লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৬৩
Fatima Fariyal
হাসপাতালের করিডোর জুড়ে পিনপতন নীরবতা। Emergency C-section লেখা লাল বাতিটা এখনো জ্বলছে। সামনেই সবাই শ্বাস রুদ্ধ করে বসে আছে। ভিতরে রিদিতাকে নিয়ে গেছে এক ঘণ্টারও বেশি সময় হয়ে গেছে। প্রতিটা সেকেন্ড যেন ঘণ্টার সমান ভারী। ঘড়ির প্রতিটা কাঁটা এক এক করে সবাই গুনছে। কিন্তু এখনো কোনো সুখবর আসেনি। আহাদ অস্থিরতায় একবার অপারেশন থিয়েটারের দরজায় গিয়ে কপাল ঠেকাচ্ছে, তো আবার নিচে বসে পড়ছে; আবার কখনো দুই হাতে চুল টেনে ধরে শূন্যে তাকিয়ে থাকছে। এই অপেক্ষা তাকে ভিতর থেকে ছিঁড়ে ফেলছে। আফরোজা শেখ ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন অসহায়ের মতো। বুকের ভেতর অসহায়ত্ব আর ভয় একসাথে পাক খাচ্ছে। মনে মনে ভাবছেন, আল্লাহ না করুক যদি কোনো দুঃসংবাদ আসে… তাহলে এই ছেলেটাকে তিনি কীভাবে সামলাবেন?
তারেক রায়ান নিথর হয়ে বসে আছেন। চোখে এক ধরনের শূন্যতা। যেন সব অনুভূতি নিঃশেষ হয়ে গেছে। এমন একটা দিন তাকে দেখতে হবে তিনি কখনো কল্পনাও করেননি।
ঈশানী পাশে বসে বাবার দুই হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। যেন বাবাকে ভরসা দিতে চায়; অথচ সে নিজেই ভিতরে ভিতরে ভেঙে পড়েছে। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুর কনা সে কোনোমতে আটকে রেখেছে। আমজাদ মীর অস্থিরভাবে করিডোর জুড়ে পায়চারি করছেন। চোখ বারবার ওটির দরজার দিকে চলে যাচ্ছে। ঠিক তখনই ভিতর থেকে আদনান বেরিয়ে এল। তাকে দেখেই সবাই মৌমাছির মতো ঘিরে ধরল। আহাদ কাতর চোখে শুধু তাকিয়ে আছে, কথা বলার শক্তিটুকুও যেন নেই। আমজাদ মীর ভারী কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়লেন,
“আদনান, কিছু বলছো না কেন? কী হয়েছে? অপারেশন কত দূর?”
আদনান একবার আড়চোখে তাকাল আহাদের দিকে। গলা দিয়ে শব্দ বের হতে চাচ্ছে না। তবু ভাঙা কণ্ঠে বলল,
“এখনো চলছে। ড. জোবাইদার সাথে কথা হয়েছে। উনি বলেছেন, এখন শুধু আল্লাহ ভরসা। এর বেশি কিছু বলতে পারছেন না।”
আফরোজা শেখ দাঁড়িয়ে পড়লেন। কণ্ঠে তীব্র উদ্বেগ,
“কী বলছো তুমি? প্রায় এক ঘণ্টা হয়ে গেছে রিদিতাকে নিয়েছে! আর এখনো কিছু বলতে পারছে না?”
আদনান গভীর নিশ্বাস নিয়ে বলল,
“ছোট আম্মু, রিদিতার টুইন প্রেগন্যান্সি। তার ওপর প্রচণ্ড র’ক্ত’ক্ষ’রণ হয়েছে। সব মিলিয়ে কেসটা খুব জটিল। আমি তো বিষয়টা বুঝি। ওরা অকারণে সময় নিচ্ছে না।”
এই কথা শুনে আফরোজা শেখ হতোদ্যম হয়ে আবার বসে পড়লেন। তারেক রায়ানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। চোখ ছলছল করে উঠল। ঈশানীর চোখ থেকেও অশ্রু ঝরে পড়তে চাইছে। সুমন তারেক রায়ানের পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে বলল,
“বাবা… রিদির কিছু হবে না। আপনি চিন্তা করবেন না। আল্লাহ ভরসা, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
তারেক রায়ান ফুপিয়ে উঠলেন। মেয়ের এই করুণ পরিণতি দেখা একজন পিতার জন্য কতটা অসহনীয়; তা একজন পিতাই বোঝেন। কিন্তু আজ তার সামনে আরেকজন মানুষও ঠিক তার মতো করেই তার মেয়ের জন্য ছটফট করছে। তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। আহাদ তখন অপারেশন থিয়েটারের দরজায় মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারেক রায়ান ধীরে এগিয়ে গিয়ে আলতো করে তার কাঁধে হাত রাখলেন। আহাদ ঘুরে তাকাল। চোখে অসীম ভাঙন,
“রিদি ঠিক হয়ে যাবে তো, আব্বু? বলুন না… আপনার মেয়ে ঠিক হয়ে যাবে তো?”
