রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪১
সিমরান মিমি
পাভেল প্রায় নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে খাটে। দুচোখ জ্বলজ্বল করে তাকিয়ে আছে সিলিং এর দিকে। সে আশাহত নয়, ক্ষিপ্ত। মায়ের বোকামির কারনে ঘটনা এতোদুর গড়িয়েছে। নাহলে কিছুই হতো না। শিকদার মঞ্জিলে তারা এসেছে অনেকক্ষণ। ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই দাবানলের মতো জ্বলে উঠেছিলো। তাকে না জানিয়ে কোন আক্কেলে বিয়ের প্রস্তাব রাখলো? কেনোই বা বললো পাভেল আর্শিকে পছন্দ করে!
উপস্থিত প্রত্যেকে তখন হতভম্ব হয়ে চেয়ে ছিলেন। এমনিতেই সরদার বাড়ি থেকে অপমানিত হয়ে ফিরতে হয়েছে। সেসবের মধ্যে সম্পুর্ন ঘটনা গুলো এড়িয়ে যাওয়াতে রেগে গিয়েছিলো পরশ। আমজাদ শিকদার, আলতাফ শিকদার , পরশ এবং পাভেলের চিৎকার চেঁচামেচিতে একসময় ভীত হয়ে পিয়াশা স্বীকার করে নেয়। তারই যে বুঝতে ভুল হয়েছে, সেকথা বলে সম্পুর্ন দোষ মাথা পেতে নেয়। বিড়ম্বিত পরিবারের পুরুষগুলো তখন একে অপরের দিকে তাকিয়ে টু শব্দটা না করেই স্থান ত্যাগ করে।
গতকাল তানিয়া এসেছে পিয়াশার কাছে। তার এক্সাম শেষ। একমাত্র খালামনির কাছে কিছুদিন থাকবে বলেই লম্বা সময়ের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। সকলকে এই চাওয়াটা জানালেও তার উদ্দেশ্য ছিলো ভিন্ন। এতো বছরের লালিত এক তরফা প্রণয় মাত্র কয়েকদিনেই ছিনিয়ে নিয়েছে অন্যকোনো নারী। পরিক্ষা কালীন সময়ে ব্যস্ত থাকলেও কোনো ঘটনা তার কর্ণগোচর হয়নি। স্পর্শীয়া সরদার নামক মেয়ের সাথে পরশের প্রেম, মেয়েটির হঠাৎ লাপাত্তা, অস্থির হয়ে তাকে খুঁজতে থাকা পরশ, এমনকি লোকমুখে বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে দেখা করতে যাওয়ার ঘটনাও সে শুনেছে। তানিয়া সে কদিনে কয়েকবার ভেঙেছে, আবার নিজেকে গড়িয়েছে।
সে কখনো পরশকে ভালোবাসার কথা জানায় নি। আবার এ বাড়িতে আসলে আলাদা করে যত্ন নিতেও কার্পন্য করেনি। খালা, খালু কখনো মুখে না বললেও তানিয়ার প্রতি আলাদা স্নেহ দেখে মেয়েটা নিজেও সাহস পেয়েছিলো এই অনুভূতিকে লালন করতে। কিন্তু বেলা শেষে দেখা গেলো তার কিছুই অবশিষ্ট নেই। সব টুকু অন্য কারো পাওনা, অন্য নারীর অধিকার।
তানিয়া ভেবেছিলো মৃত্যু পর্যন্ত আর এ বাড়ির চৌকাঠ পার হবে না। যার টানে বার বার এই নীড়ে ফেরা, সেই তো তার বাসায় নতুন কাউকে স্থান দিয়েছে। তানিয়ার জন্য তো একাংশও নেই। কোথায় এসে দাঁড়াবে সে! পরবর্তীতে ধীরে ধীরে সময়ের পরিক্রমায় সিদ্ধান্ত বদলেছে। সেই সৌভাগ্যবতীকে কি সে দেখবে না, যে নিমিষেই বিশাল পাহাড়ের চূড়া জয় করে নিয়েছে! অবশ্যই দেখবে। সেই নারীকে খুটিয়ে খুটিয়ে সারা অঙ্গ বিচার করবে। কি এমন আছে তার মধ্যে যা তানিয়ার মধ্যে নেই।
