Home শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯৪

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯৪

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯৪
নূরজাহান আক্তার আলো

__’ তোমার নাম শীতল না? খুন করে জেল খাটছো, তাই না?’
হঠাৎ কারো মুখে নিজের নাম শুনে দৃষ্টি তুলে তাকাল শীতল। সামনে দাঁড়ানো তারই বয়সের একটি মেয়ে। ছিপছিপে গড়নের মেয়েটি কেমন তাচ্ছিল্য করে কথাটা বলল যেন। মেয়েটিকে চিনে, তার নাম সাবরিনা। এসে থেকেই দেখছে মেয়েটি যাকে তাকে খোঁচা মেরে কথা বলে। পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করে৷ পুলিশের সঙ্গে তর্কাতর্কির কারণে গতপরশুও পানিশমেন্ট পেয়েছে। পানিশমেন্ট ছিল এখানকার ওয়াশরুম পরিষ্কার করা। হাসতে হাসতে একা একা করেছেও। এছাড়াও খাবার খেতে গিয়ে ঝামেলা করে৷ অন্যের কাপড় ফেলে নিজেরটা রাখে। কেউ ওয়াশরুমে গেলে বাইরে থেকে দরজা লক করে দেয়। কাজ করতে দিলে অন্যকে ধমকিয়ে করিয়ে নেয়। সবই দেখে কিন্তু অপ্রয়োজনে কারো সাথে কথা বলে না। আগ বাড়িয়ে ভাব জমাতেও যায় না।

চোখের সামনে যদি দুটো মেয়েকে গল্প করতে দেখে কিংবা হাসতে দেখে তখন কিয়ারার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে একসাথে কাটানো মুহূর্তগুলোর কথা। তাদের কতকথা, কত গল্প, কত স্বপ্ন পূরণ হওয়া বাকি। বিয়ের পর দুই বান্ধবীর একসাথে হানিমুনে যাওয়া বাকি, নিজেদের ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দেওয়াও বাকি।নানান অবান্তর ভাবনার মধ্যেও কত সুখ ছিল। কত খুশি ছিল। সময়ের ব্যবধানে সব শেষ। সব তুচ্ছ আজ ৷ হারিয়ে গেছে দুষ্টুমির সঙ্গী। হারিয়ে গেছে মনের কথা আদান-প্রদান করার প্রিয় বান্ধবী। ‘এই তুই কলেজে না গেলে আমিও যাব না’— বলা মানুষটি তাকে ফেলে অন্ধকার কবরে শুয়ে আছে। কতদিন দেখা হয় না, কথা হয় না, জাপটে ধরে দুষ্টু-মিষ্টি খুনশুটি করা হয় না। সত্যি বলতে, যখনই তার কথা খুব মনে পড়ে, স্মৃতি ছলকে চোখের সামনে ভেসে উঠে খুনশুটি মুহূর্তগুলো। তখন চোখের পানিতে রাস্তা দেখতে পায় না। শ্বাস আঁটকে আসে। ভাবতে পারে না তার কারণে তার বান্ধবী পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে গেছে। আর যখনই এসব ভাবে তখন নিজেকে বড্ড অসহায় লাগে।

এদিকে সাবরিনা তখনো জবাবের অপেক্ষায়। তার চোখে-মুখে একরাশ বিরক্ত। শীতল জবাব দিলে দুটো খোঁচা মারার পরিকল্পনাও এঁটেছে সে।
এ কাজটা বরাবরই ভালোই পারে। সত্যি বলতে, মেয়েটাকে কেন জানি পছন্দ না। সব সময় চুপ করে বসে থাকে। পুলিশ থেকে শুরু করে সবাই কেন জানি তাকে নিয়ে ফুসুরফসুরও করে। বড় বাড়ির মেয়ে নাকি সে।
তাকে কী? সে যাই হোক, এত ভেবে কাজ নেই তার। এখানে বড়-ছোটো সবাইকেই একনজরে দেখা হয়। তো সে এসেছিল একটা কথা জানার জন্য, ভালোই ভালোই জানালে ভালো নয়তো মেয়েটাকে দুটো থাপ্পড়ও মেরে যাবে। এমনিতেও ধনীর দুলালিদের সঙ্গে তার যায় না। এক একটা ন্যাকাষষ্ঠী! দেখলেই ইচ্ছে করে ঠাস্ করে মেরে দিতে। কেন ইচ্ছে করে জানে না, তবে তার থেকেও বেশি এটেনশন পেলে তাকে সহ্য হয় না। সে কিছু না করলেও শত্রু মনে হয়। সাবরিনার সম্পর্কে ধারণা থাকায় কেন জানি, শীতলের কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তাই কিছু বলছে না দেখে সাবরিনা নিজেই বলল,

