রুপুর বিয়ে পর্ব ৪
Bobita Ray
রুপুর ঘুম থেকে উঠতে বেশ বেলা হয়ে গেল। রুপু ভেবেছিল দেরি করে ঘুম থেকে ওঠার জন্য শাশুড়ী মা রুপুকে আবারও কতগুলো কটু কথা শুনিয়ে দেবে। রুপু ভয়ে ভয়ে বিছানা ছাড়ল। বিনয় ঘুমিয়ে আছে। রুপু ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িং রুমে এলো। কাউকে দেখা যাচ্ছে না। তিনতলায় যাবার আগে শাশুড়ী মায়ের ঘরের দিকে একবার তাকাল রুপু। শাশুড়ী মা এখনো ঘুমিয়ে আছে। ওনার কী শরীর খারাপ নাকি ঘুম থেকে দেরি করে উঠে। রুপু ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। তবে ও হাফ ছেড়ে বাঁচল। ভাগ্যিস রুপুর আগে শাশুড়ী মায়ের ঘুম ভাঙেনি। রুপু তিনতলায় গিয়ে দেখল, রুপুর শ্বশুর স্নান করে পূজোর জোগাড় করছে আর গুনগুন করে গান গাইছে।
“বাবা?”
বিধান বাবু রুপুকে দেখে হেসে ফেলল। বলল,
“এখনই উঠলে কেন মা?”
“আমার সকালেই ঘুম ভাঙে বাবা। সেই তুলনায় আজ উঠতে দেরি হয়ে গেল।”
“তোমার মায়ের তো দশটার আগে ঘুমই ভাঙে না।”
উত্তরে রুপু হাসার চেষ্টা করল।
“তুমি চা করতে পারো মা?”
রুপু হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। ভদ্রলোক খুশিমনে বলল,
“তাহলে চট করে দুকাপ চা করে ফেলো তো মা। আমি পূজো দিয়ে আসছি। আজ বাপ-বেটি একসাথে চা খাব।”
রুপু রান্নাঘরে গিয়ে দেখল, ময়নার মা রান্না করছে আর একা একা গজগজ করছে। রুপুকে দেখে বলল,
“ও তুমি এসেছো নতুন বউদি? বড়মার তো আবার দশটার আগে ঘুমই ভাঙে না। একে তো বেলা করে ঘুম থেকে উঠে। তারপর শুরু করে আমার সাথে চিৎকার চেঁচামিচি। একাজ কেন হলোনা.. ও কাজ কেন করিনি।
বলি আমার তো মা দূর্গ্গার মতো দশটা হাত না। মাত্র দুটো হাত। এই হাত দিয়ে যতটুকু পারি ততটুকুই তো করব৷ তারউপরে আবার গতকাল ছুটা বুয়া বড়মা মাইনে দিয়ে বিদায় করে দিয়েছে। আমাকেও তাড়াতে চেয়েছিল তোমার শ্বশুরের জন্য পারেনি। ওনি খুব ভালো মানুষগো নতুন বউদি। ওনার জন্যই এখনো এই বাড়িতে টিকে আছি। আরও একজন ভালো মানুষ ছিল। অয়ন দাদা। সে যে কী আমুদে একজন মানুষ নতুন বউদি। তুমি না দেখলে বিশ্বাসই করবে না। একবার ওনার এক বন্ধুর কাছে বাড়ির সবার জন্য উপহার পাঠাল। কী দামি দামি উপহার। আমিও বাদ গেলাম না। সবার জন্য যা পাঠিয়েছে আমাকেও তাই দিয়েছে। উপহারের গায়ে সবার আলাদা আলাদা করে নাম লেখা। বড়মা তো এত দামি উপহার আমাকে কিছুতেই দিতে দেবে না। তোমার শ্বশুর মানে জেঠুর ধমকি খেয়ে শেষমেষ দিতে বাধ্য হলো। যখন ফোনে কথা বলে, আমি যদি বড়মার আশেপাশে থাকি। তাহলে আমাকে ডেকেও কথা বলে। আমাকে ডাকে ময়নার মাম্মি বলে। অন্তরডা জুড়াইয়া যায় ওনার ডাক শুনে। যেমন রাজপুত্রর মতো দেখতে তেমন তার ব্যবহার।”
রুপু ময়নার মাকে কী বলে ডাকবে বুঝতে পারছে না। কিছু একটা বলে ডাকা দরকার। ময়নার মা বলল,
“তুমি এখন রান্নাঘরে কী করতে এলে নতুন বউদি।”
“চা করতে এসেছি। তুমি কী আমাকে কোথায় কী রাখা আছে বলে দেবে?”
