Home Remedy Remedy part 21

Remedy part 21

Remedy part 21
মীরা রায়াদ

” ওই রাজাকারের বাচ্চা।”
এমন অদ্ভুত ডাক শুনে আহির সেদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। ছাদের ওপর পার্শ্বে পিলারের ওপর বসে পা নিচের দিকে ঝুলিয়ে বসে আছে শ্রাবণী। আহির বিরক্ত হলো খুব। মেয়েটাকে দেখলে কেমন অসহ্য অনুভূতি হয়। দুচোখের বিষ লাগে। অথচ শ্রাবণী তার সাথে এমন কোনো ব্যবহার করেনি যার কারণে শ্রাবনীকে এভাবে অসহ্য লাগবে। কিছু মানুষ না চাইতেও আমাদের কাছে অপ্রিয় হয়ে ওঠে। শ্রাবণী ঠিক এমনই একটি মানুষ।

” আবে ঐ ধোলা চাঁন্দ, এদিকে এদিকে।”
শ্রাবণী হাত নাড়িয়ে ইশারা করলো। কিন্তু আহিরের ওখানে যেতে ইচ্ছে করলো না। তাছাড়া আরো একটি বিষয় আহির লক্ষ্য করেছে। শ্রাবণীর মাত্র বলা বাক্যটি অভূত ভাবে বাংলা – উর্দু মিলিয়ে জগাখিচুড়ী করা। সে না চাইতেও পা বাড়ালো সেদিকে। মনে মনে ভেবে নিল, ঝুম যেতে না চাইলেও সে অতিদ্রুত চলে যাবে এই দেশ ছেড়ে।
আহিরকে আসতে দেখে শ্রাবণী তার পাশে বসতে নির্দেশ করলো। আহির একবার ছাদ থেকে নিচে তাকিয়ে দূরত্ব দেখে নিল। অভিজ্ঞ চোখ খুব সহজে অনুমান করে নিলো, কম করে হলেও ১২ তলা বিল্ডিং এর ওপর আছে তারা। এখান থেকে অসাবধানতায় যদি পরে যায়, বাঁচার কোনো রাস্তা নেই। যদিও বা হায়াত গুণে বেঁচেও যায়, তবুও হাড়গোড় একটিও আস্তো থাকবে না। অথচ তার পাশের মেয়েটা মহা আনন্দে পা দুলিয়ে কেমন বসে আছে দেখো! ভয় করে না নাকি? জংলী একটা। আহির বসলো তো নাই, উল্টো আরো টানটান হয়ে দাঁড়ালো। শ্রাবণী বুঝলো তাকে পরোক্ষভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে আহির। আহিরের ভাব নেয়া দেখে বিরক্ত হলো শ্রাবণী। মনে মনে খবিশ বলতে ভুললো না।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

” কি মিয়া! এতো রাতে এখানে কি?”
আবারও সেই জগাখিচুড়ি ভাষা। উফ্! আহিরের চোখেমুখে বিরক্তি ভাব ফুটে উঠল। সে অতিষ্ট হয়ে বলল –
“কুড ইউ প্লিজ স্পিক ঈদার ইন উর্দু অর ইংলিশ?”
অন্য কেউ হলে হয়তো মেনে নিতো। কিন্তু শ্রাবণী তেরা উত্তরে বলল –
” পারতাম না।”
” ওয়াট?”
আহির বুঝলো মেয়েটা আস্তো একটা বেয়াদব। এর সাথে কথা বলা মানে নিজের ইচ্ছাতে মাথায় জট পাকানো। শ্রাবণী হেঁয়ালি না করে শুদ্ধ ইংলিশে বলল –

“এখানে কি?”
” এমনি। ঘুম পাচ্ছিল না।”
” তো এখানে কি মিয়া?”
” কিভাবে এখানে এসেছি জানি না। তবে এখন ভালো লাগছে। এতক্ষন দম বন্ধ লাগছিল।”
শ্রাবণী হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে গেল। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। অসাধারণ দৃশ্য। শ্রাবণী সেদিকে তাকিয়ে রইলো দীর্ঘক্ষণ। তারপর ভীষণ শীতল গলায় বলল –
” এই শহরটাই এমন। দমবন্ধ হয়ে আসে।নিশ্বাস নেয়া যায় না। স্বার্থপরে ভরা এই শহরে আমারও দমবন্ধ লাগে। কিন্তু কোথাও যেতে পারি না। কিছু পিছুটান যেতে দেয় না। কিছু আশা দূরে থাকতে দেয় না।”
আহির বুঝলো না। এই মেয়ের হঠাৎ কি হলো? শুরু থেকে শ্রাবনীকে যেমন দেখেছে এখন সেই শ্রাবণীর সাথে মিল পাচ্ছে না।

