দাহশয্যা পর্ব ৬৫
Raiha Zubair Ripti
সকালবেলা ইস্তানবুল শহরটা জেগে ওঠে বসফরাস নদীর কোল ঘেঁষে। এক শহর, অথচ দুই মহাদেশকে জুড়ে রেখেছে সে। এই শহরের নাম এক সময় ছিলো কনস্টান্টিনোপল, আবার আজকের দিনে তার নাম ইস্তানবুল।
এই শহরের প্রতিটি ইট-পাথর ইতিহাসের সাক্ষী রোমান, বাইজেন্টাইন আর অটোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী একসাথে হয়েছে যে শহর, তার রূপ আর কোথাও পাওয়া যায় না।
সোলেমানরা MY TERRACE Cafe & Restaurant এ সকালের নাস্তা করে দ্বিতীয় দিনের ভ্রমণ শুরু করে। ভ্রমণ শুরু হয় হায়া সোফিয়া থেকে। খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৭ সালে বাইজেন্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ান প্রথম নির্মান করে।
হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি ছিল খ্রিস্টান বিশ্বের সবচেয়ে বড় গির্জা। এখানে সম্রাটদের অভিষেক হতো, রোমান সাম্রাজ্যের শক্তি প্রদর্শিত হতো।
কিন্তু ১৪৫৩ সালে ইতিহাস বদলে যায়। সুলতান মুহাম্মদ ফতেহ অটোমান বাহিনী নিয়ে কনস্টান্টিনোপল জয় করেন। তিনি শহরে প্রবেশ করেই হায়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরিত করেন। এর ভেতরে আরবি ক্যালিগ্রাফি যুক্ত হয়, মিনার তৈরি হয়, কিন্তু বাইজেন্টাইন মোজাইকগুলো থেকেই যায়।
হায়া সোফিয়া মসজিদের ভেতরে দাঁড়ালে একসাথে দেখতে পাওয়া যাবে —দেয়ালে খ্রিস্টের প্রতিমা। আর সাথে বিশাল ক্যালিগ্রাফিতে লেখা “আল্লাহু আকবর”।
একই ছাদের নিচে দুই ধর্ম, দুই সভ্যতা হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম টা আর কোথাও নেই।
তার কয়েক কদম হেঁটেই সামনে আসে নীল মসজিদ। নির্মাতা সুলতান আহমেদ প্রথমের বয়স তখন মাত্র ১৯। তিনি চেয়েছিলেন অটোমান শক্তি, ধর্মীয় মহিমা আর সৌন্দর্যের এক প্রতীক গড়ে তুলতে। ১৬১৬ সালে তৈরি হয় মসজিদটি। এর বিশেষত্ব ছয়টি মিনার। তখন মক্কার কাবায়ও ছয় মিনার ছিল। সমালোচনার মুখে সুলতান পরে মক্কায় আরেকটি মিনার যোগ করেন, যাতে আলাদা মর্যাদা থাকে।
ভেতরে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে প্রায় ২০,০০০ নীল টাইলস। সকালের আলো যখন জানালা দিয়ে ভেতরে ঢোকে, পুরো হলঘরটা নীলাভ আলোয় ভেসে যায়।
এখানে নামাজ পড়তে বসলে মনে হয় আকাশের নিচে বসে আছো, আর নীল সমুদ্র তোমাকে ঘিরে রেখেছে।
দুপুরের দিকে তারা আসে টপকাপি প্যালেসে। ১৪৬৫ সালে সুলতান মুহাম্মদ ফতেহ এটি নির্মাণ করেন। প্রায় ৪০০ বছর ধরে অটোমান সুলতানরা এখান থেকেই সাম্রাজ্য চালিয়েছেন।
