Death or Alive part 13
priyanka hawlader
সকালের প্রথম আভা ইতোমধ্যে পাহাড়ঘেরা কোহেকাফের আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে, তবে অন্যান্য ভূমির সকালের মতো রোদের ঝলমল ছোঁয়া এখানে আসে না। এখানকার আলো যেন প্রকৃতির এক সযত্নে রচিত মায়া—কুয়াশার ঘোমটা সরিয়ে ধীরে ধীরে চোখে পড়ে, কিন্তু পুরোমাত্রায় নয়। সূর্য আছে, অথচ তার তাপ নেই, তার ঔজ্জ্বল্য যেন পাহাড়ের ঘন নিঃশ্বাসে আটকে আছে।
অর্ষার চোখ খুলতেই সে এমনই এক আলো-আধার পরিবেশে নিজেকে আবিষ্কার করে। কক্ষের জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া ম্লান আলোকরেখা তার চোখে পড়ে—সেই আলো ঘরের মেঝে ছুঁয়ে যেন তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।
শরীর এখনো ভারী, তবে মন কিছুটা স্থির। ঘুমচোখে সে চারপাশে তাকায়। টেবিলের উপর রাখা ধোঁয়া ওঠা খাবারের থালা তার চোখে পড়ে। সেখানে স্পষ্ট বোঝা যায়, এই খাবার কেউ সদয় মন নিয়ে তার জন্য সাজিয়ে রেখে গেছে। অর্ষা মনে মনে ভাবে—হয়তো সেই রান্নাঘরের নারীই এই উপকার করেছে, যার চোখে সে সেদিন এক আশ্চর্য কোমলতা দেখেছিল।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, জানালার ধারে গিয়ে বাইরের দিকে তাকায়—কুয়াশায় মোড়ানো পাহাড়ের ঢালু আর মেঘের ভাঁজে হারিয়ে যাওয়া সূর্যরশ্মির গাঢ় রহস্য তার চোখে মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়। এরপর ফ্রেশ হয়ে শান্তভাবে সেই খাবার খেতে বসে। খাবারে এক অপার্থিব স্বাদ—ঘরের উষ্ণতা আর অজানা কোনো মাতৃত্বের ছোঁয়া যেন সেখানে লুকিয়ে আছে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
খাওয়া শেষ করতেই হঠাৎ মনে পড়ে যায়—ওয়াজফান গতরাতে বলেছিল, আজ থেকেই তাকে কাজে অংশ নিতে হবে। এক অদ্ভুত দায়িত্বের গন্ধ অর্ষার মনে চেপে বসে। সে চুপচাপ প্রস্তুত হয় এবং কক্ষের দরজা খোলার আগে এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়।
তবে আজ আর কেউ তাকে থামায় না।
দরজা খুলতেই বুঝতে পারে—সে বের হতে পেরেছে। কক্ষের বাইরের করিডোরে পা দিতেই অনুভব করে, পুরো রাজপ্রাসাদটি যেন এক নীরব কিন্তু কঠোর নিয়মে চলে, যার কেন্দ্রে রয়েছে ওয়াজফানের ইচ্ছা ও শাসন।
আলোর টুকরো টুকরো ছায়া করিডোরের পাথরের দেয়ালে খেলে যাচ্ছে। অর্ষা জানে না কোথায় যাচ্ছে, কী আছে সামনে, কাকে খুঁজছে—তবুও এগিয়ে যেতে থাকে ধীরে ধীরে, যেন কোনো অদৃশ্য সুর তাকে টেনে নিচ্ছে।
করিডোরের বাঁকে পৌঁছে হঠাৎ এক কক্ষের দরজা খোলা দেখে সে থেমে যায়। দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিতেই তার চোখে পড়ে—কক্ষের মাঝখানে বসে আছে ইসাবেলা।
তাকে দেখে অর্ষার মনে হয়, সে যেন কালের অন্য এক রেখায় প্রবেশ করেছে। মোমের আলোয় ইসাবেলার মুখে পড়ে অপার নীরবতা—কিন্তু সেই নীরবতাই যেন তার ভেতরের ঝড়কে স্পষ্ট করে তোলে। তার মুখ দেখে বোঝা যায়—সে কিছু জানে, হয়তো কিছু চাপা রেখেছে, অথবা কাউকে অপেক্ষা করছে।
অর্ষা আর অপেক্ষা না করে ধীরে ধীরে কক্ষে পা রাখে। ইসাবেলার চোখ ঠিক তার চোখে এসে পড়ে। সেই দৃষ্টিতে কোনো আতঙ্ক নেই, কিন্তু রয়েছে অসীম এক বিষণ্নতা—যেন কোনো মহাসত্য প্রকাশের আগে গভীর প্রশান্তি নেমে আসে হৃদয়ে।
অর্ষা ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে ইসাবেলার দিকে তাকিয়ে সে বলে ওঠে একটুখানি সাহস সঞ্চয় করে,
— “ইসাবেলা… তুমি কি আমাকে রান্নাঘরটা একটু দেখিয়ে দিতে পারো? আমি তো এই বাড়ির কিছুই চিনি না।”
তার কণ্ঠে ছিল বিনয়ের ছোঁয়া আর চোখে এক অনুনয়ের দীপ্তি।
— “তোমার ভাই… আজ সকালে বলেছে, আজ থেকে আমি এই বাড়ির কাজের লোক। কাজ করতে হবে আমাকে… অথচ আমি জানি না কোথায় কী থাকে, কীভাবে কী করতে হয়।”
অর্ষার কণ্ঠ ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে, যেন অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ানো এক শিশুর মতো।
ইসাবেলা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকে—কী এক অদ্ভুত মায়া যেন তার চোখে খেলে যায়। এই সরল মুখটা যে তার ভাইয়ের জেদ আর কঠোরতার শিকার, তা সে ভালোই জানে।
