ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৭
ছায়া
স্কুলের করিডোর তখন নিস্তব্ধ। ইলিয়ানা সেই সুদর্শন পুরুষটির চোখের দিকে তাকিয়ে আছে, যার দৃষ্টিতে হাজার বছরের চেনা এক মমতা। লোকটির ধবধবে সাদা রুমাল দিয়ে রক্ত মোছার সময় ইলিয়ানা এক অদ্ভুত ঘ্রাণ পেল যেটা ইলিয়ানার খুব পরিচিত। লোকটি মৃদু হেসে ইলিয়ানার মাথায় হাত রাখল।
লোকটিঃ- ভয় পেয়ো না ছোট প্রিনসেস। কপালে সামান্য একটু কেটেছে, বাসায় গিয়ে মামুনিকে বলবে একটু ড্রেসিং করে দিতে ঠিক আছে?
ইলিয়ানা মুগ্ধ হয়ে লোকটির কণ্ঠস্বর শুনছে। এমন গম্ভীর অথচ নরম আওয়াজ সে আগে কখনো শোনেনি।সে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই লোকটি উঠে দাঁড়াল।
ইলিয়ানাঃ- আপনি কি আমার সাথে কথা বলবেন না? আপনি কে?
লোকটি কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু একবার অদ্ভুত এক বিষণ্ণ দৃষ্টিতে ইলিয়ানার দিকে তাকিয়ে করিডোর দিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে চলে গেল। ইলিয়ানা শুধু তার লম্বা গড়ন আর নেভি ব্লু শার্টের পেছনের অংশটুকু দেখতে পেল। তার মনে হলো, লোকটা যেন এই পৃথিবীর কেউ নয়, কোনো স্বপ্ন থেকে উঠে এসেছে।
টিফিন পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর ইলিয়ানা ক্লাসে ফিরে এল। ক্লাসের অন্য বাচ্চারা আরিফের কাণ্ড দেখে চুপচাপ বসে আছে। এমন সময় ক্লাসে প্রবেশ করলেন স্কুলের প্রিন্সিপাল স্যার সাথে সেই দীর্ঘদেহী সুদর্শন পুরুষটি।
প্রিন্সিপালঃ- গুড মর্নিং স্টুডেন্টস আজ তোমাদের জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। তোমাদের পুরনো ইংরেজি টিচার লিভ নিয়েছেন,তার জায়গায় আজ থেকে তোমাদের নতুন ক্লাস টিচার হিসেবে জয়েন করছেন মিস্টার নিরব চৌধুরী
পুরো ক্লাস স্তব্ধ হয়ে গেল।ইলিয়ানা তো চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। এই তো সেই মানুষটা চশমার আড়ালে সেই তীক্ষ্ণ চোখ দুটো যখন ইলিয়ানার দিকে তাকাল, তখন ইলিয়ানার মনে হলো তার হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাবে।
মিস্টার নিরব ডেস্কে দাঁড়িয়ে সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। তার ব্যক্তিত্ব এতটাই প্রখর যে পুরো ক্লাসে পিনপতন নীরবতা নেমে এল।
নিরবঃ- হ্যালো এভরিওয়ান আমি নিরব আজ থেকে আমি তোমাদের বন্ধু এবং শিক্ষক। তবে আমার ক্লাসে একটা নিয়ম আছে কেউ কাউকে ছোট করবে না বা গায়ে হাত তুলবে না।
বলতে বলতেই নিরবের দৃষ্টি আরিফের দিকে গেল। আরিফ ভয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। নিরব এরপর ধীরে ধীরে হেঁটে ইলিয়ানার বেঞ্চের সামনে এসে দাঁড়াল।
নিরবঃ- তোমরা কি কেউ জানো ইলিয়ানার বাবা একজন বীরসৈনীক ছিলেন। সে আমাদের দেশের জন্য যুদ্ধ করেছে। আমার সবার উচিত ইলিয়ানাকে সম্মান করা।
নিরবের কথা শুনে পুরো ক্লাস অবাক! স্যার কি ইলিয়ানার নাম আগে থেকেই জানেন?
