Home ভয়েজের মায়াজাল ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ১

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ১

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ১
ছায়া

দিনাজপুরের ছোট একটি শহর তখন বিকেলের রোদ যেন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে মহিলারা বাড়ির উঠানে ধান শুকাচ্ছে চার পাশে গ্রামীণ হাওয়া কখনো দূরে গরুর ডাক কখনো পাশের পুকুর থেকে ছপ ছপ পানির শব্দ। ইলা তালুকদার, সাদা গাউন পড়ে হাতে ফোন নিয়ে ছাদে দোলনায় বসে আছে। ফোনে টিকটক এ ভিডিও দেখছে হঠাৎ একটা ভিডিও সামনে আসে। ভিডিওতে শুধু দেখা যাচ্ছে রাস্তার দুপাশে হলুদ বুনো ফুল ফুটে আছে আর সাথে একটা কণ্ঠস্বর।

“ফুল কখনো নিজের জন্য ফোটে না ফোটে কারো পথের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য অথবা কারো জন্য, যে হয়তো এই পথে কখনো আসবেই না।
ইলার চোখ যেন স্থির হয়ে গেল স্ক্রিনের দিকে, এই ভয়েজে এমন কিছু আছে যা বুকের গভীরে গিয়েই ধাক্কা দিল গভীর, স্থির, অথচ মায়াবী। ইলা তার আইডিতে ডুকলে দেখে শাওন নাম দেয়া আর আর্মির হেলমেটের ছবি দেওয়া। ইলা একটার পর একটা ভিডিও দেখা শুরু করলো সব প্রকৃতির দৃশ্য, ফুল, নদী, আকাশ, গোধূলি নিয়ে ভিডিও আর প্রতিটাতেই এই একই মানুষের ভয়েজ।
একটাও ভিডিওতে মুখ নেই প্রোফাইল পিকচারে আর্মির ড্রেস পড়া গোলাকাটা একটা ছবি যেখানে নামটা দেখা যাচ্ছে শাওন লিখা।

ইলাঃ- সব কিছুই তো দেখালো ফেসটা দেখালে কি এমন ক্ষতি হতো।
ইলার পাশে বসা পরি তার কাজিন আর বেস্ট ফ্রেন্ড, কৌতূহলী হয়ে বলল,
পরিঃ- কি দেখছিস রে এত মন দিয়ে?
ইলাঃ- একটা ভয়েজ না মানে এই কণ্ঠটা না অদ্ভুত টান আছে।
পরিঃ- হুম…প্রেমে পড়লি নাকি?
ইলাঃ- দূর…আমি কণ্ঠস্বরের প্রেমে পড়ি নাকি।
ইলা মুখ বাঁকিয়ে বলল কিন্তু মন যেন অন্য কথা বলছে একটু পরে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। চারদিকে নীরবতা শুধু দূরের কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। ইলা বিছানায় শুয়ে আবার সেই আইডিতে ডুকলো। এক এক করে সব ভিডিও দেখলো।ইলার ঐ আইডিতে মেসেজ দেওয়ার ইচ্ছে হল ইলা লিখতে শুরু করল,
ইলার মেসেজঃ-

“আপনার ভয়েজ শুনে মনে হয়, প্রতিটা শব্দের ভেতর লুকিয়ে আছে অন্যরকম এক দুনিয়া আমি জানি না আপনি কে, কিন্তু আপনার ভিডিওগুলো আমার ভীষণ ভালো লাগে।
সেন্ড করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল এক মিনিট,পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট কোনো রিপ্লাই নেই। পরের দিন তারও পরের দিন ইলা মাঝে মাঝে আবার মেসেজ চেক করে কিন্তু উত্তর আসে না। ইলার মন খারাপ হলো তার পর থেকে ইলা আর কোনো মেসেজ করলো না এভাবে কিছু দিন কেটে গেলো এর মাঝে ইলার সামনে ভিডিও আসলে দেখে। রিয়েক্ট দিয়ে চলে আসে কোনো কমেন্ট করে না।
একদিন বিকেলে ছাদে বসে ছিলো ইলা ফোনে নতুন নোটিফিকেশন সেই আইডি থেকে একটা নতুন ভিডিও। ভিডিও তে দেখা যাচ্ছে অনেক গুলো ফুল আর সাথে কিছু মোটিভেশনাল কথা।
“লাইফে অনেক কিছুই আসবে যাবে কিন্তু নিজেকে স্টোং রাখতে হবে।
অন্য দিকে,