প্রাসাদের ভেতরে ঢুকলেই চারটি প্রাঙ্গণ একে একে দেখা যায়
হেরেম সেকশন,যেখানে সুলতানের স্ত্রী, সন্তান আর দাসীরা থাকতেন। রাজনীতির অনেক সিদ্ধান্ত এখানেই গোপনে নির্ধারিত হতো।
ইম্পেরিয়াল ট্রেজারি, বিখ্যাত টপকাপি ড্যাগার আর ঝলমলে রত্নখচিত মুকুট এখানেই।
রেলিক্স রুম, ইসলামি বিশ্বের পবিত্র নিদর্শন,প্রিয় নবী (সা.)-এর চাদর, দাড়ির চুল, সাহাবিদের তরবারি সংরক্ষিত আছে।
রাজকীয় বারান্দা,এখানে দাঁড়ালে বসফরাস নদী দেখা যায়। মেহরিন নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে দেখলো সেই নদী।
সূর্য যখন ডুবতে থাকে, তাদের যাত্রা হয় গালাটা টাওয়ারে। ১৩৪৮ সালে জেনোইসরা ইতালীয় ব্যবসায়ী এটি নির্মাণ করেছিল।
শহর রক্ষার জন্য টাওয়ারটি ব্যবহার হতো। পরে অটোমান যুগে এটি কারাগার, অগ্নি-প্রহরা টাওয়ার, এমনকি এক পর্যায়ে পরীক্ষামূলক উড়ান কেন্দ্রও ছিল।
একবার হাজির চেলেবি নামের এক ব্যক্তি এখান থেকে পাখার সাহায্যে বসফরাস নদী পার হয়ে গ্লাইড করেছিলেন,যা আজও কিংবদন্তি।
সেখান থেকে তারা গেলো Kubbe Rooftop এ
আজকের মতো শেষ গন্তব্য। এখানে বসে পুরো শহরকে একসাথে চোখে পাওয়া যায়—সামনে হায়া সোফিয়া আর নীল মসজিদ আলোয় ভাসছে। নিচে গালাটা ব্রিজ, তার ওপর দিয়ে গাড়ি আর ট্রাম চলছেই। দূরে বসফরাসে জাহাজ যাচ্ছে। চারপাশে সীগাল পাখি উড়ছে। মেহরিন শেষ প্রান্তে গিয়ে দাঁড়ালো। মাথার উপর সীগাল পাখি উড়ছে। কি সুন্দর! সোলেমান ছবি তুলতে ভুললো না মেহরিনের। প্রতিটি জায়গায় সে ছবি তুলেছে মেহরিনের। মাঝেমধ্যে কাপল ছবিও তুলেছে। তবে মেহরিনের আলাদা ছবিই বেশি তুলেছে।
ডক্টর অয়ন ঠেলেঠুলে এবার সোলেমান কে মেহরিনের পাশে দাঁড় করালো। নিজের ক্যামেরাটা বের করে দু’জনের ছবি তুলে দিলো। অ্যালিজা বিভিন্ন পোস শিখিয়ে দিচ্ছে মেহরিন কে। মেহরিন এক হাত সোলেমানের কাঁধে রাখলো। সোলেমান মেহরিনের কোমর চেপে ধরে নিজের কাছে টেনে আনলো। অয়ন ছবি তুললো। সোলেমান মেহরিনের কপালে চুমু খেলো।
অয়ন ভারাক্রান্ত মন নিয়ে এটারও ছবি তুললো।
এবার অ্যালিজা আর লুকা আসলো ছবি তুলতে। অ্যালিজা তার এক পা লুকার হাতে ধরিয়ে দিয়ে লুকাকে জড়িয়ে ধরলো।
অ্যালিজার এমন পোস দেখে মেহরিন হাসতে হাসতে কুটিকুটি হয়ে গেলো। সোলেমান টেনে অন্যপাশে নিয়ে গেলো। অয়ন হতাশ হচ্ছে। অ্যালিজা তাকে খাটিয়ে মারছে। বেচারা লুকার জন্য তার কষ্টই হয়। কিভাবে সামলায় এই খাটাশ বউ? ছবি তুলেই শান্ত হয় নি। এখন নাকি ভিডিও করে দিতে হবে। অয়ন করে দিলো ভিডিও। ভিডিও করা শেষে তারা সেখানে একেবারে রাতের ডিনার করে বাড়ির দিকে রওনা হলো।
