এই অবেলায় পর্ব ৩৩
সুমনা সাথী
কলরবের কাছে পুরো ব্যাপারটাই একটা ধাঁধার মতো মনে হচ্ছিল। নিযানার আচমকা ঝড়ের বেগে ঘর ছেড়ে যাওয়াটা সে স্রেফ অভিমান বলে ধরে নিয়েছিল কিন্তু পরিস্থিতি যে এত দ্রুত পালটে যাবে তা তার কল্পনার অতীত ছিল। হন্তদন্ত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই কুহু প্রায় দৌড়ে এসে ওর পথ আগলে দাঁড়াল। উৎকণ্ঠা আর রাগে কুহুর কণ্ঠস্বর কাঁপছে। চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল,
‘নিযানার সাথে তুমি ঠিক কী করেছ বলো তো?’
কলরব কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল,
‘ও কোথায়? মেয়েটার মনে হয় মাথা খারাপ হয়ে গেছে!’
কুহু সরলো না। বরং কড়া গলায় বলল, ‘তুমি আগে বলো ওর সাথে কী এমন করেছ যে এই রাতের বেলা ও বাড়ি থেকে একা বেরিয়ে গেল?’
কলরব যেন আকাশ থেকে পড়ল। অবিশ্বাস্য গলায় সে বলল,
‘বেরিয়ে গেছে মানে? এই রাতে কোথায় যাবে ও? আরে আমি কিছুই করিনি। বলছি তো ওর মাথা ঠিক নেই!’
কুহুর মেজাজ সপ্তমে চড়ল। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছিল কলরব কিছু একটা লুকোচ্ছে। নয়তো নিযানার মতো মেয়ে কখনো বিনা কারণে এভাবে ঘর ছাড়তে পারে না। ঝাঝালো গলায় বলল,
‘দাঁড়াও, আমি আব্বুকে ডাকছি। যা বলার ওনার সামনেই বোলো।’
কলরব কিছু বলে তাকে আটকানোর আগেই কুহু এক প্রকার দৌড়ে চলে গেল। কলরব এবার সত্যিকার অর্থেই দিশেহারা বোধ করল। সবকিছু যেন তার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। নিযানার ওপর তার প্রচণ্ড রাগ হতে লাগল। একই সাথে নিজের ওপরও একরাশ বিরক্তি জমা হলো। এই অসময়ে মেয়েটার পালানোর কী দরকার ছিল? কিন্ত এত রাতে গেলেও বা কিভাবে। কলরব সদর দরজার দিকে পা বাড়াতেই সেখানে আরশাদ তালুকদার এসে হাজির হলেন। সাথে অলেখা আর কাব্যও। কাব্য অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘কলরব, এসব কী শুনছি? নিযানা নাকি বাড়ি থেকে চলে গেছে! কী হয়েছে বল তো?’
কলরব মাথা নিচু করে বিড়বিড় করল, ‘সামান্য একটু কথা-কাটাকাটি হয়েছে আমাদের মধ্যে।’
আরশাদ তালুকদার গর্জে উঠলেন। বললেন, ‘সামান্য কথা-কাটাকাটি? একটা মেয়ে এই মাঝরাতে স্রেফ সামান্য ঝগড়ার জন্য বাড়ি থেকে একা বেরিয়ে গেল? সিরিয়াসলি কলরব? তুমি কি আমাদের অবুঝ পেয়েছ?’
কাব্য অস্থির হয়ে বলে উঠল, ‘তোর কি কাণ্ডজ্ঞানের এতই অভাব কলরব? তুই এখনো এখানে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ওকে আটকানোর চেষ্টা করিসনি? এই মাঝরাতে একটা মেয়ে কোথায় যাবে, কীভাবে যাবে। এতটুকু চিন্তা করার মতো ঘিলুও কি তোর মাথায় নেই!’
কলরবের ধৈর্য এবার বাঁধ ভাঙল। সে তপ্ত স্বরে পালটা জবাব দিল,
‘না নেই! আমি কি ওকে যেতে বলেছি? ও নিজেই একগাদা আজেবাজে কথা বলে ঝগড়া বাধাল আবার নিজেই অভিমানে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। আমি কেন ওর পায়ে পড়তে যাব বলতে পারিস?’