” মানে?
শ্রাবণী দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। খুব ঠাণ্ডা স্বরে বলল –
” নিচে যান মি. আহির। বৃষ্টি নামবে এখনি।”
আসার পর থেকে এই প্রথম কি মেয়েটা ভালো ভাবে কথা বলল? হ্যাঁ। আহির অবাক হলো বেশ কিন্তু কথা বাড়ালো না। আর নাই বা শ্রাবনীকে নিচে যাওয়ার কথা বলল। আহির একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে চলে গেল নিচে। আর শ্রাবণী? সে বসে রইলো একই ভাবে। ঝুম বৃষ্টি মুছে দিয়ে গেলো তার কষ্ট, দুঃখ, চোখ বেয়ে পরা সদ্য অশ্রুবিন্দু।

ঢাকা এসেছে ওরা আজ ৪ দিন। ঝুম তার অ্যাসিস্টেন্টের সাথে দেখা করেছে। দেশে তার ব্যবসাটা এখনও এই মেয়েটিই সামলাচ্ছে। ঝুম শাইয়ানের সাথে কথা বলে ঠিক করেছে, এখানের সব একবারে বন্ধ করে পাকিস্তানে নতুন করে শুরু করবে। মেহেরুন্নেসা ও সহমত পোষণ করেছে তাতে।

আহির যদিও বলেছিল সে চলে যাবে কিন্তু তার আর যাওয়া হয়নি। দেরিতে হলেও সে বুঝতে পেরেছে এই দেশটি অতোটাও খারাপ না। তাছাড়া বিথী আন্টি মানুষটি চমৎকার। শ্রাবণ ভোজন প্রিয় মানুষ হলেও দারুন মনের ছেলে। তাকে খাবারের লোভ দিয়ে যে কোনো কাজ করিয়ে নেয়া যায়। শুধু সমস্যা শ্রাবনীকে নিয়ে। সেদিন রাতের পর মেয়েটা আবার আগের মতো ব্যবহার শুরু করেছে। কথাবার্তার যা অবস্থা! সারাক্ষন বিরক্ত করে। কিন্তু একটা জিনিস আহিরকে ভাবায় খুব। আহিরের মনে হয় মেয়েটা ইচ্ছে করে সকলের সামনে নিজেকে এভাবে উপস্থাপন করতে চায়। যদিও সে এই ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ভাবেনি। কারণ বাইরের কারো প্রতি তার আগ্রহ জন্মায় না। ঝুম তার গ্রামের বাড়ি যেতে চেয়েছে। এমনকি সে তার বাবার মুখোমুখি ও হতে চায়। শাইয়ান যদিও শুরুতে বারণ করেছিল কিন্তু পরবর্তিতে ঝুমের কথা ভেবে মেনে নিয়েছে। কাল তারা ঝুমের গ্রামের বাড়ি যাবে বলে আজ রাতে ডিনারটা শাইয়ানের তরফ থেকে সকলের জন্য ট্রিট হিসেবে থাকবে বলে জানিয়েছে শাইয়ান।

শহরের একটি নাম করা রেস্টুরেন্টে তারা সকলে ডিনারের জন্য এসেছে। ঢাকার মতো ব্যস্ত শহরে খোলা মেলা মনোরম পরিবেশের মাঝে সৃষ্ট এই আধুনিকতা ঝুমের মন কেড়ে নিলো। ঢাকা আসার পর থেকে তার মনটাও কেন যেন মানতে চাচ্ছিল না। করাচিতে যদিও অনেক ভিড় কিন্তু ঢাকার মতো না। তাছাড়া মুলতান খুবই শান্তিপ্রিয় এলাকা। দীর্ঘদিন সেখানে কাটিয়ে ঢাকা অবস্থান করা খুব বেশি সমস্যার হয়ে পড়েছে ঝুমের কাছে। তাছাড়া ইদানিং তার সর্বদা কেমন যেনো হাসফাঁস লাগে। অস্থির অস্থির ভাব। কোনো কিছুতে মন মানে না।

