Home ভয়েজের মায়াজাল ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৮

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৮

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৮
ছায়া

ড্রয়িং রুমে বসে শাহরিয়ারের অস্থিরতা এক মুহূর্তের জন্যও কমছে না।ল্যাপটপের আলোয় তার মুখটা গম্ভীর দেখাচ্ছে। আরিয়ান স্যার অনেক আগে মারা গেছেন,কবরে নামানো মানুষটি কি আবার ফিরে আসতে পারে? অথচ আজ স্কুলের গেটে সেই নিরব চৌধুরীর চোখে চোখ পড়ার পর শাহরিয়ারের মনে হয়েছে সে কোনো জ্যান্ত প্রেতাত্মাকে দেখছে।
শাহরিয়ারের সিক্সথ সেন্স বলছে, নিরব চৌধুরী সাধারণ কেউ নন।সে তৎক্ষণাৎ স্কুলের সেই বায়োডাটা আর পরিচয়পত্র নিয়ে তদন্ত শুরু করল।নিরবের বায়োডাটায় লেখা আছে সে গত ২৫ বছর ধরে লন্ডনে ছিল এবং সেখান থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে ৩ বছর আগে দেশে ফিরেছে।শাহরিয়ার বিড়বিড় করে বলল
শাহরিয়ারঃ- এটা কি শুধুই কাকতালীয়?
শাহরিয়ার আর দেরি করল না সে প্রিন্সিপাল কে ফোন করলো ফোনের ওপাশ থেকে প্রিন্সিপাল এর কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

প্রিন্সিপালঃ- “হ্যালো কে বলছেন?”
শাহরিয়ারঃ- “আসসালামু আলাইকুম স্যার আমি মাউন্টেন ভিউ স্কুল এর এক স্টুডেন্ট এর মামা কথা বলছি।আপনার ছেলে নিরব চৌধুরী যে স্কুলে জয়েন করেছে। তার কিছু অফিসিয়াল ভেরিফিকেশনের জন্য আপনার সাথে কথা বলা দরকার ছিল।
প্রিন্সিপালঃ- “হ্যাঁ বলুন কী জানতে চান?
শাহরিয়ারঃ- “আপনার ছেলে কি ছোটবেলা থেকেই আপনাদের সাথে ছিল? মানে বাংলাদেশে ওর কোনো রেকর্ড আমরা পাচ্ছি না কেন?
আমজাদ চৌধুরী একটু হেসেই উত্তর দিলেন
প্রিন্সিপালঃ- আসলে নিরব ছোটবেলা থেকেই ওর খালার কাছে লন্ডনে থাকতো। পড়াশোনা বেড়ে ওঠা সব ওখানেই। তাই দেশে ওর কোনো বন্ধুবান্ধব বা পরিচিতি নেই। ৩ বছর আগে একটা বড় দুর্ঘটনার সৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলে তারপর জেদ ধরল দেশে আসবে তাই আমরাও বাধা দিইনি। পাকাপাকিভাবে চলে এসেছে।
৩ বছর আগে শাহরিয়ারের কপালে ভাঁজ পড়ল। দুর্ঘটনার কথা শুনে সে দমে গেল।
শাহরিয়ারঃ- দুর্ঘটনা? কী হয়েছিল উনার?
আমজাদ চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন
প্রিন্সিপালঃ- ওটা অনেক পুরনো কথা বাবা। ওসব ও আর মনে করতে চায় না। এখন ও শিক্ষকতা নিয়ে ভালো আছে, এটাই আমাদের সুখ।

