লাল শাড়িতে প্রেয়সী শেষ পর্ব
Fatima Fariyal
বাবা হওয়ার ভারটা কাঁধে পড়ার পর থেকেই আহাদের জীবনযাত্রা বদলে গেছে। আগের সেই নির্বিকার সময়সূচি আর নেই। এখন প্রতিটা দিন কাজ শেষ করার একটাই তাড়া, যত দ্রুত সম্ভব বাড়ি ফেরা। কারণ বাড়িতে তার জন্য অপেক্ষা করে থাকে দুটো ছোট্ট প্রাণ। চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকে দরজার দিকে। বাবা ফিরবে এই আশায়।
ওদের ওমন ভরাট, বিস্মিত চোখদুটো আহাদের সমস্ত ক্লান্তি শুষে নেয়। অফিসের চাপ, রাজনীতির কূটচাল, মানুষের মুখোশ, সবকিছু মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে যায়। এই আনন্দটুকু থেকে সে কোনো দিনই বঞ্চিত হতে চায় না। কিন্তু আজ… আজ বড়সড় একটা মিটিং ছিল। সময় কোথা দিয়ে চলে গেল টেরই পেল না। মন্ত্রণালয় থেকে বেরোতে বেরোতে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। তাছাড়া আজকের দিনটা তার জন্য এমনিতেই বিশেষ। আজকে ডিসেম্বরের ছাব্বিশ। রিদিতার জন্মদিন। মনে পড়ে আহাদের বুকটা একটু চেপে ধরল। অবশ্য রিদিতার হয়তো নিজেরই খেয়াল নেই। দুটো বাচ্চা সামলাতে সামলাতে দিন–তারিখ, উৎসব, সব গুলিয়ে যায় মেয়েটার। তবুও… সে তো প্রেয়সীর বিশেষ দিনটা ভুলতে পাটে না। গাড়ির কাছে আসতেই আহাদের চোখে পড়ল, নাদিম আর শাওন দাঁড়িয়ে আছে। ওদের ওপরই আজকের একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছিল সে। গাড়ির ঠান্ডা বোনেটে ভারী, ক্লান্ত শরীরটা ঠেকিয়ে আহাদ প্রশ্ন ছুড়ল,
“আমি যা যা বলেছিলাম, সব এনেছিস তো?”
নাদিম সঙ্গে সঙ্গে ডিকি খুলে দেখাল,
“সব আনছি ভাই। কিন্তু… একটা ঝামেলা হয়ে গেছে।”
আহাদের ভ্রু কুঁচকে গেল, “কী ঝামেলা?”
“কেকটা…” নাদিম ঢোক গিলল, কেকটা বচকায়া গেছে।”
“হোয়াট?”
আহাদের কণ্ঠ মুহূর্তে চড়া হয়ে উঠল।
নাদিম তড়িঘড়ি যোগ করল, “সব ঠিকই ছিল ভাই। এখানে আসার পরই ঝামেলাটা হইছে। আর এটা শাওনের জন্যই হইছে।”
শাওন সঙ্গে সঙ্গে তেঁতে উঠল,
“একদম ফাও কথা বলবি না নাদিম! আমার জন্য হইছে? নাকি তোর জন্য?”
“গাড়ির ডিকি কে খুলছে?”
“আমি কী জানি!”
নাদিম ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “এখন তো জানবাই না। দুধে ধোয়া তুলশি পাতা !”
“নাদিম্মাআআআ!”
শাওন দাঁত কিড়মিড় করতে লাগল। পরের মুহূর্তেই আহাদের বজ্রকণ্ঠ আছড়ে পড়ল,
“থাপ্পড়ায়া একেকটার চেহারার নকশা পাল্টায়া দিবো। একটা কাজও ঠিকঠাক করতে পারিস না, গর্দভ!”
দুজনেই মুহূর্তে চুপসে গেল। ঠিক তখনই শাহীন বেরিয়ে এলো। ভেতরে কিছু ফাইল আর ডাটা নিয়ে ব্যস্ত ছিল এতক্ষণ। এসেই আহাদকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“চলেন ভাই। আমি ডাটা ট্রান্সফার করে দিয়েছি। বাকিটা সৌম্য বাবু দেখে নেবে বলেছে।”
আহাদ মাথা নাড়ল, “ঠিক আছে। তুই এবার যা।”
শাহীন একটু থমকে প্রশ্ন করল,
“আপনি বাড়ি যাবেন না?”
“হ্যাঁ যাবো।”
আহাদ একটু চুপ থেকে, সংক্ষেপে বলল,
“এখন থেকে তোর আর আমার সাথে বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার দরকার নেই। কাজ শেষ করে সোজা বাসায় যাবি। নীলার এই মুহূর্তে তোকে বেশি দরকার।”
শাহীন একদণ্ড চুপ করে রইল। তারপর একটু গাল ভারী করে বলল, “সমস্যা নেই ভাই। আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েই যেতে পারবো।”
এই কথাটুকুতেই আহাদের চোখ লাল হয়ে উঠল।
“সমস্যা আছে কি নাই আমি জানতে চেয়েছি? আমি যখন বলেছি চলে যাবি, তখন ম্যানম্যান করছিস কেন?”