ছেলের মুখে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা শুনে আরশাদ তালুকদার ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। তিনি রাগে গজগজ করতে করতে কলরবের দিকে তেড়ে আসতেই কাব্য মাঝপথে বাধা দিয়ে দাঁড়াল। শান্ত করার সুরে বলল,
‘শান্ত হও চাচ্চু। আমি দেখছি ও কোথায় যেতে পারে। এত রাতে বেশি দূর যাওয়ার কথা নয়। আমি এখনই খোঁজ নিচ্ছি।’
কাব্য দ্রুত পায়ে বাইরের দিকে বেরিয়ে গেল। আরশাদ তালুকদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন। কলরব তখনো একগুঁয়ে ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল। অলেখা ছেলের কাছে এগিয়ে এসে খুব নিচু স্বরে শুধালেন,
‘কী করছিস তুই এসব? এর আগেও তো তোদের মধ্যে কত অশান্তি হয়েছে। কই নিযানা তো কোনোদিন এমন কাণ্ড করেনি! সত্যি করে বল তো আসলে কী হয়েছে?’
কলরব অসহায় চোখে মায়ের দিকে তাকাল। ইরার ফোন কল আর সেই পুরনো সম্পর্কের টানাপোড়েনের কথা এই মুহূর্তে ফাঁস হলে যে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হবে তা সে খুব ভালো করেই জানে। তাই কথা গোপন করে বলল,
‘সামান্য কথা-কাটাকাটি আম্মু। তুমি তো জানোই। ও সবকিছু একটু বেশিই বোঝে। স্রেফ আমার ওপর রাগ দেখিয়ে বেরিয়ে গেছে। তেমন কিছু না।’
ছেলের মুখে শব্দগুলো শোনামাত্র আরশাদ তালুকদার বিদ্যুৎবেগে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। গম্ভীর গলায় বললেন,
‘তেমন কিছু না, তাই না?’
কলরব শুধু যান্ত্রিকভাবে মাথা নাড়ল। তিনি ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বললেন,
‘কেমন কিছু হয়েছে? সেটা জানার আর কোনো প্রয়োজন আমি বোধ করছি না।’
বলেই তিনি হুট করে কলরবের একটা হাত শক্ত করে চেপে ধরলেন। কলরব কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরশাদ তালুকদার তাকে একপ্রকার টেনে হিঁচড়ে সদর দরজার কাছে নিয়ে এলেন। অলেখা বাধা দেওয়ার সুযোগটুকুও পেলেন না। তিনি সজোরে ধাক্কা দিয়ে কলরবকে বাড়ির বাইরে বের করে দিলেন। অন্ধকার বারান্দায় কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে কলরব যখন অবিশ্বাস্য চোখে তাকাল তখন আরশাদ তালুকদার গর্জে উঠে বললেন,
‘অনেক সহ্য করেছি তোমাকে। তোমার ওপর রাগ করে বউ ঘর ছেড়েছে। এখন স্বামী হিসেবে তোমার দায়িত্ব তাকে যেভাবে হোক ফিরিয়ে আনা। আর শোনো, নিযানাকে ছাড়া এই বাড়িতে তোমার আর কোনো জায়গা নেই। যতদিন সে বাইরে থাকবে ততদিন তোমাকেও এই বাইরেই রাত কাটাতে হবে। যাও!’
