Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ২৪

এই অবেলায় পর্ব ২৪

এই অবেলায় পর্ব ২৪
সুমনা সাথী

এক ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখে চিৎকার করে জেগে বসল নবনী। পাশে শুয়ে থাকা দিব্যর ঘুম মুহূর্তেই ছুটে গেল। সে তড়িঘড়ি করে উঠে বসে নবনীর কাঁধে হাত রেখে শুধাল,
‘নবনী? কী হয়েছে তোমার?’
নবনীর বুকটা ধড়ফড় করছে। সে দ্রুত আর তপ্ত শ্বাস ফেলছে। দিব্য ওর শরীরের তীব্র কম্পন স্পষ্ট অনুভব করতে পারল। বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে মাত্র। দিব্য উঠে গিয়ে ঘরের আলোটা জ্বেলে দিল। এক গ্লাস পানি নবনীর দিকে বাড়িয়ে ধরল। নবনী একবার ম্লান মুখে দিব্যর দিকে তাকিয়ে গ্লাসটা নিল। এক নিশ্বাসে সবটুকু পানি পান করল। দিব্য নবনীর মুখোমুখি বসে কোমল গলায় বলল,

‘খুব বাজে কোনো স্বপ্ন দেখেছ?’
নবনী নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সায় দিল। দিব্যর কপালে সূক্ষ্ম চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে কিছুটা নির্লিপ্ত গলায় বলল,
‘যদি তোমার হার্ট এতটায় দুর্বল হবে; তবে কাল সাহস করে ওখানে যাওয়ার কী দরকার ছিল? বাড়ির আর কোনো মেয়ে কি সেখানে গিয়েছিল?’
দিব্যর প্রশ্নটা নবনীর কানে তীরের মতো বিঁধল। সে অত্যন্ত উত্তেজিত গলায় বলল,
‘কারণ ওই জ্বলন্ত আগুনের মাঝে মৌনিতা বা বাড়ির অন্য কোনো মেয়ের স্বামী আটকা পড়ে ছিল না! তাদের কিসের ভয় হতো? তারা কেনই বা যেতে যাবে?’
দিব্য স্তম্ভিত হয়ে গেল। সে দেখল নবনীর দুচোখ বেয়ে অশ্রুর ধারা নেমেছে। আশ্চর্য! সে কি এমন কিছু বলেছে যে মেয়েটাকে এভাবে কাঁদতে হবে? নবনী রাগে আর অভিমানে নিজের চোখের পানি মুছে ফেলল। দিব্য তালুকদারের মতো একজন মানুষ এতটা নির্বোধ হয় কী করে? নিশ্চয়ই ওই আগুনের ধোঁয়ায় আর উত্তাপে লোকটার কাণ্ডজ্ঞান লোপ পেয়েছে! প্রচণ্ড অভিমানে নবনী বিছানা ছেড়ে চলে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু সে পা বাড়ানোর আগেই দিব্য বিদ্যুৎবেগে ওর হাতটা চেপে ধরল। দিব্যও তখন নবনীর সাথে উঠে দাঁড়িয়েছে। না চাইতেও নবনীকে থমকে দাঁড়াতে হলো। দিব্য ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বিভ্রান্ত গলায় বলল,
‘সমস্যাটা কী তোমার? হঠাৎ কাঁদছই বা কেন আর এমন অদ্ভুত আচরণই বা করছ কেন? আমরা কথা বলছিলাম, তার মাঝখানে তুমি আমাকে এভাবে উপেক্ষা করে চলে যেতে পারো না। জবাব দাও নবনী। কী এমন স্বপ্ন দেখেছ তুমি?’

নবনীর মেজাজ যেন এক নিমেষে সপ্তমে চড়ল। এই লোকটার সমস্যাটা ঠিক কোথায়? নিজের আকাশচুম্বী অহংকারটা কি দুই মিনিটের জন্য পাশে সরিয়ে রেখে সে কিছুই ভাবতে পারে না? এক মানুষের ভেতরে এতগুলো রূপের সহাবস্থান কীভাবে সম্ভব! নবনী নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা করে বলল,
‘আমি নামাজ পড়তে চাই। আমায় যেতে দিন।’
কথাটা বলার পরক্ষণেই নবনীর মনে হলো সে অত্যন্ত অযৌক্তিক একটা অযুহাত দাঁড় করিয়েছে। বাইরের পৃথিবীটা এখন স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে। ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় চারিদিক উদ্ভাসিত। নামাজের ওয়াক্ত সম্ভবত পার হয়ে গেছে। ভাবনার জালে জড়িয়ে থাকতেই সে নিজের হাতে এক প্রবল টান অনুভব করল। দিব্য এক হেঁচকা টানে ওকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করাল। ওর তীক্ষ্ণ ও স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো নবনীর পানে। নবনী বরাবরের মতোই এখানে বড় অসহায়; ওই চাউনির দিকে সরাসরি তাকিয়ে থাকার সাহস ওর নেই। সে চোরের মতো মাথা নিচু করে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। দিব্য গম্ভীর গলায় বলল,
‘মিথ্যা বলাটাও একটা শিল্প নবনী। তবে সেই মিথ্যাটা কতটুকু টিকবে, তা নির্ভর করে সামনের মানুষটা কে তার ওপর। আমাকে চিনতে তোমার আর কতদিন সময় লাগবে?’
নবনী এক পলক তাকিয়েই দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ক্ষীণ স্বরে বলল,

