রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২
সিমরান মিমি
মা, এক কাপ কফি দিবে প্লিজ!
টিভির স্ক্রিন থেকে চোখ সরালেন পিয়াশা। মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন দোতলার দিকে। শব্দটা ছোট মেয়ের রুম থেকে এসেছে। পড়ার ফাঁকে মায়ের কাছে আবদার করেছে হয়তো। কিন্তু নাটক টাও যে এগোচ্ছে। এই মুহুর্তে এখান থেকে ওঠা মানে গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকুই অদেখা রয়ে যাবে। তিনি বসেই রইলেন। এইতো মিনিট দুয়েক পরেই এড আসবে। তখন যাবেন কফি নিয়ে। কিন্তু অপেক্ষা আর পার হলো কই? মিনিট খানেকের মধ্যেই সিঁড়ি দিয়ে নামার আওয়াজ এলো কানে। নিশ্চয়ই প্রেমা এসেছে রেগে মেগে। পিয়াশা পেছনে তাকালেন। সাথে সাথে মুখভঙ্গি বদলে নরম হলো। শান্ত ভঙ্গিতে নামছে তানিয়া। তাকে দেখতেই মৃদু হাসলো। বললো,
-তোমার উঠতে হবে না খালামনি। আমি নিয়ে যাচ্ছি।
পিয়াশা আহ্লাদী চোখে চাইলেন। এই বাড়িতে সকলে তাকে হুকুমের মধ্যে রাখলেও এই একজন সর্বক্ষণ সস্তি দেয় তাকে। মেয়েটাকে এতো আদুরে কে হতে বলেছে? যখন বাড়িতে চলে যায় তখন তো পিয়াশা তার অনুপস্থিতিতে পোড়ে। ইচ্ছে হয় সারাক্ষণ নিজের কাছে রেখে দিতে। অবশ্য এর সমাধান ও ভেবে নিয়েছেন। এবারে অপেক্ষা শুধু সময়ের।
তানিয়া দরজায় মৃদু শব্দে টোকা মারলো। হাতে কফির কাপ। দরজার সামনে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রেমা হতাশ হলো। ঠোঁট বাঁকিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে বললো,
-ওহহ তানি আপু। তুমি কেনো এমনটা করো? আমার রুমে ঢুকতে গেলেও কি তোমার অনুমতি লাগবে ? হুট করে ঢুকে পড়বে। এতো ফরমালিটিতে আমার লজ্জা লাগে।
তানিয়া ত্রস্ত পায়ে ভেতরে ঢুকলো। টেবিলের উপর মগ রেখে মৃদু হেসে বললো,
– এটা তোমার ব্যক্তিগত রুম প্রেমা। আর তুমি যথেষ্ট বড় হয়েছে। এভাবে হুটহাট ঢুকে পড়তে আমারই অসস্তি লাগে।
ক্লিক করে ক্লাস টাকে পজ করলো প্রেমা। অতি যত্নে মগ হাতে নিয়ে পিছু ঘুরে তানিয়ার দিকে চাইলো। কফিতে তৃপ্তি নিয়ে চুমুক দিয়ে চোখ বন্ধ করলো। আহ্লাদী কন্ঠে বললো,
– তুমি কি জানো, তুমি আস্ত একটা আদুরে দলা। তোমাকে এতো ভালো কেনো লাগে, বলতে পারো?
– কারন তোমার মন সুন্দর। আর সুন্দর মনের মানুষরা কখনো অন্যের প্রতি খারাপ ধারণা রাখতে পারে না।
তানিয়ার মিষ্টি উত্তরের পরিবর্তে প্রেমা দাঁত বের করে হাসলো। আবদারের সুরে বললো,
– শোনো আপু, তুমি কিন্তু এবার অনেক দিন থাকবে। যাওয়ার কথা মাথাতেই আনবে না। নাহলে আমি খুব মন খারাপ করবো।
তানিয়া আনমনে চুপ হয়ে কিছু ভাবলো। টেবিলের দিকে নজর পড়তেই বললো,
-ওহহ,সরি! তোমাকে বুঝি বিরক্ত করলাম। ক্লাস করছিলে?
-কোনো সমস্যা নেই। এটা রেকর্ড ক্লাস। একটু আগেই লাইভ করেছি। এখন নোট করছিলাম।
মেয়েটা আবার ও বসলো। আলাপ দীর্ঘ করতে কৌতূহলী কন্ঠে প্রশ্ন করলো,
-কার ক্লাস করছিলে?
