সে আমার বন্দিনী পর্ব ৪
তানিয়া হুসাইন
প্রাইভেট জেটটি রাতের আকাশে নেমে এল, নিচে ঢাকা শহর আলোয় ঝলমল করছে।
বস, আমরা পৌঁছে গেছি, ডিয়েগো জানাল।
রাজভীর প্লেন থেকে নেমে এলো কালো শার্ট, ব্লেজার, আর চোখে কালো শেডস পরা। বাংলাদেশ তার জন্য নতুন এমন নয়, কাজের সূত্রে এসেছে কয়েকবার।
তার চোখে কোনো কৌতূহল নেই, বরং এক ধরণের হিসেবি শীতলতা।
____রাজভীর ঢাকার সবচেয়ে বিলাসবহুল পাঁচ তারকা হোটেলে উঠে—একটি প্রাইভেট সুইট রুম বুক করা হয় তার জন্য।
কলেজের ক্যাম্পাসের মাঠে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
ওই তুই! তোদের ঘরে মা-বোন নাই নাকি,
মেয়ে দেখলেই চু-লকানি উঠে যায় বলেই লাঠি দিয়ে ছেলেটাকে আঘাত করছে একের পর এক।
– ছেলেটা চিৎকার করছে, কিন্তু সাফা এক বিন্দু পাত্তা না দিয়ে লাঠির আরেকটা বাড়ি মারল।
গোটা ক্যাম্পাসে শোরগোল পড়ে গেছে।
“সাফা! ছাড়! প্লিজ, এটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে
সাফার বান্ধবী খাদিজা বার বার বলছে।কিন্তু সাফা কারোর কথা শুনতে নারাজ
ইশায়া দৌড়ে গিয়ে সাফাকে টেনে সরাল।
অরিনা আর মেহনাজও ছুটে এলো।
খাদিজা বলে ওঠে,
___তুই পাগল নাকি?
তোর এই অতিরিক্ত সাহস এর কারনে একদিন তোকে খুব বড় বিপদে পড়তে হবে দেখিস।
এখনো সময় আছে শুধরে যা।
সাফা তখনো ক্ষিপ্ত, শ্বাস নিচ্ছে দ্রুত।
সাফা খাদিজার হাত ঝাড়া মেরে বলে,
___তোদের মত অন্যায় দেখে আমি চুপ থাকতে পারিনা।
___ ইশায়া শক্ত করে সাফার হাত ধরে রাখল।
এরপর খাদিজা ও এসে সাফাকে বলে,
চল এখান থেকে, যা হবার হয়েছে।
ক্লাস শেষ। প্রকৃতি আজ একটু অন্যরকম।
আকাশ ধূসর, চারদিকে অদ্ভুত একটা স্নিগ্ধতা। হালকা বাতাস বইছে, যেন ঝড়ের আগের নীরবতা।
কলেজের গার্ডেন
ইশায়া এক কোণে গিয়ে বসেছে, মাথা উঁচু করে আকাশ দেখছে।
অরিনা বিরক্ত হয়ে বলল,
ইশু, চল! বৃষ্টি হলে আমরা আটকে যাব!
___ইশায়ার লড়চড় নেই।
এক মনে আকাশ দেখতে ব্যস্ত।
আজকে কেন জানি তার এত ভালো লাগছে এই বাতাস।
প্রকৃতির উথালপাতাল। ঝড়ো হাওয়া।
____মেহনাজ হাত গুটিয়ে বলল,
মনে হচ্ছে আজকেই তোর কলেজে আসার শেষ দিন!
