Home রুপুর বিয়ে রুপুর বিয়ে পর্ব ২৬

রুপুর বিয়ে পর্ব ২৬

রুপুর বিয়ে পর্ব ২৬
Bobita Ray

বিনয় ঘর অন্ধকার করে শুয়েছিল। রুপু ঘরে এসে লাইট জ্বালাতেই বিনয় হুড়মুড় করে উঠে বসল। রুপু বিনয়কে দেখেও দেখল না। নিজের মনে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে চুল বাঁধতে বসল। বিনয় এক দৃষ্টিতে আয়নার দিকে তাকিয়ে রইল। ওই-তো আয়নায় রুপুর সুন্দর মায়াকাড়া মুখটা দেখা যাচ্ছে। মন বলছে, বিনয়ের এখন রুপুর কাছে যাওয়া উচিত। ওকে আচমকা শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেই মোমের মতো গলে যাবে। নিজেকে সঁপে দেবে বিনয়ের বাহুডোরে। সবভুলে বিনয়কে আপন করে নেবে। কিন্তু রুপুর কাছে যাওয়ার সাহস হচ্ছে না। রুপু যদি কটুকথা শুনিয়ে দেয় কিংবা রামধমক দেয়। বিনয়ের হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। নানান রকম দুশ্চিন্তায় মাথা কাজ করছে না।
একি রুপু তো শুয়ে পড়বে। বিনয় প্রাণপনে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল। বলল,

“রুপু?”
রুপু বিছানায় উঠে আরাম করে বসল। বলল,
“কিছু বলবে?”
বিনয় কোনভাবেই জড়তা কাটিয়ে উঠতে পারছে না। বিড়বিড় করে বলল,
“তুমি কী এখন ঘুমাবে?”
“হুঁ।”
বিনয়ের বুকের ভেতর ধড়ফড় করছে। রুপুকে এইমুহূর্তে কিছু কথা বলা দরকার। কথাগুলো বলতে না পেরে বুকের ভেতরে গুমোট বেঁধে আছে। মাথায় চাপা যন্ত্রণা হচ্ছে। বিনয় হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে মুখের ঘামটুকু মুছে নিল। মনে সাহস সঞ্চয় করে বলল,
“তুমি কী আমার পাশে শুবে রুপু?”
রুপু মিষ্টি করে হাসল। হাসির রেশ সহজে রুপুর মুখ থেকে মিলিয়ে গেল না। বিনয় মুগ্ধ দৃষ্টিতে রুপুর হাসিমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। রুপু বলল,

“কেন শুবো না। তুমি বললে অবশ্যই শুবো। তুমি তো আবার আমার সাজগোজ পছন্দ করো না। শাড়ি একটানে খুলে ফেলি, কী বলো? ন্যাংটা হয়ে তোমার পাশে শুলে নিশ্চয়ই তোমার খুব ভালো লাগবে।”
বিনয় বিস্ফোরিত চোখে রুপুর দিকে তাকিয়ে রইল। ওর সমস্ত শরীর শিরশির করে উঠল। অতিরিক্ত লজ্জা অপমানে চোখে জল এসে গেল। রুপুটা সত্যিই অন্যরকম। নাহলে একটা ভুলের জন্য নিজের বরকে হাসিমুখে এত কঠিন কঠিন কথা শুনাতে পারত না। কোন মেয়ের ক্ষেত্রেই সম্ভব না। এই অসম্ভব কাজটা রুপু করছে। খুব ভালোভাবেই করছে।
বিনয় চোখের জল মুছে বড় বড় করে নিঃশ্বাস ফেলল। ভেজা কণ্ঠে বলল,
“তুমি.. তুমি আমাকে কী ভাবো?”
“সত্যিই জানতে চাও?”
“হ্যাঁ জানতে চাই।”
“থাক, তোমার মন খারাপ হয়ে যাবে।”
“তাহলে তুমি নিজের জেদ নিয়েই থাকবে?”

“জেদ তো করছি না। তুমি যা বলছ তাতেই তো রাজি হয়ে যাচ্ছি। দেখি টাকার এমাউন্টটা?”
রুপু হাত বাড়িয়ে দিল। বিনয় আচমকা রুপুর হাতটা মুচড়ে ধরল। রুপু ব্যথায় কুঁকড়ে গেল। তবু টু শব্দটিও করল না। বিনয় রুপুর হাতখানা ছেড়ে দিয়ে রুপুর পায়ের কাছে বসে পড়ল। দুহাত দিয়ে জাপ্টে ধরল রুপুর পাদু’টো। রুপু অনুভূতিশূণ্য শক্ত কাঠের পুতুলের মতো বসে রইল। কোন ভাব আবেগই এখন আর রুপুকে স্পর্শ করছে না। বিনয় ভেজা কণ্ঠে বলল,
“কী করলে ক্ষমা করবে আমাকে তুমি? আমি রাগের মাথায় যে নোংরা কথাটা তোমাকে বলেছি। সেই একই কথা তুমি আমাকে হাজারবার বলো। প্রমিস আমি একটু টু শব্দও করব না। তবুও ক্ষমা করো প্লিজ।”
রুপু হাই তুলে বলল,