ঢাকার সেনানিবাসের ভেতরে সকালটা সব সময় অন্যরকম প্যারেড গ্রাউন্ডে ভোর ৫ টার বাঁশির শব্দ,সাথে সৈনিকদের একসাথে দৌড়ের তাল মিলিয়ে হাঁক “Left! Right! Left!” “ শাওন” সবুজ আর্মি ড্রেসে গম্ভীর চোখে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রশিক্ষণের মাঠে। ২৮ বছরের এই তরুণ উচ্চতা 5’11 ইঞ্চি অফিসারের চোখে সবসময় দৃঢ়তা মুখে শান্ত ভাব। চারপাশের কেউ জানে না প্যারেড শেষ হলে, ইউনিফর্ম খুলে, সে অন্য এক জগতে ঢুকে যায়। বিকেলে ডিউটি শেষ করে শাওন তার ব্যাকের ঘরে ফিরল। অনেক ক্লান্ত শাওন টাওয়েল নিয়ে ফ্রেশ হতে চলে গেলো।

শাওন ফ্যাশ হয়ে রুমে আসলো ঘরটা ছোট কিন্তু সাজানো, এক পাশে ল্যাপটপ, মাইক্রোফোন, সব ভিডিও করার সরঞ্জাম ফ্রেশ হয়ে টেবিলের পাশে বসে শাওন কফির কাপ হাতে নিলো তারপর ল্যাপটপ চালাল।
স্ক্রিনে টিকটকের ড্যাশবোর্ড খুলল প্রোফাইল @🪖🪖শাওন🪖🪖 ডজনখানেক নতুন মেসেজ কেউ কিছু কবিতা পাঠিয়েছে কেউ বলেছে ভয়েজ ভালো লাগে আর সবার শেষে এ চোখে পড়ল একটা লম্বা মেসেজ,
“আপনার ভয়েজ শুনে মনে হয়, প্রতিটা শব্দের ভেতর লুকিয়ে আছে অন্যরকম এক দুনিয়া আমি জানি না আপনি কে, কিন্তু আপনার ভিডিওগুলো আমার ভীষণ ভালো লাগে।
শাওন কিছুক্ষণ চুপচাপ করে পড়ল মেসেজ টা,তারপর ফোন টা রেখে দিল রিপ্লাই করল না। কারণ সে কারো মেসেজ কমেন্ট এর রিপ্লাই করে না। রাত গভীর হলে শাওন রেকর্ডিং শুরু করল। মাইক্রোফোনে ধীরে ধীরে বলতে লাগল ভিডিওর সাথে কিছু কথা
শাওনের ভয়েজঃ
“কখনো তুমি কাউকে দেখার আগেই তার কণ্ঠে হারিয়ে যাবে… আর তখন বুঝবে, কিছু গল্প মুখ দেখায় না, শুধু কণ্ঠে বেঁচে থাকে।”
রেকর্ড শেষ করে সে হালকা হেসে শাওন বলল,