আর কখনো আসতে পারবি না।
তাই এভাবে গাঁট হয়ে বসে আছিস।
___ ইশায়া হাসে ওর কথায়।তারপর ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। আজ সে হেটেই বাড়ি যায় রিকশা নেয় না।
একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে তার কেনো সে জানে না…
____ইশায়া ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরল। দরজা পার হতেই দেখল মা-বাবা, সাফা আপুর পরিবারের সবাই বসে আছে।
ইশু! তোর ভাইয়েরর এনগেজমেন্টের ডেট ঠিক হয়ে গেছে,এই শুক্রবার, সায়মা বেগম খুশিতে বললেন।
সেই মুহূর্তে ইশায়ার মন ভরে উঠল আনন্দে।
ইশায়া সায়মা বেগমকে বলল,
___মা হাতে তো সময় নেই,তিনদিনের মাঝে কিভাবে কি করবে।
___সবাই হাতে হাতে করলে হয়ে যাবে।
সব কথাবার্তা শেষে সাফার বাবা-মা কামরুল আহমেদ, ফারজানা আহমেদ চলে যান।তাদের তো কাজ আরো বেশি তাদের বাড়িতেই তো প্রোগ্রামটা হবে।
রাতে সাফা ইশায়াকে ফোন দিয়ে বলে,
সাফার এনগেজমেন্ট এর শাড়ি একসাথে কিনতে যাবে কাল যেনো ইশায়া কলেজে না যায়।ইশায়া ও সায় দেয় সাফার কথায়।দুজোনেই খুব এক্সাইটেড।
ইশায়া সাফাকে বলে,
_আমি কি নিবো আপু।আমি অরিনা মেহনাজ সেইম ড্রেস পড়বো।
এগুলো নিয়েই ওদের মাঝে কথা হতে থাকে।
এর মাঝে আদ্রিয়ান এর ফোন আসায় সাফা ইশায়াকে বায় বলে লাইন কেটে দেয়।
সাফা এসে ইশায়াকে পিক করে।ওরা দুপুরের আগেই বেরিয়ে যায় শপিং এর উদ্দেশ্যে।
ইশায়ার বাবা, আবির দু-জনই অফিসে। আদ্রিয়ানের ক্লাস আছে। জান্নাত এর শরীর ভালো না সে এখন ৬ মাসের প্রেগনেন্ট তাই ওকে নিয়ে আর জার্নি করেনি।
সায়মা বেগম নিশেধ করে দিয়েছেন।
জান্নাত এর সাথে ইশায়ার মা সায়মা বেগম ছিলেন।
___ওরা শপিংয়ে যায় যেহেতু বিয়ে সামনে অনেক কেনাকাটি, শপিং করতে করতে ওদের অনেকটাই লেট হয়ে যায়। কিন্তু এর মাঝে ঘটে যায় একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা।
___জান্নাত বাথরুমে পা পিছলে পড়ে যায়।
তার আহাজারিতে পাগল প্রায় সায়মা বেগম কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না।
ঘড়িতে তখন ৬;২৩।বাড়িতে কেউ নেই।
সায়মা বেগম আবিরকে ফোন দিলেন সে ফোন ধরছে না।তিনি আদ্রিয়ান কে ফোন দিয়ে জানালেন ঘটনা।
আদ্রিয়ান দ্রুত বেরিয়ে পরে,
অ্যাম্বুলেন্সে ফোন দিয়ে ঠিকানা পাঠিয়ে দেয়।
___অ্যাম্বুলেন্স এলে দ্রুত ধরাধরি করে জান্নাত কে উঠানো হয়।এর মাঝে সায়মা বেগম ইশায়াকে ফোন দিয়ে জানান সবকিছু।
___ইশায়া স্তব্ধ হয়ে যায়,,
সাফা দ্রুত ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলে।