প্রেমা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
-ওহ, এটা? এটা সোভাম স্যারের অনলাইন ক্লাস। উনি ব্যাকরণ পড়ান। ফ্রি ক্লাস, কেইবা মিস দেয়! তাছাড়া উনি খুব সুন্দর করে বোঝান।
তানিয়া মনোযোগ দিয়ে শুনলো। রাত প্রায় নয়টা। একটু পরেই খাবারের সময়। তার উচিত নিচে গিয়ে খালামনি কে সাহায্য করা। মানুষ টা এতো বড় বাড়ির যাবতীয় কাজ করে। যদিও বাড়ি ঘর ধোঁয়া-মোছার কাজগুলো করার জন্য দারোয়ানের স্ত্রী আসে। কিন্তু তারপর ও! রান্না বান্না থেকে শুরু করে টুকটাক সবই তো করতে হয় পিয়াশাকে। মাঝেমধ্যে তানিয়ার রাগ হয় ভীষণ। খালুজান কে কিছু বলতেও ইচ্ছে করে, কিন্তু তা সে পারে না। খালামনি তো কখনো টু শব্দ টাও করে নি। তাহলে সে বলার কে? অথচ স্ত্রীর হাতের রান্না ছাড়া সে যে অন্য কারো রান্না খাবার খাবে না, এটা ভালোবাসা কম – জেদ মনে হয় বেশি। তারপরেও, কিছু করার নেই। পিয়াশা তো ভালোবেসেই করছে সবটা।
তানিয়া উঠে দাঁড়ালো। দু- কদম এগোতেই দাঁড়িয়ে পড়লো। প্রেমার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বললো,
– শুনেছিলাম পাভেল ভাইয়া এসেছে। কিন্তু এসে তো দেখা পেলাম না। কোথায় সে?
প্রেমা ঠোঁট ফুলালো। হতাশ হওয়ার ভান ধরে বললো,
– ওর কথা আর বলো না আপু। দুনিয়ার হাড়ে বজ্জাত। ও বাড়িতে আসেই বড় ভাইয়াকে জ্বালাতে। ভাইয়া এবার বেজায় ক্ষেপেছে। আসার পরদিনই থাপ্পড় খেয়েছে ভাইয়ার হাতে। শেষে আব্বু আর ভাইয়ার ভয়ে আবার চলে গেছে। জানিনা আবার কবে আসবে। তবে চিন্তা করো না, যে নির্লজ্জের নির্লজ্জ! ঠিক কয়েকদিন পর আবার হাজির হবে।
তানিয়া অসন্তুষ্ট হলো। ফর্সা নাকের আগা লাল হয়ে উঠলো তড়তড় করে। রাগ টাকে যথাসম্ভব চেপে রেখে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
– তোমার বড় ভাইয়াকে বলে দিও – এতো রাগ ভালো না। পাভেল ভাইয়া ও এ বাড়ির ছেলে। দুজনের ই সমান অধিকার। তাকে সম্মান করে বলে বারবার অপমান করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়াটা অনুচিত। ও বড় হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে দু ভাইয়ের মধ্যে দুরত্ব বাড়বে। এক সময় দেখা গেলো অতিরিক্ত শাসনের চোটে বড় ভাইকে আর কেয়ার ই করলো না।
ড্রয়িংরুমে টাঙানো বড় দেয়াল ঘড়িটার কাঁটা গুলো টিকটিক করে ঘুরছে। সময় এখন প্রায় সাড়ে দশটা। পা দুটো উঁচু করে সোফায় শুয়েছিলো স্পর্শীয়া। কলিং বেল বাজতেই তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালো। নাক-চোখ কুঁচকে দরজা খুললো। সোভামের লম্বাটে মুখটা অস্তিত্বমান হতেই গলা খিঁচিয়ে বলে উঠলো,
-কালু ভাই, প্রতিদিন কোন মহাকার্য উদ্ধার করতে যান আপনি? আপনার কারনে পেট খিঁচিয়ে বসে থাকতে হয় ক্ষিধে নিয়ে।
