নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৩৪
আতিয়া আদিবা
হিমলতলী গ্রামটি যেন প্রকৃতির রূপের এক অন্যন্য বহিঃপ্রকাশ। ধুলোমাখা মেঠো পথ, দুপাশে ঘন বাঁশঝাড়ের বুনো গন্ধ আর ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক। গজনবী এস্টেটের সেই জৌলুস প্রকৃতির এ রূপের কাছে ঠুনকোই বটে। এখানে বাতাসের পরতে পরতে দামী আতরের সুবাস মিশে না থাকলেও, আছে ভিজে মাটির সোঁদা ঘ্রাণ।
সূর্য তখন মধ্যগগনে। তপ্ত রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে যাওয়া ধুলো তাইমুর এবং হেমাঙ্গিনীর পায়ের পাতায় বিঁধছে। আভিজাত্যের শেষ চিহ্নটুকুও তিনি নদীর অতল গভীরে বিসর্জন দিয়ে এসেছেন। মাথার চওড়া ঘোমটার আড়ালে হেমাঙ্গিনীর কুণ্ঠিত নয়নযুগল কেবল তাইমুরের পদচিহ্ন অনুসরণ করে চলেছে।
তাঁরা এসে পৌঁঁছালেন গ্রামের নির্জন এক কিনারায়। যেখানে জনমানবের আনাগোনা তেমন একটা নেই। কিছুদূরে একটি জীর্ণ কুটিরের সন্ধান মিলল। সেই কুটিরের সম্মুখে এসে স্থির হলেন তাঁরা।
কুটিরটি ছিল এক বৃদ্ধ দয়ালের। সে কুটিরের মাটির দেওয়ালে বার্ধক্যের বলিরেখার মতো অজস্র ফাটল, পলেস্তারা খসে কঙ্কালসার রূপ বেরিয়েছে। উপরে খড়ের চালের অনেকটা অংশ বোধহয় বিগত বর্ষার উন্মত্ত ঝড়ে বিলীন হয়ে গেছে। উঠোনে আগাছার অরণ্য আর এক কোণে অযত্নে মরে যাওয়া এক বিষণ্ণ তুলসী গাছ।
এ যেন এক ধ্বংস হয়ে যাওয়া সাম্রাজ্যের ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি।
বৃদ্ধ দয়াল তার ঝাপসা নজরে আগন্তুকদের নিরীক্ষণ করলেন। তাইমুরের সুদীর্ঘ দেহবল্লরী আর চোখের শানিত জ্যোতি দেখে তিনি অবচেতনভাবেই কিঞ্চিৎ কুঁকড়ে গেলেন। তাইমুর অতিশয় বিনীত মস্তকে বললেন,
- কর্তা, আমরা বড় দূরপথের মুসাফির। শ্রান্ত চরণে মাথা গোঁজার এক চিলতে আশ্রয় খুঁজি। আপনার এই জীর্ণ কুটিরটুকুই আমাদের কাছে অমরাবতী হবে, যদি আপনি মেহেরবানি করে ঠাঁই দেন।
বৃদ্ধ বিড়বিড় করে বললেন,
– ঘর তো নয় বাপ, এ এক যমপুরী। নিঝুম রাতে সাপ-খোপের হিসহিসানি শোনা যায়। তবে যদি প্রাণ হাতে নিয়ে থাকতে পারো, মাস গেলে দু-আনা পয়সা দিলেই হবে।
তাইমুর নিরুদ্বেগ চিত্তে সম্মতি দিলেন।
কুটিরের ভেতর প্রবেশ করতেই দেখা গেল মেঝের ওপর ধূসর ধুলোর পুরু আস্তরণ। একোণ সেকোণ মাকড়সার নিপুণ জালে বন্দী। ভাঙা চাল দিয়ে প্রবেশ করা রৌদ্রচ্ছটায় ধুলিকণাগুলো যেন কোনো এক বিষণ্ণ নৃত্যে মত্ত। আসবাব বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই, কেবল এক কোণে পড়ে আছে এক ভগ্ন মৃৎপাত্র।
তাইমুর হেমাঙ্গিনীর নয়নে এক চিলতে করুণা মাখা হাসি নিয়ে চাইলেন। তাঁর সেই রাজকীয় হাসি আজ কেমন মলিন দেখালো। তিনি নিভৃতে শুধালেন,
- বেগম সাহেবা, গজনবী মহলের স্ফটিক স্বচ্ছ ঝাড়লণ্ঠনের নিচে আপনার রজনী কাটত। আপনি কি এই অভিশপ্ত ছায়ার তলে বুকভরে নিশ্বাস নিতে পারবেন? এই দারিদ্র্যের কশাঘাত কি সইবে আপনার?