কলরবও দমবার পাত্র নয়। জেদ দেখিয়ে আরশাদ তালুকদারের মুখের উপর বলে দিল,
‘ঠিক আছে। ফিরব না তোমার বাড়িতে। প্রয়োজনে সারাজীবন বাইরে কাটাব। তাও ওই গিরগিটি আর নাটকবাজ মেয়েটাকে ফিরিয়ে আনতে আমি কোথাও যাব না।’
অলেখা চোখ রাঙিয়ে ছেলেকে ধমক দিলেন, ‘মুখ সামলা কলরব! আর একটা বাজে কথাও যেন না শুনি। এখনই গিয়ে দেখ মেয়েটা কোথায়। ওকে সাথে নিয়েই কিন্তু ফিরবি।’
কলরব আর কোনো কথা না বলে রাগে গজগজ করতে করতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। তার মাথায় তখন একটাই জেদ। সে আর ফিরবে না। কিন্তু রাস্তায় নামার পর ওর মনে পড়ল। উত্তেজনার মাথায় গাড়ির চাবিটাই তো সাথে আনেনি। এখন এই মাঝরাতে কোথায় যাবে সে? বা হাতে ফোনটা পেল। বার কয়েক শান্ত, অভিক সবাইকে কল দিয়ে ও পেল না৷ মেজাজ আরো খারাপ হলো ওর। সবাইকে একসাথে মরতে হলো। রাস্তা তখন একদম শুনশান। এখন ক্লাবে হেঁটে গেলেও অনেকটা পথ৷ হাঁটতে ও ইচ্ছা করছেনা ওর। ল্যাম্পপোস্টের নিচে একটা কুকুর ঝিমোচ্ছিল। কলরব নিজের একটা সঙ্গী পেল; এগিয়ে গিয়ে কুকুরটার পাশে বসল। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে লাগল,
‘কী রে? তোরও কি কেউ নেই? আমার মতোই এতিম তুই? দেখ আজ থেকে আমিও তোর দলে। নিজের বাপ কথায় কথায় বাড়ি থেকে বের করে দেয়। ঠিক করেছি আর ফিরব না ওই বাড়িতে। কিন্তু মুশকিল হলো। তুই না হয় রাস্তায় শুয়ে রাত কাটাতে পারিস। আমি তো আর পারব না। কিরে, কিছু একটা তো বল! কখন থেকে আমি একাই বকবক করছি।’
কুকুরটা কোনো সাড়া দিল না। কলরব আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘আমার জীবন তো না। যেন ফুটবল। যেদিকে যাই সেদিকেই লাথি খাই। অসহ্য লাগছে সব। আমি অকারণে সবকিছুতে কেনো ফেঁসে যাই?’
হঠাৎ কুকুরটা বসা থেকে উঠে পড়ল। আড়মোড়া ভেঙে কলরবের থেকে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল। কলরব অবাক হয়ে বলে উঠল,
‘কী রে? তুইও কি মেয়ে নাকি? স্রেফ একটু ছুঁয়েছি বলে অমনি দূরে গিয়ে দাঁড়ালি? শালা, আমি কি এতটাই খারাপ? একটা কুকুর পর্যন্ত আমাকে ইগনোর করছে! এই যে শোন, আমি কলরব তালুকদার! আমাকে ইগনোর করছিস? সিরিয়াসলি?’
আচমকা এক তীব্র আলোর ঝলকানি কলরবের চোখে পড়তেই সে মুখ তুলে তাকাল। একটি বাইক ঠিক ওর সামনে এসে থামল। চালক মাথা থেকে হেলমেটটি সরাল। কলরব সবিস্ময়ে দেখল সেটি আর কেউ নয় কায়েফ। আর যে বাইকটি নিয়ে সে এসেছে সেই বাইকটা ও তারই। কায়েফ কোনো বাক্যব্যয় করল না। বাইক থেকে নেমে চাবিটা কলরবের হাতের তালুতে গুঁজে দিল। কলরব মুহূর্তকাল হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এই পরিস্থিতির জন্য সে মোটেই প্রস্তুত ছিল না। কায়েফ পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হতেই কলরব দৌড়ে গিয়ে ওর পথ আগলে দাঁড়াল। এক জোড়া ভ্রু নাচিয়ে কৌতুক মেশানো গলায় জিজ্ঞেস করল,
‘কী ব্যাপার বল তো? হঠাৎ এই দয়া?’