সারাটাদিন হাঁটাহাটি করে মেহরিনের পা ব্যথা হয়ে গেছে। ঠিকমতো হাঁটতে পারছে না। আজও উঁচু জুতা পড়েছে তবে সেদিনের মতন তেমন উঁচু না। হাঁটার মাঝখানে বারবার দাঁড়িয়ে যাচ্ছিলো মেহরিন। সোলেমান সেটা বুঝে বলল-
“ কি সমস্যা হচ্ছে তোমার? ”
মেহরিন বলল-
“ হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। ”
সোলেমান পায়ের দিকে তাকালো। হিল পড়েছে।
“ পড়তে মানা করেছিলাম না? শুনো নি তো। দেখি খুলো। ”
সোলেমান মেহরিনের জুতা খুলে দিলো।
“ খালি পায়ে হাঁটবো এখন আমি রাস্তায়? ”
সোলেমান নিজের জুতা দেখিয়ে বলল-
“ আমার জুতা তো বড় হবে তোমার পায়ে। হাঁটতে পারবে না। ”
মেহরিন খালি পায়েই হাঁটতে শুরু করলো। সোলেমানের হাতে মেহরিনের জুতা। খালি পায়ে হাঁটতে গিয়ে রস্তার ইট পাথরের ঘষা লাগছে । সোলেমান এগিয়ে এসে বলল-
“ হেই হোল্ড মাই নেক। ”
কথাটা শেষ করেই এক হাতে করে মেহরিন কে পাঁজা কোলে তুলে নিলো। মেহরিন ভয় পেয়ে সোলেমানের গলা জড়িয়ে ধরলো।
পেছন থেকে অ্যালিজা লাফিয়ে উঠলো। অয়নের ক্যামেরা অন ছিলো আগে থেকেই। পুরো দৃশ্য টা ভিডিও হয়ে গেছে। অ্যালিজা লুকার দিকে তাকাতেই লুকা বলল-
“ একদম না। আমি পারবো না কোলে নিতে। তাকিয়ে লাভ নেই। ”
রাস্তার সব লোক যাওয়ার পথে বারবার দেখছে মেহরিন আর সোলেমান কে।
“ লোকজন দেখছে সুলতান সাহেব। নামান আমাকে। ”
সোলেমান দৃষ্টি সোজা রেখে বলল-
“ আই ডোন্ট কেয়ার। তুমি শক্ত করে জড়িয়ে ধরো। ”
বাংলাদেশে আজ প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। শুধু বৃষ্টি হচ্ছে বললে ভুল হবে। একপ্রকার প্রলয়কারী ঝড় হচ্ছে। রাস্তায় গাছ ভেঙে পড়ে রাস্তা ব্লক হয়ে আছে।
ইয়াসিন আর ইমন শেরেবাংলা মেডিকেলের সামনে জ্যামে আঁটকে আছে। রাত বাজে সাড়ে ১২ টা। এই রাস্তা কখন ঠিক হবে আর তারা কখন ফিরবে বাসায়? ঊর্মিটাও তো একা আছে।
ইব্রাহিম ইমন দের ফিরতে দেরি হচ্ছে বলে ফোন করলো। আর ফোন করতেই জানতে পারলো রাস্তায় গাছ ভেঙে পড়েছে। ঝড়ের জন্য লোকজন ও আসতেছে না গাছ সরাতে।
ইব্রাহিম তাদের মেডিকেলের ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নিতে বলল। ঝড় না থামলে লোক আসবে না রাস্তা পরিষ্কার করতে। ইমন তাই করলো। ঊর্মি কে ফোন করে বলল তার ফিরতে সকাল ও হতে পারে। সে যেন খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
ঊর্মি জেগে ছিলো ভাইয়ের জন্য। এখনও খাবার টাও খায় নি। ইব্রাহিম খাবার নিয়ে আসলো। মেডিসিন তো খেতে হবে।
ঊর্মি ইব্রাহিম কে খাবার নিয়ে আসতে দেখে চমকালো। ইব্রাহিম ভ্রু কুঁচকালো। আশ্চর্য চমকানোর কি আছে তাকে দেখে?
