দাহশয্যা পর্ব ১৬
Raiha Zubair Ripti
আজ ২৯ জুন সকালে ঘুম থেকেই উঠে সোলেমান জানতে পারলো ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে একটি মর্মান্তিক লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটেছে। সকাল ৯:৩০ মিনিটের দিকে মুন্সিগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা এমভি মর্নিং বার্ড লঞ্চটি সদরঘাটে ভিড়ার সময় পেছন থেকে ময়ূর-২ নামক একটি বড় লঞ্চের সঙ্গে সংঘর্ষে ডুবে যায়।
এই দুর্ঘটনায় অন্তত ৩৪ জন যাত্রী নিহত হন, এবং আরও অনেকে নিখোঁজ ছিলেন। দুর্ঘটনার সময় লঞ্চটিতে প্রায় ৫০ থেকে ১০০ জন যাত্রী ছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
নিউজ টা শুনেই টিভিটা বন্ধ করে দরজার পানে তাকাতেই দেখলো ম্যেড এসে দাঁড়িয়ে আছে। সোলেমান জিজ্ঞেস করলো-
-” কিছু বলবি?
-” বড় সাহেব ডাকছে আপনায়।
-” কিসের জন্য?
-” জানি না। আপনায় বললো লাইব্রেরি রুমে যেতে।
সোলেমান তপ্ত শ্বাস ফেললো। বসা থেকে উঠে ফোনটা হাতে নিয়ে লাইব্রেরি রুমে গেলো।
দেয়ালজুড়ে পুরনো বেশ অনেক গুলো কাঠের বুকশেলফে সাজানো দুষ্প্রাপ্য বইয়ের সারি। কম করে হলেও ১০ হাজার বই আছে এই ঘরের বুকশেলফে। ঘরের মাঝখানে কাঠের ভারি একটি টেবিল, বলাবাহুল্য এই কক্ষে কোনো জানালা নেই। এই কক্ষের আকৃতি খুব বিশাল নয়। আবার ছোটও নয়।
রুম পুরো ফাঁকা। বুঝলো তার চাচা কোথায় থাকতে পারে। সিক্রেট রুমে। সোলেমান এগিয়ে এসে বইয়ের তাক গুলোর মধ্যে থাকা নির্দিষ্ট এক বই ধরে সেটিকে একটু হালকা টান দিতেই এক ক্লিক শব্দ হয়। তারপর ধীরে ধীরে ডানে থাকা বইয়ের তাকগুলোর মাঝে একটি তাক স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরে গিয়ে খুলে দেয় এক গোপন পথে যাওয়ার রাস্তা। পথে অবশ্য এখনও একটা দরজা। একটা গোপন কোড লিখতে হয়। সোলেমান লিখলো সেই কোড টা। তারপর দরজা টা খুলে গেলো।
সোলেমান সেই অন্ধকার পথ বেয়ে হাঁটতে থাকে। নীচু ছাদের করিডোর। হাত বাড়ালেই ডানদিকের দেয়ালে চাপা লাইটের বোতাম। চাপ দিতেই জ্বলে ওঠে নরম, হলুদ আলো। করিডোরের শেষে একটি ভারী দরজা, লোহার কাঠামোয় মোড়া, আর তার মাঝখানে প্রাচীন ঘড়ির মতো ঘূর্ণায়মান তালা। সোলেমান একবার সেদিকে তাকিয়ে সোজা চলে গেলো নির্দিষ্ট গন্তব্যে।
বাশার সুলতান টেবিলের উপর খাতায় কিছু একটা বারংবার দেখছে। হিসেব মিলছে না। সোলেমান এসে চেয়ার টেনে বসলো। ফোনটা টেবিলের উপর রেখে বলল-
-” চোখ মুখে এত চিন্তার ছাপ কেনো?
বাশার সুলতান হাতে থাকা কাগজ টা সোলেমানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
-” থাকার কথা ১৬ টা। কিন্তু আছে ১৫ টা । আর একটা মিছিং।
-” গোলমাল হলো কি করে সেই একটার?
-” সেই একটা তো তোর কাছে। সেই একটার জন্য ডেলিভারি আঁটকে আছে। কবে নিয়ে আসবি? দু’দিন আছে হাতে সময়। এরমধ্যেই নিয়ে আসতে হবে।
সোলেমান চুপ হয়ে গেলো। শরীর টা বেশ ঘামছে। হাসফাস করে বলল-
-” পেয়ে যাবে দু’দিনের মাঝে। আসছি।
সোলেমান অস্থিরতা নিয়ে সেই কক্ষ ত্যাগ করলো। কেমন যেনো বিদঘুটে অনুভব হচ্ছে।
হসপিটালে ৩ দিন থেকে ইব্রাহিমের সাথে ইব্রাহিমের বাগান বাড়িতে আসলো ইমন। এখন জ্বর তেমন নেই শরীরে। চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে। চোখের নিচে অসুস্থ হওয়ার ছাপ। এই ৩ দিনে শরীরের ওজন টাও কমে গেছে। ইব্রাহিম ম্যেড কে ডেকে ইমনের খাবার আনতে বলল। ইব্রাহিম রিপোর্ট টা বিছানায় রেখে বলল-
-” চিন্তা করো না। করোনা হয় নি। মেডিসিন গুলো ঠিক মতো খেলে একদম সুস্থ হয়ে যাবে।
ইমন স্মিত হাসলো। ম্যেড এসে খাবার দিয়ে গেলো। ইমন হাল্কা খেলো। সম্পূর্ণ টা খেতে পারে নি। বিকেলে এসে ইয়াসিন দেখা করলো ইমনের সাথে। ইমনের পাশে বসে মন খারাপ করে বলল-
-” ঠিক আছেন নি ভাই এখন? এই কয়েকদিন বহুত মিস করছি আপনারে।
ইমন আধশোয়া হয়ে বলল-
-” মিস করেছো?
-” হ। ভাই আপনে কি অনেক দূর পড়াশোনা করছেন?
