রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩৯
সিমরান মিমি
পরশ শিকদার ঘোরের মধ্যে আবির্ভূত হয়েছেন। ধীর পায়ে শিকারীর ন্যায় এগিয়ে আসছেন স্পর্শীয়ার দিকে। ঠোঁটে কুটিল হাসি, দৃষ্টিতে মুগ্ধতা। এক হাতের তালুতে রঙ মাখিয়ে মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছেন। ভিড় এড়িয়ে প্রায় কাছাকাছি এসে পড়েছে এমন সময় সম্বিত ফেরে স্পর্শীয়ার। সে পরশের দিকে তাকিয়ে একবার পেছনে ফেরে। নাহ, কেউ নেই। তবে কি অসভ্য পুরুষ তাকে দেখে হাসছে? চোয়াল শক্ত হয়ে যায় স্পর্শীয়ার। গম্ভীর হয়ে হাটা শুরু করে দেয় পেছনে। খানিকটা এগিয়ে যাওয়ার পরেই পা থামিয়ে দেয়। পরশ ডাকছে – স্পর্শীয়া!
সেই ডাকে স্পষ্ট অধিকারবোধ। নামের প্রতিটা উচ্চারণে রয়েছে মুগ্ধতা। যেনো এই নামটি সে হাজার বার বলতেও রাজি। ক্লান্তি ছোবে না একবারও।
স্পর্শীয়া চুপ করে রইলো। মুখাবয়বে বিরক্তি ছাপিয়ে খরখর কন্ঠে বললো,
– কি সমস্যা?
– অনেকগুলো। সবগুলো শুনতে চাও? তাহলে তো কোথাও বসতে হবে। চলো, চা খেতে খেতে বলি।
পরশ কৌতুকের সুরে বললো। সহ্য হলো না স্পর্শীয়ার। তবে জনসম্মুখে চেঁচামেচি করাও যাবে না। লোকে ভাববে, বাবা হেরে যাওয়ায় মেয়ে রাগ উগড়াচ্ছে। এটা অপমানজনক। বরং এমনভাবে কথা বলতে হবে যেনো এই হার স্পর্শীয়া পাত্তাই দেয় নি। পরশ শিকদার এমপি হলো কি প্রধানমন্ত্রী হলো তা নিয়ে তার কোনো ভাবনাই নেই। অতএব, নিজেকে সামলে মৃদু হেসে বললো,
_ চা খাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি বুঝে গেছি, আপনার আসলে মাথায় সমস্যা।
—এতো তাড়াতাড়ি বুঝে গেলে? বাহ!
পরশ অবাক হওয়ার ভান ধরলো। স্পর্শীয়া তাতে আরেকটু সুর মিলিয়ে বললো,
– একদমই না। আমি যেদিন আপনাকে প্রথম দেখেছি, সেদিনই বুঝেছি আপনি তাঁরছিড়া।
পরশ মৃদু হাসলো। কোনো উত্তর দিলো না। তাকিয়ে রইলো স্পর্শীয়ার মুখের দিকে। একপলকে, মুগ্ধতা নিয়ে। স্পর্শী কপাল কুঁচকে তা দেখলো। পরক্ষণেই আঙুল উঁচিয়ে তেড়ে যাওয়ার ন্যায় বললো,
– এই এই, এভাবে তাকালে চোখ একদম গেলে দেবো।
থেমে, ঘন নিঃশ্বাস ছেড়ে শান্ত হয়ে বললো,
আপনার প্রবলেম টা কি বলবেন? ইদানীং এমন পিছু লেগেছেন কেন?