হেমাঙ্গিনী স্বীয় বসনাঞ্চল দিয়ে মেঝের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে এক অপার্থিব স্মিত হাসল। সেই হাসিতে মিশে ছিল পরম স্বস্তি। সে মৃদুকণ্ঠে উত্তর দিল,
- হুজুর, ঐশ্বর্যের সেই স্বর্ণপিঞ্জরে আমি কেবলমাত্র মরীচিকা দেখেছি, শান্তি নয়। আজ এই ছিন্ন চালের রন্ধ্র দিয়ে যখন আকাশের ধ্রুবতারা দেখব, তখন জানব আমি আমার পরম আশ্রয়ের ছায়াতলে আছি। এর চেয়ে সমৃদ্ধ মহল আমার আর চাই না। সত্যিই চাই না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, এই ধ্বংসাবশেষকেই আমি আপনার ঘর বানিয়ে তুলব।
তাইমুর এক সুদীর্ঘ উষ্ণ নিশ্বাস ফেললেন।
পেটে ক্ষুধার লেলিহান শিখা জ্বলছে। হেমাঙ্গিনীর সেই লাবণ্যময় মুখখানিও অনাহারে পাণ্ডুর হয়ে এসেছে। তাইমুর বুঝলেন, এখন আর ভাববিলাসিতার লগ্ন নেই।
– অন্নের সন্ধানে যে আমায় এখন বের হতে হবে, হুর-এ-মন! সাবধানে থাকুন। আমার ফিরে আসার প্রহর গুনুন।
হেমাঙ্গিনী মিষ্টি হেসে সায় দিল সে কথায়।
তাইমুর কুটির ছেড়ে বেরিয়ে এলেন অন্নের সংস্থানে।
হিমলতলী গঞ্জের কোলাহল আজ তাইমুরের কাছে এক নতুন জগত। এখানে কেউ তাঁর বংশের পরিচয় জানে না, কেউ তাঁকে কুর্নিশ করে না। সবাই এখানে তার নিজস্ব জীবনযুদ্ধের এক একজন রণক্লান্ত সৈনিক। তাইমুর দেখলেন এক কাষ্ঠ ব্যবসায়ীর আড়তে প্রকাণ্ড সব কাঠের গুঁড়ি তরণী থেকে নামানো হচ্ছে। কিন্তু সেই বৃত্তিতে প্রবেশাধিকার মেলা ভার, কারণ সেখানকার শ্রমজীবী মানুষেরা এক দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেটে আবদ্ধ।
তাইমুর শ্রান্ত চরণে হাঁটতে হাঁটতে এক কামারশালার সম্মুখে এসে থামলেন। সেখানে কর্কশ শব্দে কৃষকদের ভগ্ন লাঙল আর কাস্তে শান দেওয়া হচ্ছে। কামার তখন একাকী এক বিশাল লৌহ-হাতুড়ি দিয়ে অগ্নিবর্ণ লোহাকে বশ করার বৃথা চেষ্টা করছিল। তাইমুর সম্মুখে অগ্রসর হয়ে দৃঢ়স্বরে বললেন,
- ও ভাই, তোমার কি কোনো যোগ্য সহকারীর প্রয়োজন আছে? আমি শারীরিক শ্রম দিতে কুণ্ঠাবোধ করি না।
কামার তাঁর বলিষ্ঠ অবয়ব আর প্রশস্ত বক্ষপট দেখে কিঞ্চিৎ সংশয়ে পড়ল।
– বাপু, এ তো অগ্নিকুণ্ডের খেলা। তোমার এই রাজপুত্রের ন্যায় কোমল করতল তো পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাবে। পারবে এই দশাসই হাতুড়ি দিয়ে লোহাকে শাসন করতে?