শাহীন মাথা নিচু করে ফেলল, “সরি ভাই…”
আহাদ আর কিছু বলল না। নীরবে শাহীনের গম্ভীর মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। শাহীনের চোখে ক্লান্তি, ভেতরে জমে থাকা অসহায়ত্ব, সবই যেন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেই চেনা, দৃঢ় আহাদ আজ একটু ধীর হয়ে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে শাহীনের কাঁধে হাত রাখল। কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই বদলে গেল। কঠিন আহাদ যেন হঠাৎ করেই অভিভাবকের রূপ নিল।
“দেখ শাহীন, জীবন কখনো কারোর জন্য থেমে থাকে না। থামে না, বুঝলি? তুই এখন যেটা করছিস, সেটা শুধু তোর নিজের ক্ষতিই করছে না। তোর জীবনের সঙ্গে আরও তিনটা মানুষ জড়িয়ে আছে। তোর মা, নীলা… আর তোর অনাগত সন্তান।”
শাহীন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। আহাদ একটু থামল, যেন কথাগুলো ঠিক জায়গায় বসাতে চাইছে। আবার বলল,
“একবার ভাব, খালাম্মা কতটা খুশি তোর বাবা হওয়ার খবরে। সারাজীবন কত কষ্ট করে মানুষ করেছে তোকে। আর নীলার কথা ভাব। মেয়েটা ছোটবেলা থেকে তেমন কিছুই পায়নি। তবুও কোনো অভিযোগ না করে সবকিছু মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।”
আহাদ এবার একটু শক্ত করে শাহীনের কাঁধে হাত রাখল।
“যে তোকে ছেড়ে গেছে, তার জন্য যাকে পেয়েছিস; তাকে অবহেলা করিস না। সবাই সব কিছু পায় না শাহীন। যা পেয়েছিস, সেটার মূল্য দিতে শিখ।”
শাহীন যেন পাথর হয়ে গেল। কী বলবে সে? কী করবে? নিজেকেই তো সে এখনো বুঝে উঠতে পারেনি। মানিয়ে নিতে চাইলেও কোথাও যেন একটা বাধা কাজ করে। তবুও সত্যিটা অস্বীকার করার উপায় নেই, নীলা চেষ্টা করছে। সম্পর্কটা বাঁচানোর চেষ্টা করছে। আহাদ পিঠে আলতো করে চাপড় দিয়ে ভরসা দিল। শাহীন আবেগ সামল দিতে না পেরে আহাদকে জড়িয়ে ধরল। একদম অনাকাঙ্ক্ষিত। আহাদ কিছু বোঝার আগেই দুই পাশ থেকে নাদিম আর শাওনও ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে তিনজনের চাপে আহাদ প্রায় পিষ্ট!
আহাদের সাধারণত গায়ে গা লাগানো একদমই পছন্দ না। কিন্তু আজ কেন জানি খারাপ লাগছে না। বরং অদ্ভুত একটা ভালো লাগা কাজ করছে। এই তিনজন, তার এই ত্রয়ী; ওকে ভীষণ ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। সেটা আজ আবার নতুন করে অনুভব করল সে। কয়েক সেকেন্ড পর আবেগী মুহূর্তটা কেটে যেতেই আহাদ আবার নিজের চেনা রূপে ফিরে এল। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। বিরক্ত গলায় বলল,
“আহ! কী করছিস? মেয়ে মানুষের মতো গায়ে পড়েছিস কেন? ছাড়! ছাড় আমাকে। দূরে যা!”
কিন্তু ত্রয়ী ছাড়ার পাত্র নয়। বরং আরও শক্ত করে চেপে ধরল। আজ সুযোগ পেয়েছে, এমন সুযোগ তো বারবার আসে না। গর্জে উঠল আহাদ,
“থাপ্পড়ায়া একেকটার চেহারা পাল্টায়া দিবো। ছাড়তে বলেছি না!”
এবার তিনজনই ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। আহাদ আদেশের সুরে বলল, “শাহীন, যা, বাসায় যা। তোর তিন দিনের ছুটি। এই তিনটা দিন নীলা আর তোর অনাগত সন্তানের জন্য। ভুলে যাস না।”
শাহীন কিছু বলল না। শুধু ইশারায় নীরব বিদায় জানিয়ে চলে গেল। শাহীন চলে গেলেও নাদিম আর শাওন বিস্ময়ে মুখ হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে। আহাদ সেটা দেখে বিরক্ত হয়ে বলল,
“সমস্যা কী? এমন বোয়াল মাছের মতো হা করে আছিস কেন?”
নাদিম অবাক গলায় বলল,
“শাহীন তো নীলার ধারে কাছেও যায় না। যতদূর আমি জানি! তাহলে হুট করে বাবা কীভাবে হচ্চে ও?”
শাওন হে হে করে হেসে উঠল।
“সবই আল্লাহর লীলা খেলা, বুঝলি?”
নাদিম সন্দেহের চোখে তাকাল।
“মানে? কী বলতে চাইছিস!”
আহাদ তখন আনমনে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। দেরি হয়ে যাচ্ছে। শাওন রহস্যময় ভঙ্গিতে বলল, “সেদিন আমি ওর অরেঞ্জ জুসের সঙ্গে একটু মশলা মিশাইছিলাম। মনে হয় সেটারই কর্মফল।”
নাদিম চোখ চকচক করে উঠল।
“আমারেও একটু মশলা দে ভাই! আর কত একা একা নিঃসঙ্গ জীবন কাটামু!”
শাওন ব্যঙ্গ করে বলল,
“জীবনে তো একটা প্রেমিকাও জুটাইতে পারছ নাই। মশলা কার উপর প্রয়োগ করবি?”
“তোর উপর, আয়, পাটক্ষেতে যাই।”
শাওনের কাঁধে হাত রাখতেই শাওন ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে দিল।
“আস্তাগফিরুল্লাহ! নাউজুবিল্লাহ! আমার এত খারাপ দিনও আসে নাই যে তোর লগে পাটক্ষেতে যামু!”