_’ কদিন পর পর লম্বা-চওড়া এক পোলা দেহা করতে আহে, কে ও? কী লাগে তোর?’
_’কেন, পছন্দ হয়েছে? বিয়ে করবে?’
_’ বেশি কথা কইস না। যা কইছি জবাব দে।’
_’ উনার নাম শোয়াইব শুদ্ধ। পেশায় সায়েন্টিস্ট। যেমন চেহারা, তেমনি টাকা-পয়সা, ফোন নাম্বার মুখস্থ আছে দেব?’
_’তোর কী লাগে?
_’ আমার শ্বশুরের পুত।’
_’দেবর নাকি ভাসুর?’
_’বর।’
_’কিহ্! তুই বিবাহিত?’
_’ বিশ্বাস হলো না? আমারও হয় না। এতদিন দূরে থাকলে মনে থাকে নাকি?’
_’সত্যি তোর জামাই লাগে নাকি ভং মারাইতাছোস?’
_’শুধু জামাই না চাচাতো জামাই।’
_’চাচাতো জামাই মানে?’
_’সে এক সময় চাচাতো ভাই ছিল। দেখতে শুনতে ভালো, টাকা পয়সাও মেলা দেখে প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে জামাই বানিয়ে নিয়েছি। সে এখন আমার বাচ্চার বাবারও।’
_’তোর বাচ্চাও আছে?’

শীতল জবাব দিলো না আপেলের একটি টুকরো মুখে পুরে বিরক্ত নিয়ে চিবাতে লাগল। সাবরিনা কয়েকবার জিজ্ঞাসা করলেও জবাব পেল না।
কেন জানি কথা বলতে ইচ্ছে করছে না৷ আজ সকাল থেকেই কেন জানি অস্থির অস্থির লাগছে। কিছুতে নিজেকে শান্ত করতে পারছে না। বিপদ আসার আগে যেমন লাগে ওই রকম আর কি! আজকে শুদ্ধর আসার কথা ছিল কিন্তু আসে নি। সারাদিন অপেক্ষা করেছে কিন্তু সে আসে নি। এমনটা তো হয় না। যেদিন আসার কথা থাকে ঠিকই চলে আসে। ক্লান্ত দেহে এসে যখন তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে কলিজাখানা ঠান্ডা হয়ে আসে। সব কষ্ট ফিকে হয়ে ওই মুখের দিকেই তাকিয়ে থাকে। কিন্তু আজ কি হলো? এল না কেন? সবাই ঠিক আছে তো? একের পর এক যেসব হচ্ছে ভয়ে বুক ধুকপুক করতে থাকে৷ আল্লাহর কাছে দোয়াও করে যেন
আর বিপদ না আসে। আর কাউকে হারাতে না হয়।