‘দেখুন…!’
‘দেখছি তো। দেখার মতো যথেষ্ট সাহস আমার আছে। ওসব কথা বাদ দাও। এখন আসল কথাটা বলো। তুমি কি কোনো বিশেষ কারণে আমার ওপর রেগে আছো?’
নবনী আকাশ থেকে পড়ল। সে তো রাগ করেনি। কেবল প্রচণ্ড বিরক্ত হয়েছে। অভিমান করেছে। আর যদি মনের কোণে রাগ জমেও থাকে তবে তার কারণ সে নিজেও ঠিক জানে না। কিন্তু সামনের এই মানুষটা নাছোড়বান্দা; উত্তর না নিয়ে যে সে আজ ছাড়বে না। তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। নবনী মিনমিন করে বলল,
‘কই, না তো! আপনার ওপর হুট করে রাগ করতে যাব কেন?’
দিব্যর মনে হলো নবনী সম্ভবত তার পড়াশোনা বন্ধ হওয়া আর নিযানার জন্য করা নিয়মের শিথিলতা নিয়ে ক্ষুব্ধ। সে মনে মনে চাইল নবনী যেন বিষয়টা সহজভাবে গ্রহণ করে। তাই শান্ত গলায় বুঝিয়ে বলল,
‘দেখো নবনী, যদি নিযানার পড়াশোনা নিয়ে তোমার মনে কোনো ক্ষোভ থেকে থাকে; তবে তুমি নিজেও জানো ওর পরিস্থিতিটা একটু ভিন্ন। আমি পড়াশোনার বিরোধী নই কিন্তু আমাদের বাড়ির এই নিয়মটা বহু বছরের পুরনো। বিয়ের আগেই কি তোমাকে এ বিষয়ে স্পষ্ট করে জানানো হয়নি?’

নবনী বিস্ময় নিয়ে দিব্যর দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষটা কোথাকার কথা কোথায় নিয়ে গেল! দিব্যর কথার ইঙ্গিত বুঝতে নবনীর বাকি নেই ঠিকই কিন্তু সে তো এমন কিছু ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। দিব্য পুনরায় বলতে শুরু করল,
‘তুমি যদি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাও আমি তোমাকে বাধা দেব না। তবে যদি আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছার কথা বলো; তবে আমি চাইব তুমি এখন যেভাবে দিয়াকে সময় দিচ্ছ, সেভাবেই ওকে আগলে রাখো। তোমার কাছে সত্যিটা বলতে দ্বিধা নেই। আমার আম্মু আমাকে কলরব বা কুহুর মতো অতটা পছন্দ করেন না। কিন্তু আমি আমার মাকে খুব ভালোবাসি। আর আমি কখনো তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেতে পারব না। আমি চাইব তুমিও যেন তেমন কিছু না করো। তবে ওই যে বললাম, তোমার যদি একান্ত ইচ্ছা থাকে। তবে তোমার পূর্ণ স্বাধীনতা আছে। আমি সেখানে বাঁধা হয়ে দাঁড়াব না।’
নবনীর কানে বাকি কথাগুলো আর পৌঁছাল না। সে কেবল দিব্যর একটি বাক্যে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। অলেখা কেন তার নিজের সন্তানকে পছন্দ করেন না? নবনী হতভম্ব হয়ে প্রশ্ন করল,
‘উনি আপনাকে কেন পছন্দ করেন না? উনি কি আপনার নিজের মা নন?’
নবনীর মনে একরাশ বিস্ময় আর কৌতূহল উঁকি দিল। যা আগের মুহূর্তের সব অভিমানকে এক মুহুর্তে ফিকে করে দিল। দিব্যর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো। নবনীর মনের সংশয়টুকু সে আঁচ করতে পেরেছে। সে আলতো করে এক হাতে নবনীর কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। অপর হাতের তালু নবনীর বাঁ গালে রেখে তার মুখটা সামান্য উঁচু করে সরাসরি চোখের দিকে তাকাল। নবনীর সর্বাঙ্গে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দনের শব্দ যেন নিজের কানেই শুনতে পেল সে।চোখের পাতাদুটো অবাধ্য হয়ে বারবার কেঁপে উঠছে। দিব্য নিচুস্বরে বলল,