সে হালকা হেসে অর্ষার হাতটা টেনে খাওয়ার ঘরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলে,
— “এই বাড়িতে অনেক দাস-দাসী আছে, অর্ষা। প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা লোক। তবে ভাই যেহেতু তোমাকে নিজে থেকে কাজ করতে বলেছে, আমি দেখবো যেন তোমাকে কিছুটা হলেও সহজে রাখা যায়।”
সাতপদ ধরে সে অর্ষার পাশে হেঁটে রান্নাঘরের দিকে যায়। হাওয়ায় লেগে থাকা মসলার গন্ধে এক অজানা স্নিগ্ধতা মিশে থাকে।
খাবার ঘরের কাছে গিয়ে ইসাবেলা একটি দাসীকে ডেকে আনে—মেয়েটি দেখতে শান্ত স্বভাবের, গায়ের রঙ টকটকে পাকা আমের মতো, চোখে-বসে কাজের আন্তরিকতা।
ইসাবেলা নরম অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
তোমার নাম সিলভিয়া, না? শুনো, এই মেয়েটির নাম অর্ষা। ও আজ থেকে এই বাড়িতে থাকবে। আমার ভাইয়ের আদেশে ও কিছু কাজ করবে, কিন্তু বেশি না। তুমি ওকে রান্নাঘরটা দেখিয়ে দাও, আর কোথায় কী থাকে সেটা চিনিয়ে দাও। তবে খেয়াল রেখো, ওকে যেন বেশি কাজ করতে না হয়। আমি জানি তুমি যত্ন নেবে।”
সিলভিয়া মাথা নিচু করে সম্মান জানায়।
যেমন আদেশ প্রিন্সেস । আমি ওকে সব দেখিয়ে দেবো।”
অর্ষা একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল গুটিশুটি হয়ে, আর ইসাবেলার এমন আচরণে তার মুখে ফুটে ওঠে কৃতজ্ঞতার ছায়া। এই বিশাল অচেনা বাড়িতে, এই ভয়ঙ্কর নিয়তির মধ্যেও কেউ একজন আছে যে তার ওপর একটুখানি সদয়, একটুখানি নরম।
অর্ষা ইসাবেলার চোখে চোখ রেখে ধীরে বলে ওঠে,
— “ধন্যবাদ… সত্যিই ধন্যবাদ তোমাকে।”
ইসাবেলা এক হালকা হাসি দিয়ে ঘুরে চলে যায়, আর অর্ষা হাঁটতে থাকে নতুন দাসী সিলভিয়ার সঙ্গে—জীবনের এক নতুন পথে, যেখানে প্রতিটি দিনেই অপেক্ষা করছে অজানা সব গল্প, শঙ্কা আর… সম্ভবত কিছু পরিত্রাণ।
বিকেলের দিকে রাজপ্রাসাদের চারদিকে রোদ একটু একটু নরম হয়ে আসছে। আকাশের একপাশে ধূসর মেঘের রেখা জমেছে—যেন ঠিক যেমনটি জমেছে অর্ষার মনেও, এক অজানা চাপা ভাবনায়। আজ অনেকটা সময় সে ব্যয় করেছে ছোটখাটো কিছু কাজ করতে। ভারী কিছু না করলেও এই বিশাল প্রাসাদে অল্প কিছু কাজেই সময় আর শক্তি দুইটাই যেন নিঃশেষ হয়ে যায়।
তার হাতে এখনো ঝাড়ু আর কাপড়। সদর দরজার সামনে রাখা বিশাল বিশাল স্বর্ণখচিত ফুলের টপগুলো সে মুছছে ধীরে ধীরে। এক একটি টপ যেন একটি করে রাজ্যের প্রতীক, আর সেই প্রতীকের উপর ধুলো জমে আছে—যেমন অর্ষার ভবিষ্যতের ওপর জমে আছে অন্ধকার রহস্যের ধুলোমেঘ।
তবে আশ্চর্যজনকভাবে, কাজের ক্লান্তির মধ্যে তার মনে একধরনের শান্তি আছে। হয়তো এই প্রথমবার সে কিছু একটা করার অনুভূতিতে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখছে—নইলে যে নিঃসাড় হয়ে যেত তার মন, সেই ভয় তো ছিলই।
হঠাৎ করেই দূর থেকে ওয়াজফান এর ছায়া ভেসে ওঠে বারান্দার রেলিংয়ের ওপরে। তার হাতে এক হয়তো ওটা রক্তের মতো গাঢ় কোন পানীয়। দূর থেকে তাকিয়ে আছে অর্ষার দিকেই। চোখের দৃষ্টিটা স্থির। ঠোঁটে যেন মৃদু একটা রহস্যময় হাসি।
অর্ষা সেদিকে নজর না দিয়ে মাথা নিচু করে টপ মুছে যেতে থাকে, কিন্তু তার হাত থমকে যায় মুহূর্তেই—মনের ভেতরে সেই দৃষ্টি ঠিকই গেঁথে যায়।
চারদিক নিঃস্তব্ধ, শুধু দূরে রাজ্যপ্রাসাদের দেয়ালে হালকা বাতাসে পাতার খসখস শব্দ। মনে হয় যেন প্রাসাদের অদৃশ্য দেয়ালের ফাঁক দিয়ে কোনো অজানা ছায়া এগিয়ে আসছে তার দিকে।
কিছুক্ষণ আগে দ্বিতীয় তলার মার্বেল করিডোর ধরে হেঁটে যাচ্ছিল ওয়াজফান। তার গা ঘেঁষে কাঁচের জানালায় প্রতিফলিত হচ্ছিল ছায়া, যেন কোনো অশরীরী প্রতিপত্তি নিজেই তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিল। হঠাৎ, নীচে তাকাতেই অর্ষার সেই শান্ত দৃশ্য চোখে পড়ে তার। থেমে যায় সে। চোখজোড়ায় খেলে যায় খাঁটি শয়তানি রঙের এক উত্তাপ। ঠোঁটের কোণে খেলে যায় ঠাণ্ডা, নির্মম, শিকারি হাসি।
আর তখন থেকেই ওভাবে দাঁড়িয়ে আছে সে।
তার চোখে তীব্র এক তৃপ্তির ছায়া। তার ঠোঁট ফাঁক হয়ে আসে, খুব আস্তে, নিজেকেই শোনানোর মতো করে বলে ওঠে,
“এভাবেই… ধীরে ধীরে… তোমাকে ভেঙে ফেলব। তোমার প্রতিটা সাহস… আত্মসম্মান… আত্মবিশ্বাস—সব শেষ করে দেব আমি। তুমি নিজেকে ভুলে যাবে… নিজের নাম পর্যন্ত মনে থাকবে না। থাকবে শুধু আমার ছায়া, আমার দাসত্ব।”