ফোন রেখে শাহরিয়ার ল্যাপটপটা সশব্দে বন্ধ করল।বায়োডাটা একদম নিঁখুত, প্রিন্সিপাল এর কন্ঠস্বরও অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু শাহরিয়ারের মন সায় দিচ্ছে না। সে তার পুরনো বন্ধু সজলকে (একজন দক্ষ হ্যাকার) কল করল।
শাহরিয়ারঃ- “সজল” তোকে একটা কাজ করতে হবে। লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রিটের আশেপাশে ‘নিরব চৌধুরী’ নামে কারো কোনো অস্তিত্ব ছিল কি না সেটা সার্চ কর। আমি শুধু নাম দিয়ে বিশ্বাস করতে পারছি না।
পরের দিন সকালে শাহরিয়ার স্কুলে যাওয়ার জন্য ইলিয়ানাকে রেডি করছিল।সে মনে মনে ঠিক করেছে, আজ সে নিরব চৌধুরীর সাথে সামনাসামনি কথা বলবে এবং তার গলার স্বর আর চোখের ভাষা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
শাহরিয়ার ইলিয়ানাকে নিয়ে যখন স্কুলে পৌঁছাল,দেখল নিরব চৌধুরী ক্লাসরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। আজ তার পরনে কালো শার্ট শাহরিয়ার সোজা তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
শাহরিয়ারঃ- “মিস্টার নিরব আপনার সাথে আমার একটু ব্যক্তিগত কথা ছিল।
নিরবঃ- জ্বি বলেন কি ব্যক্তিগত কথা??
শাহরিয়ারঃ- আপনি লন্ডনের কোথায় ছিলেন যেন?

নিরব শান্ত চোখে শাহরিয়ারের দিকে তাকাল। তার মুখে কোনো ভয়ের চিহ্ন নেই সে মুচকি হেসে বলল
নিরবঃ- আগের কথা কি এখন প্রাসঙ্গিক? অতীত তো অতীতই তবে আপনার যদি খুব আগ্রহ থাকে, তবে আজ বিকেলে আমার বাসায় চায়ের দাওয়াত রইল। সেখানেই সব কথা হবে।
নিরবের এই আত্মবিশ্বাস দেখে শাহরিয়ার দমে গেল। লোকটা কি সত্যিই আরিয়ান স্যার? নাকি আরিয়ানের মতোই কোনো নতুন চরিত্র?
শাহরিয়ার যখন গভীর চিন্তায় মগ্ন, তখনই তার ফোনের স্পেশাল রিংটোনটা বেজে উঠল।এই রিংটোনটা শুধুমাত্র হেড কোয়ার্টার থেকে কল আসলে বাজে। শাহরিয়ারের বুকটা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল।শাহরিয়ার ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে তার কমান্ডিং অফিসারের গম্ভীর স্বর ভেসে এল।
অফিসারঃ- শাহরিয়ার আপনার জন্য একটা ইমার্জেন্সি অর্ডার আছে।আমাদের বড়সড় একটা মুভমেন্ট দেখা যাচ্ছে। আপনাকে আগামী এক মাসের জন্য স্পেশাল অপারেশনে জয়েন করতে হবে। কাল ভোরের মধ্যে আপনাকে রিপোর্ট করতে হবে।

শাহরিয়ার স্তব্ধ হয়ে গেল।এই কয়েক বছর ধরে সে প্রায় সব কাজই বাসা থেকে বা অনলাইন হেডকোয়ার্টারের মাধ্যমে ম্যানেজ করে আসছিল শুধুমাত্র ইলা আর ইলিয়ানার জন্য। কিন্তু এবার কোনো অজুহাত চলবে না।
শাহরিয়ারঃ- “স্যার আমার পরিবারে কিছু সমস্যা ছিল মানে আমি যদি…”
অফিসারঃ- ইট’স অ্যান অর্ডার শাহরিয়ার দেশের সুরক্ষার চেয়ে বড় কোনো দায়িত্ব এখন আপনার কাছে নেই ইউ হ্যাভ টু কাম।
ফোনটা রেখে শাহরিয়ার কপালে হাত দিয়ে বসে রইল। তার মাথায় শুধু একটা চিন্তা ঘুরছে এই এক মাস ইলা আর ইলিয়ানাকে কে সামলাবে? বিশেষ করে ইলিয়ানার স্কুল। এই দিকে যে নিরব চৌধুরীর রহস্য তাকে তাড়া করছে, ইলাকে একা ফেলে যাওয়া কি ঠিক হবে?
রাতে ডিনার টেবিলে শাহরিয়ার খুব মনমরা হয়ে বসে ছিল। ইলা শব্দ শুনেই বুঝতে পারল ভাইয়ার মন ভালো নেই।
ইলাঃ- ভাইয়া কী হয়েছে? খেতে বসেও তুমি চুপচাপ কেন?
শাহরিয়ার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল

শাহরিয়ারঃ- বনু আমাকে কাল ভোরে বের হতে হবে। হেডকোয়ার্টার থেকে কল এসেছে। এক মাসের জন্য একটা অপারেশনে যেতে হবে। একদমই না করার উপায় নেই।
কথাটা শুনে ইলার হাতের চামচটা থেমে গেল। তার একমাত্র অবলম্বন তার ভাই। আরিয়ান যাওয়ার পর শাহরিয়ার ছাড়া সে এক মুহূর্ত কাটানোর কথা ভাবেনি। কিন্তু সে জানে শাহরিয়ারের দেশপ্রেমের কথা।
ইলা ম্লান হেসে বলল
ইলাঃ- টেনশন করো না তো ভাইয়া। তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো। আমি আর ইলিয়ানা সব সামলে নেব।
শাহরিয়ার অস্থির হয়ে বলল
শাহরিয়ারঃ- কীভাবে সামলাবি বনু? তুই তো চোখে দেখতে পাস না। ইলিয়ানাকে স্কুলে কে দিয়ে আসবে? কে নিয়ে আসবে? বাসাই বা তোদের পাহারা দেবে কে?
ইলা শান্ত গলায় বলল
ইলাঃ- কেন ভাইয়া? আমাদের বাড়িতে মেডরা আছে, গার্ডরা আছে। আর স্কুলে যাওয়ার জন্য স্কুলের গাড়ি বা একটা ড্রাইভার ঠিক করে নিলেই হবে। তুমি শুধু শুধু চিন্তা করছো। মনে রেখো, আমি আরিয়ানের স্ত্রী। আরিয়ান সবসময় বলতেন, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, নিজেকে শক্ত রাখতে হয়। আমি এখন আর আগের সেই দুর্বল ইলা নই ভাইয়া।

শাহরিয়ার ইলার হাতটা ধরল। তার চোখ ভিজে এল।
শাহরিয়ারঃ- আমি জানি তুই অনেক স্ট্রং। কিন্তু তোরা একা থাকবি আমার ঠিক লাগছে না।
ইলা মাথা নেড়ে বাধা দিল
ইলাঃ- ভাইয়া হয়তো ওটা তোমার মনের ভুল। তুমি মন দিয়ে দেশের কাজ করো। আমাদের কথা একদম ভাববে না। এক মাস তো দেখতে দেখতেই কেটে যাবে।
কথা শেষ করে সবাই ঘুমিয়ে পড়লো, পরের দিন ভোর চারটে বাংলোর বাইরে জিপ দাঁড়িয়ে আছে। শাহরিয়ার রেডি হয়ে ইলার ঘরে ঢুকল। ইলিয়ানা তখনো গভীর ঘুমে। শাহরিয়ার ইলিয়ানার কপালে একটা চুমু দিয়ে ইলার দিকে তাকাল।
শাহরিয়ারঃ- বনু আমি চললাম প্রতি রাতে আমাকে ফোন দিবি। আর কোনো দরকার হলে সাথে সাথে আমাকে কল করিস। আমি সব ব্যবস্থা করে দেবো।
ইলা হাতড়ে শাহরিয়ারের কাঁধে হাত রাখল।
ইলাঃ- সাবধানে থেকো ভাইয়া আমরা তোমার জন্য অপেক্ষা করব।
শাহরিয়ার চলে যাওয়ার পর বাংলোটা এক নিমিষেই অনেক বেশি শান্ত আর বিষণ্ণ হয়ে গেল। ইলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে পাহাড়ি হাওয়ার শব্দ শুনতে লাগল। সে জানে না, এই এক মাস তার জীবনে কী ধরনের ঝড় বা মায়ার জাল নিয়ে আসতে চলেছে।