আহাদ ফোড়ন কেটে বলল,
“আশেপাশে পাটক্ষেত নাই। তবে একটু খুঁজলে কচুক্ষেত পাইতে পারস।”
নাদিম কি আর সুযোগ ছাড়ে? সে আবার শাওনের কাঁধে হাত রেখে বলল, “চল, কচুক্ষেতে যাই।”
শাওন ঝট করে সরে গেল।
“আল্লাহ মাফ করুক। প্রয়োজনে আফ্রিকার জঙ্গলে যামু, তবুও তোর সাথে যামু না!”
“চল না যাই,”
নাদিম আবার জ্বালাতে লাগল। এইবার শাওন দৌড়ে পালাল। নাদিমও পেছনে পেছনে ছুটল।
“আমারে তো নিয়া যা! একা একা গেলে হবে না তো শাওন বেবি!”
আহাদ দৃশ্যটা দেখে শব্দ করে হেসে উঠল। অতঃপর গাড়িতে উঠে বসল। দেরি হয়ে গেছে। যাওয়ার পথে আবার কেক নিতে হবে। আজকের দিনটা যে একটু আলাদা।
শাহীন যখন বাড়ির ভেতরে ঢুকল, তখন ঘড়ির কাঁটা নয়টা পেরিয়ে বেশ খানিকটা এগিয়েছে। তার কাছে বাড়ির অতিরিক্ত চাবি থাকে। রাত-বিরেতে ফেরার অভ্যাস তার নতুন। মা আর নীলাকে বিরক্ত করতে চায় না সে। মায়ের শরীর এমনিতেই ভালো থাকে না আর এখন নীলার শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। শারীরিক দুর্বলতার সঙ্গে মানসিক চাপও যোগ হয়েছে। বাড়িতে ফিরেই শাহীন সাধারণত চুপচাপ গিয়ে নিজের মতো করে শুয়ে পড়ে। নীলা অনেকবার বলেছে, রাত যত দেরিই হোক; যেন অন্তত তাকে ডাকে। কিন্তু শাহীনের ভেতরে অদ্ভুত এক অস্বস্তি কাজ করে। যাকে সে নিজের স্ত্রীর পূর্ণ মর্যাদা দিতে পারে না, তার কাছ থেকে স্বামীর অধিকার চাওয়া তার কাছে বোকামি মনে হয়। যদিও সত্যিটা হলো, সে চায়ও না। সম্পর্কটার দায় এড়িয়ে যাওয়াই তার সহজ পথ। ধীরে দরজা খুলে ভেতরে পা রাখতেই শাহীন থমকে গেল। ডাইনিং টেবিলের উপর মাথা রেখে নীলা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। চারপাশ নিস্তব্ধ। এমন দৃশ্য নতুন নয়, প্রায়ই নীলার অপেক্ষা এভাবেই শেষ হয়। অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত শরীর নিজেই হার মানে। শাহীন ধীরে এগিয়ে এসে খুব নিচু স্বরে ডাকল,
“নীলা… নীলা।”
নীলা হকচকিয়ে উঠে বসল। ঘুম জড়ানো চোখ কচলাতে কচলাতে তাকাল শাহীনের দিকে। যেন কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল বুঝতে সে কোথায়, কী হচ্ছে।
“আপনি এসেছেন?” নরম গলায় বলল সে।
“আজকে এত তাড়াতাড়ি?”
শাহীন প্রশ্নটার উত্তর দিল না। সে বরাবরের মতো পাশ কাটিয়ে গেল। চারপাশে একঝলক চোখ বুলিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল,
“মা কই? ঘুমিয়ে পড়েছে?”
নীলা মাথা নেড়ে বলল।
“হ্যাঁ, মায়ের তো নয়টার ওষুধ। খাওয়াইয়ে ওষুধ দিয়ে এসেছি।”
“ওহ।”
এইটুকুই। শাহীন সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। ঠিক তখনই নীলা পেছন থেকে ডাকল,
“আপনি খাবেন না?”
শাহীনের কণ্ঠে ক্লান্তি। “না, ইচ্ছে করছে না।”
নীলা আর কিছু বলল না। নীরবে টেবিলে রাখা খাবারগুলো ঢাকতে শুরু করল। সেই নীরবতার মধ্যে একটা চাপা অভ্যস্ত কষ্ট লুকিয়ে থাকে, যা কখনোই প্রকাশ পায় না। শাহীন সিঁড়ির এক ধাপে পা রেখেই হঠাৎ থেমে গেল। কেন জানি মনে হলো, কিছু একটা বলা দরকার। সে ফিরে তাকাল।
“তুমি খেয়েছো?”
নীলা সামান্য চমকে উঠল। এমন প্রশ্ন শাহীনের কাছ থেকে সে কখনোই আশা করে না। মুখে হালকা একটা হাসি আনার চেষ্টা করল; যদিও চোখে সেটা পৌঁছাল না।
“না, খাইনি।”
“কেন খাওনি?”