পরশ চোখ সরিয়ে নেয়। ছেলেরা এখনো রঙ মাখাতে ব্যস্ত। আমেজে কেউই এদিকে তাকিয়ে দেখছে না। হয়তো খেয়ালই করেনি পরশ এখানে এসেছে। স্পর্শীয়া এখনো প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য তাকিয়ে আছে। সেদিকে তাকিয়ে কিছুটা গম্ভীর হয়ে গেলো পরশ। সে নিজেও চিন্তিত। হঠাৎ এমন পরিবর্তনে সে নিজেও অবাক। মৃদু হেসে আনমনে বলে ফেললো,
– হয়তো তোমার পরিকল্পনায় তুমি সফল হয়েছো। আর আমি পড়েছি ফাঁদে।
স্পর্শীয়া কপাল কুঁচকে ফেললো। পরিকল্পনা বলতে কি বুঝিয়েছে পরশ? কিভাবেই বা সে সফল হয়েছে? বুঝে উঠতে পারলো না। তাকিয়ে রইলো ফ্যালফ্যাল করে। মুহুর্ত’টা নিস্তব্ধতায় ছেড়ে গেলো। হঠাৎ পরশ ডান হাতের তর্জনী তুলে নিমিষেই ছুঁয়ে দিলো স্পর্শীয়ার নাক। চমকে দু কদম পিছিয়ে গেলো স্পর্শী। ডান হাত দিয়ে নাক মুছে তাকাতেই দেখলো রঙ। পরশ লাল রঙ লাগিয়ে দিয়েছে তার নাকের ঢগায়।
মুহুর্ত’টা স্পর্শীয়ার কাছে বড্ড অসহনীয় ঠেকলো। রাগে চোখের কোটর ভরে এলো প্রায়। এই মুহুর্ত তার কি এমন করা উচিত যাতে লোকটা এই কাজের যোগ্য জবাব পাবে? সে ভেবে পেলো। তবে কি থাপ্পড় মারবে পরশকে? কিন্তু সামান্য একটু রঙ নাকের আগায় লাগানোর অপরাধে থাপ্পড় মারা টা কি আসলেই যুতসই? যদি মেরেও ফেলে, তারপর কি হবে? এই ছেলেপেলে গুলো সব মিলে তাকে ঘিরে ধরবে৷ অপমান করবে। সবমিলিয়ে বিস্তর ঝামেলা হবে। এরপর পুলিশ, জার্নালিস্ট, মিডিয়া সবাই আসবে নিউজ কভারের জন্য। শেষে গিয়ে বাবার নামেই দূর্নাম। আর যদি দূর্নাম নাও হয় তবেও দুই পক্ষ আবারো ঝামেলায় নামবে। মারামারি, কোপাকুপি, সবমিলিয়ে বিশাল সংঘর্ষ।
স্পর্শীয়া চোখ দুটো বন্ধ করে জোরে একটা শ্বাস নিয়ে ছাড়লো। কঠোর দৃষ্টিতে তাকালো সামনের অভদ্র পুরুষের দিকে। চোয়াল শক্ত করে তীব্র জেদ নিয়ে খামচে ধরলো পরশের হাত। ঠিক যে হাতটা দিয়ে রঙ মেখেছিলো সেটাই। আক্রোশে ধারালো নখের ঢগা ঢুকে গেলো চামড়া ভেদ করে। এরপর ছেড়ে দিলো। চামড়া ছিলে ফোটা ফোটা রক্তের দেখা মিলিছে। পরশ তখনো নির্বিকার, নিরব। ঠোঁটে মৃদু হাসি। তা দেখে গা জ্বলে গেলো স্পর্শীর। লোকটা এতোটুকু আর্তনাদও করলো না! বিষয়টা আরো যন্ত্রণা দিচ্ছে।
কয়েকটা ছেলে উঁকিঝুঁকি মেরে তাকাচ্ছে। স্পর্শী সামলে নিলো নিজেকে। মৃদু হেসে বললো,
– আমিও রাঙিয়ে দিলাম। লাল রঙে। আপনার জয়ের প্রথম উদযাপন এটা। আশা করছি দ্বিতীয়বার আমার সাথে উদযাপন করতে আসবেন না।
“চড়ুই! এখানে কি করছিস? ”
পেছন থেকে পাভেলের কৌতূহলী কন্ঠ শোনা গেলো। সে এগিয়ে এসে দুজনের মাঝখানে দাঁড়ালো। পরশ তখনো মৃদু হেসে স্পর্শীয়ার দিকে তাকিয়ে। কলিজাটা ধক্ করে উঠলো। তীব্র অসস্তিতে পরে আশেপাশে তাকাতে লাগলো পাভেল। নুয়ে পড়া কন্ঠে আত্মবিসর্জন দিয়ে বললো,
– সরি! আমি মনে হয় ভুল টাইমে চলে এসেছি।
– কোনো সমস্যা নেই। বল কি বলছিলি!