সকালে ইলিয়ানা ঘুম থেকে উঠে দেখল মামা নেই। সে যখন কান্নাকাটি শুরু করল, তখন ইলা তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে স্কুলের জন্য রেডি হতে বলল। শাহরিয়ার স্কুল ভ্যান ঠিক করে দিয়েছে ইলিয়ানাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
ইলিয়ানার মন খারাপ ইলিয়ানা স্কুলে ভ্যান থেকে নেমে সোজা ক্লাস রুমে চলে গেলো মাথা নিচু করে। নিরব সেটা দেখলো আজ ইলিয়ানার মন খারাপ। একটু পর নিরব স্যার ক্লাস নিতে আসলো ইলিয়ানা চুপচাপ বসে আছে। নিরব তার কাছে এসে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল।
নিরবঃ- কী হয়েছে প্রিন্সেস? আজ তোমার মামাকে দেখছি না কেন? তুমি স্কুল ভ্যানে আসলে যে ?
ইলিয়ানা মুখ ভার করে বলল

ইলিয়ানাঃ- মামা অনেক দূরে গেছে যুদ্ধের কাজে। এক মাস আসবে না। আমার খুব মন খারাপ স্যার।
স্কুলের ছুটির ঘণ্টা পড়তেই অন্য বাচ্চারা হইহই করে বেরিয়ে গেল, কিন্তু ইলিয়ানার কাঁধের ব্যাগটা আজ বড্ড ভারী মনে হচ্ছে সে ধীরপায়ে করিডোর দিয়ে হাঁটছে। তার ছোট্ট মনে শুধু মামার কথা ঘুরপাক খাচ্ছে।
নিরব দূর থেকে ইলিয়ানার এই বিষণ্ণতা লক্ষ্য করছিলেন। তিনি দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে ইলিয়ানার সামনে দাঁড়ালেন। তার পরনে আজ সেই গাঢ় ধূসর রঙের শার্ট, যা তাকে অদ্ভুতভাবে শাহরিয়ারের বর্ণনার সেই ‘আরিয়ান স্যার’-এর অবয়বে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
নিরবঃ- প্রিন্সেস এখনো ভ্যানে ওঠোনি? ভ্যান তো গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
ইলিয়ানা মাথা নিচু করেই বলল,

ইলিয়ানাঃ- যাচ্ছি স্যার মামা নেই তো, তাই ভালো লাগছে না।
নিরব হাঁটু গেড়ে ইলিয়ানার সমান হয়ে বসলেন। তার চোখে এক অদ্ভুত মায়া। তিনি মৃদু স্বরে বললেন,
নিরবঃ- মামা নেই তো কী হয়েছে? তোমার মন ভালো করতে আমি তোমাকে তোমার প্রিয় আইসক্রিম খাইয়ে বাসায় দিয়ে আসতে পারি। চলো আমার গাড়িতে ওঠো। তোমাকে একদম গেটের সামনে নামিয়ে দেব।
ইলিয়ানা এক মুহূর্তের জন্য থমকাল। নিরব স্যারের গলার স্বর শুনলে তার কেন জানি মনে হয় এই মানুষটা তার অনেক চেনা। কিন্তু পরক্ষণেই মামার কড়া শাসনের কথা মনে পড়ে গেল। সে মাথা নেড়ে বলল
ইলিয়ানাঃ- না স্যার আপনার সাথে গেলে মাম্মাম অনেক বকবে। মামা বলে গেছে অপরিচিত কারো সাথে কোথাও না যেতে। আর আমি স্কুল ভ্যানেই যেতে পারব।
নিরব একটু হাসলেন।সেই হাসিতে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ছিল কি না, তা বোঝা বড় দায়। তিনি বললেন
নিরবঃ- আমি কি তোমার কাছে অপরিচিত ইলিয়ানা? আমি তো তোমার টিচার। আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি ভ্যানেই যাও। তবে সাবধানে যেও।

