বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৬
রানী আমিনা
রাতের তৃতীয় প্রহর। ঘড়ির কাটা দুইটার দিকে এগোচ্ছে ধিমে ধিমে। এমন সময় জমাট নিরবতা ভেদ করে তারস্বরে বেজে উঠলো কলিং বেল। ইলহান উপুড় হয়ে ঘুমিয়ে ছিল বিছানায়, ওর পিঠের ওপর চিৎ হয়ে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে লুসি।
মেয়েটার জন্য একটা ন্যানি রেখেছে সে, কিন্তু সে মেয়ে কোনোভাবেই ন্যানির সাথে থাকতে চায়না। রাত হলে টুক টুক করে হেটে চলে আসে ইলহানের সাথে ঘুমোতে। ঘুমন্ত ইলহান আজ টের পায়নি কখন লুসি এসে ঘুমিয়েছে। কলিংবেলের শব্দে জেগে উঠে পিঠের ওপর ভর ঠাহর করে কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে রইল সে৷
ক্ষণিক পরেই দরজায় করাঘাত পড়ল, ইলহান সন্তর্পণে লুসিকে নামিয়ে দিয়ে গায়ে একটা রোব জড়িয়ে বেরিয়ে এলো বাইরে। হেল্পিংহ্যাণ্ড মেয়েটি দাঁড়িয়ে, মুখে শঙ্কা। ইলহানকে দেখেই আনুগত্য জানিয়ে সে বলে উঠল,
“শেহজাদা, শেজাদী আনাবিয়া ফারহা দেমিয়ান এসেছেন।”
ইলহানের কপালে ভাজ পড়ল, কামরায় ফিরে যেতে যেতে বলল,
“ওর বিশ্রামের ব্যাবস্থা করো, আমি আসছি।”
মেয়েটি মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো তৎক্ষনাৎ। রুমে ফিরে এসে ফ্রেশ হয়ে গায়ে একটা শার্ট জড়িয়ে নিলো ইলহান। সিড়ি দিয়ে নেমে নিচে আসতেই দেখল টেবিলের ওপর দুপা তুলে সোফায় শরীর এলিয়ে বন্ধ চোখে আধশোয়া হয়ে আছে আনাবিয়া, সাড়াশব্দ নেই। পাশেই হেল্পিংহ্যান্ড মেয়েটি অসহায় মুখে দাঁড়িয়ে। ইলহানকে দেখেই এগিয়ে এলো সে, চাপা গলায় বলল,
“শেহজাদা, শেহজাদীর জন্য কামরা প্রস্তুত করেছি, কিন্তু তিনি যেতে রাজি হননি। এখানেই বসবেন উনি। ক্ষমা করবেন শেহজাদা!”
ইলহান এগিয়ে গেলো সোফার দিকে। মেয়েটা এই অল্প সময়েই ঘুমিয়ে গেলো কিনা ভাবতে রইল। আনাবিয়ার বিপিরীতের সোফায় বসল নিঃশব্দে৷ সে বসতেই আনাবিয়া সশব্দে আড়মোড়া ভেঙে বসে ঘুম জড়ানো স্বরে বলে উঠল,
“চাচাজি, মারাত্মক রকম ক্ষিদে পেয়েছে, রান্নাঘরে যা যা আছে সব নিয়ে আসুন। চিকেন, বিফ বা সিফুড হলে বেশি ভালো হয়। মাটন আমি খাইনা৷ স্যুপ ট্যুপ হলেও চলবে, তবে ভেজটেবল খাবোনা৷ সিফুড বলতে লবস্টার, ক্র্যাব, অক্টোপাস, অয়েস্টার। মিউসেল, টুনা বা স্যামন ট্যামন চলবেনা। ছোট্ট ছোট্ট সার্ডিন থাকলে চলতে পারে, ডিপ ফ্রাই, সাইজে বড় গুলো খাবোনা৷ সাথে বিফের স্টেক হলে ভালো হয়, মিডিয়াম। চিকেন ফ্রাইও। আর…. আর কিছুনা আপাতত এগুলোই। তাড়াতাড়ি!”
