রুপুর বিয়ে পর্ব ২৫
Bobita Ray
বড়ছেলের চিন্তায় বীথি রানীর খুব অস্থির লাগছে। ছেলেটা স্পষ্ট করে কিছু বলছেও না। আবার ছেলের চুপ করে থাকা বীথি রানীর সহ্যও হচ্ছে না। ছেলেটা আজ সারাদিন শো-রুমে গেল না। ঠিকমতো ভাত খেল না। চোখদুটো লাল লাল, মুখটা শুকনো। হঠাৎ কী এমন হলো বিনয়ের? এমন ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে কেন? বীথি রানী কতভাবে বিনয়ের গায়ে মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করল।
“তোর কী হয়েছে বাবা?”
“শরীরটা ভালো লাগছে না মা।”
“কী হয়েছে শরীরে? গায়ে তো জ্বর নেই। কোথায় কোথায় খারাপ লাগছে?”
বিনয়ের বিরক্ত লাগছে খুব। কানের কাছে মায়ের ঘ্যান ঘ্যান এইমুহূর্তে অসহ্য লাগছে। খুব করে বলতে ইচ্ছে করছে। তুমি এখন ঘরে যাও তো মা। এতকথা বলতে আমার ভালো লাগছে না। কথাগুলো মাকে বলতে না পারার জন্যও নিজের উপরে মেজাজ খারাপ লাগছে। রুপুটা কেন বিনয়কে দেখতে পারে না? কেন কারণে-অকারণে বিনয়কে কঠিন কঠিন কথা শোনায়, কেন আজ সকালে নিজের সম্পর্কে এমন একটা নোংরা কথা বলল? আচ্ছা বিনয় কী এতই খারাপ? রুপুকে একটা নোংরা কথা বলার জন্য কতগুলো নোংরা কথা বিনয়কে কঠিনভাবে শুনিয়ে দিল রুপু। কথাগুলো বলার সময় কী ওর একটুও বুক কাঁপল না? রুপুর মুখে
কথাগুলো শোনার পর থেকেই বিনয়ের মনে একবিন্দু শান্তি নেই। বুকের ভেতর হাহাকার।
কী করলে রুপু বিনয়কে ক্ষমা করবে। কী করলে বিনয়কে রুপুর কাছে সহজ ভাবে যেতে দেবে। চিন্তায় চিন্তায় বিনয়ের নিজেকে পাগল পাগল লাগছে।
“বিনয় বিনয়..”
বিনয় চোখ বন্ধ করে ঘাপটি মেরে শুয়ে রইল। বিনয় যে জেগে আছে এখন মাকে কোনভাবেই বুঝতে দেওয়া যাবে না। নাহলে সারাক্ষণ কথা বলে বিনয়ের মুখ থেকে আসল কথা টেনে বের করবে মা। মাকে রুপুর সম্পর্কে এত নোংরা কথা বলতে ইচ্ছে করতেছে না। রুপুটা যেমনই হোক। বিনয়েরই তো বউ। ওর সম্মান বজায় রাখার দায়িত্ব বিনয়ের। মায়ের কাছে সবকথা বলা গেলেও এইকথা বলা যাবে না। কোনভাবেই বলা যাবে না।
ছেলের ভাবগতিক বীথি রানীর কাছে মোটেও ভালো ঠেকছে না। রুপুকে যে জিজ্ঞেস করবে। কী হয়েছে বিনয়ের সে উপায়ও নেই। মেয়েটা যে ক্যাট ক্যাট করে কথা বলে। হাসিমুখে এমন এমন কথা বীথি রানীকে শুনিয়ে দেবে। লজ্জার শেষ থাকবে না। প্রথমেই চোখদুটো কপালে তুলে বলল,
“একি কাণ্ড! মা ভক্ত ছেলে মাকেই এতবড় কথা লুকাল? এটা তো ভালো লক্ষ্মণ না। ঠিক করে বলুন তো, আপনার ছেলে এবারই কী প্রথম আপনার কাছে কিছু লুকাল? নাকি এর আগেও লুকিয়েছে? আপনার জন্য আমার এখন সত্যি সত্যি খুব চিন্তা হচ্ছে মা।”
রুপুর কথা ভাবতে গিয়েই বীথি রানীর মেজাজ খারাপ হলো। এভাবে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার কোন মানে হয় না।
বীথি রানীর ছোটবোন ইতিকে একটা ফোন করা যাক। ওর যে বুদ্ধির ধার। একটা না একটা উপায় ঠিকই বের করে ফেলবে।
বীথি রানী কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে ফোনে বলল,
“ইতি ইতিরে? তুই কী আমাদের বাসায় একবার আসতে পারবি?”