স্পর্শীয়ার কন্ঠ ঝরঝরে। সে পরশকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে পাভেলের দিকে চাইলো। মৃদু হেঁসে বললো,
– অনেক দিন পর দেখা। কেমন আছিস?
পাভেল অপ্রয়োজনীয় হাসলো। বললো,
– এখন তো তোর দেখা করার মানুষের অভাব নেই।
থেমে,
আমি ভালোই আছি।
পাভেলের ইঙ্গিতপূর্ণ কথাকে টোটালি অগ্রাহ্য করে স্পর্শীয়া ব্যস্ততা দেখালো। তাড়াহুড়ো করে বললো,
– শোন না, আমার যেতে হবে। ফোনে কথা বলে নেবো। বায়!
সে এগিয়ে গেলো। পাভেল চেয়ে রইলো ভগ্নহৃদয়ে। হঠাৎ পিছু ডেকে বললো,
– চড়ুই!
স্পর্শী জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়। পরক্ষণেই পাভেল মাথা নাড়িয়ে বলে,
– না, কিছুনা। টা টা!
সে চলে যায়। তবুও দৃষ্টি সরালো না পাভেল। কেমন অসহায়ের মতো তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে চেয়ে রইলো। ইশশ! এতোগুলো বছর এতো পাশাপাশি দুজন। অথচ তাকে একবারের জন্যেও ভালো লাগলো না? ভালো বাসলো তো বাসলো, এমন একজনকে ; যে কিনা পাভেলের নিজের ভাই। তাও অল্প কটা দিনের মধ্যে।
নির্বাচনে জয়ী হওয়ার উপলক্ষে আজ সন্ধ্যায় বিশাল আয়োজনে পিকনিক করবে দলের ছেলেরা। যারা বিপদ-আপদ প্রতিটা পদক্ষেপে পরশের ছায়াসঙ্গী হয়ে ছিলো। আগামীকাল বড় একটা গরু জবাই দেওয়া হবে। স্থানীয় লোকেদের বিরিয়ানি খাওয়ানোর জন্য। সনাতনীদের জন্যেও রয়েছে আলাদা আয়োজন। তাদের দেওয়া হয়েছে খাঁসি। স্থানীয় বিশাল পুজা মন্ডপের সামনেই বিরিয়ানি রান্না করবে তারা। সভা শেষে যে যার সুবিধা মতো গ্রহণ করবে খাবার। আপাতত সেটাই আলোচনা চলছে কয়েকজন প্রতিনিধির সঙ্গে। পাভেল সেখানে উপস্থিত থাকলেও বড্ড আনমনা হয়ে আছে। কয়েক বার খেয়াল করলেও আলোচনার চাপে জিজ্ঞেস করা হয়ে ওঠে নি। অবশেষে সকলে বিদায় নিলো। পরশ কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করলো – কি হয়েছে তোর?