ইলিয়ানা ভ্যানে উঠে বসলে নিরব অপলক দৃষ্টিতে গাড়িটার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
অন্যদিকে, ইলা বাড়িতে ছটফট করছে। শাহরিয়ার চলে যাওয়ার পর থেকেই তার মনের ভেতর একটা কু ডাকছে। চোখের আলো নেই বলে শ্রবণশক্তি আর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তার অনেক বেশি প্রখর। হঠাৎ ডোরবেল বাজল।
ইলা দরজার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কে” ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠ একজন মহিলার গলা ভেসে এল, “ম্যাডাম” আমি আপনার কাজের লোক জাবেদা।ইলা সাবধানে দরজা খুলল।
ইলাঃ- জবেদা খালা ইলিয়ানা এখনো আসেনি?
মহিলাটি ভেতরে ঢুকে শান্ত গলায় বলল,

জাবেদাঃ- না ম্যাডাম এখনো আসেনি আপনি চিন্তা করবেন না,এসে পড়বে তাড়াতাড়ি।
ইলা কিছু বলল না কিন্তু তার অস্বস্তি কাটল না। ঠিক তখনই গেটে স্কুল ভ্যানের হর্ন শোনা গেল ইলিয়ানা ফিরেছে। ইলা দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ইলা গল্প শুনলো কথা কথায় ইলিয়ানা নিরব এর কথা বলে দেয়। আর এটাও বলে দেয় তার পার্ফিউম এর স্মেল এর কথা।
ইলা হেসে বলে সেম ধরনের পার্ফিউম তো অনেক জন ব্যবহার করে। ইলিয়ানা এই ছোট মাথায় এত কিছু ডুকালো না।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল।বাংলোর চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা পড়ছে। ইলা ড্রয়িং রুমে বসে ছিল, এমন সময় তার ফোনের বেজে উঠল। শাহরিয়ারের ফোন করেছে
শাহরিয়ারের ফোন আসতেই ইলা যেন মরুভূমিতে এক ফোঁটা বৃষ্টির ছোঁয়া পেল। ফোনের ওপাশ থেকে শাহরিয়ারের ক্লান্ত কণ্ঠ ভেসে এল।
শাহরিয়ারঃ- বনু কেমন আছিস? ইলিয়ানা ঠিক মত ফিরেছে স্কুল থেকে?
ইলা হাসি মুখে উত্তর দিল,
ইলাঃ- হ্যাঁ ভাইয়া ঠিক মত ফিরেছে।ও এখন ওর রুমে খেলছে। তুমি ঠিকমতো পৌঁছেছ তো? খেয়েছ কিছু?
শাহরিয়ার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
শাহরিয়ারঃ- হ্যাঁ রে পৌঁছেছি তবে এখানে নেটওয়ার্কের খুব সমস্যা, তাই সবসময় ফোন করতে পারব না। সারাটা দিন তোদের চিন্তাতেই কাটল। জবেদা খালা কি ঠিকমতো কাজ করছে? রান্না কি খেতে পারছিস?
ইলা আশ্বস্ত করে বলল,

