Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ২৯

দাহশয্যা পর্ব ২৯

দাহশয্যা পর্ব ২৯
Raiha Zubair Ripti

নিশুতি রাত। রাত পেহালেই কোরবানির ঈদ। চারপাশে তখন নিস্তব্ধতা। রাতের আকাশে আধো চাঁদের আলো,দূরে কুকুরের একটানা ডাক আর মাঝে মাঝে গাছের পাতায় হালকা বাতাসের সাড়া।
সোলেমান আর ইব্রাহিম দুজনেই মেহরিন দের বাড়ি থেকে ফিরছে, গাড়ির পেছনের সিটে রাখা মোতালেব ভুঁইয়ার দেওয়া ঈদের নতুন জামাকাপড়ের ব্যাগগুলো। সেখান থেকে এখনো হালকা আতরের ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে। রাস্তায় তখন লোকজন কম, তবে আলোঝলমলে দোকানগুলো থেকে ভেসে আসছে উৎসবের শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা।
ইব্রাহিম কিছুটা ঘুম ঘুম চোখে পাশের সিটে মাথা হেলিয়ে বসে, আর সোলেমান একহাতে স্টিয়ারিং, অন্য হাতে ফোন ধরে ফেসবুক স্ক্রোল করছে।
গাড়ি ধীরে ধীরে সুলতান ভিলার গেটের কাছে পৌঁছাল। ঠিক সেই সময় সোলেমানের চোখ আটকে গেল একটি হেডলাইনে।

“ টেকনাফে পুলিশের গুলিতে সাবেক মেজর জুনায়েদ খান নিহত”
সাথে এক ঝাপসা ছবি রক্তমাখা রাস্তা, জরুরি আলোয় ঝলমলানো অ্যাম্বুলেন্স, আর নিচে হাজারো শোকমাখা মন্তব্য।
সোলেমান কে ফোনে এমন অদ্ভুত ভাবে ডুবে যেতে দেখে পাশে বসা ইব্রাহিম একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে-
-” কি হয়েছে?
সোলেমান ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
-” মেজর জুনায়েদ খান পুলিশের গু’লিতে মা’রা গেছে।
ইব্রাহিম মোবাইলটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনে তাকায়। একের পর এক নিউজফিড ভেসে আসছে। চোখে পড়ে ইউনিফর্ম পরা এক সাহসী পুরুষের ছবি।

মেজর (অব.) মোহাম্মদ জুনায়েদ খান ২০১৮ সালে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন। তিনি মেধাবী, বিচক্ষণ, উদ্ভাবনশীল এবং স্বাধীনচেতা অফিসার ছিলেন। তার বাবা অর্থমন্ত্রণালয়ের সাবেক উপসচিব ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আবদুল খান। গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জে।
চাকরি থেকে অবসর নিয়ে তিনি বহুমুখী প্রতিভার বিকাশে মনোযোগী ছিলেন। করোনা মহামারির কারণে তার বিশ্বভ্রমণ ও ‘জাস্ট গো’ প্রমাণ্যচিত্র প্রকল্প পিছিয়ে যায়।
ঈদের আগে, রাত ৯টায় কক্সবাজারের টেকনাফে শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন।
এই মেজর জুনায়েদ ছিলেন সংস্কৃতিমনা মেধাবী ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। চাকরি থেকে অবসর নিয়ে বিভিন্নমুখী প্রতিভার বিকাশ ঘটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। মেজর জুনায়েদ বিশ্বভ্রমণের প্রস্তুতি নিয়েও করোনা মহামারির কারণে তার অভিযান পিছিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি প্রিয় মাতৃভূমির সৌন্দর্য বিশ্বদরবারে তুলে ধরার জন্য ‘জাস্ট গো’ নামের প্রমাণ্যচিত্র তৈরি করছিলেন। এ জন্য ফিল্ম তৈরিতে পারদর্শী স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন ছাত্রকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার সেই ‘ জাস্ট গো’ প্রজেক্ট টা অসম্পূর্ণই থেকে যায়। ঈদের আগের দিন রাত ৯টায় কক্সবাজারের টেকনাফে মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হলেন।
এত এত লেখা গুলো পড়ে সোলেমান আর ইব্রাহিম দু’জনেই থ হয়ে গেলো। ইব্রাহিম বা হাত দিয়ে কপাল ঘষতে ঘষতে বলল-