সোভাম স্পর্শীকে সরিয়ে পাশ কাটিয়ে ঢুকে গেলো ভেতরে। রুমে ঢুকতে ঢুকতে বললো,
– না খেয়ে বসে থাকতে বলেছে কে? খেয়ে নিলেই হয়।
সোভামের কন্ঠস্বর শান্ত, রুমে যাওয়ার তাড়াও রয়েছে। স্পর্শী চোখ দুটো বন্ধ করলো। মুহুর্তেই ছুটে গিয়ে হাত চেপে ধরলো। টেনে রুম থেকে বের করে মায়ের সামনে আনলো। শার্ট, মুখ শুঁকে নাক ছিটকে বললো,
– ওঁয়াক! ছি!! ও মা, তোমার ছেলে আজকেও বিড়ি টেনে এসেছে।
সাথে সাথে মুখ চেপে ধরলো সোভাম। মায়ের দিকে তাকিয়ে দুপাশে মাথা নেড়ে বললো,
– সব মিথ্যা আম্মু। ও ফাঁসাচ্ছে আমাকে।
পিপাসা ভ্রু কুঁচকে তাকালো ছেলের দিকে। ক্ষানিকক্ষণ পরেই বসলো সোফায়। আর্তনাদ করে বললো,
– তুই যে সিগারেট খাস তা আমি জানি। স্পর্শীর আমাকে জানাতে হবে না। ভালো তো, এখন সিগারেট খাস, কদিন পর গাঁজা খাবি। বংশের ধারা তো রাখতে হবে।
মুখের আদল থমথমে করে স্পর্শীর দিকে তাকালো। চোখ রাঙিয়ে কথা এড়াতে বলে উঠলো,
– ওকে বিকালে যারা দেখতে এসেছিলো, তারা কি পছন্দ করেছে। পছন্দ হলে দ্রুত বিদায়ের চেষ্টা করো।
পিপাসা উত্তর দিলেন না। ও বাড়ি থেকে ফোন দেয় নি কেউ। নিজে থেকে দেওয়াটাও কেমন আত্মমর্যাদা হীন মনে হওয়ায় সে ও দেয়নি। চুপচাপ চলে গেলেন রান্নাঘরের দিকে। সোভাম স্পর্শীর দিকে তাকিয়ে কোনো কথা না বলেই চলে গেলো রুমে। শার্ট টা খুলে বিছানায় ফেলতেই স্পর্শী হাজির হলো। ভাইয়ের টেবিলের উপর উঠে পা ঝুলিয়ে বসতেই কটমট করে উঠলো সোভাম। বললো,
– আমার আশেপাশে তো দূর, রুমেও ঢুকবি না তুই।
কানেই নিলো না স্পর্শী। বললো,
– আসলে আমার তো দোষ নেই। তুই কথা বলতেই বাজে গন্ধ টা একদম নাকে ঢুকে গেলো। হুট করে চাপিয়ে রাখতে পারি নি, তাই বলে দিয়েছি।
– তোর নাকটা এতো বড় করে বানালো কেনো রে? যাতে আমি সেকেন্ডে সেকেন্ডে বাঁশ খাই?
স্পর্শী দাঁত মেলে হাসলো। বললো, হয়তো!
ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে বসতেই পুণরায় খোঁচাতে লাগলো স্পর্শী। ফিসফিসিয়ে ব্যঙ্গ করে বললো,
– তোর প্রেমিকা আমাকে ফোন করেছিলো। বলে, সোভাম কি বাড়িতে গেছে? আমার ফোন ধরছে না কেনো?
থেমে, এইই কেনো রে? তোর ওই বিরক্তিকর প্রেমিকা আমায় কেনো ফোন দেবে? কেনো দিয়েছিস আমার নাম্বার?
থতমত খেয়ে মায়ের দিকে তাকালো সোভাম। সে তরকারি গরম দিচ্ছে। স্পর্শীকে থামাতে কন্ঠ চাপিয়ে বললো,
– আস্তে! আর তুই ওকে সহ্য করতে পারিস না কেনো? দিশা খুব ভালো মেয়ে। তোরা দুজনই দুজনকে সহ্য করতে পারিস না, কি আজব!
চোখ দুটো বড় বড় করে তাকালো স্পর্শী। বললো,
– এইই ভাইয়া, তোর প্রেমিকা আমাকে সহ্য করতে পারেনা – তারপরেও ওই মেয়ের সাথে কথা বলিস তুই? ছিহ! কতটা সার্থপর তুই?
