Remedy part 14
মীরা রায়াদ
সকাল থেকে ঝুম শাইয়ানের পিছু নিয়েছে। ছোট ছোট পায়ে শাইয়ান যেদিকে যাচ্ছে পিছু পিছু সেও সেদিকে যাচ্ছে। শাইয়ান দেখেও বিশেষ আমলে নিল না। সে নিজের মতো করে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যাগভর্তি করলো। ঝুম অবশ্য বারকয়েক কথা বলার চেষ্টা করেছিল, বলেছিল সে করে দিচ্ছে কিন্তু শাইয়ানের তরফ থেকে আগ্রহ না দেখে মিয়িয়ে গেলো মেয়েটা। শাইয়ান ঠিক করেছিল রাতের দিকে বের হবে। কিন্তু কাল রাতের পর তার ভীষণ অভিমান হলো। অভিমান করেই সে সিদ্ধান্ত নিলো বেলা থাকতে চলে যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ। তাই সব কিছু তৈরি করে নিল। মাঝে মেহেরুন্নেসার কাছে গিয়ে অনেকক্ষন বসেছিল। মাকে বুঝিয়ে বলল ঝুমের দিকে খেয়াল রাখতে। মেয়েটা ভীষণ নাজুক। খাওয়া – দাওয়া করতে চায় না একদম। প্রায় রাতে তাকে বকে খাওয়াতে হয়। বারবার করে বলল রাতে যেন না খেয়ে ঘুমাতে না যায়, সে দিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে। মেহেরুন্নেসা তখন নীরবে হেসেছে। ছেলে তার একদম বাবার মতো যত্নশীল হয়েছে।
যাওয়ার আগে নিজেদের থাকার রুমে আবার আসলো শাইয়ান। ঝুম বিছানার একপাশে চুপটি করে বসে। তার মুখশ্রী ফ্যাকাশে। বিরহের বেদনা চোখেমুখে ফুটে উঠেছে স্পষ্ট। শাইয়ান বুঝলো তাও কিছু বলল না। সে একা কেন পুড়বে? এবার না হয় ঝুম ও একটু পুড়ুক। বুঝুক শাইয়ানের কতো কষ্ট লাগতো। শাইয়ানকে আসতে দেখে উঠে দাড়ায় ঝুম। কিছু বলতে চায়, কিন্তু সেই সুযোগ তাকে দেয়া হয় না। শাইয়ান তাকে পাশ কাটিয়ে কেবিনেট খুলে কিছু একটা বের করে ঝুমের সামনে ধরে।
” এটাই তো আপনার ফোন তাই না? পাসপোর্ট আমি নিজের কাছে রেখেছিলাম, কিন্তু আপনার ফোনের ব্যাপারে আমি তখন জানতাম না। আপনি বলার পর হলরুমে খোজ লাগিয়ে পেয়েছি। যদিও পরবর্তী দিনগুলোতে আমার কাছে ছিল। এজন্য আমি দুঃখিত।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
চোখে চোখ রেখে দৃঢ় গলায় জানালো শাইয়ান। ঝুম তখন অপরাধবোধে মাথা নিচু করে ফেলল। শাইয়ান ঢিল মেরে ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে মারল। কয়েক পল ঝুমকে দেখলো ভালো করে। তারপর এগিয়ে এসে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। এরপর কতো দিন দেখা হবে না কে জানে? এভাবে আবার জড়িয়ে ধরতে পারবে তো সে? এই প্রথমবার ক্যাম্পে যেতে তার বুক কাপছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা হারিয়ে ফেলবে। এমনটা কি ঝুমের জন্য? ঝুম চাইলো বিপরীতে শাইয়ানকে জড়িয়ে ধরতে, কিন্তু দ্বিধাবোধে পারল না। শাইয়ান খুব ভালোবেসে ঠোঁট ছোঁয়ালো ঝুমের কপালের মধ্যভাগে। অনেকটা সময় নিয়ে ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইলো দুজন। উপভোগ করলো এই সময়টা। ভালো লাগায় দুজনের মন ভোরে গেলেও কেউ একটা কথা বলল না। অনেক অনেকক্ষন পর শাইয়ান বলল –
” আমাকে ক্ষমা করে দিবেন আরীবা। আপনার সাথে অনেক অন্যায় করেছি। জোর করে বিয়ে করেছি। নিজের কাছে বেঁধে রেখেছি। সব কিছুর জন্য ক্ষমা চাইছি আমি। জানি না আবারও আমাদের দেখা হবে কি না। যদি ফিরে আসি তাহলে আপনি পুরোটাই আমার। তখন চাইলেও আমি আপনার একটা কথাও শুনবো না। আর যদি ফিরে না আসি তাহলে আপনার পাসপোর্ট আপনার হাতে পেয়ে যাবেন। তখন না হয় আপনি নিজের দেশে চলে যাবেন। কেমন?”