নীলা একটু থামল। তারপর সোজাসাপটা উত্তর দিল,
“একা একা খেতে ইচ্ছে করছিল না।”
শাহীন অজান্তেই একটা ঢোক গিলল। আসলেই তো। মেয়েটার সঙ্গে একবেলা বসে খাওয়াটুকুও তার হয় না। যেন সবসময় অপেক্ষার তালিকায় পড়ে থাকে। শাহীন কী মনে করে আর উপরে গেল না। চুপচাপ হাত ধুয়ে ডাইনিং টেবিলে এসে বসল। নীলার চোখে এটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। সে দ্রুত খাবারগুলো খুব যত্ন করে শাহীনের সামনে সাজিয়ে দিল। কোনো উচ্ছ্বাস নেই, শুধু দায়িত্ব আর অভ্যাস। শাহীন ইশারা করতেই নীলাও তার পাশে এসে বসল। রাতের নীরবতার ভেতর শুধু থালা-চামচের টুংটাং শব্দ। দুইজন মানুষ, একই টেবিলে তবুও মাঝখানে একটা অদৃশ্য দেয়াল। নীরবতার মধ্য দিয়েই শেষ হলো সেই রাতের নৈশভোজ।
ঘরে এসে নীলা ধীরে ধীরে বিছানা গুছিয়ে নিল। দিনের শেষে শরীরটা ক্লান্ত হলেও মনটা আজ অন্যরকম অস্থির। বাইরে থেকে শাহীনের শাওয়ারের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর সে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো। নীলা বালিশটা তুলে শাহীনের দিকে বাড়িয়ে দিল। কারণটা খুবই স্বাভাবিক, আবার খুবই নিষ্ঠুর। শাহীন বরাবরই সোফায় ঘুমায়, আর নীলা বিছানায়। এই ঘরের ভেতরেও তাদের জন্য আলাদা আলাদা জায়গা নির্ধারিত। শুধু একদিনই তাদের বিছানা আলাদা ছিল না। সেদিন শাহীন নেশায় ছিল। নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল আর নীলাও সেদিন তাকে থামায়নি। একজন বৈধ স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র বন্ধনের মতোই সেদিন তাদের মাঝখানে কোনো দূরত্ব ছিল না। সম্পর্কটা অস্বীকার করার সুযোগও ছিল না। আর আজ, আজই নীলা জানতে পেরেছে সে মা হতে চলেছে। ঠিক কত সপ্তাহ, সে নিশ্চিত না। ছয়, সাত পিরিয়ডের হিসাব মিলিয়ে এইটুকু আন্দাজই করতে পেরেছে। কিন্তু এই অনাগত প্রাণটার অস্তিত্ব সে তার ভেতরে খুব স্পষ্টভাবে অনুভব করছে। শাহীন বালিশটা নিতে গিয়ে হঠাৎ থমকে গেল। আহাদের কথাগুলো আচমকা তার মাথার ভেতর আছড়ে পড়ল। সে বালিশটা আবার আগের জায়গায় রেখে দিতে দিতে শান্ত স্বরে বলল,
“আমি যদি বেড শেয়ার করি, তোমার কোনো আপত্তি আছে?”
একটু থেমে যোগ করল,
“আসলে… সোফায় শুতে শুতে আমার ঘাড় ব্যথা করছে।”
নীলা প্রথমে বুঝতেই পারল না, কী বলবে। এমন প্রস্তাব তার জন্য একেবারেই অপ্রত্যাশিত। বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল। কয়েক সেকেন্ড পর সে শুধু মাথা নেড়ে জানাল, তার কোনো আপত্তি নেই। শাহীন আর কিছু বলল না। কোনো ব্যাখ্যা নয়, কোনো কৃতজ্ঞতাও নয়। চুপচাপ বিছানায় শুয়ে পড়ল। নীলা তখনও বসে আছে। হয়তো অস্বস্তিতে, হয়তো দ্বিধায়। সে জানে না, এই মুহূর্তটাকে স্বস্তি বলবে, না নতুন কোনো ভুল বোঝাবুঝির শুরু। শাহীন সেটা টের পেল। তাই প্রসঙ্গ পাল্টে স্বাভাবিক স্বরে বলল,
“সকালে তোমাকে নিয়ে হাসপাতালে যাবো। রেডি থেকো।”
নীলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কণ্ঠে হালকা বিষণ্ণতা, কিন্তু কোনো অভিযোগ নেই।
“আপনাকে জোর করে কোনো দায়িত্ব পালন করতে হবে না, শাহীন। আমি কখনো এসব নিয়ে অভিযোগ করব না।”
একটু থেমে আবার বলল,
“আমি জানি… আপনি আনিকাকে ভালোবাসেন। আর আমি সেই জায়গাটা দখলও করতে চাই না।”
এই কথাটা বলতে গিয়ে নীলার বুকটা একটু ভারী হয়ে এল। তবুও সে নিজেকে সামলে নিল। সে চোখ নামিয়ে বলল।
“শুধু একটা আবদার আছে আমার। দুজন মানুষ থেকে আমাকে কখনো আলাদা কইরেন না।”
তারপর নিজের উদরের ওপর আলতো করে হাত রেখে খুব শান্ত স্বরে যোগ করল,
“আপনার মা… আর যে আসতে চলেছে, এই দুজনকে নিয়ে একটু সুখী থাকতে চাই। এ ছাড়া আপনার প্রতি আমার আর কোনো অভিযোগ নেই।”
শাহীন সম্পূর্ণ চুপ করে রইল। কিছু বলার ভাষা তার নেই।
সত্যিই তো, এই মেয়েটা কখনো অভিযোগ করেনি। কখনো প্রশ্ন করেনি, কেন সে এখনো অন্য একজনের স্মৃতিতে আটকে আছে। আর সে নিজে? সে কি পেরেছে আনিকাকে ভুলতে? না, পারেনি। সে কি পেরেছে আনিকাকে ভুলে নীলার সঙ্গে নতুন করে সবকিছু স্বাভাবিকভাবে শুরু করতে? না, সেটাও পারেনি। তাদের মাঝখানে যে উঁচু অদৃশ্য প্রাচীর দাঁড়িয়ে আছে, সে কি পেরেছে সেই প্রাচীর ভাঙতে? না। আজও পারেনি। ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল। এই নীরবতায় ভালোবাসা নেই, কিন্তু দায়িত্ব আছে। দূরত্ব আছে, তবুও একসঙ্গে থাকার বাধ্যবাধকতাও আছে।