-” মাস্টার্স কমপ্লিট করেছি।
-” কই থিকা?
-” রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কেনো তুমি পড়াশোনা করো নি?
-” খুব বেশি করা পারি নাই। সোলেমান ভাই বলছিলো পড়তে। পড়ি নাই। ভাইয়ে তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলো। ভীষণ মেধাবী ভাইয়ে।
-” পড়াশোনা কেনো করলে না?
-” ভালো লাগে না পড়াশোনা করতে। এই দেশে পড়াশোনা কইরা কি লাভ কন? এই যে দেখেন আমি পড়াশোনা না কইরাও আপনার আগে থেকে ইনকাম করি। আর আপনি পড়াশোনা কইরাও বেকার ছিলেন।
ইমন তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল-
-” কথাটা তেঁতো হলেও এটা চিরন্তন সত্যি যে এ দেশে পড়াশোনা না করা লোকজনের থেকে পড়াশোনা করা লোকজনের বেকারত্ব বেশি। তার উপর যদি বাবার ছায়া না থাকে আর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধের উপর থাকে তাহলে জীবন আরো বিভীষিকাময় বুঝলে ইয়াসিন?
-” হ ভাই এটাই। আমি যা পাই নিজের হাত খরচ রাইখা বাকিটা মায়রে দিয়ে দেই।
-” তোমার পরিবারে কে কে থাকে?
-” এক মা ছাড়া আর কেউ নাই।
-” তোমার বাবা কোথায়?
-” জানি না।
-” মানে!
-” আমার মা উনার দ্বিতীয় বউ ছিলো। আম্মায় জানতো না উনি যে বিবাহিত। আমি হওয়ার দুই বছর পর জানাজানি হইছে৷ বড় বউতে উনারে বলছে আমার আম্মারে ডিভোর্স দিতে। নইলে কেস করবো। উনিও বলে ভয়ে আম্মারে ডিভোর্স দিয়ে দিছে। তারপর থেকে যোগাযোগ বন্ধ। আমি জানিও না সে দেখতে কেমন। বাপের পরিচয় ছাড়া বড় হইছি। আম্মা কখনও তার ছবি দেখায় নাই। উনি উনার প্রথম বউ বাচ্চা নিয়ে কই থাকে জানি না। আদৌও বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে কে জানে।
ইমনের ভীষণ খারাপ লাগলো কথা গুলো শুনে। কি বলা উচিত এখন তার সে বুঝতে পারলো না। ইমন তো বাবার আদর, ছায়া পেয়েছিল৷ কিন্তু ইয়াসিন তো জানেও না তার বাবা দেখতে কেমন। থেকেও না থাকার মতন।
চৌধুরী ভিলায় মেয়ের অপেক্ষায় বসে আছেন তরিকুল চৌধুরী। রাত ১২ টার পর তার মেয়ে বাড়িতে আসলো। নূর জাহান এমন ভাবে হেঁটে যেতে লাগলো যেন বসার ঘরে কেউ নেই। তরিকুল চৌধুরী মেয়েকে দেখেই উঠে দাঁড়ালো। পেছন থেকে ডাক দিলো।
-” নূর জাহান।
নূর জাহান শুনলো না সেই ডাক। তরিকুল চৌধুরী কে উপেক্ষা করে চলে যেতে নিলে তরিকুল চৌধুরী মেয়ের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল-
-” দিন কে দিন বেয়াদব হচ্ছো তুমি নূর জাহান।
নূর জাহান রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। দাঁত চেপে ঠান্ডা গলায় হুমকি দিয়ে বলল-
-” ডোন্ট কল মি নূর জাহান।
তরিকুল চৌধুরী কিছুটা নুইয়ে গেলো।
-” তোমার আর এজওয়ানের মাঝে কি চলছে মাহি?
-” হু ইজ এজওয়ান? আমার কারো সাথে কিছু নেই। আপনি প্লিজ আপনার এই চেহারা নিয়ে আমার সামনে আসবেন না তো। আমার গা গুলায় আপনাকে দেখলে। ইচ্ছে করে মে’রে ফেলতে। তাই প্লিজ জাস্ট স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম মি।
কথাটা বলেই মাহি চলে গেলো। তরিকুল চৌধুরী দাঁড়িয়ে কটমট করতে লাগলো। মাঝেমধ্যে আফসোস হয় কেনো যে সেদিন মে’রে ফেললো না এই মেয়েকে।
তরিকুল চৌধুরী বউ লুবনা চৌধুরী উপর থেকে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলেন। এগিয়ে এসে স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল-
-” কি বেয়াদব হয়েছে মেয়েটা দেখছো তো? কোথায় যায়,কোথায় থাকে কাউকে কিছু বলে না। তোমার মেয়ের চরিত্রের ঠিক নেই। না জানি কত ছেলের সাথে…
তরিকুল চৌধুরী রাগী চোখে তাকালো বউয়ের দিকে। বউ নিভে গেলো। রাগে চলে গেলো রুমে।
আগামীকাল মেহরিনের এসএসসি রেজাল্ট দিবে। আর আজকের রাতটায় ভয়ে তার হাতপা জমে যাচ্ছে। বাই এনি চান্স যদি প্লাস মিস হয়ে যায় তাহলে! মেহরিনের বাবার স্বপ্ন তার মেয়ে ডক্টর হবে। মেহরিন তার বাবার চিকিৎসা করবে। মোতালেব ভুঁইয়া রোজ এই স্বপ্ন দেখে। বাবার স্বপ্ন কেই নিজের স্বপ্ন ভেবে ক্লাস ফাইভ থেকেই লালিত করছে মেহরিন। সেজন্য তার জীবনের অর্ধেক টা সময়েরও বেশি সময় মেহরিন পড়ার মাঝে ডুবিয়ে রাখেছে নিজেকে। কলেজের বই গুলোও আগে থেকে কিনে দিয়েছিল মোতালেব ভুঁইয়া যাতে এই সময় টাতে পড়ে কিছুটা হলেও এগিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু কি জানি হলো। আকস্মিক বিয়ে ঠিক করলো।