ইলহানের চোখ কপালে উঠলো, কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলো সেখানে। হেল্পিংহ্যান্ড মেয়েটার দিকে তাকাতেই সে ইশারায় বুঝিয়ে দিলো সিফুডের অতগুলো পদ রান্নাঘরে নেই, বাকিগুলো হতে পারে৷ ইলহান গলা খাকারি দিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, তুমি ফ্রেশ হও আমি দেখছি।”
আনাবিয়া উঠলনা, আবারও চোখ বন্ধ করে শরীর এলিয়ে দিলো সোফাতে৷ ইলহান হেল্পিংহ্যান্ড মেয়েটির সাথে রান্নাঘরের দিকে গিয়ে চাপা গলায় আলোচনা করল কিছুক্ষণ। রান্নার জন্য একটি ছেলে থাকে বাড়িতে। ছেলেটা ঘুমিয়েছে বোধ হয়, মেয়েটা গিয়ে তৎক্ষনাৎ ডেকে উঠিয়ে তাকে লাগিয়ে দিলো রান্নায়।
ইলহান সব বুঝিয়ে দিয়ে ফিরে এলো আনাবিয়ার নিকট৷ আনাবিয়া কপালের ওপর হাতের ভর দিয়ে ছিলো, ইলহানের উপস্থিতি টের পেয়ে হাত সরিয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“রান্না হতে দেরি হবে? ফ্রিজে কোনো খাবার নেই।”
“হ্যাঁ, কিন্তু তুমি ফ্রিজের খাবার খেতে পারবে? অভ্যাস নেই তো তোমার, হঠাৎ খেলে পেট খারাপ করতে পারে৷ তখন তোমার স্বামী মহোদয় আমাকে ওপরে পাঠিয়ে দিবেন৷”
“কিচ্ছু হবেনা, আপনি আপাতত আমাকে কিছু গরম করে দিন।”
ইলহান কিচেনে ফিরে গিয়ে কয়েকপিস কেক নিয়ে ফিরল, আনাবিয়ার দিকে প্লেট এগিয়ে দিয়ে বলল,
“বিকেলে তৈরি করেছিলো জেক ছেলেটা। খেয়ে দেখো, বেশ ভালো কেক বানায় ছেলেটি।”
আনাবিয়া লুফে নিলো প্লেটটি। চিবোনোর সময় হলনা, চোখের পলকেই কেকগুলো প্রায় গিলে খেয়ে ফেলল সে, এরপর ঢকঢক করে পানি খেলো এক মগ ভর্তি। ইলহান বিস্মিত হয়ে চেয়ে রইল ওর দিকে৷ এমন সময়ে তার নজর গেলো আনাবিয়ার হাতের দিকে, প্রায় আঁতকে উঠে উদ্বিগ্ন গলায় সে জিজ্ঞেস করল,
“হাতে রক্ত কেন তোমার? কেটেছে কোথাও? কিভাবে আঘাত লাগিয়েছ?”
ব্যাস্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে এলো সে আনাবিয়ার হাতটি পরখ করতে। আনাবিয়া হাতের উলটো পিঠ দিয়ে মুখ মুছে বলল,
“এ রক্ত আমার নয়, আসার সময়ে রাস্তায় কয়েকটা ছেলে মিলে মারামারি করছিলো, হর্ণ বাজালেও সরছিলনা। মেজাজ খারাপ ছিলো, তাই….. সেঁটে দিয়ে এসেছি। সরি।”
“বেঁচে আছে?”
“বলতে পারিনা।”
ইলহান ফোস করে শ্বাস ছাড়ল, বলল,
“হঠাৎ এখানে এলে যে? আমার দু’মিনিটের ছোট ভাইয়ের সাথে আবার ঝগড়া বাঁধিয়েছ?
“পরে বলবো, ক্ষিদে পেটে কথা বলতে ভাল লাগেনা৷ আপনার সাথে কিছু আলাপ আছে আমার৷ দ্রুত খাবার রেডি করতে বলুন ওদের। আমার কিন্তু মেজাজ গরম হয়ে যাচ্ছে!”
ইলহান দ্বিতীয়বার তাড়া দিলো জেক নামক ছেলেটিকে। ক্ষণিক পর একটি একটি করে আইটেম হাজির হতে রইল আনাবিয়ার সম্মুখে, আনাবিয়া গোগ্রাসে খেতে রইল সব। ইলহান বিপরীতে বসে বিস্মিত চোখে দেখতে রইল আনাবিয়াকে।
খাওয়া শেষ হলে হেল্পিংহ্যান্ড মেয়েটি এসে টেবিল পরিষ্কার করে দিয়ে গেলো। ডাইনিং প্লেস নিরব হলে আনাবিয়া ডেকে উঠলো,
“চাচাজি”
“হু, বলো”
“মীর এখানে কেন এসেছে? কি কাজে?”