শাওনঃ- এইটা ওদের জন্য যারা আমাকে চেনে না, কিন্তু আমার ভয়েজ শুনে সব সময় আমাকে সাপোর্ট করে।
ভিডিও আপলোড করে শাওনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য জানালার বাইরে হারিয়ে গেল চোলে গেলো তার গ্রামের শৈশব কালে যেখানে তার বেড়ে উঠা তার জন্মস্থান। শাওন রাজশাহী বিভাগের আত্রাই জেলার ছেলে। তার ছোট থেকে বড় বেলা সব কেটেছে আত্রাইতে।
অন্যদিকে রংপুর বিভাগের দিনাজপুর জেলার প্রান্তিক এক গ্রামে থাকে আমাদের সেই দুষ্টু মিষ্টি ইলা। তাদের বাড়িটা চার তালা সাদা রঙ এর ফিনিশিং, চারপাশে পুকুর আর সবুজ গাছ পালা দিয়ে ভরা “তালুকদার ভিলা”। এই বাড়িতে একসাথে থাকেন চার ভাইয়ের পরিবার সবাই মিলে জয়েন্ট ফ্যামিলি। প্রতি সকালেই উঠোনে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, বাচ্চাদের হাসির শব্দ, আর মুরগির ডাক যেন গ্রামটা এখনো পুরনো দিনের উষ্ণতায় মোড়ানো।
এই বাড়ির ছোট্ট রাজকুমারী ইলা তালুকদার। বয়স সতেরো দিনাজপুর সরকারি কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। গোল মুখ, হাসলে গালে টল পড়ে,সব সময় কপালে ছোট্ট টিপ পড়ে, চোখে কেমন এক দুষ্টুমি আর সরলতার মিশ্রণ। বাড়ির সবার আদরের কারণ সে বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে।

ইলার বাবা রাশেদ তালুকদার সাহেব শান্ত তিনি পুলিশ অফিসার ছিলেন এখন রিটায়েড পার্সোন, মা গৃহিণী সবসময় মেয়েকে আদর করে রাখেন। পরিবারে আরো সবাই আছে আর আছে পরি তালুকদার ইলার সমবয়সী কাজিন একই সাথে একই কজেলে পড়ে তাদের বোন এর থেকে বান্ধবী বেশি মনে হয়। দুজন মিলে সারাদিন হাসি-আড্ডা, ছোটখাটো ঝগড়া, আবার এক মিনিটে মিটমাট।
পরের দিন সকাল বেলা উঠোনে ধান মাড়াই চলছে। ইলা গামছা মাথায় বেঁধে পুকুর থেকে পানি তুলছে শখ করে পরি পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
পরিঃ- শোন কাল রাতে তোকে দেখলাম কারো ভিডিওতে লাইক মারছিস বারবার।
ইলাঃ- উফ সেটা বলিস না রে ভয়েজটা শুনেছিস? মনে হয় আমার সাথেই কথা বলছে।
পরি চোখ বড় করে বলল,

পরিঃ- ওই তোর প্রেম শুরু হয়ে গেল নাকি?
ইলাঃ- দূর আমি কণ্ঠস্বরের প্রেমে পড়ি নাকি,
মুখ গম্ভীর করল ইলা কিন্তু মনে মনে জানে এই কণ্ঠে সে প্রতিদিন হারাচ্ছে নিজেকে। বিকেলে কলেজ থেকে ফিরে ইলা বসে পড়ে হাতে ফোন নিয়ে আবার @🪖🪖শাওন🪖🪖 আইডিতে। প্রতিটা ভিডিও যেন তার মনেই কথা বলে ফুল, আকাশ, নদী, সবকিছুতে ভয়েজের মায়া।
ইলা আবার মেসেজ দিল,
“আপনার ভয়েজগুলো শুধু সুন্দর না এগুলো যেন কোথাও মনকে ছুঁয়ে যায়। আপনি জানেন না কিন্তু আপনার কথা শোনার পর মনে হয় আমি একা নই।
মেসেজ পাঠিয়ে ইলা আকাশের দিকে তাকাল।সন্ধ্যার মেঘে রঙ বদলাচ্ছে, হালকা বাতাস বইছে। আর কোথাও এক অচেনা মানুষ,হয়তো এই মুহূর্তে,ঠিক একই আকাশ দেখছে।

