নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৭
আতিয়া আদিবা
প্রাসাদের সুবিশাল সিংহ-তোরণ পার হয়ে ঈশা খাঁ যখন অশ্বপৃষ্ঠে ময়দানে এলেন, তখন আকাশের পূর্ব দিগন্তে রক্তিম সূর্য সবেমাত্র তার তেজ বিকীরণ করতে শুরু করেছে। শিশিরসিক্ত দূর্বাঘাসের ডগায় ভোরের মিঠা রোদ চিকচিক করছিল।
বহু বৎসর পর ঘোড়ার রাশ হাতে নিয়েছেন জমিদার ঈশা খাঁ। তার সেই সুপরিচিত অশ্বারোহণের ময়দান, চারিদিকে উঁচু শাল-সেগুন বৃক্ষের নিবিড় বেষ্টনী, যা স্থানটিকে বাহিরের জগৎ থেকে এক নিবিড় বিচ্ছিন্নতা এনে দিয়েছে।
মাঠের এক প্রান্তে একটি প্রস্তর বেদি, আর অন্য প্রান্তে এক বিশাল তেঁতুল বৃক্ষ। যে বৃক্ষের নিচে দাঁড়িয়ে তিনি যৌবনকালে অগণিতবার তার প্রশিক্ষণ ঝালাই করে নিয়েছেন।
সকালের প্রাতরাশ তিনি তার বেগম নুরজাহান এবং একমাত্র কন্যা আয়েশার সাথে সেরে এসেছেন। সকালের কি সুন্দর শুভ সূচনা!
তাই হয়ত তার মুখে লেগে ছিল মৃদু হাসি। তবে সে হাসি মনের গভীরে জ্বলতে থাকা রুদ্ধ আগুন দমাতে পারে নি। দমাতে পারে নি প্রতিদ্বন্দ্বিতার বহ্নি।
জমিদার সিকান্দার গজনবী তাকে সরাসরি অশ্বদৌড়ের প্রচ্ছন্ন আহ্বান জানিয়েছেন। এ কোনো সামান্য প্রতিযোগিতা নয়। এ হলো দুই জমিদারের মধ্যকার ক্ষমতার অলিখিত সংঘাত, অহংকারের সংঘর্ষ। বাল্যকালের বন্ধুর প্রতি ঘটে যাওয়া অন্যায়, গজনবীর এস্টেটের উত্তরের আমবাগান আর সেই পারস্যের শামশির – পরিস্থিতি স্ব-বশে আনার প্রবল আকাঙ্ক্ষা বিরাজমান ঈশা খাঁ এর মাঝে।
তিনি মনে মনে কঠিন সংকল্প করেছেন। ওই আমবাগান আর শামশের, উভয়ই তার হবে। সিকান্দার গজনবীর এতবড় স্পর্ধা! তার দিকে বাজি ছুঁড়ে দেয়? এর ফল সে পাবে।
এককালে ঈশা খাঁ ছিলেন অশ্বচালনায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাঁর খ্যাতি ছিল বহু দূর বিস্তৃত। তার ঘোড়া ‘বাহাদুর’ কেবলমাত্র একটি পশু ছিল না।সেটি বহন করত তার প্রতাপের প্রতীক।
যদিও কালের প্রবাহে জমিদারি ও রাজনীতি তার এবং অশ্বের মাঝে ব্যবধান ডেকে এনেছে। ক্ষমতার নরম গদি তাকে করে তুলেছে আরামপ্রিয়। তবুও সেই বিলাসিতার আবরণ ভেঙে আজ আবার তিনি লাগাম ধরেছেন বেশ পোক্ত ভাবে।