তারেক রায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। আহাদ রাজা তাকে “আব্বু” বলে ডেকেছে, এই ডাকটা তার জন্য অপ্রত্যাশিত, অথচ গভীরভাবে ভেতরটা নাড়া দিল। আহাদ ভাঙা গলায় আবার বলল,
“আপনি ওকে বলুন না… এভাবে আমাকে নিঃস্ব করে যেন না যায়। আপনি তো ওর বাবা। আপনার কথা ও শুনবে। আপনি একবার বলুন না।”
তারেক রায়ান ব্যথাতুর এক ঢোক গিলে নিলেন। তারপর অদ্ভুত কোমল স্বরে বললেন,
“আমার বলা না বলায় কিছু হবে না বাবা। এখানে সব কিছু আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। তার বান্দাকে হেফাজত করার মালিক একমাত্র তিনিই। আপনি তার কাছে চান।”
আহাদ অসহায় স্বরে বলল,
“আমি চাইলে কি তিনি শুনবেন? আমার মতো পাপী বান্দার দোয়া কি তিনি কবুল করবেন?”
তারেক রায়ান হালকা হাসলেন,
“তিনি পরম দয়ালু। মন থেকে চাইলে তিনি কাউকে ফিরিয়ে দেন না।”
এই কথাগুলো আহাদের ভিতরে কোথাও গেঁথে গেল।
কিছুক্ষণ পর সে তারেক রায়ানের সাথে হাসপাতালের কেন্দ্রীয় মসজিদের দিকে এগিয়ে গেল। শীতল পানিতে অযু করে দুজনেই একসাথে এশার নামাজ আদায় করল।
নামাজ শেষে তারেক রায়ান দীর্ঘ মোনাজাতে ডুবে গেলেন। কাঁপা কণ্ঠে মেয়ের জন্য দোয়া করলেন, সব যেন আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে ফিরে আসে। আহাদও তার পাশে বসে তাকে অুনুকরন করে মোনাজাতে হাত তুলল। বুকের অদৃশ্য বোঝা যেন কিছুটা হলেও হালকা হয়েছে। এক অদ্ভুত প্রশান্তি তার অন্তর ছুঁয়ে গেল। মোনাজাত শেষে আহাদ ক্লান্ত শরীরে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে পড়ল মসজিদের খসেখসে কার্পেটে। তারেক রায়ান তার মাথাটা টেনে নিজের উরুর ওপর রাখলেন। আলতো করে মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন, যেমন করে একজন বাবা তার সন্তানকে শান্ত করে। আহাদ একদম শিশুর মতো চুপচাপ সেই স্পর্শ অনুভব করতে লাগল। ঠিক যেমনভাবে রিদিতা তার চুলে আঙুল চালাত, এই স্পর্শটাও ঠিক তেমন। তার শুকনো মুখে একচিলতে হাসির আভা ফুটে উঠল। যার সাথে সে আজ অব্ধি চোখে চোখ রেখে ঠিকভাবে কথাই বলেনি, আজ তারই কোলে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করে আছে।
নীরবে কেটে গেল কিছু সময়। হঠাৎ আহাদের ফোন বেজে উঠল। সে চমকে উঠে বসল। শাহীন। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ ভেসে এল,
“ভাই! ভাবিকে অবজারভেশন রুমে নিয়ে গেছে। ডাক্তার বলেছে, আল্লাহর রহমতে সবাই ঠিক আছে। মা আর বাচ্চা সবাই সুস্থ। এখন আপনাকে খুঁজছে।”
আহাদ চোখ বন্ধ করে গভীর স্বস্তির নিশ্বাস নিল। তারেক রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি আসছি শাহীন… এখনই আসছি।”
মসজিদ হাসপাতাল চত্বরেই ছিল। তাই পৌঁছাতে সময় লাগল না। একজন নার্স এগিয়ে এসে বলল,
“পেশেন্ট রিদিতার হাজবেন্ড কে আছেন? আপনাকে ভিতরে ডাকছে।”
আহাদ তার মায়ের দিকে তাকাল।।আফরোজা শেখ চোখের ইশারায় সাহস দিলেন। আকাশি এপ্রোন, টুপি আর মাস্ক পরে আহাদ কাচের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল বুকভরা ভয়, আশা আর অজানা এক অনুভূতি নিয়ে। সামনের বেডে রিদিতা শুয়ে আছে আধা অচেতন অবস্থায়। সাদা চাদরে ঢাকা তার শরীরটা এখন খুবই নিস্তেজ দেখাচ্ছে। মুখে ক্লান্তির ছাপ, চোখ দুটো অল্প অল্প খুলছে। আহাদ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার মাথার কাছে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। এতক্ষণ যে বুকের ভেতর ঝড় বইছিল, প্রেয়সীকে চোখের সামনে দেখে সেই ঝড়টা আরও তীব্র হয়ে উঠল। রিদিতা তাকে দেখামাত্রই আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ঢুকরে কেঁদে উঠল। আহাদ কাঁপা হাতে তার চোখের কোন মুছিয়ে দিল। বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে আলতো করে গাল ছুঁয়ে দিল, কপালে, গালে, দুই চোখের পাতায় একের পর এক নরম চুমু খেল। তারপর কপালে কপাল ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সেই নীরবতার মধ্যেই রিদিতা টের পেল, আহাদও কাঁদছে। ধীর, ভাঙা কণ্ঠে সে বলল,
“আপনি কাঁদছেন? আমি তো ভেবেছিলাম… আপনি খুশি হয়েছেন।”
আহাদ মাথা তুলে নাক টানল। কণ্ঠটা নামিয়ে বলল,
“আমার প্রাণভোমরা নিয়ে টানাটানি করে বলছো খুশি হতে?”