ইলাঃ- হ্যাঁ ভাইয়া জবেদা খালা অনেক ভালো রান্না করে একদম আপন মানুষের মতো গুছিয়ে। আর ইলিয়ানা তো সারাদিন তোমার গল্প আর ওর নতুন নিরব স্যারের গল্প করে কাটাল।
শাহরিয়ারের কপালে ভাঁজ পড়ল। সে গলার স্বর নিচু করে জিজ্ঞেস করল,
শাহরিয়ারঃ- নিরব স্যার? কেন ও কী করেছে?
ইলা হেসে বলল,
ইলাঃ- আরে না ও বলছে ওর নিরব স্যারের গলার স্বর নাকি খুব সুন্দর, আর উনার পারফিউমের ঘ্রাণ নাকি একদম আরিয়ানের মতো।ছোট মানুষ তো, আবোলতাবোল ভাবে। আমি ওকে বুঝিয়েছি যে একই রকম পারফিউম অনেকেই ব্যবহার করে।
শাহরিয়ার ওপাশ থেকে চুপ হয়ে গেল। তার মনের ভেতরের সন্দেহটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। কিন্তু এখন সে নিরুপায় শুধু বলল,
শাহরিয়ারঃ- সাবধানে থাকিস বনু। দরজা-জানালা সব সময় লক রাখবি।
ভাই-বোনের গল্প চলল। শাহরিয়ার তার অপারেশনের কিছু হালকা কথা শোনাল, আর ইলা শোনাল ইলিয়ানার দুষ্টুমির কাহিনী। ফোনের ওপাশে শাহরিয়ারের অস্তিত্ব ইলাকে এক অদ্ভুত নিরাপত্তা দিচ্ছিল।
এভাবে পরের দুই দিন ইলা আর ইলিয়ানার বেশ ভালোই কাটল। জবেদা খালার হাতের রান্না আর ইলিয়ানার চঞ্চলতায় বাংলোটা মুখর থাকত। দ্বিতীয় দিন বিকেলে হঠাতই গেটের সামনে একটা গাড়ির শব্দ পাওয়া গেল। লিয়ান আর নাদিয়া এসেছে ইলাকে সারপ্রাইজ দিতে।
নাদিয়া ঘরে ঢুকেই ইলাকে জড়িয়ে ধরল।

নাদিয়াঃ- কেমন আছো ইলা? শাহরিয়ার ভাই তো লিয়ান কে ফোন করে বলল তোমাদের একলা রেখে গেছে। আমরা ভাবলাম তোমাদের একটু দেখে আসি।
লিয়ানের হাতে এক বিশাল কার্টনভর্তি খেলনা আর চকোলেট। ইলিয়ানা তো খুশিতে আত্মহারা।
ইলিয়ানাঃ- লিয়ান আংকেল এই বারবি সেটটা কি আমার জন্য? আর এই কিটকেটগুলোও?
লিয়ান হেসেই ইলিয়ানার গাল টেনে দিল,
লিয়ানঃ- সব তোমার জন্য ছোট আম্মু। আর শোনো আজ কিন্তু আমরা সবাই মিলে বাগানে বারবিকিউ করব, একদম কোনো মানা চলবে না।
ইলা লিয়ান আর নাদিয়ার আগমনে অনেক বেশি হালকা বোধ করল। লিয়ান নাদিয়া ইলাকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে বসে অনেক গল্প করল। শাহরিয়ারের অবর্তমানে তারা ইলার পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাদিয়া ইলাকে হাত ধরে বাগানে নিয়ে গেল একটু মুক্ত বাতাস খাওয়ানোর জন্য।
নাদিয়াঃ- ইলা শাহরিয়ার ভাই বলছিল তোমার জন্য অনেক টেনশন করে এবার অন্তত চোখের অপারেশন টা করে নাও।
ইলা এক মুহূর্ত চুপ থেকে ম্লান হাসল।

ইলাঃ- জানি নাদিয়া কিন্তু আমি এভাবেই ঠিক আছি।
লিয়ান পাশ থেকে বলে উঠল,
লিয়ানঃ- তুমি ঠিক নেই ইলা, এটা তোমার পাগলামি আমি ডাক্তার এর সাথে কথা বলেছি নাদিয়ার এক ফ্রেন্ড আছে সে চোখের ভালো ডাক্তার লন্ডনে থাকে পরের মাসে আসবে তখন আমি তোমাকে নিয়ে যাবো তার কাছে।
ইলাঃ- এত কিছুর কোনো দরকার নেই লিয়ান আমি ঠিক আছি।
সন্ধ্যায় লিয়ান আর নাদিয়া তাদের ছোট মেয়ে ইলা ইলিয়ানা সবাই মিলে বারবিকিউ করলো বাগানে। অনেক আড্ডা মজা করে বিদায় নিল। যাওয়ার সময় তারা বলে গেল,তারা আবার আসবে। ইলা দরজায় দাঁড়িয়ে তাদের বিদায় জানাল।
পরদিন সকালে ইলিয়ানা বেশ ফুরফুরে মেজাজে স্কুলে এসেছে। বারবিকিউ পার্টি আর শাহরিয়ার এর সাথে রাতে কথা হওয়ার পর তার মনটা এখন অনেক ভালো। ক্লাসে বসে সে আপন মনে ড্রয়িং খাতার পেছনে হিজিবিজি আঁকছিল,