ইলিয়ানাঃ- আপনি কি সত্যিই আমাদের টিচার?
নিরব মৃদু হাসল এই হাসিতে যেন মায়া ঝরছে।
নিরবঃ- হ্যাঁ আমি তোমাদের নতুন টিচার আর তোমার সাথে যেহেতু প্রথম দেখা তাই আজ থেকে আমরা বন্ধু অকে।
নিরব হাত বারিয়ে দিলো এটা দেখে ইলিয়ানা হাত বাড়িয়ে বন্ধুত্ব করে নিলো।
ইলিয়ানাঃ- কিন্তু আপনি আমার সম্পর্কে এত কিছু কিভাবে জানলেন?
নিরব মুচকি হেসে উত্তর দিলো
নিরবঃ- আমি তোমার বায়োডাটা পড়েছি দেখান থেকেই জেনেছি।
ইলিয়ানা ছোট ছোট চোখ টিমকিয়ে বলল
ইলিয়ানাঃ- ঠিক আছে তাহলে কাল আমি আপনাকে আমাদের বাড়ির ফুল গিফট করবো।
নিরব আজ ক্লাসে সবার পরিচয় নিয়ে ছুটি দিয়ে দিলো। ছুটির পর ইলিয়ানা এসে দেখে গেটের সামনে শাহরিয়ার দাঁড়িয়ে আছে। ইলিয়ানা দৌড়ে শাহরিয়ার এর কাছে গেলো।
শাহরিয়ার ইলিয়ানাকে নিয়ে সে যখন গাড়িতে উঠতে যাবে, তখন ইলিয়ানা তখন শাহরিয়ার এর শার্ট টানিছে। নিরব তখন তার কালো গাড়িটির দিকে যাচ্ছিল।
ইলিয়ানাঃ- মামা দেখো এই যে আমার নিরব স্যার। উনিই আমাকে আজ আরিফের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন।
শাহরিয়ার ফিরে তাকাল নিরবের দিকে কিন্তু ততক্ষণে নিরব গাড়িতে উঠে পড়েছে। শাহরিয়ার শুধু নিরবের পিঠ দেখতে পেলো। শাহরিয়া ইলিয়ানাকে নিয়ে বাড়ি চলে গেলো।
আর শাহরিয়ার ইলিয়ানাকে বলে দিয়েছে মারামারির বিষয় যেনো ইলা না জানে তাহলে দুজনকেই রিমান্ডে নিবে।তাই ইলিয়ানা চুপচাপ কিছু বলেনি।
পরের দিন সকালের নরম রোদে বারান্দায় ইলা বসে আছে। হাতে এক কাপ চা, চোখে একটা শান্ত ক্লান্তি।
ইলিয়ানা সকালে উঠে বাগানে হাটছে লম্বা চুল খোলা, গায়ে হলুদ রঙের ফ্রক, পায়ে ছোট্ট সাদা জুতো। সে বাগানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটা ছোট্ট বেলুন হাতে নিয়ে ঘুরছে আর চিৎকার করে ডাকছে
ইলিয়ানাঃ- মামা মামা দেখো আমি উড়তে পারি।
শাহরিয়ার তখন বাগানের এক কোণে ছোট্ট একটা সুইং সেট করছে। পাঁচ বছর ধরে শাহরিয়ার এই বাড়িটাকে আরও নিখুঁত করে তুলেছে প্রতিটা কোণে ইলিয়ানার জন্য কিছু না কিছু। সুইং, স্লাইড,ছোট্ট স্যান্ডপিট, এমনকি একটা ছোট্ট গাছের নিচে বেঞ্চ যেখানে ইলা বসে বই পড়ে আর ইলিয়ানা তার পায়ের কাছে খেলা করে।
শাহরিয়ার মুখ তুলে হাসল। তার নোহার ভালোবাসা হারিয়ে কিছুটা পাথর হয়ে গেলেও ইলিয়ানা সেই অভাবটা পূরণ করে দিয়েছে।
শাহরিয়ারঃ- উড়তে পারবি না রাজকন্যা, তবে আমি উড়িয়ে দিতে পারি এদিকে আয়।