এতে মেহরিনের একটুও মন খারাপ নেই। কারন তার শ্বশুর বাড়ি থেকে তাকে পড়তে দিবে। পুরো রাত টা মেহরিন না ঘুমিয়েই কাটালো। সকালে ভোরের আওয়াজ কানে আসতেই মেহরিন বিছানা ছেড়ে উঠে ওজু করে ফজরের নামাজ পড়ে রান্না ঘরে গেলো। আজকের সকালের ব্রেকফাস্ট টা মেহরিন নিজে বানালো। বুয়ার থেকে শুনেছে আজকের সকালে কি বানানো হবে। এবং সেই মোতাবেকই সব রান্না করেছে।
আফিয়া সুলতান ঘুম থেকে উঠে নিচে আসতেই টেবিল ভরা খাবার সাজানো দেখে অবাক হলো। রান্না ঘরের দিকে তাকাতেই দেখলো মেহরিন রুটির প্লেট আর জুশের জগ নিয়ে আসছে। আফিয়া সুলতান এগিয়ে গিয়ে মেহরিনের হাত থেকে প্লেট, জুশ নিয়ে বললেন-
-” এত কষ্ট কেনো করছো মেহরিন। এসব আমিই তো বানাতাম।
মেহরিন শাড়ির আঁচল টেনে মাথায় ভালোমতন নিয়ে বলল-
-” সব দিন তো আপনিই বানান। আজ আমি বানালাম।
আফিয়া সুলতান মেহরিন কে ধরে বসালো। মেহরিনের থুতনিতে ধরে বলল-
-” এত লক্ষী কেনো তুমি বলো তো? আমার খুব আফসোস হয় যদি তোমার মতন এমন লক্ষী গুণবতী, শান্ত একটা মেয়ে আমার হতো।
মেহরিন স্মিত হাসলো। আফিয়া সুলতানের হাতের উল্টোপিঠে চুমু খেয়ে বলল-
-” আমি তো আপনারই মেয়ে মা।
আফিয়া সুলতান জড়িয়ে ধরলো মেহরিন কে। চোখ দিয়ে দু ফোঁটা পানি গড়ালো। হ্যাঁ মেহরিনও তার মেয়ে। সোলেমান, রুমাইসাও তো তারই ছেলেমেয়ে।
রুমাইসা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে তার মাকে এভাবে মেহরিন কে আদর করতে দেখে মন খারাপ হওয়ার ভান করে বলল-
-” আমার আদরে তো এখন ভাগ বসে গেছে। ভাবি কেই আদর করো একা একা। আমি তো কেউই না। আমাকে তো ভুলে যাবে।
আফিয়া সুলতান হাসলো। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
-” পাগলী আয়।
রুমাইসা এগিয়ে আসলো। আফিয়া সুলতান দু মেয়েকে জড়িয়ে ধরলো।
আনোয়ার সুলতান আর আমিরুল সুলতান আসলেন নিচে। আজ মেহরিন খাবার সার্ভ করলো। সবাই বেশ প্রশংসা করলো মেহরিনের রান্নার। খাওয়াদাওয়া শেষে এঁটো থালাবাসন ধুয়ে রাখলো। তারপর দেওয়ালে থাকা ঘড়িতে দেখলো ১২ বেজে গেছে। ১২ টার দিকেই তো রেজাল্ট পাবলিশ হবে। মেহরিন ভাবলো ঊর্মির কথা। এসে থেকে আর কথা হয় নি ঊমির সাথে। মেয়েটা নিশ্চয়ই রেগে আছে। রুমাইসা এসে মেহরিন কে ছাঁদে নিয়ে গেলো। রুমাইসা চেক করবে মেহরিনের রেজাল্ট। মেহরিনের বুক ধুকপুক করছে। ১২ টা ১৫ বাজতেই রুমাইসা ক্রমে ঢুকলো রেজাল্ট দেখার জন্য। মেহরিনের রেজিস্ট্রেশন নম্বর আর রোল নম্বর টাইপ করলো।
মেহরিন চোখ বন্ধ করে আছে। না জানি রেজাল্ট কি আসে। রুমাইসা স্ক্রিনে আসা রেজাল্টের দিকে একবার তাকাচ্ছে তো আরেকবার মেহরিনের ভয়ার্ত মুখ টার দিকে তাকাচ্ছে। রুমাইসা গলা গম্ভীর করে বলল-
-” তুমি বলেছিলে প্লাস পাবে। কিন্তু তুমি তো প্লাস পাও নি ভাবি।
ব্যাস এই কথাটাই ছিলো মেহরিনের শরীর টাকে জমিয়ে দেওয়ার জন্য। চোখ খুলতেই টইটম্বুর হলো জলে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল-
-” সত্যি প্লাস আসে নি?
রুমাইসা দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল-
-” না।
মেহরিন এবার ডুকরে কেঁদে দিলো। এত চেষ্টা এত শ্রম তার এভাবে বিফলে চলে গেলো। আকস্মিক মেহরিন কে এভাবে কাঁদতে দেখে রুমাইসা তড়িঘড়ি করে মেহরিন কে ধরে বলল-
-” আরে কাঁদছো কেনো মেয়ে।
মেহরিন হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল-
-” আমার তাহলে কি করা উচিত?
রুমাইসা জড়িয়ে ধরে মুচকি হেঁসে বলল-
-” সেলিব্রেট করা উচিত। কারন তুমি শুধু প্লাস না। গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছো মেহরিন ওপ্স সরি ভাবি।
কথাটা কানে যেতেই কিভাবে রিয়াক্ট করবে তা ভুলে গেলো। রুমাইসা কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল-
-” সত্যি বলছো আপু?
-” হ্যাঁ এই দেখো রেজাল্ট।
মেহরিন ফোনের স্কিনে দেখলো তার রেজাল্ট টা। সত্যি গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছে মেহরিন। তার বাবা কি এতক্ষণে জেনে গেছে এই রেজাল্ট? তার অনুভূতি টা কেমন হচ্ছে?