খোলা ছাদের কিনারার পাশের একটি টেবিলে বসে পরলো তারা। একপাশে যথাক্রমে শাইয়ান, ঝুম ও আহির। অন্য পাশে আহিরের বরাবর শ্রাবণী, তার পাশে শ্রাবণ তারপর তাদের মা। মাথার ওপর মস্ত বড় আকাশ। মৃদু মন্দ বাতাস বইছে। খাবার অর্ডার দিয়ে তারা বেশ জমিয়ে আড্ডা দেয়া শুরু করলো। শাইয়ান বরাবরের মতো চুপ। সে তার ফোনে কিছু একটা করে চলেছে। বিথী আন্টি নিজেকে তরুণদের মাঝে বিশেষ উপস্থাপন করতে ব্যস্ত। কথা মূলত আহির, ঝুম ও শ্রাবণীর মাঝেই চলছে। বলতে গেলে আহির আর শ্রাবণীর মাঝে কথা কাটাকাটি লাগছে আর ঝুম তাদের থামানোর চেষ্টা করছে। শ্রাবণ সেসব হা করে গিলে খাচ্ছে। শাইয়ান বেজায় বিরক্ত আহিরের কান্ডে। চোখ মুখ কুঁচকে সে একবার তাকালো হাতে পায়ে বড় হওয়া আবুলগুলোর দিকে। তারপর চোখ ফিরিয়ে ঝুমের দিকে তাকালো। মেয়েটা অন্যান্য দিনের থেকে আজ ভীষণ শান্ত। ব্যাপার কি! এমন তো হওয়ার কথা না। এখানে আসার কথা শুনে সব থেকে ঝুমই বেশি উৎসাহিত ছিল। শাইয়ান কপালে ভাঁজ ফেলে সামান্য ঝুঁকে গেলো ঝুমের দিকে। কন্ঠে নমতীয়তা ঢেলে বলল –

” আপনি ঠিক আছেন আরীবা? শরীর খারাপ লাগছে?”
ঝুম অসহায় ভাবে তাকালো। তার এখানে ভালো লাগছে না। কান্না পাচ্ছে হঠাৎ। কি হচ্ছে সে নিজেও জানে না। হঠাৎ করে ঝুম কেঁদে ফেলল। বড় বড় মায়াবী চোখ দুটো থেকে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ল। শাইয়ানের বুক ধক করে উঠল। কি হয়েছে এই মেয়ের? সে ব্যস্ত হয়ে পরলো। অজান্তে কোনো ভুল করে ফেলল না তো? ঝুম কি কষ্ট পেয়েছে তার কোনো কাজে?
” কি হয়েছে পাখি? কাদছেন কেন?”
ঝুমের কান্নায় আহির আর শ্রাবণীর ঝগড়া থেমে গেল। এমন এক মুহূর্তে ঝুমের কান্নার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। সবাই ব্যস্ত হয়ে পরলো ঝুমকে নিয়ে। কিন্তু ঝুমের কান্না থামলো না। উল্টো একের পর এক প্রশ্নে তার কান্নার বেগ বাড়লো। চিন্তায় অতিষ্ট শাইয়ান চেঁচিয়ে উঠলো হঠাৎ।

” সমস্যা কি আপনাদের? আমি কথা বলছি তো। আর একটা শব্দ ও শুনতে চাই না আমি।”
পরপর থেমে ঝুমকে উদ্দেশ্য করে নরম অথচ ব্যাকুল গলায় বলল –
” কি হয়েছে পাখি? আমাকে বলবেন না?”
তার কন্ঠ ভীষণ রকম নরম। ঝুমের দুগালে হাত রেখে চোখের পানি মুছে দিলো। ঝুম বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে কাদঁছে। একটু আদর পাওয়ার জন্য কি? শাইয়ান অবাক। ঝুম বাচ্চামো করার মতো মেয়ে না। করলেও সীমা অতিক্রম করে না। যতটুকু করে চার দেয়ালের মাঝে। এমন এক পাবলিক প্লেসে এভাবে কান্না করার মতো অবুঝ তো সে না। কি হলো ওর?
” ভালো লাগছে না ডক্টর।”
” আচ্ছা। কেনো ভালো লাগছে না?”
” জানি না তো।”
ঝুমের উত্তরে সকলে তব্দা খেয়ে গেল। কিন্তু শাইয়ান ধৈর্য্যহারা হলো না। সে আগের মতো একই ভাবে নরম সুরে বলল –