ইলহান স্মিত হেসে উত্তর দিলো,
“সে এখানে কেন এসেছে আমি কিভাবে জানব? তার সাথে তো আর আমার দহরম মহরম নয় যে প্রতিটা কাজ আমাকে জানিয়ে করবে।”
“মিথ্যা বলবেন না। আপনি জানেন, আ’ম শিওর।”
“তুমি কি বলছো আনাবিয়া, আমি বুঝতে পারছিনা। আমি সত্যিই জানিনা সে এখানে কেন এসেছে। আসওয়াদ যে এখানে এসেছে সেটাও আমি এইমাত্র তোমার থেকেই জানলাম। আর তাছাড়া আমি জানবোই বা কিভাবে? তুমি নিজেও জানো তার সাথে আমার কেমন সম্পর্ক।”
আনাবিয়া ইলহানের পার্পল রঙা উজ্জ্বল চোখে তাকাল সরাসরি, বলে উঠল,
“সেদিন হসপিটালে আমি অসুস্থ হওয়ার পর আপনারা দুজন কোনো চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছিলেন, কিসের চুক্তি?”
ইলহান অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে হেসে বলল,
“চুক্তি? কিসের চুক্তি? তুমি হয়তো ভুল শুনেছ আনাবিয়া, এমন কোনো কথাই হয়নি আমাদের মাঝে। হলেও সেটা হয়তো সাম্রাজ্যের কোনো ব্যাপারে। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও কোনো চুক্তির ব্যাপারে আমারা আলোচনা করেছি বলে মনে পড়ছেনা৷”
“চাচাজি, মীর আপনার সাথে সাম্রাজ্যের ব্যাপারে যে কখনো কোনো আলোচনা করবে না আমি জানি। আপনাদের মাঝে ঠিক কি কথা হয়েছিলো সেদিন আমাকে বলুন চাচাজি। কিসের চুক্তির ব্যাপারে আলোচনা করছিলেন?”
ইলহানকে বিবর্ণ দেখালো, অপ্রস্তুত হেসে সে বলল,
“বিশ্বাস করছোনা কেন? আমাদের ভেতর কোনো ধরণের চুক্তি বিষয়ক আলাপ হয়নি আনাবিয়া। হতে পারে এগুলো তোমার কল্পনা, বা তুমি কোনো স্বপ্ন দেখেছিলে। এসব ভিত্তিহীন কথা এখন বাদ দাও৷ তোমার কথা বলো, প্রাসাদে বেশ ভালো খাওয়া দাওয়া হচ্ছে মনে হচ্ছে?”
“হঠাৎ এ কথা বলছেন যে?”
“গোলগাল দেখাচ্ছে তোমাকে, ছোটবেলায় যেমন ফোলা ফোলা গাল নিয়ে ঘুরতে তেমন ফোলা গালের দিকেই এগোচ্ছো আবার দেখি!”
আনাবিয়া আনমনে নিজের গালে হাত বুলোল, সত্যিই কি তার স্বাস্থ্য বেড়েছে? ক্ষণিক চুপ থেকে হঠাৎ এদিক এদিক চেয়ে সে জিজ্ঞেস করল,
“বাহারকে দেখছিনা, কোথায় সে?”
ইলহান নিজেও আনাবিয়ার দৃষ্টি অনুসরণ করে চতুর্দিকে তাকিয়ে উত্তর করল,
“বাহার….! সে তো…. হসপিটালে।”
“হসপিটালে কেন? কি হয়েছে?”
“হঠাৎ করে মারাত্মক জ্বর বাধিয়ে ফেলেছে, ডাক্তার বলছে হয়তো টাইফয়েড। সারতে সময় লাগবে।”
“কোন হসপিটালে, আমি দেখা করে আসব।”
“এখন? এত রাতে হসপিটালে যাবে তুমি? কি প্রয়োজন?
সে তো এখানের ফ্রেয়ন হস্পিটালে আছে, জানোইতো সেখানের নিয়ম কত কড়া। নির্দিষ্ট সময় ব্যাতিত পেশেন্টের সাথে মিট করতে দেয়না। এখন গিয়েও তেমন সুবিধা করতে পারবেনা। তার চেয়ে এখন একটা ফ্রেশ ঘুম দাও। নাকি আসওয়াদের সাথে দেখা করতে যাবে?”