এমন সময় নিরব ক্লাসে ঢুকলেন।আজ নিরবের পরনে সাদা শার্ট, হাতা দুটো কবজি পর্যন্ত গোটানো।আর একটা সাদা চিকন ফ্রেমের চশমা। ক্লাস শেষ হয়ে গেছে হঠাৎ নিরব দেখলেন ইলিয়ানা খুব মন দিয়ে কিছু একটা আঁকছে। তিনি নিঃশব্দে ইলিয়ানার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
নিরবঃ- বাহ প্রিন্সেস তো দেখি মস্ত বড় শিল্পী হয়ে গেছে। এটা কী আঁকছো? ডাইনোসর নাকি তোমার মামা কে?
হঠাৎ স্যারের কণ্ঠ শুনে ইলিয়ানা চমকে উঠে খাতাটা হাত দিয়ে ঢেকে ফেলল। তার বড় বড় চোখ দুটো গোল গোল করে তাকিয়ে বলল
ইলিয়ানাঃ- ইশশ স্যার আপনি একদম ভূতের মতো চুপিচুপি আসেন কেন? ভয় পেয়ে গেছিলাম তো।
নিরব শব্দ করে হেসে ফেললেন। তিনি পাশের একটা বেঞ্চে বসলেন।
নিরবঃ- সরি বাবা আচ্ছা দেখি তো কী আঁকছিলে? লুকোচ্ছো কেন?
ইলিয়ানা মুখটা একটু বাঁকিয়ে খাতাটা দেখাল। একটা এবড়োথেবড়ো মানুষের ছবি,যার মাথায় চারটে শিং আর হাতে একটা বড় লাঠি।
ইলিয়ানাঃ- এটা হলো ‘রাক্ষস মামা’। যখন আমি দুষ্টুমি করি, তখন মামা এমন রাগী হয়ে যায়।
নিরব হাসতে হাসতে বললেন,
নিরবঃ- তোমার মামা শুনলে কিন্তু তোমাকে আর চকোলেট দেবে না। আচ্ছা রাক্ষসের শিং থাকে বুঝলাম, কিন্তু চারটে কেন?
ইলিয়ানা সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,

ইলিয়ানাঃ- দুটো শিং দিয়ে সে গুতো দেয়, আর বাকি দুটো দিয়ে ওয়াইফাই সিগন্যাল ধরে।মামা তো সবসময় ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকে তাই।
নিরব নিজের হাসি থামাতে পারলেন না। এই ছোট বাচ্চাটার কল্পনাশক্তি দেখে তিনি অবাক হন। তিনি পকেট থেকে একটা ছোট ডেইরি মিল্ক বের করে ইলিয়ানার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
নিরবঃ- নাও এটা তোমার ঘুষ। তোমার মামাকে যেন এই ছবিটা না দেখাও।
ইলিয়ানা চকোলেটটা হাতে নিয়ে একটু ভাবুক হয়ে গেল। তারপর নিচু গলায় বলল,
ইলিয়ানাঃ- স্যার একটা কথা বলব? রাগ করবেন না তো?
নিরব কোমল স্বরে বললেন,
নিরবঃ- বলো আমি কেন রাগ করব?
ইলিয়ানা চকোলেটের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে বলল,
ইলিয়ানাঃ- আপনি যখন হাসেন না, তখন আপনাকে একদম আমার কল্পনার পাপা-র মতো লাগে। কিন্তু আমার পাপা তো ডাইনোসর এর দেশে চলে গেছে। আপনি কি আপনি কি ডাইনোসর এর দেশ থেকে এসেছেন?আপনি কি আমার পাপার বন্ধু।

