Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৩০ (২)

সাঁঝের মায়া পর্ব ৩০ (২)

সাঁঝের মায়া পর্ব ৩০ (২)
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

বাইরে কাঠফাটা রোদ আজকে।দুদিনের মধ্যে কেমন একটা অসহ্য গরম পরে গেছে।রোজা রেখে বেশ অসহ্যই লাগছে আবহাওয়াটা।বাইরে একফোঁটা বাতাসের ছিটেফোঁটা অবধি নেই।গাছের একটা পাতাও বোধহয় নড়তে দেখা যাচ্ছে না।নিয়াজ গাড়ির গ্লাসে দু হাত ঠেকিয়ে ছোট বাচ্চাদের মতো হা করে গাছপালার দিকে তাকিয়ে আছে।
____”দোস্ত,একটা পাতাও নড়েনা ক্যান?”
সাজিদ অনেকক্ষণ হলো খেয়াল করছিলো নিয়াজকে।ছেলেটা বারবার এক কথা বলে মাথার পোকা বের করে ফেলছে। ধমকে ওঠে নিয়াজকে।
____”বসে আছিস এসির ভিতর।বাইরে পাতা নড়লো নাকি ডাল নড়লো তা দিয়ে তোর কাজ কি!”
নিয়াজ বোধহয় আহতই হলো সাজিদের কথায়। সোজা হয়ে ঘুরে তাকালো ওর দিকে।আহত গলায় বললো,
____”তোরা প্রকৃতি বিদ্বেষী।দেশের শত্রু।প্রকৃতির খোলা হাওয়ার কাছে এসব এসিটেসি তুচ্ছ।বুঝলি না রে,বুঝলি না।
কথাটা শেষ করতে করতে আবার একই ভঙ্গিতে দু হাত ঠেকিয়ে তাকিয়ে রইলো বাইরের দিকে।সাজিদ বিরক্ত দৃষ্টিতে মাথা নাড়ে দুদিকে।ফিচেল গলায় বলে,,

____”লাগছে তো টিকটিকির মতো।টিকটিকি যেমন দেয়ালে আটকে থাকে,তেমন করে সেটে আছিস।”
মোটেই বন্ধুর এসব অপমানে ক্ষেপলো না নিয়াজ।এসব তো অহরহ শুনতে হয়।বিশেষত সাজিদ এর কাছ থেকে।এখন কি হবে সেটাও জানে সে।
অনিমা কঠিন চোখে তাকালো সাজিদ এর দিকে,
____”কতবার বলেছি ওকে এসব আজেবাজে প্রাণীর নামে ডাকবে না।অশিক্ষিতর মতো কথাবার্তা সাজিদ…”
নিয়াজ ঘাড় বাকিয়ে সাজিদের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো।সে জানতো এটাই হবে।সাজিদ কথা বাড়ায় না।বউয়ের সাথে ঝগড়া টা তার ঠিক পোষায় না।সে আবার বড়ই বউ ভক্ত কি না…
মেইনরোড ধরে গাড়ি চলছে।যেহেতু ঈদের আগে।তাই রাস্তাঘাটে প্রচুর ব্যাস্ততা।
গাড়ি চালাচ্ছে ঈশান।বন্ধুদের এসব ছেলেমানুষী কথাবার্তায় একদম মন নেই তার।চোখে সানগ্লাস দেওয়া।দৃষ্টি সামনে দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে।পাশে বসা নিয়াজ।পিছনে সাজিদ আর অনিমা ।তারা রওনা হয়েছে বেলা এগারোটার দিকে।ঢাকা থেকে তাদের বাড়ির পৌছুতে সাধারণত সময় লাগে সাড়ে চার ঘন্টা।যদি না কোনো ধরনের জ্যামে আটকায়।তবে ভয়ে আছে এখন কোনোভাবে জ্যামে না আটকালেই হলো।নিয়াজ অবশ্য বারবার বলছিলো ট্রেনে যাবে।সে বরাবরই জার্নির জন্য ট্রেন প্রেফার করে যদি না খুব তাড়াহুড়ো থাকে।তবে গ্রামের যা পরিস্থিতি পিকনিক এর মতো করে হেলেদুলে বাড়ি পৌছুলে ঈশানের বাবা রাইসুল দেওয়ান আর তাদের আস্ত রাখবেন না। তাছাড়া তদন্ত যেহেতু সাজিদ এর হাতে।সেহেতু জলদিই যেতে হবে।তার টিম এরই মধ্যে পৌছে গেছে তাদের এলাকায়।নেহাৎ বন্ধুদের সাথে একসাথে যাচ্ছে না হলে সেও এতক্ষণে বাড়িতেই থাকতো।
পুরোটা রাস্তা ঈশান একটাও কথা বলছে না।মাথার মধ্যে হাজারটা চিন্তা সাজাচ্ছে।নিয়াজ বেশ কয়েকবার ডেকেছে।উত্তর পায়নি।এবার বেশ জোরেশোরেই ডাকলো।

____”অ্যাই নব্যবিবাহিত পুরুষ ঈশান আরশাদ দেওয়ান? শুনছেন ভায়া?”
ঈশান বিরক্ত হলো।ভ্রু কুচকে ঘাড় ঘুরালো একবার নিয়াজের দিকে।সাথে সাথেই ড্রাইভিং এ মন দিলো আবার।ভীষন ব্যাস্ত রাস্তা,এই বাদরের কথায় কান দিয়ে প্রান হারানোর মানেই হয়না।বিয়ে করেছে সবে সবে।এখনো রাজ্যের ঝামেলায় বউটাকে ছুঁতেই পারেনি।যা ছুয়েছে কানামাছি খেলার মতো।ওতে চলবে!।এখনই দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করলে তার চলবে কেনো!
ঈশানের উত্তর না পেয়ে আবার ডাকলো নিয়াজ।ঈশান গম্ভীর গলায় উত্তর নিলো এবারে,
____”কি সমস্যা নিয়াজ!”
____”শুনছিস না কেনো?”
____”বাচ্চাদের মতো তাই ডেকেই যাবি?”
____”একবার উত্তর নিলেই তো আর ডাকিনা।”
____”একবার উত্তর নিলে গোটা রাস্তা তুই আর থামবি না।”
____”তা ঠিক।”
ঈশান চোখের সানগ্লাস টা খুলে শার্টের ঝুলালো।তপ্ত দৃষ্টি দিতেই কথার পিঠে কথা থেমে গেলো।পিছন থেকে হাসছে সাজিদ আর,অনিমা।একমাত্র ঈশানের ধমকই বাচাল টাকে থামাতে পারে।সাজিদ আরাম করে পা তুলে দিলো সিটে।মাথা এলিয়ে দিলো অনিমার কোলে।রাত থেকে যা দৌড়ঝাঁপ গেলো!তার ওপর আবার এত ঘন্টার জার্নি।চোখ বুজে আসছে।নিয়াজ ঘাড় বাঁকিয়ে দেখলো ওদের।নাক সিটকালো।

____”আমরা কি নেমে যাবো গাড়ি থেকে এসপি সাহেব?স্পেস লাগবে?”
হাতের ক্যাপটা ছুড়ে দিলো সাজিদ নিয়াজ এর দিকে।চোখ বুজলো কোনো কথা না বলে।
নিয়াজ কথা বলতে না পেরে বোর হচ্ছে। নাঈম আর রিতু টা থাকলে জমতো ভালো।ঈশানের সাথে আড্ডা দেওয়ার চিন্তাভাবনা জগতের সবচেয়ে বেকার আশা।তবুও হাল ছাড়লো না সে।ধীর গলায় বললো,
____”বিয়ে করলি নতুন নতুন। আমি সিরিয়ালে আছি।টিপস দিলি না?”
ঈশান শব্দ করে হর্ন দেয়।বিরক্তির প্রকাশ আরকি।নিয়াজ তাতে মোটেই দমে গেলো না।
____”একটা কথা শুনলাম জানিস?মা বললো।শুনবি?”
ঈশান বড্ড উদাসীন গলায় বললো,
____”কি?”
____”রেগে যাস না।তিতিরের সম্মন্ধ এসেছে একটা…”
ঈশান ভ্রু বাকায়।
____”,তিতিরের সম্মন্ধ আন্টির কাছে?”
সজোরে মাথা নাড়লো নিয়াজ।বাঁকা হয়ে বসলো এদওকে।

_____”ছেলে নাকি কলেজের টিচার বুঝলি।আমার রহমান চাচা আছে না?ঘটকালি করে।সে নাকি মা কে বলেছে।ছেলে চাচার পাশের বাড়ি ভাড়া থাকে এক মাস হলো।তোর বাড়ির সাথে আমাদের একটা মাখোমাখো কানেকশন আছে।ছেলেটার মা রহমান চাচাকে ধরেছিলো বিস্তারিত খোঁজ নিতে,যেহেতু ঘটক মশাই সে।আর ঘটক চাচা এসেছে মায়ের কাছে।”
ঈশানের মুখ দেখার মতো হয়েছে।কপালে ভাজ পরেছে বেশ কয়েকটা।স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে বিরক্ত সে।সাজিদ চোখ তুলে তাকায় একবার অনিমার দিকে।অনিমাও হাসছে।ঘটনা টা মিথ্যা নয়।ঈশান গাড়ি নিয়ে তাঁদের বাড়ির সামনে আসার আগে তারা যখন ব্যাগপ্যাক নিয়ে অপেক্ষা করছিলো তখন সত্যিই নিয়াজের মা কল করে এই কথাই বলছিলো। রহমান চাচা বিদেশে ছিলেন বিগত দশ বছর। দেশে এসেছেন পনেরো দিন হলো।এসেই নিজের পুরাতন পেশায় আবার যাত্রা শুরু করেছেন।সুতরাং গ্রামের কার বিয়ে হয়েছে,কে বিয়ের বয়সী এসব সম্পর্কে আপাতত তার ধারনা একদমই কম।যেহেতু ঈশান তিতিরের বিয়ে টা কাউকে জানিয়ে দেওয়া হয়নি হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া সে হিসেবে ওদের বিয়ের খবরটা পায়নি তিনি।নিয়াজ এর মা ও এই কথা ভেবেই নিজেও জানায় নি ওদের বিয়ের কথা।তবে বারবার বলে দিয়েছেন তিতিরকে দেওয়ান রা এখনি বিয়ে দেবেন না।যেহেতু বড় আরও চারজন আছে।এসব নিয়ে জলঘোলা না করাই উত্তম।