‘আস্তে কথা বলো নবনী। দিয়া জেগে যাবে তো। উনি আমার জন্মদাত্রী মা। এটা সত্য। তবে… তুমি আমাকে ঠিক যে কারণে একসময় পছন্দ করতে না; উনিও ঠিক একই কারণে আমায় খুব একটা পছন্দ করেন না।’
নবনী আড়ষ্ট হয়ে গেল। সেই দিনগুলোতে সে তো সত্যিই ছোট ছিল; অবুঝ মনে তখন মানুষের বাহ্যিক রূপটাই ছিল সব। আজ এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে নিজের সেই পুরনো মানসিকতার কথা ভেবে সে প্রচণ্ড লজ্জাবোধ করল। মনে মনে ভাবল। এই একটি কথা নিয়ে লোকটা আর কতদিন তাকে খোটা দেবে! কিন্তু পরক্ষণেই এক গভীর বিস্ময় তাকে গ্রাস করল। সে না হয় বাইরের মানুষ ছিল কিন্তু অলেখা তো দিব্যর মা! মা হয়ে নিজের সন্তানকে গায়ের রঙের কারণে অপছন্দ করা কি আদৌ সম্ভব? নবনী কিছু বলতে গিয়েও কথা হারিয়ে ফেলল। নিজেকে সামলে নিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
‘দেখুন, তখন আমি সত্যিই ছোট ছিলাম। অত কিছু বুঝতাম না।’
দিব্য মনে মনে বেশ কৌতুক বোধ করল। লজ্জায় নবনীর ফরসা মুখটা এখন ডালিমের ন্যায় লাল হয়ে উঠেছে। আড়ষ্টতায় সে যেন নিজের ভেতরেই কুঁকড়ে যাচ্ছে। দিব্য মুখভঙ্গি কৃত্রিম গম্ভীর রেখে বলল,
‘তাই নাকি? ছোট মানুষের যে এত কিছু বুঝতে নেই, সেটা কি জানতে না?’
নবনী এক মহাসংকটে পড়ল। লোকটার সাথে কথায় জেতা ভার! প্রসঙ্গ ঘোরাতে সে দ্রুত বলল,
‘কিন্তু উনি তো আপনার নিজের মা…!’

দিব্য মাথা নেড়ে সায় দিল। ‘আম্মুকে তো দেখেছ। অসম্ভব সুন্দরী ছিলেন তিনি। এখনো অবশ্য সেই শ্রী অটুট আছে। খুব অল্প বয়সে আমার আব্বুর সাথে ওনার বিয়ে হয়েছিল। আব্বুর গায়ের রং একদম আমার মতো। তুমি হয়তো জানো না, আমার একজন যমজ ভাই ছিল। নাম দুর্জ। ওর গায়ের রং ছিল ঠিক আম্মুর মতো দুধে-আলতা। আর আমি হয়েছিলাম আব্বুর প্রতিচ্ছবি। আম্মু কিশোরী ছিলেন বলেই হয়তো, ওই বয়সে আমাকে ওনার খুব একটা পছন্দ হতো না। তবে খুব অবহেলা যে করতেন তা নয়। আমার শৈশবের বেশিরভাগ সময় কাটত আমাদের বাড়ির কাজের লোক অমেলা আন্টির কাছে। সময়ের সাথে সাথে ওনার আচরণের পরিবর্তন এসেছে ঠিকই কিন্তু সেই ক্ষতগুলো আমি ভুলতে পারিনি। আম্মু বলেন, তিনি দুই ছেলেকে একসাথে সামলাতে পারতেন না বলেই আমাকে অমেলা আন্টির কাছে রাখতেন। কিন্তু আমি কোনোদিন তা মন থেকে মানতে পারিনি। বড় হওয়ার সাথে সাথে আমি নিজেই দূরত্ব বাড়িয়ে নিয়েছি। তবে আমি আমার মাকে আজও খুব ভালোবাসি।’
নবনীর কাছে পুরো বিষয়টি অবিশ্বাস্য এক রূপকথার মতো মনে হলো। দিব্যর যমজ ভাই ছিল! সে বিস্ময়াভিভূত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘তাহলে উনি এখন কোথায়? মানে আপনার সেই যমজ ভাই। কী যেন নাম বললেন?’
দিব্যর মুখাবয়ব মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে উঠল। সুদূর অতীতে হারিয়ে যাওয়া কোনো এক ধূসর স্মৃতির দিকে চেয়ে সে ম্লান স্বরে বলল,