আনাবিয়া বুক ভরে শ্বাস নিয়ে মৃদুস্বরে বলল,
“না, তার সাথে এখন দেখা করতে চাইনা। আপনি আমাকে এখন বলুন সেদিন আপনাদের মাঝে কোন চুক্তি নিয়ে আলাপ হচ্ছিল।”
ইলহান আচমকা হেসে উঠলো সশব্দে। স্নেহপূর্ণ স্বরে বলল,
“আরে পাগলি, কোনো চুক্তিই নয়! আমাদের ভেতরে এমন কিছু নিয়ে আলোচনা হলে তো আমি তোমাকে অবশ্যই জানাতাম, তাই নয় কি? তুমি শুধু শুধু ভাবছো।”
“সত্যি বলছেন আপনি?”
সন্দিহান স্বরে শুধোল আনাবিয়া। ইলহান স্মিত হেসে উত্তর দিলো,
“শতভাগ সত্যি আনাবিয়া, তুমি হয়তো ঘুমের ঘোরে ভুলভাল শুনেছিলে। তুমি বিশ্রাম নিবে এখন, কিয়ারা তোমার জন্য বিছানা প্রস্তুত করে রেখেছে। লুসি ঘুমিয়েছে, নইলে তোমাকে দেখলে এতক্ষণে নেঁচে কুদে পাগল করে ফেলত। রাত অনেক হয়েছে, তুমি এখন ঘুমাবে চলো।”
“না, আমি বেরোব।”
“বেরোবে? কোথায় যাবে এত রাতে? আজকের রাতটা এখানেই থেকে যাও, কাল সকালে যেও যেখানে খুশি।”
“ না, কাজ আছে কিছু। শেষ করে শিরো মিদোরিতে ফিরবো।”
ইলহান প্রায় হাতে পায়ে ধরে অনুরোধ করল আনাবিয়াকে রাতটা থেকে যেতে। কিন্তু সে শুনলনা কোনো কথা। ক্ষণিক বসেই বেরিয়ে পড়ল অজানার উদ্দ্যেশ্যে। আনাবিয়া বেরিয়ে যেতেই ইলহান উৎকন্ঠিত চেহারায় ফিরল নিজের কামরায়। মুঠোফোন টা নিয়ে ডায়াল করল কারো নম্বর। কয়েকবার রিং হতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো কারো গুরুগম্ভীর কন্ঠস্বর,
“দ্রুত বল কি বলবি।”
“বউ এসেছিল তোর, জানিস নিশ্চয়?”
“হু।”
“সেদিন হাসপাতালে আমাদের ওসব নিয়ে কথা বলা উচিত হয়নি। আনাবিয়া সন্দেহ করছে আমাদের মাঝে কোনো চুক্তি হয়েছিল, প্রশ্ন করছিল আমাকে। আমি কোনোরকমে কাটিয়ে দিয়েছি৷ তবে এভাবে বেশিদিন ওকে সত্য থেকে দূরে রাখতে পারবিনা আসওয়াদ।”
“সে চিন্তা আমার, ফোন রাখ।”
“বাচ্চার কান্ডিশান কেমন?”
“ভালো।”
“এনি কম্পিকেশন্স?”
“এখনো পর্যন্ত না।”
“গ্যুড।”
ক্ষণিক বিরতি দিয়ে, ইলহান আবার বলল,
“আমার সন্তানকে মেরে ফেলেছিলি তুই, অথচ আমাকে দ্যাখ! আমার মেয়েকে মিথ্যে বলে তোকে সন্তানের মুখ দেখানোর ব্যাবস্থা করছি। শুধুমাত্র আমার মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে তোকে এখনের মত ক্ষমা করে দিয়েছি। তবুও, তোর সন্তান পৃথিবীতে আসার পর আমার থেকে দূরে রাখবি, নইলে কবে নাজানি কি করে বসব।”
ইলহানের কথাতে মীর আচমকা হাসলো খুব, ইলহানের নিকট পৈশাচিক শোনাল সে হাসি। হাসি থামিয়ে মীর বলল,
“ভুলে যাসনা তুই এখনো শ্বাস নিচ্ছিস আমার করুণায়। নেহাত শিনজো তোকে প্রচন্ড ভালোবাসে, নইলে এতদিনে তোর কঙ্কালও মিশে যেত মাটিতে। আমার এ করুণা যদি কখনো শেষ হয়ে যায় তবে তুইও আর জীবিত থাকবিনা। তাই দুয়া কর৷ আর আমার সন্তানের দিকে কখনো বিরূপ দৃষ্টিতে তাকালে সেদিনই তোর চোখ উপড়ে ফেলব, কথাটা মাথায় রাখিস। ফোন রাখ, আমি ব্যাস্ত আছি।”
ইলহান শ্বাস বন্ধ করে ঘুর্ণিপাকে উঠে আসতে থাকা ক্রোধটাকে সামলাল, শান্ত স্বরে বলল,
“আর একটা কথা।”
“বল।”
“আমার মেয়েটাকে কেমন অন্যরকম লাগছে।”
“কেমন?”