____”কি রে দিবি বউয়ের বিয়ে?”
____”শাট আপ নিয়াজ।”
____”কথায় কথায় ধমকাবি না।মানিসই তো না ওকে বউ হিসেবে।মানিস কি?
ঈশান এক হাতে চুল ঠেলে দিলো পিছন দিকে।ভাবলেশহীন গলায় বললো,
____”মানলেই কি,না মানলেই কি!”
____”মানলে আলাদা কথা।না মানলে অনেক কিছু।”
____”কি অনেক কিছু! “
নিয়াজ ওপরের লুকিং গ্লাসে চোখ মেলালো অনিমা,সাজিদের সাথে। ওদের প্ল্যান করাই ছিলো ঈশানকে কি করে খোচাবে আজকে।মনের কথা পেট থেকে টেনে বের করবে।পেটের ভিতর কি আছে তা ওরা না জেনে ছাড়ছে না।গম্ভীর গলায় বললো,
_____”মেয়েটা ছোট।জীবনের কিছু শুরুই হয়নি।তুই ওকে না মানলে ওর ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে না?বড়দের আবেগের কথা ধরে চললে হবে?তাছাড়া শুধু তিতির কেনো তোরও তো জীবন টাও পরেই আছে।”
ঈশানের দারুণ মেজাজ খারাপ হচ্ছে নিয়াজের এসব কথায়।বন্ধু না হলে এতক্ষণ লাথি মেরে ফেলে দিলো গাড়ি থেকে।

____”একটু চুপ করবি তুই।কনসেনট্রেট করতে পারছি না রাস্তায়।”
____”ওমনি?
____”কি ওমনি?”
____”যেই একটা সিরিয়াস কথা বললাম অমনি তুই কমসেনট্রেট করতে পারছিস না। তোর ওপর মাঝেমধ্যে প্রচুর মেজাজ খারাপ হয় বিশ্বাস কর।শুধুমাত্র দিদার কথা রাখতে বিয়ে টা না করলেও পারতি।”
____”নিয়াজ, এসব নিয়ে কথা শুনতে অসহ্য লাগছে থামবি?”
____”কেনো থামবে?ভুল তো বলেনি ও।”
এবার কথাটা বললো অনিমা।সাজিদ ও ঘুমায়নি।নিয়াজ এই কথা তোলার পর থেকে আগ্রহ চোখে তাকিয়ে আছে ঈশানের উত্তর শোনার জন্য। অনিমা কঠিন গলায় বললো,

_____”আবেগে পরে বা অন্যের কথায় চলতে গিয়ে এমন কিছু করা উচিত নয় যেটা এ জীবনেও মানতে পারবি না তুই।আগে একটাবার কেনো মনে হলো না তোর যে তুই তিতিরের সাথে থাকতে পারবি না?বিয়ের রাত থেকে মেয়েটাকে মানসিক টর্চার করে আসছিস।ও একটা বাচ্চা মেয়ে ঈশান।যেটুকু বয়স হয়েছে,ও যেভাবে বড় হয়েছে বা চলাফেরায় অভ্যস্ত দিনদুনিয়ার এসব নেগেটিভ সাইট সম্পর্কে ওর ধারনা নেই।আমরা জানি সেটা।তাহলে ও কিভাবে সবটা সামলে সামনে এগোবে বলতে পারিস!তাছাড়া আর একটা কথা।এটাই কঠিন বাস্তব। একটা ছেলে একটা রেখে দশটা প্রেম বা বিয়ে করলে তার বদনাম হয়না।কিন্তু একই কাজ একটা মেয়ের দিকে আলাদা।খুব সহজেই তার দিকে আঙুল তোলা যায়।বিয়ে জিনিসটা একটা মেয়ের জন্য অনেককিছু।”
ঈশান ভ্রু কুচকে থাকে।হুট করে এহেন ক্লাস নেওয়ার মানে বুঝতে পারে না সে।আগে জানলে যেতোই না এদের সাথে।গম্ভীর গলায় বললো,

_____”কি সমস্যা তোদের। এসব শেনানোর মানে কি!”
তিনজনই অবাক চোখে তাকালো ঈশানের দিকে।এত কথা বলার পর যদি বলে এসব বলার মানে কি তাহলে তাকে কি বলতে ইচ্ছে হয়!
নিয়াজ বিষ্ময়মাখা গলায় বললো,
____”বুঝিস নি কি বলছি?এভাবে চলবে না তোদের।যেহেতু ভালোবাসিসই না।বাসবিও না।ছেড়ে দে না হয়।”
এবার গাড়ির গতি বাড়লো দ্বিগুণ। তিনজনেরই খেয়াল হলো সেটা।লুকিং গ্লাসে তিনজনের চোখাচোখি হলো।মনে মনে হাসলো তিনজনই।অনিমা গম্ভীর গলাতে বললো,
_____”ডোন্ট মাইন্ড,কথাটা হয়তো বেশি পারসোনাল হয়ে যাবে,।তবুও বলছি…তোদের ফিজিকাল….আই মিন তোকে আমরা যতদূর চিনি আমরা হান্ড্রেড পারসেন্ট সিওর তুই মেয়েটার সাথে কিছু করিস নি…সুতরাং…
এবার কঠিন গলা শুনতে পাওয়া গেলো ঈশানের।মেজাজ আর সামলাতে পারলো না বোধহয় সে।বজ্রকঠিন গলাতে বললো,

____”জাস্ট স্টপ ইট গাইজ।কি সব হচ্ছে এসব।”
অনিমা আজ দমার পাত্রী নয়।যেকোনো মূল্যে আজ শুনেই ছাড়বে ঈশানের মনের কথা।একই কন্ঠে বললো,
____”অবুঝ এর মতো কথা বলিস না ঈশান।তুই রাগে,অভিমানে, তোর জেদের কাছে হার মানতে নাই চাইতে পারিস।একটা মেয়ে হয়ে আমি চোখের সমানে একটা মেয়ের এমন অবস্থা মোটেই মানতে পারবো না।বি অনেস্ট প্লিজ,অন্তত আমাদের কাছে।মেয়েটাকে ভালোবাসিস তুই?”
উত্তর দেওয়ার জন্য মুখ খুলেও কথা বলতে পারলো না ঈশান।হাত শক্ত হয়ে এলো কেমন একটা।বুকের বা পাশের হাতুড়ি পেটানো শব্দ শুরু হয়ে গেছে জোরকদমে।

_____”বাসিস?”
_____”না।”
_____”ভালোবাসিস না তিতির কে?”
_____”না বললাম তো।”
_____”শেষবার জিজ্ঞেস করবো।তুই ভালোবাসিস না তিতিরকে?ওর কসম।”
এবার না শব্দটা করতে পারলো না ঈশান।মুখ এসে আটকে গেলো শব্দটা।চোখমুখ অস্বাভাবিক তপ্ত দেখালো।ফর্শা মুখখানা কেমন কালো দেখাচ্ছে।
নিয়াজ হাসি সামলাতে না পেরে মুখ ঘুরিয়ে নিলো।সাজিদ মুখ ঢাকলো অনিমার ওড়নার নিচে।অনিমাই কেবল এমন হাই মোমেন্ট এ বাকি দুই গাধার মতো হাসার ভুল করলো না।বরঞ্চ একই গলায় বললো,

____”ভালোবাসিস?”
____”জানিনা।”
এবার শব্দ করেই হেসে ফেললো নিয়াজ।সিটের মধ্যে হাসতে হাসতো দু পা তুলে বসলো।পিঠ মুরে পিছনে তাকিয়ে তাকালো হাস্যজ্বল দুই বন্ধুর দিকে।অনিমার মুখে বিজয়ের হাসি।না’ থেকে এক ঝটকায় জানিনা তে এসেছে দেওয়ান সাহেব এই বা কম কিসে।
নিয়াজ সজোরে থাপ্পড় মারলো ঈশানের বাম হাতের বাহুতে। দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বললো,
____”ব্যাটা ভাঙ্গবি তাও মচকাবি না।ভালোবাসোস তাও মুখে বলস না।নাকি টেরই পাসনা যে ভালোটালো বাসোস?”
____”ভালোবাসা কি?”
____”এইবার লাইনে আয় শালা।কথাটা জিজ্ঞেস করলেই পারিস।এতো এতো অভিজ্ঞ বন্ধু থাকতে তুই কি না ব্যাটা টের পাসনা ভালোবাসা কি!মানসম্মান ডুবাবি নাকি!”
____”এত সহজে ভালোবাসা হয়!”
অনিমা খানিক এগিয়ে বসলো সিটে।সাজিদও সোজা হয়ে বসেছে এরইমধ্যে। নরম গলায় বন্ধু কে বললো,

____”লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট এর কথা বলে মানুষ। শুনিসনি!ভালোবাসা এক সেকেন্ড এও হতে পারে।”
____”আগে হলো না কেনো!কত মেয়েই তো আশেপাশে ছিলো।রুষা নিজেই এতগুলো বছর পাগলের মতো….কই কখনো তো ওকে ছুতেও ইচ্ছে করেনি।আগ্রহ হয়নি।সেসময় নিজের ওপর নিয়ন্ত্রন হারাইনি”
অনিমা হাসে বন্ধুর অবুঝের মতো কথাগুলো শুনে।ঈশান যে তাদের কথার প্যাচে পরে গেছে বুঝতে পারে সে।না হলে ঈশান আরশাদ দেওয়ান কখনো এভাবে বাচ্চাদের মতো এ ধরনের প্রশ্ন করতো না।ভালো তো অবশ্যই সে বাসে তিতিরকে।টের পায়না।
_____”বললাম না।ভালোবাসা কি সবার প্রতি আসে! আগে পরে বিষয় নয়।কে,কখন,কেনো এসবও ভালোবাসার যুক্তিতে খাটে না।তুই প্রেমে পরেছিস।হোক সেটা এত বছরের প্রথম বার।তবুও পরেছিস।এটা মানছিস না কেনো!আমরা জানি,তোকে আমাদের থেকে ভালো আর কে চেনে।সেই এতটুকুন বয়স থেকে আমরা একসাথে। মুখ ফুটে না বললেও তোর নজর দেখে বলে দিতে পারি আমরা।কেনো লুকাচ্ছিস নিজের ফিলিংস! না বুঝতে পারলে অন্তত শেয়ারটা কর।সলভ করবো।চুপ করে একরোখার মতো ভালোবাসিনা,চাইনা,সম্ভব নয়।এসব কথা বলা সমাধান নয়।অযথা জ্বলেপুড়ে ছাড়খার হচ্ছিস।নিজেও, সাথে তিতিরকেও পোড়াচ্ছিস। “