“এখন তো কোনভাবেই সম্ভব না বড়দি।”
“আয় না একবার। আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি৷ উত্তরা থেকে পুরান ঢাকা আসতে খুব বেশি সময় লাগবে না।”
“কী হয়েছে বলতো?”
বীথি রানী মুখে আঁচল চাপা দিয়ে বলল,
“আমার সোনার টুকরা ছেলেটার হঠাৎ কী হলো বুঝতে পারতেছি না। আজ সারাদিন শুয়ে আছে। ঠিকমতো ভাত খেলো না। ওর বাবার সাথে শো-রুমে গেল না। আমার খুব চিন্তা লাগতেছে।”
“কী আর হবে! দ্যাখ রাতে বউয়ের সাথে বোধহয় ঝগড়া-টগরা হয়েছে।”
“না। রাতে ঝগড়া হয়নি।”
“তুই কীভাবে জানলি রাতে ঝগড়া হয়নি। তুই কী রাতে ওদের সাথে ছিলি নাকি?”
বীথি রানী আমতা আমতা করে বলল,
“না মানে…হ্যাঁ মানে.. বিনয়ের বউ..”
ইতির কৌতূহল বেড়ে গেল। বিস্ময় চেপে বলল,
“বিনয়ের বউ কী?”
“আমাকে ওর সাথে শুতে বলল।”
“আর তুই ওমনি ছেলে-ছেলের বউয়ের কাছে শুয়ে পড়লি? ছিঃ বড়দি।”
বীথি রানী মিইয়ে যাওয়া গলায় বলল,
“ছিঃ ছিঃ করছিস কেন? আমি তো ইচ্ছে করে ওদের সাথে ঘুমাইনি। তাছাড়া খাটও আলাদা ছিল।”
“আলাদা খাট ছিল মানে? ওদের ঘরে আরেকটা খাট পাতা হয়েছে নাকি?”
“হুঁ।”
“কেন?”
“ফোনে এতকথা বলতে পারব না। তুই বাড়ি এসে দেখে যা। আমি গাড়ি পাঠাচ্ছি।”
ইতি এসেছে ঘণ্টাদুই আগে। রুপুর নামে সব ধরনের বদনাম করার জন্য এই দুইঘণ্টাই বীথি রানীর কাছে যথেষ্ট। কাঁদতে কাঁদতে চোখের জল নাকের জল এক করে বোনের কাছে রুপুর নামে একনাগাড়ে কতকিছু বলে গেল বীথি রানী। সবশুনে ইতি বলল,
“তোর বউমাকে দেখে বোঝা যায় না কিন্তু। এত খারাপ।”
“প্রথম দেখেছিস তো। তাই বুঝতে পারছিস না। থাক আজকের দিনটা। দেখবি ডাইনির মুখের কী ভাষা।”
“বিনয় বউকে কিছু বলে না?”
“কী বলবে। ওকে তো এক ধমক দিয়েই চুপ করিয়ে রাখে। আমার কী মনে হয় জানিস? আমার ছেলেটাকে হাতে রাখতে তাবিজ-টাবিজ কিছু করে ফেলেছে।”
“কী বলছিস কী?”
“সত্যি বলছিরে..”