‘দুর্জ! আমাদের বয়স যখন মাত্র সাত তখন একটা ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ও আমাদের ছেড়ে চলে যায়। আজ কতগুলো বছর পার হয়ে গেল অথচ আমার মনে হয় এই তো সেদিনকার কথা। জানো নবনী, ছোটবেলায় আমি ওকে খুব হিংসা করতাম। কিন্তু ও চলে যাওয়ার পর আমি বুঝেছিলাম, আমি ওকে কতটা ভালোবাসি।’
বলতে বলতে দিব্যর দুচোখ কানায় কানায় ভরে উঠল। এই কঠিন মানুষটির চোখে আজ শ্রাবণের মেঘ। নবনীর সামনে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করাটা তার ব্যক্তিত্বে হয়তো সাজে না। কিন্তু এই একটি প্রসঙ্গে এলে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। দিব্য প্রাণপণ চেষ্টা করল নিজের আর্দ্র চোখদুটো আড়াল করতে কিন্তু নবনীর সন্ধানী দৃষ্টি এড়ানো সম্ভব হলো না। যে লোকটা তীক্ষ্ণ চাহনিতে বিদ্ধ করে আজ সে-ই দিশেহারা হয়ে চোখের দৃষ্টি সরিয়ে নিচ্ছে। নবনী বুঝতে পারল। দিব্য তালুকদার নামের এই দুর্ভেদ্য দেয়ালটার আড়ালে যে মানুষটি বাস করে; তাকে হয়তো আজ অবধি আর কেউ এভাবে ভাঙা অবস্থায় দেখেনি। নবনীর মনে হলো, এক জীবনে এই অহংকারী লোকটার যা কিছু থাক না কেনো, একবিন্দু নিখাদ ভালোবাসার বড্ড অভাব। সে ভালোবাসার কাঙাল অথচ তার পৌরুষ তাকে সেটা স্বীকার করতে দেয় না। দিব্য যখন নবনীকে ছেড়ে দূরে সরে যেতে চাইল নবনী তখন নিজের পায়ের পাতায় ভর দিয়ে খানিকটা উঁচু হলো। দুই হাতে সজোরে জড়িয়ে ধরল দিব্যর গলা। দিব্যর মাথাটা টেনে নিয়ে নিজের কাঁধে ঠাঁই দিল সে। দিব্য মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে থমকে দাঁড়াল। নবনী তার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ঠিক যেমন করে মা তার অবুঝ সন্তানকে শান্ত করে। অদ্ভুত এক প্রশান্তি দিব্যর সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। সে নিজেও আর নিজেকে সংবরণ করতে পারল না; আরও নিবিড়ভাবে নবনীকে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করল। দিব্যর তপ্ত অশ্রুতে নবনীর কাঁধ ভিজে একাকার হয়ে গেল। নবনী অনুভব করতে পারল, এই বিশাল মানুষটার ভেতরে গুমরে মরা বহু বছরের জমানো কষ্টগুলো আজ শ্রাবণের ধারার মতো ঝরে পড়ছে।