মোতালেব ভুঁইয়া ফোনে মেয়ের রেজাল্টের দিকে তাকিয়ে আছে নিষ্পলক। তার আদরের মেয়ে তার মুখ রেখেছে। অলংকারপুর গ্রামে মাত্র দুজন গোল্ডেন পেয়েছে। তারমধ্যে একজন তার মেয়ে। মোতালেব ভুঁইয়া ফোনটা সেরিনের হাতে দিয়ে বাজারে গেলেন। মিষ্টি নিয়ে মেয়ের শ্বশুর বাড়ি যাবেন।
রুমাইসা ভাইয়ের ফোনে ফোন করছে। কিন্তু তার ভাই ফোন ধরছে না। এদিকে হাস ফাঁস করছে রুমাইসা ভাইকে মেহরিনের রেজাল্ট টা শোনানোর জন্য। অথচ ভাই তার কাজের সময়ই ফোন ধরে না। অগ্যত রুমাইসা ইব্রাহিম কে ফোন করলো। ইব্রাহিম গাড়ি চালিয়ে ক্লাবের দিকে যাচ্ছিল। রুমাইসার ফোন পেয়ে ফোনটা রিসিভ করে কানে নিয়ে বলল-
-” বল।
-” ভাইয়া কোথায়? ফোন কেনো ধরছে না?
-” আমি তোর ভাইয়ের কাছেই যাচ্ছি। কি কথা বলবি সেটা বল।
-” ভাইকে বলে দিও তার বউ গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছে।
ইব্রাহিম ভ্রু কুঁচকালো।
-” কিসের গোল্ডেন জিপিএ?
-” এসএসসি। আজ তো এসএসসির রেজাল্ট দিয়েছে। আর মেহরিন গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছে।
ইব্রাহিম চমকালো। সোলেমানের বউ কি এসএসসি দিলো এবার!
-” সোলেমানের বউয়ের বয়স কত?
-” মেয়েদের বয়স জিজ্ঞেস করা ইট’স ব্যাড ম্যানার্স ভাইয়া।
-” সত্যি সোলেমানের বউ এত ছোট! সবে এসএসসি দিলো!
-” অবাক কেনো হচ্ছো? জানতে না?
-” আচ্ছা রাখছি। সোলেমান কে জানিয়ে দিব আমি তার বউয়ের রেজাল্ট।
ইব্রাহিম ফোন টা কেটে দ্রুত গতিতে গাড়ি থেকে নেমে এক খাপ মিষ্টি নিয়ে ক্লাবে আসলো। সোলেমান বসে ছিলো নিজের কক্ষে। ফোনটা টেবিলের উপরেই উল্টো হয়ে সাইলেন্ট করে রাখা। ইব্রাহিম কক্ষের ভিতরে ঢুকলো। মানুষের সামনে জ্ঞান দেওয়া ছেলে,বাল্যবিবাহ বিরোধী হয়ে সে নিজেই বাল্যবিবাহ করে বসে আছে। ইব্রাহিম সোলেমানের মুখে একটা মিষ্টি ঢুকিয়ে দিয়ে বিষন্ন গলায় বলল-
-” কংগ্রাচুলেশনস সোলেমান। তোর বউ..
সোলেমান ভ্রু কুঁচকালো। ইব্রাহিমের সম্পূর্ণ কথা না শুনেই ত্বরিত মোড়ে মুখ থেকে মিষ্টি টা বের করে বলল-
-” বা’ল কিসের মিষ্টি খাওয়াচ্ছিস আর কিসের কংগ্রাচুলেশনস? বউয়ের সাথে এখনও এক বিছানায় শুতেই পারি নি৷ কংগ্রাচুলেশনস শোনার জন্য তো কিছু করা লাগে৷ সেটাও তো করি নি। বউকে আজ পর্যন্ত একটা চুমু তো দূরে থাক ছুঁয়েই দেখা হয় নি। আর তুই ফইটকার নাতি মিষ্টি নিয়ে এসে বলছিস কংগ্রাচুলেশনস! মাথা ঠিক আছে তোর? নাকি এই দিনের বেলায় নেশা মেরে এসেছিস।
ইব্রাহিম তপ্ত শ্বাস ফেললো।
-” আমি কোনো নেশা করি নি। আর তুই আমার সম্পূর্ণ কথা না শুনেই অন্য কিছু ভাবছিস।
-” তাহলে কংগ্রাচুলেশনস বলিস কেনো? আর এই মিষ্টি কিসের?
-” তোর বউ গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছে এসএসসি এক্সামে।
সোলেমান বিরক্ত হলো।
-” পেতেই পারে গোল্ডেন জিপিএ। এতে মিষ্টি খাওয়ানোর কি আছে? সেই চার পাঁচ বছর আগের রেজাল্টের মিষ্টি তুই এখন খাওয়াচ্ছিস ফইটকার নাতি?
-” আজকে কিসের রেজাল্ট পাবলিশ হয়েছে জানিস?
-” না তো। কিসের?
-” এসএসসির।
-” তো?
-” তোর বউয়ের ও আজ রেজাল্ট পাবলিশ হয়েছে। আর সেটা এসএসসির।
সোলেমান ফট করে তাকালো ইব্রাহিমের মুখের দিকে।
-” মাথা ঠিক আছে তোর? আমার বউ তো অনার্সে পড়ে।
-” জ্বি না। তোর বউ এসএসসি পাশ করলো আজ।
-” মজা নিস না তো।
-” তুই আমার শালা লাগিস যে মজা করবো? রুমাইসা ফোন করে জানালো এই নিউজ। রুমাইসা তোকেও ফোন করেছিলো। ফোনে পায় নি বলে আমায় ফোন করে জানিয়েছে।
সোলেমান টেবিলের উপর থেকে ফোন টা নিয়ে দেখলো অনেক গুলো মিসকল রুমাইসার৷ সোলেমান কল ব্যাক করলো রুমাইসা কে। রুমাইসা ফোন রিসিভ করতেই সোলেমান বলল-
-” মেহরিনের আজ রেজাল্ট পাবলিশ হয়েছে?