এসব নানান চিন্তায় ভালো লাগছে না কিছু। এদিকে যে দেখতে আসে এত এত খাবার নিয়ে আসে। শুদ্ধও একগাদা ফল পাঠিয়েছিল এখনো শেষ করতে পারে নি। অল্প করে পাঠালেও হয় কিন্তু না এমনভাবে জিনিসপত্র পাঠায় যেন এটা শশুরবাড়ি। বেশি বেশি দেয় যেন চৌদ্দ গুষ্টি নিয়ে খেতে পারে৷ বারণ যে করবে শুনলে তো? শুনবে তো না বরং একই ভাষণ দেবে এখন পুষ্টিকর খাবার-দাবার খেতে হবে। বেশি করে পানি পান করতে হবে। শরীর দূর্বল পুষ্টিকর খাবার না খেলে অসুখে পড়বে। যুক্তিতে সে আজীবনই সেরা। তার সঙ্গে পেরে ওঠা এত সোজা না। কিন্তু মনে রং থাকলে না ঘুরেফিরে খাওয়া যায়? গলা দিয়ে খাবারই নামতে চায় না। আজকে মহারাজের আসার কথা। তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে ধরে ফেলবে খাওয়া-দাওয়া, ঘুমের অনিয়ম হচ্ছে। তখন বকবে না তবে ঠান্ডা স্বরে দেখা করতে না আসার হুমকি দেবে। তাই গতদিন থেকে বেশি বেশি ফলমূল খেতে শুরু করেছে। সারাবছর না পড়ে পরীক্ষার আগের দিন রাতে পড়তে বসলে যেমন হয় তার অবস্থা ঠিক তেমনই। সে অবশ্য কিছু নষ্ট করে না যতটুকু পারে খায় নতুবা কাউকে দিয়ে দেয়। আজও তাই করেছে। শুদ্ধর জন্য অপেক্ষা করতে করতে সকাল পেরিয়ে দুপুর হলো। দুপর গড়াতে থাকল নিজ নিয়মে। অস্থির হয়ে দুপুরের খাওয়া হলো না। বিকাল চারটার পর দেখা করতে দেয় না। বাড়ির লোক আসবে, দেখা হবে, এইটুকু মুহূর্তের জন্য চাতক পাখির ন্যায় অপেক্ষা করে। অথচ এল না সে। এসব ভাবতে ভাবতে তার চোখ ভিজে এল। চোখের কোণা বেয়ে আপনা-আপনি জল
গড়াতে লাগল। হঠাৎ খবর এল তার বাড়ি থেকে লোক এসেছে৷ কথাটা
শোনামাত্রই তড়িৎ উঠে বসল। চোখ মুছতে মুছতে দৌড়ে গেল সেদিকে।
চারটা বাজতে মাত্র বিশ মিনিট বাকি। অনেকে কথা বলে চলেও গেছে।

সে যেতেই আরো দুজন চলে গেল উপস্থিত থাকল মাত্র দুজন। নিজের বাড়ির লোকদের সাথে কথা বলায় ব্যস্ত তারা। শীতল লোহার জালের ওপাশে দাঁড়িয়ে খুঁজল কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে কিন্তু পেল না। তখন আরো একজনের সময় শেষ দেখে আরেকও আপন জনের থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। থাকল সে আর আরেকটি মেয়েটি। সময়ও চলে যাচ্ছে অথচ শুদ্ধ আসছে না দেখে শীতল অসহায় দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকাল। কই সে? উঁকি দিয়ে কাজ হবে না জেনেও উঁকি মারতে লাগল৷ এই মুহূর্তটুকু তাদের জন্য কতটা দামি শুদ্ধ কী তা ভুলে গেছে? তখনই দরজা পেরিয়ে ধীরে ধীরে রুবাব এল। দাঁড়াল তার সোজাসুজি। শুদ্ধ না এসে রুবাবকে দেখে অবাক হলো, কেন জানি অদ্ভুত লাগল। রুবাব কখনো একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে না। এত মরণ তৃষ্ণা থাকে একজন প্রেমিকের চোখে আর ভাইয়দের চোখে থাকে স্নেহ। শীতল কেন জানি না চাইতেও জোরপূর্বক হেসে এক ধাপ পিছিয়ে গেল। তাকে পিছাতে দেখে রুবাব বলল,

_’কেমন আছো বাবুই? চিনতে পারছো আমাকে?’
শীতল বাকহারা হয়ে বিস্ময় নিয়ে তাকাল। রুবাবের কন্ঠস্বর নয়, এটা তো ইয়াসিরের কন্ঠস্বর! অনেকবার খুব কাছ থেকে শুনেছে, মনের ভুল হতেই পারে না! তাছাড়া তাকে বাবুই বলে শুধু ইয়াসির ডাকে। কিন্তু সে এখানে কেন? কার মাধ্যমে এসেছে? এত রিস্ক নিয়ে আসার কারণ কি? তার মনোভাব বুঝে ইয়াসির কোনোকিছু না ভেবেই চোখের কালো লেন্স খুলে ফেলল। তখনই চোখে পড়ল সমুদ্রের মতো সুন্দর একজোড়া নীল চোখের। যে চোখের দিকে তাকালে আরেকবার তাকানোর ইচ্ছে জাগে।
না চাইতেও সৌন্দর্যের প্রশংসা করতে হয়। এবার সুস্পষ্ট এটা ইয়াসিরই।অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে সে রুবাবের ছদ্মবেশে। আর ইয়াসির রুবাবের থেকে হাইটে একটু বেশিই লম্বা। হাইট পুরোপুরি ম্যাচ না করলেও নিঁখুত তার ছদ্মবেশ! এভাবেও ছদ্মবেশ নেওয়া সম্ভব? চোখে কালো লেন্স না লাগালে বোঝার উপায় নেই এটা নীল চোখওয়ালা। কন্ঠস্বর শুনে বুঝল এটা ইয়াসির নয়তো রুবাব ভেবে ভুল করেই বসত। শীতল হতবাক হয়ে তার আপাদমস্তক দেখল। তারপর ধীরেসুস্থে জিজ্ঞাসা করল,