কায়েফ বিরক্তি নিয়ে শীতল কণ্ঠে জবাব দিল, ‘কোনো ব্যাপার নেই। রাস্তা ছাড়।’
সে আবারও পাশ কাটিয়ে যেতে চাইল কিন্তু কলরব নাছোড়বান্দা। সে দ্বিতীয়বার পথ আটকে দাঁড়ালো। হুট করে খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসির দমক যেন আর থামতেই চায় না। হাসতে হাসতে তার শরীর ভেঙে পড়ার উপক্রম। কায়েফ কুঞ্চিত ভ্রু আর দ্বিগুণ বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে রইল। কর্কশ স্বরে বলল,
‘তোর কি মাথা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে? সর সামনে থেকে।’
কলরব হাসি থামিয়ে বলল, ‘না সরলে কী করবি? আর তুই তো এমনি এমনি আসিসনি। এসেছিস কেন সেটা বলবি না?’
কায়েফ দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘স্রেফ দয়া দেখাতে এসেছিলাম। তুই ভালোয় ভালোয় সর। আমি সরালে কিন্তু বিষয়টা মোটেও সুখকর হবে না।’
‘পারলে সরিয়ে দেখা!’
কলরবের কথা শেষ হতে না হতেই কায়েফের শক্ত মুঠো সরাসরি আছড়ে পড়ল কলরবের গাল বরাবর। কলরব স্থির থাকতে পারল না। টাল সামলে নিয়েই সে পাল্টা এক জোরালো ঘুষি বসাল কায়েফের মুখে। মুহূর্তের মধ্যে রাতের সেই নিস্তব্ধ রাস্তা দুই ভাই বা বন্ধুর রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। বেশ কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তির পর দুজনেই ক্লান্ত হয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে রাস্তার পিচের ওপর এলিয়ে পড়ল। কলরব তখনো হাসছে। কায়েফ কর্ষশ কণ্ঠে বলল,
‘নির্লজ্জ কোথাকার!’
কলরব গাল ডলতে ডলতে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল,
‘জানি। উফ, গালটা একদম টনটন করছে। কেউ এভাবে মারে? আমার সুন্দর ফেসটা যদি নষ্ট হয়ে যেত?’
‘ইচ্ছে তো করছে তোর গলাটা টিপে ধরতে!’
‘সাহস থাকলে দিয়ে দেখ না!’
কলরব আবারও উসকে দিল তাকে। কায়েফ আর কোনো উত্তর দিল না। সে চোখ জোড়া বুজে আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে রইল। একটু আগেই হয়তো এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। রাস্তার ভেজা পিচ থেকে এক ধরণের সোঁদা গন্ধ আর শীতলতা পিঠ বরাবর শিরশির করে উঠছে। তবে আশ্চর্যজনকভাবে এই মারপিটের পর কায়েফের ভেতরটা এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে উঠল। ঠোঁটের বাঁ কোণে একটা জ্বলুনি অনুভব করে হাত দিতেই দেখল আঙুলে কাঁচা র ক্ত। কলরব সেদিকে এক পলক তাকিয়ে টিপ্পনী কেটে বলল,
‘কেটে গেছে নাকি? বাহ! এই অবস্থায় তোকে যা লাগছে না… একদম রাজপুত্তুর!’
কায়েফ বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, ‘নিজের মুখটা একবার আয়নায় দেখেছিস? পুরো জোকারের মতো দেখাচ্ছে তোকে।’
কলরব হালকা করে হাসল। একটু আগেও বুকের ভেতর যে অস্থিরতার ঝড় বইছিল এখন তা অনেকটা থিতিয়ে এসেছে। সে বেশ সহজ গলায় নিচু স্বরে বলল,
‘আই অ্যাম স্যরি ভাই।’
কায়েফ উদাসীনভাবে জবাব দিল, ‘ইটস ওকে।’
কলরব এবার যেন একটু আহত হলো। বিষণ্ণ গলায় শুধাল,
‘এত সহজে ওকে বলে দিচ্ছিস কেন? তোর কি একটুও কষ্ট হয় না? তুই কি আর নিযানাকে চাস না? মানুষ কীভাবে এত তাড়াতাড়ি সব ভুলে যায়? ওকে ঘৃণা করার তো কোনো কারণ নেই। ওর তো কোনো দোষ ছিল না। মেয়েটা তো তোকেই ডিজার্ভ করে। আমার মনেহয় তোকে পছন্দ ও করতো। তবে ভীতুর ডিম তো। মায়ের মুখের উপর কিছু বলতে পারেনা। বাধ্য হয়ে বিয়েটা করেছে।’
কায়েফ খুব শান্ত গলায় বলল, ‘ও বিবাহিত।’
কলরব তাচ্ছিল্যে হেসে বলল, ‘তাতে কী হয়েছে? অন্য কারো সাথে সংসার করছে বলেই কি তাকে ঘৃণা করতে হবে? যাকে মানুষ ভালোবাসে তাকে তো সব অবস্থাতেই ভালোবাসে। সে যদি ধ র্ষিতা ও হয় তাতে তো যায় আসার কথা না। তাতে কী ভালোবাসা কমে যাওয়ার কথা?’