“তোমার সেন্টিমেন্টাল ড্রামা শেষ হয়ে থাকলে আমার পা ছাড়ো প্লিজ… আমার প্রচুর ঘুম পাচ্ছে।”
হতভম্ব বিনয়কে পাশ কাটিয়ে রুপু শুয়ে পড়ল। রুপুর চোখদুটো ঘুমিয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে। বাইরে থেকে থেকে মেঘ ডাকছে। কে জানে আজরাতে হয়তো বৃষ্টি হবে। ঝুমবৃষ্টি।
অথৈয়ের ফোনটা তখন থেকে বেজেই চলেছে। এটা যদিও অথৈয়ের নিজের ফোন না। আগে দিদির ফোন ছিল। দিদির বিয়ে ঠিক হবার পর দিদির শ্বশুরবাড়ি থেকে দিদিকে নতুন একটা ফোন গিফট করল। তখন থেকেই এই ফোনটা অলিখিত ভাবে অথৈয়ের হয়ে গেল। অপরিচিত নম্বর। রাতদুপুরে অনেক আজেবাজে ধরনের ছেলে ফোন করে মেয়েলি কণ্ঠ পেলেই খারাপ খারাপ কথা বলে। এই ধরনের ফোনও হতে পারে। অথৈ ফোন রিসিভ করবে না করবে না ভেবেও কী মনে করে যেন ফোন রিসিভ করে চুপ করে রইল। অয়ন বলল,
“হ্যালো.. হ্যালো বেয়াইন সাব, তুমি কী আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?”
অথৈ বিরক্তি চেপে বলল,

“এতরাতে ফোন দিয়েছেন কেন? এতরাতে আমার কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না।”
“কেউ আর আমি কী এক হলাম? হ্যালো.. হ্যালো অথৈ প্লিজ ফোন কেটো না।”
“(নিশ্চুপ।)”
“সত্যি করে বলোতো? এই যে দুইদিন আমি তোমার সাথে কোনরকম যোগাযোগ করিনি৷ তোমার কী একটুও মন খারাপ হয়নি?”
“আজব তো। মন খারাপ হবে কেন?”
“সত্যিই একটুও হয়নি? বুকে হাত রেখে বলোতো?”
অথৈ বেখেয়ালে বুকে হাত রাখতে গিয়ে চমকে উঠল। কড়া কণ্ঠে বলল,
“রাতদুপুরে ফাজলামো করার জন্য ফোন দিয়েছেন নাকি?”
অয়ন হেসে ফেলল। মাথা চুলকে কানের সাথে ফোনটা শক্ত করে চেপে ধরল। বলল,

“আগামীকাল আমার সাথে একটা জায়গায় যাবে?”
“না।”
“সত্যিই যাবে না?”
“বললাম তো না।”
“আমার মন বলছে, তুমি যাবে।”
“যাব না.. যাব না.. যাব না।”
“তারমানে তুমি যাবে।”
“আমার কিন্তু প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ হচ্ছে।”
“আমারও হয়। ব্যাপার না।”
“এই ফোন রাখুন তো আপনি।”
“আমি কেন রাখব। তুমি রাখো। অথৈ শোনো?”
“শুনতে-টুনতে পারব না।”
“আমি এখন ফোন রাখলেই তো তুমি ভ্যা ভ্যা করে কাঁদবে।”
অথৈ চমকে উঠল। অথৈয়ের এখন সত্যি সত্যিই কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কেন কাঁদতে ইচ্ছে করছে। অথৈয়ের জানা নেই। তবে কাঁদলে মনটা শান্ত হবে। অল্পবয়সী মেয়েরা অকারণে কাঁদতে ভালোবাসে।
অয়ন বলল,

“আমার কী ধারণা জানো? তুমি আমাকে বেখেয়ালে ভালোবেসে ফেলেছ। কিন্তু বুঝতে পারছ না। কিংবা বুঝতে পারছ। কিন্তু নিজের ভালোবাসার কথা আমাকে বলতে পারছ না। সেই দুঃখ তোমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।”
“আপনাকে ভালোবাসতে আমার বয়েই গেছে।”
“তাই না?”
ইশ, কথার কী ঢঙ। অথৈয়ের গা জ্বলে যায়। অয়ন বলল,
“আগামীকাল বিকেল চারটায়। তোমার বাসার সামনের চায়ের টঙ দোকানে আমি বসে থাকব।”
“থাকুন বসে, আমি যাব না।”
“তুমি আসবে।”
“যাব না, বললাম তো।”
“তুমি আসবে অথৈ।”
“যাব না আমি।”
“তুমি না এলে আমি যে কী করতে পারি। তা তুমি খুব ভালো করেই জানো।”
“কী.. কী করবেন আপনি?”
“সোজা তোমার বাসায় চলে যাব। তোমার বাবা-মাকে বলব তুমি আমাকে ডেকেছ। তারপর বাকিটা ওনারা বুঝে নেবেন।”