নিরবের হাসিমুখটা এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।চোখের মণি দুটো যেন একটু ভিজে উঠল কেনো সেটা নিরব নিজেও জানে না। নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,
নিরবঃ- আমি কি দেখতে ডাইনোসরের মতো?
ইলিয়ানা মাথা নেড়ে বলল,
ইলিয়ানাঃ- উঁহু আপনি দেখতে একদম রাজপুত্তুরের মতো। শুধু যদি আপনার একটা ঘোড়া থাকতো।
নিরব মৃদু হেসে বললেন,
নিরবঃ- ঘোড়া নেই তো কী হয়েছে? আমার সাদা গাড়ি আছে না একটা? ওটাকেই আপাতত সাদা ঘোড়া ধরে নাও। আচ্ছা শোনো আজ টিফিনের সময় কিন্তু তোমাকে একটা ম্যাজিক দেখাব।
ইলিয়ানার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল। সে উত্তেজিত হয়ে বলল,
ইলিয়ানাঃ- সত্যি ম্যাজিক দেখাবেন আপনি কি কান দিয়ে ধোঁয়া বের করতে পারেন? আমার মামা কিন্তু পারে।
নিরব অবাক হয়ে বললেন,
নিরবঃ- কান দিয়ে ধোঁয়া? তোমার মামা কি জাদুকর নাকি?
ইলিয়ানা খিলখিল করে হেসে উঠল,

ইলিয়ানাঃ- আরে না স্যার মামা যখন খুব রেগে যায়, তখন আমি বলি মামা দেখ তোমার কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে অমনি মামা হেসে দেয়।
নিরবও হাসলেন তিনি বুঝতে পারলেন,এই পিচ্চি মেয়েটা তাকে অদ্ভুতভাবে মায়ার জালে জড়িয়ে ফেলছে। তিনি ইলিয়ানার মাথায় হাত রেখে বললেন,
নিরবঃ- তোমার মামা অনেক লাকি ইলিয়ানা।তোমার মতো একটা হাসিখুশি মেয়ে পাশে থাকলে কোনো মানুষই বেশিক্ষণ রাগী থাকতে পারে না।
টিফিনের ঘণ্টা বাজতেই ইলিয়ানা ব্যাগ থেকে তার টিফিন বক্স বের করল। নিরব স্যার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। ইলিয়ানা একটা স্যান্ডউইচ বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
ইলিয়ানাঃ- স্যার নিন এটা মাম্মাম বানিয়েছে।মাম্মাম চোখে দেখে না তো, তাই মাঝে মাঝে স্যান্ডউইচে চিনি দিয়ে ফেলে। খেয়ে দেখুন তো আজ নুন দিয়েছে না চিনি?

নিরবঃ- আমি তোমার টিফিন খেয়ে নিলে তুমি কি খানে প্রিন্সেস??
ইলিয়ানাঃ- আজ তো আমি মাম্মাম করে বলে দুটো বানিয়ে নিয়েছি। একটা আপনার জন্য আর একটা আমার জন্য।
নিরব স্যান্ডউইচটা হাতে নিয়ে এক কামড় দিলেন। তার চোখে এক পলকের জন্য পুরনো কোনো স্মৃতি ভেসে উঠল। তিনি চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে বললেন,
নিরবঃ- একদম নুন-চিনি ঠিক আছে। তোমার মাম্মাম পৃথিবীর সেরা রাঁধুনি।
ইলিয়ানা অবাক হয়ে বলল,
ইলিয়ানাঃ- আপনি কি করে জানলেন স্যার? আপনি কি আগে আমাদের বাসায় খেয়েছেন?
নিরব সামলে নিয়ে বললেন,

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৭

নিরবঃ- না, মানে… শিক্ষকরা সব জানে। শিক্ষকরা হলো ছোটখাটো জাদুকর। আর মাম্মাম রা সব সময় সেরা রাধুনি হয়।
কিন্তু নিরব এর এই টেস্ট অনেক পরিচিত নিরব জানে না তবে তার মনে হচ্ছে এই স্যান্ডউইচ আগেও খেয়েছে কিন্তু কোথায় কবে সেটা মনে করতে পারছে না।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৯