কায়েফের হাতের মুষ্টি শক্ত হয়ে এল। চোয়াল শক্ত করে বলল,
‘কে বলল তোকে যে আমি ওকে ঘৃণা করি? ও যদি অন্যের বাচ্চার মা-ও হতো আমার ভালোবাসায় এক চুলও কমতি আসত না। সত্যি বলতে, নিযানার বিয়ে তোর সাথে না হয়ে যদি অন্য কারো সাথে হতো। তবে ওর স্বামীকে খু ন করে হলেও আমি ওকে ছিনিয়ে নিতাম। আই রিপিট জাস্ট ছিনিয়ে নিতাম। খুব ভালোবাসি ওকে। অনেক বছর ধরে। যত্ন করে ভালোবেসেছি। আমার খুব শখের ও৷ ওর জন্য নিজে যেখানে খু ন হতে পারি। সেখানে দুই একটা খু ন করা কোনো বিষয় না।’
কলরব মজা করে বলল, ‘তাহলে আমাকে মারবি না কেন?’
কায়েফ এবার শোয়া থেকে উঠে বসল। ‘আমাকে এখন ফিরতে হবে। ভাইয়া ফোন করেছিল। নিযানাকে খুঁজে পাওয়া গেছে। কিন্তু ও এই বাড়িতে ফিরতে একদম রাজি হয়নি। ভাইয়া বলল ও নাকি খুব কাঁদছিল। আপাতত ওকে ফুফুর বাড়িতে রেখে আসা হয়েছে। চাচ্চু এখন প্রচণ্ড রেগে আছেন। তুই বরং কয়েকটা দিন বাইরেই থাক। পরিস্থিতি একটু ঠান্ডা হলে ফিরিস।’
কলরব শোয়া থেকে উঠে বসে দাঁত বের করে হাসল। বলল,
‘আব্বু তো বলে দিয়েছে বউ ছাড়া বাড়ি ফেরা নিষেধ।’
কায়েফ এক পলক ওর দিকে তাকাল। কলরবের ঠোঁটের এক পাশটা ফুলে উঠেছে। ফর্সা মুখটা লাল হয়ে আছে। দেখতে কিঞ্চিৎ অদ্ভুত লাগছে। কায়েফের কেন যেন হাসি পেল। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
‘বিয়ে যখন করেছিস তখন ওকে ভালো রাখার দায়িত্বটাও তোর। তোর প্রতি আমার কোনো রাগ নেই। যা আমাদের ভাগ্যে ছিল। তা-ই হয়েছে। শান্তিতে সংসার কর। শুধু ওকে কখনো কষ্ট দিস না। ওর চোখের পানি সহ্য করতে পারিনা। আমার কষ্ট হয়।’
কলরবের বুকের ভেতরটা আচমকা এক তীব্র যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল। শরীরের শিরা-উপশিরায় যেন বিষাক্ত কোনো স্রোত বয়ে গেল নিমেষেই। কম্পিত গলায় বলল,
‘তাহলে এসব কেন বলছিস কায়েফ? তুই তো সব জানিস। তুই তো জানিস ওর সাথে আমার সম্পর্কটা ঠিক কেমন…!’