” আচ্ছা ঠিক আছে সমস্যা নেই। মন ভালো নাই লাগতে পারে ব্যাপার না। কাঁদতে ইচ্ছা করেছে কেঁদেছেন ভালো করেছেন। এবার বলুন কি করলে ভালো লাগবে আপনার।”
ঝুম পরপর কয়েকবার নাক টানলো। এখন তার ভালো লাগছে। সে হঠাৎ হাসি দিয়ে বলল –
” এখন ভালো লাগছে ডক্টর।”
মারাত্মক মুড সুইং। শাইয়ান ছাড়া সকলের চোখ ছানাবাড়া দিয়ে গেল। মাত্রই না মেয়েটা ব্যাকুল হয়ে লাগলো? কি অদ্ভুত! শাইয়ান জহুরী নজরে ঝুমকে তাকিয়ে দেখলো বেশ কিছুক্ষন। ভালো করে দেখে মনে হলো মেয়েটার স্বাস্থ্য কিছু দিনের থেকে অনেকটাই বেড়েছে। কিছু একটা ভেবে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। এই মেয়ে আবার কোনো অঘটন ঘটায়নি তো? মনে প্রশ্ন জাগলেও কথা বাড়ায়নি সে। যত্ন করে চোখের পানি মুছে দিলো ভালো করে।
” ফ্রেশ হবেন?”

ঝুম ঝকঝকে দাঁত বের করে গালে টোল ফেলিয়ে মন মাতানো হাসি দিল। শাইয়ান বুঝি এই হাসি দেখেও স্থির থাকতে পারে? তার দুনিয়া থেমে গেছে ততক্ষনে। বুক ধুকপুক ধুকপুক করছে। শাইয়ানের সেই অবস্থা দেখে গাল ছড়িয়ে আরো হাসলো। মজা নেয়া হচ্ছে? কি ভয়ানক মেয়ে ভাবা যায়? ঝুম মাথা নেড়ে বুঝাল সে এখন কোথাও যেতে চায় না। কিছু সময় পূর্বের তার মন খারাপ হাওয়ায় মিইয়ে গেছে। সে মেতে উঠেছে মন মাতানো শুরে। আড্ডা যখন জমজমাট ঠিক তখন দুজন ওয়েটার মিলে টেবিল ভরে খাবার পরিবেশন করলো। জমে উঠলো তাদের সময়। এই পর্যায়ে ঝুমকে প্রাণবন্ত লাগলো খুব। সবাই খুশি মনে খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছিল। এমন সময় শ্রাবণী চুপ করে গেল। তার হাত থেমে আছে। চোখ ঠিক আহিরের পিছনে স্থির। খুব শান্ত, ধীর নজর তার। কেউ খেয়াল না করলে ও আহির করলো। সে শ্রাবণীর দৃষ্টি বরাবর পিছু ফিরে দেখল একটি ছেলে একটি মেয়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। সম্ভবত প্রপোজ করছে। আহির আবার শ্রাবণীর দিকে তাকালো। ওই চোখে কিছু একটা ছিল হয়তো যা আহির বুঝতে পারল না। তবে বড্ড পরিচিত লাগলো। ততক্ষনে একে একে ঝুম, শ্রাবণ ও শ্রাবণীর মা ও সেদিকে লক্ষ্য করলো। মিসেস বিথী হঠাৎ রেগে দাঁড়িয়ে গেলেন। কোনরূপ সতর্কতা ছাড়া ছেলেটির কাছে গিয়ে ছেলেটির শার্টের কলার চেপে থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন। ছেলেটি অতর্কিত হামলায় দুই কদম পিছিয়ে গেল। কিছু বলতে নিলে মিসেস বিথীকে দেখে কেমন চুপসে গেলো। কিন্তু ছেলেটির সাথের মেয়েটি চুপ রইল না। বয়সে বড় মানুষটির কাঁধে ধাক্কা দিয়ে চেঁচিয়ে বলল –