____” আমি একটা প্রশ্নের উত্তর খুজে পাইনা why her?”
____”এটা দুনিয়ার সবচাইতে ইউজলেস প্রশ্ন ঈশান।তোর অবচেতন মনও জেনে গেছে ইউ লাভড হার।অথচ কেনো এক জেদে স্বীকার করছিস না।ওই কেনো এই জবাব খোদা ছাড়া কেউ জানেনা।”
ঈশান জবাব দেয় না।অনিমাও আর প্রশ্ন করেনা।সে জানে তাদের কথাগুলে কাজে দেবে এবারে,বেশ করে কাজে দেবে।ঈশান আরশাদ দেওয়ান নিজের ফিলিংস বুঝবে।তার ধারনা অবশ্য অন্য। ঈশান নিজের ফিলিংস আরও আগেই টের পেয়েছে।প্রকাশ করছে না ইচ্ছে করেই।হয়তো জেদে,নয়তো অন্য কোনো কারণ আছে এর পিছনে।
নিয়াজ আচমকা থমথমে পরিবেশ ভেঙে কপট গম্ভীর গলায় বললো,

_____”তোদের মধ্যে কিছু হয়েছে ঈশান!”
সাজিদ পা তুলে লাত্থি মারলো নিয়াজের পিছনে।এটা কি ধরনের প্রশ্ন। নিয়াজ হাতের ইশারা থামতে বললো সাজিদকে।ঈশানের অতি তপ্ত মুখ ইগনোর করে আবার বললো,
____”কিছু করিস নি তো ভাই মেয়েটার সাথে। ডিভোর্স চেয়েছিস।ওকে যেখানে বিয়ে দেবো সে বেচারা নিশ্চয় বাই ওয়ান গেট ওয়ান নিতে চাইবে না বল?”
____”আর একটা উল্টাপাল্টা কথা বললে তোর খবর আছে নিয়াজ।”
____”তার মানে হয়েছে কিছু-মিছু! “
____”হলে হয়েছে তোর কি!”
চিৎকার করে উঠলো নিয়াজ।অনিমা, সাজিদও হা হয়ে গেছে।সাজিদ ব্যাস্ত গলায় বললো,
____”সব?”
____”আমাকে তোদের এতোটা নিচ মনে হয়!”
____”হয় তো।তোর যা অবস্থা পরখ করেছি আমরা।আর খোঁজ খবরে যা কানে এসেছে,তুই ব্যাটা ভয়াবহ ভাবে পিছলাইছোস।তোকে আর বিশ্বাস নাই।সুযোগ পাইলে মাছ ক্যান,মাছের কাটা,মাথা,লেজ সব চাবাবি তুই। “
____”তোরা এতো বাজে বকার সাহস পাচ্ছিস কোথা থেকে।থামবি?”
এবার বোধহয় হতাশই হলো নিয়াজ।আসলেই হতাশ হলো নাকি এ তার নিদারুণ অভিনয় ধরতে পারা গেলো না।ফিচেল গলায় বলল,

____”হয়নি তার মানে।এটাও নিশ্চিন্ত হওয়ারই বিষয়।পাত্রপক্ষকে বলতে পারবো নির্দ্বিধায় যে বোনটা আমার শুধুমাত্র একটা চুক্তির বিয়ের শিকার।তাছাড়া আর কিছু না।”
____”আর একবার ওর বিয়ের কথা বললে সামনের ওই ট্রাকের সাথে গাড়িটা ঠুকে দেবো বললাম।”
শব্দ করে হেসে ফেললো তিনজনই।ব্যাটা মুখে স্বীকার করবে না একটা শব্দও। অথচ বউয়ের কথা তুললেই দুুনিয়ার বাইরে চলে যায় ভাবুক কবি হয়ে। আর জেলাসি তো ফ্রিইই।

মামিদের সাথে ইফতারির আয়োজন করতে ব্যাস্ত তিতির,নিশি,নূরি।বাড়ির মেয়েদের বছরের আর সময় কাজে হাত না দিলেও এই মাসটায় তাদের কিছু বলেন না কেউ।তারাও বেশ আনন্দ নিয়েই কাজে মশগুল থাকে।ইফতারের বেশি সময় বাকি নেই।ঘন্টাখানেক এর মতো।রাইসুল দেওয়ান রা তিন ভাই আজকে বাসাতেই।গতকালের অমন একটা ঘটনায় সারাদিনই এলাকার বিশিষ্ট সব মানুষদের আলাপ আলোচনা বসছে তাদের বাইরের লিভিং রুমটায়।তিতির ডাইনিং টেবিলে দাড়িয়ে ফল কাটতে ব্যাস্ত,নূরি শরবত বানাচ্ছে, নিশি প্লেট সাজাচ্ছে সকলের।তিতির আড়চোখে বারংবার তাকাচ্ছে সদর দরজার দিকে।বড় মামনীর থেকে শুনেছিলো ঈশান রওনা দিয়েছে সেই সকালে।অথচ সন্ধ্যা হয়ে এসেছে লোকটা পৌছুলো না এখনো। না তো ফোন করতে পারছে, আর না তো লজ্জায় কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারছে। রাহেলা দেওয়ান তাড়া দিলেন মেয়েদের। রাইসুল দেওয়ান রা বাহিরের ঘরে ইফতার করবেন আজকে।এলাকার কিছু লোকজন এসেছে।নয়ন তারাহুরো করে কাজের ছেলেটাকে নিয়ে তাদের ইফতার নিয়ে গেলো সেখানটায়।বাড়ির সকলেও এসে বসছে ধীরে ধীরে টেবিলে।রাহেলা চোখমুখ কুচকে তিতিরকে বললো,

____”ঈশান ফোন করেছিলো?”
তিতির দুদিকে মাথা নাড়ে।করেনি।ঈশান কোনোদিন তাকে কল করেছে বলে তো তার মনে পরলো না।তার নাম্বারই নেই বোধহয় ঈশানের কাছে।তবে মুখে কিছু বললো না।রাহেলা ব্যাস্ত হয়ে তিতিরের ফোন টেবিলের ওপর থেকে হাতে দিলো,ঈশানকে ফোন করে খোঁজ নিতে বলে ছুটলো রান্নাঘরের দিকে।তিতির ফোন হাতে দোনোমোনো করতে ব্যাস্ত।ফোন করতেই যাবে তখনই শোনা গেলো গাড়ির আওয়াজ।ঈশানের গাড়ির হর্ন এটা।চেনে তারা।তিতির নিজেও হাফ ছাড়লো ফোন করতে না হওয়ায়।
ক্লান্ত শরীরে গটগট করে ভিতরে ভিতরে আসলো ঈশান।তিতিরের চোখ গেলো সবার আগে।কি বিধ্বস্তই না দেখাচ্ছে।রোজা রেখে এতটা জার্নি করে কাল রাতে গেছে আবার আজকেই ফিরলো.।মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না।নিশি,নূরি একপলক দেখলো তিতিরের সেই উতলা মুখখানা।মিটিমিটি হাসলো দুজনেই।রাহেলা ছুটে এলেন রান্নাঘর থেকে ছেলের আসার শব্দ পেয়ে।

_____”আব্বা আসলি।ইশশশ কি অবস্থা। “
ঈশান মায়ের দিকে তাকালো।রাহেলা আক্ষেপ করতে করতে শাড়ির আচলে ছেলের মুখ মুছতে ব্যাস্ত।
_____”আমি ফ্রেশ হয়ে নামি।আজান দেবে তো।”
রাহেলা মাথা নেড়ে ছেলেকে যেতে দিলেন।ঈশান আড়চোখে দেখলো তিতিরকে। মেয়েটা তাকচ্চেও না তার দিকে একবারও।মাথায় এসে হানা দিলো সারারাস্তা তিনবিচ্ছুর বলা কথাগুলো।নিজের এলোমেলো দৃষ্টি সরিয়ে ওপরে গেলো সিড়ি ভেঙ্গে।
ইফতার শেষে নামাজ পরে সবেই নিচে এসেছে তিতির।মামনী রা সবাই সারাদিন এর ব্যাস্ততা শেষে বসেছে টিভির রুমে।রিশা,রোশনি,রাফি ঘরের এক কোনায় তাদের ডল হাউজ বানাতে ব্যাস্ত।নিশি,নূরি যার যার রুমে।তিতিরকে দেখেই উঠে এলেন রিক্তা দেওয়ান।রান্নাঘর থেকে এককাপ কফি এনে হাতে ধরিয়ে দিলেন।
_____”ঈশান কফি চাইলো।নিয়ে যা মা।”
তিতিরের হাতে কফিটা ধরিয়ে দিয়েই নিজে ছুটলো টিভির দিকে।সিরিয়াল মিস হয়ে যাবে কি না!তিতির একমুহূর্ত থ হয়ে দাড়িয়ে রইলো।সে তো পণ করে ছিলো ওই লোকের সামনেও পরবে না,এখন নাচতে নাচতে যেতে হবে তারই ঘরে।কি যে সমস্যা এসব!কি আর করার।গুটিগুটি পায়ে এসে দাড়ালো ঈশানের রুমের সামনে।নক করলো ছোট ছোট শব্দে।