ঘুমের ঘোরেই একটা কর্কশ গালি কানে আসতেই ধড়ফড় করে চোখ মেলল নিযানা। সকালেই এমন কুরুচিপূর্ণ শব্দের উৎস খুঁজতে গিয়ে তার নজর পড়ল আয়নার সামনে। সেখানে দাঁড়িয়ে দিব্যি চুল ব্রাশ করছে কলরব। কানে ফোন ধরা। কার সাথে যেন বেশ চড়া গলায় কথা বলছে সে। সকাল সকাল বেশ পরিপাটি আর ফিটফাট হয়ে তৈরি সে; দেখলেই বোঝা যায় কোথাও বেরোনোর তাড়া আছে। নিযানা বিছানায় উঠে বসল। মাথাটা এখনো কিছুটা ভার ভার ঠেকলেও শরীরের তপ্ত ভাবটা নেই। জ্বরটা বোধহয় রাতের ওষুধে নেমে গেছে। হঠাৎ একটা চিন্তা মস্তিষ্কে বিদ্যুৎচমকের মতো খেলে যেতেই নিযানা চমকে উঠল। সে দ্রুত খাট থেকে নেমে ধীর পায়ে গিয়ে কলরবের ঠিক পেছনে দাঁড়াল। আয়নার প্রতিবিম্বে নিযানাকে লক্ষ করল কলরব। ভ্রু কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে সে ঘুরে দাঁড়াল। নিযানার তীক্ষ্ণ চাউনির মুখোমুখি হয়ে কর্কশ স্বরে বলল,
‘কী? সকাল সকাল ওভাবে কী দেখছিস? মনে হচ্ছে চোখ দিয়ে একদম গিলে ফেলবি!’
নিযানার বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে এলেও সে নিজেকে সংযত রাখল। অত্যন্ত শান্ত গলায় প্রশ্ন করল,
‘তুমি কাল রাতে ঘরে ঢুকলে কীভাবে? আমার খুব স্পষ্ট মনে আছে। আমি নিজের হাতে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করেছিলাম।’

কলরব মুহূর্তের জন্য থতমত খেয়ে গেল। কী মুসিবত! মেয়েটার স্মৃতিশক্তি মারাত্মক। ঠিক মনে পড়েগেছে। পরক্ষণেই এক চিলতে কৃত্রিম হাসি টেনে স্বাভাবিক হওয়ার ভান করে বলল,
‘দেখ, তুই নিজেকে আইস্টাইন ভাবলেও তোর মগজটা আসলে অতটাও সচল না। দরজা তো খোলাই ছিল। বন্ধ থাকলে আমি ঘরে আসতাম কী করে? যত সব ফালতু কথা!’
নিযানা মানতে নারাজ। সে এক পা এগিয়ে গিয়ে বলল,
‘একদম নাটক করবে না। সেদিনও ঘরের দরজা ভেতর থেকে আটকানো ছিল অথচ তুমি ঘরে ছিলে না। আবার পরে বাড়ির ভেতর থেকেই তোমাকে বের হতে দেখলাম। সত্যি করে বলো তো এসবের রহস্য কী? নয়তো আমি ছোট মামুকে গিয়ে সব বলে দেব কিন্তু!’
কলরব তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, ‘মামুকে গিয়ে বলে দেব! ন্যাকা একটা। তোর মামুকে আমি ডরাই নাকি? যা, গিয়ে বলে আয়।’
‘তার মানে তুমি সরাসরি কিছু বলবে না, তাই তো?’
কলরব কোনো জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। সে পাশ কাটিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হতেই নিযানা আবার ওর পথ আগলে দাঁড়াল। কলরব এবার মেজাজ হারিয়ে নাক-মুখ কুঁচকে বলে উঠল,
‘সমস্যা কী তোর? তুই কি চাস তোকে তুলে একটা আছাড় মারি?’
নিযানার মেজাজ খারাপ হলো। এটা কেমন ব্যবহার! সে নিজের কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব শীতল রেখে পাল্টা প্রশ্ন করলো,

‘কোথায় যাচ্ছো তুমি? আর রোজ এত রাত পর্যন্ত কোথায় থাকো তুমি, বলবে কি?’
কলরবের কণ্ঠস্বরে তাচ্ছিল্য, ‘সেটা কি তোকে কৈফিয়ত দিতে হবে নাকি?’
‘দিতে হবে। অবশ্যই দিতে হবে।’
কলরব এক পা এগিয়ে এসে বিদ্রূপের সুরে বলল, ‘তোর মনে হয় না তুই একটু বেশিই বলে ফেলছিস? তুই আমার কে যে তোকে সব বলতে হবে?’
কথাটা তীরের মতো নিযানার বুকে বিঁধল। সে কি সত্যিই কেউ না? এই ঘরে, এই জীবনে তার অবস্থানটা কি এতটাই নড়বড়ে যে কলরব অবলীলায় তাকে এই প্রশ্ন করতে পারল? অপমানে নিযানার ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে গেলেও সে নিজেকে সামলে নিল। স্থির গলায় বলল,
‘ঠিক আছে, বলতে হবে না। তবে একটা কথা কান খুলে শুনে রাখো। রাত দশটার পর এই ঘরের দরজা বন্ধ থাকবে। তুমি দরজায় ধাক্কাতে ধাক্কাতে অজ্ঞান হয়ে গেলেও আমি তা খুলব না।’
কথাটা শেষ করে নিযানা পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল কিন্তু কলরব তড়িৎ গতিতে ওর হাত চেপে ধরে আবারও মুখোমুখি দাঁড় করাল। দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