রিদিতা দুর্বল হাসি হেসে জিজ্ঞেস করল,
“ভয় পেয়েছিলেন?”
আহাদ এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল, “ভীষণ।”
“আমাকে ভালোবাসেন?”
রিদিতার চোখ দুটো ভিজে উঠল। আহাদ মৃদু গলায় বলল,
“উহুম।”
এই উত্তর শুনে রিদিতা অভিমানে ঠোঁট দুটো ফুলিয়ে নিল। ক্লান্ত মুখেও সেই ছোট্ট অভিমানটা স্পষ্ট। আহাদ সেটা দেখে হালকা হাসল। সামান্য ঝুঁকে তার কপালের ছোট চুলের গোছা সরিয়ে দিতে দিতে বলল,
“ভালোই যদি না-ই বাসি, তাহলে ব্যাঙের বাচ্চা দুটো কোথা থেকে আসল, রিদি রানি?”
“খবরদার!” রিদিতা ক্ষীণ শক্তি দিয়ে বলল, “আমার বাচ্চাদের ব্যাঙের বাচ্চা বলবেন না।”
আহাদ চোখ বড় করে বলল,
“যাক বাবা! আপনি নিজেই তো একটা ব্যাঙ। আপনার বাচ্চাদের ব্যাঙের বাচ্চা বলবো না তো কী বলবো?”
রিদিতা ক্ষুব্ধ স্বরে বলল, “ব্যাঙ আপনি! আপনার চোদ্দ গুষ্টি!”
আহাদ ঠোঁট চেপে হাসি চাপা দিয়ে বলল,
“সেই চোদ্দ গুষ্টির মধ্যেই তো আপনার বাচ্চা দুটোও পড়ে।”
রিদিতা রাগী চোখে তাকিয়ে রইল। আহাদ তার নাকে আলতো করে একটা ঠোকা দিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, আর বলব না। হয়েছে?”
রিদিতা ধীরে মাথা নাড়ল। ফের জিজ্ঞেস করল,
“বেবিদের দেখেছেন?”
আহাদ মাথা নাড়ল, “উহুম।”
“কেন?”
কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে, তবুও সে নিজের কথা শেষ করল,
“আমি তো বলেছিলাম, আমি ম’রি কিংবা বাঁচি, সবার আগে আপনি ওদের মুখ দেখবেন। তাহলে কেন দেখলেন না?”
আহাদ চোখ নামিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“কারণ তার আগে তোমাকে দেখা জরুরি ছিল। এখন নিশ্চিন্তে ওদেরও মন ভরে দেখতে পারব।”
সে পাশের একজন নার্সকে ইশারা করল। নার্স এসে একজন একজন করে দুটো বেবিকেই আহাদের কোলে তুলে দিল। আহাদ গভীর দৃষ্টিতে নিজের দুইটা অস্তিত্বের দিকে তাকিয়ে রইল। ছোট্ট ছোট্ট মুখ, মুঠো করা আঙুল, কাঁপা নিঃশ্বাস; সবকিছু যেন অবিশ্বাস্য লাগছে। একে একে দুজনের কপালে চুমু খেল। ছোট আঙুলগুলো ছুঁয়ে দেখল। তারপর কৌতূহল নিয়ে চাদর সরিয়ে দেখতে লাগল। রিদিতা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কী করছেন? এভাবে কী দেখছেন?”
“ছেলে না মেয়ে চেক করছি।”
“আপনি এটাও জানেন না?”
রিদিতা অবাক হয়ে বলল,
“আগেই তো বলা ছিল। একটা ছেলে, একটা মেয়ে!”
“জানি তো! তবুও নিজের চোখে দেখে নিশ্চিত হলাম আর কী!”