তার কণ্ঠে শীতল বিষ, আর চোখে এক অসুস্থ উন্মাদনা।
ঠিক সেই মুহূর্তে—দূরের এক সাদা দরজা নিঃশব্দে খুলে যায়। দরজাটা যেন বাতাসে ভেসে আসে। নীরবতায় কেঁপে ওঠে করিডোর। ভিতর থেকে কেউ প্রবেশ করে— মানুষরূপী একটা জিন চোখ দুটি অস্বাভাবিক দীপ্তিতে জ্বলছে, মুখে গভীর রহস্যের ছায়া। তার পা ফ্লোরে পড়ে না যেন—ভেসে আসে ধীরে ধীরে। পোশাকে নিখুঁত পুরুষের ভান, কিন্তু চলনে… চোখে… মুখের বাঁকে… লুকিয়ে আছে অন্য কিছু।
ছেলেটি ছিল যেন এক অপার্থিব সৌন্দর্যের মূর্তি। জিনেরা সাধারণতই মানুষদের চেয়ে অধিক রূপবান হয়, তবে এই ছেলেটির সৌন্দর্য ছিল অন্য মাত্রার—এক আশ্চর্য মুগ্ধতা ছিল তার চোখে, এক রহস্যময় আবেশ তার মুখাবয়বে। তার দীর্ঘ চুল কাঁধ ছুঁয়ে পড়ে ছিল, গভীর চোখদুটি যেন কোনো এক অতল রহস্যের দরজা, আর তার হালকা হাসি যেন সৃষ্টির সমস্ত জাদু নিয়ে নেমে এসেছে।
সে ধীরে ধীরে পা ফেলে অর্ষার কাছে আসে । এরপর দাঁড়িয়ে থাকে সে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে অর্ষার দিকে—যেন সে এই প্রথম কোনো কিছুতে এত গভীর মনোযোগ দিল। অর্ষা তখন ব্যস্ত ছিল কোনো কাজ নিয়ে, মাথা নিচু করে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিল। এই রাজ্যে এসে সে নিজের মনে লুকিয়ে থাকা কষ্ট আর প্রশ্নগুলো নিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত কাটায়।
হঠাৎ চোখ তুলে ছেলেটিকে দেখতে পেয়ে অর্ষা খানিকটা অবাক হয়ে যায়। হঠাৎ করে তার সামনে এসে কেন দাঁড়িয়ে আছে । ছেলেটি সামনে এগিয়ে এসে নরম কণ্ঠে বলে ওঠে,
— “তুমি অর্ষা, তাই না? সেই মানব কন্যা… যাকে আমাদের বাদশা নিয়ে এসেছে?”
কণ্ঠে ছিল কৌতূহল, কিন্তু কোনো শত্রুতার আভাস ছিল না। বরং এক ধরনের প্রশ্রয়মিশ্রিত মৃদুতা ছিল তার গলায়।
অর্ষা কিছুটা দ্বিধা নিয়ে মাথা নাড়ে। ছেলেটির উপস্থিতিতে তার মনে ভয় না হলেও এক অজানা সত্তার সম্মুখীন হবার অনুভূতি হচ্ছিল।
ছেলেটি হালকা হেসে বলে,
— “তোমাকে নিয়ে এখন পুরো রাজ্যে গুঞ্জন ছড়িয়েছে। কারণ এই প্রথম এই রাজ্যে কোন মানব ঢুকেছে তাও বাদশা নিজে নিয়ে এসেছে।
অর্ষাও একটু মৃদু হাসে। এই রাজ্যে আসার পর, মানুষ বলে যে কেউ নেই যার সাথে সে খোলামেলা কথা বলতে পারে। শুধু ইসাবেলা মাঝে মাঝে এসে কিছু সময় দিয়ে যায়, কিন্তু তা খুবই সীমিত। এই ছেলেটির উপস্থিতি যেন হঠাৎ করে তাকে একটা নতুন জানালার সামনে এনে দাঁড় করালো।
অর্ষা মনে মনে ভাবতে থাকে—
“এই ছেলেটি কি আমার বন্ধু হতে পারে? যদি তার সঙ্গে আমি বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পারি, তাহলে হয়তো এই বন্দিত্ব থেকে বের হবার পথ খুঁজে পাব। আমাকে এখন কৌশলে চলতে হবে। ওদের বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। আর তারপর… তারপর একদিন পালিয়ে যাব এই অচেনা জিনের রাজ্য থেকে।”
তবু তার মুখে ছিল শান্ত এক হাসি। ধীরে ধীরে সে ছেলেটির সাথে কথোপকথন শুরু করে, সাবধানে শব্দ বেছে নিয়ে। ছেলেটি হাসিমুখে উত্তর দেয়, মাঝে মাঝে এমন কিছু বলে যা অর্ষাকে বিস্মিত করে। মনে হচ্ছিল, ছেলেটির মাঝে লুকিয়ে আছে অনেক গল্প, অনেক না বলা কথা।
আর এই মুহূর্তে, এই নিঃসঙ্গ রাজ্যে, সেই গল্পগুলোর একজন শ্রোতা হয়ে ওঠে অর্ষা—একটা পথের খোঁজে, এক মুক্তির আশায়।
এতক্ষণে হওয়া সবকিছুই বারান্দা থেকে ধীর অথচ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিল ওয়াজফান। অপার নীরবতায় তার চারপাশ জমাট বাঁধলেও, চোখে ছিল ঝড়—এক অশান্ত, দহনময় দ্বন্দ্ব। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা অর্ষা, যার মুখে এখন একরাশ হাসি—একজন অপরিচিত ছেলের সঙ্গে বিনীতভাবে কথা বলছিল সে। হাসিটা ছিল বিনয়মিশ্রিত, একটুও ঔদ্ধত্যপূর্ণ নয়। অথচ ওয়াজফানের চোখে সেই চেনা মুখটা আজ যেন অপরিচিত লাগছে—চোখে বেঁধে যেন কাঁটা।
সে জানে না কেন এই মুহূর্তে বুকের ভেতরটা দাউ দাউ করে জ্বলছে। ঈর্ষা? না, হয়তো অধিকারবোধ! নাকি সে শুধু চায় না কেউ অর্ষার হাসি ছুঁক, এমনভাবে যেভাবে সেই ছেলেটি আজ ছুঁয়ে ফেলেছে?