মীর হাউজের পেছনের আঙিনা দিয়ে নিঃশব্দে ভিতরে প্রবেশ করল আহাদ। সঙ্গ দিয়েছে আদিল আর তানভীর। আদিল আগেই একবার ভিতরে ঢুকে চারপাশটা ভালো করে দেখে এসেছে, রিদিতা তখন বাচ্চাদের নিয়ে নিচতলাতেই আছে। বাড়ির সবাই দুই ছানাকে ঘিরে ব্যস্ত। এই ব্যস্ততাটাকেই কাজে লাগাল আহাদ। সোজা নিজের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। দ্রুত মই লাগিয়ে বেলকনি পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল সে। সময় খুব বেশি নেই। যতটা সম্ভব কম সময়ের মধ্যে ঘরটাকে একটু সাজালো। নিখুঁত না, লুকিয়ে-চুপিয়ে যতটুকু করা যায় ততটুকুই আর কি। সব শেষ আবার আগের পথেই নিচে নামল তিনজন। এবার মূল দরজা দিয়েই ঢুকবে, স্বাভাবিকভাবে। এতে কারোর মনে সন্দেহের বীজও গজাবে না।
হলঘরের মেঝেতে আলাদা করে নরম কার্পেট বিছানো। মূলত সেখানেই বাচ্চাদের খেলনা ছড়িয়ে রাখা হয়, যেন ওরা নিচে বসে খেলতে পারে। এখন তো ওরা একটু একটু বসতে শিখেছে, হামাগুড়িও দেয়। তাই আর কোলে বেঁধে রাখার দরকার পড়ে না। আদনান সোফায় বসে অরিতাকে উরুর ওপর বসিয়েছে। খেলছে ‘ঘোড়া-ঘোড়া’।
“ঠক ঠক ঠক, অরিতা ঘোড়ায় উঠেছে… ঘোড়াআআ!”
অরিতে খরল্লা দিয়ে হেসে উঠল। সে আদনানের সাথে এই খেলাটা বেশ উপভোগ করে। আদনান আবার ঝাঁকালো,
“হুস ঘোড়া চল, চল… আহ! এতা কী হলো? ঘোড়া আমার কথা শুনছে না কেন? এই ঘোড়া চল, রাজকন্যাকে নিয়ে চল প্রাসাদে..”
বলতে বলতে পা নাচাতে লাগল সে। অরিতা খিকখিক করে গলা ভেঙে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে মুখ গলিয়ে লালা ঝরছে। আদনান নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে লালাটা মুছে আবার আগের মতো পা নাচাতে লাগল। আহিয়া পাশেই বসে। দৃশ্যটা দেখে হালকা হাসছে। আদনানের মেয়ে বাবুদের প্রতি আগ্রহ আহিয়াকে দিয়েই শুরু হয়েছে। সেটা এখন আহিয়া বুঝল, অরিতার প্রতি আদনানের দুর্বলতা দেখে। রিদিতা বাচ্চাদের খাবার রেডি করতে করতে আড়চোখে বারবার ওদের দিকে তাকাচ্ছে। আমজাদ মীর কোলে আব্রাহামকে নিয়ে আদর করছেন। আফরোজা শেখ পাশে বসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল দেখছেন, তবুও মাঝেমাঝে নাতি-নাতনীর দিকে তাকাতে ভুলছেন না। হালিমা বেগম আর বানি রাতের খাবারের টেবিল গুছাচ্ছে। রিতু সহযোগিতা করছে। আদিবা পাশে বসে ড্রইং করছে, আহিয়া মাঝে মাঝে তাকে সাহায্য করছে। আসফাক মীর সিরিয়াস আর কোকোর সাথে খেলছে। শারমিন সবার সঙ্গে এই মুহূর্তগুলো উপভোগ করছেন। জার্মানিতে থাকার কারণে এসব আনন্দ থেকে তিনি অনেকটাই বঞ্চিত থাকেন। তাই যখনই আসেন, একেবারে উসুল করে নেন। রিদিতা এক গ্লাস পানি আমজাদ মীরের দিকে বাড়িয়ে দিল,
“বাবা, আপনার খাবার আগের ওষুধটা খেয়ে নিন। আব্রকে আমার কাছে দিন।”
বলেই ছেলের দিকে হাত বাড়াল।
“আসো বাবা, মাম্মার কাছে আসো।”
কিন্তু ছেলেটা মুখ ঘুরিয়ে দাদার বুকের সঙ্গে আরও শক্ত করে লেপ্টে রইল। সে বুঝে গেছে মা এখন খাবার খাওয়াবে। এতটুকু ছেলে, অথচ বুদ্ধিতে একেবারে সেরা। বুকের দুধ ছাড়া অন্য কিছু খাওয়ানোর সময় দুটো বাচ্চাই নাক সিটকায়। এখন ছয় মাস শেষ, তাই একটু একটু করে বাড়তি খাবার দিতে চায় রিদিতা। কিন্তু তারা খেতেই চায় না। কয়েকবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো সে। ছেলেটা বারবার মাথা ঘুরিয়ে নিচ্ছে। আফরোজা শেখ হালকা হেসে বললেন,
“তুমি আমার কাছে দিয়ে যাও। আমি খাইয়ে দিচ্ছি।”
আমজাদ মীরও সায় দিলেন,
“ঠিক আছে, তোমার আম্মা খাইয়ে দিবে। তুমি যাও মা।”
“রিদি, তোর ফোন! ঈশানী আপু কল দিছে।”
আহিয়ার ডাকে রিদিতা বাচ্চাদের দিকে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে ফোন রিসিভ করল। কথা বলতে বলতে একটু সরে এল।
“মাহি কেমন আছে বুবু? ওর জ্বর কমছে?”