“এত বিপদজনক বউ নিয়ে সংসার করছিস কীভাবে?”
“আস্তে বল। শুনলে ঝগড়া বাঁধিয়ে দেবে। যে খারাপের খারাপ। আমি ভালো দেখেই এখনো এই বউ নিয়ে মুখ বুঁজে সংসার করে খাচ্ছি। আমার জায়গায় তুই থাকলেই পারতি না।”
“কাঁদিস না বড়দি।”
“কাঁদি কী আর সাধে? বিয়ের দিন মুখ দেখেই বুঝেছিলাম। এই বউ ভালো হবে না। অলক্ষ্মী ডাইনি আমার সোনার টুকরা ছেলেটার কপালে জুটবে কে জানতো।”
“বাচ্চাকাচ্চা যেহেতু এখনো হয়নি। তাহলে ছারাখারা করিয়ে দে।”
“দিতে পারলে তো বাঁচতাম। আমার গাদা ছেলেটা মনে হয় না ছাড়বে।”
“ছেলের কাছে বউয়ের ভুলগুলো চোখে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দে। ছেলের কাছে আবদার কর। দেখবি বউয়ের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে নিজেই ছেড়ে দিতে চাইবে।”
“সাতচুন্নিটা কিছুতেই আমার ছেলের ঘাড় থেকে নামবে না। শেষে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।”
“কেলেঙ্কারি যেন নাহয় সেই ব্যবস্থা তোকেই করতে হবে।”
“কী যে শখ ছিল। আমার বিনয়ের জন্য একটা পুতুলের মতো সুন্দর বউ আনব। অথচ কপালে জুটল। সাক্ষাৎ মা কালী।”
“শখ পূরণ করার সময় তো চলে যাচ্ছে না। ছেলেকে সুন্দর দেখে আবার বিয়ে দে। আমার ভাসুরের মেয়েটাকে তো দেখেছিস। পুতুল নাম। যেমন সুন্দর রুপ। তেমন বিরাট বড়লোক ঘরের মেয়ে। পুতুলের সাথে যদি কোনভাবে বিনয়ের বিয়ে দেওয়া যায়। তাহলে তোদের কপাল খুলে যাবে রে বড়দি। বাংলাদেশে ভাত খাবি। বিদেশে গিয়ে হাগবি। এলাহি কাণ্ড। আমার ভাসুর টাকার পাহাড় করে ফেলেছে। ওদের কাছে বিদেশ যাওয়া ডাল-ভাত। মেয়েকে সোনা দিয়ে মুড়িয়ে দেবে। সাথে তোকেও।”
লোভে বীথি রানীর চোখদুটো চকচক করে উঠল। বলল,
“সবই তো ঠিক আছে। কিন্তু মেয়েটার তো চরিত্র ভালো না। শুনেছি দুইবার পেট ফেলেছে।”
“ওহ তুমি আগুন সুন্দরী বউও চাও, কোটিপতি বউয়ের বাপের বাড়ি চাও। আবার সাথে বউয়ের চরিত্রও ভালো চাও। একসাথে তো এতকিছু পাওয়া যাবে না বড়দি। তাছাড়া পুতুল তো ইচ্ছে করে পেট বাঁধায়নি। ওকে রেপড করা হয়েছে।”
“রেপ না ছাই। ও মেয়ে তো বয়ফ্রেন্ডের হাত ধরে বাড়ি থেকে কয়বার পালাইছে। তার কোন হিসাব নাই।”
“তাহলে আর কী করার। তুমি এই ডাইনি, কুটনি দজ্জাল বউ নিয়েই সংসার করো। ভালো একটা পাত্রীর খোঁজ দিলাম৷ মনে ধরল না। বড়লোকের মেয়েরা সংসার নিয়ে মাথা ঘামায় না। বুঝলি তো বড়দি। এই মেয়ে বউ হলে পাঁচটা কাজের লোক সাথে নিয়ে তোর বাড়িতে আসত। তোর সংসার তোরই থাকত।”
পুতুলের মতো বউ বীথি রানীর ভাগ্যে জুটেনি দেখে বীথি রানী বুকচিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
রুপু চা নিয়ে এসে ইতি মাসির সামনে নামিয়ে রাখল। ইতি মাসি অসময়ে রুপুকে দেখে চমকে উঠল। ভয় পাওয়া কণ্ঠে বলল,
“তুমি কখন এলে?”