-” দেশে সাহসী মানুষরা যদি এভাবে হারিয়ে যায়… তাহলে আমরা কার হাতে নিরাপদ? আমার মনে হয় এটা পরিকল্পিত হ’ত্যা সোলেমান।
সোলেমান ফোন টা পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে বলল-
-” হতে পারে। তদন্তের পর জানা যাবে।
-” হুমম। আগামীকাল সব পরিবার ঈদের আনন্দে মাতবে। আর এই পরিবার পুত্র হারানোর শোক পালন করবে ভেবেই খারাপ লাগছে।
সোলেমান দের গাড়িটা ধীরে ধীরে সুলতান ভিলার গেটের ভিতর দিয়ে প্রবেশ করলো। রাত এখন আনুমানিক ১ টার কাছাকাছি বাজে। সোলেমান গাড়ি থেকে নেমে জামাকাপড়ের ব্যাগ গুলো নিয়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করছে।
কেবলই তাহাজ্জুদের নামাজ শেষ করেছে মেহরিন। গাড়ির হর্ণের শব্দ পেয়ে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকাতেই দেখতে পায় সোলেমান এসেছে।
ইব্রাহিম ক্লান্ত শরীর নিয়ে রুমে চলে গেছে।
মেহরিন জানালা থেকে সরে এসে দরজাটা খুলতেই সোলেমান কে দেখতে পায়। হাতে তার অনেক গুলো শপিং ব্যাগ। মেহরিন সোলেমানের হাত থেকে ব্যাগ গুলো নিতেই সোলেমান পাঞ্জাবির কলার টেনে পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে বলে-

-” জেগে ছিলে?
মেহরিন ডিভানের উপর প্যাকেট গুলো রেখে বলল-
-” হুমম।
-” জেগে কি করছিলে?
-” আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করছিলাম।
-” তাহাজ্জুদ?
-” হুমম। এগুলো কি বাবা দিয়েছে?
-” হ্যাঁ। বলে এসেছি আগামীকাল বিকেলের দিকে তোমায় নিয়ে যাব ও বাড়ি। সকালেই যেতাম কিন্তু কোরবানির ঈদ তো। সকালে সময় হবে না।

-” খেয়ে এসেছেন?
-” হ্যাঁ। তোমার আম্মা জামাই আদর করে তারপর ছেড়েছে। সেজন্যই তো দেরি হয়ে গেলো ফিরতে।
-” আচ্ছা তাহলে এখন ঘুমাবেন তো?
-” হুমম। তুমি শোও আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।
মেহরিন বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো। সোলেমান ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে মেহরিনের পাশে শুয়ে পড়লো। আজ কিছুটা দূরত্বে ঘুমালো দু’জন দু’দিকে ফিরে।
ঘড়ির কাঁটা ঠিক ভোর ৫:১৫ ছুঁই ছুঁই। ঈদের দিনের সেই চেনা, প্রশান্ত,উৎসবভরা ভোর। মেহরিনের ঘুম ভাঙতেই মেহরিন প্রথমে পাশে তাকায়। সোলেমান তার দিকেই ফিরে ঘুমিয়েছে। মেহরিন আস্তে করে শোয়া থেকে উঠে পর্দা সরিয়ে জানালার বাহিরে তাকালো। আকাশ হালকা সোনালি, দূরে মিনার থেকে ভেসে আসছে তাকবিরের ধ্বনি, “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার…”