ঘোর ভাঙে পাভেলের। দ্রুত দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলে, না কিছুনা।
আবার সবকিছু নিরবতায় ছেয়ে যায়। প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। দলের ছেলেরা সাউন্ডবক্স কাধে নিয়ে উঠছে ক্লাবের ছাদে। একপাশে রান্না বসিয়েছে বাবুর্চি। অন্যপাশে সাজানো রয়েছে হালকা-পাতলা নেশাদ্রব্য। তবে এই মুহুর্তে সেসবে ঝোঁক নেই পাভেলের। সে নিস্তেজ হয়ে মাথা ঝুকিয়ে আছে টেবিলের উপর। প্রায় অনেকক্ষণ ভেবেচিন্তে পরশের দিকে তাকালো। শান্ত কন্ঠে বললো,
– একটা প্রশ্ন করবো ভাইয়া?
– হ্যাঁ বল।
পাভেল আবারো সময় নেয়। ধীর স্থির কন্ঠে বলে,
– চড়ুই কে বিয়ে করবি কবে?
আচমকা এ ধরণের প্রশ্নে চমকে গেলো পরশ। সময় নিয়ে ধাতস্থ হয়ে মৃদু হাসে। বলে,
– কবে করবো সেটা বাদ দে। আগে বল, তোর চড়ুইকেই কেনো বিয়ে করবো?
হতবাক হয়ে ভাইয়ের কথা শুনলো পাভেল। বললো,
– এটা কেমন কথা? ওর সাথে রিলেশনে আছিস, অথচ বিয়ে করবি না?
পরশ এ পর্যায়ে শব্দ করে হাসলো। তবে কোনো উত্তর দিলো না। ভাইয়ের হাসিটা বড্ড রহস্যময় ঠেকলো। স্পর্শীকে বিয়ে না করলে কেনোই বা পরশ সম্পর্কে জড়ালো? তাহলে সে চড়ুইকে ঠকাবে। এটা কি পুরোনো কোনো প্রতিশোধ? পাভেল নড়েচড়ে বসে। তারা মাথা ফাঁকা লাগছে। সে আরো কৌতূহলী হয়। জিজ্ঞেস করে,
– তুমি কি সত্যিই চড়ুইকে ভালোবাসো?
পরশ ভাবার জন্য সময় নেয় না। ভালোবাসা শব্দটা শুনতেই চোখেমুখে মুগ্ধতা ছড়িয়ে যায়। কিছুটা ধীর কন্ঠে ফিসফিস করে বলে ওঠে,
– আপাতত তাই’ই মনে হচ্ছে।
-মনে হচ্ছে মানে কি ভাইয়া? তুই ওকে ঠকানোর প্লান করছিস? দেখ, এটা কিন্তু মোটেই ঠিক হবে না। ও আমার বেস্টফ্রেন্ড। ও এসব বিষয়ে অত্যন্ত সিরিয়াস। একটার পর একটা প্রেম করার মেয়ে ও না। যাকে একবার ভালো লাগবে তাকে নিয়েই ভাববে। এ জন্যই আজ অবধি কারোর সাথে সম্পর্কে জড়ায়নি। তোর সাথে যেহেতু জড়িয়েছে, তার মানে আমি এতটুকু নিশ্চিত যে – ও তোকে অসম্ভব ভালোবাসে। তুই ওকে ঠকাতে পারিস না। আমি কিন্তু সব বলে দেবো!
বিরক্তিতে কপালের চামড়ায় কয়েকটা ভাজ ফেললো পরশ। ইচ্ছে করছে পিঠের উপর দুমধাম করে দুটো কিল বসাতে। কিন্তু করলো না। বরং ধমক মেরে বললো,
– শাট আপ! তোর ভাবনায় কি কখনো ভালো কিছু আসে না? যখনই ভাবিস তখনই উল্টাপাল্টা প্যাঁচাস। ওকে আমি ঠকাতে যাবো কেনো? এসব ভুলভাল ভাবনা কি করে আসে তোর মনে? আশ্চর্য!
পাভেল থেমে যায়। কপালে হাত দিয়ে নিঃশ্বাস নেয়। ধীর কন্ঠে বলে,
– তাহলে কবে বিয়ে করছিস?