_’আপনি এখানে?’
ইয়াসির সে কথার ধাঁরে কাছে না গিয়ে একদৃষ্টিতে শুধু তাকিয়েই রইল। এরপর আদুরে সুরে বলল,
_’বাবুই, যাবে আমার সাথে?’
_’কোথায়? ‘
_’যেখানে থানা-পুলিশ থাকবে না৷ যেখানে থাকবে মুক্তি, স্বাধীনতা আর অনেক আদর, যত্ন আর ভালোবাসা।’
_’ না।’
_’কেন?’
_’জামিনের চেষ্টা চলছে খুব তাড়াতাড়ি মুক্তি, স্বাধীনতা পেয়ে যাব। আর রইল, আদর-যত্ন আর ভালোবাসার কথা ওসবের জন্যও আমার বাড়ির লোকরা আছে।’
_’আমার কোনোকিছুই তোমার প্রয়োজন নেই, তাই না?’
_’না।’
_’ তোমাদের ভদ্র সমাজে যারা অতি ভদ্রতা দেখায় তারা মুখোশধারী।
এরা এক একটা টাকার পোকা। এসব পোকাদের টাকা দিয়ে কেনা যায় নতুবা প্রাণের ভয় দেখিয়ে স্বার্থ হাসিল করা যায়।’

_’করা গেলেও আমার হয়ে কিছু করবেন না আপনি। জামিন পেয়ে যদি কখনো জানতে পারি আমার জামিনের পেছনে আপনার হাত আছে তাহলে ওয়াদা করছি সেই মুহূর্তে আমি সুইসাইড করব।’
_’এতটাই ঘৃণা? প্রিয়জন না করলে, অন্তত প্রয়োজনে পাশে থাকতে দাও?’
_’ প্রিয়মানুষ কেড়ে নিয়ে কি আর প্রিয়জন হওয়া যায়?’
_’উপহাস করছো?’
_’উপহাস কেন করব? যা সত্যি তাই তো বললাম। নয়তো এই বেশে, এই অসময়ে আমার সামনে কেন, মি. খান?’
_’আসতে পারি না? তুমি নাহয় আপন না ভাবো, আমিও কি ভাবতে পারি না? ধরে নাও, নিজের মনকে সুখী করতে আজ আমি এখানে।’
_’অন্যের সুখ কেড়ে নিয়ে নিজে সুখী হওয়া যায় বুঝি? যা-ই হোক, বলুন
দেখি, এখানে আমাকে দেখে কেমন লাগছে?’
ইয়াসির জবাব দিলো না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে মলিন সুরে জবাব দিলো,

_’ বিষণ্ণ মেঘের মেঘমালা তুমি, আমার কাছে বরাবরের মতোই ভয়ঙ্কর সুন্দর।’
_’বাহ্! দারুণ বললেন তো! মাফিয়া না হয়ে কবি হলেও পারতেন।’
_’প্রেমে পড়তে?’
_’বুঝলাম না।’
_’কবি হলে আমার প্রেমে পড়তে?’
শীতল জবাব না দিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে অন্যদিকে তাকাল৷ তবুও ইয়াসির তৃষ্ণা নিয়ে তাকিয়েই রইল। এটা কিসের তৃষ্ণা? একটু ছুঁয়ে দেখার নাকি না পাওয়ার? কি জানি হবে কিছু একটা। সবার সব কিছু খুঁটিয়ে দেখতে নেই। জানতেও নেই। জানতে গেলে মন পুড়ে যাওয়ার সম্ভবণা থাকে। এরচেয়ে কিছু জিনিস দেখে না দেখার ভান করা উত্তম। তাকে চুপ দেখে ইয়াসির বলল,