হঠাৎ ঝুমের বুকের মাঝে কিছু একটা হলো। সে ডানহাতে শাইয়ানের পরিপাটি করে পড়া সাদা শার্টটা মুঠো করে ধরলো। ভয় করলো তার। ছেড়ে দিলে যদি হারিয়ে যায়? কি বুঝাতে চাইছে লোকটা? কোথায় যাবে?
ঝুম ব্যস্ত হয়ে প্রশ্ন করল –
” আপনি কোথায় যাচ্ছেন ডক্টর?”
শাইয়ান শান্ত স্বরে বলল –
” এখন সিএমএইচ এ যাচ্ছি।”
স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ল ঝুম। শাইয়ান আর দাড়ালো না, ব্যাগ তুলে বেরিয়ে গেলো। ঝুম দাঁড়িয়ে দেখলো, কিন্তু বলতে পরলো না আমাকে ছেড়ে যাবেন না ডক্টর। আমাকে নিয়ে যান। বলা হলো না তার। আদোও আর বলতে পারবে কি? ভাগ্যে কি লেখা আছে ঝুম আর শাইয়ানের?
শাইয়ান গিয়েছে আজ ৭ দিন। সেদিন যাওয়ার পর সে আর ঝুমের সাথে যোগাযোগ করেনি। প্রথম দুদিন ঝুম নিজেকে সামলাতে পারলেও তারপর থেকেই মনটা শাইয়ানের জন্য কাদঁছে। ফোন থাকলেও ঝুম শাইয়ানকে কল করতে পারছে না। কারণ তার কাছে শাইয়ানের ফোন নাম্বার নেই। সে এই কথাটা কাউকে বলতে পারছে না। এতগুলো দিন একসাথে থাকার পরও শাইয়ানের নাম্বার নেই জানলে কে কেমন ভাবে নেবে এই ভয়ে ঝুম কারো থেকে চাইছেও না। জড়তা কাজ করে। শাইয়ানের ঘরে তার আজকাল মন টেকে না। যতক্ষন ওই ঘরে থাকে ঝুম ছটফট করে। শাইয়ানকে খুব মনে পড়ে। তাই যতো পারে কম কম থাকে ওখানে। বর্তমানে সে বাড়ির ছাদে অবস্থান করছে। সূর্য ডুবেছে অনেকক্ষন। চারিপাশ নিস্তব্ধ, অন্ধকার। ঠিক ঝুমের মনের মতো। আকস্মিক পাশে আহির এসে বসলো। আহিরের উপস্থিতি বুঝেও বিশেষ আমলে নিল না ঝুম। তার এখন এই ছেলের সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। মন ভালো নেই তার। দীর্ঘক্ষণ কেউ কথা বলল না। নিশ্চুপ আঁধার দেখে গেলো। অতঃপর আহির গলা পরিষ্কার করে বলল –
” শাইয়ানকে মিস করছেন?”