নাকি সে চায় না এই মেয়ে হাসুক একে তো সে এনেছে কষ্ট দেওয়ার জন্য তবে কেন এমন দাঁত কেলিয়ে হাসছে।
কোনো এক অভিশপ্ত ছায়ার মতো হঠাৎ সে নিচে নেমে আসে—দ্রুত, দৃঢ় পদক্ষেপে। কোনো শব্দ নেই, শুধু ক্ষেপে ওঠা চোখের ভাষা।
অর্ষা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার বাহু শক্ত করে ধরে ফেলে ওয়াজফান। সে বিস্ময়ে বলে ওঠে,
—“আপনি হঠাৎ…?”
কথাটা শেষ করার আগেই ওয়াজফান কোনো জবাব না দিয়ে টানতে টানতে তাকে নিয়ে চলে যায় রাজপ্রাসাদের ভিতরের দিকে—তার চোখে আগুন, ঠোঁটে জবাবহীন নীরবতা।
রুমে ঢুকেই দরজাটা ঝাঁপ করে বন্ধ করে দেয় সে। তারপর এক ধাক্কায় অর্ষাকে মেঝেতে ফেলে দেয়।
এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে যায়। মেঝের ওপর ছিটকে পড়া অর্ষা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। চোখে একরাশ বিস্ময়, আর মনে হাজারটা প্রশ্ন—কিন্তু কোনো শব্দ সে বের করতে পারে না।
ওয়াজফান দাঁড়িয়ে থাকে তার সামনে। চোখে অদ্ভুত এক উন্মাদনা।
আর এই চুপচাপ তীব্রতাই যেন অর্ষার শরীরে কাঁটা ধরিয়ে দেয়।
ওয়াজফানের চোখ যেন আগুনে জ্বলছে। তার হাতে তখন একখণ্ড কালো চামড়ার চাবুক ভয়ংকর, নির্মম। সে ধীরে ধীরে অর্ষার দিকে এগিয়ে আসে, যেন শিকারির চোখে ধরা পড়েছে অবুঝ কোনো হরিণী। কক্ষের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে নীরব আতঙ্কে।
“তোর হাসি… আমার সহ্য হয় না,” তার কণ্ঠে বিষ মেশানো আগুন, “তুই কেন হাসছিলি? আমি তোকে এনেছি যন্ত্রণা দেওয়ার জন্য। মজা পাওয়ার জন্য নয়!”
এই কথা বলেই হঠাৎ সে চাবুকটা তুলে আঘাত করে বসে অর্ষার পিঠে—একটা কড়া, ছ্যাঁকা-দেওয়া আঘাত। চামড়ায় ধাক্কা খেয়ে অর্ষার শরীরটা খানিকটা কেঁপে ওঠে, কিন্তু মুখ থেকে একটাও শব্দ বের হয় না। সে নীরব, অনড়, যেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এক যোদ্ধা—ব্যথা পেলেও মুখ ফুটে কষ্ট স্বীকার করবে না।
ওয়াজফানের রাগ যেন আরও বেড়ে যায় অর্ষার এই অবজ্ঞায়। সে গর্জে ওঠে, “তুই বুঝবি আজ, যন্ত্রণা কাকে বলে! আমি যেন আর কখনও তোকে হাসতে না দেখি!”