উলঙ্গ শরীর। পড়নে ট্রাউজার বিনা বুক-পিঠে এক গোছা সুতোও নেই। সদ্য গোসল সেরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছে পরশ। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে আচমকাই নজর পড়লো গলায়। স্মৃতিতে ভেসে উঠলো কফিশপের চিত্রটি। স্পর্শীয়ার ছুড়ে মারা গরম কফিতে খুব একটা আঘাত না পেলেও একটা ফোস্কা পড়ে গেছিলো। ঠিক যেনো গরম তেলের এক ফোঁটার আস্তরণ। সময়ের সাথে সাথে সেই ক্ষুদ্রাংশ টুকুর চামড়া শুকিয়ে পড়ে গেছে। এখন সে স্থানটা হয়ে উঠেছে বেমানান। পরশ তো খুব একটা ফর্সা নয়। বাবার মতো শ্যামবর্ণ পেয়েছে। সেই তামাটে দেহের গলায় ক্ষুদে একটু জায়গা সাদা হয়ে আছে। উপরের চামড়া উঠে যাওয়ায় সহজেই চোখে লাগছে তা। স্থানটুকুতে আঙুল বুলিয়ে অকারণেই মৃদু হাসলো। বাম বাহুতে প্রথম দিনের সেই ক্ষতটা এখনো আছে। ব্যথা চলে গেলেও দাগ তো থেকে যায়। দীর্ঘক্ষণ, দীর্ঘসময়, স্মৃতি হয়ে। সে সেখানেও আঙুল বুলিয়ে দেয়। সবশেষে নজর আসে হাতের খামচানো দাগ। বয়স খুব একটা বেশি নয় এই ক্ষতর। এইতো নির্বাচনের দিনে পাওয়া।
পরশের ভীষণ অদ্ভুত লাগলো। তার শরীরে তেমন দাগ নেই। অবশ্য রাজনীতি করতে গেলে মার, কোপের চিহ্ন শরীরে থাকাটা অস্বাভাবিক ছিলো না। তবে পরশের বেলায় তা হয়নি। বাবা আমজাদ শিকদার সাবেক এমপি হওয়ায় সমর্থনে থাকা লোকেরও অভাব ছিলো না। এতো এতো রাজনৈতিক নেতাদের ভিড় এড়িয়ে প্রতিপক্ষ পাভেল, পরশকে কখনোই আঘাত হানতে পারে নি। তবে শামসুল সরদার এবার বেশ শক্তপোক্ত এক প্রতিপক্ষ জন্ম দিয়েছে। যে আসতে না আসতেই ছুরির আঘাত, গরম কফি, এমনকি মেয়েলি খামচির দাগটুকুও পরশের শরীরে গেথে গেছে। না জানি সামনে আরো কত আঘাত পাওনা রয়েছে। পরশ ঠোঁট কামড়ে হেঁসে সেকথা ভাবলো। এরপর ফোন হাতে নিয়ে তৎক্ষণাৎ আঘাতগুলো ফোনে ধারণ করলো। স্পর্শীয়া ব্লক খুলেছে হোয়াটসঅ্যাপে। সাথে ছোট্ট একটা মেসেজও পাঠিয়েছে – শুনুন, আপনার সাথে আমার কথা আছে।
এসবে তোয়াক্কা করলো না পরশ। একে একে ছবিগুলো সেন্ড করে ভয়েস নোট পাঠালো৷
– আমার শরীরে তোমার দেওয়া এতোগুলো আঘাত আছে। অথচ তোমার শরীরে আমার দেওয়া কোনো চিহ্নই নেই। ব্যাপারটা ভীষণ বেমানান স্পর্শীয়া। ন্যুনতম একটা দাগ হলেও থাকা উচিত। এবার তুমিই বলো, কোন ধরণের দাগ তুমি আমার থেকে নিতে আগ্রহী?