ঝুম পাশ ফিরে চাইলো, কিন্তু কিছু বললো না। আহির দেখলো মেয়েটি এখন আর আগের মতো নেই। সপ্তাহ এক আগেও যে উজ্জ্বলতা ছিল, যে চঞ্চলতা ছিল তা যেন হারিয়ে গেছে কোথাও। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল –
” মনের কথা সময় থাকতে বলতে হয়। মানুষটা না থাকলে তখন হাজার বলেও তখন লাভ হয় না।”
ঝুম তাকিয়ে থাকলো। তার চোখে পানি। আহির বুঝলো হয়তো। দৃষ্টি ফিরিয়ে দূর আকাশ পানে তাকিয়ে অন্যরকম ব্যথিত গলায় বলল –
” জানেন ঝুম আমি একজনকে ভালবাসতাম। খুব ভালবাসতাম। কিন্তু শুধু মাত্র নিজের হেঁয়ালি আর অবহেলায় তাকে হারিয়ে আজ আমি নিঃস্ব।”
ঝুম অবাক হয়ে দেখলো আহিরকে। আহিরের চোখে কি নিদারুণ কষ্ট। হারানোর বেদনা। এই ছেলেও বুঝি কাউকে ভালোবেসে ছিল? কি এমন হয়েছিল তার সাথে?
” কি হয়েছিল?”
আহির হাসলো। ঝুম দেখলো তার চোখে চিকচিক পানি। অথচ ঠোঁটে কি দরুন হাসি।
” আপনি আমাকে যেভাবে চেনেন আমি আগে এমন ছিলাম না। চুপচাপ, স্থূল দেহের ছেলে ছিলাম( বলেই হাসলো সে)। কেউ আমার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাইতো না। শাইয়ানই ছিল আমার একমাত্র বন্ধু। যখন শাইয়ান ক্যাডেট স্কুলে চলে গেলো আমি তখন সম্পূর্ণ একা হয়ে গেলাম। গুমরে মরছিলাম। ঠিক সেই সময় জারা আমাদের স্কলে এডমিশন নিয়ে আসে। ওর বাবা সরকারি চাকরিজীবী ছিল। প্রতি দু এক বছরে দেশের এখান থেকে ওখানে যেতে হতো। তেমনই সেই সময় ওরা করাচি এসেছিল। শুরু থেকেই ও আমার সাথে কথা বলতো, মিশতে চাইতো। আমিই দূরেদূরে থাকতাম। কিন্তু জারার মতো মেয়ের থেকে বেশি দিন যে দূরে থাকা যায় না। আমিও পারিনি। টানা দুবছর আমরা বন্ধু ছিলাম। তারপর বন্ধু থেকে একে অপরকে ভালোবেসে ফেললাম। আমার মতো ফ্যাটি ছেলেকে জারার মতো স্কুল ক্রাশ মেয়ে ভালোবেসে ছিল জানেন? মেয়েটা অসম্ভব ভালবাসতো আমায়।
আমার থেকেও বেশি ভালোবাসতো। ও আমাকে মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করতে শিখালো। নিজেকে পরিবর্তন করতে শিখালো। মাত্র দেড় বছরের মাঝে ওর পরিবার আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে জানতে পেরে যায়। তারপর থেকেই জারাকে অনেক অনেক অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হতে হলো। মেয়েটা তাও আমাকে ছাড়লো না। আমার মতো বেকার ছেলেটাকে বিয়ে করতেও রাজি ছিল। হাজারো ঝড় – ঝাপটা পেরিয়ে আমরা পরিবারকে মানিয়ে নিয়েছিলাম। এক্ষেত্রেও জারার অবদান বেশি ছিল। সব ঠিক ছিল জানেন? তারপর তারপর আমাদের জীবনে গ্রহণ লাগলো। জারার বাবার ট্রান্সফার হয়। ওরা অন্য শহরে চলে যায়। দুবছর সব ঠিকই ছিল। না ঠিক ছিল না, জারা ঠিক থাকলেও আমি ছিলাম না। ( এই পর্যায়ে আহির অস্থির হয়ে উঠল) আমি…আমি শেষ করে দিয়েছি সব। আমি করেছি। জারা দূরে যাওয়ার পর আমি নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম।
