দাহশয্যা পর্ব ৪৪
Raiha Zubair Ripti
রাত চারটার পর সোলেমান রুমে ফিরে। মেহরিন কে ঘুমে বিভোর থাকতে দেখা গেলো। সোলেমান গুটিগুটি পায়ে বিছানায় এসে শুতেই মেহরিন চোখ মেলে বলল-
-” কোথায় গিয়েছিলেন?
সোলেমান কিছুটা চমকে উঠলো।
-” ঘুমোও নি?
-” ঘুমিয়েই ছিলাম। আপনার যাওয়ার শব্দ পেয়ে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল।
-” আমি তো কোনো শব্দ করি নি তাহলে?
-” আপনার বুক থেকে আমাকে সরিয়ে যখন বালিশে শুইয়ে দিলেন,তখন ই আমার ঘুম ভেঙে গেছে। এত রাতে কোথায় গিয়েছিলেন?
-” একটা আর্জেন্ট কাজে।
-” কি এমন আর্জেন্ট কাজ যে এত রাতে বের হতে হলো?
সোলেমান বউকে বুকে টনে আনলো। কথাটা কে সূক্ষ্ম ভাবে এড়িয়ে গিয়ে বলল-
-” বোর্ড মিটিং ছিলো একটা। রাজনৈতিক বিষয়ে মিটিং সচারাচর মাঝ রাতেই হয়। সেখানেই গিয়েছিলাম।
মেহরিন বিশ্বাস করে নিলো স্বামীর কথা।
এজওয়ান গতকাল রাতেই বাহাদুর কে ফোন করে বলেছিল আসার পথে যেন বাসমতির চাউল আনে সাথে ডাল মশলা আর দুটো মুরগী। বাহাদুর এজওয়ানের কথা মতনই সব নিয়ে এসেছে। গার্ডের দুজন কে দিয়ে মুরগী কাটিয়েছে সাথে পিয়াজ মরিচও। তারাই চাল ডাল ধুয়ে দিয়েছে।
পুরো দমে খিচুড়ি রান্নার তোড়জোড় চলতে লাগলো। বাবুর্চি হয়েছে বাহাদুর। ইউটিউব দেখে দেখে রান্না করছে। হাতে অবশ্য গ্লাভস পড়ে নিয়েছে। মুরগীর মাংস গুলো কষিয়ে চাল ডাল ঢেলে দিলো। এই এজওয়ানের জন্য তাকে কি না কি করতে হয় ভাবলেই তার নিজের জন্য দুঃখ হয়। রান্না প্রায় শেষের দিকে আসতেই এজওয়ান বাহাদুর কে জিজ্ঞেস করলো-
-” টেস্ট কেমন হয়েছে? লবন ঠিকঠাক হয়েছে?
বাহাদুর সরু চোখে বলল-
-” রেঁধে দিয়েছি এটাই তো অনেক। লবন আবার
আমায় খেয়ে চেক করতে বলিস না ভাই।
ইয়াসিন সবেই ঢুকেছে রুমের ভেতর। খিচুড়ির ঘ্রাণে মুখর হয়ে আছে রুম। কোনো পিকনিক নাকি আজ? এজওয়ান ভাই তাকে রেখেই পিকনিক করতেছে! কিছুটা মন খারাপ করেই জিজ্ঞেস করলো-
-” ভাই কিসের খিচুড়ি এটা? আমায় রাইখাই আপনেরা পিকনিক করতাছেন!
বাহাদুর জিজ্ঞেস করলো-
-” তুইও করবি নাকি পিকনিক?
-” হ,আমারেও নেন। খাইয়া আসি নাই । ক্ষুধাও লাগছে। খিচুড়ি টা কি লোভনীয় লাগতেছে দেখে। টেস্ট মনে হয় ভালোই হইছে।
-” এটা এলাকায় বিলাবো।
-” তোবারক?
-” হ।
-” লবন দেখছেন নি আপনারা?