বাহাদুর মারা গেছে কতকাল হয়ে গেছে! কৃষ্ণবর্ণের নতুন ঘোড়াটির গায়ে হাত বুলিয়ে ঈশা খাঁ বুকের মাঝে শূন্যতা অনুভব করলেন। বাহাদুর এবং তার স্মৃতি থেকে নিজের সরিয়ে আনা প্রয়োজন। ঈশা খাঁ ঘোড়ার পিঠে আলতো চাপ দিলেন। প্রথমে কিছুটা আলস্যে মাথা ঝাঁকাল। ঈশা খাঁ হাসলেন, তাঁর হাসিটা ছিল কিছুটা ক্রুর। তিনি রাশ সামান্য শক্ত করে ধরে বললেন,
– তুই আমার বাহাদুরের শূন্যতা পূরণ করতে পারবি না। তার স্থান কেবল আমার স্মৃতিতেই অম্লান রবে। কিন্তু আমি জানি, তুই এসেছিস আমার একমাত্র উদ্দেশ্য সাধনে। এই মুহূর্তে আমার চিত্তে একই আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে। আসন্ন পূর্ণিমার অশ্বদৌড়ে বিজয়।
তিনি অশ্বের দিকে সামান্য ঝুঁকে এলেন। তার কণ্ঠস্বর আরও দৃঢ় এবং তীক্ষ্ণ হলো,
– আমার প্রতিদ্বন্দ্বী সিকান্দার গজনবীর দম্ভ এবং আমার বাল্যকালের বন্ধুর সম্মান, উভয়কেই আমি পুনরুদ্ধার করব। এর জন্য আমার সর্বোচ্চ শক্তি চাই, আমার প্রতাপে আগুন চাই। তোর শিরায় শিরায় যে বেগ আছে, তা যেন অগ্নির মতো তীব্র হয়! তোর পশ্চাতে যেন ধ্বংসের ইঙ্গিত ভিন্ন আর কোনো চিহ্ন না থাকে! আজ থেকে তোর নাম হবে ‘বারুদ’।
অশ্বটি উত্তেজিত হয়ে তীব্র হ্রেষা করে উঠল, যেন এই কঠিন সংকল্পকে সে বশ্যতা স্বীকার করল এবং নতুন উদ্যমে ছুটতে লাগল ময়দানে।
বারুদের খুরের খট-খট-খট-খট শব্দ ময়দানের সমস্ত নিস্তব্ধতাকে খান খান করে দিচ্ছিল। সে ছুটে চলছিল শাল-সেগুন বৃক্ষের সারির মাঝ দিয়ে।ময়দানের ওপর উড়ন্ত এক ঝাঁক কপোত, অশ্বের দ্রুতগতির শব্দে চমকে উঠে ডানা ঝাপটে আরও উপরে উঠে গেল।
ক্ষণিককাল বাদে ঈশা খাঁ এর শরীর বিদ্রোহ করল। দীর্ঘদিনের অভ্যাসের অভাব। হাতে পায়ে একপ্রকার বেদনা অনুভব করলেন তিনি। কিন্তু এই শারীরিক কষ্ট তার দৃঢ় সংকল্পকে বিন্দুমাত্র টলাতে পারল না। বরং তা যেন তার জিদকে আরও তীব্র করে তুলল। তিনি চোখ বুজলেন। বুক ভরে গভীর শ্বাস নিলেন। বাতাসের গতিতে তার কেশরাশি পিছনের দিকে উড়ছিল, পরিহিত রেশমি পোশাক হাওয়ায় পতপত শব্দ করছিল।
তার মানসপটে স্পষ্ট ভেসে উঠল সেই অতীত দিনগুলোর কথা। যখন তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ, যখন তার ঘোড়ার গতিকে কেউ পরাস্ত করতে পারত না।
ঈশা খাঁ মনে মনে গর্জন করে উঠলেন,
– আমি ঈশা খাঁ। কেউ আমাকে পরাস্ত করতে পারবে না। কেউ নয়!