“আপনি আসলেই পাগল।”
আহাদ নরম গলায় বলল, “হুম, পাগলই তো। আর সেই পাগলামির কারিগর আপনি নিজেই।”
রিদিতা হালকা হাসল। আহাদ আবার ঝুঁকে তার কপালে নরম চুমু খেল। এবার রিদিতা বেবিদের হাত, আঙুলে একের পর এক চুমু দিতে লাগল। আহাদ অপলক চোখে সেই দৃশ্যটা দেখছিল একজন মা, তার সদ্য জন্ম নেওয়া সন্তান, আর সেই অদ্ভুত শান্তি। ঠিক তখনই একজন নার্স এসে বলল,
“স্যার, আপনার সময় শেষ। এখন আপনাকে বাইরে যেতে হবে। আগামীকাল পেসেন্টকে কেবিনে শিফট করা হবে। এর পরের বার তখনই দেখা হবে।”
আহাদ শেষবার রিদিতার দিকে তাকাল। সদ্যোজাত দুটো শিশুকে কোলে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল তার; ভয়, দায়িত্ব আর সীমাহীন ভালোবাসা একসাথে চেপে বসেছে। বাইরে অপেক্ষারত মানুষগুলোর ভিড় উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল। আহাদ বেবিদের তারেক রায়ানের কোলে তুলে দিল। তারেক রায়ান একে একে দুজনকে কোলে নিয়ে কানের কাছে মধুর স্বরে আজান শোনালেন। এমন সময় আফরোজা শেখ বাচ্চাদের দিকে তাকিয়েই আবেগ চেপে রাখতে না পেরে বলে উঠলেন,
“মাশাআল্লাহ! একদম পুতুলের মতো হয়েছে।”
সাথে সাথেই আমজাদ মীর গর্বভরা কণ্ঠে হেসে উঠলেন। বুকটা যেন আরও চওড়া হয়ে গেল তার।
“দেখতে হবে না, কার নাতি-নাতনী। মীর পরিবারের র’ক্ত বলে কথা।”
সবাই এক জোট হয়ে হেসে উঠল। এমন সময় আহিয়া এসে হাজির। সে বাড়িতেই ছিল। শরীর ভালো না, তাই আদনান বারবার তাকে আসতে বারণ করেছিল। কিন্তু ফুপি হওয়ার আনন্দ তার সমস্ত শারীরিক দুর্বলতাকে হার মানিয়েছে। আবেগ আর ভালোবাসার টানে শেষ পর্যন্ত আদিল সঙ্গে নিয়ে এসেছে। বাচ্চাদের কাছে গিয়ে সে ছোট ছোট আঙুল দুটো ধরে আদর করল। চোখেমুখে কী যে আনন্দ! কণ্ঠটা আপনাতেই শিশুসুলভ হয়ে উঠল।
“আউ! গুলুগুলু বেবিরা… দেখ কে এতেতে! তোমাদের ফুপ্পু এতেতে… এতা তোমাদের ফুপ্পু… ফুপ্পু!”
তার কণ্ঠের উচ্ছ্বাসে মেয়েবাবুটার ঠোঁট কুঁচকে উঠল।আহিয়া একদম ভয় পেয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তাকে আলতো করে ঝুলাতে লাগল।
“ও লে লে… না না, না.. কাঁদেনা… কাঁদেনা। এতা ফুপ্পু… তো, তোমাদের ফুপ্পু!”