মেহরিনের বিয়ের পর আজ প্রথম কোরবানি ঈদ তার এই নতুন সংসারে। মেহরিন ওয়াশরুম থেকে ওজু করে এসে ফজরের নামাজ টা আদায় করে ওড়না টেনে, পা টিপে রান্নাঘরে চলে যায়।
সকালের রান্না আজ একটু ভিন্ন। খুবই হাল্কা, সেমাই, শাহী পরোটা রাঁধে মেহরিন। এখন ভারি কিছু রাঁধল না। সেমাই, চা পরোটা খেয়ে বাড়ির পুরুষ গুলো নামাজে যাবে। আফিয়া সুলতান রান্না ঘরে এসে দেখে মেহরিনের রান্না প্রায় শেষের দিকে।
এদিকে ছয়টা বাজার একটু আগে সোলেমান ঘুম ভাঙতেই পাশের বালিশের দিকে তাকিয়ে দেখে কেউ নেই। ঘুমচোখে উঠে দাঁড়িয়ে দরজার কাছে আসতেই, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসে ঘি আর দারচিনির ঘ্রাণ। সোলেমান বুঝে গেলো বউ তার রান্না ঘরে। পরশু আনা জামাকাপড় গুলো বোধহয় বউ তার খুলেই দেখে নি। সোলেমান হাঁক ছেড়ে ডাকলো-“ মেহরিন একটু রুমে আসো তো।
সোলেমানের ডাক শুনে মেহরিন রুমে ছুটে আসে। সোলেমান আলমারি থেকে সেদিন আনা প্যাকেট গুলো বের করছে।

-” কিছু বলবেন?
সোলেমান তিনটা প্যাকেট হাতে তুলে নিয়ে বলল-
-” হুমম। এখান থেকে যে কোনো একটা চুজ করে গোসল সেরে পড়ে এসো।
মেহরিন উল্টেপাল্টে দেখলো সব গুলো পোশাক সাদা রঙের। মেহরিন সাদা শাড়ি টা তুলে নিতেই সোলেমান বলল-
-” বাচ্চা মেয়ে শাড়ি রাখো৷ কামিজ টা পড়ো।
মেহরিন মাথা নেড়ে কামিজ নিয়ে ওয়াশরুমে গেলো।
সোলেমান সোফায় বসে পকেট থেকে ফোনটা বের করে চাচাকে ফোন করলো।

বাশার সুলতান বসার ঘরে বসে আছেন। চোখ মুখে রাগের ছাপ। কত শখ ছিলো ছেলের বিয়ে সে ধুমধাম করে দিবে। কিন্তু এই ছেলে কি করলো! তুলে নিয়ে বিয়ে করলো। সেই মেয়ে নিয়ে এখন সকাল বিকেল রাত দুপুর মারামারি ঝগড়াঝাঁটি কিলাকিলি লাগে। সেদিন বাসায় ফিরেই মাহিকে দেখে প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলো বাশার সুলতান৷ ছেলে বিয়ে করে ফেললো পারিবারের কেউ জানলো না। তার বাপ ভাই জানলে তো বাশার সুলতান কে কথা শোনাতে শোনাতে শেষই করে দিবে। আর সোলেমান সে তো রেগে না জানি এজওয়ান কে চ’ড় ই বসিয়ে দেয়।
এই তো গতকাল রাতের কথা বাশার সুলতান বাসায় ফিরে দেখে মাহি আর এজওয়ান রীতিমত চুলোচুলি করছে। কি নিয়ে করছে কেউ বলে নি। মাহি মেয়েটাকে একদম পছন্দ না বাশার সুলতানের৷ কেমন জানি মাফিয়া মাফিয়া লাগে। আকস্মিক পকেটে থাকা ফোন বেজে উঠায় বাশার সুলতান ফোনের স্কিনে তাকিয়ে দেখলো সোলেমান ফোন করেছে। ফোনটা রিসিভ করে কানে নিতেই ওপাশ থেকে সোলেমান বলল-