ইব্রাহিম পাশে বসে বলল-
“ খাবার খেতে হবে। ঔষধ আছে। ”
ঊর্মি কাঁথা টেনে শুয়ে বলল-
“ ইচ্ছে করছে না। খাব না। ”
ইব্রাহিম টেনে কাঁথা সরিয়ে দিয়ে বলল-
“ উঠো। খাবার খেতেই হবে। তোমার ভাইয়া বলছে খেতে। আর আমিও খাই নি। ক্ষুধা লেগেছে। ”
“ আপনি খান নি কেনো? সমস্যা কি আপনার? ”
“ তুমি আমার সমস্যা। খাচ্ছো না কেনো? তোমার আমার দু’জনের জন্যই নিয়ে এসেছি খাবার। ”
“ ক্ষুধা নেই আমার। ”
“ তোমার ভাইকে ফোন দিয়ে বলবো? ঝড় মাথায় নিয়েই কিন্তু চলে আসবে। ভালো লাগবে? বাহিরের অবস্থা ভালো না কিন্তু। ”
ঊর্মি উঠে বসলো।
“ খাইয়ে দিব? ”
ঊর্মি ছোট্ট করে বলল-
“ দিন। ”
ইব্রাহিম যত্ন করে খাইয়ে দিলো ঊর্মি কে। সাথে নিজেও খেলো। ঊর্মির এঁটো মুখ ধুইয়ে দিলো।
বাহিরে এখনও বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বাজ পড়ছে। এসব দেখে ইব্রাহিম জিজ্ঞেস করলো-
“ চলে গেলে ভয় পাবে না তো? ”
“ না। ”
ইব্রাহিম তপ্ত শ্বাস ফেলে চলে যাচ্ছিলো দরজাটা চাপিয়ে। এমন সময় খুব জোরে শব্দ করে বিদ্যুৎ চমকাতেই ঊর্মি চেঁচিয়ে উঠলো। ইব্রাহিম দৌড়ে আসলো। দু হাত কানে চেপে আছে ঊর্মি। আকস্মিক এত জোরে করে চমকানোতে ঊর্মি বুঝতে পারে নি।
ইব্রাহিম হন্তদন্ত হয়ে এসে জড়িয়ে ধরে বলল-
“ খুব ভয় পেয়েছো? বেশি পাকনামি করো তাই না? খুব তো বললে চলে যেতে। এখন চেঁচাচ্ছ কেনো? বে’য়াদব মেয়ে একটা। ”
ঊর্মির শরীর কাপছে ভয়ে। দু হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো ইব্রাহিম কে। ইব্রাহিমের বুকের কাঁপুনি স্পষ্ট গুনতে পারছে ঊর্মি। সমস্ত শরীরের ভর ছেড়ে দিলো ঊর্মি ইব্রাহিমের উপর। ইব্রাহিম ঊর্মির মুখের উপর আসা চুল গুলো সরিয়ে দিলো। চোখ বুঝে আছে।
“ এখনও ভয় করছে? ”
“ উঁহু। ”
“ আমাকে শান্তি দিচ্ছ না তুমি ঊর্মি। আমি তোমার স্বামী। দূর দূর করো কেনো? ভালোবাসো না? ”
ঊর্মি ইব্রাহিমের শার্টের বোতামের উপর হাত রেখে বলল-
“ পাশা..”
“ হুমম বলো। ”
“ ভালো বাসি আপনাকে। কিন্তু আমি যে আমার পরিবার কে ঠকালাম। এই গ্লানি আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কবে ঘুচাবেন আমার এই গ্লানি? অপরাধী মনে হয় নিজেকে সারাক্ষণ। ”
“ লক্ষীটি, তুমি চাইলে আজই আমি বলে দিতে পারি। বলবো? ”
“ না না ভাইয়ার রাগ আমি কিভাবে সামলাবো? ভাইয়ার রাগ সামলানোর ক্ষমতা আমার নেই। ”
কথাটা বলেই ইব্রাহিমের থেকে দূরে সরে গেলো ঊমি। বিদ্যুৎের ঝলকানিতে মাঝেমধ্যে ঊর্মির ফর্সা চিকন দেহটা স্পষ্ট হচ্ছে।