“স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে বেশ, খাচ্ছেও অনেক৷ চোখ মুখের ভাব অন্যরকম, মুড সুইংয়ের কথা না-ই বা বলি।”
ইলহানের কথায় মীর নিরব রইল কিছুক্ষণ, তারপর বলে উঠল,
“তুই যা ভাবছিস তেমন কিছু নয়।”
“তুই কিভাবে শিওর হচ্ছিস?”
“ওর অ্যাবর্শনের সময় হেকিমকে বলে কপার-টি সেট করিয়েছিলাম, ফিফটি ইয়ার্স ডিউরেশন। টুয়েন্টি নাইন ইয়ার্স পেরিয়েছে এখনো টুয়েন্টি ওয়ান ইয়ার্স উইদাউট টেনশন চলে যাবে। নো য়্যোরিজ।”
ইলহান ক্ষণিক চুপ থেকে বলল,
“আমার মনে হল, তাই বললাম।”
“আমারও মনে হয়েছিল, কিন্তু সেটা সম্ভব নয় তাই মাথা ঘামাইনি। ফোন রাখ, ব্যাস্ত আছি।”
“কপার টি সেট করেছিস, ও জানে এ ব্যাপারে? ওর অনুমতি নিয়েছিস?”
“না।”
“তো এমন কাজ কিভাবে করলি?”
“আমার যেটা ভালো মনে হয়েছে করেছি, কৈফিয়ত চাওয়ার সাহস কোথায় পাস?”
“ওর অনুমতি নেওয়া উচিত ছিলো।”
“তখন অনুমতি নেওয়ার মতো সিচুয়েশন ছিলোনা। আর উচিত অনুচিত আমি তোর থেকে শিখবোনা।”
“ওকে পরে জানাতে পারতি।”
“অকারণে ঝামেলা করবে, আর আমার সিদ্ধান্তই শেষ কথা।স্বামী আমি ওর, ওর জন্য আমি যে সিদ্ধান্ত নিবো সেটাই বেস্ট।”
“বেশি আত্মবিশ্বাস হয়ে যাচ্ছে না?”
“না। ফোন রাখ, সময় নষ্ট করার সময় নেই।”
“হু।”
ফোন রেখে দিলো ইলহান। লুসি তাকে বিছানায় না পেয়ে উঠে বসে চোখ ডলতে শুরু করেছে। ইলহান একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফোনটা ফেলে রাখল সাইড টেবিলের ওপর। রাত বাকি এখনো অনেক।
কিমালেব হতে শিরো মিদোরির পথের টানেলের প্রবেশপথে, রাস্তার পাশের একটি বিরাট ওক গাছের মগডালে চুপচাপ বসে আছে লিয়াম৷ ঝিমুনি আসছে তার। চোখজোড়া রাস্তার দিকে। ক্ষণিক পর বাইকের আলো দেখেই নড়েচড়ে বসল সে। বাইকটা কিমালেব হতে বেরিয়ে এসে প্রবেশ করল টানেলে।
লিয়াম কানে থাকা ইয়ারপিসে তৎক্ষনাৎ বলে উঠল,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, শেহজাদী মাত্রই কিমালেব ত্যাগ করলেন।”
“ঠিক আছে, তুমি ফিরে এসো। ছেলেগুলোর ডেডবডির ব্যাবস্থা হয়েছে?”