বাহাদুর বলল-
-” না।
-” তাহলে আমি চেখে দেখি।
এজওয়ান গম্ভীর গলায় বলল-
-” খবরদার, খিচুড়ির দিকে চোখ তুলেও তাকাবি না। খাওয়া তো দূরে থাক।
কথাটা বলে এজওয়ান হাঁটা ধরলো। তার একটা ফোন এসেছে। পেছন পেছন বাহাদুর ও চলে গেলো আরেক রুমে কাঙ্ক্ষিত জিনিস আনতে।
ইয়াসিনের পেটের ভিতর টায় ইঁদুর ছোটাছুটি করছে। জিহ্বার ডগায় পানি চলে এসেছে। পাশে থাকা প্লেট দেখতে পেয়ে সেটা হাতে নিয়ে এক চামিচ খিচুড়ি উঠিয়ে নিলো প্লেটে। গরম খিচুড়ি ফু দিতে দিতে খেতে লাগলো।
এজওয়ান ফোনে কথা শেষ করে রুমের ভেতর ঢুকেই দেখতে পেলো ইয়াসিন খিচুড়ি প্লেট চেটেপুটে খাচ্ছে। এজওয়ান নাক ছিটকালো। ফোনটা পকেটে ঢুকাতে ঢুকাতে মাথায় কুবুদ্ধি হাজির হলো। ইয়াসিন কে একটু ভয় দেখানো যাক। শালার ব্যাটা কে বলল না খেতে। তারপরও আখাইয়ার মতন ঝাঁপিয়ে পড়েছে খেতে!
-” তোকে না খেতে মানা করেছিলাম আমি ইয়াসিন?
ইয়াসিন বুড়ে আঙ্গুল চেটে বলল-
-” নিজেরে আটকায় রাখতে পারি নাই ভাই। তোবারক, এটা তো সবার জন্য উন্মুক্ত। আমারে খাইতে মানা করেন ক্যান আপনি।
-” খিচুড়ি টা কেমন হয়েছে খেতে?
ইয়াসিন ঢেকুর তুলে বলল-
-” সেই স্বাদ হইছে ভাই। স্পেশাল কোনো কিছু দিয়েছিলেন নাকি টেস্ট বাড়াতে?
-” হ্যাঁ ভীষণ স্পেশাল কিছু দিয়েছিলাম।
-” কি ভাই সেটা? নাম কন। আমিও সেটা কিনে আনবো। সেই স্বাদ হইছে।
এজওয়ান বাঁকা হেঁসে বলল-
-” এটা কিনতে পাওয়া যায় না রে পাগলা।
-” এ্যাহ কি বলেন। কিনতে পাওয়া যাবে না কেনো?
-” টুনটুনি কিনতে পাওয়া যায় না।
ইয়াসিন কপাল কুঁচকালো।
-” কিসের টুনটুনি ভাই?
-” টুনটুনি এক ধরণের নরম মাংস । আর এটা সেই টুনটুনির খিচুড়ি।
-” এটা টুনটুনি দিয়ে রান্না করা খিচুড়ি? তোবারক না? আর এই টুনটুনি কই পাইছেন? আমি তো ভাবছি আমি আরো মুরগির গোস খাইলাম। টুনটুনির এত স্বাদ!