“ ঊর্মি। ”
“ হুমম। ”
“ খাওয়া দাওয়া ঠিকমতো করবে। মোটা হতে হবে তো। ”
“ খাই তো। ”
“ স্বাস্থ্য ভালো হচ্ছে না কেনো তাহলে? ”
“ জানি না। লোকে বলে স্বামীর বাড়ির ভাত খেলে বলে স্বাস্থ্য হয়। ”
“ খাচ্ছ তো এখন। তাহলে হচ্ছো না কেনো? ”
“ জানি না। ”
“ লোকে ভুল বলেছে। স্বামী বাড়ির ভাত না। স্বামীর আদর না পেলে নারীদের স্বাস্থ্য বাড়ে না। ইউ নিড ইমিডিয়েটলি স্বামীর আদর। ”
ঊর্মি কাঁথা টেনে বলল-
“ আপনি চলে যান। এক রুমে থাকাটা ঠিক হবে না। শয়তান ভর করবে। তখন অঘটন ঘটে যাবে। ”
ইব্রাহিম ঊর্মির পাশেই শুয়ে বলল-
“ কেয়ার করছি না। ভর করলে করবে,অঘটন ঘটলে ঘটবে। ”
ঊর্মি ইব্রাহিম কে ঠেলে বলল-
“ যান আপনার রুমে। ”
ইব্রাহিম গেলো না। ঊর্মিকে টেনে এনে মাথাটা বুকে চেপে ধরে বলল-
“ আমার এই জীবনে আপন বলতে,নিজের বলতে তুমি ছাড়া আর কেউ নেই ঊর্মি। খুব ছোট থাকতেই পরিবার হারিয়েছি। নিজের দেশ ছেড়ে এই অচেনা দেশে এসেছি সোলেমানের সাথে। পরিবার বলতে সোলেমানের পরিবার কেই চিনেছি। এখন আমার নিজের একটা পরিবার বলতে শুধুই তুমি। প্লিজ ছেড়ে যেও না। আমি ছেড়ে যাওয়ার শোক কেটে উঠতে পারবো না। অনেকে পারে, চোখের সামনে অনেক কেই দেখেছি। ওরা খুব স্ট্রং হৃদয়ের। নিজেদের সামলে নিয়েছে। কিন্তু আমার হৃদয় খুবই দূর্বল এসব বিষয়ে। আমার জীবনের প্রথম ও শেষ নারী হয়ে তুমিই থেকো ঊর্মি। ”
ঊর্মি গালে হাত রাখলো ইব্রাহিমের। ঊর্মি জানে তার বাবা মা নেই। বাবা ছাড়া থাকার কষ্ট ঊর্মি বেশ ভালোই জানে। অবশ্য তার মা আছে। কিন্তু ইব্রাহিমের কেউ নেই। তার বাবা মায়ের কি হয়েছে সে কথায় গেলো না ঊর্মি। আশ্বস্ত করে বলল-
“ যাব না কখনো। আপনি প্লিজ আমার হাত ছেড়ে দিয়েন না। ”
ইব্রাহিম ঊর্মির হাতে চুমু খেয়ে বলল-
“ জীবনেও যাব না। উল্টো তোমাকে নিজের করে রাখার জন্য দরকার পড়লে যুদ্ধে নামবো। একটুও কষ্ট পেতে দিব না। খুব ভালোবাসবো। ”
ঊর্মির কেনো জানি নিজেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুখী নারী মনে হতে লাগলো। যেমন টা মেহরিন বলতো। তেমনটাই আজ মনে হচ্ছে নিজেকে। স্বামী ভালো হলে সব মেয়েই নিজেকে শ্রেষ্ঠ সুখী নারী ভাবে।
ঊর্মি আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ইব্রাহিম কে। ইব্রাহিমের হাত চলে গেলো ঊর্মির উন্মুক্ত কোমরে। ঊর্মি শিউরে উঠলো।
মাহি বৃদ্ধাশ্রমে যাবে আজ বাশার সুলতান কে আনতে। শুধু শুধু নিজের ঘড় বাড়ি ছেড়ে লোকটা কেনো বৃদ্ধাশ্রমে থাকবে? তাও আবার তার জন্য!