রুমাইসা উৎফুল্লতার সহিত বলল-
-” হ্যাঁ এর সাথে অলংকারপুর গ্রামের মাঝে দ্বিতীয় হয়েছে।
সোলেমান রাগে ফোন টা কেটে দিলো। তার মা তাকে মিথ্যা বলেছে সেদিন! বলেছে অনার্সে পড়ে মেহরিন! আর মেহরিনের কথাবার্তা শুনে তো মনে হলো না মেহরিন এত ছোট! শেষে কি না বাল্যবিবাহ করলো সে! সোলেমান চেয়ার ছেড়ে উঠে রেগে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল-
-” আমি নওগাঁ যাচ্ছি।
এজওয়ান সুলতান আজ বাহাদুরের ফ্ল্যাটে এসেছে৷ বাহাদুর নূর জাহানের নাম্বার কালেক্ট করে এনেছে। এজওয়ান নাম্বার টা ফোনে উঠিয়ে ডায়াল করলো।
সবেই বোনের বাড়িতে এসেছে মাহি। আননোন নাম্বার থেকে ফোন আসায় ভ্রু কুঁচকালো। ফোন রিসিভ না করে উল্টো কেটে দিলো। এজওয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো। ফুঁসতে ফুঁসতে বলল-
-” এই এজওয়ান সুলতানের ফোন কেটে দিচ্ছে এই মেয়ে!
বাহাদুর দাড়ি সেভ করতে করতে বলল-
-” ঐ মেয়ে জেনে বসে আছে নাকি তুই ফোন দিয়েছিস।
-” কথা খুব একটা ভুল বলিস নি। আবার ট্রাই করবো?
-” কর।
এজওয়ান আবার ট্রাই করলো। মাহি সেম নম্বর থেকে আবার ফোন পেয়ে এবার রিসিভ করলো। কানে নিয়ে বলল-
-” কে বলছেন?
-” আমি তোমার ফিউচার সুইটহার্ট।
মাহির চোখ মুখে রাগে ছাপ স্পষ্ট হলো।
-” ফাইজলামি করছেন আমার সাথে? কে আপনি?
-” বললাম তো তোমার ইন ফিউচার বাচ্চার বাবা।
মাহি চোয়াল শক্ত করে বলল-
-” থাপ’ড়িয়ে একদম বাপের নাম ভুলিয়ে দিব।
-” মনে হয় না তোমার হাতে থা’প্পড় খেয়ে বাপের নাম টা ভুলতে পারবো৷ তবে তোমার ঠোঁটে জোশ জোশ চুমু খেলে নিজেকে ভুলে যেতে পারি।
-” জু’তা চিনিস রাস্কেল?
-” হ্যাঁ চিনি তো। তোমার জুতার মাপ কতো বলো নিয়ে আসছি।
-” এই কে রে তুই?
-” বাঁচাল মেয়ে এক কথা বারবার বলিস কেনো? বললাম না তোর বাচ্চার বাপ আমি।
মাহি ফোন কেটে দিলো। পরক্ষণে আবার কল আসলো। মাহি ধরলো না। এজওয়ান সেটা দেখে বাহাদুর কে বলল-
-” এ বা’ল তোর দাড়ি রাখ৷ চল আমার সাথে।
-” কোথায় যাব?
-” আমার শ্বশুর বাড়ি।
-” সেভ টা করে নেই।
-” করা লাগবে না। ড্রোন টা সাথে নিয়ে চল।
-” ড্রোন দিয়ে আবার কি হবে?
-” আমি বাসর রাত করবো আর তুই ভিডিও করবি সেজন্য নিব। কথা না বলে আয় তাড়াতাড়ি।
বেচারা বাহাদুর অর্ধেক সেভ করা মুখটা পানিতে ওয়াশ করে ড্রোন হাতে নিয়ে দৌড় লাগালো। গাড়িতে এসে দেখলো এজওয়ান কারো লোকেশন ট্র্যাক করছে।
-” কার লোকেশন ট্র্যাক করছিস?
-” তোর ভাবির। সোজা গুলশানের ১ এ যাবি। এই লোকেশনে।
বাহাদুর গাড়ি চালিয়ে সেই লোকেশনে গেলো। গাড়ির ভেতর থেকে বাড়ি টা দেখেই এজওয়ান বলল-
-” ক্যেয়া বাত হ্যে। শাকিলের বাড়িতে এসেছে নূর জাহান! বাহাদুর ড্রোন দিয়ে দেখ তো নূর জাহান কোন রুমে।
বাহাদুর ড্রোন দিয়ে দেখলো। দক্ষিণ পাশের এক রুমে সোফায় আধশোয়া হয়ে টেবিলের উপর পা রেখে চোখ বন্ধ করে আছে। এজওয়ান দেওয়াল টপকে সেই কক্ষের পাশে গেলো। তারপর পাইপ বেয়ে উপরে উঠে বেলকনি দিয়ে রুমের ভেতর গেলো। মাহি এখনও টের পায় নি তার রুমে যে সে ব্যতিত আরো একজন আছে। এজওয়ান মাহির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। দেওয়ালে হেলান দিয়ে বুকে দু হাত গুঁজে মাহির দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইলো।
-” মিস ধানিলঙ্কা,, তোমার ঝালের তেজে চলে আসতে হলো চোরের মতন পাইপ বেয়ে।
এজওয়ান এগিয়ে আসলো। মাহির মুখের কাছে এগিয়ে নিলো নিজের মুখটা। মাহি হঠাৎ করে কারো উপস্থিতি টের পেলো নিজের অতি নিকটে। তাই ফট করে চোখ মেলে তাকালো। আর এতেই সামনে থাকা সেই মুখ দেখে চমকালো। এজওয়ানের বুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল-
-” আপনি এখানে!