তাইমুর কোনো বাদানুবাদে লিপ্ত হলেন না। তিনি স্বীয় চাদরটি সযত্নে একপাশে সরিয়ে সেই তপ্ত অগ্নিকুণ্ডের সম্মুখে গিয়ে দণ্ডায়মান হলেন। উত্তপ্ত লৌহপিণ্ডের ওপর যখন তিনি প্রথম হাতুড়ির আঘাত হানলেন, তখন প্রতিটি প্রহারে তাঁর পেশিতন্তুগুলো এক অলৌকিক শক্তিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। যে হাত একসময় সূক্ষ্ম তলোয়ারের শৈল্পিক চালনা আর তুখোর ঘোড়ার বলগা ধরতে অভ্যস্ত ছিল, আজ সেই হাত জীবনযুদ্ধের তাগিদে লোহা পিটিয়ে নিজের ভাগ্য প্রসন্ন করবার চেষ্টায় মগ্ন। আগুনের লেলিহান শিখায় তাঁর গৌরবর্ণ ললাট বেয়ে ঘর্মবিন্দু ঝরছে ঠিকই, কিন্তু সে ঘাম তার অজেয় সংকল্পকে দমাতে পারল না।
সারাদিনের সেই হাড়ভাঙা শ্রম শেষে কামার অতিশয় সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে যৎসামান্য তাম্রমুদ্রা আর কিঞ্চিৎ তণ্ডুল ও লবণ প্রদান করল। তাইমুরের নিকট আজ এই সামান্য উপার্জিত অন্ন যেন গজনবী এস্টেটের সমগ্র খাজনার চেয়েও অধিক মূল্যবান।
ওদিকে হেমাঙ্গিনীও নিরাসক্ত হয়ে বসে থাকেনি। সে কুপজল দিয়ে সেই জীর্ণ কক্ষটিকে ধুয়ে মুছে স্নিগ্ধ করে তুলেছে। উঠোনের সেই অরণ্যসম আগাছাগুলো সে স্বহস্তে নির্মূল করেছে। জীর্ণ ঘরটি এখন দৈন্যদশাগ্রস্ত হলেও তাতে এক গৃহিণীর যত্নের স্পর্শ লেগেছে। সে পথের পাশে পড়ে থাকা শুষ্ক কাষ্ঠখণ্ড সংগ্রহ করে এক আদিম উনুন নির্মাণ করেছে। ক্ষুধার জ্বালায় দেহ অবসন্ন হলেও সে উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রতীক্ষা করছিল তার প্রাণের তাইমুরের জন্য।
নিশুতি রাতের অন্ধকারে যখন চতুর্দিক নিমজ্জিত, তখন দূরে এক ছায়ামূর্তি দৃশ্যমান হলো। তাইমুর ফিরছেন। তাঁর হস্তে অতি সামান্য এক পুঁটলি।
হেমাঙ্গিনী ব্যাকুল হয়ে সম্মুখে ধাবিত হলো। তাইমুর শ্রান্ত দেহে উঠোনের এক কোণে উপবেশন করলেন। তাঁর সেই অভিজাত করতল আজ হাতুড়ি চালনার ফলে রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। কোথাও কোথাও ফোসকা পড়ে চামড়া বিবর্ণ হয়ে গেছে।
হেমাঙ্গিনী তাঁর সেই ক্ষতবিক্ষত হাত দুটি গালে চেপে ধরে আর্তনাদ করে উঠল।
- হুজুর, একি সর্বনাশ করেছেন! আপনার এই আজ এমন ক্ষতবিক্ষত! আমার এই অলক্ষুণে কপালের সংস্পর্শে এসেই এমন দশা হল।
তাইমুর তাঁর রক্তিমাভ ক্লান্ত নয়ন মেলে চাইলেন। তিনি পুঁটলি থেকে বের করলেন একখানা স্থূল খসখসে চাদর, দুখানি মৃৎপাত্র আর যৎসামান্য আহার্য।