ক্যারিয়ার গড়ার নেশায় আমি আমার জারাকে একা করে দিয়েছিলাম। ও কাদতো, অভিযোগ করতো, সময় চাইতো কিন্তু আমার কাছে তখন ওর জন্য সময় ছিল না। আমার তখন বন্ধুর অভাব ছিল না। আমার দিন যাচ্ছিল বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে, ক্যারিয়ারের প্ল্যান করে। আর আমার জারা? ওর দিন যেতো অপেক্ষা করে। জানেন, ও এতো বলতো আমি বদলে গেছি, তখন আমি আমলে নিতাম না। বড্ড বিরক্ত হতাম রোজকার ঝগড়া – ঝামেলায়। রেগে কথা বলতাম না। ফোন দিলে ধরতাম না। অথচ ও সারা রাত কাদতো। ৫ টা বছর ও সব সহ্য করে গেল। তারপর আমার জারা ধীরে ধীরে বদলে গেল।
একদিন জানতে পারলাম ওর বিয়ে। ও সেদিন একটুও কাদলো না জানেন? কিন্তু আমি কেদেছি। হারানোর ভয়ে কেদেছি। ক্ষমা চেয়েছি কিন্তু ও ক্ষমা করলো না। কি বলেছিল জানেন? বলেছিল তুমি কি আমার সেই ৫ বছরের কষ্ট, কান্না, অপেক্ষা ফিরিয়ে দিতে পারবে? যদি পারো তাহলে আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিবো। আমি পারিনি। পারতাম না ফিরিয়ে দিতে। সেদিন আমি আমার জারাকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। অন্য কারো বউয়ের সাঁজে দেখেছিলাম। অথচ ওর কোনো দোষ ছিল না। দোষ আমার ছিল। আমার করা অবহেলায় আমার জারা আমাকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়ে ছিল। ও বলতো, আমি যদি না থাকি তুমি কাদবে। ওর কথা সত্যি হয়েছিল। আমি আজও কাদি। থাকতে মূল্য দিন। শাইয়ান আপনাকে ভীষণ ভালবাসে ভাবি। যাওয়ার দিন আমায় ডেকে কি বলল জানেন? বলল, আহির আমার বউকে একদম জ্বালাবে না। তোমার জন্য যদি উনি কাদে তাহলে আমি তোমাকে আস্তো রাখবো না( হেঁসে ফেলল আহির)। আমি কখনো শাইয়ানকে কারো জন্য এতোটা পাগল হয়ে দেখিনি। ওকে আর কষ্ট দিবেন না ভাবি।”
ঝুম কাদঁছে, খুব কাদঁছে। তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। আহিরের জন্য, জারার জন্য এমনকি নিজের জন্যও। আচ্ছা শাইয়ান কি তাকে ছেড়ে যাবে? তাহলে তার কি হবে? ওই ঘরে যে মানুষটাকে ছাড়া ভালো লাগে না তার। সে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে মানুষটার। হারানোর ভয় ঝুমকে দরুন ভাবে কাবু করলো। তাইতো সে শব্দ করে কেঁদে ফেলল। আহির ঝুমের আকস্মিক কান্নায় ভড়কে গেল। কিছু বলতে নিবে তার আগে শাইয়ানের গলা শুনতে পেল।
” তোমাকে আমি খুন করে ফেলবো আহির। তুমি আবার আমার বউকে কাঁদালে। বারবার বারণ করার পরও তোমার সাহস হলো কিভাবে ওনাকে কাঁদানোর?”