– করলে তো দেখতেই পাবি। এসব শুনতে ভাল্লাগছে না। উপরে যা, দেখ ওরা কি করছে!
একপ্রকার জোর করে রুম থেকে পাভেলকে বের করে দিলো পরশ। এতোক্ষণ মাথা ফাঁকা ছিলো। তাই শান্ত ছিলো।কিন্তু এই পাভেলটা এসে সব বিগড়ে দিলো। স্পর্শীয়ার নাম বলে সবকিছু উলোটপালোট করে ফেলেছে। এখন তো সেই রণচন্ডীর সাথে কথা না বললে মন শান্ত হবে না। কি এক মুসিবত! পরশ দ্রুত তার পার্সোনাল ফোন হাতে নিলো। এই নাম্বারটা দিয়ে কখনোই কল, মেসেজ করা হয় নি। তবে এখন করতে হবে।
এই মুহুর্তে সে ক্লাবের দোতলার রুমে আছে। যার কারনে এক্সট্রা কোনো সিমও নেই। অগত্যা ব্যক্তিগত নম্বরটাই ব্যবহার করতে হলো।
স্পর্শীয়ার ফোন বাজছে থেমে থেমে। ভর সন্ধ্যাবেলায় বেলকনিতে গিয়ে ভাবছিলো। বলতে গেলে পরশকে নিয়েই ভাবনায় মশগুল ছিলো। লোকটার তখনকার পরিকল্পনার বিষয়টা ভীষণ ভাবাচ্ছে। অতঃপর অনেক ভেবেচিন্তে বুঝতে সক্ষম হলো স্পর্শীয়া।
পরশ শিকদারকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে শোধ তুলবে – এ কথা সেদিন ক্যাফেতে বসেই নিজ মুখে স্বীকার করেছিলো। এমনকি সেই পরিকল্পনায় ব্যর্থ হয়েছে এটা ভেবেই বাদ দিয়েছিলো সব। ওসব ছেলেমানুষী আর স্পর্শীয়া করবে না, করতে চায়ও না। অথচ আজ এতোদিন পর না চাইতেও লোকটা তার প্রেমে পড়ে গেলো? অত্যন্ত সন্দেহজনক ব্যাপার। স্পর্শী এক চুলও বিশ্বাস করবে না। ওমন কাঠখোট্টা খাটাশকে সে জীবনেও পছন্দ করবে না। নিশ্চয়ই তাকে ফাঁদে ফেলার জন্য এমন হাবভাব ধরেছে।
স্পর্শীয়া চোখমুখ কুঁচকে আবারো ভাবলো। না না, লোকটা বর্তমানে এমপি। তার বাবাকে পরাজিত করে জিতেছে। এর মধ্যে তার সাথে নাটক করার কি প্রয়োজন? সে কি ওতোটাই বোকা! নিজের সম্মানের কথা একবারও ভাববে না? আবার পরশের চোখমুখও কেমন যেনো! ইদানীং কেমন অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে থাকে। মুচকি মুচকি হাসে। এই চোখমুখ তো আর মিথ্যে বলবে না! উফফফ! স্পর্শীয়া দু’হাতে মাথা চেপে ধরলো। কেনো ভাবছে সে এসব? ওই লোক প্রেমে পড়লেই বা কি? পড়ুক, মরুক, যা তা হোক। সে একবারও পিছু ফিরে দেখবে না।
অসহ্য যন্ত্রণা। ফোনটা বেজেই চলছে। স্পর্শীয় থমথমে পায়ে এগিয়ে গেলো ঘরে। রিসিভড করে কানে তুলতেই ওপাশ থেকে পুরুষালি কন্ঠ ভেসে আসলো।
“বাবা হেরে যাওয়ায় খুব বেশি কষ্ট পেয়েছো? ”
ও প্রান্ত থেকে রাগ, ক্ষোভ কোনো অভিব্যক্তিই পাওয়া গেলো না। পরশ পুণরায় ঠোঁট চেপে হাসি আটকে বললো,
“তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য আমি খুবই দুঃখিত। চলো একটা মিটমাট করা যাক। সকালে দেখা করো। জয় টা একসাথে উপভোগ করি।”
স্পর্শীয়া ফুসে উঠলো। তীব্র আক্রোশ চেপে রাখতে পারলো না। বললো,
“ আপনার মতো নির্লজ্জ আমি দুটো দেখিনি।”
“ সে কি! ডেটে যাবে না?”