_’ভাগ্য যদি ফোনের মতো একক্লিকে রিফ্রেশ করা যেতো তাহলে আমার ভাগ্যলিপি আমি নিজে লিখতাম। অভাগা, অপ্রাপ্তি, আঘাত, অভাব, অপূর্নতা শব্দগুলোকে চিরতরে মুছে ফেলতাম। কষ্টের অস্বস্তি রাখতাম না, থাকত না কোনো পিছুটান। শুধু থাকত একরাশ পূর্ণতা আর নিজের মতো করে সাজানো এক ঝলমলে গল্প।’
_’আর কিছু বলবেন? আমি যাই?’
_’এখনো পনেরো মিনিট বাকি। আমার সাথে বিশ মিনিট কথা বলতেও এত অনীহা?’
_’আজকে শুদ্ধর আসার কথা ছিল। সে না এসে আপনি কেন?’
_’আমি আসতে চেয়েছি তাই তাকে পারমিশন দেওয়া হয় নি। তাছাড়া ও আসতে পারত না বাইক এক্সিডেন্ট করেছে। যদিও আমিই করিয়েছি।’
কথাখানা কর্ণকুহুরে ঢুকতেই শীতলের দৃষ্টিজোড়া কঠিন হয়ে এল। বোচা নাকের পাটা ফুলে উঠল। সে হিসহিসিয়ে বলল,

_’আপনি কি কখনোই আমাদেরকে ভালো থাকতে দিবেন না?’
_’দেব। যদি আমি যা চাই তাই দাও।’
_’আপনি বেঁচে থাকতে আপনার কোনো চাওয়া পূরণ করব না আমি।’
_’মরে গেলে করবে?’
শুদ্ধর এক্সিডেন্টের কথা শুনে শীতলের ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এ
মানুষটা এত জঘন্য কেন? আর কত ক্ষতি করবে তাদের? সে ঘৃনায় মুখ ফিরিয়ে নিলে ইয়াসির ঠোঁট টিপে হাসল। আসলে সে মিথ্যা বলে বাবুই পাখির মিষ্টি মুখের রাগের আভা টুকু উপভোগ করতে চাইল। যার জন্য এই মিথ্যার আশ্রয়। শীতলের চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে দেখে ইয়াসিরের
বুকে ব্যথা হলো। তার বাবুই তার জন্য এত উতলা হয় না৷ ব্যথা পেলেও এত কাতর হয় না। সে নিজেকে সামলে পুনরায় বলল,
_’বলো? আমি মরে গেলে আমার চাওয়া পূর্ণ করবে?’
_’ যদি আপনার থেকে চিরতরে মুক্তি পাই তবে করব৷ বলুন কি চান?’
_’ জানোই তো, আমার আমি ছাড়া এ পৃথিবীতে আমার আর কেউ নাই। তাই আমি চাই, আমি মারা গেলে আমার কবরের যত্ন নাও।’
শীতল জবাব দিলো না। তার মাথায় ঘুরছে শুদ্ধ কেমন আছে? কতটা লেগেছে? তাই তাকেই জিজ্ঞাসা করল,

_’শুদ্ধ কেমন আছে? ঠিক আছে তো?’
_’মরে নি। তবে তিন চার সপ্তাহ হয়তো দেখা করতে আসতে পারবে না। সমস্যা নেই আমি তো আসব।’
একথা শুনে শীতল ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। চোখ মুখে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালে ইয়াসির বলল,
_’আমি এলে হবে না, বাবুই?’
_’না।’
_’কেন, কেন হবে না? ভালো তো আমিও বাসি।’
_'(….)’
_’ বলো! বলোনা? কেন হবে না? জবাব দিয়ে যাও, বাবুই! বাবুই!’
ইয়াসির ব্যতিব্যস্ত হয়ে পাগলের মতো একই কথা জিজ্ঞাসা করতেই থাকল। তখন শীতল ছলছল চোখে তাকিয়ে কান্নারত কন্ঠে উচ্চারণ করল,
_’কারণ আপনি আমার কেউ না।’

