আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৫৩
কায়নাত খান কবিতা
__ডোন্ট ইউ লাভ মি এ্যানিমোর কিং?”
__নো..!”
কিছু কিছু কথা থাকে না, যেগুলো আমাদের ভিতর থেকে ভেঙে চুড়ে তচনচ করে দেয়, কিংশুকের এই এক বাক্যের কথাটি ও ছিলো ঠিক সে-রকমই।তবু ও কেন যেন অরিন মানতে নারাজ হয়ে পরে। যেই মানুষটি তাকে এভাবে ভেঙে চুড়ে চেয়েছে, সেই মানুষটিই আজ তাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
__কিং! আপনি মিথ্যা বলছেন রাইট?”
__ নো! আই ডোন্ট লাভ ইউ এ্যানিমোর।’
পাথর মূর্তির মতো হয়ে দাড়িয়ে পরে অরিন।কিংশুক তাকে দেখে ও না দেখার ভাঙ্গ করে চলে যেতে থাকে। কিন্তু পারে না।তার আগেই হাতে আরেকটি হাতের শক্ত বাঁধন অনুভব করে সে।
__কিং, আমি থাকতে চাই আপনার সাথে।’
__আমি চাই না।’
__কেন চান না? এতোদিন তো ঠিকই চাচ্ছিলেন।এখন কেন নয়?’
__ভুল করেছি।আর নয়।’
এক ঝাটকা মেরে নিজের হাত অরিনের হাত থেকে সরিয়ে নেয় কিং। কিন্তু অরিন শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কিংশুককে।
__অরিন ছাড়!’
__আমি আপনাকে ছাড়বো না কিং।’
__অরিন ছাড়তে বলেছি।’
__ নো…!”
__অরিনহহ।’
নিজের থেকে আলাদা করে খুব জোড়ে অরিনের গাল বরাবর চ’ড় বসিয়ে দেয় কিংশুক। অসহায়ের মতো গাল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে অরিন।
__আই ডোন্ট লাভ ইউ। চলে যা আমার জীবন থেকে। বাঁচতে দে আমাকে।জাস্ট গোওওও।”
খুব জোড়ে ধমকিয়ে ওঠে কিংশুক অরিনকে। ধমক এতোটাই জোড়ে ছিলো যে রিতীমত অরিনের সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে । গালে হাত দিয়েই নিজেই রুমে চলে যায় অরিন। কিংশুক ও রাগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পরে। প্রচন্ড দম বন্ধ লাগছে তার।এখন অরিনের আশেপাশে থাকলে হয়তো আবার ও তার রাগের পারদ ফেটে পড়বে। তাই সে ও চুপচাপ বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পড়ে।
নিজের রুমে এসে what’s app এ একটা পরিচিত নাম্বার ডায়েল করে অরিন। আজ একজন বিশেষ মানুষকে তার বড্ড দরকার।এই বিশেষ মানুষটি ছাড়া আর কেউ এখন আগলে রাখতে পারবে না।
কাঁপা কাঁপা হাতে কোনো রকম নাম্বারটি ডায়াল করে অরিন।কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ফোন রিসিভ হয়ে যায়।
__বেটা..!”
পরিচিত কন্ঠস্বর কানে ভেসে আসতেই গলা শুকিয়ে আসে অরিনের। এতো বছর পর অভিমানের বাধ ভাঙ্গল তার। কী দিয়ে শুরু করবে সে? কিছু ক্ষণ চুপ হয়ে থাকে সে।চোখ দিয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পরে।
__পাপা!”
__ইতনে দিন বাদ ইয়াদ আইয়ি পাপা কী? ইতনা নারাজ কন হোতা তে বেটা?”
__ সাচ পাতা হেনি থা-না পাপা। ওর আপনে ভী তো বলা নেহি কুচ।”
__বেটা মে আপনি বিভিকে বারে মে কেসে বলু? ও ভী আপনি বেটিকে সাথ।”
প্রচন্ড কান্নায় ভেঙে পরে অরিন।এতোদিন রাগে অভিমানে যেই বাবার সাথে কথা বলেনি৷ সেই বাবা ও এতো গুলো বছর শুধু তারই প্রতিক্ষা করে গেছে। কোনো অভিযোগ ছাড়াই।