ওপাশ থেকে ঈশানীর কণ্ঠ ভেসে এল,
“না রে, আরও বেড়ে গেছে। তোর ভাইয়া বলল সকালে হাসপাতালে নিয়ে যাবে। হুট করে জ্বর আসছে, আর কমছেই না। আব্র আর অরিতা কী করে? কেমন আছে?”
“কী আর করবে? বাপের মতো খালি ত্যাড়ামি করে। এই বয়সেই ত্যাড়ামি শিখছে। মুখে খাবারই দেওয়া যায় না।”
ঈশানী হেসে উঠল। তার বোনটা বাচ্চা দুটো নিয়ে ভালোই হিমশিম খায়।
“একদম তোর মতো হয়েছে। তুইও খাবার খাওয়ার সময় চৌদ্দবার মাথা ঘুরাইতি।”
রিদিতা কিছু বলল না। শুধু কপাল গুছিয়ে ছেলে-মেয়ের দিকে তাকাল। হঠাৎ ঈশানী বলল, “ওহ! আজ তো তোর জন্মদিন ছিল। আমি তো উইশ করতেই ভুলে গেছি।”
রিদিতার নিজেরও তো মনে ছিল না।
“সমস্যা নাই। আমি তো নিজেও ভুলে গেছি।”
“কেন? আহাদ রাজা তোকে উইশ করে নাই?”
মনের ভেতরটা ভারী হয়ে গেল রিদিতার। আহাদ রাজা তো সত্যিই উইশ করেনি। সে ভুলে গেলে কী হবে, আহাদ রাজা কীভাবে ভুলতে পারল? তবুও বোনকে বুঝতে দিল না।
“আজকে ওর বড় মিটিং ছিল। তাই একটু ব্যস্ত। হয়তো সময় পায় নাই।”
ঈশানী বুঝে গেল নিশ্চয়ই আহাদ রাজা কোনো প্ল্যান করছে। নয়তো রিদিতার জন্মদিন ভুলে যাওয়ার মতো বোকামি সে করবে না।
“থাক, মন খারাপ করিস না। সময় করে একটু আসিস। মাহি তো আব্র আর অরিতাকে দেখলে অর্ধেক সুস্থ হয়ে যাবে।”
“আচ্ছা। আহাদ রাজা যদি অনুমতি দেয়, কালই যাব। উনার তো আবার আদি যুগের হিটলার বাপ-দাদাদের মতো বাপের বাড়ি যাওয়া নিয়ে সমস্যা।”
ঠিক তখনই মূল দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকল আহাদ।
রিদিতা বোনের থেকে বিদায় নিয়ে ফোন রেখে দিল। আহাদ তার দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপে ইশারা করল। কিন্তু সে মুখ গম্ভীর করে হালিমা বেগমের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। আহাদ বুঝে গেল, প্রেয়সী ঘোর অভিমান করেছে। সে করুক। মানিয়ে নিতে তার সময় লাগবে না। কিন্তু তাই বলে এমন অবহেলা?
ঠিক তখনই,
“পা… প্পা! পা পা… পা প্পা!”
ছেলের আধো বুলি ডাকেই ঘোর কাটল আহাদের। তাকে দেখামাত্রই আব্র আর অরিতা হাত-পা ছড়িয়ে উচ্ছ্বাসে লাফাতে লাগল। আহাদ এক গাল হেসে এগিয়ে গিয়ে দুজনকেই কোলে তুলে নিল। পরপর তাদের গালে হামি দিতে লাগল। দুজনেই বাবার বুকের সঙ্গে একেবারে লেপ্টে গেছে। সারাদিন পর এই আশ্রয়টা যে কতটা দরকার ছিল!
বাচ্চাদের কোলে নিয়েই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে ডেকে উঠল আহাদ,
“রিদি, উপরে আসো।”
আজ দ্বিতীয়বার ডাকতে হয়নি তাকে। আহাদের সাথে পা মিলিয়ে উপরে উঠে এল। দরজার সামনে এসে আহাদ থামল। চোখের কোণে তাকাল প্রেয়সীর দিকে। রিদিতার গাল ফুলে আছে এখনো, ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে রাখা। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, অভিমান এখনো কাটেনি। আহাদ ইচ্ছে করেই হালকা মেজাজে প্রশ্ন করল,
“কী হয়েছে? পটকা মাছের মতো হাউপ করে আছো কেন?”
এই একটুখানি কথাতেই রিদিতার ভিতরে জমে থাকা আবেগের বাঁধ ভেঙে গেল। কণ্ঠে জমে থাকা ক্ষোভ বেরিয়ে এল একসাথে।
“আপনি খুব খারাপ! আমি আপনার সাথে থাকবো না। আব্বুকে বলবো, আমাকে এসে যেন নিয়ে যায়!”
মুহূর্তেই আহাদের মেজাজ তুঙ্গে উঠে গেল। চোখ লালচে হয়ে উঠল, কণ্ঠে নেমে এল পরিচিত কর্কশতা।
“থাপ্পড়ায়া চেহারার নকশা পাল্টায়া দিবো, বজ্জাত বেডি! সাহস কী করে হলো এই কথা বলার? কিছু বলছি না বলে দিনদিন সাহস বেড়ে যাচ্ছে, না?”
রিদিতা আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। ফুঁসতে ফুঁসতে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে গেল। তখনই আহাদ টের পেল, বাচ্চা দুটো তার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। বাবার গলার স্বর, মুখের কঠোরতা পুরোপুরি বুঝতে চেষ্টা করছে হয়তো। মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিল সে। মুখে কৃত্রিম একটা হাসি টেনে আনল। এত চেষ্টা করেও সন্তানদের সামনে রাগটা লুকিয়ে রাখতে, কিন্তু এই আল্লাহর বান্দিটা আর হতে দেয় কই!