_____”এসো।”
ঈশানের খুব ধারনা ছিলো রিক্তা অথবা নিজের মা এসেছে।তিতির শুকনো ঢোক গিয়ে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো।ঈশান উদাম শরীরে বুকসেল্ফ এর সামনে দাড়ানো।হাত উচিয়ে ওপরের তাক থেকে কোনো বই বের করছে সম্ভবত। এক হাত ওপরে তুলে রাখায় চওড়া পিঠের ওপর প্রজাপতির কারুকার্য ফুটে উঠেছে। ধকধক করে ওঠে লোকটাকে লেখলেই তার,তার ওপর আবার এ অবস্থায়। ঈশান কে ফিরতে না দেখে খুকখুক শব্দ করলো তিতির।পরিচিত কন্ঠস্বরে ফিরে তাকালো এবারে ঈশান।তিতিরকে সে আশা করেনি এখন।কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হাতে কফির কাপ নিয়ে।মুখ ঘুরিয়ে নিলো,গমগমে গলায় বলল,

____”রেখে যা ওখানে।”
তিতির ধীরেসুস্থে কাপ টা রাখলো।তবে ঘুরে চলে যেতে গিয়ে বাধলো বিপত্তি। কি থেকে কি হয়ে গেলো। বুঝতেই পারলো না তিতির।আচমকা খেয়াল করলো কফি কাপটা নিচে পরে চুরমার হয়ে গেলো।চিৎকার করে উঠলো একপ্রকার। ঈশান সবে বইটা নামিয়েছে।কাচ ভাঙ্গার শব্দ আর তিতিরের চিৎকারে ছুটে আসলে এপাশে।দু হাত বাহু চেপে একপ্রকার উচু করে সরিয়ে আনলো মেয়েটাকে।ব্যাস্ত গলায় বলল,
_____”লাগলো কোথাও?হ্যা?”
তিতির চোখমুখ বুজে দারিয়ে আছে।ভয়ে তার প্রান যায় যায়।ব্যাথা পাওয়ার জন্য নয়।ব্যাথা সে পায়নি।ঈশানের অতী প্রিয় কাপ টা ভেঙে ফেলার অপরাধে।কাপটা ঈশানের সেই ছোটবেলাকার।যতদূর জানে ঈশানের দশম জন্মদিন এ চন্দ্রা দেওয়ান উপহার দিয়েছিলো এটা।বিদেশ থেকে আনা,অতি সুন্দর রিয়াল মার্ভেল এর কফি মগ।তিতির নিচের ঠোঁট কামড়ে দাড়িয়ে রইলো।ঈশান তখনও এদিক ওদিক ভয়ার্ত দৃষ্টি বুলাতে ব্যাস্ত।তিতিরের কোথাও লেগেছে কি না বুঝতে চেষ্টা করছে।তিতিরের জবাব না পেয়ে আবার ডেকে উঠলো,

____”লেগেছে?”
দু দিকে মাথা নাড়লো তিতির।লাগেনি।ঈশান সন্তুষ্ট হলো না।ওকে একপ্রকার কোমড় ধরে উচু করে এনে বসালো বিছানায়।পায়ের দিকে গভীর দৃষ্টিতে পরখ করলো। সত্যিই লাগেনি।এবার ভাঙা মগের দিকে তাকাতেই হা হুতাশ করে উঠলো তিতির,
____”চিৎকার করবেন না প্লিজ।ইচ্ছে করে ভাঙ্গিনি আমি।”
ভ্রু কুচকে আসে ঈশানের।সে একবারও কিছু বলেছে!হোক অতি প্রিয় একটা জিনিস।তারপরেও কারোর আঘাত পাওয়ার থেকে ওটা নিশ্চয় গুরত্বপূর্ণ হয়না!
____”তোকে কিছু বলেছি আমি! “
____”বলেননি,বলতে কতক্ষণ। “
মেজাজ খারাপ হলো ঈশানের।গম্ভীর গলায় বললো,

____”ঘরে যা।খালা কে পাঠা।পরিষ্কার করে দিয়ে যাবে।”
তিতির পিটপিট করে তাকায়।ঈশান তার সামনে নেই।সরে গিয়ে দাড়িয়েছে আবার বুক সেলফ টার কাছে।নিচে ছুড়ে ফেলা বইটা হাতে তুলে উল্টেপাল্টে দেখছে সেটা।তিতির উঠে দাড়ালো। চলে যেতে গিয়েও কি মনে করে থমকে দাড়ালো।গম্ভীর গলায় বললো,
____”আপনি কাল কখন পৌছেছিলেন ঢাকাতে?”
ঈশান বই থেকে মুখ তোলে না।গম্ভীর গলায় জবাব দেয়,
____”কেনো!”
____”সুবর্ণা আপু… “
____”গেট লস্ট। “
আচমকা ঈশানের ধমকের কারণ টের পেলো না সে।মুখ খুলতে যাবে আবার শোনা গেলো ঈশানের গলা,
____”যেতে বললাম তো।”
তিতির অপমানিত বোধ করলো।গটগট পায়ে বেড়িয়ে এলো ঘর থেকে।সে বের হতেই মুখের ওপর দরজা আটকালো ঈশান।তিতিরের আচমকা কান্না পেলো।শুরুর কয়দিন কি পরিমাণ পাগলামি করতো তাকে এ রুমে থাকতেে,অথচ সেদিন এর পর একটা বারও তাকে ডাকেনি ঈশান।কথাও বলার চেষ্টা করেনি।এতগুলো দিন পরে কাল সবে কথা বলে খানিকটা।আর আজ তো বেরই হয়ে যেতে বললো।

রাতের খাওয়াদাওয়া শেষে গভীর ঘুমে মগ্ন বাড়ির বড়রা।বাড়ির নিচতলা সম্পূর্ণ অন্ধকার। তবে ওপরের তলায় ছেলেমেয়ে রা কেউ ঘুমায়নি।নিশি, নূরি দুজনেই ফোনে প্রেমালাপ এ ব্যাস্ত।নয়ন অফিসের কিছু কাজ করছিলো।ঈশানও তাই সম্ভবত। ল্যাপটপে মুখ গুজে বসা।বাইরে শীতল বাতাস বইছে।তার রুমের জানালা,বারান্দার কাচ দুটো খুলে রাখা।ল্যাপটপ টা বন্ধ করতেই ঘরটা অন্ধকার এ ছেয়ে গেলো।বাইরের থেকে আলো আসছে দরজা, জানালা ভেদ করে।সিগারেট হাত এসে দাড়ালো বারান্দায়। রেলিং এ ভর করে আয়েশ করে সিগারেট টানলো।তিতিরের বারান্দার দিকে তাকাতেই থমকালো সে।তিতির বারান্দার দোলনাটায় শুয়ে।ঘুমিয়ে গেছে।গায়ের ওড়না টা গলা ছেড়ে মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।ওর পাখির খাচাটা বারান্দার এককোনায় ঝোলানো।কিচিরমিচির করছে সে দুটো।খোলা বারান্দা তাদের বেশ প্রশ্যস্ত।গাছগাছালী দিয়ে ভর্তি বারান্দা টা মেয়েটার।সেই সবুজের মাঝে চাঁদনি রাতে দোলনায় কোনো সাদা কাপড়ে কেউ শুয়ে থাকলে তাকে বোধহয় কোনোভাবেই এ দুনিয়ার নারী বলে ঠাহর করা যায়না।

নিজের বারান্দার রকিং চেয়ারে বসলো ঈশান।দু বারান্দার মাঝে মাত্র এক হাত দুরত্ব দুজনেই দুজনের বারান্দার দু প্রান্তে।সেই হিসবে যতটুকু দুরত্ব আরকি।ঈশান ঘোরলাগা চোখে তাকিয়ে রইলো তিতিরের দিকে।দোলনা টা মৃদু দুলছে।খোলা চুল ছড়িয়ে দেওয়া ওপাশে।মেয়েটাকে চুল বাধতে সে খুব কমই দেখে।হাতের সিগারেট টা দেখতে দেখতে শেষ হয়,ধরায় আরেকটা।আজকাল বড্ড সিগারেট খাওয়া হচ্ছে। বিগত কয়েকবছরের এত খায়নি যতটা সে লাস্ট দেড় মাসে খেয়েছে।ঈশান এর বড্ড তেষ্টা পাচ্ছে,তবে মোটেই পানি খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না।হাতের আধখাওয়া সিগারেট এর দিকে তাকালো।কেমন অসহ্য লাগলো এটা।নিচে ফেলে পায়ে পিষলো।দু হাতে মাথার ঘন চুল পিছনে ঠেললো।বেশ বাতাস শুরু হয়েছে।বৃষ্টি নামবে না।কারণ আকাশ একদম ঝকঝকে এখন।তাঁরার মেলা দেখা যাচ্ছে।চাঁদ টা তার মধ্যে নিজের আলোয় আলোকিত করছে পৃথিবীকে।চাঁদের আলো ঠিকরে পরছে তিতিরের মুখের ওপর।শ্বাস আটকে এলো আচমকা ঈশানের।তিতিরের গায়ের জামাটা সম্ভবত জরজেট এর!না কি বলে ওটাকে!তাই তো বোধহয়। না চাইতেও স্থির দৃষ্টি চলে যায় নিষিদ্ধ অংশে।চোখ ফিরিয়ে নেয় সে।বুকের ওপর ওড়নাটা নেই।সে বেচারা নিচে পরে আছে,সুডৌল বক্ষজোড়া জামার আঁটসাঁট অবস্থার জন্য স্পষ্ট ফুটে উঠে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে।আর কতবার বললে মেয়েটা এমন বড় গলার জামাকাপড় পরবে না।আশ্চর্য! মেরে ফেলতে চায় নাকি ওকে মেয়েটা!দু হাতে মুখ ডলে।তার ঘুম দরকার ছিলো।ভেবেছিলো সিগারেট টা খেয়ে লম্বা একটা ঘুম দেবে।সাহরী তে উঠতে হবে যদিও।তবুও দুইরাত হলো এক ফোঁটা ঘুম নেই।কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে ঘুম ছুটে গেছে তার।একফোটা ঘুমের রেশমাত্র নেই চোখেমুখে। বেহায়া মনটা বারবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে ফেলছে তিতিরের দিকে।সে যতবার বোঝাতে চাইছে এটা ঠিক নয়,নিষিদ্ধ। ততবার মনটা তাকে হালাল সার্টিফিকেট এর দোহাই দিতে ব্যাস্ত।ঠান্ডা বাতাসের মধ্যেও গরম লাগলো তার।দ্রুত হাতে খুলে ফেললো শার্টের ওপরে তিন-চারটে বোতাম।উঠে দাড়িয়ে দু হাতে চুল খামচে ধরলো।অস্থির লাগছে তার।ভীষনভাবে অস্থির।পকেট হাতড়ে আরেকদফা সিগারেট বের করলো।কাঁপা হাতে ঠোঁটে ধরলো।দাঁতে দাত চেপে দৃষ্টি সরিয়ে রাখলো মেয়েটার ওপর থেকে।ওই চাঁদের আলোয় চাঁদমুখটা যতবার দেখছে ততবার গিয়ে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। তিতিরের পায়ে নূপুর পরা।একটু নড়ে উঠতেই ঝনঝন শব্দ হচ্ছে। কানে বাজছে ঈশানের।সামন্য নূপুর এর শব্দও তাকে পাগল করে ফেলছে।