অশ্বটিকে নিয়ে তিনি তীব্র গতিতে বেশ কয়েকটি পাক মারালেন। তার দক্ষতা, ধৈর্য এবং দ্রুততা পরীক্ষা করলেন। বারুদও যেন তার প্রভুর ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ছুটতে লাগল।
ঈশা খাঁ যখন শেষ পাকটি সেরে অশ্বটিকে ময়দানের তেঁতুল বৃক্ষের দিকে আনছিলেন, তখন দূর থেকে দুজনকে এগিয়ে আসতে দেখলেন। একজন পুরোপুরি ইউরোপীয় পোশাকে, অন্যজন বাঙালি।
ঈশা খাঁ তৎক্ষণাৎ চিনতে পারলেন। মিস্টার রবিনসন এবং রামকমল রায়। তাদের গতিবিধিতে আগমনের অভিসন্ধি স্পষ্ট হয়ে উঠল।
ঈশা খাঁ অশ্ব থামালেন। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, কিন্তু মুখে ক্লান্তির চিহ্ন নেই। তিনি ঘোড়ার রাশ দৃঢ় করে ধরে স্থির দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকালেন।
মিস্টার রবিনসন বেশ চড়া সুরে ইংরেজিতে সম্ভাষণ জানালেন,
– গুড মর্নিং, মিস্টার ঈশা খাঁ। আশা করি, আপনার প্রাতঃভ্রমণ ফলদায়ক হয়েছে।
ঈশা খাঁ ইংরেজিতেই উত্তর দিলেন,
– মর্নিং, মিস্টার রবিনসন।
তিনি ইচ্ছা করেই ঘোড়া থেকে নামলেন না। উঁচু আসনে বসে রইলেন, যা তার মাঝে একটি অহংকারী মনোভাব বজায় রাখল।
তিনি আরও বললেন,
– জ্বি, হয়েছে। এই অশ্বটি আমাকে বহু বছর পর আবার স্মরণ করিয়ে দিল, আমি কেন এই অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ অশ্বারোহী।
রামকমল রায় তখন এগিয়ে এসে মাথা নিচু করে কুর্নিশ করলেন। চতুরভাবে বললেন,
– আজ্ঞে, জমিদার মশাই, আপনার অশ্ব চালনার খ্যাতি সারা অঞ্চলে আজও ছড়িয়ে আছে।
রামকমলের চতুরতায় ঈশা খাঁ এর মন গলল না।
তিনি কঠিন দৃষ্টিতে তাদের পানে তাকালেন। তিনি অবগত আছেন, এই লোকগুলোর এখানে আসার কারণ।
ঈশা খাঁ সরাসরি প্রশ্ন করলেন,
– আপনাদের উপস্থিতি এখানে অপ্রত্যাশিত নয়। জমিদার সিকান্দার গজনবীর সাথে আপনাদের সাক্ষাৎ ব্যর্থ হয়েছে, তাই পুনরায় আমার কাছে এসেছেন। তাই না?
রবিনসন কিছুটা অপ্রস্তুত হলেন বটে, তবে দ্রুতই নিজেকে সামলে নিলেন। উত্তর দিলেন,
– আমরা বাণিজ্যের মানুষ। আমরা দেখি, কোথায় আমাদের চাষের জন্য সবচেয়ে ভালো ভূমি আছে। সিকান্দার গজনবী, তিনি নতুন সুযোগের মূল্য বোঝেন না। কিন্তু আপনি তো দূরদর্শী, সাহেব।
রামকমল রায় গলার স্বর আরোও নরম করে বললেন,
– আসলে হুজুর, আমরা আপনার এস্টেটে নীল চাষের পরিমাণ নিয়ে কথা বলতে এসেছি। আপনি তো জানেন, এখন নীল চাষে কেমন লাভ। আমরা শুনেছি, আপনার এস্টেটের অর্ধেকেরও কম জমিতে এখন নীল চাষ হয়।
ঈশা খাঁ নাক দিয়ে একটি হালকা শব্দ করলেন। যা বিরক্তির ইঙ্গিত দেয়। তিনি স্পষ্ট করলেন,
– হ্যাঁ, তা হয়। আমার প্রজাদের আমি জোর করি না, তারা অন্য শস্যও ফলাতে পারে। আমি কোনো লোভী ব্যবসায়ী নই যে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করব।
রবিনসন এবার মূল প্রস্তাবটি ঈশা খাঁ-কে দিলেন।উচ্চস্বরে বললেন,
– দেখুন, আমরা আপনাকে প্রস্তাব দিতে এসেছি যে, আপনার এস্টেটের চার ভাগের তিন ভাগ জমিতে নীল চাষের ব্যবস্থা করুন। আমরা আপনাকে দেব এক অভূতপূর্ব মূল্য। যত টাকা আপনি এই মুহূর্তে কল্পনা করতে পারছেন, তার চেয়েও অনেক বেশি।
তিনি একটি মোটা থলি হাতে নিলেন। মোহরের ভারে নুইয়ে পড়ছিল থলিটি। রবিনসন সেটি ঈশা খাঁর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
– এটি কেবলমাত্র একটি অগ্রিম নমুনা। বাকিটা চুক্তির পর।
ঈশা খাঁ থলিটির দিকে একবার তাকালেন, তারপর রবিনসনের চোখে চোখ রাখলেন। তাঁর চোখে তখন খেলা করছিল এক জটিল হিসাবনিকাশ।
মুখে নিষেধ করলেও ঈশা খাঁ অর্থের লোভী। চার ভাগের তিন ভাগ জমিতে নীল চাষ মানে বিপুল ধনলাভ। এই অর্থ তাঁর জমিদারির ক্ষমতাকে বহু গুণ বাড়াবে। উপরন্তু, তিনি চান না যে, নীলকর সাহেবরা তার এস্টেটে এতটা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করুক।
ঈশা খাঁ মনে মনে ভাবলেন,
-পুরোটা মেনে নিলে এরা মাথায় চড়ে বসবে। আবার পুরোপুরি অস্বীকার করলে এই অর্থ আর ক্ষমতা হাতছাড়া হবে। অপেক্ষা করা যাক।
তিনি ধীরেসুস্থে জবাব দিলেন,
– আপনাদের প্রস্তাবটি আকর্ষণীয়, মিস্টার রবিনসন। কিন্তু চার ভাগের তিন ভাগ… এটি অনেক বড় অঙ্ক। আমার প্রজা এবং আমার ভবিষ্যতের কথা তো আমাকে ভাবতে হবে!