রাতের অন্ধকারে একটা পরিত্যক্ত রাস্তা, যেখানে সাধারণত কেউ যাতায়াত করে না তেমন। রাস্তার আশেপাশে পুরোনো দালান আর অর্ধেক ধ্বংস হয়ে যাওয়া কিছু বিল্ডিং দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসে একটা থমথমে ভাব।
ভীর তার কালো SUV থেকে নামল, চোখে কালো সানগ্লাস, মুখে সেই চিরচেনা ভয়ঙ্কর গম্ভীর ভাব। তার আশেপাশে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় শতাধিক গার্ড প্রত্যেকের হাতে অ*স্ত্র। সামনে অপেক্ষা করছে এক রহস্যময় লোক, যার সাথে তার দেখা করার কথা।
___সাফা ড্রাইভারকে বললো শর্টকাটে রাস্তা ধরতে।
কারণ ঢাকার জ্যাম ২-৩ ঘন্টায় ছুটে না তাদের কাছে সময় খুব কম।
জান্নাত কে রক্ত দেওয়া লাগতে পারে যদি ব্লাডের প্রয়োজন হয়।সাফা আর জান্নাতের রক্তের গ্রুপ সেম।
____মেইন রোডে গেলে অনেক সময় লাগবে, তাই তারা অন্য এক পথ ধরল—সেই রাস্তা তুলনামূলক নির্জন।
____কিন্তু কিছুদূর আগানোর পরে গাড়ি থেমে গেল।
গাড়ি থামায় বিরক্ত হয় সাফা।এদিকে ইশায়া টেনশনে শেষ।
সাফা বেরিয়ে এলো গাড়ি থেকে, চোখেমুখে রাগ আর বিরক্তি।
রাস্তার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, চারদিকে কালো পোশাক পরা একদল মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। এদের চোখে ভয় নেই, মুখে কোনো কথা নেই, শুধু একটা কঠোর শৃঙ্খলা আর দাপট আছে!
ইশায়া চট করে সাফার হাত চেপে ধরল।
আপু চলো! আমরা অন্য রাস্তা দিয়ে যাব!
কিন্তু সাফা কারও কথা শোনার পাত্রী না।
এইসব গুন্ডামি করতে আসছে? আমরা কি ওদের দাস যে, এরা যেখানে খুশি রাস্তা বন্ধ করে রাখবে আর আমরা চুপচাপ বসে থাকব?
সাফা সামনে এগিয়ে গেল, বুকের ভেতর রাগের আগুন।
এই! এখানে রাস্তা ব্লক করে রাখার মানে কী?” সে চিৎকার করে বলল।
কিন্তু চারপাশের কেউই কোনো উত্তর দিল না।
__ সামনে গিয়ে সে কালো পোশাকের এক লম্বা লোককে দেখতে পেল,গাঢ় কালো শার্ট, মাথায় পিছনে আঁচড়ানো চুল, শীতল চোখ,যেন কোনো প্রাণহীন পাথর।
___ নিকো চুপচাপ সাফার দিকে তাকাল,
একবার চোখ বুলিয়ে নিল পুরোটা, কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না।এখন সে কাজে,তার উদ্দেশ্য অন্য।
___বাঁচতে চাইলে এখান থেকে চলে যাও।
নিকোর কণ্ঠের গভীরতা ঠাণ্ডা ছিল, কিন্তু তাতে লুকিয়ে ছিল ভয়ঙ্কর হুমকি!