ইলিয়ানা দৌড়ে এসে শাহরিয়ারের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শাহরিয়ার তাকে কোলে নিয়ে ঘুরিয়ে দিল, তারপর বেলুনটা আলতো করে ছেড়ে দিল। বেলুনটা উঠতে উঠতে গাছের ডালে আটকে গেল।
ইলিয়ানাঃ- ওহ নো আমার বেলুন
শাহরিয়ার হেসে বলল,
শাহরিয়ারঃ- চিন্তা নেই মামা উড়তে পারে।এখনি উড়ে আমার ইলিয়ানার বেলুন এনে দিবে।
শাহরিয়ার ইলিয়ানাকে কাঁধে বসিয়ে গাছের দিকে এগোল। এক লাফে ডাল ধরে বেলুনটা খুলে নিয়ে ইলিয়ানার হাতে দিল। মেয়েটা চিৎকার করে হাততালি দিল।দূর থেকে ইলা তাদের এই দুষ্টুমি শুনছে
ইলাঃ- তোমরা দুজনেই একদম এক। দুষ্টুমিতে কারো কাছে কম যাও না।
ইলিয়ানা মায়ের দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসল।
ইলিয়ানাঃ- মা আমি তো মামার মতোই হবো। সবচেয়ে স্ট্রং, সবচেয়ে ব্রেভ।
শাহরিয়ার আর ইলা দুজনেই একসাথে হেসে উঠল। কিন্তু ইলার হাসিতে একটা ছায়া মিশে আছে। ইলিয়ানা আবার বেলুন নিয়ে খেলা শুরু করলো। ইলা শাহরিয়ার এর পাশে এসে চুপ করে দাঁড়াল। দুজনেই অনেকক্ষণ চুপ।
ইলাঃ- ভাইয়া…ইলিয়ানা আজ সকালে একটা প্রশ্ন করেছে।
শাহরিয়ার অবাক হয়ে ইলার দিকে তাকিয়ে বলল
শাহরিয়ারঃ- কি প্রশ্ন??
ইলাঃ- রাতে খেলতে খেলতে হঠাৎ বলল
“মাম্মাম” আমার পাপা কোথায়? সবার তো পাপা থাকে। আমার পাপা টা কেন আসে না?
শাহরিয়ার এর বুকটা ধক করে উঠল। সে চোখ বন্ধ করল।
শাহরিয়ারঃ- তুই কী বলছিস?
ইলাঃ- বললাম তোমার পাপা অনেক দূরে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে। কিন্তু সে তোমাকে সবসময় দেখছে। তোমার প্রতিটা হাসি, প্রতিটা দৌড়, প্রতিটা কথা সব তার কাছে পৌঁছে যায়। ঐযে আকশের সব চেয়ে বড় স্টার টা দেখা যাচ্ছে ঐটা তোমার পাপা।
কথাটা শেষ করে ইলা নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল।
ইলাঃ- এভাবে কতদিন অকে বুজ দিবো ভাইয়া।
শাহরিয়ার গভীর নিঃশ্বাস নিল।
শাহরিয়ারঃ- যতদিন না ও নিজে থেকে বুঝতে পারে। কিন্তু বনু আমি মনে করি ও ইতিমধ্যেই অনেক কিছু বুঝে ফেলেছে। ওর হাসিতে যে দৃঢ়তা, সেটা বলে দেয় ইলিয়ানা এই বয়সে অনেক ম্যাচিউর এর মতো কাজ করে। আর ও যখন আমাকে “বাবা” বলে ডাকে ওর মনে হয় ও আমার মাধ্যমে আরিয়ান স্যারকেই খুজে।
ইলা শাহরিয়ারের দিকে তাকাল। তার চোখে কৃতজ্ঞতা আর একটা গভীর বোঝাপড়া।
ইলাঃ- তুমি না থাকলে আমরা দুজনেই ভেঙে পড়তাম ভাইয়া। তুমি আমাদের….