ঈশান সিগারেট এর ধোয়া ছাড়লো আকাশের দিকে।স্থির, পিপাষার্ত দৃষ্টি রাখলো দূর আকাশের ওই চাঁদের দিকে।দুটো চাঁদই তার ধরাছোঁয়ার বাইরে।অথচ আকাশের ওই চাঁদের থেকে কয়েকশ গুন সুন্দর চাঁদ, তার নামে দলিল করা।চাইলেই তাকে ধরতে পারে,ছুতে পারে,সেই ব্যাক্তিগত চাঁদের আলোয় স্নান করতে পারে।পারে না!পারো তো।তাহলে কি বাধা দিচ্ছে তাকে!কে জানে।ঈশান বুকের বা পাশে হাত রাখে।বা বাশের হৃদপিণ্ড নামক দেহাংশ টা শব্দ করে আন্দোলন করছে বেশ।আচ্ছা তিতির কি জানবে ঈশান সত্যিই কতটা বেহায়া! কতটা নির্লজ্জ।

জানবে কি এই একমাসে কতদিন মাঝরাতে গিয়ে ওই নরম বুকে মুখ গুজে পরে থেকেছে সে।উন্মাদের মতো ঘ্রান টেনেছে ওই ছোট্ট শরীরের।চুমুতে চুমুতে নিজের পিপাসা মিটিয়েছে রাতভর।তিতির যতবার দুঃস্বপ্ন দেখে কেঁদে উঠতে গেছে ততবার আলতো হাতে মাথায় হাত বুলিয়েছে। কত কসরত করে সে আবিষ্কার করেছে ঘুমের ঘোরে মেয়েটার শ্বাসকষ্ট হলে বুকের বা পাশটা আলতো হাতে মালিশ করতে হয়।ইশশশ চিনচিন করে উঠলো ঈশানের বুকের বা পাশটা।রোগ সারানোর জন্য হলেও সে মূহুর্তটা মোটেই শান্তিদায়ক ছিলো না তার জন্য। তিতির বেশ শান্ত হয়ে যেতো বুকের বা পাশে মালিশ করলে,শ্বাসকষ্ট কমতো খুব দ্রুত।রোজ রাতেই এমন হতো মেয়েটার সাথে।কিন্তু ঈশান!স্ত্রী নামক বৈধ নারীর এমন বিপদজনক সঙ্গ পেয়ে সামালাতো নিজের বুকে পাথর চাপা দিয়ে।ঘুমের ঘোরে তলিয়ে থাকা ছোট মাথাটা এনে চেপে ধরতো নিজের বুকের বা পাশে।বেশিরভাগ সময়ই তিতির খুব করে নাক ঘষতো বিছালছানার মতো।তারপর শান্তিতে ঘুম দিতো।মেয়েটার ছটফটানি কমে গেছে সেটা টের পেতো যখন তার উন্মুক্ত বুকে তিতিরের মুখের ঠান্ডা লালা হসে পরতো।

হাসি পেলো ঈশানের।জানে এসব মেয়েটা!জানবে কখনো আদৌ।সবকথার উর্ধ্বে সে কখনো জানাতে পারবে! কোমড় নিচু করে রেলিঙে ভর দিয়ে ঘাড় কাত করে তাকায় তিতিরের দিকে।কি স্নিগ্ধই না লাগছে।ঈশান সিগারেট টেনে হাসলো মৃদু। ঈশান আরশাদ দেওয়ান ফেঁসেছে, ভয়ংকর ভাবে ফেঁসেছে।গিটার টা এনে গলা ছেড়ে গান গাইতে পারলে একটু ভালো লাগতো কি!লাগতো বোধহয়।তবে সেটা করা যাচ্ছে না আপাতত।ঘুম ভেঙে যাবে তিতিরের।গলার কন্ঠ একদম খাদে নামিয়ে সিগারেট এ টান দিয়ে তিতিরের দিকে মাতাল চাওনি রেখে গান ধরলো সে।
“একলা ছিল মন ধূসর এতদিন
এক ঝলকে তোর হয়েছে কি রঙিন
শুনতে পেলে যেই নূপুর বাজে তোর
বেঁচে থাকাই দায়,মরে যাওয়া কঠিন..
তোর চোখের ঝিল জানি
বেরোনো মুশকিল মানি
তাও পারি না যে
এগিয়ে গিয়েছে আমারই দু’টো পা…
তোকে একার দেখার লুকিয়ে কি মজা
সে তো আমি ছাড়া কেউ জানে না
তোকে চাওয়ারা পাওয়ারা নয় রে সোজা
সে-তো আমি ছাড়া কেউ জানে না..

আচমকা ছটফট করে উঠলো তিতির।চোখ পিটপিট করছে তার।এমন অবস্থা কখন হয় এতদিন এ টের পেয়ে গেছে ঈশান।চমকে গেলো।থেমো গেলো গান।ব্যাস্ত হয়ে এখান থেকেই ডেকে ফেলতে গিয়েও ডাকলো না।তিতিরের হাত তখন পেটের ওপর থেকে ঝুলে পরেছে নিচের দিকে।মেঝে ছুইছুই।ঈশান ছুটলো। সটানে নিজের দরজা খুলে ঢুকে পরলো তিতিরের রুমে।তিতিরের রুম লক করা থাকেনা।মাঝেমধ্যেই শ্বাসকষ্ট হওয়ায় রাহেলা দেওয়ান এর কড়া নির্দেশ একা থাকলে দরজা আটকানো যাবেনা।যদিও বাড়ির কেউই জানেনা তাদের আলাদা থাকার কথা।ঈশান কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এসে পৌছুলো তিতিরের কাছে।কাঁপছে মেয়েটা।চোখ দিয়ে অনবরত গড়িয়ে পরছে পানি।ঈশান হাটু ভেঙে হুড়মুড়িয়ে বসে পরলো।দু হাতে আজলায় নিলো নরম মুখটা।ফুঁপিয়ে উঠলো তিতির।আজকে অন্য দিনের মতো হলো না।তার আগেই তাকালো মেয়েটা।ঈশান কে সামনে পেয়ে যেনো জানে পানি পেলো।দু হাতে খামচে ধরলো ঈশানের গলা। থমকায় ঈশান।তিতির ঈশানের গলায় মুখ গুজে পরে আছে।চোখের পানিতে ভিজের যাছে ঈশানের ঘাড়।

_____”আ..আপনি বারবার চলে যান কেনো!হ্যা?ধরতে পারি না কেনো আমি।আমি কত ছুটে যাই জানেন আপনি?বারবার হাত ফসকে যায়…”
দুঃস্বপ্ন কি তাকে নিয়ে দেখছিলো তিতির।তিতির জেগে,সুতরাং নিজের হাত দিয়ে ওকে জড়িয়ে নিতে ইতস্তত করলো খানিকটা।কিন্তু বাধ মানলো না মন।হাত সবেই উঠেছে তিতিরের কোমড় অবধি,সজোরে ধাক্কা দিলো তিতির ঈশানকে।ঈশান পরে গেলো না, তবে আচমকা টান সামলাতে না পেরে মেঝেতে হাতের তালু পরলো তার।তিতির ছিটকে উঠে দাড়ালো।এদিকওদিক তাকিয়ে নিজের পড়না গলায় জড়ালো।চোখমুছলো ভালো মতো।
____”আপনি এখানে কেনো।”
ঈশান উঠে দাড়িয়েছে ততক্ষণে। কপালে ভাজ ফেলে তাকালো তিতিরের দিকে।ঘুমে নেই আর।গম্ভীর গলায় বললো,

____”চেচামেচি করছিলি কেনো।আমি আমার বারান্দায় এসেছিলাম।শুনতে পেয়ে..
____”তাই চলে আসবেন এভাবে রুমে!”
নিজের গোপন সত্তা টা সামনে আসতে দিলো না ঈশান।তিতিরের এহেন জেরায় মেজাজ খারাপ হয় তার।
____”কি মনে করিস তুই নিজেকে!”
____”কি মনে করবো কিছুনা।যান নিজের ঘরে।আর হুটহাট আমার ঘরে নক না করে ঢুকবেন না।আমার যাই হোক না কেনো।”
তখন ঈশানের করা অপমান এর প্রতিশোধ নিলো তিতির নিজের রুম থেকে ওকে বের হয়ে যেতে বলে।ঈশানের সেটা মোটই পছন্দ হলো না।না চাইতেও স্বভাবের দোষে তেতে উঠলো বেচারা,
_____”সাহস হয় কি করে ঈশান আরশাদ দেওয়ান কে রুম থেকে বেড়িয়ে যেতে বলার।”
তিতির এর মুখ নির্বিকার দেখালো। মনে মনে ভীষন ভয় পায় ঈশানের সামনে গলা তুলে কথা বলতে।কিন্তু ওপরে সে সেটা প্রকাশ করবে কেনো!ঈশানের গলায় তাল মিলিয়ে বললো,
_____”যেখান থেকে সাহস টা আপনি পেয়েছেন।”
_____”অকৃতজ্ঞা কি তোর বাপের বাড়ির রক্তে হুম?তোর ভালোর জন্য এসেছিলাম।বাজে বকা শোনার জন্য নয়।”
চূড়ান্ত আতে ঘা লাগলো তিতিরের।বাবার কথা তোলায়।কথায় কথায় অপমান কেনো করা হবে তাকে।