___কেন? রাস্তা কি তোমার বাবার?” সাফার কণ্ঠে ছিল তেজ।
সে এক ইঞ্চি-ও পিছালো না।
___নিকোর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। এত বড় স্পর্ধা?
তোমার জিহ্বা খুব বেশি লম্বা, মেয়ে!নিজের জন্য বিপদ ডেকে এনো না।
কিন্তু সাফা একের পর এক কথা বলে যায়।
মেজাজ হারায় নিকো।
গার্ডদের দিকে চোখ ইশারা করতেই, মুহূর্তের মধ্যে
দশ-পনেরোটা বন্দুক সাফার মাথায় তাক করা হলো।
__ সাফার মুখের রং ফ্যাকাসে হয়ে গেল মুহূর্তেই এতোগুলো বন্দুক একসঙ্গে দেখে সে ভয় পেয়ে যায়।
নিকো সামান্য হেসে বলে,
__তুমি জানো না তুমি কার সাথে কথা বলছো।
ইশায়া কেঁপে উঠে দৌড়ে এলো, আপু! বলে চিৎকার করে ঝাঁপিয়ে পড়ল সাফার ওপর।সে শক্ত করে সাফার হাত চেপে ধরল।আতঙ্কে পুরো শরীর কাঁপছে তার।
___ভীর তখন দূরে দাঁড়িয়ে নিজের কাজে ব্যস্ত ছিল।
____কিন্তু হঠাৎ চিৎকারে বিরক্ত হয় সে,
পিছনে ঘুরল চিৎকারের উৎস দেখতে,
তার চোখে প্রথমে ধরা পড়ল—দুইটা মেয়ে।
একজন ক্ষিপ্ত, সাহসী, ভয়হীন আগুনের মতো!
আর একজন…
পিছনে ভয় পেয়ে গুটিয়ে যাওয়া মেয়েটি।
ভীরের চোখ আটকে গেল তার ওপর।
সে ধীরে ধীরে সানগ্লাস খুলল।
ফর্সা গোলগাল গড়নের ছোট্ট একটা মেয়ে,
সময় যেন থমকে গেল ওখানেই।
মেয়েটার মুখে কি যেন একটা আছে অদ্ভুত রকম কিছু,
ওই চোখ.,
চোখ সে বহু মানুষ এর দেখেছে,
ভয় পাওয়া চোখ, কাঁপা চোখ, আতঙ্কিত চোখ, লোভী…
কিন্তু এটা?
এতে ভয় আছে, কিন্তু সেই ভয়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত বিশুদ্ধতা।
___ভীর ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। তার শিকারি চোখ ইশায়ার দিকে অদম্য আগ্রহের সাথে তাকিয়ে। একটু সামনে এগোতেই ইশায়ার ঠোঁটের সাথে লাগানো ছোট্ট তিলটায় তার নজর পড়ে।
___ এই ছোট্ট চিহ্নে ভীরের একদম ভিতর থেকে কিছু একটা জাগ্রত হয়
_এক অদ্ভুত অনুভূতি, যেটা তার কঠোর ও নির্দয় ব্যক্তিত্বের বাইরে। কিন্তু তার স্বভাব এতটাই শক্ত যে, সে এই অজানা অনুভূতিকে ঠাহর করার সামর্থ্য রাখেনি।
___ভীর নির্দেশ দেয় সবাইকে বন্দুক নামানোর জন্য,
তার আদেশে, আশেপাশের সবাই বন্দুক নামিয়ে ফেলল।
____কিন্তু নিকো যে সবার কাছে এক বিরোধী চরিত্র
সে মানতে নারাজ।
সে প্রতিবাদে উঠে দাঁড়ালো, কিন্তু ভীরের হিংস্র গলায় গর্জন তুলে বলল,
চুপ কর, নিকো!যেটা বলেছি সেটা করো।
নিকো, ভীরের তীক্ষ্ণ আদেশ শুনে, আর কিছু বলার সাহস পায়নি। সে নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
এই মুহূর্তে, ভীরের চোখে ইশায়ার প্রতি এক রহস্যময় আকর্ষণ জাগ্রত হলেও, তার কঠোরতা ও শাসনব্যবস্থার মাঝে সেটা কোনো স্থান নিতে পারে না।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৩
____রাস্তার নির্জনতায়, সবাই যেন ভীরের এক অদ্ভুত ও কঠিন আদেশের সম্মুখীন ছিল, যেখানে শুধু তার শিকারি দৃষ্টি আর হিংস্র গর্জনই ছিল একমাত্র ভাষা।
___ওরা রাস্তা ছেড়ে দিতেই ইশায়া সাফাকে নিয়ে বেরিয়ে আসে এইখান থেকে।গাড়ি ঘুড়ায় অন্য রাস্তায়।
সাফা কিছু বলে না সে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে পড়বে সে ভাবেনি।