শাওনের পরিচয়ঃ
শাওন ২৮ বছর বয়সী একজন আর্মি অফিসার যিনি ঢাকায় সেনানিবাসে কর্মরত
।আত্রাই জেলার ছোট্ট গ্রামে জন্ম হলেও, চাকরির কারণে সময় কাটে রাজধানীর ব্যস্ত শহরে। তার গড়ন ফর্সা,উচ্চ চওড়া কাঁধ আর নির্ভরযোগ্য চোখের রেখা যা মানুষের মনেও স্থির হয়। কেউ তাকে প্রথমবার দেখে বোঝে না,তার ভেতর কতটা কঠোরতা আর একই সঙ্গে কোমলতা লুকিয়ে আছে।
শাওনের বাবা একজন ডক্টর মা একজন টিচার বাড়িতে বাবা মায়ের সাথে থাকে তার ছোট টুইন্স দুই বোন দুজনি এবার ssc দিবে। শাওন তার পরিবারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল, কিন্তু কঠোর অনুশাসনের কারণে মাঝে মাঝে ঘরোয়া জীবনে দূরত্ব বজায় রাখে।
শাওন এর বাসায় একটি কুকুর থাকে নাম ‘এরিক’ ও শুধু শাওনের সঙ্গী নয়,জীবনের একান্ত বন্ধু। বাসায় গেলে দিনের পর দিন এরিক শাওনের সঙ্গে থাকে,সবাই যখন শহরের ব্যস্ত জীবনে ক্লান্ত, তখন এরিকের কোমল স্পর্শই তার একান্ত শান্তি।

শাওন আর্মি অফিসার হওয়ার পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া তে এক রহস্যময় আইডি চালান @🪖🪖শাওন🪖🪖 এই আইডিতে সে কখনো তার মুখ দেখায় না শুধুই তার ভয়েজ দিয়ে কবিতা, গল্প, মজা এবং অনুভূতির প্রকাশ করে। তার কণ্ঠে যে মায়া,যেটা মানুষকে মুগ্ধ করে, সেটি তার জীবনের কঠিন বাস্তবতার ছায়ার বিপরীতে এক অদ্ভুত আশ্রয়।
শাওন কখনোই নিজের পরিচয় প্রকাশ করেন না, কারণ সে বিশ্বাস করে বাস্তবতা অনেক সময় চেহারার বাইরে লুকিয়ে থাকে। তার ভেতরের গল্প,যেটা সে নিজের কাছেও ঢেকে রাখে কেবলমাত্র তার ভয়েজই জানে।
ইলা আবার সেই প্রোফাইলে ডুকে দেখে শাওনের নতুন ভিডিও এসেছে কিনা। ইলা দেখে নতুন ভিডিও আসছে হারিয়ে গেল শব্দের মাঝে ভিডিওর নিচে চুপচাপ একটা কমেন্ট দিল

ইলার কমেন্টঃ
“আপনার ভয়েজের মায়া যেন বৃষ্টি’র মতো মন ছুঁয়ে যায়।”
কিছুক্ষণ পর ফোনটা নড়ল কিন্তু রিপ্লাই ছিলো না ইলা জানত, শাওন কোনো কমেন্টে কখনো উত্তর দেয় না। দিন কয়েক পর ইলা মনের সাহস জোগাল সে শাওনকে আবার মেসেজ করল অনেক বড় করে মেসেজ লিখলো।
“আপনার ভয়েজ শুনে মনে হয় আপনি নিজের ভেতর কত গভীর গল্প লুকিয়ে রেখেছেন। আমি বারবার শুনি কিন্তু কখনো আপনাকে চিনতে পারি না। কেন কখনো উত্তর দেন না?
শাওন ফোনটা খুলল মেসেজটা পড়ল গভীর মনোযোগ দিয়ে। চোখে কিছুক্ষণ বিষণ্ণতা সে জানত মেসেজগুলো তার কাছে আসছে কিন্তু উত্তর দেওয়া তার পক্ষে কঠিন। একটু হেঁটে একটা ফুলের গাছের কাছে গিয়ে দাড়ালো ফুল এ টোকা দিয়ে বলল
শাওনঃ- সবকিছু জানা সম্ভব নয় ইলা সব মানুষের নিজের একটা দেয়াল রাখে।
ইলা কোনো উত্তর না পেয়ে আগের মতই নিরাস হয়ে গেলো কিন্তু তেমন গুরুত্ব দিলো না, ইলা নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে এখন তার বাবা মা পরি ও পরিবার এর বাকি লোকজন এর সাথে।