____”পরিবার তুলবেন না।এ বাড়ির রক্তও আমার গায়ে সুতরাং মুখ সামলে বলবেন।আমিও বলতে পারি তাহলে।আপনার চরিত্র নিয়ে।কিন্তু বলবো না।কারণ পরিবার কে সম্মান আমি দিতে জানি।এটা আমার পরিবার। আপনি যা হয়েছেন তার দায় একান্ত আপনার।বাপ মা টানবো না আমি।বেড়িয়ে যান আমার ঘর থেকে।এখনি।যা উপকার করেছেন আমার এ জীবনে তা আমি কখনো ভুলবো না।আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো।সত্যি… এইযে কাটা ঘায়ে নুনের ছেটা লাগাতে এসেছেন।এই কঠিন ঘা টা আপনারই তৈরি।সুতরাং জুতা মেরে গরু দান করতে হবে না।প্লিজ যান।”
ঈশানের মাথায় রক্ত চড়লো এবারের তিতিরের ব্যবহারে।গায়ে হাত সে তুলবে না।শপথ নিয়েছে।দাতে দাঁত চেপে বললো,

_____”এত কিসের অহংকার সবসময় করিস তুই।সেটা বোঝা আমাকে। সেই তো আমার ঘাড়েই বোঝা হয়ে ঝুলছিস।আজীবনের জন্য ঝুলিয়ে দিয়েছে। এ জীবনে মুক্তি নেই,উল্টো হালাল হয়ে পরকালের জন্যও গেরে বসেছিস।আবার আমার বাড়িতে দাড়িয়ে আমাকেই বেড়িয়ে যেতে বলিস।”
চমকে তাকায় তিতির।যে কথা কম করতে চায় তত কথা বাড়ে।এসব কথা থেকে আজীবন পালিয়ে বাচতে চায় সে।যতবার দূরে সরতে চায় এসব তিক্ত কথার রেশ থেকে। ততবার এই লোকটা ওকে আঙুল দিয়ে সেসব ইশারা করে দেখায়।
____”বোঝা সেটা আগে মনে হয়নি।বিয়েতে কেনো রাজি হলেন সেদিন।রুষাকে নিয়ে হোটেলে না ঢুকে বাড়িয়ে একেবারে নিয়ে আসলেই ঝামেলা শেষ হয়ে যেতো।এই নাটক চালানোর মানেই ছিলো না আর।জটিল তো সব আপনিই করলেন।আমিও আমার মতো ভালোই থাকতাম।আমাকে যে ভালোবাসে তার কাছে। গোটা দুনিয়ার সমস্ত ভালোবাসা পায়ের কাছে এনে রাখতো সে।“
ঈশান সহসা একদম ঘেষে গেলো তিতিরের।রুষা আর রাহাত।এই দুটো নাম বারবার ঢুকে পরে তাদের মাঝখানে।তখন আর কোনো দিক খেয়াল থাকে না তার রাগে।ভেঙে চুরমার করে দিতে ইচ্ছে হয় তার সব।এই যেমন এখন মনে হচ্ছে। খুন করে ফেলতে মন চাচ্ছে তিতিরকে।রাহাতের কাছে গেলে ভালো থাকতো সে!এখন এটা মনে হয়।অবুঝের বাচ্চা একটা।আর রইলো বাকি রুষা।বলেছিলো না হয় বাধ্য হয়েই রুষার কথা সেদিন। কিই বা করার ছিলো আর।কিন্তু পরে তো আরও হাজার বার বলেছিলো সেসব মিথ্যা।সেদিনের কথা বিশ্বাস করা গেলে পরের কথা কেনো বিশ্বাস করতে পারে না।ওটা বিয়ের প্রথম রাত ছিলো বলে এতো ইগোতে লেগেছে!
মুখটা অস্বাভাবিক লাল হয়ে গেছে ঈশানের।চোখ দিয়ে আগুন ঝড়ছে,

____”ঝুলিয়ে দিলে কি করতে পারতাম।হেল হয়ে গেছে লাইফটা আমার।কি করছি না করছি,কেমন হয়ে গেছি নিজেই চিনতে পারি না আমি।শুধু তোর জন্য এসব।সব তোর জন্য। জ্বলে পুড়ে তামা তামা হয়ে যাচ্ছি।আমি ঈশান আরশাদ পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরা বাকি আছে এখন।তোর জন্য সব।মরে যাই এটা চাস আমি।ঝাঝরা তো করিসই প্রতিনিয়ত বুকটা।একদিন পিস্তল ধরিয়ে দেই,একেবারে ঝামেলা খতম কর।করবি?হ্যা?”
তিতির চোখ বুজে পিছিয়ে দেয়ালে ঠেকলো।ঈশানের এই রুপ বরাবরই ভয় পায় সে।চোখের সামনে ভেসে উঠলো সেদিন রাতে ঈশানের রাগের কথা।গা ভয়ে।কেঁপে উঠলো।ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো সে।ঈশান মেজাজ হারায় সজোরে লাথি বসায় দোলনার রডে।দ্রুত পায়ে বের হয়ে যায় ঘর থেকে।

তিতির স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে রইলো।ঈশান বের হয়ে যেতেই এসে আটকালো দরজা।আর কত অপমান সহ্য করতে হবে তাকে!সে বোঝা!বাবা মা মরলে এতিমই বলে তাদের। তারা বোঝা নয় তো কি।কে আছে তার আর,কেউ নেই।এটা তার মামার বাড়ি ছিলো একসময়,এখন নেই।শশুর বাড়ি এটা তার।সেখানে স্বামী যখন বোঝা বলে তখন সেখানে কোন সম্মান এ পরে থাকবে সে।সেও কম যায়না।বাবা বাড়ি যা আছে,যে আছে তাদের কাছেই থাকবে সে।আগে পরে এমনিতেও সম্পর্ক শেষ হবে এ পরিবার এর সাথে। তাদের বিচ্ছেদের পর নিশ্চয় মামাবাড়ি তে নাচতে নাচতে এসে ঈশানের বউয়ের হাতের রান্না খেতে পারবে না।বিছানার কিনারায় পাথরের মতো দাড়িয়ে রইলো খানিক্ষন। স্থির করলো কিছু একটা।দ্রুত পায়ে ব্যাগ গুছিয়ে ফেললো।রাগে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়েছে সেও।স একটা মানুষ এটা ভুলে যায় কি করে ঈশান! কষ্ট তারও হয়,মৃত্যু যন্ত্রণা লাগে তার সবকিছু।তবুও দিনশেষে সে জেদি!অহংকারি!কি করতে হতো ভালো হতে গেলে!ঈশানের অপমান সহ্য করে মুখ বুজে সব শুনে রাত হলে গায়ের কাপড় খুলে তার সাথে বিছানায় গেলে! চলতো এভাবে সারাজীবন ভালোর তকমা গায়ে লাগিয়েে!

ঘড়ির কাটা শব্দ করে ঘুরছে।এগারোর ঘর ছেড়ে পার হচ্ছে বারোটার কাটা।দেওয়ান বাড়ি নিস্তব্ধ।ঈশান ঘরময় পায়চারি করছে।মেয়েটাকে ওভাবে কথা শোনানোর মানেই হয়না কোনো।দোষটা তার নিজের।তার ভাগ্যের।কিচ্ছু ঠিক করতে পারছে না।অন্য এক প্রিয় মানুষের জীবন জড়িয়ে আছে এতে।সওদা করার মতো অবস্থায় এসে পরেছে সে।একজনকে বাচিয়ে অন্য জনকে ভাসিয়ে দেওয়ার মতো শক্তি,মনের জোর তার নেই।একটা পথ খুজে না পাওয়া পর্যন্ত কষ্ট পেতে হবে,কষ্ট দিতে হবে।খনিকের সুখের জন্য অনন্তকালের বিচ্ছেদ ঘটানো কি যুক্তিযোগ্য!নয় তো।
তিতিরের ঘর থেকে এসেছে প্রায় পয়তাল্লিশ মিনিট।মেয়েটা কি ঘুমিয়েছে!ঘুমানোর কথা নয়।বোধহয় কেঁদে বালিশ ভেজাচ্ছে।না ঘুমানো পর্যন্ত যেতেও পারছে না সে।দেখবে একবার গিয়ে!ধীরেসুস্থে তিতিরের দরজার সামনে এসে থমকালো সে।হাট করে খোলা দরজা।ভিতরে অন্ধকার। ভ্রু কুচকে ভিতরে ঢুকতেই থমকালো।আলমিরাও খোলা।ভিতরে কোনো জামাকাপড় নেই।রুমটাই ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।বুকের বা পাশটা অশনী সংকেত দিয়ে উঠলো।এদিকওদিক ছটফটে পায়ে খুঁজলো মেয়েটাকে।পুরো ঘরে কোত্থাও নেই তিতির।থরথর করে কাঁপলো পা।নিশি কে ডাকবে।ওর ঘরে কি না!রাত তো বেশি হয়নি,ঘুমায়নি ওরা হয়তো।তবে…কিছু একটা মনে হতেই নিজের ফোন বের করলো সে।লোকেশন ট্রাকিং বের করতেই থমকালো। হার্ট বিট মিস করলো একটা।তিতির সত্যিই এই বাড়িতে নেই।পনেরো দিন আগেই তিতিরের ফোন,সিম সব নিজের ফোনের সাথে কানেক্ট করে নিয়েছিলো সে।সেফটির জন্য। মাথা ব্ল্যাংক লাগলো তার।অস্ফুটস্বরে আওরালো,

_____”শিট…”
ঝড়ের গতিতে নিজের ঘর থেকে গাড়ির চাবি হাতে নিয়ে ছুটলো।গাড়ি স্টার্ট করে লেকেশন অন করলো সামনে।স্টেশন দেখাচ্ছে লোকেশন।স্থির হয়ে আছে এক জায়গায়।রাগে মেয়েটাকে খুন করলেও শান্তি পাবে না সে আজকে।
দীর্ঘক্ষণ ধরে বাজতে থাকা ফেনটা কানে তুললো।ওপাশ থেকে এক রুক্ষ গলা এলো।
____”স্যার আপনার ছোট বোন তিতির এতো রাতে…
____”শাট আপ।নজরে রাখো।আমি আসছি।”