“আমি করে দেই তুমি ঘরে যাও।”
“না। চা’টা আমিই করব।”
রুপু চায়ের জন্য জল গরম করতে দিল। ময়নার মা রুটির জন্য ময়দা মাখছে। ময়দা মাখতে মাখতে বিড়বিড় করে বলল,
“তোমার ভাগ্য খুব খারাপ নতুন বউদি। বড়মার শিরায় শিরায় যে শয়তানি বুদ্ধি। সেই বুদ্ধির সাথে তুমি কয়দিন লড়াই করে টিকতে পারবে কে জানে। তোমাকে যেহেতু তার একটুও পছন্দ হয়নি। এই বিয়েটা ভাঙার জন্য ওনি সব রকম কলাকৌশল করবে।”
রুপু চমকে উঠে ময়নার মায়ের দিকে তাকাল। কথাগুলো এত আস্তে বলেছে ময়নার মা। ময়নার মা ভেবেছিল রুপু শুনতে পায়নি। ময়নার মা একমনে রুটি বেলতে শুরু করল।
রুপু চায়ের কাপ শ্বশুরের হাতে তুলে দিতেই বিধান বাবু বলল,
“চলো মা ওই দিকটায় গিয়ে বসি।”
বিধান বাবু চায়ে চুমুক দিয়ে বলল,
“বাহ…দারুণ চা করেছো তো তুমি। তোমার শাশুড়ী মায়ের রান্নার হাতও ভালো। তবে সে এখন রান্না করতে চায় না। মাঝে মাঝে বিনয় যখন আবদার করে। শুধু তখনই রান্না করে।”
“বাবা শোরুমে যাবেন না?”
“যাব। তার আগে তোমার সাথে আমার একটু কথা আছে মা। কথাগুলো এখনই বলব। নাকি আরও কিছুদিন সময় নেব। ঠিক বুঝতে পারছি না।”
“আপনার অসুবিধে না থাকলে এখুনি বলুন বাবা।”
“আমি অনেক দুঃখে – কষ্টে মানুষ হয়েছি মা। আমার বাবা ছিল ভবঘুরে। পর পর পাঁচ ভাইবোন হওয়ার পর আমার মায়ের গর্ভে আবারও সন্তান এলো। তখন আমার ছোট বোনটার মাত্র একবছর বয়স। মায়ের শেষের সন্তানটা গর্ভেই নষ্ট হয়ে গেল। মামা এলো অসুস্থ মাকে নিতে। আমরা দলবেঁধে সবগুলো ভাইবোন মায়ের সাথে মামাবাড়ি গেলাম। মা তখন খুব অসুস্থ। আমরা মামাবাড়ি যাওয়ার চারদিন পর বাবা গেল মাকে নিয়ে আসতে। আমার দিদা অসুস্থ মাকে কিছুতেই যেতে দেবে না। মায়েরও যাওয়ার তেমন ইচ্ছে নেই। মা বার বার বাবাকে বোঝাল একটু সুস্থ হলেই যাবে।
আমার ভবঘুরে বাবা বুঝল না। মায়ের সাথে তুমূল ঝগড়া শুরু করল। ঝগড়ার একপর্যায়ে বলল,
“তুই যদি এখন আমার সাথে না যাস। তাহলে আমি আরেকটা বিয়ে করব।”
আমার বোকা মা ভাবল বাবা নেহাৎ রাগের মাথায় কথাটা বলেছে। কিন্তু আমার বাবা সত্যি সত্যিই বিয়ে করে ফেলল। খবর পেয়ে মা ছুটে গেল। বাবার পাদুটো জড়িয়ে ধরে মায়ের সেকি কান্না।
বাবা দুই বিয়ে করেই ক্ষ্যান্ত দিল না। পর পর চার বিয়ে করল। আগেকার যুগে বিয়ে খুব সহজ জিনিস ছিল। এত দেখাদেখির ব্যাপার ছিল না।
বাবা প্রথমদিকে আমাদের খরচ দিলেও পরে আর তেমন টাকা পয়সা দিতো না। তিনবেলা ভাত জুটতো না। মা লোকের বাড়ি থেকে ভাতের মাড় চেয়ে এনে লবন দিয়ে গুলিয়ে দিতো। তাই অমৃতের মতো চুমুক দিয়ে খাইতাম।