কায়েফ হাত উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিল। নির্লিপ্ত গলায় বলল,
‘আমি আর নতুন করে কিছু জানতে চাই না। তুই এসব কেনো বলছিস? আমি যদি বলি ওকে আমাকে দিয়ে দে। তুই কি দিতে পারবি? পারবি না। তাই এসব কথার মানে হয়না। আমি তো বললাম তোর উপর রাগ নেই। আর যদি আমার কথা বলি তাহলে। সময় সব ক্ষতের ওপর প্রলেপ দিয়ে দেয়। হয়তো কিছুদিন পর এই কষ্টটা আর থাকবে না। অনেক রাত হয়েছে। এখন কোনো বন্ধুর বাসায় চলে যা। আর সকালে একবার ফুফুদের বাসায় গিয়ে নিযানার কাছে ক্ষমা চেয়ে সব মিটিয়ে নিস। জীবনটা কোনো ছেলেখেলা নয়।’
কলরব কিছু একটা বলতে চেয়েও পারল না। কথাগুলো গলার কাছে এসে আটকে গেল। সে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল কায়েফের দিকে। কায়েফ ততক্ষণে দ্রুত পায়ে অনেকটা পথ পেরিয়ে গেছে। তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে কলরব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আকাশের দিকে তাকিয়ে ত্যাচ্ছিল হেঁসে বলল,
‘শালার, সব কত মহান। খালি আমি-ই!’
কাব্যকে গেট থেকেই বিদায় করে দিল নিযানা। কাব্যও আর বাড়তি জোরাজুরি করেনি। কারণ সে জানত ভেতরে গেলে তাকেই অপ্রীতিকর সব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। আনতাসা আর নওয়াজ চৌধুরীর প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তার কাছে নেই। পুরোটা পথ সে নিযানার মুখ থেকে কিছু শোনার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। মেয়েটা পুরোটা সময় পাথরের মূর্তির মতো নিথর হয়ে বসে ছিল। আর অবিরত তার চিবুক বেঁয়ে গড়িয়ে পড়েছে নোনা জল। নিশুতি রাতে কলিং বেলের শব্দ শুনে কেউ সাড়া দিলনা। বাড়ির পুরনো দারোয়ান লোকটা নিযানার সাথে এসেছে। সে কুণ্ঠিত স্বরে বলল,
‘আপুমণি, আমি কি স্যার বা ম্যাডামকে ফোন দেব? উনারা বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছেন।’
নিযানা শুধু মাথা নেড়ে সায় দিল। কিছুক্ষণ পর দরজা খুললেন আনতাসা। পেছনে চিন্তিত মুখে নওয়াজ চৌধুরী। এই অসময়ে মেয়েকে দেখে তাঁরা যেমন অবাক হলেন তার চেয়েও বেশি বিচলিত হলেন তার বিধ্বস্ত চেহারা দেখে। আনতাসা মেয়ের হাত ধরে প্রায় চিৎকার করে উঠলেন,
‘বেবি! কী হয়েছে তোমার? তুমি এই মাঝরাতে একা কেন? তোমার সাথে কি কেউ আসেনি?’
নিযানা নির্জীব। ভাঙা গলায় পালটা প্রশ্ন করল, ‘কেন? এখন কি নিজের বাড়িতে আসাও মানা? দিনক্ষণ ঠিক করে অনুমতি নিয়ে আসতে হবে?’
মেয়ের এমন রুক্ষ জবাবে আনতাসা চমকে উঠলেন। নওয়াজ চৌধুরী পরিস্থিতি সামাল দিতে নরম সুরে বললেন,
‘না না সোনা। তা কেন হবে? এসো, ভেতরে এসো।’
নিযানা আর কোনো বাক্যব্যয় করল না। দ্রুত পায়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে সে সোজা সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। আনতাসা পেছন থেকে ডাকলেন,
‘তুমি কোথায় যাচ্ছ নিযানা?’