শাহরিয়ার মাথা নেড়ে থামিয়ে দিল।
শাহরিয়ারঃ- আমি তোদের কিছু দেইনি বনু। তোরা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিস। ইলিয়ানার প্রতিটা “মামা” বলাটা তোর প্রতিটা হাসি আমাকে “ভাই” ডাকা এগুলো আমার বেঁচে থাকার কারণ।
হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে ইলিয়ানার ছোট্ট গলা ভেসে এল
ইলিয়ানাঃ- মা… মামা… পানি…
দুজনেই হেসে উঠল শাহরিয়া ঘরের দিকে যেতে যেতে বলল,
শাহরিয়ারঃ- বনু তুই আস্তে আস্তে আয় আমি দেখি রাজকন্যার কি হলো।
শাহরিয়ার ভেতর গিয়ে দেখে ইলিয়ানার খিলখিল করে হাসছে। ইলিয়ানার স্কুলে যাওয়ার উৎসাহ একটু বেশিই।কারণ সেখানে অনেক মানুষ আর ইলারিয়ান এর স্বপ্নবাগানে তারা তিনজন আর দুটো কাজের লোক আর চারজন গার্ড ছাড়া আর কেউ নেই। তাই ইলিয়ানা স্কুল যাওয়ার পর থেকে তার অনেক ভালোলাগে। ইলিয়ানা স্কুল ড্রেস পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
শাহরিয়ার ঘরে ঢুকে হাতে একটা চিরুনি আর কয়েকটা রঙিন হেয়ার ব্যান্ড নিল। ইলা তখন বিছানায় এসে বসে হাতড়ে হাতড়ে ইলিয়ানার স্কুল ব্যাগটা গোছানোর চেষ্টা করছে।
শাহরিয়ারঃ- রাজকন্যা এদিকে আয়। আজ তোর চুলে একটা নতুন স্টাইল করে দেবো রাতে আমি এটা ইউটিউব দেখে শিখেছি।
ইলিয়ানা দৌড়ে এসে শাহরিয়ারের সামনে দাড়ালো। শাহরিয়ার খুব যত্ন করে ইলিয়ানার লম্বা রেশমি চুলগুলো আঁচড়ে দিতে লাগল। ইলা দূর থেকে ওদের কথার আওয়াজ শুনে মৃদু হাসছে।
ইলিয়ানা হঠাৎ আয়নায় শাহরিয়ারের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে বলল
ইলিয়ানাঃ- মামা একটা কথা জিজ্ঞেস করব? সত্যি করে বলবে কিন্তু।
শাহরিয়ার বিনুনি করতে করতে বলল
শাহরিয়ারঃ- হ্যাঁ রে বুড়ি বল কী বলবি? তোর জন্য তো আমি সাত চড়েও রা কাড়ি না।
ইলিয়ানা মুখটা একটু গম্ভীর করে বলল
ইলিয়ানাঃ- মামা তুমি কি কখনো বিয়ে করবে না? ক্লাসে মুনিয়ার মামার বিয়ে হলো গত সপ্তাহে, অনেক মজা হয়েছে বলল। তোমার বিয়েতে আমি লাল লেহেঙ্গা পরতে চাই। মজা করতে চাই। তুমি কেন বিয়ে করছো না?
শাহরিয়ারের হাতের চিরুনিটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল নোহার সেই আকুল আবেদন শাহরিয়ারের বুকটা হু হু করে উঠল, কিন্তু সে পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল। সে চায় না তার ব্যক্তিগত বিষাদ এই ছোট্ট মেয়েটার মনে কোনো ছায়া ফেলুক।
শাহরিয়ার হেসে উঠে বলল
শাহরিয়ারঃ- আরে আমার পাগলি রাজকন্যা আমি যদি বিয়ে করি, তবে তো তোর মামি এসে আমাকে শাসন করবে। বলবে ‘এতক্ষণ ভাগনির সাথে খেলছো কেন? যাও কাজে যাও। তখন তোকে কে সময় দেবে বল তো? আমি কি চাই আমার রাজকন্যার ভাগ অন্য কেউ নিক?