– আস্তে কথা বল। আমি ক্লাসে ছিলাম, তাই ফোন তুলতে পারিনি। আর দিশা তোকে অপছন্দ করে না। তোদের আলাপ নেই তাই এমন অসস্তি।
“তোরা ফিসফিস করছিস কি নিয়ে।”
পিপাসার গলার আওয়াজ পেতেই থেমে গেলো দুজন। নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসলো। দুজনকে নিশ্চুপ দেখে আর কিছুই জিজ্ঞেস করলো না পিপাসা।
খাবার খাওয়ার এক পর্যায়ে সোভাম মায়ের দিকে তাকালো। গলা পরিস্কার করে বললো,
– আম্মু , পার্লার টা ছেড়ে দাও।
চমকে ছেলের দিকে তাকালো পিপাসা। হতভম্ব হয়ে বসে রইলো এভাবেই। মুখের ভাত টুকু গিলে বললো,
– কি বললি? বুঝিনি আমি।
স্পর্শী নিজেও অবাক। কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না। আপাতত চুপ থাকাটা শ্রেয় মনে করে চেয়ে রইলো মা ও ভাইয়ের পানে।
– বলেছি পার্লার টা ছেড়ে দাও। ওখানে আর কাজ করতে হবে না। বিক্রি করে দাও কারো কাছে।
পিপাসা রেগে গেলেন। ছেলের দিকে তাকিয়ে অবহেলার সুরে বললেন,
– চাকরি টা হলেও না হয় কথাটা মানা যেতো। কিন্তু এখন কোন আন্দাজে বলছিস?
– আম্মু, এমন না যে আমি একদম বেকার বসে আছি। কিছু না কিছু তো করছিই।
– হ্যাঁ করছো। আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু সেটা এতোটাও বড় কিছু না। ঢাকা শহরে এমন দু কামড়ার একটা ফ্লাট রেখে মা- বোন কে চালানোর সক্ষমতা তোর হয় নি। কোচিং টাও মাত্র কয়েক মাস হয়েছে শুরু করেছিস। সেটার ভিত ও এখনো শক্ত হয় নি। এদিকে চাকরিও হচ্ছে না। কোন আক্কেলে আমাকে পার্লার বিক্রি করতে বলছিস? এটা আমার শখের।
সোভাম মায়ের কথার পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষানিকটা মেজাজ হারালো। গমগমে কন্ঠে বললো,
– তোমার শখের কিইবা অবশিষ্ট আছে? এটাও নাহয় বাদ যাক।
ছেলের খোটার সামনে পড়ে হতভম্ব হয়ে পড়লেন পিপাশা। চোখ টা জ্বলছে। স্পর্শীর সামনে এসব নিয়ে আলোচনা করা সুবিধার হবে না জেনেও সোভাম কেনো এগুলোই টানছে? খিটখিটে কন্ঠে বললো,
-শখের সব হারিয়েছি ঠিকই। তবে পার্লার টা না থাকলে দু দুটো বাচ্চা মানুষ করতে পারতাম না। আমি বুঝতে পারছি না হুট করে এই বুদ্ধিটা তোকে কে দিলো? কার নজর পড়লো আমার সংসারে? কে চায় আমি ধ্বংস হয়ে যাই ছেলেমেয়ে নিয়ে?
– আম্মু, আম্মু এতোটাও রিয়াক্ট করার কিচ্ছু নেই এখানে। আমি জাস্ট অফার করেছি তোমাকে। আর আমি অবুজ নই যে – কেউ বুঝালেই তার কথা মতো চলবো।
কোনোমতে পাতের খাবার টা শেষ করে হাত ধুয়ে নিলো সোভাম। রুমের দিকে অগ্রসর হয়ে দরজার সামনে গিয়ে থেমে গেলো। পিছু ঘুরে মায়ের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
– এখন হয়তো সামর্থ্য নেই, আশা করি চাকরি পেয়ে গেলে তোমার আর কোনো অজুহাত থাকবে না।
পিপাসা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন সেদিকে। তার চোখ দুটো পুকুরের পানির মতো স্থবির হয়ে আছে। মাছের তরকারি টা আজ খুবই সুস্বাদু হয়েছে। স্পর্শী আরেক টা লেজ নিলো পাতে। আশেপাশের কিছুই যেনো তাকে ছুতে পারছে না। অথবা ছুতে পারলেও সেটা প্রকাশ করার সময় হয়নি এখনো। আয়েশ করে খেতে খেতে মায়ের দিকে তাকালো। গা ছাড়া ভাব নিয়ে বললো,