নিযানা কোনো উত্তর দিল না। এক প্রকার দৌড়ে নিজের ঘরে ঢুকে সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিল। দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে মেঝের ওপর বসে পড়ল। চোখ দুটো বন্ধ করতেই কলরবের সেই স্বীকারোক্তি কানে বাজতে শুরু করল। এক অসহ্য অস্থিরতা তাকে যেন গ্রাস করে নিল মুহূর্তেই। উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের ফুলদানি, বইপত্র আর যা কিছু সামনে পেল। সব লন্ডভন্ড করে দিল। এক সময় ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে এল তার। বিছানায় ধপ করে শুয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। কলরব কীভাবে পারল তাকে এভাবে ঠকাতে? নিযানা তো ভেবেছিল সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। হয়তো এভাবেই তাদের মাঝে একটা সুন্দর বন্ধন গড়ে উঠবে। কিন্তু সবটাই ছিল মরীচিকা। কলরব একটুও পালটায়নি। সে কারণেই হয়তো অবলীলায় তাকে এড়িয়ে চলে। কথায় কথায় ডিভোর্সের কথা বলে। আর সে বোকার মতো কত অপমান নিয়ে আশায় বেঁচেছে। তীব্র যন্ত্রণায় নিযানার মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতরটা যেন পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে তার। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে ভীষণ। নিচতলা থেকে নওয়াজ চৌধুরী আর আনতাসার উচ্চকণ্ঠ ভেসে আসছে। মেয়েকে এমন অবস্থায় দেখে তাঁরা নিজেদের মাঝেই বিবাদে জড়িয়ে পড়েছেন। কিন্তু নিযানা এখন এসবের ঊর্ধ্বে। সে শুধু এক গভীর শূন্যতার মাঝে ডুবে যাচ্ছে।
পূর্বাকাশে ভোরের সূর্য রক্তিম আভা ছড়াচ্ছে। গতকালের মেঘলা আকাশের গুমোট ভাব কেটে গিয়ে চারপাশ ঝলমলে রোদে উদ্ভাসিত। বাগানের পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত। নিদ্রাভঙ্গ হতেই দিয়া দেখল সে তার পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় দুই মানুষের সাথে শুয়ে আছে। নবনী তার পাশে। তার ওপাশে দিব্য। শোয়া থেকে উঠে বসতেই ওর ডাগর চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। সে কি স্বপ্ন দেখছে? দুহাতে চোখ কচলে নিয়ে আবারও তাকাল। না! স্বপ্ন নয়! ওর ছোট্ট ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। মুখটা খুশিতে ঝলমল করে উঠল। নবনীর মুখের ওপর এলোমেলো কিছু চুল এসে পড়েছিল। দিয়া খুব সাবধানে, কোমল স্পর্শে চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে নবনীর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ল। আলতো করে চুমু খেল গালে। একবার চুমু দিয়ে তৃপ্তি হলো না। একটু হেসে আবারও আদর করল। ঘুমের ঘোরেই নবনী মুখটা একটু কুঁচকে নিল। তা দেখে দিয়া বেশ আনন্দিত হলো। সে আবারও নবনীর গালে ঠোঁট ছোঁয়াল। দিব্যর ঘুম ততক্ষণে ভেঙে গেছে। মেয়ের এই অদ্ভুত সুন্দর কাণ্ড দেখে সে মৃদু হেসে ফিসফিসিয়ে বলল,
‘কী চলছে এখানে, মা?’
দিয়া চমকে উঠে বাবার দিকে চাইল। একগাল হেসে বলল,
‘পাপ্পা, গুড মর্নিং!’
‘গুড মর্নিং সোনা। কিন্তু তুমি কী করছিলে?’
দিয়া তর্জনী দিয়ে নবনীকে দেখিয়ে আদুরে গলায় বলল,
‘দেখো পাপ্পা, ঘুমিয়ে থাকা মাম্মাকে কত প্রিটি লাগছে। কত শান্ত! তাই দিয়া ওকে আদর করে দিচ্ছি। ঘুমিয়ে থাকলে মাম্মা কত ভালো আর রেগে থাকলে মাম্মা একদম পঁচা!’