সে আরও একবার আঘাত করে। আবার… তারপর আরেকবার… পরপর, দ্রুত, হিংস্র চাবুকগুলো অর্ষার কোমল পিঠে পড়তে থাকে, যেন অন্ধ প্রতিশোধের ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
অর্ষার চোখের কোনা দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। প্রতিটি চাবুক যেন তার রক্তমাংস ছিঁড়ে ফেলছে, অথচ তবু তার মুখে একটিও শব্দ নেই। সে যেন দাঁতে দাঁত চেপে নিজের শক্তিকে আঁকড়ে আছে। তার চোখে এক ধরনের তীব্র প্রতিজ্ঞা—সে হার মানবে না, এই দানবের সামনে নত হবে না কখনও।
ওয়াজফান যেন উন্মাদ হয়ে গেছে। যতই আঘাত করে, ততই অর্ষার নিরবতা তার ভেতরের দানবটাকে আরও ক্ষেপিয়ে তোলে। সে চায় অর্ষা কাঁদুক, চিৎকার করুক, তার কাছে মাথা নত করুক। কিন্তু না, অর্ষা নীরব এক শক্তির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার নীরব কান্না, তার রক্তাক্ত পিঠ, আর অদম্য চোখের ভাষা যেন বলে দিচ্ছে—“আমাকে ভাঙা যাবে, কিন্তু ভীত করা যাবে না।”
ওয়াজফান এই প্রতিরোধের সামনে দাঁড়িয়ে যেন প্রথমবার বুঝতে পারছে—এই মেয়েটা শুধু মাংসপিণ্ডে গড়া কোনো দুর্বল মানবী নয়, সে যেন এক অভেদ্য আগুনের শরীরী রূপ, যে সহ্য করতে জানে, কিন্তু হার মানতে নয়।
অর্ষার পরনে ছিল একটি সাদা জামা—নির্মলতার প্রতীক, শান্তির প্রতিচ্ছবি। কিন্তু সেই সাদার উপর একের পর এক পড়তে থাকা আঘাতে ফুটে উঠতে থাকে লাল রঙের দাগ—তাজা রক্তের ছোপ। ধীরে ধীরে পুরো জামাটা যেন রক্তরাঙা এক আতঙ্কের চিত্র হয়ে ওঠে।
ওয়াজফান যখন সেই রক্তে স্নাত সাদা জামাটা দেখতে পায়, এক অদ্ভুত মুহূর্তে তার হাত থেমে যায়। যেন সময়ের চাকা হঠাৎ আটকে গেছে কোথাও। তার ঠোঁট চেপে ধরা, চোখ দুটো বিস্ফারিত, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। এই লাল রঙ তাকে যেন এক অন্য বাস্তবতায় ঠেলে দেয়—এক যন্ত্রণার রাজ্যে, যেখান থেকে সে নিজেই পালাতে চায়।
সে অনুভব করে, এই রক্ত শুধু অর্ষার শরীর থেকে ঝরেনি, বরং তার নিজের আত্মাও যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে যেন কেউ ভেতরে ভেতরে তাকে চাবুক দিয়ে আঘাত করছে—প্রতিটা ফোঁটা রক্ত, একেকটা দংশনের মতো তার বুকে বিঁধছে। অথচ এই রক্ত তো সে নিজেই বের করেছে! এই অনুতাপ, এই অসহ্য বোধে ওয়াজফানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে।
তার হাতের চাবুকটা যেন আগুন হয়ে উঠেছে, সে এক ঝটকায় সেটা ছুঁড়ে ফেলে দেয় দূরে। তার মুখে তখন আর আগের মতো উন্মত্ততা নেই—আছে এক অস্পষ্ট গম্ভীরতা, নিঃশব্দ আতঙ্ক। কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে, স্তব্ধ দৃষ্টিতে অর্ষার দিকে তাকিয়ে, সে কোনো শব্দ না করেই ধীর পায়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়।
ওয়াজফানের চলে যাওয়ার পর যেন গোটা ঘর নিঃশব্দ হয়ে পড়ে। কেবল অর্ষার দেহটা তখন কুঁকড়ে গিয়েছে মেঝেতে। তার সাদা রক্তমাখা জামাটা বিছিয়ে আছে পাথরের মেঝেতে, আর তার কাঁপতে থাকা শরীর থেকে যেন কান্নার প্রতিটি শব্দ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।
অর্ষা, যন্ত্রণায় বিধ্বস্ত, ভয় আর অপমানের ভারে মাটিতে শুয়ে পড়ে। তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়তে থাকে অশ্রু, যা যেন ধুয়ে দিতে চায় সেই রক্তের লাল দাগগুলো। কিন্তু চোখের জল দিয়ে কি হৃদয়ের ক্ষত মোছে?
সে কাঁদে। নিঃশব্দে নয়, ফুঁপিয়ে নয়, বরং বুকফাটা এক ক্রন্দনে। তার কান্না যেন ছিন্নভিন্ন আত্মার আর্তনাদ—একটা মেয়ে, যে নিজের জীবন নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছিল , অথচ আজ হারিয়ে যাচ্ছে এক দানবের আঁধারে।
তার কণ্ঠে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু তার কান্নার প্রতিধ্বনি যেন সেই ঘরের দেয়ালগুলোতে গিয়ে প্রতিফলিত হতে থাকে বারবার। যেন দেয়ালগুলোও কাঁদছে, আকাশও স্তব্ধ হয়ে শুনছে এক অসহায় মেয়ের আত্মার আর্তনাদ।
নিশ্ছিদ্র নীরবতায় কেটে যায় কয়েকটি দিন। প্রসাদের দেয়ালের অন্তরালে, অর্ষা নিজের কাজে ব্যস্ত থাকলেও হৃদয়ের গহীনে এক অস্থিরতা কাজ করছিল প্রতিনিয়ত। ওয়াজফানের সঙ্গে সেই রাতের ভয়াবহ ঘটনার পর থেকে তার আর কোনো কথা হয়নি, হয়নি দেখা। সে মনে মনে ভাবে ভালোই হয়েছে দানবটা সামনে আসে না।
সেই রাতের আঘাত শুধু মনের ভেতর নয়, শরীরেও ছাপ ফেলে যায়। ওয়াজফানের হিংস্র আঘাতের পর, সারা গা কেঁপে জ্বর আসে অর্ষার। শরীর যখন কাঁপছিল, মন তখনো তার চেয়েও বেশি কাঁপছিল। কিন্তু সেই রাত্রির নিস্তব্ধতায় এক উষ্ণ উপস্থিতি ছিল পাশে—রান্নাঘরের সেই নারী ও ইসাবেলা । যেন নিঃশব্দ কোনো দেবদূত, তারা সেদিন সারারাত অর্ষার সেবায় নিয়োজিত ছিল। ভেজা কাপড়ে শরীর ঠান্ডা রাখার চেষ্টা, উষ্ণ জলে মাথা ধোয়া, আর চোখে চোখে তার যন্ত্রণার খেয়াল রাখা—সবই নিঃস্বার্থ, মমতাময়।
তাদের এই মানবিকতার বিপরীতে ওয়াজফানের নির্দয়তা যেন আরও করুণ, আরও নির্মম হয়ে ধরা দেয়। সেই রাতের পর, অর্ষার ঠোঁট সিল করে দেয় এক গোপন শপথে—এই দানবটার সঙ্গে আর কখনো কথা নয়। তার মন বলেছিল, “শরীরের ঘা শুকিয়ে যাবে একদিন, কিন্তু আত্মার দাহ কবে মিটবে?”