স্পর্শীয়া অনলাইনে নেই। নিশ্চয়ই এই মেসেজ দেখার পর একটা মিসাইল ছুড়ে মারবে। পরশ অতিদ্রুত ফোন রেখে নিজের নিরাপত্তা বজায় রাখলো। এরপর আয়নার দিকে চোখ রাখতেই হাস্যোজ্জ্বল মুখটা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে গম্ভীর রুপ ধারণ করলো। দরজা পুরোপুরি হা করে খুলে রাখা। তার কিছুটা সামনেই রুমের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে তানিয়া। পরশ থমথমে কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়লো।
– তুমি! কখন এসেছো রুমে?
প্রশ্নটা তানিয়ার কাছে অস্বাভাবিক ছিলো না। সে মৃদু হাসার চেষ্টা করে মলিন কন্ঠে শুধালো, অনেকক্ষণ।
ফের চোয়াল শক্ত করলো পরশ। কঠোর কন্ঠে সাবধান করে বললো,
– এটা লাস্ট বার তানিয়া। এরপর থেকে কখনোই তুমি আমার রুমে ঢুকবে না। কিছু দরকার হলে নক করবে বাইরে দাঁড়িয়ে।
– হুম।
তানিয়ার ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। তবুও সে বাইরে শক্ত থাকার চেষ্টা করলো। পরশের ভয়েস নোট সেও শুনতে পেয়েছে। কিন্তু বুঝে উঠতে পারে নি। বারবার মনের মধ্যে তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। কোন দাগের কথা বললো পরশ? তবে কি সে স্পর্শীয়াকে নিয়ে একসাথে থেকেছে! বিয়ে ছাড়াই? অথচ এই পুরুষ তার দিকে কখনো ঠিকভাবে ফিরেও তাকায় নি। দেখে কখনো মনেই হয়নি তার মধ্যে পুরুষালি কোনো মোহ-মায়া আছে। কিন্তু সেই লোক আজ বিয়ে ছাড়াই অন্য আরেক নারীর সাথে থেকেছে। এতোটাই অধৈর্য্য! কি আছে স্পর্শীয়া সরদারের মধ্যে?
তানিয়ার নিরবতা পরশের বিরক্তিকে তুঙ্গে তুলে দিচ্ছে। কিছুই বলছে না, করছে না অথচ চুপচাপ তাকিয়ে আছে স্থির হয়ে। পরশের শরীর তখনো উদাম। সে তোয়ালে মেলে গায়ে জড়িয়ে স্বাভাবিক ভাবে জিজ্ঞেস করলো,
– কিছু বলবে?
-হু, হ্যাঁ বলবো।
হুশ ফিরলো তানিয়ার। নিজেকে সামলে কিছুটা টিটকিরি মেরে বললো,
– শুনলাম, পাভেল ভাইয়ার সম্বন্ধ নিয়ে গেছিলেন সরদার বাড়িতে। কিন্তু আপনি তো এখনো অবিবাহিত। যতদুর জানি, সে বাড়িতে আপনার পছন্দের স্পর্শীয়াও আছে। তারপরেও ছোটো ভাইকেই কেনো ফাঁসালেন? আপনি চাইলেই তো নিজের কথা বলতে পারতেন।
পরশ কপাল কুঁচকে তাকালো। বিরক্তি নিয়ে বললো,
– আমার বিষয়ে তোমার এতোটা না ভাবলেও চলবে। বাই দ্যা ওয়ে, তুমি পাভেলকে ভাইয়া বলে ডাকলেও – আমাকে আপনি আপনি করছো কেনো? সম্বোধনহীন ডাক আমার পছন্দ নয় তানিয়া। পরবর্তীতে প্রেমা যেভাবে ভাইয়া ডাকে, ওভাবেই ডাকবে। এখন যাও।