” এই কে আপনি? ওকে মারলেন কেন? হচ্ছে কি এখানে। প্রাইভেসি বলে কিছু নেই নাকি? ম্যানেজার, ম্যানেজার। কিসব মানুষকে ঢুকতে দেন আপনারা? অশিক্ষিত, আনকালচার যত্তসব।”
মিসেস বিথীকে ধাক্কা দেয়ার সাথে সাথে তাকে ধরে ফেলল শাইয়ান। মিসেস বিথী আগুন চোখে মেয়েটির দিকে চাইলো। মেয়েটি সেই চোখ দেখে ভড়কে গেলো হয়তো। শ্রাবণী এখনো একই ভাবে বসে। সে শান্ত, বড্ড শান্ত। কিন্তু শ্রাবণ শান্ত রইলো না। খেতে পছন্দ করা ছেলেটিকে আহির এসে থেকে ঝামেলা করা তো দূরের কথা বাড়তি একটি কথাও বলতে দেখেনি, সেই ছেলে মেয়েটিকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী শ্রাবণের ধাক্কায় মেয়েটি ছিটকে গিয়ে পড়ল নিচে। নিচে পড়তেই মেয়েটি কেঁদে উঠলো। মিসেস বিথীর হাতে থাপ্পড় খাওয়া ছেলেটি কাছেই ছিল, সে গিয়ে ধরে তুলল মেয়েটিকে। রাগত স্বরে শ্রাবণকে উদ্দেশ্য করে বলল –

” শ্রাবণ, কি ধরনের অসভ্যতা এসব? ও তোমার থেকে বয়সে বড়।”
এতক্ষন শান্ত নজরে শ্রাবণী সবটাই দেখছিল। এই পর্যায়ে উঠে দাড়ালো সে। খুব ধীর কদম তার, নেই কোনো তারা। শান্ত নদীর মতো খুব অন্যরকম একটি মানুষের মতো বলল –
” আমার মাও তোমার ওঁর থেকে বয়সে অনেক বড় পাভেল। তোমার ওঁ আগে আমার মাকে ধাক্কা দিয়েছে। সেই ভাবে দেখতে গেলে তোমার ওঁ কিন্তু অসভ্যের কাতারেই পরে তাই না?”

পাভেল নামের ছেলেটি কথা বলল না। ব্যস্ত হয়ে মেয়েটির ব্যাথা দেখতে লাগলো। শ্রাবণী দেখলো সবটা। তার মাঝে কি চলছে তার খোঁজ কি কেউ রাখে? ঝুম এগিয়ে এসে শ্রাবনীকে ধরলো। শ্রাবণী পাশ ফিরে চাইলো ঝুমের দিকে। উড়নচণ্ডী মেয়েটার চোখে এই প্রথম আহির জল দেখলো। ছলছল চোখ দুটো যেন বলছে, ঠকে গেছি আমি। তারপর আবার চাইলো পাভেলের দিকে। যে এখনো মেয়েটিকে নিয়ে পরে আছে। অথচ শ্রাবনী চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছে সে খবর তার নেই। শ্রাবণী কিছু না বললেও মিসেস বিথী চুপ নেই। সে তেড়ে এসে বলল –

” প্রতারক। আমার মেয়েটাকে এতোগুলো বছর মিথ্যে আশা দেখিয়ে এখন অন্য মেয়েকে বিয়ের চিন্তা করছিস? তোকে আমি ছাড়বো না। অসভ্যের জাত। আমি জানতাম তোদের জাতটাই এমন। এই জন্য তোর সাথে শ্রাবণীর বিয়ে দিতে আমি রাজি ছিলাম না। দেখ শ্রাবণী দেখ, কার জন্য করলি এতো। কার জন্য নিজের শখ আল্লাদ নষ্ট করে নিজেকে শেষ করলি। তোকে কতবার বললাম শুনলি না। তোর বাপটাও শুনেনি। ঠকের বাচ্চারা ঠক।”
মিসেস বিথী রাগে কাপছে। তার মেয়েটার জীবন, যৌবন শেষ করে এখন অন্য মেয়েকে বিয়ে করবে? আর সে তা দেখবে বসে বসে? কখনো না। এর শেষ দেখে ছাড়বে সে। শ্রাবণীর চোখে আজ জল থামছে না। এভাবে প্রতারণা করা যায়? ১৩ বছর কি কম সময় একটা মানুষকে চেনার জন্য?

