Home তুই আমার বিশ্বাস ছিলি তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬৯

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬৯

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬৯
জান্নাতি আক্তার জারা

সকাল বেলা উঠা সূর্য মামা সারাদিনে ক্লান্তি শেষে হেলে পড়া বিকালে নরম রোদের তীব্র তেজ কমে কোমল উষ্ণর আভা ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে, ধীরে ধীরে সন্ধ্যা থেকে রাত হয়ে আরছে, কিন্তু বিয়ে বাড়ির এত সাজসজ্জা ঝলমলে লাইটিং এর ভীরে সেই অন্ধকার বুঝা মুসকিল,বাড়ির উঠানে গায়ে হলুদের আয়োজন করা হয়েছে, পুরো উঠান জুড়ে হলুদ আর সাদা কাপড় দিয়ে সাজানো, মৃদু বাতাসে সেই হলুদ সাদা পাতলা কাপড় গুলো দুলছে, হলুদ সাদা কাপড়ের মাঝামাঝি তরতাজা গাঁদা ফুল দিয়ে ডেকোরেশন করা, তরতাজা ফুলের সুবাসে বিয়ে বিয়ে গন্ধ লেগে আছে যেন,

মেয়েরা সবাই হলুদ পোশাকে সাজিয়ে ছে নিজেদের, কেউ শাড়ি তো কেউ লেহেঙ্গা, আর ছেলেরা মেরুর পাঞ্জাবিতে , মেরুন কাতান ফ্যাব্রিকের হালকা চকচকে ফিনিশটা পুরো পাঞ্জাবিতে আলাদা একটা লাক্সারি লেভেলে নিয়ে গেছে, আর বর বউয়ের জন্য গোল্ডেন কালারে শাড়ি পাঞ্জাবি, মিম কে গোল্ডন শাড়িতে মোহময়ী লাগছে, মাথায় হাতে গলায় তাজা গোলাপ আর গাদা ফুলের সংমিশ্রণে মালা, মাথায় পরা গোল্ডেন বৌ ওড়না তাকে দিচ্ছে এক পরিপূর্ণ নববধূর রূপ, আর শ্যাম বর্ণ মায়াবী মুখভরা হাসিতে চারপাশ ঝলমল করছে যেন, পার্থ স্টেজের সামনে দাঁড়িয়ে মিমের হাসিমাখা মুখটা ক্যামেরাবন্দি করে নিচ্ছে, শুধু কী মিমের উঁহু, মিমের পাশে বসা নতুন বর আরশেরও, আরশের শরীরে গোল্ডেন রঙের পাঞ্জাবি, হালকা কাজ করা সূক্ষ্ম নকশা আরশের লুককে আরও অভিজাত করে তুলেছে, আরশ মিম দুজন স্টেজে বসে হাসি মুখে একটার পর একটা কাঁপল পিক উঠাচ্ছে, আর তাঁদের ক্যামেরা ম্যান স্বয়ং পার্থ, পার্থর মুখ দেখে হৃদয়ের ঝর বুঝা মুসকিল, মুখে লেগে আছে হাসি, তাঁর হাসিতে লেগে আছে বেস্টফ্রেন্ড কে সুখে দেখার আনন্দ,
আহিন আলভী দুজন স্টেজের পাশে চেয়ারে বসে ফোন স্ক্রল করছিলো,আলভীর কিছু একটা মনে পড়তেই ফোন পকেটে ভরে আশেপাশে তাকিয়ে কাউকে খোজোর চেষ্টা করতে লাগলো, বেশ কিছুক্ষণ ভীরের মধ্যে চোখ বুলিয়ে কাঙ্খিত কিছু খুজে পেয়ে ঠোঁটের কোনে দুষ্টু হাসি খেলে গেলো, একনজর আহিন কে দেখে নিয়ে বসা থেকে উঠতে নিতেই আহিন ফোন স্ক্রল করতে করতে প্রশ্ন করলো,

___” কই যাস?
___” আরছি।
আহিন আর কিছুই বললো না, পুনরায় ফোন স্ক্রল করায় মনোযোগী হয়ে গেলো, আলভী স্টেজের উপর গায়ে হলুদের সাজানো ডালা থেকে কাঁচা হলুদ বাটা হাতের মুঠোয় নিলো, মুখে লেগে আছে দুষ্টমির হাসি, হলুদ নিয়ে স্টেজ থেকে দূরে দাঁড়িয়ে হলুদ লেহেঙ্গা পরিহিত এক মেয়ের দিকে এগুতে লাগলো, মেয়েটা তার ফোনে নানারকম রংঢং করে পিক উঠাচ্ছে, ছেড়ে দেওয়া চুলের জন্য মেয়েটার মুখ দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু আলভী পিছন থেকে ঠিকই ঠাহর করে নিয়েছে মেয়েটা কে হতে পারে, আলভী বাঁকা হেসে পিছন থেকে মেয়েটার গালে হলুদ লাগিয়ে বলল,
___” হাই কিউটি ?
মেয়েটা বিরক্ত মুখে ফোনের ক্যামেরায় হলুদ মাখা ফেস দেখতে দেখতে পিছনে ফিরে সামনের ব্যাক্তি কে না দেখেই কিছুটা উচ্চ স্বরে বলল,

___” আপনিইই ?
___” আরে সালা, কিউটি দেখি এখনো আমাকে মনে রেখেছে,সারারাত কি আমাকে নিয়ে ভাবছিলে নাকি?
মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে ফোন থেকে চোখ তুলে তাকালো, সঙ্গে সঙ্গে আলভী বুকে হাত দিয়ে বলল,
___” উফফ বিয়ান আপনাকে যা লাগছে না।
মেয়েটা এবার হাতে হাত ভাজ করে ঠোঁট বাঁকা করে আলভী কে উপরনিচ পরক করতে করতে বলল,
___” ফ্লার্ট করছেন?
আলভী এবার থতমত খেয়ে গেলো, গতরাতের নূরফিয়া আর আজকের নূরফিহা কে সম্পূর্ণ ভিন্ন লাগছে, গতরাতের মেয়েটা কেমন ভীতু টাইপের, আর আজকের নূরফিহার মধ্যে কেমন তেজ দেখা যাচ্ছে, আলভী আশ্চর্য মুখে বলে উঠলো,
___” হোয়াট, ফ্লার্ট আর আমি, আমি তো ভেবেছিলাম ভালো কথা বলছি, কিউউউটি ?
মেয়েটা আলভীর টেনে টেনে কথায় চোখ রাঙিয়ে, দাঁত কিড়মিড় করে তাকালো, আলভী মেয়েটার আরেকটু কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
___” তুমি যদি না চাও, তাহলে থেমে যাই, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে তোমার আপত্তি নেই?
মেয়েটা আলভীর দিকে আঙ্গুল তাক করে রাগী গলায় বলল,

___” দেখুন, আপনি আপনার নিমিট ক্রস করছেন।
আলভী মেয়েটাকে রেগে যেতে দেখে হেসে উঠলো, পুনরায় সিরিয়াস গলায় বলল,
___” সরি সরি, নট ফ্লার্ট, কিডিং ইয়ার, আমি জাস্ট ফ্রেন্ডলি হচ্ছিলাম, বাই দ্য ওয়ে তুমি হোয়াটসঅ্যাপ ইউজ করো?
মেয়েটার মুখে এবার দুষ্টুমি খেলে গেলো, মেয়েটা ইনোসেন্ট ফেস করে হাত দিয়ে ইশারা করে আলভীর মুখের কাছে মুখ আনলো,আলভী এতে মহা খুশি, মেয়েটা ইনোসেন্ট মুখে আলভীর মতো ফিসফিস করে বলল,
___” না আমি তো ফেয়ারলাভলী ইউজ করি।
আলভী প্রথমে খুশি হলেও এবার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল, হতবিহ্বল মুখে তার মুখ থেকে আপনাআপনি বেরিয়ে এলো,

___” এ্যাঁ?
মেয়েটার মুখে সেই দুষ্টু হাসি,
___” এ্যাঁ না হ্যাঁ।
আলভী কিছুক্ষণ অবাক হয়ে মেয়েটার দুষ্টুমিতে খেলে যাওয়া মুখটা পরক করে মেয়েটার চালাকি বুঝতে পেয়ে হালকা হেসে স্বাভাবিক হলো, নিজের ফোনটা দেখিয়ে বলল,
___” নট ব্যাড কিউটি, আমি আসলে জানতে চাচ্ছিলাম তুমি হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জার ইউজ করো কিনা, আই মিন, তোমার কন্টাক্ট নাম্বারটা কী পাওয়া যাবে?
মেয়েটা ঠোঁট উল্টে অ্যাটিটিউড নিয়ে বলল,
___” সরি ব্রাদার, আমি অচেনা কাউকে আমার নাম্বার দিই না।
আলভী হেসে বলল,
___” আরে কিউটি,এত পরপর ভাবো কেনো, নাম্বারটা পেলে তোমার খোঁজখবর রাখতাম, কথা বলতে বলতে ধীরে ধীরে তোমার মনটা জিতে নিতাম, এনিওয়ে আমি কিন্তু একটু একটু করে তোমার মনে জায়গা করে নিচ্ছি।
মেয়েটা ভ্রু তুলে হালকা হাসল,

___”ওহ তাইনাকি, কিন্তু সমস্যা হলো আমার মনে তো এত জায়গা নেই মিস্টার?
___” মানে?
মেয়েটা হালকা হেসে বলল,
___”মানে, আমার মনে জায়গা পেতে হলে একটা লম্বা ওয়েটিং লিস্ট পার হতে হয়,আপনি এখনও লাইনের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন।
___” তাহলে কী আমি লাইনে দাঁড়িয়ে যাব, বলা তো যায় না একদিন হয়তো ওই ওয়েটিং লিস্ট পেরিয়ে পার্মানেন্ট জায়গা করে নেব, তবে আশা করি কিউটির মনে ভিআইপি উপায়ে কোনো শর্টকাট রাস্তা আছে, না থাকলেও ব্যাপার না, আমি কিন্তু শর্টকাট রাস্তা খুঁজে নিতে পারি।
মেয়েটা এবার আলভীর চোখের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল,
___” কী বলুন তো মিস্টার,মনে জায়গা করে নিতে তো সবাই পারে, কিন্ত হৃদয়ে কয়জনেই বা পারে?
আলভীর কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পরলো,সে সোজা হয়ে , হাতে হাত ভাঁজ করে গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করলো,

___” কেন কিউটি, তোমার হৃদয় বুঝি খুব ভিআইপি?
___” হ্যাঁ ভিআইপি, আর ভিআইপি জায়গা পেতে হলে একটু স্পেশাল হতে হয়, আপনি এখনো সেই লেভেলে যাননি মিস্টার।
___” কী ব্যাপার কিউটি, গতকাল আর আজকের তোমার মধ্যে চেঞ্জিং লাগছে, চোখের সেই ভীতু ভাবটা হঠাৎ এত তেজে ভরে গেল কিভাবে?
মেয়েটা নিজের গাল থেকে আলভীর লাগিয়ে দেওয়া হলুদ নিয়ে বাঁকা হাসি মুখে রেখে আলভীর গালে হলুদ ছুড়ে দিয়ে বলল,
___” কারণ, আই অ্যাম নূরপ্রিয়া, নট নূরফিহা।
আলভী নূরপ্রিয়ার কথায় হাসতে হাসতে অবিশ্বাস্য কন্ঠে তাচ্ছিল্য করে বলে উঠলো,
___” হোয়াট, আর ইউ কিডিং কিউটি?
নূরপ্রিয়া বলল,
___”আই অ্যাম নট কিডিং,ফর ইয়োর কাইন্ড ইনফরমেশন, আই অ্যাম নূরপ্রিয়া, আর এই যে (নূরপ্রিয়া হাত দিয়ে আলভীর পেছনে ইশারা করে দেখিয়ে বলল) “লেহেঙ্গা পরা মেয়েটাকে দেখছেন, ও আমার জমজ বোন নূরফিহা।
আলভী পিছনে তাকিয়ে শকড হলো যেন,
___”ইম্পসিবল, এটা কীভাবে সম্ভব, এতটা মিল, ও নো, ভুল জায়গায় এন্ট্রি নিয়ে ফেলেছি!
নূরফিহা তাঁদের দিকেই আসছিল, আলভী নূরফিহাকে আসতে দেখে একনজর নূরপ্রিয়ার দিকে তাকিয়ে জায়গা থেকে দ্রুত প্রস্থান করলো, বলতে গেলে এক প্রকার পালিয়েই গেলো, নূরফিহা আলভী কে তাড়াহুড়া করে চলে যেতে দেখে অবাক হলো, সে নূরপ্রিয়ার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো,
___” কী রে উনি এভাবে পালিয়ে গেল কেনো?
নূরপ্রিয়ার মুখে হাসি, নূরফিহা কে একনজর দেখে বলল,

___” আর বলিস না, আইটেম টা তোকে ভেবে ফ্লার্ট করতে এসেছিল, বাই দ্য ওয়ে আইটেমটা কে রে?
নূরফিহা বিরক্ত মুখে বলল,
___” তোর মুখের ভাষা কি চেঞ্জ হবে না?
___” আরে বাদ দে, বল না কে রে, ভালো লাগছে বেডা রে।
নূরফিহা হতাশার নিঃশ্বাস ফেলল, হ্যাঁ, তারা দুই বোন, জমজ, নূরফিহা বড় আর নূরপ্রিয়া মাএ তিন মিনিটের ছোট,জমজ হলেও তাদের দুজনের আচরণ চালচলন সবকিছুই আলেদা, দু’জন যেন চরিত্র, নূরফিহা, একটু লাজুক ভিতু কথা বলে কম, আর নূরপ্রিয়া চঞ্চল দুষ্টু হাসিখুশি এক মেয়ে, নূরফিহা বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করে, আর নূরপ্রিয়া পড়াশোনার জন্য বাহিরে থাকে, বিয়ে উপলক্ষে গতরাতে বাড়ি ফিরছে সে, নূরপ্রিয়া নূরফিহাকে ভাবনার জগতে ডুবে যেতে দেখে তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
___” কি রে বল, কে এই আইটেমটা?
___” মিষ্টি ভাবীর কাজিনের ফ্রেন্ডের ছোট ভাই, সম্পর্কে আমাদের বিয়াই সাব হয়, নাম সম্ভবত আলভী, স্টাডি করতে কানাডায় থাকে, গতরাতে কাউকে না জানিয়ে কানাডা থেকে বাংলাদেশে এসে সবাই কে সারপ্রাইজ দিয়েছে, আর সে তোর মতোই ফ্লার্টি মাস্টার, আসার পর থেকেই আমার সাথে ফ্লার্ট করেছে, আজ আমাকে ভেবে তোকে, আর কিছু?
নূরফিহা এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলেই থামল, নূরপ্রিয়ার মুখে হাসি, দু’হাতে তালি মেরে বলে উঠলো,

___”আরে ব্যাস, ক্যা বাত হ্যায়, পারফেক্ট জুটি, যা ফিস্, এই আলভী বেডাই তোর জিজু।
নূরফিহা একটু ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলল,
___”আম্মু যদি জানতে পারে এই বয়সে পড়াশোনার নাম করে প্রেম করে বেড়াস, তাহলে তোর পড়াশোনা বন্ধ,ডাইরেক্ট বিয়ে দিয়ে দেবে, দেখিস।
নূরপ্রিয়া নূরফিহার গলা জরিয়ে ধরে আবদারের সরে বলল,
___” আরে তুই আসিস না, বরাবরের মতো আম্মু কে ম্যানেজ করে নিবি।
___” হ্যাঁ প্রতিবার কিছু না কিছু ঝামেলা করবি, আর তোকে বকা থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব তো আমার তাইনা?
___” এভাবে বলছিস কেন, তুই আমার বড় আপু না, আম্মুর বকার হাত থেকে ছোট বোন কে বাঁচানোর দায়িত্ব তো বড় আপুদের।
নূরফিহা ভ্রু কুঁচকে বলল,

___” এখন মনে পড়ছে আমি তোর বড়, কেনো অন্য সময় তো বড় বোন বলে একটুও সম্মান দেস না, বিপদের বেলায় বড় আপু তাইনা?
নূরপ্রিয়া এবার নূরফিহার গড়া ছেড়ে দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিমায় হাত নড়েচড়ে বলতে লাগলো,
___” তোর কথা শুনে মির্জা গালিবের মতো আমার চিৎকার করিয়া বলতে ইচ্ছা হচ্ছে, হে বনু, তুমি আমার বড় বোন হয়েছো, আবার সম্মানও চাও, হে বনু, তুমি আমার বড় বোন হয়েছো, আবার সম্মানও চাও, তুমি বড়োই নাদান বনু, একি চেহারা নিয়ে জন্ম নিয়েছো, আবার সম্মানের সাথে সাথে বড় বোন হিসাবে মর্যাদাও চাও হ্যায়।
নূরপ্রিয়া কথাগুলো বলে শব্দ করে হেঁসে উঠলো, নূরফিহা হাতাশার নিশ্বাস ফেলে বলল,
___” তুই আর ভালো হাবি না, চল এদিকে।

___”দোস্ত আমি শেষ।
আলভী চেয়ারে বসে হাফাতে লাগলো, আহিন আলভীর কথা শুনে ফোন পকেটে গুজাতে গুজাতে ভ্রু কুঁচকে বলল,
___” শেষ মানে?
___” শেষ মানে শেষ।
আলভীর পুনরায় একি কথায় আহিন বিরক্ত মুখে বলল,
___” কেনো তোকে কবরে দিয়ে আসতে হবে।
___” আমি হার্ট অ্যাটাক করবো দোস্ত, একি রুপি দুই ক্রাশ, একটার বহুদ তেজ, একদম বোম্বাই মরিচ, আরেকটা।
আহিন ভ্রু কুঁচকে,
___” আরেকটা?
___” লাজুক লতা।
আহিন এবার নিজের বিরক্ত ধরে রাখতে পারলো না, দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
___” মেয়াদ উত্তির্ন গাঁজা সেবন করেছিস ?
___” আরে ভাই, কিছুক্ষণ পারে তুইও লাল পানি না খেয়েই মাতলামি করবি, দেখিস।
আলভী আহিন কে রাগী চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে গলা খাঁকারি দিয়ে স্বাভাবিক হয়ে বলল,

___” নূরফিহা…
___” নূরফিহা মানে, তুই নূরফিহার সাথে ফ্লার্ট করেছিস, খবরদার আলভী, ওর আশেপাশে তুই ঘেঁষবি না।
আলভীর মুখের কথা কেরে নিয়ে আহিন আলভী কে হুমকি দিতে লাগলো, আলভীর আহিনের কথায় ভ্রু কুঁচকে এলো,সন্ধিহান গলায় বলল,
___” একমিনিট একমিনিট, নূরফিহার কথা বলতেই তুই হুমকি দিচ্ছিস কেন, বাই এনি চান্স তুই কী নূরফিহা কে লাইক করিস?
আহিন আমতা আমতা করতে লাগলো,
___” না, আমি সে কথা কখন বললাম, বাট তুই নূরফিহার থেকে দূরে থাকবি, এটাই ফাইনাল।
___” শিকার করছিস না, না করলি প্রবলেম নেই, বাট তুই বলে দে, কোনটা তোর, আর কোনটা আমার।
আহিন বুঝতে পারলো না, আলভীর কথার মানে,
___” কী কোনটা তোর, কোনটা আমার?
___” বুঝছিস না, বললাম নূরফিহা তোর, আর নূরপ্রিয়া আমার, বাট বুঝবো কিভাবে কোনটা নূরফিহা, কোনটা নূরপ্রিয়া?
আহিন অবাক স্বরে,

___” নূরফিহা নূরপ্রিয়া, বুঝলাম না, বুঝিয়ে বল?
আলভী বুঝতে পারলো, আহিন কিছুই জানে না, আলভী প্রথম থেকে সবকিছু খুলে বলল, আহিনের কাছে, আহিন সব শুনার পর কিছুক্ষণ থ হয়ে বসে থেকে হটাৎই চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে রাগী গলায় বলল,
___” তুই গতকাল নূরফিহার সাথে ফ্লার্ট করেছিস?
আলভী পড়ে গেলো মহা ঝামেলায়, এই ছেলে জমজ বোন কে চিনবে কিভাবে এটা নিয়ে না ভেবে আলভী কে নিয়ে পড়ে গেলো, আলভী নিজেও চেয়ার থেকে উঠে আহিন কে শাস্ত করতে লাগলো,
___” দেখ ভাই, আমি তো জানতাম না, তুই নূরফিহা কে লাইক করিস, জানলে নূরফিহার দিকে ফিরেও তাকাতাম না, বাট এখন তো জেনে গেছি আর নূরফিহার দিকে তাকাবো না তোর কসম, বাট নূরফিহা আর নূরপ্রিয়া কোনটা এটা বুঝবো কিভাবে, আমার তো মেয়েটা কে ভালো লাগছে দোস্ত?
আহিন কিছুক্ষণ ভাবলো, আলভী আহিনের ভাবুক মুখের দিকে চেয়ে আছে, এই বুঝি আহিন নিজের ভাবনা শেষ করে একটা সলিড ডিসিশন দিবে, কিন্তু আলভীর ভাবনায় পানি ঢেলে আহিন বলে উঠলো,
___”নূরফিহা আর নূরপ্রিয়া যেহেতু একরকম দেখতে, আর তোর নজরও তেমন ভালো না, দেখা যাবে নূরপ্রিয়ার জায়গায় নূরফিহাকেই চোখ দিয়ে যা করার করে ফেলবি, এত রিস্ক নিতে পারব না, তোর পছন্দ ক্যান্সেল কর, দেখ, বিয়েবাড়িতে অনেক মেয়ে আছে ওদের দিকে ট্রাই কর, দুই-একটা এমনিই পটে যাবে।
আহিন বিরক্ত কন্ঠে বলল,

___” এই অফার তো আমিও তোকে দিতে পারি, আর কী সব চোখ দিয়ে যা করার করে ফেলবো, আমাকে কি তোর লুচ্চা মনে হয়?
___” লুচ্চা না হলে ফ্লার্ট করতি না।
আহিনের কথায় আলভী হেঁসে উঠে বলল,
___” বাদ দে না ভাই, আমি পাক্কা ভালো হয়ে যাবো, তোর নূরফিহার কসম।
আহিন চোখ রাঙিয়ে তাকালো, আলভী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না, বন্ধুর কথায় হতাশা আর যুক্তি দেখিয়ে অভিযোগের সুরে বলল,
___” তোর চোখের সামনে, তোর বন্ধুর হক অন্য কেউ মেড়ে চলে যাবে, আর তুই বসে বসে গরুর হাড্ডি চুষবি সালা ভায়রাভাই।
আহিন কিছুক্ষণ আলভীর ক্ষিপ্ত মুখের দিকে চেয়ে থেকে শব্দ করে হেঁসে উঠলো, হাসতে হাসতে আলভীর ঘারে হাত দিয়ে বলতে লাগলো,
___” যা, বন্ধু হিসেবে তোর পাশে থাকব, আমার শালী তোর ঘরের ঘরোয়ালি,কিন্তু ভুল করেও আমারটার দিকে তাকাবি না।
আলভীর মুখে এবার চওড়া হাসি দেখা গেলো, তাঁর পাশাপাশি কিছুটা টেনশন ফুটে উঠলো, আলভী পুনরায় বলল,

___” না তাকালো বুঝবো কিভাবে কোনটা কার?
আহিন কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
___” নো টেনশন, নূরফিহা শান্তশিষ্ট লাজুক মেয়ে, আমি চিনে ফেলবে প্রবলেম নেই।
___” বাট আমার কিউটি?
আহিন একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
___” আমাকে বুঝা, এক দেখায় কেউ কীভাবে কারও প্রেমে পড়ে?
আলভী মুচকি হেসে বলল,
___” ইট ওয়াজ লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট, কিছু অনুভূতি আছে যা ব্যাখ্যা করা যায় না।
দুই বন্ধু প্রপোজ না করেই নিজেরাই ঠিক করে নিলো, কে কাকে নিজের জীবনের সাথে জরিয়ে নিবে, অথচ একটি বাও তাঁদের মনে এলো না, মেয়ে দুটো কী চায়, তাদের দুই বোন দুই বন্ধুর লাভ স্টোরি হয়তো এভাবেই শুরু হলো, ধীরে ধীরে এই ভালো লাগা থেকে গভীর ভালোবাসার রুপ নিবে, ভাগ্যের লিখন থাকলে হয়তো কেনো একদিন তাঁদেরও কপালে পূর্ণতা লেখা থাকবে, তাদের কিশোর কিশোরী বয়সে ভালোবাসার রঙে রঙ্গিন হতে যাচ্ছে, যদি ভালোবাসা খাঁটি হয়ে থাকে, হাজারো ঝড় তুফান তাদের আলেদা করতে পারবে না, ভালো থাক এভাবে ঝড়তুফান হাসি কষ্ট খুনসুটিতে বেড়ে ওঠা হাজারো প্রেমিক প্রেমিকা,

মিম কে একে একে বড়রা সবাই হলুদ লাগিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, পাড়ার প্রতিবেশী থেকে আত্মীয়-স্বজন রা একে একে হলুদ লাগিয়ে দিচ্ছে, বক্সের চলছে গায়ে হলুদের গান, আরশ মিমের পাশেই বসে আছে, তার চোখ যেন মিম থেকে সরছে না, আরশ মাঝেমধ্যে মিমের কানের কাছে ফিসফিস করে কী যেন বলছে, এতে মিম কখনো লাজুক হাসি, তো কখনো আরশের হাত চেপে ধরে চোখ রাঙিয়ে তাকাচ্ছে, আরশ মিম কে লজ্জায় ফেলে নিজেও মজা নিচ্ছে, চারপাশের হাসি-ঠাট্টা, গানের শব্দের মাঝে দুজনের খুনসুটি অনেকের চোখে পড়ছে, তবুও কেউ কিছু বলছে না, আরশ পুনরায় মিম কে লজ্জায় ফেলতে একটু ঝুঁকে মিমের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

___” লজ্জায় রাঙ্গানো মায়াবী মুখটা হলুদের আড়ালে লুকিয়ে কী লাভ, আমি কিন্তু আগেই দেখে ফেলেছি, তাও পুরোটা।
মিম এবার হালকা করে আরশের হাতে চাপ দিল, চোখ রাঙিয়ে তাকাল, আরশ মুচকি হেসে আরও কাছে ঝুঁকে বলল,
___” ইস বিয়ের পর, এই রাগটাই সবচেয়ে বেশি মিস করব।
মিম অবাক কন্ঠে ফিসফিস করে জানতে চাইলো,
___” কেনো?
___” কারন অকারণ, সময় অসময়ে আমার ডিপ আদরে অভ্যস্ত হতে হবে, আমি বড়োই বেসামাল, আমার বউয়ের লাজুক মুখটা আমাকে পাগল করে দেবে।
___” কারণ-অকারণ সময়-অসময়ে আমার এই গভীর আদরে অভ্যস্ত হতে হবে, আমি বড়ই বেসামাল,আমার বউয়ের লাজুক মুখটা আমাকে পাগল করে দেবে।
মিম এবার সত্যিই লজ্জা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল, আরশের হাতের মিমের হাত আরেকটু শক্ত হয়ে গেলো, আরশ পুনরায় হেসে ফিসফিস করে বলল,

___”একটা কথা বলি?
মিম ছোট করে বলল,
___” একদম না।
আরশ এবার হেঁসে উঠলো অন্য দিকে মুখ ফিরালো, মিম যে সত্যিই বেশ লজ্জা পেয়েছে, আরশ পুনরায় মিমের দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বলল,
___” জাস্ট একটা কথা বলল।
আরশের গলায় আকুতি শুনা গেল, তবুও মিম গলল না, আরশ কে বারণ করে বলল,
___” না আর একটা শব্দও না।
___” আরে শোনো না?
ইস কথাটার মধ্যে কী ছিলো মিমের জানা নেই, এখন খুব করে ইচ্ছা হচ্ছে আরশ বলুক, আরশ মিমের মনের ভাব বুঝতে পেয়ে একটা শান্তির নিশ্বাস ফেলে বলল,
___” আজকে না, আমার সত্যি মনে হচ্ছে,এই মেয়েটাই আমার পুরো দুনিয়া হতে যাচ্ছে।
মিম নিজের লাজলজ্জা ভুলে বলল,

___” কেনো, এর আগে মনে হয়নি?
আরশ হেসে বলল,
___” আগে সন্দেহ ছিল, আজ কনফার্ম হয়ে গেল।
___” তা নাতজামাই, বিয়ের পরে এভাবে সারাজীবন আমার নাতনির দিকে তাকিয়ে থাকবে তো?
আরশ শান্ত গলায় বলল
___” সারাজীবনও কম পড়ে যাবে, ওকে দেখা শেষই হবে না।
আরশ তখনও এক দৃষ্টিতে মিমের দিকে তাকিয়ে আছে, মিম দাদির কথায় আরশের মুখের দিকে তাকালো, আরশ কী উওর দেয় শোনার জন্য, বয়স্ক দাদির মুখে দুষ্টু হাসি, তিশাদের বাড়ির পাশে দাদি বাড়ি, আরশ এর আগেও দেখেছে দাদিকে, দাদি পুনরায় বললেন,
___” এভাবে সারাজীবন আমার নাতনির দিকে তাকিয়ে থাকলে হাসপাতালে যাবে কখন, উপার্জন না করলে আমার নাতনি রে খাওয়াবে কী?
আরশ মুচকি হেসে বলল,

___”ভালোবাসা খাওয়াবো।
আরশের কথা শেষ হতেই আশেপাশে সবাই হো হো করে হেসে উঠল, কেউ আবার চিৎকার দিয়ে হাত তালি দিয়ে উঠল, মিম লাজুক হেঁসে মুখ নিচু করে নিলো, কিন্তু আরশের কথায় বাদ সেজে আশিক বলল,
___” প্রেমে পড়লে মাথার উঁকুন ও জোনাকি মনে হয়, যাক ভাই, বিয়ের পর বুঝবি, বউ কী জিনিস।
আশিকের কথা শেষ না হতেই মায়া ভ্রু কুঁচকে জিরা করতে লাগলো,
___” এই বউ কী জিনিস মানে, কী বুঝাতে চাইছো তুমি ?
আশিক হাত তুলে বলল,
___” আমি কিছু বলিনি, আমি নির্দোষ, সব দোষ এই মুখের!
পুনরায় চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেলো, মায়া রাগী সরে বলল,
___” তুমি কী আমাদের বউ জাতি কে অপমান করছো?
মায়ার কথায় এবার মেয়েদের সিরিয়াস হতে দেখা গেলো, আশিক এবার শুধু নিজের বউ কে না, বন্ধুর বউ থেকে শুরু করে আশেপাশে সব ভাই ব্রাদারের বউ কে ভয় পেতে শুরু করলো, আশিকের ফেস দেখে, হাবীব আনাস আদিল রাফি আমান আরশ সবাই মুখ চেপে হাসি আটকাতে লাগলো, আশিক হাসার চেষ্টা করে হাবীবের দিকে তাকিয়ে বলল,

___” আরে দোস্ত বলনা,আমি বউ মানে বুঝিয়েছি, বউ খুব আদরের জিনিস, বউ কে দেখলে বুক পরান জুড়িয়ে যায়, বউ মানে তো আমাদের পৃথিবী, আরে আমি আসল কথা তো বলতেই ভুলে গেছি, বউ আমাদের খুব যত্ন নেয়, বউ তো সব, বল?
আশিকের কথায় ছেলেরা সবাই এক সাথে বলে উঠলো,
___” ঠিক ঠিক।
রাফি বলে উঠলো,
___” আশিক ব্রো, আমি তোমার সাথে একমত, বউ আমাদের আদরের জিনিস, না হলে কি আর আমরা এত ঢাকঢোল পিটিয়ে, গুষ্টি-সহকারে এই এক সুখকে ঘরে তুলি!
রাফির কথায় আমান বলল,
___” বউ যে কতটা শান্তির, এটা প্রত্যেকটা পুরুষের কাছে পরিস্কার, বিয়ে না করলে হয়তো আপসোস থেকে যেতো, ইস বিয়ে কেনো করলাম না, আর বিয়ের পর।
আরিশা আমানের কথা জানতে চাইলো,
___” বিয়ের পর কী অশান্তি ?
আনাস আরিশার কথায় বলল,

___” যাক, বিয়ের পর বোনের আমার বুদ্ধি খুলেছে, এতগুলো বউজাতির মধ্যে আমার বোনটাই বুদ্ধিমতী।
মেয়েরা এবার সবাই মিলে ক্ষ্যাপাক্ত বাঘের মতো ক্ষেপে গেলো, কেনো না তারা এতক্ষণে বুঝতে পেয়ে গেছে, ছেলেরা তাদের এতক্ষণ খুব যত্ন যহকারে পচাচ্ছিল, কিন্ত তাদের মধ্যে আদিল খুব মনোমুগ্ধকর চোখে হানিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
___”তোমরা যেই যা বলো, এই দুনিয়ায় আপন বলতে আমি শুধু আমার বউকেই বুঝি, দুঃখ-কষ্ট তো সবার সাথেই শেয়ার করা যায়, কিন্তু কান্নার পর বউ যখন স্বামীকে সামলে জড়িয়ে ধরে বলে কষ্ট পেও না, সব ঠিক হয়ে যাবে, আমি আছি তো তোমার পাশে,এই সামান্য ভরসাটুকুই পাহাড় সমান কষ্টকে হালকা করে দেয়, নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছা করে এই একটা মেয়ের জন্য।
আদিলের কথায় মেয়েদের একটু স্বাভাবিক হতে দেখা গেলোও হাবীব বলে উঠলো,

___” ভাই আমার নতুন, বুঝবা বুঝবা।
আদিল সম্বন্ধির কথায় হাসলো, আশিক বন্ধু কে সায় জানিয়ে বলল,
___” আরে কার পিএ দেখতে হবে না, আমাদের বউ পাগল আজান তালুকদার তাকবীরের পিএ বলে কথা।
আদিল কে ব্যঙ্গ করতে দেখে সন্ধ্যা আদিলের সাপোর্ট টানে বলে উঠলো,
___” হ্যাঁ, আদিল ভাইয়া আর তাকবীর ভাইয়ার মতো হতে হলে তোমাদের আগে কাজুবাদাম খেতে হবে, তবেই না ব্রেনটা কাজের হবে!
মেয়েরা সবাই শব্দ করে হেঁসে উঠলো, ছেলেরা সবাই বেশ অপমান বোধ করলো এবার, তাকবীরের কথা উঠতেই হানিফ বলে উঠলো,
___” বাই দ্য ওয়ে, তাকবীর ব্রো কে দেখছি না, গতকাল মেহেদী অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি, আজকে গায়ে হলুদেও দেখছি না?

হানিফের কথায় আনাস আরাতের দিকে তাকালো, মেয়েটা এই নিয়ে সকাল থেকে মন খারাপ করে আছে, গতকাল বিকালে তাকবীর অফিসের কাজে শহরে চলে গেছে, এতদিন আদিল অফিসে থেকে সবকিছু সামলা তো, আর তাকবীর গ্রামে থেকেই আদিল কে হেল্প করতো, কিন্তু বিয়ের উপলক্ষে আদিল কে পুরোপুরি ছুটি দিয়ে দিয়ে নিজে একা হাতে অফিস সামালাচ্ছে, আনাস আহাদ তালুকদার আদনান তালুকদার তো বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত, তাছাড়া তাকবীর এসব আনুষ্ঠানিক বিয়ে পছন্দ করে না, তাকবীর আগেই পরিবার কে অফার দিয়েছিলো, বিয়েটা সিম্পল ভাবে পড়িয়ে দিতে, কিন্তু রুপোলী বেগম নিজের মেয়ের বিয়ে ধুমধামে দিবেন, তাছাড়া আরশের আম্মু আব্বুর ইচ্ছা, তাঁদের ছেলের বিয়েটা খুব বড় করে দিবে, আরাতের মন খারাপ এতে না, আরাতের মন খারাপ তাকবীর কে নিয়ে, বিয়ের এতগুলো বছর পার হয়ে গেলো, আরাত এত বছরেও তাকবীর কে পরিবর্তন করতে পারেনি, সেই আগের মতো মানুষের থেকে দূরত্ব, ফ্যামিলির সাথে আড্ডা দেয় না, শুধু তাকবীরের মাঝে পরিবর্তন বলতে একটাই এসেছে, আরাত, আরাতের সাথে তাকে হাসতে দেখা যায়, দুষ্টুমি করতে দেখা যায়, আরাতের পাশে বসে মন খুলে কথা বলতে দেখা যায়, আর দেখা যায় মাঝেমধ্যে আনাস আদিল আনহা শেখের সাথে টুকিটাকি কথা বলতে, কিন্তু আজকে আরাতের অভিযোগ, তাকবীর সব ছেলেদের মতো কেনো না, সবাই কত মজা করে, সে কেনো করে না, আনাস তার বুড়ী কে সকাল থেকে লক্ষ করছে, সবার মাঝে হাসিখুশি থাকলেও মেয়েটা তাকবীর কে মিস করছে,
সবার মুখে একি কৌতুহল তাকবীর কোথায়, তাকবীর কে নিয়ে সবার মধ্যে এত কৌতুহল সৃষ্টি হতে দেখে আরাত সবাই কে তাজ্জব করে দিয়ে বসা থেকে উঠে বাড়ির দিকে যেতে যেতে বলল,

___” একটা গান আছে না, বাবা তোমার দরবারে সব পাগলের খেলা, হরেক রকম পাগল দিয়ে মিলাইছে মেলা, তোমরা সবকটা পাগল, শুধুমাত্র আমার উনি ছাড়া, এজন্য সে এখানে নেই।
কেউ বুঝলো না আরাতের হটাৎ রাগের কারণ, আনাস বোনের অভিমান দেখে হাসলো, স্বামীর উপর অকারণে রেগেও থাকবে, আবার স্বামীর জন্য অকারণে সবাই কে রাগও দেখাবে, পরিবেশ টা হটাৎই থম মেরে গেলো, আনাস পরিবেশ টা স্বাভাবিক করতে আশিক হাবীব কে ইশারা দিয়ে কিছু একটা বুঝিয়ে পুনরায় আহিন কে ইশারা করলো, আহিন আনাস এর ইশারা মতো বক্সের কাছে গেলো, পুনরায় ধীরে ধীরে অনুষ্ঠান বক্সের তালে তালে হাসিমজা হৈহল্লারে মেতে উঠলো, বক্সে বেজে উঠলো

“চুমকি চলেছে একা পথে
সঙ্গী হলে দোষ কি তাতে?
রাগ করো না, সুন্দরী গো
রাগলে তোমায় লাগে ভাল..
গানের তালে তালে সবার হাত তালি, চিল্লাচিল্লি তো আছেই, আলভী এবার গানের সাথে নিজেও সুর মিলিয়ে নূরপ্রিয়া আর নূরফিহা দুজনের দিকে তাকিয়ে গাইতে লাগলো,
“চুমকি চলেছে একা পথে
সঙ্গী হলে দোষ কি তাতে
হার মেনেছে দিনের আলো
রাগলে তোমায় লাগে আরো ভালো
সুন্দরী চলেছে একা পথে,
আলভীর তাকানোতে নূরফিহা মাথা নিচু করে নিলো, আর নূরপ্রিয়া দুষ্টু হেসে আলভীর চোখের দিকে চেয়ে রইলো, আলভীর এখনো কনফিউজ, কোনটা কে হতে পারে, তাই দুজনের সামনে এসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে নূরফিহার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে গান গাইতে লাগলো,

”ও টাঙ্গেওয়ালি, হাত করো খালি
চাবুক রেখে আমার হাত ধর, সেই ভালো।
সাথে সাথে আহিন আলভীর সামনে এসে আলভীর হাত ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিয়ে, আলভী জিব্বায় কামড় দিয়ে সরি বলল,আহিন চোখ রাঙিয়ে নূরফিহার হাত ধরে নাচতে নাচতে গাইতে লাগলো,
”একা একা এই পথে চলোনা
আর কারো নজরে পড়োনা
তাহলে যে মরে যাবো আমি,
চুমকি চলেছে একা পথে
সঙ্গী হলে দোষ কি তাতে
হার মেনেছে দিনের আলো
রাগলে তোমায় লাগে আরো ভালো
সুন্দরী চলেছে একা পথে,

গানটা শেষ হওয়ার সাথে সাথে সাউন্ড বক্সে আরেকটা গান বেজে উঠলো, এবার ছেলেরা সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে বক্সের তালে তালে ডান্স করছে,আনাস আদিল আশিক হাবীব রাফি আমান হানিফ কেউ বাদ পড়ে নি, সবাই একসাথে ডান্স করতে লাগলো,
“ইয়াদ রাখনা মেরা কেহনা,
ইয়ে দিল এক দিন মিল জানে হ্যায়
হাম তেরা দিওয়ানে হ্যায়,
হাম আশিক মস্তানে হ্যায়।
ডান্স শেষ হতেই সবাই একসাথে হাততালিতে মাতিয়ে তুললো পরিবেশটা, বিয়ের বাড়ির আনন্দ যেন সবাই কে মাতিয়ে তুললো, ছেলেরা ডান্স করে অনেকেই ক্লান্ত, কে কোথায় বসে পড়েছে ঠিক নেই, আইরা আর হানিয়া দ্রুত তাদের জন্য ঠান্ডা শরবতের ব্যবস্থা করল, এতএত আনন্দের মধ্যে অন্ধকার রাস্তা ভেত করে তাকবীরের মার্সিডিজ এসে থামল উঠানের একপাশে, গাড়ি থেকে ক্লান্ত শরীর নিয়ে নেমে এলো তাকবীর, এসেই চারপাশে বক্সের সাউন্ডে বিরক্ত হলো কিছুটা,উঠানে একনজর চোখ বুলিয়ে শরীরের কালো কোট কনুইয়ের ভাঁজে নিয়ে বাড়ির ভিতরে দিকে পা বাড়ালো, আনাস তাকবীর কে দেখতে পেয়ে পিছু ডেকে উঠলো,

___” ভাইয়া?
তাকবীর জায়গায় দাঁড়িয়ে গেলো, কিন্তু পিছু ফিরলো না, আনাস তাকবীরের দিকে এগিয়ে এসে বলল,
___” ভাইয়া বুড়ী অভিমান করে রুমে চলে গেছে।
তাকবীর ভ্রু কুঁচকালো, পিছনে ফিরে একনজর সবাই কে চোখ বুলিয়ে নিলো, সবার মধ্যে আরাত কে চোখে পরলো না, তাকবীর আনাস এর দিকে তাকাতেই আনাস মুচকি হেসে পুনরায় বলে উঠলো,
___” তুমি নেই অনুষ্ঠানে, এই কারণে রাগ করেছে তোমার উপর, ভাইয়া আমার ছোট বোন টা, কবে তুমি বলতে এত পাগল হয়ে গেলো বলোতো?
আনাস এর কথায় আজ আর তাকবীর কে মুচকি হাসতে দেখা গেলো না, গম্ভীর গলায় বলল,
___” তোর ছোট বোন আমার দুই বাচ্চার মা, সে তো আমি বলতেই পাগল থাকবে।
কথাটা বলে তাকবীর পুনরায় চলে যেতে নিলো, আনাস তাকবীরের সামনে এসে পথ আটকে বলল,
___” ভাইয়া, কী হয়েছে,টেনশন করছো কেন?
তাকবীর আনাস এর মুখের দিকে তাকালো,তাকবীর আনাস কে কিছু না বললেও আনাস কেমন করে যেন সবকিছু বুঝে যায়, আজকে তাকবীর কে সেই আগের মতো লাগছে, অন্য সময় হলে আনাস এর সাথে টুকিটাকি দুষ্টুমি করতো, কিন্তু আজকে তাকবীর কে একটু বেশিই গম্ভীর দেখা যাচ্ছে, আনাস এর প্রশ্নে তাকবীর কেনো ভনিতা ছাড়া সোজাসাপটা বলল,