হলুদ কালারের একটা চুড়িদার পড়ে রেডি হয়ে নিলো। এজওয়ান সোফায় বসে বসে দেখছে মাহি কে। মাহি চুল ঠিক করে সাইড ব্যাগটা নিতেই এজওয়ান বলল-
“ কোথায় যাবে তুমি সুইটহার্ট? ”
মাহি ব্যাগে ফোন ভরে বলল-
“ দেখি কোথায় যাওয়া যায়। ”
” সাফওয়ানের কাছে? ”
মাহি ভ্রু কুঁচকালো। কথায় কথায় শুধু সাফওয়ান আর সাফওয়ান।
“ হুমম। ”
এজওয়ান বসা থেকে উঠে আসলো।
“ কারন কি যাওয়ার? ”
“ এমনি সরুন। ”
মাহি বেরিয়ে গেলো। গাড়ির কাছে এসে দরজা খুলতে নিলে এজওয়ান এসে ড্রাইভিং সিটে বসলো। মাহি জিজ্ঞেস করলো-
“ আপনি আসলেন কেনো? যাবেন আমার সাথে?”
এজওয়ান গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বলল-
“ হ্যাঁ। ”
“ কেনো? ”
“ মন বলেছে আমার আজ সঙ্গে যাব তোর। মরবো আরাম করে আর বাঁচবো বড়জোর। আই মিন ক্যামেরাম্যান হবো আমি। পরকীয়া করতে যাচ্ছ তো। ”
মাহি বিরক্ত হয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। গাড়িটা সাফওয়ানের বাড়ির দিকে গেলে মাহি বলল-
“ আশ্চর্য ওদিকে যাচ্ছেন কেনো? ”
“ বাড়ি তো এদিকেই। ”
“ আমি বৃদ্ধাশ্রমে যাব। ওদিকে যান। ”
“ ফর হোয়াই? ”
“ আপনার বাবা কে আনতে। ”
এজওয়ান গাড়ি থামিয়ে দিলো।
“ বাট ড্যাডি তো বৃদ্ধাশ্রমে নেই। ”
মাহি চমকালো।
“ নেই মানে? ”
“ হুমম। বাবা তো অস্ট্রেলিয়া গেছে আজ সকালে।”
“ হোয়াট! ”
“ চমকাচ্ছ কেনো? ”
“ আমাকে বললেন না কেনো? ”
“ আমি নিজেই জেনেছি আজ সকালে। বাবা ফোন করে জানিয়েছিল। দুদিন পরই চলে আসবে। ”
“ কি জন্য গিয়েছেন? ”
“ ওখানে বিজনেসে কোনো একটা সমস্যা হচ্ছে। ভাইজান যেতে পারবে না। আমিও যেতে পারবো না। সেজন্য বাবা গেছে। ”
” বৃদ্ধ একটা লোক কে দিয়ে আপনারা এত খাটান কেনো? ”
“ কোথায় খাটালাম? উনি নিজ থেকেই খাটেন। আমাদের ও খাটান। আমরা খাটাই না। ”
“ সোলেমান সাহেব রা আসবে কবে দেশে? ”
এজওয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল-
“ হোয়াট সোলেমান সাহেব? ইউর ব্রাদার ইন-ল। ভাইয়া বলতে শিখো ম্যানার ছাড়া মেয়ে। ”
“ আসবে কবে? ”
“ দেরি আছে। মেবি ভাইজান একেবারে বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে ফিরবে। আমাদের যেই হারে ইগনোর করা শুরু করছে! ভাইজান ফিরলে আমিও তোমায় নিয়ে চলে যাব। ভাইজানের মতন লম্বার হানিমুন করে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ফিরবো। ”
“ আজাইরা প্যাচাল। বলেছি না আমি আপনার বাচ্চাকাচ্চা নিব না। ”
“ তুমি নিবা না? আমি ঢেলেই দিব। ”
“ গাড়ি ঘুরান বাসায় চলে যাব। ”
এজওয়ান গাড়ি স্টার্ট দিলো। কিছুদূর আসতেই এজওয়ানের পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো। এজওয়ান রিসিভ করে কানে নিতেই ওপাশ থেকে জানানো হলো- তরিকুল চৌধুরী কে অন্য জেলে শিফট করার সময় তিনি পালিয়ে গেছেন।
এজওয়ান আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলল-
“ হোয়াট! ”
মাহি এজওয়ানের এমন রিয়াকশন দেখে বলল-
দাহশয্যা পর্ব ৬৪
“ কি হয়েছে? ”
এজওয়ান ফোন কেটে বলল-
“ তরিকুলের বেটি তোমার বাপ,মানে আমার শ্বশুর মশাই জেল থেকে পালিয়ে গেছে….