- কাঁদবেন না, বেগম। এই রক্তই তো আজ আমায় মুক্তি দিল। নিজের স্বেদবিন্দুতে কেনা শুদ্ধ অন্ন গ্রহণ করব আজ। এই দেখুন, বিশ্রামের জন্য একখানা চাদরও এনেছি। আজ আর এই ধরণীর ধুলোয় বিমর্ষ হয়ে শুতে হবে না।
হেমাঙ্গিনী কম্পিত হস্তে সেই তণ্ডুল দিয়ে যৎসামান্য লবণ-লঙ্কা সহযোগে অন্ন প্রস্তুত করল। মৃৎপাত্রে শ্রীহীন আহার্য পরিবেশন করে সে তাইমুরের সম্মুখে ধরল। তাইমুর লক্ষ্য করলেন হেমাঙ্গিনীর হাত ক্ষুধায় কাঁপছে। তিনি স্বয়ং এক গ্রাসও গ্রহণ না করে ভাতের নলা মেখে হেমাঙ্গিনীর মুখের সন্নিকটে ধরলেন।
- বেগম সাহেবা, আজ থেকে এই অধমের শ্রমেই আপনার জীবন সচল থাকবে। মুখ খুলুন।
হেমাঙ্গিনী অশ্রুসিক্ত নয়নে সেই অন্ন গ্রহণ করল। জীবনে তারা কত রাজকীয় মেজবানি আর পঞ্চব্যঞ্জন আস্বাদন করেছে, কিন্তু আজ স্বামীর এই মেহনতি করস্পর্শে সেই সামান্য অন্নও কিভাবে যেন অমৃতের স্বাদ এনে দিল।
জ্যোৎস্না প্লাবিত সেই নিস্তব্ধ উঠোনে বসে তাঁরা একে অপরকে পরম মমতায় খাইয়ে দিলেন।
রাত্রি যখন সুগভীর হলো, তখন সেই ভগ্ন কুটিরের মেঝেতে চাদরটি বিস্তৃত করে তাঁরা শুয়ে পড়লেন।
মস্তকের নিচে কোনো কোমল রেশমি উপাধান নেই। তাইমুর স্বীয় বলিষ্ঠ ও সুদীর্ঘ বাহুটি হেমাঙ্গিনীর মস্তকের নিচে ন্যস্ত করলেন। হেমাঙ্গিনী তাইমুরের প্রশস্ত বক্ষের উষ্ণতায় মুখ লুকিয়ে ফেলল। সমস্ত শঙ্কা মুহূর্তেই বিস্মৃত হলো। ফিসফস করে বলল,
– হুজুর, স্বর্ণখচিত বালিশের চেয়েও আপনার এই সান্নিধ্য আমার নিকট অনেক বেশি স্বর্গীয়। আজ এই নিঃসঙ্গ নিশীথিনী, এই ভগ্ন কুটির আর আপনার এই হৃৎস্পন্দনের ছন্দ এমন রাজ্যে রাজত্ব করতে পেরে আমি সত্যিই নিজেকে ভাগ্যবতী বলে মনে করছি। আমার প্রকৃত রাজত্ব।
তাইমুর হাসল। বলল,
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৩৩
– নিদ্রা যান এখন, বেগম সাহেবা। আগামীর দিনগুলো আমাদের জন্য জটিল হতে চলেছে।
বাইরের বাঁশঝাড়ে পেরিয়ে বাতাসের শাঁ শাঁ গর্জন শোনা যাচ্ছে। নদীর বুক থেকে আসা হিমেল বাতাস কুটিরের রন্ধ্র দিয়ে প্রবেশ করছে। কিন্তু দুটি অবাধ্য আত্মা আজ এক জীর্ণ চাদরের অন্তরালে আগামীর স্বপ্ন বুনতে ব্যস্ত।
জমিদারপুত্রের এই মহান বিসর্জন আর একজন বাঈজীর সহসা এই আগমন কি হিমলতলী গ্রামে নতুন কোনো ইতিহাসের সূচনা করবে?