অন্য দিকে শাওন প্রতিদিনের মতো তার মোবাইলে ভিডিও রেকর্ড করছিল।সকাল থেকে সন্ধ্যা প্রায় ৫-৬টা ভিডিও পোস্ট করাই তার নিয়ম। তার ভয়েজ শুধু মধুর নয় মাঝে মাঝে মেয়েদের ভঙ্গিতে মজা করে এমন ঢং করতো যেটা শুনলে কেউ না হেসে থাকতে পারত না। আজকের একটা ভিডিওতে সে বলল
শাওনঃ- আজ শপিং মলে গিয়েছিলাম দুইজন মেয়ে একে অন্য কে এত ঢং করে কথা বলছে যে মনে হচ্ছে সবাই আম্বানির ঘরের বউ বলল আর সব হয়ে গেলো
প্রথম মেয়েঃ- জানেন ভাবি আমার জামাই কালকে আমাকে সেন্টমার্টিনে নিয়ে যাচ্ছে।
দ্বিতীয় মেয়েঃ- ওমা তাই নাকি ভাবি আপনি অনেক লাকি আমার জামাইর সাথে তো আমি আজ রাতের ফ্লাইটেই মালদিপ্বে যাচ্ছি।

ভিডিও পোস্ট হতেই ফোনে রিয়্যাকশন বার্তা ঢুকতে শুরু করল, শাওন হাসল কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল। ইলা আবার বসে সে সব ভিডিও দেখতে থাকে আর হাসে। মনে মনে বলে এই ছেলে এত দুষ্টু কেনো? ইলার শাওনের প্রতিটি ভিডিও দেখে মন ভরে যায়। কখনো গম্ভীর, কখনো হাস্যরসাত্মক শাওনের ভয়েজে যেন সব মিশে আছে জীবনের নানা রং। ইলা চুপচাপ আরো এক বার লাস্ট মেসেজ করল,
ইলার মেসেজঃ
“আপনার হাসির ভঙ্গিতে আমার দিনটা ভালো হয়ে যায়… কিন্তু কেন আপনি কখনো আমার মেসেজের উত্তর দেন না?
মেসেজ পাঠানোর পর ফোন হাতে চেপে ধরে বসে রইল।কয়েক ঘণ্টা গেল, প্রতিবার এর মত ইলার মন খারাপ হলো কোনো রিপ্লাই নেই।
এদিকে শাওন সে সব মেসেজ পড়ে কিন্তু একটাও উত্তর দেয় না। কারণ তার মধ্যে লুকানো এক জটিলতা আছে যা প্রকাশ করে না কাউকে।
ইলার মন মাঝে মাঝে ভেঙে যায় তবে সে হাল ছাড়ে না।প্রতিদিনই ফিরে আসে শাওনের ভয়েজ শুনতে, হাসতে, কষ্ট পেতে আর ভালোবাসতে। আর শাওন সে ক্রমশ তার অদেখা দেয়ালের ভেতর থেকে ইলাকে কাছে টানে কিন্তু শব্দ ছাড়া কিছু প্রকাশ করে না।