রুপু মিষ্টি করে হাসল৷ ইতি মাসির সামনে বসতে বসতে বলল,
“যখন আপনার ভাগ্নের বিয়ের ঘটকালি করছিলেন তখনই এসেছি। নিন নিন চা নিন, চা-টা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে তো। বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে হয় আরাম করে বসে চা খেতে খেতে।”
রুপু চায়ের কাপে ছোট ছোট চুমুক দিয়ে বলল,
“মা আপনার কিন্তু মাসির ঘটকালিতে রাজি হয়ে যাওয়া উচিত। এত ভালো সম্বন্ধ হাতছাড়া হয়ে গেলে তো আবার আমাকেই দোষারোপ করবেন।”
বীথি রানীর প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে। কুল কুল ঘামছে। জড়ানো কণ্ঠে বলল,
“কী কী বলতে চাইছ তুমি?”
রুপু চা খেতে খেতে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“আপনার একটা সুন্দর বউমার খুব শখ। আমাকে দিয়ে শখটা তো আর পূরণ হলো না। প্রমিস আপনি যদি পুতুলকে আপনার বড়ছেলের বউ করে আনেন। তাহলে আমি একটুও আপত্তি করব না। হাসিমুখে আমি ওদের বিয়েটা মেনে নেব।”
রুপু তো এত সহজে মেনে নেবার পাত্রী না। হঠাৎ কী হলো রুপুর? বীথি রানীর মনে একফোঁটা শান্তি লাগছে না। রুপুর চুপ করে থাকাটা কোন বড়সড় ঝড়ের পূর্বাবাস নয়তো? রুপু মনের সুখে পা নাচাতে নাচাতে বলল,
“আপনারা সবগুলো বোনই দেখতে খুব কুৎসিত। অসুন্দর। নাকগুলো এবড়ো থেবড়ো। তার উপরে খাটো। আমার ধারণা আয়নায় বোধহয় আপনারা নিজের চেহারা ভালো করে দেখেন না। তাই অন্যের চেহারা নিয়ে সমালোচনা করেন। সে যাইহোক.. আপনার বড়ছেলের যেমন সুন্দরী বউ পাওয়ার অধিকার আছে। তেমন আমার শ্বশুর আর মেসোশ্বশুরেরও আছে। আগে আপনার বড়ছেলের বিয়েটা ভালোই ভালোই হোক। তারপর ঘটা করে আমার শ্বশুর আর মেসোশ্বশুরকেও আমি নিজে সুন্দরী মেয়ে দেখে বিয়ের ব্যবস্থা করে দেব। এত কুৎসিত বউ নিয়ে তারা যৌবনকাল নষ্ট করেছে। তারউপরে যৌতুকও মনে হয় পায়নি। বৃদ্ধকালটা অন্তত সুন্দরী বউ নিয়ে সুখে শান্তিতে সংসার করে যাক। এই ব্যাপারে আমি আজই বাবার সাথে কথা বলব। আমার মনে হয় না বাবা আপত্তি করবে।”
ইতি মাসি একচুমুক চা কেবলই মুখে নিয়েছিল। রুপুর মুখে ভয়ংকর কথাগুলো শুনে চা-টুকু ভুলে পুচকুনি মেরে বীথি রানীর মুখের উপরে ছিটিয়ে দিল। গরম চা আচমকা বীথি রানীর মুখে পড়তেই ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠল। দুইবোনের কাণ্ড দেখে রুপু শব্দ করে হেসে ফেলল। দ্বিগুণ উৎসাহে বলল,