‘আমাকে হুমকি দিচ্ছিস? ভুলে যাস না এটা আমার বাড়ি, আমার ঘর। এখানে তুই বলার কে শুনি? আমার যখন ইচ্ছা আসবো। যখন ইচ্ছা যাব। যা খুশি করব আমি। তুই আটকাতে পারবি না?’
নিযানা ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘না, পারবে না। যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে না তুমি। কারণ এখন এই ঘরটা আমারও। আর আমি যা বলেছি ঠিক তা-ই করব। ছাড়ো আমাকে!’
‘কী চাস তুই? এত বাড়াবাড়ি কেন করছিস বল তো?’
কলরবের গলায় এক ধরণের অস্বস্তি, বিরক্তি। নিযানা দ্বিগুণ তেজ নিয়ে বলল,
‘ডিভোর্স! যেটা তুমি দেবে বলেছিলে।’
কথাটা বলার সময় নিযানার কণ্ঠস্বর কি সামান্য কেঁপে উঠল? হয়তো। কিন্তু কলরবের মাঝে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। সে মুহূর্তকাল নিস্তব্ধ হয়ে নিযানার চোখের দিকে চেয়ে রইল। সেই দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ডের নীরবতায় দুই জোড়া চোখের লড়াই চলল। কলরব যেন নিযানার চোখের গহীনে কিছু একটা খুঁজল। তারপর অবজ্ঞার সাথে নিযানাকে নিজের থেকে দূরে ঠেলে দিল। অত্যন্ত শীতল আর নির্লিপ্ত গলায় বলল,
‘ঠিক আছে। তাই হবে।’
কথাটা বলেই সে আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। হনহনিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। হতভম্ব নিযানা পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার ছলছল চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল। সেই ঝাপসা চোখেই সে কলরবের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।

সকালের নাস্তার টেবিলে বাড়ির প্রায় সকলেই উপস্থিত। নিযানা এসে বসতেই মৌনিতা উদ্বেগের সাথে জিজ্ঞেস করল,
‘নিযানা, তোমার শরীর এখন কেমন? জ্বরটা কি একটু কমেছে?’
নিযানা মৃদু মাথা নেড়ে সায় দিল। দিব্য অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
‘তোর জ্বর এসেছিল নাকি রে? হুট করে এমন জ্বর এল কীভাবে? এখন কেমন বোধ করছিস?’
মৌনিতার কথা শুনে টেবিলে উপস্থিত কয়েক জোড়া চোখ স্থির হলো নিযানার ওপর। কেবল কলরব তালুকদারের কোনো হেলদোল নেই; সে যেন জগতের সব ভাবনার ঊর্ধ্বে থেকে নিশ্চিন্তে খেয়ে যাচ্ছে। মৌনিতা উত্তর দিল,
‘জ্বর আসবে না কেন বলো? কাল কলেজ থেকে ফেরার সময় কায়েফের সাথে একদম কাকভেজা হয়ে ফিরেছিল মেয়েটা।’

আরশাদ তালুকদার কিছুটা সন্দিহান গলায় বললেন,
‘কায়েফের সাথে কেন? কলরব কি তোমাকে আনতে যায়নি? কলরব, আমি কি তোমাকে নির্দিষ্ট করে বলে দিইনি?’
কলরব খাওয়া থামিয়ে নির্বিকার মুখে তাকাল। অত্যন্ত নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
‘আমি আনি বা কায়েফ আনুক। কেউ একজন নিয়ে এলেই তো হলো। এতে এত আলোচনার কী আছে?’
কায়েফ এতক্ষণ চুপ ছিল। গম্ভীর গলায় প্রত্যুত্তর করলো,
‘আমি মোটেও কাউকে আনতে যাইনি। আমি বাড়ি ফিরছিলাম। পথে দেখলাম ও প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে একা রাস্তা দিয়ে হাঁটছে। নিজের দায়িত্বহীনতাকে অন্যের দায়িত্ব বলে চালিয়ে দিলেই সব মিটে যায় না।’
আরশাদ তালুকদারের কণ্ঠস্বর এবার বেশ ভারী হয়ে এল। তিনি নিযানার দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘নিযানা, সত্যি করে বলো তো কী হয়েছিল? তুমি কলরবের সাথে কেন ফেরোনি? ও কি তোমাকে আনতে যায়নি?’
নিযানা একবার কলরবের দিকে তাকাল। মুহূর্তে চার চোখের মিলন হলো। কলরবের চোখে নিরেট চাহনি। নিযানা ভাবল, এই সুযোগে একটা উচিত শিক্ষা দেওয়া যাক। মাথা নিচু করে অত্যন্ত ক্ষীণ স্বরে বলল,
‘কাল কলরব আমাকে মাঝরাস্তায় একা নামিয়ে দিয়ে চলে এসেছিল। তার কিছুক্ষণ পরেই ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়।’
কথাটা শুনে আরশাদ তালুকদার ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন,