কিছু দিন পেরিয়ে গেছে শাওন তার ভিডিও পোস্ট করছে প্রতিদিন নিয়ম করে। ইলা প্রতিদিনই দেখে কিন্তু আগের মতো আর তেমন কমেন্ট করে না। কারণ সে বুঝে গেছে রিপ্লাই পাওয়া হয়তো সম্ভব নয়। শাওনের মনের ভেতরে কী চলছে, সেটা ইলা জানে না। কখনো মনে হয় হয়তো সে একদমই পাত্তা দিতে চায় না। আবার কখনো মনে হয় হয়তো তার কোনো কারণ আছে। হয়তো প্রেম করে আর নয়তো বউ আছে।
সেই রাতে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল গভীর অন্ধকারে, বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে পুরো বাড়ি ভরে গেল, সকাল পর্যন্ত বৃষ্টি থামেনি। দুপুরের দিকে হালকা বাতাস আর ঠাণ্ডা কুয়াশার সাথে বৃষ্টি পড়ছিল ধীর গতিতে। ইলার মন হঠাৎ করেই কেমন নরম হয়ে গেল। জানালার ধারে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি ধরল। মনে মনে বলল,
ইলাঃ- (আজ যদি বাইরে বের হতাম এই রাস্তায় হাঁটতাম)
পাশে বসা পরি হেসে বলল
পরিঃ- দেখছি কারো ভয়েজের নেশা ছাড়াও বৃষ্টির নেশা ধরেছে।
ইলা কপালে ভাঁজ ফেলে বলল
ইলাঃ- চল না বাইরে বের হই বৃষ্টিতে হাঁটব।
পরিঃ- এখন এই ভিজে ভিজে রাস্তায়?
ইলাঃ- হ্যাঁ এই তো মজা।

দুইজন ছাতা হাতে বেরিয়ে পড়লো, কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে পায়ের নিচে কাদা ছিটকে পড়ছিল। গাছের পাতায় জমে থাকা পানি ঝরে পড়ছিল মাথার ওপর। ইলা মাঝেমধ্যে থেমে নিজের ফোনে কিছু ভিডিও ক্লিপ নিল। তার হাঁটার দৃশ্য, চারপাশের সবুজ, দূরে ভিজতে থাকা ধানক্ষেত, আর মাটির গন্ধ।সবই মিশে গেল ভিডিওতে। পরি মজা করে বলল
পরিঃ- তোর ভিডিওগুলো কি ওই ভয়েজওয়ালাকে পাঠাবি?
ইলা হাসল কিন্তু কিছু বলল না
ইলাঃ- সে তো আমাকে চিনেই না।
বৃষ্টি ভেজা গ্রাম পথ থেকে ফিরে ইলা সোজা নিজের ঘরে ঢুকল। চুল ভেজা হাতে এখনো মাটির হালকা কাদা লেগে আছে। তাই ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িং রুমে চলে গেলো পরি ড্রয়িং রুমে বসে গরম চা খাচ্ছে, আর ইলা তার ফোনে মগ্ন হয়ে গেল।

ইলার দুইটা টিকটক অ্যাকাউন্ট দুইটাতেই সে ভন্ডামি করে শুধু একটা তে একটু বেশি একটাতে একটু কম।
ইলাঃ- তুই থাক আমার ভালো লাগছে না আমি রুমে গেলাম।
ইলা রুমে চলে আসলো বিছানায় বসে সে আজকের সব ক্লিপ একে একে নিল।ধানক্ষেত, গাছের পানির ফোঁটা, হাঁটার স্লো-মোশন শট সব মিলিয়ে একটা ভিডিও বানাল ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা মিউজিক এড করে দিলো। ভিডিও আপলোড করল তার দ্বিতীয় একাউন্টে। আর আপলোডের পর হঠাৎ মাথায় একটা ভাবনা এল
ইলাঃ- অনেক দিন হয়ে গেল কোনো মেসেজ পাঠাইনি তাকে আজ একটা পাঠাই।
সে আবার শাওন এর আইডিতে ডুকলো, ফাঁকা মেসেজ বক্সের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ ভাবল।তারপর আঙুল কিবোর্ডে নাচতে লাগল