এজওয়ান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল-
-” হুমমম। তোমাকে দেখতে আসলাম।
-” আমাকে দেখতে এসেছেন মানে?
এজওয়ান বিরক্ত হলো। সোজা কথাই তো বললো তাকে দেখতে এসেছে। তারপর ও ঢং করে বলছে আমাকে দেখতে এসেছেন মানে!
-” কি চাই আপনার? কেনো এসেছেন? আর আপনাকে ঢুকতে দিলো কে?
-” আমার কি চাই? আমার তোমাকে চাই।
-” আমাকে মানে?
-” মনে ধরছে তোমায় আমার ডার্লিং। সেজন্য আমার লাগবে তোমাকে।
মাহি দাঁতে দাঁত চেপে বলল-
-” হু আর ইউ?
-” আমি? ভুলে গেলে আমায়! কোনো ব্যাপার না। মনে করিয়ে দিচ্ছি।
— আমি হলাম রোমিও
লেডি কিলার রোমিও
পাক্কা প্লে বয় রোমিও
ফ্লার্টিং মাস্টার রোমিও…এজওয়ান সুলতান।
মাহি নাম টা শুনে চিনতে পারলো। এই ছেলের কথাটাই কাল তাহলে উনি বলেছিল। মাহি হাত নাড়িয়ে বলল-
-” গেট দ্য হেল আউট অফ আওয়ার হাউজ। রাইট নাও।
-” না গেলে কি করবে?
-” কি করবো দেখবেন?
মাহি এজওয়ানের কলার ধরার জন্য হাত বাড়াতেই এজওয়ান কিছুটা নিচু হয়ে মাহিকে খুলে যাওয়া জুতার ফিতাটা বেঁধে নেয়। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়াতেই মাহি এজওয়ানের হাত ধরে বাড়ির বাহিরে আসে। আর বাহিরে আসতেই নজরে আসে বাহাদুর কে। বাহাদুর হাত দিয়ে অর্ধেক সেভ করা মুখ লুকায়। মানইজ্জত রাখলো না এই এজওয়ান। মাহি এজওয়ান কে ধাক্কা দিয়ে সামনে এনে দাঁড় করিয়ে হুংকার দিয়ে বলে-
-” এসব ফ্লাটিং অন্য মেয়ের সামনে গিয়ে করবেন। আমি ঐ সব রাস্তার সস্তা মেয়ে নই।
-” তুমি তো ডায়মন্ড। এক্সপেন্সিভ।
চোখ টিপে বলল এজওয়ান।
-” হ্যাঁ আমি এক্সপেন্সিভ তো বটেই। হোপ ডায়মন্ড আমি। আর সেই হোপ ডায়মন্ড কেউ কেনার সাহস দেখায় না। আর আপনার মতন ছেলেরা হাত বাড়ালে সে হাত একদম ঝলসে যাবে। আমাকে ছোঁয়ার চেষ্টাও করবেন না মাইন্ড ইট। বি কেয়ার ফুল। আমাকে এখনও ঠিক মতন চিনেন নি।
-” চিনতেই তো চাই আগুন সুন্দরী।
-” দু বার জন্ম নিলেও আমাকে চেনার সাধ্য আপনার হবে না।
মাহি চলে গেলো। এজওয়ান রেগে গাড়িতে গিয়ে বসলো। এজওয়ান ও গিয়ে উঠলো গাড়িতে৷ বাহাদুর কে বলল-
-” মাল বের কর।
বাহাদুর পেছন থেকে হুইস্কির বোতল বের করে এগিয়ে দিয়ে বলল-
-” ঐ মেয়ে তো তোরে পাত্তাই দিলো না। ধাক্কা মেরে বের করে দিলো বাড়ি থেকে। আর তুই ঐ মাইয়ার লাইগা আমারে দাড়ি টাও সেভ করতে দিলি না।
এজওয়ান হুইস্কির বোতলে চুমুক দিয়ে বলল-
-” তাতে আমার বা’ল ছেড়া গেছে? ওর জন্য সাতখুন ও মাপ।
-” আর হোপ ডায়মন্ড কারে কয় আবার?
-” একটা ডায়মন্ড আছে৷ সেটার নাম হোপ। এটাকে অভিশপ্তও বলা হয়। এটা নিয়ে অনেক কাহিনি আছে।
-” বল না।
-” বাল গুগল ঘেঁটে জান। এখন গাড়ি স্টার্ট দে।
-” দাঁড়া আগে গুগল ঘেঁটে জেনে নেই।
বাহাদুর গুগলে লিখলো হোপ ডায়মন্ড কে অভিশপ্ত ডায়মন্ড বলা হয় কেনো?