ওয়াজফান যে প্রতিদিন প্রসাদের কাছাকাছি কোথাও আছে—তা টের পাওয়া গেলেও, অর্ষা ভান করত যেন তার অস্তিত্বই অদৃশ্য হয়ে গেছে। তার দৃষ্টি ঘুরিয়ে রাখত, পা ফেলে অন্যদিকে হাঁটত, শব্দ শুনেও করত না প্রতিক্রিয়া। তার নীরবতা হয়ে উঠেছিল এক মর্মান্তিক প্রতিবাদ।
এভাবেই গড়িয়ে যায় কয়েকটি দিন। প্রতিটি দিন যেন এক যুদ্ধ, প্রতিটি রাত এক স্মৃতির ছায়া।
তবুও, অর্ষা স্থির থাকে।
ভেঙে পড়ে না।
কারণ সে জানে—এই নীরব যুদ্ধেও একদিন সূর্য উঠবে।
এই ক’দিনে ইসাবেলার সঙ্গে বন্ধুত্বটা অনেকটাই দারুন হয়েছে।
সেই বুনো অচেনা জায়গায়, যেখানে প্রতিটি দেয়াল যেন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, সেখানে ইসাবেলা যেন একটুকরো আশ্রয়।
অর্ষার চারপাশে যেখানেই আঁধার, ইসাবেলা সেখানে যেন আলো হয়ে জ্বলে ওঠে।
দুজনের বন্ধুত্বটা এখন আর কেবল ‘সহবত’ নয়।
তা এখন কিছুটা নির্ভরতার, কিছুটা আত্মিক সংলাপের ছোঁয়া পেয়েছে।
ইসাবেলার হাসিতে একধরনের কোমলতা আছে, যা অর্ষার ভেতরকার বিপন্ন কিশোরী সত্তাটাকে একটু প্রশ্রয় দেয়।
বিকেলবেলা জানালার ধারে বসে চা খেতে খেতে তারা দুজন মাঝে মাঝে এত গল্পে ডুবে যায় যে সময় ঠিক কখন গলে পড়ে, বোঝাই যায় না।
ইসাবেলার চোখে থাকে কৌতূহল, মুখে থাকে ছোট ছোট প্রশ্ন, আর অর্ষা যতটুকু পারা যায়, ততটুকুই উত্তর দেয়।
তবু এই ছায়াপথের ভেতরেও একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে—যেটা একসময় হয়তো বন্ধুতা নামের সংকীর্ণ ছক ভেঙে আরও কিছু হবে।
তবে অর্ষা জানে, এই বন্ধুত্বের পেছনে তাকে রাখতে হবে সতর্ক এক মন।
কারণ সে ভালো করেই জানে, সে এখানে বন্দি।
আর যেকোনো বন্ধুত্বই তার মুক্তির সিঁড়ি হতে পারে, যদি সেটা ঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়।
আর ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়িয়েই সে ভাবতে শুরু করে,
“জ্যাইম। হ্যাঁ, তাকেও তো ভুলে গেলে চলবে না।”
জ্যাইম—যে ছেলেটি নীরবে তার পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছে,
যার চোখে কোথাও যেন একটুকরো বিশ্বাসযোগ্যতা আছে,
যার স্বরে কিছুটা মমতা, কিছুটা দ্বিধা মিশে থাকে।
জ্যাইমের সঙ্গে ওর কথা হয়েছিল কিছুদিন আগে, আর সেই মুহূর্তগুলোর কথা মনে পড়তেই অর্ষার চোখে ভেসে ওঠে এক অদ্ভুত অনুভূতির রেখা।
সে হঠাৎ করেই বুঝতে পারে—জ্যাইম হতে পারে তার মুক্তির চাবিকাঠি।
আর এখন, সেই চাবিটাকেই তাকে কাজে লাগাতে হবে।
অর্ষা মনের গহীনে এক নীরব প্রতিজ্ঞা করে, “জ্যাইমকে বিশ্বাস করতেই হবে, অন্তত একবার।
তার মায়ার ভেতর থেকে পথ খুঁজে বের করতে হবে আমার।
সে হয়তো জানে না, কিন্তু আমি জানি—আমার মুক্তির সবচেয়ে কাছের দরজাটাই এখন জ্যাইম।”
এই প্রাসাদে ওয়াজফানের পর যদি কারো কথা চলে তা হল জ্যাইম।
আর জ্যাইম এমনিতে খুব ভালো সব সময় ভালো ব্যবহার করো কিন্তু এখন ওকে ফাঁসাতে হবে এখান থেকে বের হওয়ার জন্য।
তার ঠোঁটে একটুকরো স্থির হাসি জমে ওঠে।
আর চোখ দুটো হয়ে ওঠে স্থির, সিদ্ধান্তপ্রবণ।
বাইরে হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছে, দূরে সূর্য ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
আকাশে লালচে সোনালী আলো মিশে এক অপার্থিব দৃশ্য তৈরি করেছে।
আর অর্ষার ভেতরেও সূর্য অস্ত যেতে যেতে এক নতুন আলো জন্ম নিচ্ছে।
আলো—যেটা তাকে বলছে, “হাঁটো। এবার তুমি নিজের পথ নিজেই তৈরি করো।”
রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে, প্রাসাদের অভিজাত ডাইনিং হলে শুরু হলো জমকালো নৈশভোজ।