‘কলরব! এসব আমি কী শুনছি? এটা কোন ধরণের কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ, হ্যাঁ?’
আফতাব তালুকদার পরিস্থিতি সামলাতে চাইলেন। বললেন,
‘আহ্! কী শুরু করলে তোমরা। ভাইয়া, খাওয়ার টেবিলে এসব কথা-কাটাকাটি কি শোভা পায়? খাওয়াটা শেষ করো। পরে না হয় এসব নিয়ে কথা বলা যাবে।’
কলরব নিচু গলায় বলল, ‘ঠিক আছে। পরের বার থেকে আর এমনটা হবে না।’
এইটুকু বলেই সে খাওয়া অসম্পূর্ণ রেখে টেবিল থেকে উঠে পড়ল। দ্রুতপায়ে সেখান থেকে প্রস্থান করল। আরশাদ তালুকদার রাগে ফুঁসতে লাগলেন। কোনোমতে নাস্তা শেষ করে তিনিও বেরিয়ে গেলেন। একে একে দিব্য, কাব্য সবাই যার যার গন্তব্যে রওনা হলো। নিযানা কলেজের জন্য তৈরি হয়েই এসেছিল। সে-ও যখন উঠে যাবে ভাবছিলো ঠিক তখনই অলেখার গম্ভীর কণ্ঠস্বর শোনা গেল,
‘দাঁড়াও নিযানা। তোমাদের সবার সাথে আমার কিছু জরুরি কথা আছে।’
নিযানা নিঃশব্দে পুনরায় নিজের আসনে বসে পড়ল। মৌনিতা, নবনী আর মাজহা তিনজনেই কিছুটা বিস্ময় নিয়ে অলেখার দিকে তাকালো। অলেখার কণ্ঠস্বরে কাঠিন্য। তিনি তীক্ষ্ণ গলায় বলতে শুরু করলেন,
‘তোমরা তিনজনই যেহেতু এই বাড়ির বউ। তাই সংসারের ওপর তোমাদের তিনজনেরই সমান দায়বদ্ধতা আছে। তিন-তিনজন জোয়ান বউ ঘরে থাকতে শাশুড়িদের এই বয়সে অসুস্থ শরীর নিয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটার কোনো মানে আমি দেখি না। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আগামী তিন মাস তোমরা সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবে।’

মাজহা পাশ থেকে যোগ করলেন, ‘এখন বলো, এ ব্যাপারে তোমাদের কারো কোনো আপত্তি আছে কি না?’
তিনজনেই যান্ত্রিকভাবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। অলেখা কাজের ভাগ বুঝিয়ে দিলেন,
‘নিযানা সকালের নাস্তা তৈরির দায়িত্ব নেবে। যেহেতু রান্নার বিন্দুমাত্র অভিজ্ঞতা ওর নেই। তাই নাস্তা তৈরি করাটাই ওর জন্য সহজ হবে। নবনী দুপুরের রান্না সামলাবে আর মৌনিতা রাতেরটা। এতদিন মৌনিতাকে একাই সব সামলাতে হয়েছে। ওকে অনেক কষ্ট দিয়েছি আর না৷’
নিযানা অবাক হয়ে অলেখার দিকে চাইলো। সকালে যদি তাকে নাস্তা তৈরির দায়িত্ব সামলাতে হয় তবে সে কলেজে যাবে কখন? সে অত্যন্ত দোটানায় পড়ে নিচু স্বরে বলল,
‘মামি, কিন্তু আমার তো…!’
ওর কথা শেষ হতে দিলেন না অলেখা। বললেন, ‘কী? তোমার কোনো সমস্যা আছে? তোমাকে তো সবসময়ই বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে নিযানা। বাকিদের তো কোনো অসুবিধা দেখছি না।’
নিযানা কেন যেন মুখ ফুটে আর প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পেল না। অলেখাকে আজকাল খুব ভয় লাগে ওর। অলেখা পুনরায় বলে উঠলেন,
‘সংসার করতে গেলে সবসময় স্বামীকে টেক্কা দিতে নেই। স্বামী দোষ করুক বা গুণ, তা জনে জনে বিচার দিয়ে বেড়ানো কোনো বুদ্ধিমতী স্ত্রীর কাজ নয়। মাঝেমধ্যে কিছু ত্রুটি আড়াল করতে শিখতে হয়। স্বামী-স্ত্রীর নিজেদের মান-অভিমান আর ঝগড়া নিজেদের ঘরের ভিতরে মেটানো ভালো। নয়তো তার পরিণতি কারো জন্যই সুখকর হয় না। আশা করি, আমার তোমরা বুঝতে পেরেছ।’