আদনান দূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। এত আনন্দের মাঝেও তার ভেতরে এক নিঃশব্দ পোড়া ব্যথা।আহিয়ার চোখের সেই উজ্জ্বলতা, কণ্ঠের সেই মাতৃত্বমাখা মায়া; সবকিছু মিলিয়ে তার নিজের অপূর্ণতাটাকে যেন আরও প্রকট করে তুলছে। কিন্তু কীভাবে বোঝাবে সে? কী বলবে আহিয়াকে? যে নিজেও ভেতরে ভেতরে পুড়ে যাচ্ছে। কিন্তু কিছুই করার নেই। আল্লাহর সাথে পাল্লা দেওয়া যায় না। হয়তো তিনি চাননি তার সন্তান এই পৃথিবীতে আসুক… এই ভাবনাটুকুতেই তার বুকটা আরও ভারী হয়ে উঠল। আর ভাবতে পারল না সে। একটা গভীর, দীর্ঘশ্বাস ফেলে আদনান এগিয়ে এসে আহিয়ার পাশে দাঁড়াল। আলতো করে আঙুলের ডগা দিয়ে দুটো বেবির নাকে ছুঁয়ে দিল। স্পর্শটুকু ছিল নিঃশব্দ, কিন্তু ভরা ভালোবাসায়। এত বছর পর মীর পরিবারে আবার একসাথে পুত্র ও কন্যার আগমন ঘটেছে। চারপাশ জুড়ে শুধু হাসি, দোয়া আর আনন্দের উল্লাস।
ছয় মাস পর…
সকাল থেকেই মীর হাউজে এক অন্যরকম উচ্ছ্বাসের ঢেউ আছড়ে পড়েছে। কারণটা খুব স্পষ্ট, আজই জার্মানি থেকে ফিরেছে সালমান মীর আর শারমিন। যেদিন আকিকা দিয়ে বাচ্চাদের নাম রাখা হয়েছিল, সেদিনই তাদের আসার কথা ছিল। কিন্তু কাজ, সময় আর ব্যস্ততার টানাপোড়েনে তখন আসা হয়ে ওঠেনি। আর আজ সেই অপূর্ণতা পূরণ হয়েছে বলেই সকাল থেকে বাড়িটা যেন উৎসবের রঙে রঙিন। হাসি, গল্প সব মিলিয়ে এক রমরমে পরিবেশ। কিন্তু এই সব কিছুর মধ্যেও আহাদ অনুপস্থিত। সে এখনো ঘুমিয়ে আছে। সারা রাত জুড়েই বাচ্চারা তাকে এক মুহূর্তও শান্তিতে ঘুমোতে দেয়নি। সারা রাত জাগিয়ে রাখে বাচ্চা দুটো। ভোরের দিকে যখন ওরা দুজন একটু চোখ বন্ধ করে, তখনই আহাদও একটু সুযোগ পায় চোখ বুজবার। কিন্তু আজ নিচতলার সেই হইহুল্লোড় তার ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। বিরক্ত হয়ে সে বালিশটা মুখের ওপর চেপে ধরল। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। শেষমেশ গভীর এক বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলে চোখ-মুখ গুছিয়ে উঠে বসল। চোখ এখনো আধ-বোজা, মাথা ঝিমুনিতে ভরা। ঠিক তখনই কানে ভেসে এল একটা পাতলা, আধভাঙা স্বর,
“পা… পাপ্পা… পা পা প্পা… পা পাপ্পা!”
আহাদ বিস্মিত হয়ে হেসে ফেলল। পাশে ঘুরতেই দেখল তার রাজকন্যা ছোট্ট ছোট্ট আঙুলগুলো পুরো মুখের ভেতর পুরে রেখেছে। চোখ দুটো চকচক করছে, মুখে একরাশ আগ্রহ। আহাদ কনুইতে ভর দিয়ে সামান্য ঝুঁকে পড়ল মেয়ের সামনে। তাকে দেখামাত্রই অরিতা উচ্ছ্বাসে হাত-পা ছুড়তে লাগল। কচি গোলাপি ঠোঁট নাড়িয়ে এক নাগাড়ে বলতে লাগল,
“পা পা পা… প্পা… পা… পা…!”
মুখ থেকে থুতু গড়িয়ে পড়ছে। আহাদ বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে আলতো করে মেয়ের মুখ মুছিয়ে দিল। আদুরে গলায় বলল,
“এই তো পাপা… কী হয়েছে পাপা? কী হয়েছে? খিদে পেয়েছে? খুব খিদে পেয়েছে? মাম্মাম খেতে দেয় না? একদম কেয়ার করে না? একটুও না? হ্যাঁ… একদমই কেয়ার করে না… জানি তো! সব জানি! পাপারও কেয়ার করে না। হুম তো একদম কেয়ার করে না।”
তার কথার মানে ছোট্ট অরিতার অবুঝ মন কিছুই বুঝল না। তবুও মেয়েটা যেন তার বাবার সঙ্গে পাল্লা দিয়েই অভিযোগ জানাতে লাগল। আরো জোরে “বু বু” করে শব্দ করতে লাগল। আহাদ চোখ ঘুরিয়ে পাশের দিকে তাকাল। আব্রাহাম, মানে ছেলেটা নির্বিঘ্নে গভীর ঘুমে। নিঃশ্বাসের ছন্দে বুক ওঠানামা করছে। আহাদ মেয়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“হুসস… আস্তে কথা বল মা। তোমার ভাই ঘুমাচ্ছে তো! শুনে ফেললে মাম্মামকে বলে দেবে। তখন পাপাকে আবার কান ধরতে হবে। আস্তে আস্তে বল, পাপা শুনছি তো!”
অরিতা যেন কথাটা বুঝল। একদম চুপ করে গেল। আঙুল মুখে পুরে ফ্যালফ্যাল করে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
আহাদ মেয়ের মুখ থেকে আঙুল সরাতেই সে আবার ঢুকিয়ে দিল। এই ছোট্ট জেদেই আহাদ বুঝে গেল মেয়ের খিদে পেয়েছে। সে আদুরে স্বরে বলল,
“খুব বেশি খিদে পেয়েছে মা? ঠিক আছে, পাপা এখনই মাম্মামকে ডেকে আনছি। কেমন?”