তানিয়া মৃদু হাসলো। পরশ তাকে এড়িয়ে যাওয়ার তীব্র চেষ্টা করছে। অথচ লোকটা জানে সে তাকে পছন্দ করে। কখনো হয়তো সরাসরি বলা হয়নি। কিন্তু তারপরেও…. তানিয়া প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেছে অনুভূতি বোঝানোর। অথচ পরশ তা বুঝলেও, সে যে বুঝতে পেরেছে ; সেটা যেনো তানিয়া না বোঝে সেজন্য বরাবরই এড়িয়ে চলেছে। তবে এমন অভিনয় আর কত! এইতো স্পর্শীয়া সরদার অধিকার নিয়ে আসলো বলে। আর কি হারানোর ভয় তানিয়ার? কিসেরই বা চক্ষুলজ্জা। ভেতরে যে সুচের মতো বিঁধছে, সেটা বিপরীত দিকের মানুষটাকে একটু হলেও তো বোঝানো উচিত।
তানিয়া গেলো না। বরং আলতো পায়ে কদম বাড়িয়ে রুমের আরো ভেতরে ঢুকলো। বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিয়ে আবদার করলো,
– থাকি না আরেকটু। স্পর্শীয়া আসার পর তো আর উঁকিও দিতে পারবো না।
পরশের মেজাজ তরতর করে বাড়ছে। গোসল সেরে এসেছে, শুয়ে শুয়ে স্পর্শীয়াকে জ্বালানোর জন্য। অথচ মেয়েটা নড়ছেই না। অগত্যা বাধ্য হয়ে টিশার্ট এবং ফোন হাতে নিয়ে গটগট পায়ে বেরিয়ে গেলো রুমের বাইরে।
তানিয়ার মা নেই। তাছাড়াও সে বড্ড শান্ত। দেখতেও সুন্দরী। পিয়াশা এবং আমজাদ তাকে অত্যন্ত স্নেহ করে। এই মুহুর্তে কোনোভাবে যদি জানতে পারে তানিয়া পরশ কে পছন্দ করে, তবে সেই স্নেহ থেকে ইমোশনাল হয়ে কোনোভাবে পছন্দ করে ফেলতে পারে। তখন পরশ দ্বিগুন ঝামেলায় পড়বে। শুধুমাত্র এই একটা কারনে বড্ড চুপচাপ হয়ে নিজের মতো করে এড়িয়ে চলে মেয়েটাকে।
পরশ বের হয়ে যাওয়ার পর কেঁদে ফেললো তানিয়া। তার কি এতটুকুও সুখ পাওয়ার অধিকার নেই। কেনোই বা কাছের মানুষগুলো চলে যায়! সে বেশিক্ষণ পরশের রুমে থাকলো না। সারা রুমে চোখ বুলিয়ে পরশের আধোয়া একটা শার্ট হাতে নিলো। খুব সন্তর্পণে ওড়নার নিচে লুকিয়ে বের হয়ে গেলো রুম থেকে। মানুষটা তার না হোক, অন্তত গায়ের গন্ধটাতো কাছে থাকুক।
_
বেলা গড়িয়ে বিকেল নেমেছে। আকাশটা বড্ড মেঘলা। গ্রীষ্মের কালবৈশাখী এই শুরু হলো বলে। চারদিকে ছোটো ছোটো আমের কুড়ির অদ্ভুত সুগন্ধ। তানিয়া গায়ের ওড়নাটা আরেকটু গুছিয়ে রিকশা থেকে নামলো। বড্ড দখিনা বাতাস এদিকটায়। ভাড়া মিটিয়ে এক পা এক পা করে হেঁটে গেলো গেটের দিকে। আসরের আজান দিয়েছে কিছুক্ষণ পূর্বেই। আজ আর নামাজ পড়া হয়নি। মানসিক ভাবে ঠিক নেই সে। প্রাণ টা বড্ড ছটফট করছে। অথচ অন্যদিন মানসিকভাবে ভেঙে পড়লে তানিয়া সবার প্রথমে জায়নামাজে দাঁড়াতো। কেনো যেনো জীবনের সবকিছু ধীরে ধীরে উলটে যাচ্ছে।
– গেটের সামনে ঘুরঘুর করে ক্যান? কিছু কইবেন?
বাহাদুরের ডাকে চমকে উঠলো তানিয়া। শান্ত হয়ে ধীর কন্ঠে শুধালো,
– স্পর্শীয়া সরদারকে একটু ডেকে দেবেন?