এজওয়ান হো হো করে হাসতে হাসতে বলল-
-” হ্যাঁ হ্যাঁ অনেক স্বাদ টুনটুনির।
বাহাদুর ইয়াসিনের পিঠের উপর কনুই দিয়ে কিল মেরে বলল-
-” গতকাল সোলেমান ভাই যেই ছেলেদের টুনটুনি
কেটে দিলো। সেই টুনটুনি গুলো দিয়েই খিচুড়ি
রান্না করা হচ্ছে বলদ। এগুলো রাস্তার কুত্তাদের খাবার।
ইয়াসিন একবার খিচুড়ি তো আরেকবার
এজওয়ানের মুখের দিকে তাকালো। তারপর
বিষয় টা বোঝামাত্রই চোখ দুটো বড় হয়ে আসলো। তড়িঘড়ি করে পেট মুখ হাত দিয়ে চেপে ধরলো। তার ব’মি আসতেছে। চোখ উল্টে আসতেছে। সাথে সাথে ওয়াক ওয়াক করে উঠলো। এজওয়ান ভাই এটা তারে কি খাওয়াইলো! ইয়াসিন রুম থেকে দৌড়ে বের হয়ে গেলো। রাস্তা দিয়ে বমি করতে করতে হসপিটালের দিকে দৌড়াতে লাগলো। এখনই পেট মুখ ওয়াশ করতে হবে তার।
এজওয়ানের ইয়াসিনের অবস্থা দেখে হাসতে হাসতে পেটে খিলি ধরে গেলো। বাহাদুর তার হাতের বক্সে থাকা টুনটুনি গুলো খিচুড়ির ভেতর ঢেলে দিলো। টুনটুনি গুলোকে ছোট ছোট করে কাটিয়েছে এজওয়ান গার্ড দের দিয়ে। কয়েক মিনিট নাড়াচাড়া করে নামিয়ে নিলো চুলা থেকে খিচুড়ি টা। ঠান্ডা হলে পাতিল নিয়ে বের হলো এলাকায়। যেখানে যেখানে কু’ত্তা দেখতে পেলো সেখানে সেখানে চামিচ দিয়ে বেড়ে দিলো।
রাস্তার অনাথ শিশু গুলো দৌড়ে আসলো খেতে। বিপাকে পড়ে গেলো এজওয়ান।
এই খিচুড়ি তো এদের দেওয়া যাবে না। এগুলো জাস্ট কু’ত্তাদের জন্য।
বাচ্চা গুলো হাত পাতলো। বলতে লাগলো-
-” আমাগোও দেন খাইতে।
লোকজন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলো আর এজওয়ান দের উদ্দেশ্য করে বলছিল-
-” কি দিনকাল আসলো ফুটপাতের বাচ্চাদের খাবার না দিয়ে কুকুর দের খাবার দিচ্ছে। মানবতা দেখছি আজকাল প্যান্ট ছিড়ে রকেটের গতিতে বেড়িয়ে আসতেছে।
এজওয়ান পাশে থাকা হোটেল থেকে আলাদা করে পাতিল খিচুড়ি কিনে বাহাদুর কে বলল এগুলো বাচ্চাদের মাঝে বিলিয়ে দিতে।
মাঝখান দিয়ে এসব বাচ্চারা চলে আসবে বুঝতে পারলে কু’ত্তা গুলোকে ধরে বাগান বাড়িতে নিয়ে খাওয়াতো।
১০ টার দিকে এজওয়ান সুলতান নিবাসে ফিরে।
মাহি মেহরিনের সাথে দেখা করতে সোলেমানের রুমে আসে। সোলেমান বাহিরে গিয়েছে। সেজন্য সাহস পেয়েছে। মেহরিন মাহিকে দেখে কি যে খুশি হলো। মেহরিন সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
-” কেমন আছেন আপু?
মাহি সালামের জবাব দিয়ে বলল-
-” ভালোই তুমি?
-” আলহামদুলিল্লাহ ভালো।
-” এসে থেকে সেই যে রুমে ঢুকে আছো। আর তো বের হও নি।
-” আসলে শরীর একটু অসুস্থ তো?
মাহি তড়িঘড়ি করে জিজ্ঞেস করলো-
-” সে কি, কি হয়েছে?
-” একটু শরীর ব্যথা।
মাহি তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল-
-” খুব কষ্ট হয়েছে পরশু তাই না?
মেহরিন হতবিহ্বল হয়ে গেলো। মাহি জানলো কি করে?
-” আপনি জানলেন কি করে?
-” নিউজ চ্যানেলে তো দেখলাম গতকাল।
মেহরিনের শ্বাস আঁটকে আসার উপক্রম। নিউজ চ্যানেল গুলোও জানে!
-” ত..তারা জানলো কি করে?
-” সোলেমান সাহেবের কোনো শত্রু হয়তো ছবি টা তুলেছিল।
মেহরিনের হাত পা জমে আসলো।
-” ক…কিসের ছবি?