এই বলে সে মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দোতলার করিডোরে এসে; নিচতলার হলঘরের দিকে তাকাল। নিচে সবাই বসে হাসছে, গল্প করছে, আনন্দে মেতে আছে। কিন্তু রিদিতাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। আহাদ বুঝে গেল, সে নিশ্চয়ই রান্নাঘরে। রিদিতা এখন হালিমা বেগম আর বানির সাথে প্রায়ই রান্নাঘরে থাকে। ছোটখাটো কাজে সাহায্য করার চেষ্টা করে। আজও তার বিপরীত হয়নি। হালিমা বেগম বারবার নিষেধ করলেও সে শোনেনি। আহাদ মেয়েকে এক হাতে সামলে গলা চওড়া করে ডাকল,
“রিদি… রিদি, উপরে আসো।”
রিদিতা তখন পরোটা বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ময়দা হাতে লেগে আছে। ডাক শুনে সে একটু থমকে গেল। এখন কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। এর মধ্যেই আবার আহাদের রুক্ষ কণ্ঠ ভেসে এল,
“রিদি, উপরে আসো। আমি দ্বিতীয়বার বলবো না।”
রিদিতার মুখে একটা অসহায় হাসি ফুটে উঠল। আহিয়া দ্রুত এসে বলল,
“ভাইয়া তোকে ডাকছে। অরিতার খিদে পেয়েছে মনে হয়। তুই যা, আমি দেখছি।”
রিদিতা আর কিছু না বলে হাত ধুয়ে দ্রুত উপরে চলে গেল।
আহিয়া কিছুক্ষণ রান্নাঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল।
কোথা থেকে শুরু করবে বুঝতে পারল না। এসব কাজ সে কোনোদিনই ঠিকভাবে করেনি। রান্নাঘর মানেই তার জন্য আতঙ্ক। এক হাতে কপালের চুলগুলো পেছনে সরিয়ে ক্লিপ দিয়ে আটকে নিল। তারপর সাহস সঞ্চয় করে হাত বাড়াল ময়দার দিকে। এক জগ ভর্তি পানি তুলে ময়দার পাত্রের মধ্যে ঢেলে দুই হাত দিয়ে গুলতে লাগল। ময়দা কাদা কাদা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু সে বুঝল না। ঠিক তখনই রান্নাঘরে ঢুকলেন হালিমা বেগম। চোখে পড়তেই যেন বজ্রাঘাত হলো তার মাথায়। তিনি কপালে চাপড় দিয়ে হায়হুতাশ করে উঠলেন,
“হায় আল্লাহ! আহিয়া তুই এটা কী করলি? তোকে কে বলছে রান্নাঘরে আসতে? বানি আপা, তুমি দেখনি? ও এটা কী করল!”
আহিয়া হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। সে তো কিছু ভুল করেছে বলে তার মনে হচ্ছে না। সে অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কেন? পরোটা বানাবা না? আমি তো আটা গুলে দিচ্ছি।”
হালিমা বেগম যেন মাথায় হাত দিয়ে বসলেন।
“মা, মাফ চাই। তোর কিছু করতে হবে না। তুই আদনানের চা নিয়ে যা। রান্নাঘরে এলেই একটা না একটা ঝামেলা করিস। ঠিকমতো তো চাও বানাতে পারিস না!”
তিনি কথা থামালেন না। বরং পুরোনো কথা তুলে ক্ষোভের সাথে বললেন,
“সেদিন কী করলি? চায়ের রং আনার জন্য মরিচ ঢেলে দিয়েছিস। পাগলেও তো বোঝে চা পাতি দিয়ে চা বানায়। আর তুই কিনা! তুই যা মা! তোর এই পরোটা মরোটা বানাতে হবে না। তুই আদনানের চা নিয়ে দিয়ে আয়।”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিতু হেসে ফেলল। আহিয়া সঙ্গে সঙ্গে চোখ রাঙাল। একটু ধমকে উঠল,
“চুপ থাক! একদম হাসবি না। সব তোর জন্য হইছে। তুই বললি না কেন এত পানি দেওয়া যাবে না?”