বাহাদুর মেয়েটাকে আগাগোড়া পরোখ করে নিলো। মুখে মাস্ক পড়া। গায়ের পোশাক দেখে ভদ্র ঘরের মনে হলো। ভাবলো, হয়তো স্পর্শীয়ার বান্ধবী হতে পারে। সে গেট খুলে দিলো। বললো,
– আচ্ছা, আসেন। বড় আম্মায় বাড়িতেই আছে।
বাধ সাধলো তানিয়া। বললো,
– নাহ, ভেতরে যাবো না। সময় নেই বেশি।আপনি গিয়ে স্পর্শীয়াকে বলুন, একজন দেখা করতে এসেছে। মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য।
ব্যাপারটা বেশ সন্দেহজনক ঠেকলো বাহাদুরের কাছে। গেটের সামনে এসেও ভেতরে যেতে চাইছে না, বিষয়টা খুব একটা ভালো ঠেকলো না। সে পুণরায় গেটের তালা আটকালো। এরপর চলে গেলো বাড়ির ভেতরে। ঠিক দশ মিনিট পর স্পর্শীয়াকে দেখা গেলো। তার চুলগুলো খোলা, এলোমেলো। মুখে এখনো ঘুমের রেশ। কোনোভাবে গায়ে ওড়না টা জড়িয়ে এগিয়ে এলো। চোখদুটো ফুলে গেছে। হয়তো কাঁচা ঘুম ভেঙেছে। হলদে ফর্সা ফোলা মুখখানার দিকে তানিয়া অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। চুলগুলো কতটা লম্বা! সদ্য ঘুম ভাঙায় মেয়েটাকে যেনো আরো বেশি সুন্দর লাগছে। তানিয়ার ভীষণ হিংসে হলো। সে চোখ নামিয়ে অন্যদিকে তাকালো। স্পর্শীয়া গেট খুলে বাইরে এসে তার সামনে দাঁড়ালো। বললো,
— আমিই স্পর্শীয়া। কিছু বলবেন?
তানিয়া স্থির দৃষ্টিতে তাকালো। দুপাশে মাথা নাড়িয়ে না সম্বোধন করে বললো,
– তোমাকে দেখার ইচ্ছে ছিলো। তাই এলাম।
অদ্ভুত লাগলো স্পর্শীয়ার। ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো,
– আপনি কি আমায় চেনেন?
– হুম।
কেমন ছোটো ছোটো রহস্যে পরিপূর্ণ উত্তর। স্পর্শীয়া মেয়েটাকে চেনার চেষ্টা করলো। কিন্তু এর পূর্বে কখনো দেখেছে বলে তো মনে হচ্ছে না। সে পুণরায় প্রশ্ন করলো,
– আমি তো আপনাকে চিনি না। আর যদি কিছু নাইই বলেন, তবে ডেকেছেন কেনো?
– ধরে নাও, তোমার না হওয়া সতীন।
মিষ্টি করে হেঁসে উত্তর দিলো তানিয়া। স্পর্শীয়া হাঁসতে পারলো না। অপ্রস্তুত হয়ে কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললো,
– কি সব আবোল তাবোল বলছেন আপনি? আমি আপনার সতীন হতে যাবো কোন দুঃখে? এতো ভণিতা না করে আসল কথা বলুন।
তানিয়া স্পর্শীয়ার কথায় উত্তেজিত হলো না। অপমানিত বোধও করলো না। ধীর কন্ঠে বললো,
– শুনেছিলাম, তুমি এসেই তাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেছিলে। অথচ, আমি তার সামান্য জ্বর হলেও জায়নামাজে বসতাম। কিন্তু দেখো, এতো যত্ন নেওয়ার পরেও মানুষটা তোমায় চাইলো, আমায় নয়।
ধীরে ধীরে অস্পষ্ট ঘটনাগুলো পরিস্কার হচ্ছে। স্পর্শীয়া বুঝতে শুরু করেছে সবটা। ছুরি দিয়ে আঘাত পরশকে করেছিলো। তার মানে এই মেয়ে পরশের পরিচিত। কিন্তু সে তাকে কি করে চিনলো? তবে কি তাকে নিয়ে শিকদার বাড়িতে আলোচনা করেছে পরশ! নানা ধরণের প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। বললো,