-” তুমি এতো ভয় পাচ্ছো কেনো? ছবিতে তোমার ফেস দেখা যায় নি। ঐ যে তোমাকে নিয়ে সোলেমান সাহেব দৌড়াচ্ছিল তার ছবি।
মেহরিন যেন প্রাণ ফিরে পেলো। সে অন্য কিছু ভেবেছিল।
-” তোমাদের পরিস্থিতি টা একদম থ্রিলার মুভির মতন ছিলো।
-” ভীষণ ভয়ংকর ও ছিলো। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আগে কখনও পড়ি নি।
-” এ তো কেবল শুরু। রাজনীতি মানেই হয় মরবে না হয় মারবে। এসবে অভ্যস্ত হতে শিখো।
-” উনার কিছু হবে না তো আবার!” ভয় নিয়ে কথাটা বলে উঠলো মেহরিন।
-” হতেও পারে। রাজনীতি যখন করছে তখন অস্বাভাবিক কিছু নয়। কখনও কখনও বিপক্ষ দলের পাশাপাশি নিজের দলের লোকজন ও হিংস্র হয়ে উঠে। শুনেছি সোলেমান সাহেবের নিজের দলের অনেকেই তাকে দেখতে পারে না। একবার তার ক্লাবে আ’গুন ধরিয়ে দিয়েছিল তারই দলের লোক। ধরো তোমাকে আমার দরকার।আমি এখন এই দরকারে তোমাকে দরকার পড়লে চাঁদ টাও এনে দেওয়ার চেষ্টা করবো। যেই তোমার দরকার আমার শেষ হয়ে যাবে সেই তোমাকেই আমি পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্যতম মৃ’ত্যু এনে উপহার দিব। সোলেমান সাহেব ঠিক এর মাঝামাঝি তে আছে।
মেহরিনের ভয়ে শরীর শিউরে উঠলো। সে রাজনীতির কিছু বুঝে না। আর কিছু বুঝতেও চায় না। তার সুলতান সাহেবের কিছু হলে সে ম’রেই যাবে।
-” এতটা বাজে কেনো রাজনীতি?
-” বিকজ ইট’স বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মতন জঘন্য পলিটিক্স আর কোথাও নেই। বাংলাদেশের মানুষ অভস্ত্য এটা দেখতে দেখতে।
এজওয়ান রুমে এসে মাহিকে দেখতে না পেয়ে বিরক্তি তে কপাল কুঁচকালো। তরিকুলের বেটি আবার কোথায় গেলো পিক ফেলাতে। পকেট থেকে ফোনটা বের করে তরিকুলের বেটির নম্বরে কল লাগালো।
মাহি এজওয়ানের ফোন পেয়ে ফোনটা রিসিভ করে কানে নিয়ে বলল-
-” কি হয়েছে ফোন দিচ্ছেন কেনো?
-‘ নিশ্চয়ই প্রেম করার জন্য ফোন দেই নি। কার সাথে পিক ফেলাতে গেছো? আর গেছো কই? লোকেশন সেন্ড করো ক্যামেরা নিয়ে আসতেছি।
-” ভদ্র ভাবে কথা বলতে পারেন না?
-” অভদ্রর কাছে ভদ্রতা আশা করা বোকামি জানো না সেটা?
-” কি সমস্যা বলুন?
-” বাসায় আসো।
-” আশ্চর্য আমি তো বাসাতেই।
-” ওহ রিয়েলি? আমি তো রুমে। তোমার ছায়াও তো খুঁজে পেলাম না।
-” আমি মেহরিনের কাছে।
-” বে’য়াদব মেয়ে। তোমায় বলেছিলাম না ভাইজানের রুমে ঢুকতে না? তাড়াতাড়ি বের হও ভাইজান আসার আগে। তার রুমে মেয়েদের ঢোকা নিষেধ।
-” আপনার ভাইজান বাড়ি নাই।
-” তুমি আসবে নাকি আমি নিতে আসবো কোনটা?
-” আসতেছি।
মাহি ফোনটা কে’টে চলে আসলো। রুমে ঢুকে দেখলো এজওয়ান বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে টানটান হয়ে শুয়ে আছে। শরীরে স্রেফ একটা কালো শার্ট। মাহি সামনে দাঁড়িয়ে বলল-
-” কি জন্য আসতে বললেন?
-” প্রেম করার জন্য। আসো প্রেম করি।
-” আপনার সাথে তর্ক করার মুড নেই আমার।
-” বাব্বাহ্ এত ভালো হয়ে গেলে কি করে?