__পাপা! মে ঘার আনা চাহতিহু!”
__ঠিক হে বেটা। কাব আওগে। অর কিং?”
__ব্ভো নেহি আয়েগা পাপা। কাভি নেহি।”
__কিউ?”
__হি ডাজেন্ট লাভ মি এ্যানিমোর পাপা।”
__আপ বাততো কারো উসছে পেলহে।”
__হাউ কুড আই পাপা? পেহলে লাগতা থা হি লাভ মি। বাট নাউ। হি ডোন্ট ইভেন ওয়ান্ট টু সি মাই ফেস পাপা। মে ঘার আনা চাহতি হু”
কিছু কিছু সম্পর্ক থাকে যেগুলো একবার ভেঙে গেলে আর জোড়া লাগে না। অরিন এবং কিংশুকের ও ছিলো তাই। তাদের সম্পর্কটি ও এমন ভাবে ভাঙ্গে অরিন শত চেষ্টা করে ও তা আর জোড়া লাগাতে পারে না। শেষ পর্যায়ে এসে অরিন গিফ-আপ করে ফেলে। বেরিয়ে পরে অজানা গন্তব্যে।
__রাত তখন প্রায় এগারোটার কাছাকাছি।ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগোচ্ছে, কিন্তু খান বাড়ির ভেতরে সময় যেন থমকে আছে।কিংশুক দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে।তার হাঁটার শব্দটাও আজ একটু ভারী।যেন প্রতিটা পদক্ষেপে অনুশোচনার চাপ লেগে আছে।
বাড়িতে ঢুকেই সে সোজা উঠে যায় অরিনের রুমের দিকে।মনে একটা অদ্ভুত টান।আজকের কাজটা ঠিক হয়নি।থাপ্পড়ট দেওয়া উচিত হয়নি।
করিডোরটা অস্বাভাবিক চুপচাপ।হালকা বাতাসে পর্দা দুলছে, তবু কোথাও কোনো শব্দ নেই।অরিনের দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই
— “কিং”
কিংশুক থামে।পিছনে তাকায়।আতিয়া বেগম দাঁড়িয়ে থাকে তার পিছনে ।চোখে ক্লান্তি, মুখে এক ধরনের চাপা গাম্ভীর্য।তার হাতে একটা খাম।আর তার সঙ্গে ছোট্ট একটা চিরকুট।কিছু না বলে তিনি খামটা কিংশুকের হাতে ধরিয়ে দেন।কিংশুক কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকে।ভ্রু কুঁচকে যায় তার দিকে ।মনের ভেতর হঠাৎ করেই অজানা এক অস্বস্তি দানা বাঁধে।সে আর দেরি করে না।খামটা খুলে ফেলে।ভেতরে কিছু কাগজ।
একটার পর একটা উল্টাতে থাকে সে।আর প্রতিটা পাতার সাথে সাথে তার মুখের রং বদলাতে থাকে।
— “ওমর!”
কণ্ঠস্বরটা পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে দেয়।কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দৌড়ে আসে ওমর।
— “জি বস!”
— “পুরা শহর লক করে দে।একটা গাড়িও যেন শহর থেকে বের হতে না পারে।”
___ওকে বস!”
‘রাতের_বেলা’
রাত তখন প্রায় ১টা ৫০।চলন্ত বাসের ভেতরে এক অদ্ভুত নীরবতা। কেউ আধো ঘুমে, কেউ ফোনের আলোয় ডুবে—সবাই নিজের জগতে ব্যস্ত।কিন্তু একজনের চোখে ঘুম নেই।অরিন।তার চোখ দুটো লালচে, ক্লান্ত… তবুও ভেতরের শক্তিটা অদ্ভুতভাবে অটুট। যেন ভেঙে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে সে। হঠাৎ তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে পুরো বাসটি।
বাস জোরে ব্রেক করতেই চারপাশে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। কেউ সামনে পড়ে যায়, কেউ বিরক্ত হয়ে উঠে বসে।কিছুক্ষণের মধ্যেই কনডাক্টরের গলা শোনা যায়
পুরো শহরে চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে।
কোনো যানবাহন এগোতে পারবে না।
খবরটা শুনে বাসজুড়ে , বিরক্তি, অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে।
__করো না কী আবার চলে আসলো? পুরো শহর লক কেন জারি করা হলো। ধূর আমার কপালই খারাপ। এর থেকে ভালো ইন্ডিয়া চলে যেতাম, ধূর ধূর!”
বাসের যাত্রীরা যে যার মতো বাস ড্রাইভারকে তুলোধুনো করতে থাকে। যেন সম্পূর্ণ দোষটি তার।সে কেন বাস থামালো। এমনিতে ও কোন নিয়ম-নীতি মানে তারা?
বাস যাত্রীরা যখন যে যার মতো করে হট্টগোল করতে ব্যস্ত ঠিক তখনই কয়েকটি গাড়ি এসে পুরো বাসটিকে গোল করে ঘেরাও করে। একই রং এর কয়েকটি গাড়ি। তাদের মাঝখান থেকে সামনের দিকে এগিয়ে বসতে থাকে আরেকটি গাড়ি। অরিন জানালা দিয়ে দেখার চেষ্টা চালিয়ে যায়, আসলে হচ্ছে টা কী?