-” উঠেছো ঘুম থেকে?
-” হুমম।
-” এজওয়ান?
-” উঠে নি।
-” ডেকে উঠাও। গোসল করে নামাজে যাও৷ আর হ্যাঁ কোরবানির সব কাজ সম্পূর্ণ হলে সোজা মহাদেবপুর চলে আসবে।
-” ঠিক আছে৷ আব্বা আর ভাইজান কি করছে?
-” রুম থেকে বের হলে তারপর বলতে পারবো। এখন গোসলে যাব। চলে আসবে দ্রুত।
ফোন কেটে দিয়ে সোলেমান পেছন ফিরতেই মেহরিন বেরিয়ে আসে ওয়াশরুম থেকে। সোলেমান একবার তাকায় মেহরিনের দিকে। সাদা পড়লে মেহরিন কে শুভ্র পরীর মতন স্নিগ্ধ লাগে।
-” তুমি অপেক্ষা করো। আমি আসছি।
সোলেমান গোসলে ঢুকে গেলো। মিনিট দশেক পর বের হয়ে আসলো। মেহরিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল শুকাচ্ছিলো। সোলেমান কে দেখতে পেলো আয়নায়। সোলেমান মাথা মুছতে মুছতে মেহরিনের দিকে এগিয়ে আসলো। মেহরিন আয়নায় তাকিয়ে দেখলো সোলেমান তার দিকেই এগিয়ে আসছে। সোলেমান ভেজা টাওয়াল টা বিছানায় ফেলে দিয়ে মেহরিনের পেছনে দাঁড়ালো। ড্রেসিং টেবিলের সামনে থাকা টুপি টা নিয়ে সোলেমান মাথায় পড়ে নিলো।

-” নাও পারফেক্ট লাগছে না?
মেহরিন বুঝলো না।
-” কি?
-” আমাদের?
মেহরিন মুচকি হাসলো।
-” জায়নামাজ টা এনে দাও।
মেহরিন আলমারি থেকে জায়নামাজ টা এনে সোলেমানের হাতে দিলো। সোলেমান জায়নামাজ টা বগলের সাথে চেপে ধরে মেহরিন কে নিজের দিকে ফিরিয়ে দু হাত গালে রেখে গাঢ় এক চুম্বন একে দিলো মেহরিনের কপালে। ঠোঁট কপাল থেকে এবার কানের কাছে এনে ফিসফিস করে বলল-
-” এই প্রথম ঈদ তোমার আমার একসাথে। ঈদ মোবারক মিসেস সুলতান।
মেহরিন সোলেমানের হাতের পাঞ্জাবি ধরলো। চোখ বন্ধ করে বলল-
-” আপনাকেও ঈদের শুভেচ্ছা এমপি সাহেব।
বউয়ের মুখে আচমকা এমপি সাহেব শুনে একটু হকচকিয়ে গেলো সোলেমান। ডাকটা নট ব্যাড।
মেহরিন কে নিয়ে নিচে আসলো। আনোয়ার সুলতান, আমিরুল সুলতান অলরেডি গোসল সেরে নামাজের জন্য রেডি হয়েছে৷ এখন হাল্কা পাতলা সেমাই খেয়েই যাবে নামাজে। আফিয়া সুলতান সেমাই বেড়ে দিলো। ইব্রাহিম মাথায় টুপি পড়তে পড়তে এগিয়ে আসলো। সোলেমানের পাশের চেয়ারে বসে সবাই কে দেখলো কিন্তু রুমাইসা কে দেখতে না পেয়ে বলল-

-” রুমাইসা উঠে নি?
আফিয়া সুলতান সেমাইয়ের প্লেট এগিয়ে দিয়ে বলল-
-” সবার আগে উঠে গোসল করে সাজতে বসেছে।
-” সাজতে বসেছে মানে! গরুর ভুঁড়ি পরিষ্কার করবে কে তাহলে?
রুমাইসা সনেই নতুন ড্রেস টা পড়ে হাত দিয়ে জামা উঁচু করতে করতে রাজকন্যার মতন নিচে নামছিলো। ইব্রাহিমের এমন কথা শুনে রেগে গেলো। এগিয়ে এসে চেয়ার টেনে বলল-
-” গরুর ভুঁড়ি পরিষ্কার করবো আমি! মাথা ঠিক আছে তোমার ভাইয়া? আমি সুলতান বাড়ির একমাত্র মেয়ে৷ এসব আমার দ্বারা হবে না।