ফোনের ওপাশের ব্যাক্তিটি বুঝলো না তাকে ধমক দেওয়ার কারণ কি।ঈশান কি আগেই জানতো মেয়েটার খবর…লোকটার বাকি কথা আর শোনার প্রয়োজন বোধ করলো না ঈশান।
ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ির গতি বাড়ায়।গেছে কিসে মেয়েটা এতো রাতে! হেটে!গা শিওরে ওঠে ঈশানের।গাড়ি নিয়ে যেতে পনেরো মিনিট লাগবে।আঁকাবাকা রাস্তা,বিধায় সময় লাগে।জোরে গাড়ি টানা যায়না এদিকটায়।মেয়েটা তার মানে সে ঘর থেকে বের হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বেরিয়েছে।কত বড় সাহস ভাবা যায়।হতাশ লাগে ঈশানের।এ মেয়ের সাথে জীবনে যদি কখনো সংসার করার সুযোগ পায় দুঃখই আছে কপালে।কারোর রাগ জেদ এক চুল কম নয়।এরকম করে চলবে!এই যেমন অন্ধকার, রাত, একা একা প্রচন্ড ভয় পায় তিতির।অথচ জেদের বশে হেটে রাত বারোটার সময় স্টেশনে চলে এসেছে! মানুষ ভয় ভয় না পাক,ভূতের ভয়ও কি নেই!কালক রাতেই এমন একটা ঘটনা ঘটে গেছে।ওর কি একবারও মনে হলো না কি করছে ও।কি হতে পারে।মাত্র একদিন এর ডিভারেন্স।এতো সাহস ওর হলো কোথা থেকে।
মিনিট বিশেক এর মাথায় গাড়ির চাকা হাওয়া ছেড়ে দিলো স্টেশন থেকে বেশ খনিকটা দূরেই।সব বিপদ একসাথে আসে যখন আসার।মাথা এমনিতেই গরম তার ওপর আবার এই ঝক্কি।অগত্যা গাড়ি থেকে নেমে একপ্রকার ছুটতে শুরু করলো সে।যদিও তার লোক তিতিরকে পেয়েছে মানে মেয়েটা সেফ।তবুও নিজে না যাওয়া অবধি শান্তি পাবে না।

তাদের এলাকার স্টেশনটা একদম মুগ্ধ করার মতো।আশেপাশে সবুজে ঘেরা।বিশাল এক স্টেশন। ।দৃষ্টি বারবার যাচ্ছে ফোনের দিকে।লোকেশন একই জায়গায়।এতো রাতে ট্রেন কোথায় পাবে ও!কোন আক্কেলে এসেছে!স্টেশনের বেশ কিছুদূর আসার পর এ মাথা থেকে চেখে পরলো ছাউনির নিচে বসা মেয়েটাকে। চিনতে একদম কষ্ট হলো না।ল্যাম্পপোস্টের আলো গিয়ে পরেছে মুখে।পাশে বিশাল ট্রলি ব্যাগ।রাগ ততক্ষণে মাথায় উঠেছে ঈশানের।হাতের মুঠো শক্ত হলো।ফোনটা পকেটে পুরে গটগট করে এগুলো ওদিকে।তিতির ভ্রু কুচকে হুট করে বায়ে তাকাতেই থমকালো।এদিকে আসা ঈশানকে দেখে দাড়িয়ে পরলো।ঈশান জানলো কি করে সে এখানে।চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে,ভুল দেখছে।

ঝড়ের গতিতে সামনে এসে দাড়ালো ঈশান।তিতির ছলছল।চোখে তাকিয়ে।ভয়ে নাকি অভিমানে সেটা অবশ্য সেই জানে।ঈশান দূর থেকে পরিকল্পনা করে এসেছিলো কষিয়ে একটা চড় মারবে।কিন্তু তিতিরের ছলছল চোখ আর বারবার ঠোঁট উল্টানো দেখে পরিকল্পনা পরিবর্তন হলো।হাত গালের বদলে গিয়ে ছুলো লতানো কোমড়।অন্য হাতে খুলে ফেললো খোপা করা চুল।পেচিয়ো নিলো চুলগুলো নিজের হাতের সাথে।হেচকা টানে মুখের কাছে মুখ নিয়ে এলো।তিতির আতঙ্কে খামচে ধরেছে ঈশানের কোমড়ের কাছে শার্টের অংশ।
ঈশান বিনাবাক্যে কামড়ে ধরলো তিতিরের ওষ্ঠজোড়া।ব্যাথায় টপটপ করে পানি গড়িয়ে পরলো সঙ্গে সঙ্গেই।ঈশানের মুখের ভিতর একইসাথে নোনতা অনুভব করা মাত্র কামড় ছেড়ে আকড়ে ধরলো। নরম আলতো চুমু দিয়ে ছেড়ে দিলো।অবলোকন করলো ওষ্ঠজোড়া।অনেকটা কেটে গেছে।ব্যাথায় চোখ খিচে বন্ধ করা তিতিরের।হাতের মুঠো শক্ত করে চেপে রাখা ঈশানের শার্ট।কাটা অংশের ওপর আবার চুমু দিলো একটা।নোনতা অংশটুকু অবলীলায় শুষে নিলো।তিতিরের শরীর থরথর করে কাঁপছে দাড়িয়ে থাকতে পারলো না।শরীর ছেড়ে দিলে যেনো।ঈশান এক হাতে আগলে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবালো।তিতির রেসপন্স করছে না।বরং সরে আসতে মরিয়া।তবে যতবার সে চেষ্টা করছে।গাঢ় থেকে গাঢ় হচ্ছে ঈশানের স্পর্শ।

তিতিরের অবাধ্যতার আক্রশ মেটাতে ব্যাস্ত যেনো।টিকিট কাউন্টার থেকে বেড়িয়ে এদিকে তাকাতেই থমকে গেলো নয়ন।শ্বাস আটকে ঘুরে দাড়ালো।ঈশান তিতিরকে এমন ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখার সাহস তার নেই।মূলত সেই নিয়ে এসেছে তিতিরকে।মোটেই দু এককথার আবেগে পরে নিয়ে আসেনি।তিতির এর কসম টসম এর অত্যাচারে উপায় না পেয়ে নিয়ে এসেছে।যদিও এত রাতে কখনো একা ছাড়তো না,তাই নিজের জন্যও টিকিট কেটেছে।তিতিরের জেদ সে জানে,সে নিয়ে না আসলে একাই চলে আসতো মেয়েটা।তার থেকে ভালো নিজে সাথে নিয়ে যাক।তারপর রাগ পরলে না হয় বুঝিয়ে ফেরতও আনবে।নয়ন ঘুরে তাকাতে পারে না আর।চোখ জ্বালা করছে তার।তিতির তাকিয়ে সরিয়ে দিতে চাইলো ঈশানকে।ঈশানের চোখজোড়া বন্ধ। যেনো কত গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে ব্যাস্ত সে।বিরক্ত করা মানা।তিতিরের চোখ গেলো অদূরে দাড়িয়ে থাকা নয়নের দিকে।তিতির কোনো মতে ইশারা করতে চাইলো ঈশানকে সেদিকে।ঈশান একপর্যায়ে বিরক্ত হয়েই ছেড়ে দিলো।ধমকে উঠলো,

____”প্রবলেম কি?”
এতক্ষণ টর্চার করে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে প্রবলেম কি! আস্ত প্রবলেম কামড়ে ধরেছে তাকে।সেটা বললে তো আবার খেয়েও ফেলতে পারে লোকটা তাকে।কোনোমতে দেখালো পিছনে।ঈশান বিরক্ত মুখে ঘাড় কাত করে পিছনে তাকাতেই চোখমুখ আরও কুচকালো।হাতের উল্টোপিঠে মুছলো ঠোঁট জোড়া।নয়ন ঘুরছে না।তাদের অন্তরঙ্গতার সাক্ষী এরই মধ্যে হয়ে গেছে নিশ্চয়ই।
ঈশান তিতিরের দিকে তাকালো।কাটা অংশে বৃদ্ধাঙ্গুলি চেপে ধরলো।দ্বিগুন ব্যাথা পেলো মেয়েটা।ব্যাথা আর্তনাদ করে উঠলো।ঈশান উঁচু গলায় ডাকলো নয়নকে।নয়ন মাথা নিচু করে এগিয়ে এসে দাড়ালো।প্রথমত তিতিরের দিকে তাকানোর মতো মনের জোর ওর নেই,দ্বিতীয়ত তিতিরকে এভাবে নিয়ে আসার জন্য ভাইয়ের কাছে অনুতপ্ত সে।ঈশান ঠোট ছেড়ে হাত ধরে টেনে কাছে আনলো তিতিরকে। উল্টো করে দাড় করিয়ে পেট গলিয়ে হাত দিয়ে রাখলো।গম্ভীর গলায় বললো,

_____”তোর একবারও মনে হলো না ওকে নিয়ে আসার সময় একবার অন্তত আমাকে জানানো প্রয়োজন ছিলো তোর।”
____”ভাইয়া কে কিছু বলবেন না। আমি….
____”শাট ইওর মাউথ।”
ঈশানের ধমকে চুপ করে গেলো তিতির।যতই রাগ,জেদ,সাহস দেখাক যা করেছে অবশ্যই সেটা অন্যায়।অন্যায় করলে ভয় পাওয়া টাও স্বাভাবিক।
নয়ন ধীর গলায় বললো,
____”আমি…”
____”যা বাড়িতে যা।বাড়িতে গিয়ে যা কথা হওয়ার হবে।”
নয়ন ভাইয়ের দিকে অপরাধির মতো তাকালো।আরেকনজর তাকালো তিতিরের দিকে।তিতিরকে উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দাড় করিয়ে রাখা।
____”মণি..?”
____”আমি থাকতে নিশ্চয় ওকে নিয়ে তোর চিন্তার কারণ নেই!”
মাথা নাড়লো নয়ন।দ্রুত ঘুরে হাটা ধরলো স্টেশনের অন্য প্রান্তের দিকে।তার গাড়ি রাখা এই পাশে।