– কান্নাকাটি করার মতো কিছুই হয় নি। তোমার ছেলে বড় হয়েছে। এখন তোমাকে কাজ করতে দিতে বাঁধা দিতেই পারে। সে যে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব নিতে চাইছে এটা তো গর্বের বিষয়। তোমার উচিত কালকেই তোমার ছোট বোনকে দাওয়াত করে খুশির খবরটা ছড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু এমা! তুমি তো কাঁদছো। থাক, তুমি বরং আজীবন কাজ’ই করো।
গেটের এক পাশে মোড়া পেতে তাতে বসে ঝিমোচ্ছিলো দারোয়ান। প্রায় এগারোটা বেজে গেছে। আজ পরশ শিকদারের বাড়িতে ফেরার কথা। পরশু’ই রাজধানীতে গিয়েছে সে। বড় সাহেব বলেছেন আজ রাতে আসবে। না জানি ফিরতে কত রাত হয়। অথচ এখনই ঘুমে ঢুলে পড়েছেন রহিম। কিছুক্ষণ পূর্বেই ছেলেকে ফোন দিয়েছেন। মাত্র দু এক ঘন্টার ব্যাপার। সচারচর বারোটার মধ্যেই গেটে তালা দিয়ে তিনি ঘুমাতে যান। তবে ইলেকশনের সময়ে সময়টা আরো দীর্ঘ হয়। কখনো কখনো দুটো পর্যন্ত ও জেগে থাকতে হয়। একের পর এক গাড়ি আসতেই থাকে তখন।
রহিম উঠে দাঁড়ালো। বসে থাকলে ঘুম বেশি কাবু করে ফেলে। এদিক ওদিক তাকাতেই নজরে পড়লো রাকিব কে। হ্যাঁ, এটাই তার ছেলে। হাতে টর্চ নিয়ে এগিয়ে আসছে রাস্তার ওপাশ থেকে। রহিম খুশি হয়ে গেট খোলে। ছেলেকে ভেতরে এনে বলে,
– তুই একটু বয় গেটের ধারে। তোর পরশ ভাইর গাড়ি আইলেই গেট বন্ধ কইরা ঘুমাইতে আইবি। আমার ঘুম আইছে অনেক।
রাকিব দ্বিমত করলো না। মাথা নাড়িয়ে বাবার হাত থেকে লাঠি টা নিলো। এরমধ্যেই আলো এসে পড়লো চোখের উপর। সেদিকে তাকাতেই তৃপ্তির হাসি হাসলো রহিম। ছেলের উদ্দেশ্যে বললো,
– আর দাঁড়ান লাগবে না। আইয়া পড়ছে। খাড়া বাপ, এক লগেই যাই।
দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেট খুলে দিলো রহিম। পরশ শিকদার গাড়ি থেকে নেমে ড্রাইভারকে ভেতরে যাওয়ার নির্দেশ দিলো। ত্রস্ত পায়ে হেঁটে এসে দাঁরোয়ানের সামনে দাঁড়ালো। বললো,
– তোমার এ মাসের বেতন দেওয়া হইছে?
মাথা ঝাকিয়ে না বললেন রহিম। আজ বারো তারিখ। প্রতিবার মাস শেষ হওয়ার আগেই বেতন দেওয়া হয়। এবার হয়তো ইলেকশনের ব্যস্ততার কারনেই দেওয়া হয় নি। এ নিয়ে রহিম নিজেও কিছু বলে নি। পরশ ওয়ালেট থেকে টাকা বের করলো। গুণে গুণে সাড়ে বারো হাজার টাকা বের করে রহিমের হাতে দিলো। এরপর এগিয়ে এলো রাকিবের দিকে। মাথায় হাত দিয়ে চুল গুলো এলোমেলো করে জিজ্ঞেস করলো,
রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১
– লেখাপড়া কেমন চলে?
– ভালো ভাই।
পরশ হাসলো। পরক্ষণেই চোয়াল শক্ত করে রাকিবের চুল শক্ত করে মুঠোয় নিলো। দু তিনটা ঝাঁকি মেরে ঠাস ঠাস করে তিনটা থাপ্পড় দিলো। হতভম্ব হয়ে গেলো রহিম। ছুটে এসে ছেলেকে ধরে পরশের দিকে তাকায়। কিছু বলার প্রয়াস করার পূর্বেই পরশ মেজাজ হারিয়ে বজ্রকন্ঠে বললো,
– তোমার ছেলেরে সাবধান কইরো। নাহলে আমার হাতেই মরবে।