আমি ছিলাম সবার বড়। ন’বছর বয়সেই মা আমাকে কাজে দিয়ে দিল। লোহার কাজ। লোহা পিটিয়ে দা, বটি বানানো। খুব কষ্টের কাজ। হাতে বড় বড় ফোস্কা পরে যেত। উপায় নেই। আমি কাজ না করলে সবাই না খেয়ে থাকবে। ওদিকে দাদু মারা যাওয়ার পরে মামাদের সংসার ভাগ হয়ে গেল। আমাদের এতগুলো ভাইবোন সহ মাকে নিয়ে যেতে কোনো মামাই সাহস পেল না। ওই লোহার কাজ করেই সবগুলো ভাইবোনকে মানুষ করলাম। বাড়িতে টিনের ঘর দিলাম। মা খুব শখ করে আমাকে বিয়ে দিল। তোমার শাশুড়ী মা একান্নবর্তী পরিবারের বড়ছেলের বউ হয়ে এলো। তোমার শাশুড়ী মায়ের কোনো আবদার পূরণ করতে পারি না। কোথাও ঘুরতে নিয়ে যেতে পারি না, একটা ভালো শাড়ি কিনে দিতে পারি না, একটু ভালোমন্দ খাওয়াতে পারি না। রাত ছাড়া সময় দিতে পারি না। তারপরও ওর কোনো অভিযোগ ছিল না। বছরের পর বছর দিব্যি আমার সাথে সংসার করে গেল। তোমার শাশুড়ী মায়ের আগ্রহেই আমি লোহার কাজ ছেড়ে স্বর্ণের কাজ শিখতে প্রথম ঢাকা তাঁতিবাজার গেলাম। সেইসময় আমার বড় ছেলে বিনয় তোমার শাশুড়ী মায়ের পেটে। সেই অবস্থায় সংসারের হাল ধরল তোমার শাশুড়ী মা। চাষবাস থেকে শুরু করে হাঁসমুরগি গরু ছাগল পালা। গরুর জন্য মাঠে ঘাস কাটা, ছাগলের জন্য পাতা পারা।
সংসারের কাজের পাশাপাশি বাইরের কাজগুলোও সে নিষ্ঠার সাথে করে গেল। স্বর্ণের কাজ শিখতে আমার পুরোপুরি সময় লাগল তিনবছর। কাজ শেখার পর লোকের দোকানে আরও পাঁচবছর মতো কাজ করলাম। তারপর নিজেই পজিশন কিনে স্বর্ণের দোকান দিলাম। আস্তে আস্তে ব্যবসা ফুলে-ফেঁপে উঠতেই দোকান ছেড়ে শোরুম করলাম। তারপর ফ্ল্যাট কিনলাম, জায়গা কিনলাম। জায়গা কিনে নিজেই বাড়ি করলাম। গাড়ি করলাম। এতকিছু আমার একদিনে হয়নি বউমা। তোমার শাশুড়ীমা প্রতিনিয়ত আমাকে সাহস জুগিয়েছে। শক্ত করে আমার হাত ধরে আমাকে সামনের দিকে এগিয়ে দিয়েছে। সময়ের সাথে সাথে ও ভীষণ পাল্টে গেল। ও যুগের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে অতীত ভুলে গেল।
আমার ভাইবোনেরা ওর পেছনে ওকে খারাপ বলে, লোকের কাছে বদনাম করে। আমার কাছেও মাঝে মাঝে অভিযোগ করে। তোমার শাশুড়ী মায়ের জন্য ওরা আমার বাড়ি এসে থাকতে পারে না। বেড়াতে পারে না। আমি ওদের কিছু বলি না। আবার ওদের কথা শুনে তোমার শাশুড়ীমাকেও কিছু বলি না। আমি তো জানি, আমার সফলতার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে তোমার শাশুড়ীমা। যে আমি একসময় ওকে ভালো একটা শাড়ি দিতে পারিনি। সেই আমি এখন ওকে সোনার গহনায় মুড়িয়ে রাখি। এখন অনেকেই ওকে অহংকারী বলে। বলুক আমি কারো কথায় পাত্তা দেই না। ওর প্রতিটা কথা শোনার চেষ্টা করি। ও কোনো কথা বললে আমি ফেলতে পারি না। এখনো ওর প্রতি আমার অনুভূতি সেই প্রথমদিনের মতোই আছে। আমার ধারণা, তুমি খুব বুদ্ধিমতি মেয়ে রুপু। এতকথা তোমাকে কেন বললাম তার কারণটা তুমি ঠিক ঠিক খুঁজে বের করবে। এবং সময়মতো কাজে লাগাবে।”
বিধানবাবু ঘড়ি দেখে বলল,
রুপুর বিয়ে পর্ব ৩
“অনেক বেলা হয়েছে। এখন আমাকে শোরুমে যেতে হবে।”
বিধান বাবু চলে গেল। রুপু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। তবে কী রুপুর শ্বশুরও জানে রুপুর শাশুড়ী রুপুকে তাড়ানোর ফন্দি আঁটছে।
ভালো হলো শাশুড়ী মায়ের অতীত জেনে। শাশুড়ী মা যদি রুপুর সাথে খুব বাড়াবাড়ি করার চেষ্টা করে রুপু খুব কৌশলে শাশুড়ী মাকে জব্দ করবে। অনেকটা স্নায়ু যুদ্ধের মতো।