রিতুর হাসি এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। নিজে দোষ করে এখন তার ঘাড়ে চাপাচ্ছে। এই বুদ্ধিটা আহিয়ার ভালোই জানা। হালিমা বেগম আর কথা বাড়ালেন না। হাতের ইশারায় তাড়া দিলেন। আহিয়া আর কিছু না বলে হাত ধুয়ে চায়ের কাপ নিয়ে ধীর পায়ে উপরে উঠতে লাগল। আজ আদনান ছুটি নিয়েছে। এতক্ষণ সে নিচেই ছিল সবার সঙ্গে। এখন উপরে এসেছে নিজের ঘরে। দরজার সামনে এসে আহিয়া থমকে দাঁড়াল। হঠাৎ করেই বুকের ভেতর একটা দোটানা জমে উঠল। সে তো রাগ করে নিজের ঘরে চলে গেছে। আজ দুই দিন হলো, এই রুমের আশেপাশেও আসেনি। এখন কী করবে? ভিতরে যাবে? নাকি চা রেখে আবার ফিরে যাবে? মনের ভেতর নিজেকেই নিজে বোঝাতে লাগল। এমন সময় ভেতর থেকে পুরুষালি একটা কণ্ঠ ভেসে এল,
“না না, নিচে বড় আব্বু, বড় আম্মু আছে। এখন নিচে গেলেই সবাই সন্দেহ করবে। আমি তো আর থাকতে যাচ্ছি না উনার সাথে। আমি শুধু চা দিয়েই চলে যাবো। ব্যাস!”
আহিয়া চমকে উঠল। চোখ বড় বড় হয়ে গেল। সে তো এসব মনে মনে ভেবেছে! উনি কী করে জানলেন? ভেতরে দাঁড়িয়ে আদনান ঠোঁট চেপে নিজের হাসি সংযত করল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার প্রতিটা দোটানা সে ঠিকই ধরে ফেলেছে। আহিয়া কান পেতে ভেতরের শব্দ শোনার চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই দরজাটা হঠাৎ সামনে থেকে খুলে গেল। আদনান দাঁড়িয়ে আছে
বুকের ওপর হাত জড়ো করে, ভ্রু একটু উঁচু করে। আহিয়া যেন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে, এমন কাচুমাচু হয়ে গেল। জিভ জড়িয়ে বলল,
“ওও… চা… চি… আম্মু আপনার চা পাঠিয়েছে। নয়তো আমি আসতামই না।”
“চাচি আম্মা বলছে?” আদনানের কণ্ঠে হালকা কৌতুক।
“হুম।”
আদনান ঠোঁট কামড়ে হালকা হাসল। তারপর ভেতরে গিয়ে সোফায় বসে পায়ের ওপর পা তুলে দু’আঙুল দিয়ে ইশারা করল। আহিয়া ছোট ছোট পা ফেলে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আদনান কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল, একদম নীরবে। তারপর টেবিলের দিকে ইশারা করে বলল,
“রাখ টেবিলে।”
আহিয়া কাপটা টেবিলে রেখেই তড়িঘড়ি করে বলল,
“আমি আসছি।”
দরজার দিকে দ্রুত পা বাড়াল।।ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এল,
“আহি!”
পা থেমে গেল আহিয়ার। দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে রইল সে।
ভিতরের অস্থিরতাটা আচমকা যেন দ্বিগুণ হয়ে উঠল। বুকের ভেতরটা কেমন ছটফট করছে। এই অনুভূতিটা তার খুব চেনা। আদনানের এই স্বর… এই ডাক… এর সঙ্গে সে বহুদিনের পরিচিত। কতবার এই কণ্ঠ তাকে নিজের কাছে টেনেছে তার হিসেব নেই। তবুও এই দুই দিন সে নিজেকে ভীষণভাবে সংযত রেখেছে। কারণটা খুব সাধারণ, আবার খুব গভীরও। সেদিন আদনানকে দেখেছিল একটা মেয়ের সঙ্গে। সহকর্মী হবে হয়তো! কিন্তু তার সাথে এত কথা কিসের? ব্যাস! সেখান থেকেই অভিমানের বীজটা আহিয়ার মাথার ভেতরে গজিয়ে উঠেছে। আদনান আর কতবার বোঝাবে? তার জীবনে আহিয়া ছাড়া আর কেউ নেই। এই কথাটা তো সে হাজারবারই বলেছে।
আহিয়া ধীরে ফিরে তাকাল। কণ্ঠটা ইচ্ছে করেই স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল,
“কিছু বলবেন, আদনান ভাই?”
আদনানের মুখটা মুহূর্তে বিবর্ণ হয়ে গেল। চোখে জমে উঠল চাপা রাগ, চাপা অসহায়তা। তবুও সে নিজেকে সামলে নিল। ঠোঁটের কোণে জোর করে একটা হাসি টেনে এনে বলল,
“একটা জিনিস দিতে ভুলে গেছিস।”
আহিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “কী?”
“এদিকে আয়। বলছি।”
এই ডাকটা সন্দেহ জাগাল তার মনে। তবুও কৌতূহলটা তাকে এগোতে বাধ্য করল। সে মাত্র দুই কদম এগিয়েছে, এর মধ্যেই আদনান হঠাৎ টেনে নিজের কোলে বসিয়ে নিল। কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“আদর। আদর দিতে ভুলে গেছিস।”
একটু থেমে আবার বলল,
“ইদানীং তোর আদরের অভাবে ভুগছি আমি, আহি। ভিতরটা মরুভূমির তৃষ্ণার্ত যাযাবরের মতো শুকিয়ে গেছে। কেন এমন করে জালাতন করিস আমাকে?”