গাড়িটি যতটা স্পষ্ট হচ্ছিল, অরিনের ভয়ভীতি ততটাই বেড়ে যাচ্ছিল। গাড়িটি আর একটু সামনে আসতেই ভালো মতো পরখ করে অরিন। কালো ভিন্ন ব্রান্ডের গাড়ি যার সামনে কোবরা ট্যাটু আঁকা। গাড়িটি দেখেই অরিন বুঝতে পারে এটা কিংশুকের গাড়ি।
__কার মুখে দেখে আজকে ঘুম থেকে উঠেছিলাম?”
সিটে সম্পূর্ণ মাথা হেলিয়ে দেয় অরিন। কারণ তাকে দেখা গেলেই মুশকিল। এমনিতে সে যা করে এসেছে, আজ আর রক্ষা হচ্ছে না। তাই নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা চালিয়ে যায় অরিন।
কিন্তু অরিনের ধারণা ভুল প্রমাণিত করে কিংশুক ঠিক তার জানালার পাশে গাড়ি দাড় করায়। আর মাইক নিয়ে দাড়িয়ে পরে।
___মাই ডিয়ার পলাতক বউ! আপনি কী নিজ ইচ্ছেতে বাস থেকে নামবেন? না-কি আমি আমার স্টাইলে আপনাকে নামাবো? Choice is yours!”
কিংশুকের আল্টিমেটাম শুনে কিছুটা ঘাবড়ে যায় অরিন।কিংশুক ঠিক কতটা ধৈর্যশীল বান্দা এটা তার থেকে ভালো আর কারো জানা নেই।
অরিন তখন ও ঘাপটি মেরে বসে থাকে।এক পযার্য়ে কিংশুক ইশারা করতেই সকলে পেট্রোল ঢালতে শুরু করে চারপাশে।
এমন পরিস্তিতি দেখে বাসে থাকা যাত্রীরা প্রচন্ড ভয় আর আতঙ্কে পরে যায়। তারা খুব কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। আর বলতে থাকে বাসে কে এমন আছে যার জন্য এসব হচ্ছে।
অরিন শুরুতে একটু জড়তা করলে ও পরে ভদ্র মেয়ের মতো চুপচাপ বাস থেকে নেমে পরে। আর একটু একটু করে সমনে আসতে থাকে।কিংশুক বাজ পাথির মতো অরিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোয়াল খুব শক্ত। রাগে রগ গুলো টান টান করছে। কিংশুককে দেখা মাত্র অরিনের সে-রাতের কথা মনে পরে যায়!
__আল্লাহ! এবার ও কী গাড়ির পিছনে দৌড় করাবে।! আমি তো কিছু খেয়ে ও আসি নি। শরীরে শক্তি ও নাই। দৌড়বো কীভাবে!’”
অরিন মনে মনে দোয়া পড়তে থাকে আর এক পা এক পা করে কিংশুকের দিকে এগোতে থাকে।
কিংশুক অরিনের সামনাসামনি আসতেই সে থেমে যায় আর অরিন নিজের দু-হাত দিয়ে শক্ত করে জামা খামচে ধরে।
কিংশুক দু-হাত ভাজ করে অরিনের সামনে দাড়ায়। আর কিছু ক্ষণ ওইভাবেই তাকিয়ে থাকে।
__ওমর কাগজটা দে তো।”
কিংশুকের কথা মতো ওমর তার হাতে কাগজ গুলো দিয়ে দু-কদম পিছিয়ে যায়।কিংশুক একটি চিরকুট নিয়ে অরিনের সামনে ধরে।
__এটা কী লেখেছিস পড়।’
অরিন চিরকুটটি হাতে নিয়ে দেখে তার লেখা চিরকুট। ভয়ে কিংশুকের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার ও চোখ নিচে নামিয়ে নেয় অরিন।
আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৫২
__জলদি পড়।’
কিংশুকের ধমকে অরিন ধীরে ধীরে পড়া শুরু করে।
__ফা**ক ইউ কিংশুক।”
__পুরোটা পড়”
__ফা**ক ইউ কিংশুক কু’ত্তা”
কিংশুক চিরকুটটি টান মেরে মাটিতে ফেলে দেয় আর চোয়াল শক্ত করে বলে,,
__একটা ঠা টিয়ে চ’ড় মারবো বেয়াদব মেয়ে। নিজের স্বামীকে কেউ কু’ত্তা বলে?”