রিদিতা ভিতরে পা রাখতেই থমকে গেল। পুরো ঘর জুড়ে মৃদু আলোয় টিমটিম করে জ্বলছে অসংখ্য হলদেটে ক্যান্ডেল। চারপাশে উষ্ণ, নরম এক আবহ। মেঝেতে লাল গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে তৈরি করা পথ, সোজা শয্যা পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে। লাল বেলুনে ভরে আছে পুরো ঘর। এক মুহূর্তেই তার সমস্ত রাগ, অভিমান; সব মিলিয়ে গেল রাতের কুয়াশার মতো। ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল আহাদের দিকে। চোখে বিস্ময়, কণ্ঠে অবিশ্বাস।
“আপনার মনে ছিল… আজ আমার বার্থডে?”
আহাদ ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি খেলিয়ে বলল,
“ভুলে যাওয়ার মতো কোনো কারণ তো দেখছি না।”
“এসব কখন করলেন?”
রিদিতার গলা কাঁপছে। আহাদ বাচ্চাদের বেবি কটে শুইয়ে রাখতে রাখতে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
“বলাটা খুব জরুরি?”
“উহুম।”
রিদিতা মাথা নাড়ল। আহাদ ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। খুব কাছে। এতটাই কাছে যে তার চিবুক রিদিতার ললাট ছুঁই ছুঁই করছে। আচমকাই কণ্ঠের সুর বদলে গেল।
“রিদি!”
“হুম…”
“একটা আবদার রাখবে?”
“কি?”
“আজকে আমার জন্য একটু লাল শাড়ি পরবে? অনেকদিন শাড়িতে দেখি না তোমায়। পরবে?”
রিদিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সত্যিই তো, অনেকদিন শাড়ি পরা হয় না। মা হওয়ার পর থেকে সময় কোথায়? এমনিতেই শাড়ি সামলানো তার জন্য কঠিন। এখন তো দুটো ছানা, ওদের নিয়ে শাড়ি পরা প্রায় অসম্ভব। আহাদ নরম স্বরে আবার বলল।
“কি হলো? পরবে?”
ভাবনার সুতো কেটে গেল রিদিতার। ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
“হুম… পরবো।”
আহাদের চোখ মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে দ্রুত আলমারির কাছে গিয়ে অতি যত্নে তুলে রাখা সেই লাল ঝলমলে শাড়িটা বের করে প্রেয়সীর হাতে তুলে দিল।
শাড়িটা চিনতে রিদিতার সময় লাগল না। এই শাড়ি পরেই তো সে প্রথম ছবি পাঠিয়েছিল আহাদ রাজাকে। যে ছবিটা এখনো তার ফোনের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করে ভেসে ওঠে।
রিদিতা শাড়িটা নিয়ে ড্রেসিংরুমে ঢুকে গেল। আহাদ এবার ঘুরে বাচ্চাদের কাছে গিয়ে বসল।
“পাপা! পা… পা!”
আনন্দে গলা ভেঙে ডাকল সে,
“আমার রাজকন্যা কোথায়? আমার আব্র বাবা কোথায়? তারা কী মাম্মাম আর পাপার রোমান্স দেখছে? ছি! লজ্জা! চোখ বন্ধ করো।”
ছোট পাখির মতো দুজনেই ডানা ঝাপটানোর ভঙ্গিতে হাত-পা ছুড়তে লাগল। আহাদ কোলে নিতেই দুজন বাবার বুকের সঙ্গে মাথা ঠেকিয়ে উষ্ণতা খুঁজল। সে ধীরে ধীরে ঘরজুড়ে পায়চারি করতে লাগল। বাবার বুকের ছন্দে, নিরাপদ উষ্ণতায়, কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজন ঘুমিয়ে পড়ল। আহাদ একজন একজন করে পরম যত্নে বেবি কটে শুইয়ে দিল। কমফোর্ট টেনে দিল ঠিকঠাক করে। তারপর দুজনেরই গালে, কপালে পরপর কয়েকটা টুপটাপ চুমু খেল। ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এল পরিচিত, মিষ্টি, সেই কণ্ঠ,
“মন্ত্রীমশাই!”
আহাদ ঘুরে তাকাল। রিদিতা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। লাল শাড়ির আঁচলটা এলোমেলো হয়ে জড়িয়ে গেছে। কপালের কাছে কয়েক গোছা চুল বেরিয়ে এসেছে, চোখে-মুখে একধরনের লাজুক অস্থিরতা। সে ঠোঁটজোড়া ফুলিয়ে অভিমানের সুরে বলল,
“শাড়ির কুচিগুলো একটু ঠিক করে দিবেন! আমি পারছি না।”
এই দৃশ্যটা দেখেই আহাদ দমকা হেসে উঠল। দু’দুটো সন্তানের মা হয়ে গেছে, অথচ এখনো শাড়ির কুচি সামলাতে পারে না। এই অবোধত্বটাই তাকে বারবার নতুন করে প্রেমে ফেলায়। সে এগিয়ে এসে রিদিতার সামনে হাটুমুড়ে বসল। যেন কোনো পবিত্র কাজ করতে বসেছে। মনোযোগ দিয়ে একে একে কুচিগুলো ঠিক করল। প্রতিটা ভাঁজে যত্ন, প্রতিটা টানে সাবধানতা। তারপর আঁচলটা আলতো করে কাঁধে তুলে দিল। পকেট থেকে বের করল লাল গোলাপের গাজরা। খুব যত্নে রিদিতার চুলের ভাঁজে গুঁজে দিল সেটা। এখন একদম পারফেক্ট। রিদিতার রুপ মুহূর্তেই বদলে গেল। একজন পরিণিতা প্রেয়সী। লাল শাড়িতে, নরম আলোয়; লাজে রাঙা মুখে একদম মোহময়। আহাদ তাকিয়ে রইল। চোখ সরাতে পারছে না। কিন্তু রিদিতা লজ্জার ভারে চিবুক নামিয়ে রেখেছে। চোখ তুলে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না। আহাদ আলতো করে তার চিবুক তুলল। কণ্ঠ নামিয়ে আনল গাঢ় খাদে,
“এই আল্লাহর বান্দি এই! তাকাও আমার দিকে।”
রিদিতা তাকাল। চোখে চোখ মিলল। গাঢ় বাদামি, ঘন পাপড়িতে ঢাকা সেই চোখ, যে চোখে তাকালে বুকের ভিতর কেমন যেন দুলুনি লাগে। সেই চোখ, যেটা রিদিতাকে প্রথম দিন থেকেই অদ্ভুতভাবে টেনেছে। সে বেশিক্ষণ সেই ধারাল দৃষ্টির ভার নিতে পারল না। চোখ নামিয়ে নিল আবার। আহাদ প্রশ্ন করল,
“সমস্যা কী তোমার?”