-” বিয়ের পর কি করবি? তখন তো আর এসব বললে চলবে না।
-” এমন ফ্যামিলিতেই বিয়ে করবো। যেখানে এসব করা লাগবে না।
আফিয়া সুলতান থামিয়ে দিয়ে বলল- ” হয়েছে থাম তোরা। মেহরিন তুমিও বসে পড়ো।
মেহরিন চেয়ার টেনে উল্টো শাশুড়ি কে বসিয়ে দিয়ে বলল-
-” আপনি ও বসুন মা। এক সাথেই খাওয়া যাক।
আনোয়ার সুলতান সেমাই মুখে নিয়ে বলল-
-” বাশার আর এজওয়ান কি আসবে না?
-” আসবে বলেছে।
-” ঈদের একটা দিন৷ অথচ ছেলে আর নাতি টা এভাবে দূরে৷ ভালো লাগে কি এটা?
-” মন খারাপ করলেই তো আর ছেলে নাতি চলে আসবে না। আমার হয়ে গেছে খাওয়া। তোমাদের হলে চলো নামাজে যাওয়া যাক।

বাড়ির পুরুষ রা চলে গেলো নামাজে। বাড়ির কাজের লোক হাসান ভাই বাগানে শাহজাদা কে গোসল করিয়ে পেট ভরে খেতে দিলো। মেহরিন সদর দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলো। গরু টার দিকে এগিয়ে গেলো। গরুটা খাচ্ছে না কিছুই। হয়তো বুঝে গেছে আজ তার সাথে কিছু হতে চলছে। চোখটা থেকেও কেমন পানি পড়ছে।
মেহরিনের খারাপ লাগে। শাহজাদার শরীরে হাত বুলিয়ে দেয়। ফিসফিস করে বলে— “ তোমাকে অনেক মিস করবো শাহজাদা৷ তোমায় রেখে দেওয়ার উপায় থাকলে রেখে দিতাম।
বাড়ির পেছনের মাঠে পুরো এলাকা জড়ো হয়েছে। তাকবিরে ধ্বনিত পরিবেশ যেন এক পবিত্র কম্পনে ভরে উঠলো। নামাজ শেষে কোলাকুলি, সালাম আর ঈদের শুভেচ্ছায় মুখর হলো পরিবেশ।
নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে সোলেমান সরাসরি গরুর কাছে চলে যায়। সাথে হুজুর ও এসেছে।
মেহরিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখে। সোলেমানের সাথে আরো কিছু লোকজন এসেছে। তারা গরুটাকে ধরে বেঁ’ধে শোয়াচ্ছে। হুজুর দোয়া পড়ে গরু জ’বাই দেয় সাথে সাথে ফিনকি তুলে গড়গড় করে র’ক্তপাত হতে শুরু করে।
মেহরিন চোখ বুজে ফেলে।

সোলেমান ছেলেগুলো কে বলে দিচ্ছে মাংস গুলো সাইজ করে কেটে তারপর এলাকায় বিলানোর জন্য। কম করে হলেও ৫-৬ মণ হবে।
সুলতানদের বাড়িতে নিয়ম৷ কোরবানির গরুর মাংস ৮-১০ কেজির মতন নিজেদের জন্য রেখে বাদবাকি গুলো,আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশী ও গরীব দের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া হয়।
বাসার বড় কাজের লোক হাসান ভাই। তিনি মাংস কা’টা শেষে সুলতান বাড়ি ও মেহরিন দের বাড়ির জন্য রেখে বাদবাকি গুলের এক অংশ নিয়ে গেলেন পাড়ায়। বাকি অংশ বিকেলের দিকে বাড়ির সামনে আসা গরীব দুস্থ দের দিয়ে দেওয়া হবে আগের নিয়মেই।
সুলতান বাড়ির জন্য রাখা মাংস টা আফিয়া সুলতান রান্নায় বসিয়ে দিয়েছে। বাকি আছে এক মণ। তার ভেতরে এই এক মণ কে ৩ ভাগে ভাগ করা হয়। এক ভাগ মেহরিন দের৷ আরেক ভাগ সেরিন দের। আর শেষ ভাগ মেহরিনের বান্ধবী ঊর্মি দের।
ইব্রাহিম লাস্টের ভাগ টা ঊর্মিদের জন্যই রেখেছে। বিকেলের দিকে চলে যাবে মাংস নিয়ে।
মাংসের সব কাজ সারতে সারতে দুপুর হয়ে যায়।
দুপুরে ফের গোসল নিয়ে খাওয়া দাওয়া সেরে রুমে আসে সোলেমান। মেহরিন এঁটো থালাবাসন ধুয়ে রুমে এসে দেখে সোলেমান খাটের এক পাশে বসে ফোন স্ক্রোল করছে। মেহরিন কে দেখেই সোলেমান ফোনটা পকেটে ঢুকালো।
মেহরিন সোলেমানের পাশে বসতেই সোলেমান বলল-