আহির বিরক্ত হলো বটে। এই জামাই – বউ দুটাই পাগল। ভালো করতে গেলেও দোষী করে ছাড়ে। আহিরের কানে সাদা চকচকে অ্যাপল এয়ারপোডস্ গোঁজা। যার সাথে সংযুক্ত আছে শাইয়ান। সে শুরু থেকে সবটাই শুনছিল প্রযুক্তির মাধ্যমে। ভালোও লাগছিল তার, কিন্তু শেষে ঝুমের কান্না তার মেজাজ খারাপ করে দিলো।
আহির বিরক্ত হয়ে বলল –
” আহ্, ভাবি কাদছেন কেন? আপনার পাগলা জামাই জানতে পরলে আমাকে খুন করবে। এমনিতেই ওয়ারনিং দেয় শুধু।”
ফিক করে হেঁসে দিলো ঝুম। আহিরের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়লো –
” এখন আমি কি করবো ভাইয়া? উনি তো আমার ওপর রেগে আছে। যাওয়ার সময় কথা বলছিল না ঠিক করে।”
মেয়েটার কন্ঠ ভীষণ রকম নরম। এতো সুন্দর করে ভাইয়া ডাকলো যে আহির গলে গেল তখনই।
” কথা হয়নি?”
ঝুম মাথা নাড়িয়ে না বুঝাল। আহির অবাক হয়ে বলল –
” সেকি! কল দেয়নি ও?”
” না।”
ঝুম আবার কেঁদে দিলো। পাষাণ লোক তার খোঁজ নেয়নি একটুও।
” তাহলে আপনি দিতেন।”
” দিবো কি করে? নাম্বার নেই তো।”
আহির হতভম্ব। শাইয়ান নিজের কপাল চাপরালো। এতদিন ভেবেছে ঝুম ইচ্ছা করে যোগাযোগ করছে না। কিন্তু এখন তো দেখছি ব্যাপারটা অন্যরকম। তার ভুল হয়ে গেছে। নাম্বারটা অন্তত দিয়ে আসা উচিত ছিল।
আহির নিজের হতভম্বতা কাটিয়ে উঠে বলল –
” এতো দিনে নম্বর জোগাড় করতে পারলেন না আপনি? আনব্লিভাবল। যায় হোক আমি দিচ্ছি আপনি কথা বলে নিয়েন।”
ঝুম মাথা নাড়ানো। পরপর নাক টেনে কাঁদো কাঁদো গলায় প্রশ্ন করলো –
” আপনার এই বখাটে লুক কি ছেঁকা খাওয়ায় পর থেকে নেয়া ভাইয়া?”
আহির ভ্যাবাচেকা খাওয়া গলায় ক্ষেপে গিয়ে বলল –
” বখাটে লুক? কোনটা বখাটে লুক হ্যাঁ?”
ঝুম আহিরের লম্বা লম্বা চুলের ঝুঁটি করা অংশকে দু আঙুলের সাহায্যে টেনে টেনে দেখিয়ে বলল –
” কেন এগুলো।”
আহির হতভম্বে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। এই মেয়ে দেখছি তার সন্মানের ছিটে ফোঁটাও বাঁচিয়ে রাখবে না। ওপর পাশ থেকে শাইয়ানের হাসির শব্দ ভেসে আসলো। আহির চোখমুখ কুঁচকে ঝুমকে ধমক দিতে গিয়েও নিজেকে সংযত রাখলো। দেখা যাবে এখন বকা দিলে এই মেয়ের জামাই তাকে হসপিটাল থেকে ফায়ার করে উড়িয়ে দিবে।
ঝুম মেহেরুন্নেসার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে। মেহেরুন্নেসা যত্ন সহকারে ঝুমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নানান রকম গল্প করে যাচ্ছেন। ঝুম সেসব শুনছে কিনা কে জানে? সেতো অন্য ভাবনায় বিভোর। ছাদ থেকে ফেরার সময় আহির ঝুমকে শাইয়ানের নাম্বার দিয়েছিল। ঘরে ফিরে ভীষণ দ্বিধা নিয়ে সে শাইয়ানকে কল দিয়েছিল। কিন্তু ওপর পাশ থেকে কল ধরেনি কেউ। ধরবে কি করে? তখন শাইয়ান ইমারজেন্সি কনফারেন্সে