কথা শেষ করে শীতল চলে গেল। ইয়াসির এত ডাকল। তবুও একবারও ফিরে এল না মেয়েটা। দেখল না তার ছোট্ট একটি কথায় মাফিয়া খান ভেঙে চুরে চুরমার হয়ে গেছে। বাচ্চাদের মতো হাতে মুখে ঢেকে কাঁদছে। তার বলা কথার প্রেক্ষিতে বিড়বিড় করেই যাচ্ছে, ‘আমি কারো কেউ না। কেউ আমাকে চাইল না!
আকাশের দিকে তাকিয়ে সেদিনের কথাগুলোয় মনে করছিল শীতল। মনে হতো না এখানকার একটা মেয়ের নাকি ভাই হয়েছে। ভাইয়ের নাম রেখেছে ইয়াসির। মেয়েটি গল্প করছিল সে যাওয়ার পথে শুনেছে। নাম শুনে তখন নীল চোখের ইয়াসিরের কথা মনে পড়েছে। সেদিন ইয়াসির বলেছিল শুদ্ধ নাকি এক্সিডেন্ট করেছে। তার সাথে নাকি দেখা করতে আসতে পারবে না। অথচ কদিন পর শুদ্ধ এসেছিল। তাকে সুস্থ অবস্থায় দেখে আল্লাহর কাছে শুকরিয়াও জানিয়েছিল। ইয়াসির সেদিন মিথ্যা বলেছিল সেটা পরে বুঝেছিল। তবে কেন মিথ্যা বলেছিল এটা অজানায় রয়ে গেছে। উনিও আর আসে নি দেখা করতে।
(নোট:- শারাফাত চৌধুরী ইয়াসিরকে দেখা করতে সাহায্য করেছিল এটা ওই দিনের ঘটনা। যেটা ছিল শীতল আর ইয়াসিরের শেষ দেখা, শেষ কথা। এবং সেদিন শীতল আর ইয়াসিরের মধ্যে কি কথা হয়েছিল এটা জানানোর জন্য এইটুকু তুলে ধরা।)

বর্তমানে,
এখন বাজে বেলা বারোটা।
সায়ন নির্বাচন অফিসে গিয়ে এত বড় কান্ড ঘটিয়ে এসেছে এটা বাড়ির কেউ জানে না। শুদ্ধও আগ বাড়িয়ে কিছু বলে নি। নিত্যদিনের মতো যে যার কাজে ব্যস্ত। সায়ন ঘুরে ফিরে অনেক আগেই বাড়ি ফিরে এসেছে।
শারাফাত চৌধুরী অফিসে গিয়েছিলেন ফিরে এসেছেন দুপুরের আগে। ফ্রেশ হয়ে, নামাজ পড়ে, সিতারাকে বললেন ছেলে-মেয়েরা যেখানেই থাকুক সবাই যেন বাড়ি ফিরে। দুপুরের খাবার একসাথে খাবেন। উনার কথা শুনে সিতারা বাকিদেরকে ফোন করে বাড়ি ফেরার তাড়া দিলেন।
সাফওয়ান চৌধুরী, শতরুপা চৌধুরী এসে পৌঁছালেন কিছুক্ষণের মধ্যে। শুদ্ধ অনেকদিন পর ল্যাবে ঢুকেছিল, কাজ না করে থম মেরে বসেছিল।
অথচ হাতে অনেক কাজ। মন না টানলে কি আর কাজে মন বসে? বসে না। সে চুপ করে বসে মনে মনে কিছু হিসাব মিলাচ্ছিল। তখন সিতারার কল পেয়ে ধীরে সুস্থে নিচে গেল। সায়নের পাশের চেয়ার ফাঁকা দেখেও
ঘুরে সাফওয়ান চৌধুরীর পাশে বসল। সায়ন মাথা নিচু করে শুধু মলিন হাসল। শাহাদত চৌধুরী আর শীতলের চেয়ার ছাড়া বাকি চেয়ার পূর্ণ।
একদিন শীতলের চেয়ার পূর্ণ হবে শুধু শূন্য থেকে যাবে শাহাদত চৌধুরী চেয়ার। এদিকে গিন্নিরা একে একে সবার প্লেটে খাবার তুলে দিলেন। যে যার মতো খেতে শুরু করল। তখন শারাফাত চৌধুরী গলা খাঁকারি দিয়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন,