-” একটু জিরিয়ে নিয়ে রেডি হয়ে নাও। ও বাড়ি যাব।
মেহরিন মাথা নাড়ালো।
এজওয়ান দুপুর থেকে বাপের সাথে ছিলো। বাহাদুর গরুর মাংস প্যাকেট করে গরীব দের মাঝে বিলিয়েছে। এজওয়ান সেসবই দেখছিলো। সকাল থেকে না খাওয়া এজওয়ান। বাড়ির ম্যেড গুলোও নেই। গতকাল রাতেই চলে গেছে। সোলেমান ছুটি দিয়ে দিয়েছে। এখন বাজে দুপুর দুটো। ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়িতে ফিরে। সোফায় বসে কয়েক বার মাহিকে ডাকে। কিন্তু মাহির সাড়াশব্দ নেই। এজওয়ান সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে রুমে এসে দেখে মাহি ফোনে কারো সাথে কথা বলছে। পাশেই টেবিলে পড়ে আছে পিৎজার খালি বক্স। কতটা হা’রামির হা’রামি জামাই শ্বশুর না খাওয়া আর এই হা’রামির পেট ভরা।
মাহি বোনের সাথে কথা বলছিলো। এজওয়ান কে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো-

-” আপনি এই রুমে যে?
এজওয়ান সোফায় বসে বলল-
-” আমার বাড়ি,আমার রুম আমি আসবো না তো কে আসবে?
মাহি বোন কে পরে ফোন দিবে বলে ফোনটা কেটে দেয়।
-” কি চাই?
-” যা চাই দিবে?
কথাটা বলেই মাহির দিকে বাঁকা চোখে তাকালো এজওয়ান।
-” আপনাকে নিষেধ করেছি না এ রুমে আসতে?
-” আর আমি বাধ্য ছেলের মতন শুনে নিলাম বুঝি?
-” কি বলবেন বলুন।
-” জামাকাপড় গুছাও।
-” দু দিনেই বুঝি অতিষ্ট হয়ে গেছেন? সামলাতে পারছেন না আমায়? তাই…
-” ছেড়ে দিচ্ছি না সুইটহার্ট। শ্বশুর বাড়ি থেকে ডাক এসেছে। শ্বশুর বাড়ি যাবে। চাচি শাশুড়ির থেকে রান্নাবান্না শিখে আসবে। বাপের ঘরে তো কিছু শেখায় নি। শেখালে তো আজ খাবার টেবিলে খাবার সাজানো থাকতো।
মাহি ভ্রু কুঁচকালো।

-” মহাদেবপুর?
-” জ্বি ম্যাডাম।
মহাদেবপুর তো মাহি কে যেতেই হবে।
-” ঠিক আছে৷ বের হন এখন।
-” এত বের হন বের হন করছো কেনো? যাও রেডি হও।
-” আগে বের হন। আপনি বের না হলে আমি রেডি হবো কি করে?
-” কেনো আর বউরা যেভাবে জামাইয়ের সামনে হয় সেভাবে।
-” আপনাকে জামাই কে মানে? আপনি পরপুরুষ আমার কাছে।
-” তরিকুলের বেটি আমি পরপুরুষ হইলে তুই আমার বাড়ি কি করিস? জামাই হই আমি তোর। মুখস্থ কর এ কথাটা।
-” এই শব্দ টা জীবনেও মুখস্থ হবে না। বাপ বেটা দুটোকেই দেখে নিব।
-” অশ্লীল বেডি,শ্বশুরের কি দেখতে চাস? জামাইয়ের টা দেখ।
-” গেট আউট।