-” আমি জন্ম থেকেই ভালো।
-” আসলেই। সেজন্য তোমার কপালে এত খারাপ একটা মানুষ জুটলো।
-” খুব শীগ্রই কপাল থেকে ঝেড়েও ফেলে দিব।
-” তাহলে তো তোমার কপাল টাও কেটে ফেলে দিতে হবে।
-” দরকার পড়লে তাই দিব।
এজওয়ান মাহির হাত টা টেনে ধরে তার বুকের উপর এনে ফেললো। মাহি ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগলো। এজওয়ান মাহিকে আরো চেপে ধরতেই মাহি এজওয়ানের বুকের শার্ট টা খামচে টেনে ধরলো। সাথে সাথে বোতাম ছিঁড়ে খুলে আসলো। এজওয়ান একবার শার্টের দিকে তাকালো। মাহি হাতের মুঠোয় থাকা বোতামের দিকে তাকিয়ে ফের এজওয়ানের বুকের দিকে তাকাতেই মাহির নজরে ফের ঐ লকেট টা চোখে বিঁধল। মাহি হাত দিয়ে লকেট টাকে ছুঁয়ে দিলো। এজওয়ান সেটা দেখলো।
-” পছন্দ হয়েছে নাকি চেইন টা?
মাহি ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ লকেট টার দিকে তাকিয়ে বলল-
-” A.J মানে?
-” A.J মানে এজওয়ান। চেনা চেনা লাগে নাকি ?
মাহি ভরকে গেলো।
-” চেনা চেনা কেনো লাগতে যাবে?
-” মনে হলো তাই জিজ্ঞেস করলাম।
মাহি সরে আসলো এজওয়ানের থেকে। এজওয়ান উঠে দাঁড়ালো। শার্ট টা খুলে মাহির হাতে দিয়ে বলল-
-” গোসল করে এসে যেন দেখি শার্টের বোতাম টা তার জায়গায় ঠিকঠাক ভাবে আছে।
মাহির শরীর পুরো বরফের মতন জমতে শুরু করলো। ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছে সে। এজওয়ান টাওয়াল টা গলায় জড়িয়ে ওয়াশরুমে ঢুকতে গিয়েও ঢুকলো না। পেছন ফিরে মাহির দিকে তাকিয়ে বলল-
-” তরিকুলের বেটি শোনো।
মাহি ঘোরের মধ্যেই এজওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-
-” হু?
এজওয়ান কিছুক্ষণ মাহিকে আপাদমস্তক দেখে বলল-
-” তোমায় দেখলে মন হয় হাজার বছর
তোমার সাথে ছিলো পরিচয় বুঝি?
স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে
এলাম তোমার কাছে..
তোমার সাথে জীবন মরণ
যেন লেখা আছে
শুধু আমি ছাড়া পৃথিবীতে
তুমি কারো নয় বুঝি,
তুমি কারো নয়……তাই না?
মাহি রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। এজওয়ান স্মিত হেঁসে ঢুকে পড়লো ওয়াশরুমে।
ইব্রাহিম সোলেমানের সাথে বসে আছে ক্লাবে। বাহিরেই ইমন গাড়িতে বসা। ইব্রাহিম সেদিন ইমনের ফোন থেকে উর্মির নম্বর টা নিয়ে নিয়েছিল ফোনে। কেনো এমন অসামাজিক আচরণ করলো তা তার বোধগম্য হলো না।
সোলেমান কিছু ফাইল চেক করতেছে। তাদের বিজনের জন্য নতুন কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে। ১৫ তালা বিল্ডিং হবে সেটার। সেটার দায়িত্ব এজওয়ান কেই দিবে সে। কনস্ট্রাকশনের কাজ প্রায় শেষের দিকেই। বেশ অনেক টাকাই খরচ করতে হয়েছে এটার পেছনে। এর ভেতর সোলেমান কে আবার দেশের বাহিরে সুইজারল্যান্ডেও যেতে হবে। অনেক দিন হলো সে যাচ্ছে না দেশের বাহিরে। ভাবছে মেহরিন কে নিয়ে যাবে কি না। নিয়ে গেলে মন্দ হয় না। কটাদিন এক সাথে থাকতে পারবে নিরিবিলি একান্তে। কেউ ডিস্টার্ব করতে পারবে না সেখানে।