ঝাড়বাতির সোনালী আলোয় ঝিকমিক করছে মার্বেলের মেঝে, যেন সেই আলোতেই মিশে আছে এক রাজকীয় রহস্য। ওয়াজফান বসে আছে প্রাসাদের রাজসিংহাসনের পাশে, পাশে তার অনুগত জ্যাইম ও গম্ভীর মুখে চুপচাপ বসে থাকা ইসাবেলা। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরও সদস্যরা।
বড় বড় প্লেট সাজানো, দামি রুপোর বাটিতে সুগন্ধি সুপ, রোস্টেড হরিণের মাংস, মশলা-মাখানো সাগর-চিংড়ি আর ফলের রসে ভেজা মিষ্টির স্তূপ। রান্নার দায়িত্বে থাকা মহিলাটি একে একে প্রতিটি প্লেটে খাবার পরিবেশন করতেই যাবে কিন্তু ঠিক তখনই ওয়াজফানের গলা যেন বজ্রপাতের মতো কেঁপে উঠল সেই নিস্তব্ধ আকাশে—
“দাঁড়াও।”
এক চিলতে রাগ, একফোঁটা কৌশল আর একরাশ অবজ্ঞা ছড়িয়ে ছিল তার কণ্ঠে। সমস্ত ঘরটা থমকে গেল। পরিবেশন করা বন্ধ।
ওয়াজফান ঠান্ডা চোখে রান্নার দায়িত্বে থাকা মহিলার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি না… আজ নয়। আজ ওর দিন। সেই মানব-কন্যা—অর্ষা। হ্যাঁ, আজ থেকে সেই করবে এসব। আমি ওকে বসে খাওয়ানোর জন্য এখানে আনিনি। ওকে নিচুতে নামাতে চাই। দম্ভ ভাঙতে চাই।
গিয়ে তাকে ডেকে নিয়ে এসো। এখনই।”
কণ্ঠে ছিল হুকুম, চোখে বিদ্রুপ, আর ঠোঁটে খেলার ছায়া এক অদ্ভুত নির্মমতা।
মহিলাটি কিছু না বলে মাথা হেঁট করে দৌড়ে চলে গেল সিঁড়ি বেয়ে ওপরে—অর্ষার কক্ষে। যেন আগুনে পোড়া একটা বার্তা নিয়ে, এক অজানা ঘৃণার সংবাদে।
আর ডাইনিং টেবিলে তখন নিঃশব্দ এক উত্তেজনা।
ওয়াজফানের কথাগুলো যেন হিমেল হাওয়ার মত নিঃসাড়ে ছড়িয়ে পড়ে রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে। কিন্তু সেই হিমের মধ্যে লুকিয়ে ছিল একরাশ জ্বলন্ত অগ্নিশিখা। জ্যাইম, যার হৃদয়ে সত্য আর ন্যায়বোধ আজও জ্বলজ্বল করে, এবার আর চুপ থাকতে পারল না। চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ নিয়ে হঠাৎ করে বলে উঠল,
“দা ভাই, আজ আমি প্রশ্ন করছি। এতদিন হয়তো কিছু বলিনি, কিন্তু আজ আর নয়। বলো তো, একটা মানব কন্যা, একেবারে সাধারণ এক মেয়ে—সে কী এমন দোষ করেছে যে তাকে বন্দি করে এই প্রাসাদের অন্ধকার কোণায় ফেলে রাখা হয়েছে? সে তো কারও কোনও ক্ষতি করেনি। তার চোখে ভয়, তার মুখে কষ্টের ছায়া—তা দেখেও তুমি কেমন নির্বিকার? কেন এমন নিষ্ঠুর আচরণ? কেন তাকে এমনভাবে কষ্ট দিচ্ছ?”
তার কণ্ঠস্বর থেমে গেল এক মুহূর্তে, যেন বুকের গভীর থেকে গর্জে ওঠা যন্ত্রণা শব্দের রূপ পাচ্ছিল। তারপর জ্যাইম একটু নরম স্বরে বলে,
“আমি জানি, তুমি এমনি এমনি কিছু করো না। সবকিছুর পেছনেই থাকে একটা কারণ—গভীর, অদৃশ্য, আমি শুধু সেই কারণটাই জানতে চাই, দা ভাই। প্লিজ, আজ অন্তত আমায় বলো।
ওয়াজফানের মুখটা কঠিন হয়ে উঠল। চোখে এক ধরণের অস্বস্তি, বিরক্তি আর অদ্ভুত শীতলতা খেলে গেল। মুহূর্তখানেক চুপচাপ তাকিয়ে থাকল জ্যাইমের দিকে। তারপর ঠোঁটের কোণটায় এক পশুর মতো ঠান্ডা ব্যঙ্গ নিয়ে বলল,
তুই আমার ব্যাপারে এত মাথা ঘামাচ্ছিস কেন জ্যাইম? আমার সিদ্ধান্ত, আমার কাজ—এসব নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। আমি কী করছি, কেন করছি, সেটা আমি জানি। তোকে জানতে বলিনি, বুঝতেও বলিনি। অতএব নিজের সীমা বুঝে চল।আমার বিষয়ে তোকে এত ভাবতে বলিনি আমি।
তার কণ্ঠে এমন এক ধরণের কঠোরতা ছিল, যা একদিকে যেমন ভয় জাগায়, অন্যদিকে তেমনি অসহায়তাও ছড়ায়।