“ভয় দেখাচ্ছেন?”
“ভয় না৷ কাজটা যে আমি সত্যি সত্যি করব। তা তুমি খুব ভালো করেই জানো অথৈ। এখন রাখি কেমন?”
অয়ন ফোন রাখতেই অথৈ রাগে ফেটে পড়ল। ফোনের দিকে তাকিয়ে ইচ্ছেমতো কতক্ষণ অয়নকে গালাগালি করল। উজবুকটার কথার কী বাহার। আমার বাবা-মাকে বলবে। আসিস তুই আমার বাড়িতে। তোকে এমন টাইট দেব। সারাজীবন মনে রাখবি। ভালোবাসার কথা বলে দুদিন কোনরকম যোগাযোগ রাখবে না। তারপর হঠাৎ ফোন করে থ্রেড দেবে। ভাব দেখে মনে হচ্ছে, ভালোবাসা উথলে পড়ছে। উথলেই যখন পড়বে। তুই এই দুইদিন কোনরকম যোগাযোগ করলি না কেন? তোর ভালোবাসার নমুনা আমার বোঝা শেষ। কথাগুলো বিড়বিড় করে বলতে বলতে অথৈয়ের চোখে জল এসে গেল। এবং আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করল। এখন ওর কাঁদতে খুব ভালো লাগছে। কাঁদতে কাঁদতে আবার আয়নায় নিজের মুখটা দেখতে আরও বেশি ভালো লাগছে। আয়নার দিকে তাকিয়ে বিভিন্ন রকম অঙ্গিভঙ্গি করে মনের সুখে কাঁদতে লাগল অথৈ।
বিধান বাবু আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করল। বীথি আজ ভোরেই বিধান বাবুর সাথে সাথে ঘুম থেকে উঠেছে। বীথির চোখ-মুখ শুকনো। কী এমন দুশ্চিন্তা করছে বীথি। যার জন্য রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি। আবার উঠেছেও ভোরে।

“এত ভোরে উঠলে কেন বীথি? তোমার কী শরীর খারাপ?”
“না না.. আমি ঠিকই আছি।”
“আরেকটু শুয়ে থাকো। চোখ-মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে রাতে তোমার ঠিকমতো ঘুম হয়নি।”
“ঘুমিয়েছি তো।”
“একি বীথি তুমি আমার পিছু পিছু আসছ কেন? আমি বাথরুমে যাব।”
“আসছি তো কী হয়েছে। আমিও বাথরুমে যাব।”
“ছিঃ ছিঃ একসাথে বাথরুমে যাবে নাকি?”
“ছিঃ ছিঃ করছ কেন? বউ নিয়ে এক বিছানায় ঘুমাতে সমস্যা নাহলে বাথরুমে যেতে কী সমস্যা।”
“সত্যি করে বলোতো, তোমার কী হয়েছে বীথি? গতকাল রাত থেকে দেখছি তুমি অস্বাভাবিক আচরণ করছ।”
“এতকথা না বলে তুমি বাথরুমে যাও।”
বিধানবাবু বাথরুমে যেতেই বীথি রানী আস্তে করে বাইরে থেকে ছিটকানি লাগিয়ে দিল। তারপর তাড়াহুড়ো করে কমন বাথরুমে ফ্রেশ হতে চলে গেল। যে করেই হোক বিধান বাবুর আগে বীথি রানীকে বাথরুম থেকে বের হতে হবে।
রুপু শ্বশুরের হাতে চায়ের কাপ তুলে দিতেই বীথি রানী চোখে-মুখে বিরক্তি ফুটিয়ে বলল,

“চা এককাপ এনেছ কেন? আমাকেও দাও।”
“আমি তো জানতাম, আপনি সকালে চা খান না।”
“এতদিন খাইনি দেখে যে এখনও খাব না। তার কোন মানে নেই।”
রুপু চোখের ইশারায় শ্বশুরকে কী যেন বলল। বীথি রানী বড় বড় চোখ করে রুপুর দিকে তাকিয়ে রইল।
অনেকদিন পর সকালে বিধান বাবুর সাথে বসে বীথি রানী ভাত খেলো। বিধানবাবু শো-রুমে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে গিয়ে দেখল, বীথিও নতুন শাড়ি পরছে।

রুপুর বিয়ে পর্ব ২৫

“এত সকালে কোথাও যাচ্ছ নাকি তুমি?”
বীথি রানী লজ্জিত মুখে বলল,
“হুঁ। তোমার সাথে যাচ্ছি।”
“আমার সাথে যাবে মানে?”
“এত আশ্চর্য হচ্ছ কেন? আমিও তোমার সাথে শো-রুমে যাব।”
বীথির কাণ্ডে বিধানবাবু বিস্মিত হলো খুব। হঠাৎ বীথির কী এমন হলো। যে সুপার গ্লু আঠার মতো বিধান বাবুর সাথে লেগে আছে। তবে যাই হোক না কেন! এর পেছনে যে রুপুর হাত আছে। তা বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে বিধানবাবু।

রুপুর বিয়ে পর্ব ২৭