গুগল জানালো—
চারশো বছর আগে, গোলকোন্ডার গহীন খনির গাঢ় অন্ধকারে প্রথম আলোয় এসেছিল এক অদ্ভুত নীল রঙের হীরা। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, হীরাটি ছিল বিষ্ণু মন্দিরের একটি মূর্তির চোখ। সেখানে এটি পূজিত হতো, রক্ষিত হতো, ভয় হতো তাকে… কারণ সৃষ্টির শুরু থেকেই হীরাটির চারপাশে ছিল এক নীরব অভিশাপের ঘূর্ণি।
একদিন হীরার ভাগ্য বদলে যায়। ইউরোপীয় এক ধনুকাটা ব্যবসায়ী, Jean-Baptiste Tavernier, সে হীরাটিকে চুরি করে। গোপনে মন্দির ছাড়িয়ে সে হীরাটি নিয়ে চলে যায় ফ্রান্সে। অনেকে বলে, মন্দির থেকে বেরিয়ে আসার মুহূর্তেই সে হীরার নিচ থেকে বিষাক্ত সাপ বেরিয়ে এসে তাকে ছোবল দিয়েছিল। সে বেঁচে গিয়েছিল, কিন্তু তার চারপাশের মানুষ একে একে অদ্ভুতভাবে মৃত্যুবরণ করতে শুরু করে।
Tavernier হীরাটি বিক্রি করে ফরাসি রাজা লুই চতুর্দশের কাছে। রাজা সেই হীরাকে নতুন আকার দেন, রাজদরবারের জন্য উপযুক্ত করে কেটে নেন। তারপর থেকেই শুরু হয় রাজপরিবারের একের পর এক বিপর্যয়। রাজা লুইয়ের শরীর ধীরে ধীরে রোগে ভরে ওঠে, তাঁর একাধিক সন্তান অল্প বয়সে মারা যায়। অভিশাপ ধীরে ধীরে গ্রাস করে পুরো রাজবংশকে।
বছর পঁচিশ পর, সেই হীরাটি পরে ছিল রাজা লুই ষোড়শের রানী,মেরি আন্তোয়ানেতের গলায়। ফরাসি বিপ্লবের সময় তারা দুজনেই আটক হন। লোককাহিনিতে আছে, হীরাটি তাদের ফাঁসির দিনও রানীর কাছে ছিল। গিলোটিনে তাদের মাথা কাটার সময় হীরার সেই গাঢ় নীল আলো নাকি ভিড়ের চোখে বিদ্যুৎ খেলে দিয়েছিল।
পরবর্তী দেড় শতক ধরে হীরাটি ঘুরে বেড়িয়েছে ইউরোপের রাজপ্রাসাদ থেকে ধনী ব্যবসায়ীর লকারে, সংগ্রাহকের ড্রয়ারে, কখনো কখনো চুরি হয়ে, কখনো আবার মৃত্যুর হিমশীতল ছায়ায়।
Henry Philip Hope নামের এক ব্রিটিশ ধনীর হাতে পড়ে হীরাটি পায় তার বর্তমান নাম,Hope Diamond। তবে আশার প্রতীক না হয়ে, হীরাটি তার পরিবারে এনে দেয় দারিদ্র্য, আত্মহত্যা আর বিচ্ছিন্নতা। হেনরির নাতি অবসাদে আত্মহত্যা করে, তাঁর স্ত্রী পাগল হয়ে যান।
এক সময় হীরাটি এক অভিনেত্রীর হাতে যায়। সেই অভিনেত্রী গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান। এক প্রিন্স এটিকে কিনে তার স্ত্রীকে উপহার দেন, স্ত্রী কিছুদিন পর তাকে ছুরি দিয়ে হত্যা করেন। হীরাটি ক্রমশ রক্তের মতো রঙহীন শোক ছড়িয়ে দিতে থাকে।
শেষে আসে হ্যারি উইনস্টন। তিনি হীরাটিকে সংগ্রহ করলেও বেশি দিন রাখেননি। এক সকালে একটি সাধারণ কাগজের খামে ভরে তিনি এটি পাঠিয়ে দেন Smithsonian জাদুঘরে। তিনি বলেন, মানুষ যদি জিনিসকে ভালোবাসে, তবে তার মুক্তি দিতেও শিখতে হয়। এরপর থেকে হীরাটি আর ব্যক্তিমালিকানায় যায়নি।
আজও Smithsonian-এ একটি আলোর ঘূর্ণিতে সাজিয়ে রাখা আছে Hope Diamond। হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন এসে তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়, ছবি তোলে, হাসে।
বিকেলের দিকে মোতালেব ভুঁইয়া ফল মিষ্টি নিয়ে আসেন মেয়ের শ্বশুর বাড়ি। আফিয়া সুলতান মোতালেব ভুঁইয়ার আপ্যায়ন করেন। মোতালেব ভুঁইয়া আর্জি জানায় মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার। আফিয়া সুলতান মানা করেন নি। মোতালেব ভুঁইয়া সন্ধ্যার আগ দিয়ে মেয়েকে নিয়ে বাড়িতে আসেন। কারন আকাশের অবস্থা ভালো না। যে কোনো মুহূর্তে বৃষ্টি আসতে পারে।
ঊর্মি খবর পেয়েছে মেহরিন এসেছে। আর শুনেই ছুটে এসেছে মেহরিন দের বাসায়। মেহরিম ভেবেছিলো ঊর্মি বোধহয় রাগ করে বসে থাকবে৷ কিন্তু না ঊর্মি এসেই জড়িয়ে ধরে বলেছে-
-” কংগ্রাচুলেশনস মেহু। তুই আমাদের গ্রামের ভেতর দ্বিতীয় হয়েছিস। আমি অনেক খুশি মেহু।
মেহরিন ঊর্মি কে নিজের থেকে ছাড়িয়ে বলল-
-” আর তোর রেজাল্ট?
-” ভালোই এসেছে। ৪.৯২। একটুর জন্য আসে নি প্লাস।
মেহরিন গালে হাত রাখলো ঊর্মির।
-” খুব কেঁদেছিস তাই না?
ঊর্মির চোখ দিয়ে জল পড়লো। খুব চেয়েছিল আটকিয়ে রাখতে। কিন্তু মেহরিনের কথা শুনে আর আটকাতে পারলো না।
-” ব্যাপার না। আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই তো করে।
-” কিছু খাস নি তাই না? দাঁড়া বস এখানে। আমি কিছু নিয়ে আসি।
কথাটা বলেই মেহরিন মিষ্টি আনতে গেলো। ঊর্মি মিষ্টি টা খেলো। কিন্তু পানি খাওয়ার সময় গ্লাস টা হাত ফস্কে নিচে পড়ে গেলো। মেহরিন বলল-
-” কোনো ব্যপার না। পানি নিয়ে আসছি।
ঊর্মি বাঁধা দিয়ে বলল-
-” আনিস না৷ বাসায় গিয়ে খেয়ে নিব নি। এখন উঠি। পানি টা মুছে দিস।
ঊর্মি চলে গেলো। মেহরিন দরজা আটকিয়ে প্লেট গ্লাস রাখতে গেলো। আর মনে থাকলো না পানিটা মোছার।
সোলেমান সুলতান ভিলায় আসে ঠিক সাড়ে সাতটার পর। বাহিরে তখন বাতাস আর মৃদু মৃদু বৃষ্টি হচ্ছে। বাড়িতে ঢুকেই গলা চেঁচিয়ে মাকে ডাকে। আকস্মিক ছেলের গলা শুনে আফিয়া সুলতান হতবিহ্বল হলো। তার ছেলে এসেছে! রুম থেকে বেরিয়ে আসলো। দেখলো সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত তার ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। এগিয়ে আসতেই সোলেমান জিজ্ঞেস করলো-
-” মেহরিন কোথায় মা?