ইলিয়ানা ঠোঁট উল্টে বলল
ইলিয়ানাঃ- ধুুর তুমি শুধু মজার কথা বলে আমাকে ভুলিয়ে দাও। আমি কি ছোট আছি নাকি? আমি জানি তুমি আম্মু আর আমাকে ছেড়ে যাবে না বলেই বিয়ে করছো না। কিন্তু মামা তুমি তো বুড়ো হয়ে যাবা, মাম্মাম তো চোখে দেখেনা। তখন তো তোমাকে দেখার কেউ থাকবে না।
শাহরিয়ার এবার ইলিয়ানার গালটা টেনে দিয়ে বলল
শাহরিয়ারঃ- আরে আমাকে দেখার জন্য তো তুই আছিস।তুই যখন বড় ডাক্তার হবি, তখন তোর বুড়ো মামাকে তোর চেম্বারে বসিয়ে রাখবি। আমি সেখানে বসে বসে তোর পেশেন্টদের ভয় দেখাব। যারা ঔষধ খেতে চায় না তোর মত তখন কেমন হবে?
কথাটা শুনে ইলা খিলখিল করে হেসে উঠল। ইলার হাসি দেখে শাহরিয়ারের মনটা শান্ত হয়ে গেল।
ইলাঃ- “ভাইয়া” তুমি পারোও বটে ও তোমাকে সিরিয়াস প্রশ্ন করছে আর তুমি ওকে হাসাচ্ছো। তবে ইলিয়ানা ঠিকই বলেছে ভাইয়া, তুমি নিজের জীবনটাকে এভাবে আমাদের জন্য উৎসর্গ করে দিচ্ছো, এটা ভাবলে আমার খুব অপরাধবোধ হয়।
শাহরিয়ার গম্ভীর হয়ে গেল। সে ইলিয়ানার বিনুনি শেষ করে একটা কিউট ক্লিপ লাগিয়ে দিল।
শাহরিয়ারঃ- “বনু” তুই আবার শুরু করলি? তোদের খুশিই তো আমার জীবন। আর বিয়ে করলে তো আমাকে বউ কে সময় দিতে হতো তখন আমার বনু আর রাজকন্যাকে পাহারা দিত কে? ওসব কথা থাক। সরি আমার রাজকন্যা, আর মজা করব না। চল এবার ব্যাগটা নিয়ে গাড়িতে ওঠ।
ইলিয়ানা ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে শাহরিয়ারের হাত ধরল। সে এখনো একটু রাগ করে আছে।
ইলিয়ানাঃ- ঠিক আছে আজ মাফ করে দিলাম। কিন্তু আজ যদি তুমি আমার নিরব স্যারকে ধন্যবাদ না দাও, তবে আমি আর কথা বলব না।
শাহরিয়ার অবাক হলো
শাহরিয়ারঃ- আচ্ছা বাবা দেখা যাবে আগে স্কুলে তো চল।
স্কুলের গেটে নামিয়ে দেওয়ার সময় শাহরিয়ার দেখল সেই কালো গাড়িটি পার্ক করা। নিরব গাড়ি থেকে নেমে উল্টো হয়ে কথা বলছে তার পরনে আজ হালকা ছাই রঙের শার্ট।
শাহরিয়ার ইলিয়ানাকে বলল সে ছুটির সময় তার স্যার এর সাথে দেখা করবে এখন একটু ব্যস্ত।
ইলিয়ানা রাগ করে বলল
ইলিয়ানাঃ- মামুর বাচ্চা তুমি আমার স্যারকে ইগনোর করতিছো।
শাহরিয়ারঃ- রাজকন্যা আমি একটু ব্যস্ত প্রমিস আমি পরে এসে কথা বলবো।
শাহরিয়ার ইলিয়ানার কপালে চুমু দিয়ে চলে গেলো।ইলিয়ানা দৌড়ে গিয়ে নিরব স্যারের হাত ধরল।
ইলিয়ানাঃ- গুড মর্নিং স্যার দেখুন মামা আমার চুলে কেমন বিনুনি করে দিয়েছে।
নিরব নিচু হয়ে ইলিয়ানার চুলের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি।
নিরবঃ- খুব সুন্দর হয়েছে প্রিন্সেস তোমার মামা তো অনেক ভালো চুল বেধে দেয়। তা তোমার মামুনি কি করে শুনি সে সময় পায়না।
ইলিয়ানা হেসে বলল