_’ আমার কিছু বলার আছে। আশা করি সবাই মন দিয়ে শুনবে। আমার কথাগুলো শোনার পর যার যার মতামত জানিও। এতদিন তোমাদের ভালো রাখার জন্য যতটুকু করার যায়, করেছি। আজকাল শরীরও আর চলছে না। তাই ভেবেছি আমার অর্জিত সম্পত্তি, টাকা-পয়সা তোমাদের বুঝিয়ে দেব।’
এইটুকু বলে উনি থামলেন। মাছ বেছে সৃজনের প্লেটে দিচ্ছিলেন সিমিন।
উনার মধ্যে আগের মতো রুপ জৌলুশও আর নেই। মনমরা হয়ে থাকেন সব সময়। শুকিয়ে গেছেন অনেকটা। চোখের নিচে কালি জানান দিচ্ছে
নির্ঘুম রাতের সাক্ষী। একটা মেয়ের জীবনে স্বামী তার অহংকার, স্বামীই অলংকার সেটা আবার প্রমাণ পেলেন। উনি সিমিনের দিকে একপলক তাকিয়ে ভাত নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন,
_’সিমিন, শাহাদতের শেয়ার তোমাকে বুঝে নিতে হবে।’
একথা শুনে সিমিনের হাত থেমে গেল। উনি মুখ কাচুমাচু করে বললেন,
_’ওগুলো কি আর আমি বুঝি ভাই? ওসব নিয়ে কি করব আমি?’
_’তা বললে কি হয় পাগলি? তোমার, শীতল-স্বর্ণের ভবিষ্যত আছে না?’
_’আপনার ভাই চাকরিসূত্রে অনেক টাকা পেয়েছে। শুদ্ধ একটা টাকাও খরচ করতে দেয় নি। বরং ব্যাংকে আমার নামে ফিক্সড করে এসেছে।

শীতলের পেছনে কত টাকা যাচ্ছে, সায়নের চিকিৎকার জন্যও খরচ হচ্ছে। শুদ্ধকে কত করে বললাম ওখান থেকে কিছু খরচ করতে শুনলই না। উল্টে পাগলটা আমার হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে বলল আমার যখন যা খেতে ইচ্ছে করে যেন কিনে খায়। এতদিন মাথার উপর আপনার ভাই ছিল। এখন আপনারা আছেন, আমার কতগুলো ছেলে-মেয়েরা আছে আমার আর কি লাগবে? এতদিন এসব ছাড়া যেমন চলেছি আমাকে আর এসবে জড়ায়েন না ভাই। আমি এসবের ভার সইতে পারব না।’
_’এটা আবেগের কথা হয়ে গেল। বেঁচে থাকতে হলে অর্থের প্রয়োজন।
আর শাহাদত এসব করেছে তোমাদের জন্য, তোমাদের ভালো থাকার জন্য। আমার ভাইয়ের আমানতটুকু তোমাকে বুঝিয়ে দিয়ে আমাকে দায়মুক্ত হতে দাও বোন।’
_’জীবন থেকে সবচেয়ে দামি সম্পদ হারিয়ে ঠিকই বেঁচে আছি। ওসব সম্পত্তি, টাকা-পয়সা দিয়ে আর কি হবে? ওগুলো যেমন আছে তেমনই থাক।’
শারাফাত চৌধুরীর চোখজোড়া জ্বলতে শুরু করল৷ কৌশলে চোখ মুছে নিয়ে এবার শুদ্ধ আর সায়নের উদ্দেশ্যে বললেন,

_’আগামীকাল উকিল আসবে। বাড়ি থেকো,,।’
শুদ্ধ বলল,
_’ ওসব হিসাব-নিকাশ বরাবরই কম বুঝি আমি। আমাকে এসবে জড়িও না। জরুরি কাজ আছে কাল সারাদিন বাড়িতেই থাকব না।’
শুদ্ধর পর এবার শখ বলল,
_’ আমাকে যে ঘর দেখে বিয়ে দিয়েছ আমি ভালো আছি, সুখে আছি, আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ দিলে অর্কদের অনেক আছে। তাই আমি মন থেকে বলছি, আমার ভাগের জিনিস আমার ভাইদের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হোক। আমি জানি, আমার ভাগে জিনিস দিলেও আমার ভাইরা আমাকে কখনো ফেলবে না, না দিলেও ফেলবে না।’
_’তা বললে হয়, মা? অন্যের ভরসায় না থেকে নিজের পায়ের মাটি শক্ত রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। আমি জানি, তোমার ভাইরা তোমাকে ফেলবে না। তবুও..।’