এজওয়ান মুখ বাঁকিয়ে রুম থেকে বের হয়ে অনলাইনে খাবার অর্ডার দিলো। এ বউ কোনো কামের বউ না। গাধা দিয়ে কি কখনও হাল চাষ করা যায়? না যায় না।
পুরো তিনটা দিন পর বিধ্বস্ত হয়ে বাসায় ফিরলো সাফওয়ান। শামসুল মির্জার ছেলের এমন বিধ্বস্ত রূপ দেখে বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। ছেলের হাতে ম’দের বোতল। তার ছেলে তো এসব খায় না। তাহলে আজ তাও আবার ঈদের এমন একটা দিনে এই অবস্থা কেনো? আর তিন টা দিন সে কোথায় ছিলো?
শামসুল মির্জা এগিয়ে আসলো। সাফওয়ান এলোমেলো পায়ে হাঁটতে গিয়ে পড়ে যেতে নিলে শামসুল মির্জা ধরে ফেলে ছেলেকে। অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করে –

-” কি হয়েছে তোর সাফওয়ান? এই অবস্থা কেনো তোর বাবা?
সাফওয়ান বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বাচ্চাদের মতন কেঁদে বলে উঠলো-
-” বাবা মাহি কে আমি চিরতরে হারিয়ে ফেললাম বাবা৷ মাহি আমাকে ঠকালো বাবা।
” মাহি কি করেছে?
-” মাহি বিয়ে করে ফেলছে।
ঈদের দিনটাও ইমনের ঘর বন্দী হয়ে কাটছে৷ সকালে জুম্মার নামাজ টাও সে পড়ে নি। ইতি বেগম আর পারছেন না ছেলের এই অবস্থা দেখতে। আকস্মিক বাড়ির দরজা দিয়ে কাউকে আসতে দেখে ঘাড় উঁচু করে দেখলো মেহরিনের শ্বশুর বাড়ির লোক এসেছে।
ইব্রাহিম আশেপাশে তাকালো। ঊর্মি কে দেখা গেলো না। ইব্রাহিম মাংসের ব্যাগ টা ইতি বেগমের হাতে দিয়ে বলল-

-” আপনাদের জন্য।
ইতি বেগম দেখলো বেশ অনেকটা মাংশ। বসতে বলল। কিন্তু ইব্রাহিম বসলো না। চলে আসলো। পথিমধ্যে দেখা হলো ঊর্মির সাথে। ঊর্মি হঠাৎ ইব্রাহিম কে দেখে ভরকে গেলো। ইব্রাহিম সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
-” ভালো আছেন বেয়াইন?
আচমকা বেয়াইন ডাকায় ঊর্মি ভ্রু কুঁচকালো। উনি এখানে কেনো?
-” জ্বি ভালো আছি। আপনি?
-” এই তো ভালো হয়ে গেলাম৷ আপনার বান্ধবী এসেছে তো। দেখা করতে এলেন না যে।
ঊর্মি চমকালো।
-” মেহরিন এসেছে?
-” হুমম।
ঊর্মি উল্টো ঘুরে হাঁটা ধরলো৷ পেছন থেকে ইব্রাহিম ও আসতে লাগলো।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। বসার ঘরে বসে গল্পগুজব করছে মেহরিন আর ঊর্মি। সেরিন রা কাল আসবে।
সোলেমান ইব্রাহিম আর মোতালেব ভুঁইয়া উঠানের মাচায় বসে কথাবার্তা বলছে। ঊর্মি হাত ঘড়িতে দেখলো সময়৷ বাসায় ফিরতে হবে। ঊর্মির বলাই হয় নি ইমন যে এসেছে৷ মনে হতেই মেহরিন কে বলল-