“মাসি মেসোর নম্বরটা দিনতো? বিয়ের ব্যাপারে আমি একটু মেসোর সাথে কথা বলব। তার কেমন মেয়ে পছন্দ সেটা তো আর আমি জানি না। মেসোর কাছ থেকে জেনে নিয়ে মেয়ে খোঁজা শুরু করে দেব। বুড়ো বয়সে তারা কচি সুন্দরী বউ পেয়ে কী যে খুশি হবে। আমার ভাবতেও আনন্দ লাগছে।”
বীথি রানী স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। রুপুকে ধমক দিতে পর্যন্ত ভুলে গেল। ইতির মাথা ঘুরছে৷ এখানে আর একমুহূর্ত বসে থাকা সম্ভব না। বড়দি ঠিকই বলেছে, বিনয়ের বউ সাঙ্ঘাতিক। ইতির মনে হচ্ছে সাঙ্ঘাতিকের উপরেও যদি কোনকিছু থাকে তাহলে এই মেয়েটা তাই। বাপরে কথার ধার। এত আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথাগুলো বলল, এখন ইতির ভয় করছে। যদি বিয়নের বউয়ের মুখে বিনয়ের বাবা আর মেসো নিজেদের বিয়ের কথাশুনে সত্যি সত্যি রাজি হয়ে যায়। না না ইতিকে এখুনি উঠতে হবে। বিরাট বড় সর্বনাশ হয়ে যাবার আগে বাড়ি চলে যেতে হবে। মনে লজ্জা থাকলে বিনয়ের মেসোকে নিয়ে জীবনেও এই বাড়িতে আসবে না ইতি। জীবনেও না।
রুপু আজ যে ভয় দেখিয়েছে। বীথি রানী রাতে নিজের বরকে ফেলে রুপুর কাছে ঘুমাতে যেতে সাহস পেল না। আর না বিনয়ের বাবাকে রুপুর সাথে খুব বেশি কথা বলতে দিল। সারাক্ষণই বিনয়ের বাবাকে চোখে চোখে রাখল বীথি রানী। বুড়ো বয়সে সতীন নিয়ে সংসার করার কোন শখ নেই বীথি রানীর। কোনকালে ছিলও না।
রাতে বিধানবাবু বিছানায় আধশোয়া হয়ে কতক্ষণ ফেসবুক দেখে। বীথি রানী পান সাজিয়ে দিল। বিধানবাবু পানের খিলি হাতে নিয়ে উঠে বসল। তখনই বীথি বিধানবাবুর কোলে বসে দুইহাত দিয়ে আহ্লাদী ভঙ্গিতে গলা জড়িয়ে ধরল। বিধানবাবু বীথির বাচ্চামো দেখে হেসে ফেলল। বলল,
“হঠাৎ আজ এত আদর?”
বীথি রানী লজ্জা পেয়ে বিধানবাবুর বুকে মুখ গুঁজে বলল,
“এমনি।”
“আজও কী ছেলের ঘরে ঘুমাতে যাওয়ার পাঁয়তারা করছ নাকি?”
“না না আর যাব না।”
বিধানবাবু শব্দ করে হেসে ফেলল। মন ভালো করা হাসি। বলল,
“একদিনেই শখ মিটে গেছে?”
“শখ মিটবে কেন? বুড়ো বয়সে নিজের বরকে ঘরে একা রেখে ছেলের ঘরে গিয়ে শোবার কোন মানে হয়?”
রুপু শাশুড়ী মায়ের ঘরের সামনে এসে দরজা ধাক্কাধাক্কি করতে করতে বলল,
“মা মা দরজা খুলুন? আজ ঘুমাবেন না আমার সাথে?”