সোলেমান ফাইল গুলো জায়গা মতন রেখে নিবাসে ফেরার জন্য রওনা হলো। শুনেছে ইয়াসিন হসপিটালে ভর্তি। ফোনে বারবার কিসের যেন টুনটুনি খাওয়ার কথা বলছিলো। টুনটুনি পাখি খেয়েছে নাকি কে জানে।
সোলেমান কে ইমনই পৌঁছে দিলো সুলতান নিবাসে। ইমন বারবার লুকিং গ্লাসে সোলেমান কে দেখছিলো। তার ভালোবাসার নারী টা এই লোকটার বউ। মানতে কি যে কষ্ট হয় ইমনের। কত বড়লোক উনি। আর ইমন সাধারণ একটা ড্রাইভার। তাদের মাঝে আকাশপাতাল তফাৎ। তার মেহরিন সুখে থাকুক। এই জীবনে আর কিছু সে চায় না। নিবাসের কাছে এসে গাড়ি থামাতেই সোলেমান নেমে পড়ে গাড়ি থেকে। ইমন জানালা দিয়ে দেখলো সুলতান নিবাস টা। ইমন দের বাড়ির মতন দশ বাড়ি একত্রে করলেও সুলতান নিবাসের সমান হবে না। তার মেহরিন তাহলে সুখেই আছে।
সোলেমান গাড়ি থেকে নেমে হাঁটা ধরতেই ইমন তড়িঘড়ি করে গাড়ি থেকে নেমে বলল-
-” সোলেমান সাহেব শুনুন।
সোলেমান দাঁড়িয়ে গেলো। হঠাৎ এই ছেলে তাকে ডাকছে কেনো?
ইমন এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়ালো। সোলেমান ভ্রু কুঁচকালো। ইমন বলল-
-” আপনি ভীষণ সৌভাগ্যবান একজন মানুষ।
এই প্রথম ইমন সোলেমানের সাথে কথা বলছে। এর আগে তাদের মাঝে কোনো কথাবার্তা হয় নি।
-” হঠাৎ এ কথা বললে যে?
ইমন মাথা নত করে বলল-
-” বিশেষ একটা কারনে বললাম। আসছি।
ইমন চলে গেলো। সোলেমান ইমনের যাওয়ার পানে একবার তাকিয়ে চলে আসলো।
ইব্রাহিম বারবার ফোনটা নিয়ে পায়চারি করছে। ফোন দিবে কি দিবে না এ নিয়ে মহা দ্বিধায় ভুগছে। কি আর হবে ফোন দিলে। চিনতে তো আর পারবে না। একটু কথা বলাই যাক।
ইব্রাহিম কল লাগালো উর্মির নম্বরে। একবার রিং বেজে কেটে গেলো। ফের দ্বিতীয় বার বাজতেই রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে কর্কশ গলায় ভেসে আসলো-
-” হ্যালো কে বলছেন?
ইব্রাহিম মৃদু হেঁসে বলল-
-” তোমার বাচ্চার বাবা।
এই কথাটা কানে আসতেই ইতি বেগমের শরীর রাগে কাঁপতে শুরু করলো। ইতি বেগম রেগে বলতে শুরু করলো ফোনের ওপাশে থাকা ব্যক্তিটাকে।
-” হারা’মজাদা,হতচ্ছাড়া, বেয়া’দব লু’ইচ্চা কে রে তুই? তুই আমার বাচ্চার বাপ? আয় তুই সামনে শিলনোড়া দিয়ে চাপা ভেঙে দিব তোর।
ঊর্মি মায়ের চিল্লাচিল্লির আওয়াজ শুনে রুম থেকে বের হয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো-
দাহশয্যা পর্ব ৪৩
-” কি হইছে কারে বকতেছো তুমি?
ইতি বেগম মেয়ের দিকে ফোন টা বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
-” দেখ তো ঊর্মি কোন হতচ্ছাড়া যেনো ফোন দিয়ে আবোলতাবোল বকতেছে। তোদের বাপ বলে নিজেকে পরিচয় দিচ্ছে। শয়তান বেডা কোথাকার….