ছিল। যেহেতু তারা দূর্লভ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যাচ্ছে, সুতরাং তাদের কিছু ইন্সট্রাকশন দেয়া হচ্ছিল। তিনবারের বার কল যখন ধরলো না তখন ঝুমের ভীষণ মন খারাপ হলো। তারপর থেকেই সে নিশ্চুপ। কিছু ভালো লাগছে না। মেহেরুন্নেসার কথার মাঝে হঠাৎ ঝুমের ফোন বেজে উঠলো। তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো ঝুম। নিশ্চই শাইয়ান ফোন দিয়েছে? ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রিনে শাইয়ানের নম্বর দেখে ঠোঁট কোনে হাসি ফুটে উঠল। মেহেরুন্নেসা বুঝলো হয়তো, তাই মুচকি হেসে নীরবে বেরিয়ে গেল।
ঝুম ফোন ধরতে ধরতে একবার কেটেও গেলো। তবুও তার হাত কাপছে। দ্বিতীয়বার কল আসতেই সে দ্রুত ফোন ধরলো। ফোন ধরে কানে চাপলো কিন্তু কথা বলল না। অপরপাশ থেকেও নীরব নিশ্বাসের শব্দ ভেসে এলো। দুজনই চুপ অথচ বলার জন্য কতো কথা জমে আছে। শুরুটা সর্বদা শাইয়ান করলেও এবার ঝুম করলো।
” ডক্টর।”
আহ্ সেই কলিজা ঠাণ্ডা করে দেয়া ডাক। শাইয়ান চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস নিলো। ভালো লাগছে তার, বিষণ ভালো লাগছে।
” হুম।”
কতদিন পর এই কন্ঠস্বর শুনতে পেলে ঝুম। আবেগে ফুঁপিয়ে উঠে বলল –
” আপনি বড্ড নিষ্ঠুর ডক্টর।”
শাইয়ান নিঃশব্দে হাসলো। ডোজ তাহলে ভালই কাজে দিয়েছে। ঝুম তখনো ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে।
” শান্ত হোন আরীবা। আমি আছি তো।”
” আপনি ছিলেন না ডক্টর। আমাকে একা রেখে চলে গেছেন। একবার খোঁজ নিলেন না। আমি কষ্ট পেয়েছি। আপনি খুব খারাপ।”
” আচ্ছা আমি খারাপ। এবার অন্তত কান্না থামান।”
ঝুম সময় নিয়ে কান্না থামালো। শাইয়ান তাকে যথেষ্ট সময় দিলো নিজেকে সামলে নেয়ার জন্য। কাল তাদের কাশ্মীর যেতে হবে। ওখানে গিয়ে ঝুমের সাথে ঠিক করে কথা হবে কি না বলা যাচ্ছে না। একেতো পাহাড়ি দুর্গম এলাকা, তারওপর শুনেছে নেটওয়ার্ক পাওয়া দুষ্কর।
” আরীবা।”
” হুম।”
” কাল আমাকে কাশ্মীর যেতে হবে।”
” কেন?”
ঝুম উদ্বিগ্ন। কাশ্মীর কেন? শুনেছে সেখানে জঙ্গিদের আস্তানা। বছরের প্রায় সময় সেখানে সর্বক্ষণই সন্ত্রাসী হামলা চলে।
” ওখানে আমার ক্যাম্প।”
ঝুম এবার শব্দ করে কেঁদে ফেলল। শাইয়ান হাসলো শুধু।
” না গেলে হয় না ডক্টর?”
” উহু।”
” কেন?”
” এটা আমার কাজ আরীবা। আপনি বুঝবেন।”
এরপর আর ঝুমের কিছু বলার ছিল না। সে জানে শাইয়ানের কাজই এসব। কিন্তু তাও ঝুমের ভয় করছে। শুধু বলল
Remedy part 13
” নিজের খেয়াল রাখবেন ডক্টর। আমার জন্য হলেও নিজের খেয়াল রাখবেন।”
শাইয়ান তৃপ্তি করে হাসলো। এই কথাগুলো শোনার জন্য কতগুলো দিন সে অপেক্ষা করেছে। সে পেরেছে, ঝুমের মনে নিজের জন্য স্থান তৈরি করতে পেরেছে।