ইলিয়ানাঃ- আমার মাম্মাম তো দেখতে পায় না তাই আমার বেশির ভাগ কাজ মামা করে। আর কিছু কিছু কাজ মেড করে দেয়।
ইলিয়ানার এই কথা শুনে নিরব এর মন একটু খারাপ হয়ে গেলো এতটুকু বয়সে মেয়েটা কত কষ্ট ফেস করতিছে। তাই নিরব তার পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে ইলিয়ানাকে দিল।
নিরবঃ- আজ ক্লাসে সবার আগে যে প্রশ্নের উত্তর দেবে তাকে আমি এই স্পেশাল চকলেটটা দেব চলো।
ইলিয়ানা চলে গেলো ক্লাসে ইলিয়ানা সবার সাথে কথা বলে কিন্তু আরিফ এর সাথে কথা বলে না। সবার ক্লাস মন দিয়ে করে। কিন্তু নিরব এর ক্লাসে ইলিয়ানার নিরবের দিকে তাকিয়ে থাকে। নিরবের কথা বলার ধরন সব কিছু ইলিয়ানার ভালোলাগে।
স্কুল ছুটির পর গেটের সামনে শাহরিয়ার দাঁড়িয়ে আছে ইলিয়ানা আসছে শাহরিয়া কারো সাথে ফোনে কথা বলতে বলতে গাড়ির গেট খুলে দিলো। তখন ইলিয়ানা
শাহরিয়ার কে টেনে নিরবের কাছে নিয়ে গেলো।
ইলিয়ানাঃ- মামা দেখো এই যে আমার নিরব স্যার উনিই আমাকে বাঁচিয়েছেন কাল আজ আবার তোমার হেয়ার স্টাইল এর প্রশংসাও করেছে।
শাহরিয়ার ফোন কেটে ফিরে তাকাল নিরব যখন শাহরিয়ারের মুখোমুখি হলো, নিরবকে দেখে শাহরিয়ারের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি উচ্চতা সেই রাজকীয় ভঙ্গি, আর চশমার আড়ালে থাকা চোখের মণি শাহরিয়ারের মনে হলো তার মৃত বস আরিয়ান খান শাওন যেন আবার জ্যান্ত হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু নিরব এর মুখে দাড়ি আছে আর আরিয়ান সব সময় ক্লিন শেভড থাকতো। শাহরিয়ার কাঁপা গলায় বলল
শাহরিয়ারঃ- স্যার আপনি…”
নিরব অত্যন্ত মার্জিতভাবে হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিল।
নিরবঃ- আই এম নিরব চৌধুরী ইলিয়ানার নতুন টিচার আপনারা কি এই এলাকারই স্থানীয়?
শাহরিয়ারের হাত কাঁপছে সে বুঝতে পারছে না এটা চোখের ভুল নাকি কোনো অলৌকিক কিছু। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল
শাহরিয়ারঃ- জ্বি আমি ওর মামা ধন্যবাদ আপনাকে আমার ভাগনিকে সাহায্য করার জন্য। আর না আমরা ঐ পাহারে থাকি।
ঠিক সেই সময় স্কুলের প্রিন্সিপাল এসে নিরবকে বলল
প্রিন্সিপালঃ- নিরব কাম ফাস্ট তোমার মা অপেক্ষা করছে হয়তো।
নিরব শাহরিয়ার এর থেকে বিদায় নিয়ে ইলিয়ানাকে বলল
নিরবঃ- প্রিন্সেস আজ আসি কালকে আবার দেখা হবে।
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৬
নিরব গাড়িতে উঠে পড়ল গাড়িটি যখন স্টার্ট নিল, নিরব আয়নায় শাহরিয়ার আর ইলিয়ানার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। গাড়িতে বসে শাহরিয়ার শুধু ভাবছে “নিরব চৌধুরী? নামটাও কি কাকতালীয়? আরিয়ান স্যারের নাম ছিল আরিয়ান খান, আর এই লোকটির নাম নিরব চৌধুরী কিন্তু চেহারা? চেহারা তো হুবহু এক।