– তোমার নাম কি? মাস্ক টা খোলো।
তানিয়া খুললো না। বরং জোর পায়ে, স্পর্শীয়াকে অবজ্ঞা করে চলে গেলো। পেছন থেকে অজস্র বার ডাকলেও তানিয়া জবাব দিলো না। না তো ফিরে তাকালো।
ঘুমের ভাব কেটে গেছে স্পর্শীয়ার। বাহাদুর কাকাকে গেট আটকাতে বলে একপ্রকার ছুটে এলো বাড়ির ভেতরে। এক্ষুনি, এই মুহুর্তে পরশ শিকদারের সাথে বোঝাপড়া করতে হবে। লোকটা পেয়েছে টা কি? এমনিতেই আর্শিয়ার বোকামির কারনে বাবা ভীষণ কষ্ট পেয়েছেন। এরমধ্যে এই বিচুটে শিকদার কোনোরকম ঝামেলা বাঁধালে শামসুল ভেঙে পড়বে। একেই নির্বাচনে হার, তার উপর মেয়েদের নিয়ে এমন অহেতুক সম্বন্ধ শুনলে না জানি রাগ করে দেশান্তরি হয়।
নেট অন করতেই টুংটাং শব্দের নোটিফিকেশনে ফোন ভর্তি হয়ে গেলো। খানিক সময় নিয়ে স্পর্শীয়া হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকলো। ফটোগুলো দেখে ভয়েস টা শুনতেই চমকে উঠলো। দুহাতে চেপে ধরলো ফোনের স্পিকার। একেই সাউন্ড বাড়ানো, তারউপর দরজা খোলা। লোকটার বদমায়েশি গেলো না। অসভ্যের মতো পুরুষ জাত চেনাচ্ছে। স্পর্শীয়া দরজা আটকে কল করলো।
স্পর্শীয়ার কল পেয়ে বেশ আয়েশ করে বসলো পরশ। এক্ষুনি একটা যুদ্ধে নামবে সে। সেই মতেই প্রস্তুতি নিলো।
– পরেরবার এমন ভাবে আঘাত করবো, যে প্রাণ টাই থাকবে না। বুঝেছেন?
পরশ আনমনে হেঁসে ফেললো। নাহ! এতো সহজে ছাড়া যায় না। স্পর্শীয়াকে আরো রাগানো উচিত। সে ঠোঁট কামড়ে দৃঢ় কন্ঠে বললো,
– পরবর্তী আঘাত টা ঠোঁট দিয়ে করিও প্লিজ! আমি তখন এমনিতেও প্রাণ হারাবো।
স্পর্শীয়া স্তব্ধ হয়ে গেলো। দাঁতে দাঁত কিড়মিড় করে ভাবতে লাগলো। এতো অসভ্য লোক দুটো হয় না। একে কি বলে শায়েস্তা করা যায়? ভোলাভালা মেয়েটা কিছু খুঁজে পেলো না। অনুরোধের সুরে বললো,
– প্লিজ! আপনার এই অসভ্যপণা আমি আর নিতে পারছি না। এবার তো ক্ষমা করুন।
– আমি মোটেও অসভ্য নই স্পর্শীয়া। একবার বিয়ে করে দেখো, এগুলো সব স্বাভাবিক মনে হবে।
স্পর্শী জোরে শ্বাস নিলো। এরপর শান্ত হয়ে ধীর কন্ঠে বললো,
– আপনার গার্লফ্রেন্ড এসেছিলো। আমার বাড়ির গেটে। সে আপনাকে নিয়ে বড্ড ইনসিকিউরড। ওই মেয়েটা যদি একবার ভেতরে চলে আসে, আর আমার পরিবারের কেউ জানতে পারে, তবে কি হবে একবার ভাবতে পারছেন? প্লিজ! ঝামেলা আর বাড়াবেন না। এখানেই অফ করুন।
পরশ সতর্ক হলো। সন্দেহের রেশ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪০
– আমি বুঝিনি স্পর্শীয়া। খুলে বলো।
– আপনি দেখা করুন। কাল সকালেই আসবেন। আশা করছি এটাই আমাদের শেষ দেখা হবে।
পরশ বাঁধ সাধলো। বললো,
– যদি এটা শুরু হয়?