রুপুর কণ্ঠ শুনে বীথি রানী ভয় পেয়ে শুকনো ঢোক চিপল। বিধানবাবুকে জাপ্টে ধরে বলল,
“তুমি এখন কোনভাবেই দরজা খুলবে না।”
“এমন করছ কেন বীথি? ছাড়ো আমাকে। রুপু মা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরে এসে কথা বলুক।”
“না না.. ওর এখন ঘরে আসার কোন দরকার নেই। তুমি ওকে চলে যেতে বলো। বলো আমি এখানেই ঘুমাব।”
“তুমিই বল।”
“আমি বলতে পারব না। তুমি বলোতো।”
বিধানবাবু হেসে ফেলল। বলল,
“ছেলের বউয়ের কাছে নিজের বউকে নিয়ে ঘুমানোর কথা বলতে কেমন লজ্জা লজ্জা লাগছে।”
বীথি রানী বন্ধ দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। মিথ্যে করে বলল,
“তোমার শ্বশুরের শরীরটা বেশি ভালো না। আমি এখন যেতে পারব না। তুমি ঘরে যাও।”
“সেকি মা! আপনি শুবেন দেখে আমি বিছানা পাতলাম। এখন না শুলে আমার খারাপ লাগবে।”
মহা যন্ত্রণায় পড়া গেল তো। বীথি রানী কড়া কণ্ঠে বলল,
“তোমার খারাপ লাগায় আমার কিছু যায় আসে না। তুমি এখন ঘরে যাও। ঘরে যাও বলছি।”
“আপনি দরজা খুলুন তো মা। আপনার শুকনো ফলের কৌটা আর চানাচুরের বৈয়াম দিতে এসেছি।”
“আমার কিছুই লাগবে না৷ তুমি দয়া করে ঘরে যাও।”
“বাবাকে একটু বাইরে বের হতে বলুন। আমি বাবার সাথে একটু কথা বলি।”
অতিরিক্ত ভয়ে বীথি রানীর চোখ-মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। রাগে শরীর কিড়মিড় করছে। ভয় আর রাগ মিলেমিশে বীথি রানীর মনে অন্যরকম ভাবতরঙ্গ তৈরি হলো। ইচ্ছে করছে ঠাস করে রুপুর গালে একটা থাপ্পড় মেরে দিতে। বেয়াদব মেয়েটা রাতদুপুরে শ্বশুরের সাথে শ্বশুরের বিয়ের আলাপ করবে। সে-কি আর বীথি রানী জানে না।
শাশুড়ী মায়ের রাগী রাগী মুখটা কল্পনা করে রুপুর খুব আনন্দ লাগছে। শাশুড়ী মাকে রাগের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে দিতে বলল,
“কী হলো মা দরজাটা খুলুন? আমার বাবার সাথে সত্যিই খুব জরুরি একটা কথা আছে।”
বিধানবাবু দরজায় হাত রেখে বলল,
“সরো তো বীথি। দরজাটা খুলে দেখি.. মেয়েটা আমাকে কী বলতে চায়।”
বীথি রানীর এখন নিজের মাথার চুল নিজেরই টেনে ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে। কোন কুক্ষণে যে ইতিকে আজ বাড়িতে ডেকেছিল বীথি৷ গাধিটা বীথি রানীর কতবড় সর্বনাশ করে দিয়ে চলে গেল। বীথি রানী শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে বিধান বাবুর দুইহাত চেপে ধরল। হড়বড় করে বলল,
“খুলবে না খুলবে না.. কিছুতেই দরজা খুলবে না তুমি।”
“আহা বীথি তুমি এমন করছ কেন?”
রুপুর বিয়ে পর্ব ২৪
“তোমাকে আমার মাথার দিব্যি। এখন কিছুতেই দরজা খুলবে না তুমি।”
বিধানবাবু হতাশ হয়ে বলল,
“রুপু মা তুমি এখন ঘুমাতে যাও। আমি আগামীকাল সকালে তোমার কথা শুনব।”
রুপু খুশিমনে মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেল। শাশুড়ী মা আজ কঠিন জব্দ হয়েছে। কম করে হলেও আগামী এক সপ্তাহ বাবাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে শাশুড়ী মা।