ইলার মেসেজঃ-
“আজ বৃষ্টিতে হাঁটলাম… মনে হচ্ছিল কিছু মুহূর্ত আপনাকে দেখাতে পারলে ভালো লাগত। যদিও জানি, আপনি হয়তো কিছু বলবেন না… তবুও পাঠালাম।
মেসেজ সেন্ড করে ফোনটা একপাশে রেখে দিল। তারপর আয়নার সামনে গিয়ে চুল মুছতে লাগল মনে মনে বলল
ইলাঃ- ( ওপার থেকে রিপ্লাই আসবে না… আমি জানি।)
তার চোখে এক ধরনের অভ্যস্ত অভিমান যেটা অনেক দিন ধরে জমে আছে, কিন্তু তবুও প্রতিবার নতুন করে জন্ম নেয়।
সারাদিন কেটে রাত নেমে এসেছে ছোট্ট ঘরে শাওনের ডেস্কে ল্যাম্পের আলো জ্বলছে। শাওন মোবাইল হাতে নিয়ে টিকটিক এ ডুকলো। নতুন একটা মেসেজ।প্রেরক “ila_dreams” শাওন মেসেজটা খুলে পড়ল
ইলার মেসেজঃ-
“আজ বৃষ্টিতে হাঁটলাম… মনে হচ্ছিল কিছু মুহূর্ত আপনাকে দেখাতে পারলে ভালো লাগত। যদিও জানি, আপনি হয়তো কিছু বলবেন না… তবুও পাঠালাম।”

শাওন হালকা ভ্রু কুঁচকে কয়েক সেকেন্ড বেশি সময় ধরে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল। তার ঠোঁটে এক অদ্ভুত হালকা হাসি ফুটল।কোনো রিপ্লাই দিল না কিন্তু কৌতূহল তাকে থামাল না। সে মেসেঞ্জার থেকে বের হয়ে ইলার সেই অ্যাকাউন্টে ঢুকে পড়ল। ভিডিওগুলো স্ক্রল করল সবুজ ধানক্ষেত, বৃষ্টিতে হাঁটা, গাছের পাতায় পানি ফোঁটা প্রতিটা ভিডিওতেই যেন একটা নির্ভেজাল আনন্দ আছে। ৭ টা ভিডিও তে লাইক দিয়ে বের হয়ে এল। কিছু বলল না তবুও নিজের অজান্তে এক অদেখা সুতায় বাঁধা পড়ে গেল।
ইলা বিছানায় বসে ফোন হাতে নিল ঘুমানোর আগে, হঠাৎ নোটিফিকেশন এই নোটিফিকেশন ইলার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। হাত ঠাণ্ডা হয়ে আসছে, হার্টবিট বেড়ে গেছে অদ্ভুতভাবে। নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল “না হয়তো ভুল দেখছি… সত্যি নাকি?”

ইলা আবার অ্যাকাউন্টে ঢুকল হ্যাঁ শাওন তার ভিডিও দেখেছে লাইক দিয়েছে। ইলার ঠোঁটে অনিয়ন্ত্রিত হাসি ফুটে উঠল। সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কয়েক সেকেন্ড হাত দিয়ে মুখ ঢাকল কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। তাড়াহুড়ো করে মেসেজ লিখল
ইলার মেসেজঃ-
ধন্যবাদ… জানতাম না আপনি আমার ভিডিও দেখবেন।আপনার লাইকটা আজকের দিনের সবচেয়ে সুন্দর সারপ্রাইজ।
মেসেজ পাঠানোর পর ফোনের একটা স্ক্রিনশট নিল, আর নিজের স্টোরিতে পোস্ট করল ক্যাপশন দিল
“Sometimes a single like can make your heart race.”

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ২