Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ৮

এই অবেলায় পর্ব ৮

এই অবেলায় পর্ব ৮
সুমনা সাথী

বাড়ির গমগমে আড্ডার মাঝে হঠাৎ ঘরে ঢুকল নিযানা। সে আরশাদ তালুকদারের একমাত্র ছোট বোনের আদরের কন্যা। গত কয়েক মাস আমেরিকায় চাচার বাসায় কাটিয়ে অবশেষে সে ফিরেছে। আর উপলক্ষ্যটা কলরবের বিয়ে। নিযানার মা মানতাসা আগেই দিব্যকে ফোন করে বলেছিলেন নিযানাকে নিয়ে আসতে। নিযানাকে দেখামাত্রই সবাই বেশ খুশি হলো। সে প্রজাপতির মতো চনমনে পায়ে এগিয়ে গিয়ে ইভান, ইহান আর দিয়াকে আদর করলো। বড়দের সবাইকে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করলো। এরপর তার চোখ দুটো স্থির হলো নবনীর ওপর। নবনী কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। নিযানা দিব্যর দিকে তাকিয়ে কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,

‘ভাইয়া, এটা বুঝি আমার নতুন ভাবি?’
দিব্য খুব সংক্ষিপ্তভাবে শুধু মাথা নাড়ল। নিযানার চোখেমুখে মুগ্ধতার আভা। সে খুশিতে ডগমগ হয়ে বলল,
‘ভাবি তো খুব মিষ্টি! একদম পুতুলের মতো। তা আমাকে পরিচয় করিয়ে দেবে না ভাইয়া?’
নবনী আগে কখনো নিযানাকে দেখেনি। তবে এ বাড়ির সবার সাথে মেয়েটার আত্মিক টান আর কথা বলার সাবলীল ভঙ্গি দেখে সে বুঝতে পারল, নিযানা এ পরিবারের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। দিব্য তার স্বভাব সুলভ নিস্পৃহতায় হালকা করে হাসল। বলল,
‘অবশ্যই পরিচয় করাব। তবে তুই চাইলে নিজেও আলাপ জমিয়ে নিতে পারিস। আফটার অল, ইউ আর আ ভেরি নাইস কমিউনিকেটর।’
দিব্যর কথা শুনে নিযানা খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে তার গালের বাঁ পাশের ওপরের গজদন্তটা ঝিলিক দিয়ে উঠল। যা তার সৌন্দর্যে যোগ করেছে এক অন্যরকম মায়াবী আভা। নিযানা সত্যিই ভীষণ সুন্দরী। সে আদুরে গলায় প্রতিবাদ করে বলল,

‘উঁহু, এটা কিন্তু একদম ঠিক না ভাইয়া। আমি যতই কথা বলি না কেনো? বড় ভাই হিসেবে তোমার উচিত আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভাবির সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। নতুন সম্পর্কের শুরুটা রাজকীয় হওয়া চাই তো!’
কাব্য গদগদ হয়ে বলে উঠল, ‘বাব্বাহ! নিযু, তুই এই কয়েক মাসেই কেমন বড় বড় কথা বলতে শিখে গেছিস? কোনো চিন্তা করিস না। তোর কাব্য ভাই থাকতে কোনো সমস্যা নেই। নবনী, শোনো। ও হলো আমাদের একমাত্র ফুপির একমাত্র আদরের মেয়ে নিযানা নওয়াজ চৌধুরী।’
নিযানা ঠোঁটে স্নিগ্ধ এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে নবনীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। খুব নরম গলায় বলল,
‘হ্যালো, আমি নিযানা।’
নবনীও সৌজন্যের হাসি হাসল। নিযানার চনমনে ভাবটা তার ভালো লাগছে। সে প্রত্যুত্তরে বলল,
‘আমি নবনী।’
কাব্য বেশ উৎসাহ নিয়ে বলল, ‘জানো নবনী, আমাদের এই নিযু কিন্তু মারাত্মক ট্যালেন্টেড! গত বছর পুরো বাংলাদেশের বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ওর দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আর ও নিজে হয়েছে শ্রেষ্ঠ বিতার্কিক। শুধু তাই নয়। পড়াশোনাতেও ও একদম একশতে একশ!’

কলরব এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল। এবার একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপাল চাপড়ে বলল,
‘ব্যাস, শুরু হয়ে গেল! কেউ কি তোর কাছে ওর বায়োডাটা জানতে চেয়েছে? কেন অনর্থক ঢাক পেটাচ্ছিস? সারাক্ষণ চোখের ওপর ওই মোটা চশমা এঁটে বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে পড়ে থাকা একটা আস্ত অসামাজিক মেয়ে ও!’
নিযানা কলরবের দিকে ফিরে তাকাল। তার শান্ত চোখের মণি দুটো চশমার কাঁচের আড়ালে চিকচিক করে উঠল। খুব ধীরস্থিরভাবে আঙুল দিয়ে চশমাটা নাকের ওপর সামান্য ঠেলে বসাল সে। তারপর বেশ তাচ্ছিল্যের সুরে জবাব দিল,
‘অসামাজিক হয়েই আমি ঠিক আছি ব্রো। অন্তত তোমার মতো সব পরীক্ষায় ডাব্বা তো আর মারি না!’
নিযানার এই মোক্ষম জবাবে কলরবের মুখটা মুহূর্তেই চুপসে গেল। ড্রয়িংরুমের সবাই আবার হাসিতে ফেটে পড়ল। কাব্য হাত দিয়ে লাইক দেখিয়ে বলল,

‘একদম কারেক্ট বলেছিস। নির্লজ্জ একটা।’
কটমট করে কাব্য আর নিযানার দিকে তাকিয়ে রইল কলরব। যেন মনে মনে ওদের ভস্ম করে দিচ্ছে। কাব্য অবশ্য হেসেই খুন। নিযানাও ঠোঁট টিপে হাসল। অলেখা বলে উঠলেন,
‘অনেক হয়েছে। এবার থাম। রাত অনেক হলো। সবাই তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খেয়ে নে। কাল সকাল সকাল আবার মার্কেটে ছুটতে হবে। বিয়ের শপিং-এর পাহাড় জমে আছে।’
নিযানা এই মুহূর্তটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। সে ঝটপট দিয়াকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। দিয়ার গালে একটা চুমু খেয়ে আদুরে গলায় বলল,
‘দিয়া মাম্মা, তুমি জানো আমি তোমার আর ইহান-ইভানের জন্য আমেরিকা থেকে কত কত চকলেট নিয়ে এসেছি? ইহান, ইভান চলো আমার সাথে! কুহু, তুই আমার ব্যাগটা একটু নিয়ে আয় তো।’
কুহুর সাথে নিযানার সম্পর্কটা একদম সই-বন্ধুর মতো। দুইজন সমবয়সী হওয়ায় ওদের মধ্যে বোঝাপড়াটাও চমৎকার। কুহু মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। নিযানার ভারী ব্যাগটা টেনে নিয়ে ওদের পিছু নিল। যাওয়ার আগে নিযানা দিয়াকে নিয়ে সিড়ি দিয়ে ওঠার সময় মাজহা প্রশ্ন করলেন,

‘তা নিযানা তোর আম্মুরা আসবে কবে রে?’
নিযানা ওপর থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে উত্তর দিল, ‘কালকেই চলে আসবে মামি। আমিই শুধু জেদ করে একদিন আগে চলে এসেছি।’
কথা শেষ করে বাচ্চাদের সাথে নিযানা আর কুহু ওপরে চলে গেল। অলেখা নিযানার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মাজহা পাশে এসে বেশ চাপা গলায় ফিসফিস করে বললেন,
‘যত দেরি করে আসে ততই ভালো।’
অলেখা কৃত্রিম রাগে চোখ রাঙালেন। মাজহা অবশ্য দমবার পাত্র নন। তিনি শব্দহীন হাসলেন। দুই জা এরপর হাসাহাসি করতে করতেই রাতের খাবারের তদারকি করতে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালেন।

রাতের নিস্তব্ধতা তখন পুরো তালুকদার বাড়িকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। খাওয়া-দাওয়া শেষে সবাই নিজের নিজের ক্লান্তি নিয়ে ঘরে ফিরেছে। নবনী আসার আগেই দিব্য দিয়াকে নিয়ে ঘরে ঢুকে গিয়েছিল। নবনী যখন ধীর পায়ে ঘরে পা রাখল। ঠিক তখনই সোফায় বসা মানুষটার দিকে নজর পড়তেই তার পিলে চমকে উঠল। মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো সে কোনো ভুতুড়ে কাণ্ড দেখছে! দিব্য আয়েশ করে সোফায় হেলান দিয়ে ল্যাপটপে কাজ করছে কিন্তু চমকানোর মূল কারণ হলো তার মুখে সেঁটে থাকা একটি সাদা রঙের ‘শিট মাস্ক’। সচরাচর গম্ভীর আর ব্যক্তিত্ববান এই মানুষটাকে এমন অদ্ভুত রূপে দেখে নবনীর চোখ বিস্ময়ে চড়কগাছ হয়ে গেল। সে ভাবতেও পারেনি যে দিব্যর মতো একজন রাশভারী মানুষ রূপচর্চার বিষয়ে এতটা সচেতন হতে পারে! দিব্য হয়তো নবনীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অনুভব করতে পারল। সে ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই অবলীলায় প্রশ্ন করল,

‘কী হয়েছে? কোনো সমস্যা? এভাবে কী দেখছ তুমি?’
নবনীর ঘোর কাটল। সে অপ্রস্তুত হয়ে বোকার মতো দুপাশে মাথা নেড়ে না বলল। দিব্য পুনরায় কাজে ডুবে গেল। নবনী ঘরে প্রবেশ করে খেয়াল করল দিয়া বিছানায় নেই। সে জানত না যে দিয়া নিযানার সাথে। তাই কিছুটা উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘আচ্ছা শুনুন, দিয়া কোথায়?’
দিব্য এবার মুখ তুলে তাকাল। মাস্কের ফাঁক দিয়ে তার চোখদুটো আগের মতোই প্রখর লাগছে। সে বলল,
‘ও নিযানার সাথে আছে। নিযানা ইভান ওরা সবাই একসাথে খেলা করছে। তুমি বরং ওকে গিয়ে নিয়ে এসো।’
নবনী মাথা নেড়ে সায় দিল। কিন্তু কৌতূহল দমিয়ে রাখতে পারলো না। দরজার দিকে পা বাড়িয়েও সে থমকে দাঁড়িয়ে না চাইতেই জিজ্ঞেস করে ফেলল,
‘আপনি মুখে এসব কী লাগিয়েছেন?’
দিব্য খুব নির্লিপ্ত স্বরে জবাব দিল, ‘শিট মাস্ক।’

নবনীর এবার হাসবে না কি অবাক হবে তা বুঝে উঠতে পারছে না। এই লোকটা কি সত্যিই দিব্য তালুকদার? বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটছেই না। সে দরজার পাল্লা ধরে কিছুক্ষণ ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। নিজেকে সামলে নিয়ে একটু কৌতুক মেশানো স্বরে বলল,
‘সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু আপনি কেন লাগিয়েছেন? না মানে, আমি সচরাচর আমার বান্ধবীদের এসব লাগাতে দেখেছি। কোনো ছেলেকে তো দেখিনি।’
দিব্য ল্যাপটপে কী একটা মেইল চেক করতে করতে খুব স্বাভাবিক গলায় জবাব দিল,
‘এটা ছেলে-মেয়ে উভয়ই লাগাতে পারে নবনী। রূপচর্চা কেবল মেয়েদের একচেটিয়া অধিকার; এটা তোমাকে কে বলল? ছেলেদেরও পরিপাটি আর উজ্জ্বল থাকা জরুরি। আর কয়েকদিন পরেই কলরবের বিয়ে।’
নবনী মুখ ফস্কে বলেই ফেলল, ‘বিয়ে তো কলরব ভাইয়ার, আপনার তো নয়!’
দিব্য এবার ল্যাপটপটা সামান্য নামিয়ে নবনীর দিকে সরাসরি তাকাল। মাথা নেড়ে বলল,
‘বিয়ে যারই হোক। সৌন্দর্য বা পরিচ্ছন্নতা খুবই দরকারি একটা জিনিস। যদিও তুমি প্রাকৃতিকভাবেই সুন্দর। তবুও বলে রাখি এসব মাস্ক ‘রিঙ্কেল’ দূর করে। মানে অকালে বুড়ো হওয়া থেকে কিছুটা বাঁচায় আর কী! চাইলে তুমিও একটা ট্রাই করতে পারো। আমার কাছে বিভিন্ন ফ্লেভারের প্রচুর আছে।’
নবনী যেন আকাশ থেকে পড়ল। লোকটা কিনা রিঙ্কেল আর বুড়ো হওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা করছে! সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

‘কেন, আপনি কি বুড়ো?’
দিব্য একটা লম্বা শ্বাস ফেলে মাস্কটা ঠিক করে চেপে বসাল। তারপর বেশ গম্ভীর মুখে বলল,
‘হতে তো চলেছিই। অলমোস্ট থার্টি থ্রি ইয়ারস ওল্ড। এই বয়সে স্কিনের যত্ন না নিলে দিয়া যখন বড় হবে তখন লোকে আমাকে ওর বাবা না ভেবে দাদা ভাবলে তো সমস্যা। আমার ইমেজের বারোটা বেজে যাবে!’
নবনীর শব্দ করে হাসতে ইচ্ছে করছে। খুব হাসি পেলেও সে নিজেকে শক্ত করে সামলে নিল। দিব্যর কথা বলার ঢং এতই স্বাভাবিক আর গুরুত্বে ভরপুর যে এই মুহূর্তে হাসলে লোকটা হয়তো অপমানিত বোধ করতে পারে। নবনী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
‘মানুষের মনের সৌন্দর্যটাই আসল। ওটা যদি কুৎসিত হয়, তবে বাইরের সৌন্দর্য দিয়ে আসলে কোনো কাজ হয় না। ওটা মূল্যহীন।’

কথাটা বলে নবনী লক্ষ্য করল দিব্য তার ল্যাপটপটা একপাশে সরিয়ে রাখল। তারপর নবনীর দিকে এমনভাবে একদৃষ্টিতে চাইল যেন সে খুব গভীর কোনো বৈজ্ঞানিক সূত্র বিশ্লেষণ করছে। হঠাৎ করেই দিব্য নিজের মুখ থেকে সাদা মাস্কটা টান দিয়ে খুলে ফেলল। ওর এই অতর্কিত আচরণে নবনী ভেতরে ভেতরে একটু কুঁকড়ে গেল। মনে মনে ভাবল সে কি ভুল কিছু বলে ফেলল? লোকটা কি তার ‘মনের সৌন্দর্য’ মার্কা তত্ত্বে রেগে গেল? তবে দিব্য মোটেও রাগল না। বরং অত্যন্ত ধীরস্থির আর শীতল কণ্ঠে বলল,
‘অবশ্যই মনের সৌন্দর্য আসল। আমি অস্বীকার করছি না। তবে বাহ্যিক সৌন্দর্যেরও দরকার আছে। যথেষ্ট দরকার আছে নবনী। বাস্তব জগতটা একটু অন্যরকম। তুমি সুন্দর হলে না চাইতেও সবার এটেনশন পাবে। সব জায়গায় দেখবে আলাদা একটা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছ। এমনকি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস; একটা লয়াল লাইফ পার্টনার পাওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। আর যদি লয়াল না-ও হয় তবে দেখবে সে তোমার সৌন্দর্যে মজে অন্তত তোমার প্রতি অনুগত হয়ে গেছে। আর তুমি যে বলছ ‘মনের সৌন্দর্য’ ওটা আসলে একটা বড়সড় সান্ত্বনা পুরস্কার ছাড়া আর কিছুই নয়।’

নবনীর চোখের পলক থমকে গেল। দিব্যর এই নির্মম বাস্তববাদী চিন্তা তাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। লোকটা কত অবলীলায় সৌন্দর্যের সাথে আনুগত্য বা ভালোবাসার সমীকরণ মিলিয়ে দিল! নবনী বুঝতে পারল না দিব্য কি তাকে ঘুরিয়ে কোনো ইঙ্গিত দিল। নাকি এটা তার জীবন নিয়ে নিজস্ব কোনো দর্শন? নবনীর মনে পড়লো একসময় সে ও তো দিব্যর সৌন্দর্য নিয়ে বলেছিলো। তখন তো মনের সৌন্দর্যের কথা তার মাথায় আসেনি৷ নবনী আর দাঁড়াতে পারলো না সেখানে। টান পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

ইভানের হাতে চকলেট অথচ সে চুপচাপ বসে আছে। দৃশ্যটা দেখে ইহান অবাক না হয়ে পারল না। ভ্রু কুঁচকে সে প্রশ্ন করল,
‘কিরে ইভান, তুই চকলেট খাচ্ছিস না কেন?’
ইভান খুব বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে স্বাভাবিক স্বরে জবাব দিল,
‘বেশি চকলেট খেলে দাঁতে পোকা হয়। আর সেই পোকাগুলো খুব পাজি হয়। আমাদের স্কুলের রোহিতের দাঁতে পোকা আছে। ও তো যন্ত্রণায় মাঝে মাঝেই চিৎকার করে কাঁদে।’
এতটুকু বাচ্চার মুখে এমন জ্ঞানসম্পন্ন কথা শুনে নিযানা হাসলো। ইভান যে একেবারেই চকলেট খায়নি তা নয় তবে নিজের একটা সীমা সে নিজেই ঠিক করে রেখেছে। এই বোধটুকু দেখে নিযানা মুগ্ধ নয়নে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। এদিকে ইভানের কথা শুনে ইহান যেন এক গভীর ভাবনায় পড়ে গেল। কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে সে পালটা প্রশ্ন করল,

‘আচ্ছা ইভান, ওর দাঁতে যদি পোকা থাকেই তবে সেটা খাবারের সাথে পেটে চলে যায় না কেন? যদি একবার পেটে ঢুকে যায়। তবে তো সাংঘাতিক কাণ্ড হবে!’
পাশ থেকে দিয়া ওর চোখ দুটো বড় করে আতঙ্কিত গলায় বলল,
‘ঠিক বলেছিস! পোকা যদি পেটে চলে যায় তবে তো ও দাঁতের মতো পেটের নাড়িভুঁড়ি সব খেয়ে ফেলবে! তাইনা?’
ভাই-বোনের এমন আজব আর অদ্ভুত যুক্তিতে ইভান বেশ বিরক্ত হলো। একরাশ বিরক্তি নিয়ে সে বলল,
‘তোরা না ভীষণ বোকা! কিছুই জানিস না। ফুপি, আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। আমি কি এখন ঘরে যেতে পারি?’
নিযানা মাথা নেড়ে আদুরে স্বরে বলল, ‘অবশ্যই সোনা। যাও। গুড নাইট।’
ইভান খাট থেকে নামতেই ইহানও তার পিছু নিল। ছোট ছোট পায়ে ওরা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই দরজায় দেখা মিলল নবনীর। মুখে তার স্নিগ্ধ হাসি। ঘরের ভেতরে পা রেখে মৃদু স্বরে সে বলল,
‘তোমাদের খেলা শেষ? এবার তবে ঘরে যাওয়া যাক। রাত তো অনেক হলো। এবার না ঘুমালে চলবে? ফুপিকেও তো একটু বিশ্রাম নিতে দিতে হবে তাই না? আমি ওকে নিয়ে যাই?’
নিযানা মৃদু হেঁসে মাথা নাড়লো। নবনী এগিয়ে এসে বিছানা থেকে দিয়াকে কোলে তুলে নিল। তাদের ঘরে পা রাখতেই। মুহূর্তে দিয়া তার ছোট্ট মুঠোর ধরা দুটো চকলেট নবনীর হাতে বাড়িয়ে দিল। নবনী কিছুটা অবাক হয়েই প্রশ্ন করল,

‘এটা কি! এগুলো আমাকে কেনো দিচ্ছো?’
দিয়া চকলেট দুটো দিয়ে বলল, ‘উঁহু, আগে আমাকে নিচে নামাও মাম্মা।’
নবনী আলতো করে দিয়াকে নরম বিছানার ওপর দাঁড় করিয়ে দিল। অল্প দুরুত্বে সোফায় বসে থাকা দিব্য একবার আড়চোখে ঘুরে তাকাল। দিয়া তখন খুব গম্ভীর মুখে বলল,
‘ওগুলো রেখে দাও। আমি পরে খেয়ে নেব। ইভান বলেছে বেশি চকলেট খেলে না কি দাঁতে পোকা হয়! আর সেই পোকা যদি খাবারের সাথে পেটের ভেতরে ঢুকে পড়ে, তবে তো আরও মুশকিল হয়ে যাবে। তাই না মাম্মা?’
মেয়ের এমন অদ্ভুত যৌক্তিক ভয় দেখে নবনী হেসেই ফেলল। বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে সে সায় দিল,
‘হ্যাঁ মা, অবশ্যই! ইভান তো একদম ঠিক কথা বলেছে। আর আমার দিয়া মা-টাও খুব বুঝদার হয়েছে দেখছি। আচ্ছা ঠিক আছে। আমি এগুলো ড্রয়ারে সাবধানে রেখে দিচ্ছি। তুমি এবার চুপচাপ শুয়ে পড়ো তো দেখি।’
নবনী কিছুটা তাড়াহুড়ো করে পা বাড়াতে গিয়েছিল কিন্তু ঘটলো বিপত্তি। ওর শাড়ির কুচিটা পায়ের সাথে জড়িয়ে গেল। ভারসাম্য সামলানোর আগেই কুচিটা খুলে গিয়ে পায়ে আরও আষ্টেপৃষ্ঠে বিঁধে যায়। নবনী যখন নিজেকে সামলাতে না পেরে সোজা উপুড় হয়ে পড়ে যাচ্ছিল ঠিক সেই মুহূর্তে দিব্যর শক্ত একটা হাত ওর কবজি ধরে নিজের দিকে সজোরে টান দিল।

পরমুহূর্তেই নবনী নিজেকে আবিষ্কার করল দিব্যর নিবিড় আশ্রয়ে। ওর কোলের ওপর। আকস্মিক আতঙ্কে নবনী দিব্যর বুকের কাছের শার্টটা খামচে ধরে চোখ দুটো শক্ত করে বুঁজে রইল। ওর হৃৎপিণ্ডটা আতঙ্কে প্রচন্ড বেগে ছুটছে। পাঁজরের দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসবে যেন। ধীরে ধীরে চোখ মেলতেই দেখল ঠিক নিশ্বাসের দূরত্বে দিব্যর মুখ। ওর গভীর, তীক্ষ্ণ চোখ দুটো অপলক চেয়ে আছে নবনীর দিকে। নবনীর ওষ্ঠাধর মৃদু কাঁপছে। এলোমেলো অবাধ্য চুলগুলো মুখের ওপর এসে অগোছালো সৌন্দর্য তৈরি করেছে। দিব্য অতি সন্তর্পণে একটি হাত বাড়িয়ে নবনীর কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো কানের লতির পাশে গুঁজে দিল। সেই স্পর্শে নবনী আবারও শিউরে উঠলো মুহুর্তে। আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলল। পরক্ষণেই পুনরায় চোখ মেললে দিব্যর গভীর দৃষ্টিতে ওর চোখ আটকে গেল। পরপর ভেসে এলো দিব্যর গম্ভীর কণ্ঠ স্বর,

এই অবেলায় পর্ব ৭

‘আমাকে কি আরও একটা বাচ্চা পালতে হবে? ভেবেছিলাম তোমাকে বিয়ে করলে আমার জীবনের চাপ কিছুটা কমবে কিন্তু দেখছি উল্টোটা হচ্ছে। যদি শাড়ি সামলাতেই না পারো তবে পরার দরকার কী? যখনই দেখি, তখনই কোনো না কোনো সমস্যা ঘটিয়ে বসে থাকো। সেদিনও তো…!’
কথাটা শেষ না করেই থেমে গেল দিব্য। নবনী লজ্জায় আড়ষ্টতায় যেন মাটির সাথে মিশে যাচ্ছিল। দিব্যর বুকের খুব কাছে ওর মাথা থাকায় স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল ওর হৃদস্পন্দন। নবনী কৌতূহলী চোখে মুখ তুলে তাকাতেই দেখল দিব্যর চোখেমুখে এক অদ্ভুত সংকোচ।

এই অবেলায় পর্ব ৯