ছেলের গলায় রাগের আভাস পেয়ে চমকালো আফিয়া সুলতান।
-” কি হয়েছে? এমন রেগে আছিস কেনো?
-” তুমি আমাকে মিথ্যা কেনো বলেছিলে যে মেহরিন অনার্সে পড়ে? ঐ মেয়ে তো সবে এসএসসি পাশ করলো।
আফিয়া সুলতান বুঝলো কেনো তার ছেলে এত রেগে৷ রুমাইসা খবর দিয়েছে নিশ্চয়ই।
-” যদি বলতাম এসএসসি পাশ তাহলে বিয়ে করতি?
-” তাই বলে মিথ্যা বলবে! মেহরিন কোথায়?
-” ওর বাবা এসেছিল। সন্ধ্যার আগ দিয়ে নিয়ে গেছে।
সোলেমান উল্টো ঘুরে চলে যেতে নিলে আফিয়া সুলতান ডেকে বলে-
-” কোথায় যাচ্ছিস?
সোলেমান রেগে বলল-
-” বউ তালাক দিতে।
-” সোলেমান বাড়াবাড়ি কিন্তু করবি না।
সোলেমান জবাব দিলো না। সেই ঝড় বাতাসের মাঝেই গাড়ি চালিয়ে অলংকারপুর গ্রামে আসলো। গাড়ি মেহরিন দের বাড়ির গেটে রেখে উঠোন দিয়ে হেঁটে যেতেই বৃষ্টি তে ভিজে গেলো।
ঝড় আসায় কারেন্ট চলে গেছে। হারিকেন জ্বালিয়ে মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে মেহরিন। পড়নে তার সাদা রঙের সেলোয়ার-কামিজ। এসেই শাড়ি চেঞ্জ করে এটা পড়েছে। আকস্মিক দরজায় ঠকঠক শব্দ শোনা গেলো। এখন কে এসেছে আবার। মেহরিন মাকে বলল-
-” আমি দেখে আসছি।
মেহরিন ওড়নাটা মাথার উপরে সুন্দর করে গুছিয়ে নিলো। ফ্লোর থেকে হারিকেনটা হাতে তুলে নিয়ে নিঃশব্দে রুম থেকে বেরিয়ে এলো সে। দরজার সিটকানিতে হাত দিয়ে খুলতেই সামনে একজন কে দেখে ভ্রু কুঁচকালো ।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন অপরিচিত পুরুষ। তার শরীরে আধভেজা সাদা পাঞ্জাবি,ছাপা নেই, রঙ নেই, তবুও যেন চাঁদের আলোয় দুধসাদা হয়ে উঠেছে। তার মুখটা কিছুটা ভিজে, আর চুলগুলো কপালের দিকে লেগে আছে বৃষ্টির ছোঁয়ায়। সাদা পাঞ্জাবির নিচে নুপুরছাপ স্নিগ্ধতা, তবে চোখে কী যেন চাপা বিস্ময়।
সোলেমান সেই মুহূর্তে আবার দরজায় কড়া নাড়তে যাচ্ছিলো। ঠিক তখনই আলোটা চোখে পড়লো,মেয়েটা হারিকেন হাতে দাঁড়িয়ে আছে, সাদা সেলোয়ার-কামিজে তার মুখখানা যেন ছায়াপাত হীন, নিখুঁত। হারিকেনের হালকা কমলা আলোয় তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, যেন কোনো শুভ্র পরী দাঁড়ানো সামনে। সোলেমান মুহূর্তে থমকে গেল।
সে পরপর দুবার চোখের পলক ফেললো।
মেহরিন সামনে থাকা লোকটাকে নিজের দিকে এক দৃষ্টি নিয়ে তাকাতে দেখে জিজ্ঞেস করলো-
-’ আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না। কে আপনি?
সোলেমান গলা খুলে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। শব্দ যেন বুকেই আটকে গেল, ঠোঁট পর্যন্ত এসে জমে রইলো নীরবতায়।
ভেতর থেকে সেরিন এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো-
-” কে এসেছে?
মেহরিন জবাবে এগিয়ে এসে বলল-
-” চিনি না।
সেরিন মেহরিনের হাত থেকে হারিকেন টা নিয়ে বলল –
-” রুমে যা আমি দেখছি।
মেহরিন চলে গেলো। সেরিন দরজায় কাছটায় এসে সামনে তাকাতেই সোলেমান কে দেখে চমকালো। দরজাটা সামনে থেকে সরে বলল-
দাহশয্যা পর্ব ১৫
-” ভাইয়া আপনি! আসুন ভেতরে আসুন।
সোলেমান ভেতরে ঢুকলো। সেরিন মাকে ডেকে বলল-
-” মা বাহিরে এসো তাড়াতাড়ি । সোলেমান ভাইয়া এসেছে।
রুমের ভেতর থেকে সানজিদা বেগম বেরিয়ে আসলেন। মেহরিন বরফের মতন জমে গেলো নাম টা শুনে, সোলেমান! ওটা তার স্বামীর নাম। তার মানে ওটা উনি ছিলো ! আল্লাহ সে তো অপরিচিত ভেবে ওভাবে কথা বলে ফেলেছে। এখন কি হবে? তবে তার স্বামী এত সুন্দর! মেহরিন বিরবির করে উচ্চারণ করলো-“ মাশা-আল্লাহ।