ততক্ষণে নবনী পুরোপুরি জেগে উঠেছে। বাবা-মেয়ের এই কথোপকথন তার কানে গেছে অস্পষ্ট। দিয়াকে ওরকম কাঁচুমাচু হয়ে বসে থাকতে দেখে পাহাড় সমান অপরাধবোধ চেপে বসল নবনীর মনে। শোয়া থেকে উঠে বসলো। দিয়া তাকে দেখেছে। সে কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই দিয়া খাট থেকে নেমে নিচে দাঁড়াল। নিজের ছোট্ট দুহাতে নিজের দু-কান শক্ত করে ধরল সে। ছলছল চোখে চেয়ে ধরা গলায় বলল,
‘স্যরি মাম্মা। দিয়া আর কোনোদিন দুষ্টুমি করবে না। তুমি প্লিজ প্লিজ আর রাগ করে থেকো না। তুমি রাগলে দিয়ার খুব কষ্ট হয়। দিয়া খুব খুব স্যরি। এখন কি আমাকে কোলে নেবে? আদর করবে? দিয়া কি কান ধরে ওঠবস করে দেখাবে মাম্মা?’
নবনীর বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। সহস্র কাঁটা এসে বিঁধলো যেন সেখানে। চোখের কার্নিশ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। দিয়া সত্যি সত্যিই ওঠবস করতে উদ্যত হতেই নবনী বিদ্যুৎবেগে খাট থেকে নেমে ওকে দুই বাহুতে আগলে নিল। বুকের মধ্যে পিষে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল নবনী। মেয়ের মাথায় মুখ গুঁজে অস্ফুট স্বরে বলতে লাগল,
‘না না সোনা, একদম না! মাম্মা তোমার ওপর একটুও রেগে নেই। মাম্মাকে ক্ষমা করে দাও সোনা। আমিই বড্ড পঁচা। আই এম সো স্যরি সোনা, সো স্যরি! স্যারি।’
নবনীর কান্নার বেগ আরও বেড়ে গেল। হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। গতকালের সেই কঠোরতা আর নিজের আচরণের কথা মনে পড়তেই তার তীব্র ঘৃণা আর রাগ হচ্ছিল নিজের ওপর। দিব্য অপ্রস্তুত হয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
‘নবনী, এখন বাচ্চাদের মতো কান্নাকাটি কোরো না তো। তোমার মা এখনই চলে আসবে। সবাই কী ভাববে বলো তো? প্লিজ স্টপ।’
নবনীর মেজাজটা এবার সত্যি খিটখিটে হয়ে উঠল। এই লোকটার কাছে আবেগের যেন কোনো মূল্যই নেই! এই অবস্থায়ও সে যুক্তির কথা বলছে। নবনী নিজের কান্নার তোড় সামলাতে না পেরে দিয়ার কপালে, গালে আর সারা মুখে অজস্র চুমু খেতে লাগল। দিয়া তার ছোট্ট হাত দিয়ে নবনীর চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,
‘তুমি কেঁদো না মাম্মা। আমি পাপ্পাকে খুব বকে দেব, দেখো!’
দিব্য অসহায় ভঙ্গিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে কৃত্রিম আক্ষেপের সুরে বলল,
‘সব দোষ কি আমার? আমাকে কেন শাস্তি দেওয়া হচ্ছে? এমনিতে মাম্মাকে এত এত আদর করা হচ্ছে অথচ আমার ভাগে তো কিছুই জুটল না!’
নবনী ভেজা চোখে একবার দিব্যর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
‘হিংসুটে একটা লোক!’
দিব্য হতাশ গলায় বলল, ‘হ্যাঁ, তুমি তো বড্ড দয়াবান! মেয়ে তার বাবার কথা জানতে চেয়েছে বলে তুমি তাকে ডিভোর্স দিতে যাচ্ছিলে। আর শোনো, মনের কথা কেউ এত আস্তে বলে না কি? আমরা কেউ শুনিনি।’
নবনী লজ্জিত হয়ে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াল। দিয়া বলল,
এই অবেলায় পর্ব ৩২
‘মাম্মা, ওয়াশরুম যাব।’
নবনী তৎক্ষণাৎ ওকে কোলে তুলে নিয়ে আদুরে গলায় বলল,
‘আচ্ছা চলো সোনা, চলো।’
ওরা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই দিব্যর ঠোঁটে এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। বুকভরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