পরশের ভাবুক প্রশ্ন। স্পর্শীয়া দাঁতে দাঁত চেপে ধরলো। বললো,
“ শ কু নে র বাচ্চা! কল করবিনা আমায়। ”
– ছি ছি, স্পর্শীয়া। এ কেমন ভাষা? তুমি আমার সাথে এভাবে কথা বলতে পারো না। যেখানে তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড দেবর হওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে, সেখানে তুমি এখনো আমায় শকুন বলে ডাকছো! এমন হলে বিয়ে কিভাবে হবে?
আর সহ্য করা যাচ্ছেনা। স্পর্শী চোখ মুখ কুচকে অসহায়তার ভঙ্গিমা করলো। কোন কুক্ষণে যে এর মতো ল্যাটা মাছের সাথে প্রেমের অভিনয় করতে গেলো! এখন সারা জীবন জ্বালিয়ে খাবে। স্পর্শী নিজেকে শান্ত করতে জোরে জোরে শ্বাস নিলো। মিষ্টি কন্ঠে বললো,
– দেখুন ভাই, আপনি প্লিজ আমাকে আর বিরক্ত করবেন না। আমাকে আমার মতো থাকতে দিন। প্লিজ!!!
– উহু! এটা তো সম্ভব নয়। তুমি আমার সাথে অবিচার করছো স্পর্শীয়া। স্বেচ্ছায় ফাঁদে ফেলেছো, এখন এই ফাঁদ থেকে তোলার দায়িত্বও তোমার। বুঝেছো?
স্পর্শী রেগে গেলো। চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
– না বুঝি নি। বুঝতে চাইও না। আল্লাহ হাফেজ! করুণা করে আর কল করবেন না।
– বেশ! তোমাকে বুঝতেও হবে না। যা বোঝার তোমার বাপ বুঝবে।
কল কাটতে গিয়েও জমে গেলো স্পর্শীয়া। চমকে গিয়ে বললো,
– এইই এক মিনিট। বাপ বুঝবে মানে? কি বলতে চাইছেন আপনি?
পরশ হাসলো। বললো,
– তুমি কি ভয় পাচ্ছো? আরে ধুর! আমি কেনোই বা আমাদের পুরোনো মেসেজ, কল রেকর্ডস তোমার বাবাকে দেখাতে যাবো?
স্পর্শীয়া থতমত খেয়ে বললো,
রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩৮
– আমি কি তা বলেছি একবারও? আশ্চর্য!
পরশ হেলান দিয়ে চেয়ারে বসলো। জিভের ঢগা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বললো,
– তোমার বাপ বলেছিলো – সে জিতলে আমাকে সহ আমার দলের সবাইকে পিরোজপুর ছাড়া করবে। কিন্ত আফসোস! সে হেরে গেলো। চুক্তি অনুযায়ী আমাকে মেয়ের জামাই বানানোর কথা। আমি আসছি স্পর্শীয়া সরদার, জয়ের ট্রফি ছিনিয়ে নিতে।
স্পর্শী হতবাক হয়ে গেলো। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে শুধালো,
– আপনার কি মাথা খারাপ?
– উহু, একদম না ম্যাডাম। তবে পরশ শিকদার ফাঁদে পড়লে, প্রতিপক্ষকে নিয়ে পড়ে। গুড নাইট।