ঈশা খাঁ এবার ঘোড়া থেকে নামলেন।তিনি ঘোড়ার রাশটি রামকমলের দিকে ছুঁড়ে দিলেন,
– ধরো।
রামকমল রায় কিছুটা বিব্রত হলেও দ্রুত লাগামটি ধরলেন।
ঈশা খাঁ পকেট থেকে একটি চুরুট বের করে ধরালেন। ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উড়তে লাগল।
তিনি দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করলেন,
– শুনুন, মিস্টার রবিনসন আর রামকমল রায়। আমি এই মুহূর্তে আপনাদের প্রস্তাব গ্রহণও করছি না, আবার পুরোপুরি প্রত্যাখ্যানও করছি না। আমি একজন দূরদর্শী মানুষ, কিন্তু হঠকারী নই। আপনারা এই প্রস্তাবটি রেখে যেতে পারেন। আমি খুব দ্রুতই আমার সিদ্ধান্ত জানাব।
রবিনসন হতাশ হলেন ঠিকই কিন্তু ঈশা খাঁর কর্তৃত্বপূর্ণ ভাব দেখে কিছু বলতে পারলেন না। রবিনসন সম্মতি জানালেন,
– ঠিক আছে, মিস্টার ঈশা খাঁ। আমরা আপনার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকব। কিন্তু মনে রাখবেন, আমাদের হাতে সময় কম। সুযোগ হাতছাড়া করবেন না।
ঈশা খাঁ দম্ভভরে উত্তর দিলেন,
– সুযোগ হাতছাড়া? ঈশা খাঁ কোনো সুযোগ হাতছাড়া করে না, মিস্টার রবিনসন। সে সুযোগ তৈরি করে।
ঈশা খাঁ আবার বাহাদুরের পিঠে চেপে বসলেন। সূর্য তখন মধ্যগগনের দিকে এগুচ্ছে। ঘোড়ার খুরের নিচে আবার ধ্বনিত হলো
খট-খট-খট-খট শব্দ।
রাতে ভোজসভার পর জমিদার ঈশা খাঁ দ্রুত পদক্ষেপে তার সুবিশাল শয়নকক্ষের দিকে গেলেন। কক্ষটি অলংকার আর জাঁকজমকে পূর্ণ হলেও, এখন যেন তাঁর অস্থির মেজাজের ছায়ায় পড়ে সেটি এক গভীর বিষাদে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছে।
প্রচণ্ড মানসিক চাপ গ্রাস করেছিল তাকে। একদিকে সিকান্দার গজনবীর প্রতি প্রতিশোধের যন্ত্রণা, অন্যদিকে নীলকরদের দেওয়া বিপুল অর্থের প্রলোভন। এই দ্বিবিধ চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তিনি এক ভিন্ন পথ খুঁজলেন, যা জমিদার আমলের ক্ষমতাবান পুরুষদের এক চিরাচরিত কদর্য দুর্বলতা।
ঈশা খাঁ এর জন্য তার বেগম নুরজাহান শয়নকক্ষে প্রতীক্ষায় ব্যস্ত ছিলেন। তার মুখে প্রগাঢ় উদ্বেগ আর চোখে স্বামীর প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা। তিনি এগিয়ে এসে ঈশা খাঁর কপালে জমে থাকা ঘাম মোছার জন্য হাত বাড়ালেন।
নুরজাহান বেগম চাপা কণ্ঠে অনুরোধ করলেন,
– হুজুর, আপনাকে বড় ক্লান্ত দেখাচ্ছে। আমি আপনার মস্তক মালিশ করে দেই? হয়তো মাথাটা একটু শান্ত হবে। আপনার এই জেদ… এই চিন্তা…
ঈশা খাঁ তড়িৎ গতিতে নুরজাহানের হাত সরিয়ে দিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে ফুটে উঠল এক উগ্র বিরক্তি।
তিনি রূঢ় স্বরে জবাব দিলেন,
– থাক! তোমার সেবার আমার প্রয়োজন নেই, বেগম। আমাকে দুর্বল প্রমাণ করার চেষ্টা কোরো না।
নুরজাহান বেগম মিনতি করলেন,
– আমি আপনাকে দুর্বল প্রমাণ করতে চাইছি না হুজুর। আমি তো কেবল…”
ঈশা খাঁ কঠোর ভঙ্গিতে থামিয়ে দিলেন তাকে।
– আর কোনো কথা নয়! তোমার ‘কেবল’ এর আড়ালে সহানুভূতি স্পষ্ট। আমার ওপর করুণা করবে তুমি?