ঈশান এবার ফিরলো তিতিরের দিকে।গম্ভীর গলাতে বললো,
____”তোকে কি করা উচিত। বল এবার?”
তিতির জবাব দেয় না।ঈশান বিরক্ত মুখে তিতিরের ট্রলি ঠেলে হাটা ধরে।তিতির থ হয়ে দাড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তাকে রেখে যাওয়া হচ্ছে টের পেতেই দ্রুত ছুটতে গেলে আচমকা চেচিয়ে উঠলো। ঈশান চমকে ফিরে তাকাতেই দেখলো পা চেপে বসে পরেছে তিতির।পা মচকেছে মেয়েটার।এবার সত্যি সত্যিই থাপড়ে মেরে ফেলতে মন চাইলো ঈশানের।দীর্ঘশ্বাস ফেললো।ওদিকে গাড়িটাও গিয়ে ঠিক করতে হবে।

____”শান্তি আমার পিছু ছাড়ে না কেনো বলতো।”
____”আমি ব্যাথা পেয়েছি এটা আপনার জন্য শান্তি!”
এক নাম্বার এর গাধা একটা।তিতিরকে ধরে দাড় করালো ঈশান।
____”এখানে বোসবি।গাড়িটা বেশ দূরে।একটু সমস্যা। ঠিক করে এগিয়ে আনি।”
তিতির একা থাকার কথায় আতকে উঠলো।
_____”নিয়ে চলুন আমাকে। আমি একা থাকতে পারবো না।
ঈশান তপ্ত চেখে তাকায়।
____”ভয় নেই।বোস আমি ট্রলিটা রেখে গাড়ি আনি।কোলে করে তো তাও দশ মিনিট হাটতে হবে।তোকে কোলে নেবো আর ট্রলি ঘাড়ে নেবো?”
_____”ট্রলি রেখে আমাকে নিয়ে চলুন আগে।”
ঈশান মাথা নোয়ায় খানিকটা।বাঁকা গলায় বলে,
____”নিতেই পারতাম।কিন্তু থাক কিছুক্ষণ স্টেশন এ একা বসে।এটা তোর শাস্তি।”
____”আ..আ.।আপনি…”
____”আমি খারাপ।খুব খারাপ।”
তিতিরকে ঝট করে কোলে তুললে নিলো ঈশান।চেচিয়ে উঠলো তিতির,

____”আমাকে ছোঁবেন না আমি হাঁটতে পারবো বললামই তো।”
ঈশানের হাত ছাড়িয়ে পা ফেলতেই পায়ের ব্যাথায় গুঙ্গিয়ে উঠলো তিতির।অসহায় এর মতো থমকে গেলো।ঈশানের বেশ হাসি পেলো এবার।ঝটকা টানে পিঠের নিচে আর হাটুর নিচে ধরে তুলে নিলো পাজাকোলে।তিতির আচমকা এহেন কান্ডে হতভম্ব হয়ে জড়িয়ে ধরলো ঈশাকে আষ্টেপৃষ্টে। ঈশান বাঁকা হাসলো।
_____”মাঝরাতে সাদা পরে বেড়িয়েছিস!মানুষ দেখলে জ্বীন পরী ভেবে ভয় পাবে।তাছাড়া বৃষ্টিও নামলো বলে।লেপটে আছিস তো গায়ের সাথে।আমি কিছু দেখে ফেললে দোষ দিতে পারবি না কিন্তু…
কঠিন দৃষ্টি দিলো তিতির।অসভ্য একটা লোক।যা মুখে আসে বলে।তিতিরকে ছাউনির নিচে বসিয়ে ব্যাগ ঠেলে হাটা ধরলো গাড়ির দিকে।মিনিট পাঁচেক এর মতো বড় বড় কদমে হেটে আড়াল হলো তিতিরের চোখে।তাকে এমন শাস্তি দেওয়ার মানে হয় কোনো।
দ্রুত পায়ে চলতে চলতে ঈশান মেসেজ করলো কাউকে।ঈশানের আদেশে একশ হাত দূরেই দাড়িয়ে দুজন লোক।সে বেচারা দুজনও উলটো হয়ে ঘুরে দাড়িয়ে।ঈশানের মেসেজ দেখা মাত্র হাফ ছাড়লো প্রথম জন।ধাক্কা দিলো পাশের জনকে।

____”এখন ঘুরতে বলেছে আমাদের। বস আসবে মিনিট বিশেক এর মধ্যে।ম্যাডাম কে এখন চোখে চোখে রাখতে বললো।”
____”তখনও চোখে চোখে রাখতে বললে সমস্যা কি ছিলো!”
পাশের লোকটা বিরক্তি হলো।বিরক্ত গলায় বললো,
____”চোখে চোখে রাখতে গিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট রাখা দেখে ফেললে চাকরি থাকতো?”
____”তা অবশ্য ঠিক…
______
ঈশানের গাড়ি ঠিক করতে করতেই কোথা থেকে বৃষ্টি নেমে এলো।হতভম্ব হলো ঈশান।ছাতা নেই তার কাছে।তিতিরকে তখন না নিয়ে আসাই ভুল হয়েছে।ট্রলি টা তাও তার লোক দিয়ে যেতো।তিতিরকে তো মনে হলো হাঁটতে পারবে না।ঈশান ভিজে জবজবে হলো মূহুর্তেই।তারাহুড়ো করে গাড়ি ঠিক করে ছুটলো তিতিরের কাছে।বিদ্যুৎ চমকালে ভীষন ভয় পায় মেয়েটা।ভেজার ভয় নেই। ছাওনির নিচে পানি যাবেনা।কিছুক্ষণ এর মধ্যে এসে পৌছুলো তিতিরের কাছে।মেজাজ তুঙ্গে উঠলো তার।তিতির মোটেই ছাওনির নিচে নেই।তিনি বহাল তবিয়াতে নিজের খোরা পা নিয়ে ছাওনি ছেড়ে বাইরে এসে দাড়িয়ে আছে।বে আক্কেল মেয়ে কি সাধে বলে!গায়ে সাদা জরজেট এর একটা লম্বা ফ্রক।কি অবস্থা হতে পারে!
ফোনে অনবরত মেসেজ, কল এসেই যাচ্ছে।তার লোক পাঠাচ্ছে।বৃষ্টি নামা মাত্র তারা আরও একটু দূরে গিয়ে ঘুরে দাড়িয়ে আছে সেটা বলতে এতো তোর জোর। সবকটা গাধা পালে সে।
গাধাগুলোর সাথে কথা বাড়ানোর মানেই হয়না।তবে দুদিনে সে শতভাগ নিশ্চিত তার প্রপার পাগল হতে আর মাসখানেক…
বিনাবাক্যে কোলে তুলে হাটা ধরলো ঈশান।মেয়েটা একদম বৃষ্টির পানি সহ্য করতে পারে না।শরীর গরম হয়ে গেছে।জ্বর এসেছে।বিরক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে সে।রাগ হচ্ছে না।রেল লাইনে মাথা দিতে মন চাচ্ছে।
তিতির আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেে আছে ঈশানের কাধ।শীতে শরীর কাপছে। তাছাড়া ভেজা শরীর লেপটে আছে ঈশানের সাথে। হাঁটার তালে বারবার গভীর স্পষ্ট অনুভব হচ্ছে। সেটাও তার কাঁপাকাপির একটা কারণ।খানিকক্ষণ সময় নিয়ে মিনমিন করে তিতির বললো,

____”আপনি জানলেন কি করে আমি এখানে?
ঈশান তেতে উঠলো,
____সেটা তোর জানতে হবে না।জ্বর এসে গেছে তো শরীরে,ছাউনির নিচে দাড়াসনি কেনো বৃষ্টির সময়?
তিতির আবারও গলায় অত্যন্ত নামিয়ে ধীর গলায় সাফাই দিলো,
____ “ভিজতে ভালো লাগছিলো। “
এটা কোনো কথা!ঈশানের ইচ্ছে হলো তুলে আছাড় মারতে মেয়েটাকে।শান্তিতে কোথায় বুকে নিয়ে ঘুমাতো।তা না।মাঝরাতে মশকরা করা হচ্ছে তার সাথে।
____”ইচ্ছে তো করছে কোল থেকে ছুড়ে ফেলে দেই ওই রেল লাইনে।বেয়াদব মেয়ে।কার ওপর রাগ দেখিয়ে রাত বারোটার সময় ব্যাগ গুছিয়ে স্টেশনে আসার সাহস করলি তুই?”
আবার ধমক!পায়ের ব্যাথায় ফুলে উঠেছে।ঠোঁট জোড়া এসেই কেটেকুটে ফেলেছে সেটাও জ্বলছে।ধমকা ধমকি পছন্দ হলো না তার।হাত দুটো সরিয়ে আনলো ঈশানের কাধ থেকে।বাজখাই গলায় বললো,
____”নামান,চলেই যাবো আমি।এসেছেন কেনো?বারবার বোঝা বলে অপমান করবেন!আমি বোঝা আপনার?ঝুলিয়ে দিয়েছে আমাকে আপনার গলায়?
ঈশান দাঁতে দাঁত চেপে ধরলো। কটমট করে বললো,

____”এতটুকুন মেয়ে।আত্মসম্মান প্রতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এখনো তো ঝুলেই আছিস।তাও আবার কোলে উঠে।
____”কোলে তুলতে বলেছে কে খালি ছোঁয়ার ধান্দা।”
আবার বাজে কথা মেয়েটার! তাকে নিয়ে কোনো পজিটিভ ভালো ধারনা বোধহয় একবিন্দুও নেই মেয়েটার মধ্যে। তিতিরকে উঁচু করে ক্যাচ ধরার মতো খানিক শূন্যে ছুড়ে আবার শক্ত করে চেপে ধরলো নিজের সাথে। ধমকে বললো,

সাঁঝের মায়া পর্ব ৩০

____”আর একটা বাজে কথা বললে ফাঁকা স্টেশনেই বাসর সেরে ফেলবো বললাম।অবশ্য তোর জন্য আরেকটু অপেক্ষা করতেই পারি।সেক্ষেত্রে পাগল তো তুই হবি সেদিন এর মতো।আমাকে কাছে পেতে।আদর চেয়ে মরিয়া হবি।তখন কিন্তু কিছু করে ফেললে আমাকে ব্লেম দিতে পারবি না।”
শিথিল হলো তিতিরের শরীর।আতঙ্কে এদিক ওদিক তাকালো সে।একদম ফাঁকা স্টেশন।বৃষ্টিতে ধুয়ে মুছে যাচ্ছে প্রকৃতি।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৩১