-” মেহরিন ইমন ভাই এসেছে।
মেহরিন ইমন এসেছে শুনে খুশি হলো।
-” ইমন ভাইয়া ভালো আছে?
-” কি জানি হয়েছে। ভাইয়া আসার পর থেকেই রুম থেকে বের হচ্ছে না।
-” কি হলো আবার?
-” জানি না। কাল আসিস বাসায় ভাইয়াকে নিয়ে।
-” আচ্ছা।
-” ঠিক আছে। আসি তাহলে।
ঊর্মিকে চলে যেতে দেখে ইব্রাহিম এগিয়ে আসলো। বলল-
-” চলে যাচ্ছ?
-” জ্বি।
-” অন্ধকার তো একা যেতে পারবে?
-” অভ্যাস আছে।
-” তারপরও একা যাওয়া ঠিক হবে না। কোনো সমস্যা না থাকলে এগিয়ে দিয়ে আসি।
ঊর্মি হাঁটা ধরলো। ইব্রাহিম ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে ঊর্মি কে বাড়ি অব্দি পৌঁছে দিলো।
ইতি বেগম মেহরিনের শ্বশুর বাড়ি থেকে দেওয়া মাংস থেকে কিছুটা মাংস রেঁধেছে। এখন ভাত বেড়ে ছেলেকে ডেকে নিয়ে এসেছে। ইমন খেতে বসলো। ঊর্মি ভেতরে ঢুকতেই ইতি বেগম জিজ্ঞেস করলো-

-” কই গিয়েছিলি?
ঊর্মি হাসিমুখে বলল-
-” মেহরিন এসেছে মা। মেহরিন কে দেখতে গিয়েছিলাম।
ইমনের ভাতের উপর থাকা হাত থেমে গেলো। উর্মি টেবিলে গরুর গোশ দেখে এগিয়ে এসে এক পিস মুখে তুলে নিয়ে বলল-
-” গরুর মাংস! কে দিলো?
কথাটা উঠায় কথার ছলে ইতি বেগম ইমনের সামনেই বলে বসলো-
-” মেহরিনের শ্বশুর বাড়ি থেকে।
ব্যাস কথাটা কানে আসতেই ইমন বসা থেকে উঠে চলে গেলো।
আকস্মিক ভাইয়ের এভাবে চলে যাওয়ার মানে বুঝলো না। ইতি বেগম ঊর্মিকে বকতে লাগলেন। না এই মেয়ে মাংসের কথা তুলতো আর না সে কথার ছলে বলে ফেলতো। সারাদিন বাদে বুঝিয়ে সুজিয়ে ছেলেকে খেতে নিয়ে এসেছিলো। সেই ছেলে না খেয়েই উঠে চলে গেলো।

রাত ১২ টার দিকে সুলতান ভিলায় কলিং বেল বেজে উঠলো। সবাই ঘুমে বিভোর। রুমাইসা জেগে ছিলো। কলিং বেলের শব্দ শুনে দরজা খুলতেই ভাই আর চাচাকে দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলো। অনেক বছর পর এজওয়ান এসেছে সুলতান ভিলায়। রুমাইসা চিৎকার করে মা আর বাপ দাদা কে ডাকতে গিয়েও থেমে যায়। আচমকা চোখ যায় এজওয়ানের পাশে থাকা এক মেয়ের দিকে। ভাই, চাচার সাথে এই মেয়ে কে? রুমাইসা কুঁচকে যাওয়া কপাল নিয়ে জিজ্ঞেস করে –

দাহশয্যা পর্ব ২৮

-” উনি কে ভাইয়া?
এজওয়ান ঘাড় বেঁকিয়ে মাহির দিকে তাকিয়ে বলে-
-” তোর ভাবি।
কথাটা কানে আসতেই রুমাইসা চমকে উঠলো। ভাবি! তার এজওয়ান ভাই বিয়ে করেছে!

দাহশয্যা পর্ব ৩০