ঠিক সেই মুহূর্তে টেবিলে এক অপ্রত্যাশিত শব্দে সবাই চমকে উঠল। নবনীর হাত থেকে ফসকে একটা কাঁচের গ্লাস মেঝেতে পড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। নবনী তড়িঘড়ি করে ভাঙা কাঁচগুলো সরানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,
‘স্যরি, স্যরি আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি। একদম হাত থেকে পিছলে গেল।’
অলেখা স্থির দৃষ্টিতে নবনীর কম্পিত হাতের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় শুধালেন,
‘কী হয়েছে নবনী? তোমার মন কোথায়? শরীর ঠিক আছে তো?’
নবনী কেবল নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। মেঝেতে পড়ে থাকা কাঁচের গ্লাসটা কয়েক টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে; সে অত্যন্ত সাবধানে সেই ভগ্নাংশগুলো কুড়োতে লাগল। অলেখাকে বলার মতো কোনো ভাষা ওর জানা নেই। সকালের সেই বীভৎস স্বপ্নটা ছিল দিব্যকে নিয়ে। সেই থেকেই এক অজানা অস্থিরতা ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে। দিব্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর সেই অস্বস্তি যেন কয়েক গুণ বেড়ে বুকটা ধকধক করছে। নিযানা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সদর দরজার কাছে পৌঁছাতেই বিস্ময়ে থমকে গেল। গেইটের পাশে কলরব দাঁড়িয়ে আছে তার বাইকটা নিয়ে। পরনে কুচকুচে কালো টি-শার্ট আর কালো প্যান্ট। মাথায় কালো হেলমেট এমনকি বাইকটাও মিলেমিশে কালো। এই ছেলেটার কালো রঙের প্রতি এত টান কেন! সব সময় কালো জ্যাকেট বা শার্টেই নিজেকে মুড়িয়ে রাখে সে। ঠিক সেই মুহূর্তে কায়েফ গাড়ির চাবি হাতে গ্যারেজের দিকে যাচ্ছিল। নিযানা কী ভেবে যেন ওকে ডেকে উঠল,
‘কায়েফ!’

কায়েফ থমকে দাঁড়াল। সেই সাথে কলরবও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। নিযানা এগিয়ে গিয়ে কায়েফের মুখোমুখি দাঁড়াতেই কায়েফের ভেতরে এক ধরণের অস্বস্তি দানা বাঁধল। সে নিযানার চোখের দিকে সরাসরি তাকাতে পারল না অথচ নিজের মনকেও কোনোমতে রুখতে পারছেনা। গম্ভীর গলায় শুধু শুধাল,
‘কিছু বলবি?’
নিযানা আড়চোখে একবার কলরবকে দেখে নিয়ে কায়েফকে বলল,
‘আমাকে একটু কলেজে নামিয়ে দিয়ে আসবে? যদি তোমার খুব একটা সমস্যা না হয় তো। নয়তো আমি অটো বা অন্য কিছুতে করে চলে যাব।”

এই অবেলায় পর্ব ২৩

কায়েফ আড়চোখে কলরবের অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করল। নিযানার কোনো আবদার ফিরিয়ে দেওয়ার সাধ্য তার কোনোকালেই ছিল না; বিশেষ করে যখন মেয়েটি নিজে থেকে কিছু চাইছে। সে বুঝতে পারল, নিযানা হয়তো কলরবের সাথে যেতে ইচ্ছুক নয় বলেই তাকে বলছে। তার ওপর এই মেয়ে যাবে একা অটোরিকশায়! পথে নির্ঘাত কোনো বিপদ হতে পারে। কায়েফ তাই আর দ্বিরুক্তি না করে গাড়ি বের করার জন্য এগিয়ে গেল। কলরব পাথরের মতো স্থির হয়ে বাইকে বসে সবটা দেখল। ওদের গাড়িটা গেইট পেরিয়ে দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়ার পর সে নিজেও ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। বেরিয়ে গেল।

এই অবেলায় পর্ব ২৫