রিদিতার কণ্ঠে নিষ্পাপত্ব, “কী করেছি আমি?”
“কথায় কথায় আমাকে ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দাও কেন?
জানের ভয় নাই?”
“ভুল হয়ে গেছে। আর বলবো না।”
আহাদ নিষ্পলক তাকিয়ে রইল প্রেয়সীর মুখের দিকে। ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি। তারপর হঠাৎ বলল, “কান ধরো।”
রিদিতা চমকে উঠল, “এ্যাহ!”
“এ্যাহ না। হ্যাঁ। ভুল যখন করেছেন এর শাস্তি তো পেতেই হবে রিদি রানি। কান ধরে বিশবার উঠবস করো।”
চোখ বড় বড় করে তাকায় সে, “এখন?”
“হু। এখনই।”
রিদিতা ঠোঁটজোড়া ফুলিয়ে বলল,
“আজকের দিনেও আপনি আমাকে কান ধরাবেন?”
আহাদ চারপাশে একবার চোখ বুলাল। বেবি কটের দিকে তাকাল। ঘুমন্ত দুই ছানা। তারপর গম্ভীর ভান করে বলল,
“ঠিক আছে। আজকে মাফ করে দিলাম। কাল সকালে বিশ বিশ, চল্লিশবার কান ধরে উঠবস করবে।”
“আপনি এত খারাপ কেন?”
কণ্ঠে আদুরে অভিযোগ। আহাদ হেসে ফেলল। সেই আহ্লাদী কণ্ঠে সে কখনো রাগ করতে পারে না। এক হেঁচকা টানে প্রেয়সীকে নিজের বুকস্থলে টেনে নিল। গলা নেশায় ভিজে গেল।
“বেশি খারাপ?”
“না, না। ভালো।”
“বেশি ভালো?”
“হুম।”
আহাদ সম্মহীন হাসল।
“আমার এত ভালো পোষায় না, জানু। আমি খারাপ হতে চাই। অনেক বেশি খারাপ হতে চাই।”
কণ্ঠ আরো নিচে নামাল,
“আজকে কি একটু খারাপ হতে দিবে?”
রিদিতার গাল লজ্জায় লালচে হয়ে উঠল। সে কিছু বলল না। শুধু নিজের মন্ত্রীমশাইয়ের বুকে মুখ লুকিয়ে নিল। এই আশ্রয়টা রিদিতার ভীষণ পছন্দের, ভীষণ শান্তির। এমন শান্তির জায়গা কয়জনের মেলে? যেমন সব থেকে বড় উদাহরণই আনিকা! সে প্রতিনিয়ত নিস্বঙ্গতায় ভুগছে। ভেতর থেকে নিশ্বেষ হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। সবারই একটা সঙ্গী হলো, শুধু বিয়ে পাগল আনিকারই আর বিয়ে করা হলো না। সাজানো একটা সংসারের স্বপ্ন পূরন হলো না। তিনটা সন্তান জন্ম দেয়ার স্বাদ অপূর্ণই রয়ে গেল। ভারী নিশ্বাষ ফেলে রিদিতা আবারো নাক ঘঁষল আহাদের বুকে এই নিরব সম্মতিটাই আহাদের জন্য যথেষ্ট। কয়েকবার নিঃশ্বাস ফেলল সে। নেশা বাড়ছে। বেশামাল আহাদ রাজা আরো বেশামাল হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি সামলাতে রিদিতা হঠাৎ প্রশ্ন করল,
“ভালোবাসেন আমাকে?”
আহাদ তখন নিজের কাজে ব্যস্ত। তবুও চেনা ভঙ্গিতে উত্তর দিল, “উহুম।”
রিদিতা বেড়ালের মতো গুটিশুটি হয়ে বুকের সাথে লেপ্টে রইল। চুপচাপ আদর খেয়ে যাচ্ছে। আহাদ ভাবল, হয়তো আবার অভিমান করেছে। সে প্রেয়সীর মাথা নিজের বুক থেকে তুলে নিজের দিকে তাক করাল। দু’হাত আলতো করে প্রেয়সীর গালে রেখে, চোখে চোখ রেখে অদ্ভুত এক নেশাময় স্বরে বলল,
লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৬৩
“তুমি প্রেয়সী, তুমি শ্রেয়সী,
বলো কোন রূপে তোমায় ভালোবাসি।
যে রূপেই থাকো, সে রূপেই মরি,
প্রেয়সী, তুমি যে বড়ই সর্বনাশী।”
সমাপ্ত