তিনি উচ্চস্বরে কটু হাসলেন। দম্ভভরে বললেন,
– আজ অশ্ব চালনার পর আমার শরীর, আমার শিরা-উপশিরায় এক নতুন তেজ সঞ্চারিত হয়েছে, বেগম। এই মুহূর্তে আমার সহানুভূতি নয়, শান্তি প্রয়োজন। তৃপ্তি প্রয়োজন।
নুরজাহান বেগম ম্লান হয়ে মাথা নিচু করলেন। তিনি জানতেন, স্বামীর জিদ ও ক্রোধের সামনে কথা বলার ফলাফল শূন্য।
নুরজাহান বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “বেশ, হুজুর। আপনি যা শুভ মনে করেন।
ঈশা খাঁ তাঁর দিকে আর ফিরেও তাকালেন না। আদেশ করলেন,
– তুমি নিজ কক্ষে বিশ্রাম নাও, বেগম। আজকের রাত আমি একা কাটাতে চাই।
নুরজাহান বেগম স্বামীর এই কথাগুলোর নিগূঢ় অর্থ বুঝলেন। তার চোখজোড়া ছলছল করে উঠল। কিন্তু তিনি মুখ খুললেন না। অবনত মস্তকে নীরবে কক্ষ ত্যাগ করলেন। তাঁর এই নিরুচ্চার প্রস্থান যেন ঈশা খাঁ-এর ঔদ্ধত্যের বিজয় আরও একবার প্রতিষ্ঠা করল।
নুরজাহান বেগম কক্ষ থেকে চলে যাওয়ার পর ঈশা খাঁ তাঁর ব্যক্তিগত খিদমতগারকে ডাকলেন।
নির্দেশ দিলেন,
– আজ রাতের জন্য, নতুন কাউকে ডেকে আনো। যে সম্প্রতি অন্দরমহলে সেবার কাজে এসেছে, খুব কমবয়সী। এক্ষুনি!
জমিদারের আদেশ পালন করা ছিল খিদমতগারের অমোঘ কর্তব্য। জমিদার বাড়ির দাস-দাসীদের ব্যক্তিগত জীবন বা ইচ্ছার কোনো মূল্য খাঁ এস্টেটে ছিল না। এটাই ছিল তখনকার সমাজের কঠোর বাস্তবতা।
কিছুক্ষণের মধ্যেই খিদমতগার ফিরে এলো। তার সাথে এলো এক অল্পবয়সী দাসী, তার নাম রূপসি। সে ভয়ে কাঁপছিল। চোখ মুখ ফ্যাকাশে।
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৬
অন্দরমহলে তার কাজের বয়স সবেমাত্র দু মাস। সে উক্ত পরিস্থিতির জন্য বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিল না।
রূপসি ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে ঈশা খাঁ-এর সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়াল। তার সর্বাঙ্গ থরথর করে কাঁপতে লাগল। সে জানত, তার ভাগ্যে আজ কী ঘটতে চলেছে। অথচ তার নিজের কোনো আপত্তি জানানোর ক্ষমতা নেই!
জমিদার ঈশা খাঁ একটি তিক্ত হাসি হাসলেন। ভোর হওয়ার আগেই জমিদারী অন্দরমহলে নেমে এলো এক গভীর ও অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা।
নুরজাহান বেগম তার কক্ষে সারারাত জেগে রইলেন। বুকে জাগ্রত হল স্বামীর আদর ভাগের তীব্র যন্ত্রণা।