___” লন্ডনের বিজনেসটা ক্যান্সেল করতে হবে।”
আনাস অবাক গলায় বলল,
___”হোয়াট, বাট হোয়াই?
___” “মিস্টার দীপ্ত চৌধুরী ঝামেলা করছে, আমাদের লন্ডনের অফিস ভেঙে সে শপিং সেন্টার করতে চায়, সে প্রথমে ক্যাশের অফার দিয়েছিল, কিন্তু আমি ইগনোর করি, আজকে সে মিটিং রুমে আমাকে ব্ল্যাকমেল করে।
___” আর তুমি তাকে ছেড়ে দিলে?
___” দীপ্ত চৌধুরীর লন্ডনের বাসিন্দা, সাথে অনেক ক্ষমতাবান,তার সাথে লড়াই করতে হলে কয়েক বছরের জন্য লন্ডনে থাকতে হবে, তবেই তাকে দমানো যাবে, বাট আই অ্যাম নট ইন্টারেস্ট।
___” তাহলে তেমার প্লান কী?
___” আই অ্যাম টায়ার্ড, সকালে কথা হবে।

তাকবীর চলে গেলো, আনাস পুনরায় সবার মাঝে ফিরে এলো, বক্সের গান এখোনো বেজে চলছে, আশিক আলভী কে গান দিতে বলল, আলভী যেতেই কয়েক সেকেন্ডের মাঝেই বক্সে আরেকটা গান বেজে উঠলো, এই ফাগুনি পূর্ণিমার রাতে চল পালায়ে যাই, গানটা, আশিক মায়ার সামনে এসে মায়ার হাত ধরে টেনে নিয়ে এসে বক্সের সাথে সুর মিলাতে মিলাতে নাচতে লাগলো, আর মায়া গানের সাথে সাথে প্রশ্ন করতে লাগলো,

আশিক: যেনো ঢাক আছে আর কাঠি নাই
মায়া : মানে?
আশিক :তোকে ছাড়া আমার হালটা যে তাই
মায়া: তারপর?
আশিক : ভাবুক যা খুশি সবাই
মায়া : সবাই কী ভাববে?
আশিক : আজ ফাগুনি পূর্ণিমার রাতে
মায়া: হুম
আশিক : চল পালায়ে যাই
মায়া : কোথায় যাবো?
এবার আনাস আইরা সাথে ডান্স করতে লাগলো,
আরশ : এই ফাগুনি পূর্ণিমার রাতে
চল পালায়ে যাই
আইরা : আরে বাবা যাবো তা কোথায়?
আরশ : দূর দেশে যাবো রে, বাসা বানাবো রে,
থাকবো দুজন একসাথে
এই ফাগুনি পূর্ণিমার রাতে
চল পালায়ে যাই
আজ ফাগুনি পূর্ণিমার রাতে
চল পালায়ে যাই।
আদিল : বৈশাখী ঝড়েতে আমাদের
ঘরেতেহয়েছিল সেই যে দেখা…
হানিয়া : আচ্ছা?
আদিল : তখন থেকেই যেনো আনমনা মন
আর উঠান লাগে শুধু ব্যাকা
হানিয়া : নাচতে না জাললে উঠান ব্যাকাই লাগে।
আদিল : আমার উঠান লাগে শুধু ব্যাকা
চল পালায়ে যাই,
আজ ফাগুনি পূর্ণিমার রাতে
চল পালায়ে যাই
এইফাগুনি পূর্ণিমার রাতে
চল পালায়ে যাই।
হাবীব : তোর আঁখি দুটো যেন মাতলা নদী,
করেছে আমায় পাগল
সন্ধ্যা : তাইনাকি?
রাফি : তোর সঙ্গ না পেলে সারাদিন কেমন
আনচান আনচান করে মন,
মিরা : বাব্বা এত প্রেম।
রাফি : আমার আনচান আনচান করে মন গো
চল পলায়ে যাই …..
এই ফাগুনি পূর্ণিমা রাতে
চল পলায়ে যাই
এই ফাগুনি পূর্ণিমার রাতে
চল পালায়ে যাই
আজ ফাগুনি পূর্ণিমার রাতে
চল পালায়ে যাই

আহিন আলভী নূরফিহা নূরপ্রিয়া চারজন মিলে ডান্স করতে লাগলো পড়ের লাইনগুলোয়,
কানে দেবো দূল, নাকি নাকছাবি
গলায় দিবো সীতাহার, হাতে দিবো চূড়ি
ভাবতে নাহি পারি আর কি দিবো উপহার
আমি আর কি দিবো উপহার গো
চল পালায়ে যাই
এই ফাগুনি পূর্ণিমার রাতে
চল পালায়ে যাই
আজ ফাগুনি পূর্ণিমার রাতে
চল পালায়ে যাই
একসাথে দুজনে বাগান বানাবো,
করবো গোলাপের চাষ
ছোট্ট দুটি ঘর রইবে সেখানে
করবো দুজনে বাস
জোড়া গোলাপের কলি দিবো গুঁজে
খোপাতে তোর রোজ ভোরে
বাকি যত ফুল বেচবো গিয়ে
হাওড়ার এই ফুলের বাজারে
তোকে জোড়া গোলাপ দিবো ভোরে
চল পলায়ে যাই,

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬৮

এই ফাগুনী পূর্ণিমা রাতে
চল পলায়ে যাই
দূর দেশে যাবো রে
বাসা বানাবো রে
থাকবো দুজনে এক সাথে
এই ফাগুনি পূর্ণিমার রাতে
চল পালায়ে যাই
আজ ফাগুনি পূর্ণিমার রাতে
চল পালায়ে যাই।

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৭০