চারদিক নিরব, শুধু রাজপ্রাসাদের দীপ্তশোভিত ডাইনিং হলে জমেছে এক গম্ভীর পরিবেশ। খাবারের পাত্রে আর কাঁসার গামলায় ঢেউ খেলে যায় টিপটিপ শব্দে, কিন্তু কারোর মুখে আর স্বস্তির ছাপ নেই।
ওয়াজফানের বক্তব্যে থমথমে পরিবেশে এবার নীরবতা ভাঙলেন তার বাবা ইশবাব নিজে। কণ্ঠে ছিল অভিভাবকের ধৈর্য, চোখে বাবার মমতা আর সংযমিত ক্রোধ।
জ্যাইম তো একদম ঠিক কথাই বলেছে, ওয়াজফান। তুমি শুধু শুধু এত রেগে যাচ্ছো কেন, বাবা? সত্যিই তো—একটা নিরীহ মানব কন্যাকে এভাবে প্রাসাদে আটকে রাখার মানে কী? ও তো কোনো অপরাধ করেনি। শুধু শুধু একটা মেয়েকে এত কষ্ট দাও কেন? আমি বলছি—এবার ওকে মুক্তি দাও। ওকে তার দুনিয়ায় ফিরিয়ে নিয়ে যাও। ওকে আর কষ্ট দিয়ো না আর, ওয়াজফান।”
রাজপিতার কথায় যেন ক্ষীণভাবে কেঁপে উঠল পুরো প্রাসাদের বাতাস। কিন্তু ওয়াজফানের চোয়াল শক্ত, চোখ জ্বলজ্বল করছে ক্রোধে। সে আর বসে থাকতে পারল না—গর্জে উঠে ডাইনিং টেবিল থেকে দাঁড়িয়ে গেল।
তার কণ্ঠে অনল যেমন জ্বলছিল, তেমনি ছিল অবিনয়, অবাধ্যতা—
আমার বিষয় নিয়ে আমি কারো নাক গলানো পছন্দ করি না!
আমি কী করব আর কী করব না, সেটা আমি নিজেই ভালো বুঝি। কাকে ধরে রাখব, কাকে ছেড়ে দেব—সেটা সম্পূর্ণ আমার সিদ্ধান্ত। আর হ্যাঁ, সেই মানব কন্যাকে নিয়ে এত চিন্তা করার কিছু নেই। আমি কাউকে বলিনি ওর বিষয়ে এত ভাবতে।
আমার স্পষ্ট কথা—আমার অনুমতি ব্যতীত কেউ যেন ওর কাছে না যায়। কেউ যেন ওকে নিয়ে কোনও প্রশ্ন না তোলে। ওকে আমি এনেছি, এবং আমি জানি ওর সঙ্গে কী করবো আর কী না করবো। কারো কাছ থেকে আমি জানতে চাইনি ওর বিষয়ে কী করা উচিত, আর চাইও না।”
এই বলে ওয়াজফান চারপাশে কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে নীরবতা চাপিয়ে দিল।
ওয়াজফানের কণ্ঠে ক্রমেই ক্ষোভের দহনে জন্ম নিচ্ছিল বিস্ফোরণ। চোখদুটো তার গাঢ় অন্ধকারে পুড়ে যাওয়া আগুনের মতো দাউ দাউ করে জ্বলছিল। উত্তেজনায় বুকটা উঠানামা করছিল। কথা বলার ধরণেই বোঝা যাচ্ছিল—সে নিজেকে আর সংবরণ করতে পারছে না।
রাগে কাঁপতে কাঁপতে সে পেছন ফিরেই হাঁটতে শুরু করল।
কিন্তু ঠিক তখনই জ্যাইম ঠাণ্ডা অথচ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠল,
দা ভাই, তুই কিন্তু ভুলে যাস না… তোর একটা ফিয়ান্সে আছে।
ওয়াজফান থমকে দাঁড়ায়। মুহূর্তের জন্য যেন চারপাশের বাতাস থেমে যায়, নিস্তব্ধতা জমাট বাঁধে তার চারপাশে। ধীরে ধীরে সে ঘুরে দাঁড়ায়, চোখে জ্বলে ওঠে রাগ।
গভীর কণ্ঠে, ঠাণ্ডা অথচ রক্তজমাট করা ধীরে ধীরে সে উত্তর দেয়,
আমি জানি, আমাকে কিছু মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। আর হ্যাঁ—আমি শুধু একজন দাসী নিয়েছি, এর চেয়ে বেশি কিছু না।”
তার চোখদুটো ছিল কঠিন, যেন জোৎস্নাহীন রাতের আকাশ, যেখানে আশা নেই, ভালোবাসা নেই—শুধু একরাশ অভিমান আর ঘৃণা। ঠোঁটে ঠাণ্ডা এক তাচ্ছিল্যের হাসি খেলে যায়।
“এইটুকু শিখে রাখ জ্যাইম,” আমার বিষয় আমি ভালে বুঝি, “তুই না ভাবলেও চলবে। আমি ঠিক জানি আমার জীবনে কে কী মূল্য রাখে।
কথাগুলো বলে ওয়াজফান দূরত্ব পায়ে সেখান থেকে চলে যায়।
ওয়াজফান চলে যাওয়ার সাথে সাথেই জ্যাইম মনে মনে বলে ,
Death or Alive part 12
তুই মুখে না বললেও দা ভাই আমি তোকে জানি। তুই কখন কি কোন কারণে করিস সেটা আমি ভালো করেই জানি। তোর উদ্দেশ্যটা আসলে কি সেটা আমি ভালো করেই তো ধরতে পেরেছি কিন্তু তোর সেই উদ্দেশ্য যে সফলতা পেতে দেওয়া যাবে না আমি কিছুতেই সেটা হতে দেব না। এবার তুই যতই চেষ্টা করেন আমি তোর উদ্দেশ্য কখনোই সফল হতে দেবো না।
তার মুখে একজোড়া তৃপ্তি হাসি।