_’এ ব্যাপারে এটাই আমার শেষ কথা বাবা।’
এবার উনি রুবাবের দিকে তাকালে রুবাব দাঁত বের হেসে বলল,
_’শিপে বসে ব্যবসার হিসাব রাখার সময় কই মামা? ঐশ্বর্য নিজেও তার পেশা নিয়ে খুশি।’
এবার সায়নের দিকে তাকিয়ে দেখলেন সায়ন আপনমনে খেতে ব্যস্ত।
একে বলা যা না বলাও তা। তবুও ভাবলেন কিছু একটা বলবেন কিন্তু সায়ন টু শব্দও করল না। তাই হতাশ হয়ে বেসিনে হাত ধুয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই সায়ন বলল,
_’ আমাকে শুধু একটা ব্রাঞ্জের দায়িত্ব দাও বাবা। রাজনীতিতে যেহেতু থাকছি না বউ-বাচ্চাকে খাওয়াতে-পড়াতে তো হবে।’
সায়নের কথা শুনে উনার পাজোড়া থেমে গেল। উনি হতবাক হয়ে ঘুরে তাকালেন ছেলের দিকে। ভুল শুনলেন ভেবে আবার বললেন,

_’ কি? কি বললে?’
_’নিবার্চন স্থগিতের আবেদন জমা দিয়েছি এসবে আর থাকছি না।’
অন্যরা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। কিন্তু শারাফাত চৌধুরী কথাখানা শুনে দৌড়ে ছুটে এলেন সায়নের কাছে। সায়নের বুকে পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন,
_’সত্যি? সত্যি বলছিস বাপ? এসবে আর থাকবি না? থাকিস না। আমি নিজে হাতে কাজ শেখাব তোকে। ওসব না করলে কি হবে? কিছুই হবে না। আমি খুশি হয়েছে আব্বা। কবে অফিসে যাবি তুই? আমার অফিসে বসবি তুই। আমার চোখের সামনে রাখব তোকে। শুনলে সিতারা আমার ছেলের এতদিনে সুবুদ্ধি হয়েছে৷’
সায়ন মুচকি হেসে শক্ত করে বাবার হাতখানা চেপে ধরল। খুশির চোটে শারাফাত চৌধুরীর কন্ঠরোধ হয়ে গেল। চোখজোড়া ভিজে উঠল। উনি সায়নের কপালে চুমু এঁকে বললেন,
_’ সন্তানের মৃতদেহের ভার পৃথিবীর সব পাহাড়ের চাইতেও ভারী। এই যন্ত্রণার কাছে জগতের বাকি সব কষ্ট ফিকে রে বাবা। যে মুখে বাবা ডাক শুনে কলিজা জুড়িয়েছি, সেই মুখের ওপরে কবরের মাটি দেওয়ার মতো দহন আর কিছুতে নেই। আমি সন্তান হারানোর ভার সইতে পারব না রে, বাবা। আমার ভেতরের সবটুকু শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে।

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯৩

তুই ওসব ছেড়ে দে। বাবা আছি তোর পাশে।’
সায়ন উনার হাতের উল্টো পিঠে চুমু খেলো। মাথা নাড়িয়ে সম্মতিসূচক মাথা নাড়াল। অর্থাৎ রাজনীতিতে নিজেকে জড়াবে না আর। তখনই তার শুদ্ধর চোখে চোখ পড়ল। মুখে না বললেও শুদ্ধর চোখ যেন বলে উঠল ‘দিনশেষে তুমি ভালো থাকবে তো?’

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯৫

12 COMMENTS

  1. আপু পরের পর্ব দেন 😫💗💗 অনেক সুন্দর হয়েছে কিন্তু উপন্যাস টা শেষ হবে কবে শেষ পর্ব পড়ার জন্য অনেক Excited ☺️☺️

  2. আপু পরের পর্ব তাড়াতাড়ি দেও প্লিজ প্লিজ 😩😩

  3. আপু পরের পর্ব কি দিবেন না 🙃😏💗💗💗💐😅😫

  4. আপু খুব ভালো লেগেছে এটা পড়ে, বাকি পর্ব গুলো তাড়াতাড়ি দেবেন আপু।

Comments are closed.