“ইয়েস ইয়োর ম্যাজেস্টি। একজন তখনো বেঁচে ছিলো, তাকে হসপিটালে দিয়ে এসেছি। বাকিদের সমুদ্রে ফেলে দিয়েছি। টানেল ক্লিন করে দিয়েছি, কোনো ব্লাড স্টেইন নেই।”
“গুড জব। এখন সরাসরি শহরের শেষ প্রান্তে চলে এসো, আমরা একটু পরই বের হবো।”
“আপনার যেমন আদেশ, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
আরও কিছুক্ষণ সেখানে বসে থেকে অতঃপর লিয়াম সুতীক্ষ্ণ কন্ঠে ডেকে উড়ে গেলো শহরের দিকে। তার কিছু মূহুর্ত বাদেই টানেল হতে ফিরে এলো বাইকটি, এগোলো আবার কিমালেবের দিকে৷
শহরের পাহাড় সারির আরম্ভের কিনার ঘেঁষে একটি উঁচু টিলার ওপর বসে আছে আনাবিয়া। শহরের বিলাসবহুল এরিয়াটা এ স্থান হতে পুরোটাই দৃশ্যমান। হাতে তার একটি বাইনোকুলার। শহরের বেশি ভেতরে গেলে মীর টের পেয়ে যাবে তার উপস্থিতি, এস্থানটি তুলনামূলক নিরাপদ।
বাইনোকুলারে আনাবিয়া পর্যবেক্ষণ করে চলেছে শহরের প্রতিটি অভিজাত ভবন৷ একটু আগে জায়ান সাদির বাসাটি ছেকে ছেকে দেখেছে সে, মীর নেই সেখানে৷ সে আছে অন্য কোথাও। মীরের গাড়িখানার খোঁজে সে এখন। যেখানেই পার্কিং দেখছে সেখানেই জুম করছে।
এদিক ওদিক খুঁজতে খুঁজতে আচমকা শহরের মধ্যিখানের একটা বিলাসবহুল একতলা বাড়ির সম্মুখে পেলো সে মীরের গাড়িটি৷ জুম করলো সে, প্রাচীর ঘেরা বাসাটির ভেতরেই পার্কিং৷ এ বাসাটি নতুন, এটা সে এর আগে দেখেছে বলে মনে পড়লনা৷ মীরের গাড়ির পাশে আরও বেশ অনেক গুলো গাড়ি পার্ক করা।
ক্ষণিক পরেই খুলে গেলো বাসাটির প্রধান দরজা। বেরিয়ে এলো মীর। আচমকা সে সরাসরি তাকাল বাইনোকুলারের দিকে। ধক করে উঠল আনাবিয়ার বুক! দ্রিম দ্রিম শব্দ কানে এসে বাড়ি খেতে লাগল। তৎক্ষনাৎ বাইনোকুলারটি সরিয়ে নিলো অন্যদিকে, যেন সে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে ব্যাস্ত।
মীর কি দেখতে পেলো তাকে?
না, এমন আঁধারে অত দূর থেকে সে দেখতে পাবেনা আনাবিয়াকে। দেখতে পেলেও চিনবেনা। গায়ে তার মোটা কাপড়ের রাইডিং স্যুট, তাকে দেখে যে কেউ বিনা দ্বিধায় পুরুষ ভেবে নিবে।
আনাবিয়া সেদিকে বাইনোকুলার নিলো আবার। মীর সত্যিই দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে। এগোচ্ছে সে গাড়ির দিকে। তার পেছনে তার কিংস গার্ড দুজন। তাদের পেছনেই জায়ান সাদি, সাম্রাজ্যের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিবর্গ। ওদের কি কোনো জরুরি মিটিং ছিলো?
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৫
আনাবিয়া নিজের মনে ভাবলো কিছুক্ষণ। জটলা বাঁধিয়ে ক্ষণিক আলাপ সেরে মীর গাড়িতে উঠল, গাড়ি ছেড়ে দিলে সবগুলো গাড়ি বেরিয়ে গেলো পরপর, ফাঁকা হয়ে গেলো সেখানের পার্কিং। গাড়ি বহর এগোলো কিমালেবের শেষ প্রান্তের সমুদ্র কিনারের দিকে৷
গাড়িগুলো চোখের আড়াল হতেই আনাবিয়া নেমে এলো টিলা থেকে। আর তারপর বাইক নিয়ে এগোল সেই বাড়িটির উদ্দ্যেশ্যে।