আহিয়া নিজের ভেতরের দুর্বলতাটা লুকাতে চেষ্টা করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইল,
“ছাড়ুন আমাকে। আমি আপনার সাথে থাকবো না। আমি এই ঘরে থাকবো না।”
আদনান একদম শান্ত স্বরে বলল,
“ঠিক আছে। সমস্যা নেই। আজ থেকে আমরা তোর ঘরেই থাকবো, কেমন?”
“না। মোটেও না।”
আহিয়ার কণ্ঠে জেদ, “আমার ঘরে আপনার জায়গা নেই।”
আদনান তাকিয়ে রইল। প্রশ্ন করল,
“আমার অন্যায় কী?”
“ভুলে গেছেন?”
“হ্যাঁ। বল কী অন্যায় করেছি আমি?”
“ওই যে… ওই মেয়েটা।”
আদনান আহিয়ার গ্রীবায় মুখ গুঁজে দিল। নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কোন মেয়েটা?”
“এখন না জানার ভান করছেন?”
আহিয়া আবার উঠতে চাইল, “ছাড়ুন আমাকে।”
আদনান তাকে শক্ত করে নিজের বুকে আটকে রাখল। কণ্ঠটা ভারী হয়ে গেল,
“পারবো না। পারবো না আমি তোকে ছাড়তে। তুই যা করার করে নে। প্রয়োজনে আমাকে মেরে ফেল। তবুও আমি ছাড়বো না।”
আহিয়া চাপা স্বরে বলল,
“সবাই নিচে আছে! ছাড়ুন না।”
আদনান নির্ভীক স্বরে বলল,
“তো কী হয়েছে? এখন সবাই জানে তুই আমার বউ।”
আহিয়ার কণ্ঠে জমে থাকা কষ্ট বেরিয়ে এল,
“আমি আপনার কেউ না। আপনি আমাকে ভালোবাসেন না।”
“কে বলল বাসি না?”
“আমি তো জানতাম না। বাসেন নাকি?”
আদনান চোখে চোখ রেখে বলল, “প্র্যাক্টিক্যালি দেখাই?”
আহিয়া চমকে উঠল, “এই না না… এ… এখন না।”
“তাহলে কখন?”
হালকা মুচকি হেসে বলল, “রাতে? রাতে তুই আসবি। না আমি যাবো তোর ঘরে?”
এইবার আহিয়া নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে বসল। চোখের কোণ দিয়ে তাকাল, আবার দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। তবে কিছু বলল না। এই নীরবতাটুকুই আদনানের জন্য যথেষ্ট ছিল। সে হালকা হাসল,
“ঠিক আছে। আমিই যাবো।”
তারপর হঠাৎ স্বরে দৃঢ়তা এনে বলল,
“একটা কাজ করিস। তোর যাবতীয় জিনিসপত্র প্যাক করে রাখিস। আমি সাত দিনের ছুটি নিয়েছি। আমরা কাল সকালের ফ্লাইটে সুইজারল্যান্ড যাবো।”
আহিয়া বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল,
“সুইজারল্যান্ড?”
“হুম।”
“আপনি কী করে জানলেন সুইজারল্যান্ড আমার ড্রিম কান্ট্রি?”
আদনান হালকা হেসে তার কানের পাশের চুলের গোছা গুঁজে দিয়ে বলল, “তোর পছন্দ-অপছন্দ ছোটবেলা থেকেই জানি আমি। আর এটা জানবো না?”
কণ্ঠটা আরো নরম হলো,
“আমি যতদিন বেঁচে আছি তোর স্বপ্নগুলো পূরণ করবো, আহি। শুধু তুই আমার হয়ে থাক আজীবন। আমার তাতেই চলবে।”
লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৬২
আহিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎই আদনানের বুকে মাথা গুঁজে দিল। অভিমানী স্বরে বলল,
“আমি তো আপনারই। আপনার হয়েই থাকবো। শুধু তার বিনিময়ে আমাকে প্রতিদিন চকলেট এনে দিলেই হবে।”
আদনান তৃপ্তিকর হেসে ফেলল। দিন যত যাচ্ছে, এই মেয়েটার প্রতি তার আসক্তি ততই বাড়ছে। আর এই মেয়েটা মাঝে মাঝে এমন অভিমান করে বসে; যে তার বুকের ভেতরটা শুকিয়ে যায়। একটাই ভয় তার মনে বারবার ঘুরে ফিরে আসে, যদি আহিয়া সত্যিই একদিন তাকে ছেড়ে চলে যায়… তাহলে তো তার জীবননাশ ঘটবে খুব দ্রুত!