পাভেলকে খুব বিব্রত লাগলো। আশেপাশের মানুষ তাকিয়ে দেখছে, যেন কোনো মজার দৃশ্য চলছে। কেউ কেউ আবার ভিডিও করছে। এখন মানুষ কারো আবেগ, অনুভূতির দাম দিতে জানে কই? মশলাদার কোনো দৃশ্য পেলেই হলো, বাছবিচার না করে তা নিয়ে রং তামাশা শুরু করে দেয়।
” দেখুন মেজো কাকি এই ব্যাপারে আমরা পরে কথা বলবো। প্লিজ সিন ক্রিয়েট করবেন না।”
সিন ক্রিয়েট! তার মেয়ের জীবনটা শেষ করে দিয়ে নাটক হচ্ছে? ভদ্রতার মুখোশ আর কতদিন? তার মেজাজ খারাপ হলো তার বলদী মেয়েটার ওপর। বাপটা ছিল এক গাধা আর মেয়েটা হয়েছে বলদী।
” খুব মানে লাগছে এখন তোর বলদের বাচ্চা? আর আমার মেয়েটা? ১৩ বছরের প্রেম হাওয়ায় উড়ে গেছে এখন? কচি মেয়ে পেয়ে সব ভুলে গেলি?”

রেগে গেলে মিসেস বিথীর মুখ নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সে কি বলে হয়তো নিজেও জানে না। খোলা মনের মানুষগুলোর এই এক সমস্যা। পরবর্তীতে তারা মনেও রাখে না কিছু। মহিলা ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। এখন তার মেয়ের কি হবে। অপেক্ষা করতে করতে ২৮ বছরে পা দিলো। কতবার বলেছে বিয়ে করে নিতে শুনল না তার কথা। এই প্রতারকটার জন্য নিজেকে একটি একটু করে শেষ করেছে। সে ফিরে চাইলো শ্রাবণীর চোখে। শ্রাবণীর ঠোঁট কোনে তাচ্ছিল্যের হাসি। অথচ দুচোখ পানিপূর্ণ। শ্রাবণী এগিয়ে এলো মিসেস বিথীর কাছে। মায়ের চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল –

” কেদো না। কিছু হয়নি। আমি ঠিক আছি।”
কিন্তু মায়ের মন শুনল কি তা! সেতো জানে তার মেয়ে এই ছেলেকে কতো ভালবাসে। যার জন্য নিজেকে বদলে নিয়েছে। এই ছেলে যা বলতো বোকা শ্রাবণী তাই শুনে নিতো। আহারে ভালোবাসা!
পাভেল এগিয়ে এসে শ্রাবনীকে তাচ্ছিল্য করে বলল –
” দেখেছেন আপনার মেয়েকে? দেখুন একবার। বুড়ি হয়ে গেছে বুড়ি। আমার সাথে যায়? না আছে রূপ না আছে স্ট্যাটাস। আমার গার্ল ফ্রেন্ডকে দেখুন আর আপনার মেয়েকেই দেখুন একবার। হাহ। কি দিতে পারবে আপনার মেয়ে আমাকে? না সুখ না টাকা। ওর থেকে আমার গার্ল ফ্রেন্ড হাজার গুণ বেটার।”
বড্ড নিচ শুনালো কথাগুলো। মানুষের মানসিকতা কতটা নিচ হলে এভাবে বলতে পারে? শ্রাবণী কি এতটাই অযোগ্য? সে ঠোঁটের কোনে আলতো হাসি নিয়ে চোখের পানি মুছে নিলো। পাভেলের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল –

” তোমার মনে আছে আমরা যখন রিলেশনে জড়িয়ে ছিলাম তখন আমাদের বয়স ছিল কতো? মাত্র ১৭ বছরের ছিলাম আমরা। আমার তখন সুন্দর্যের অভাব ছিল না পাভেল। কিন্তু তোমার ছিল। যোগ্যতার কথা বলছো? আমার জন্য যখন ভালো ভালো পরিবার থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসতো তুমি তখন বেকার ছিলে। তখন তোমারও যোগ্যতা ছিল না আমার পাশে দাঁড়ানোর। কিন্তু আমি তোমাকে ছেড়ে যায়নি। তুমি ভয়ে যখন কেঁদে কেঁদে বলতে আমাকে ছেড়ে যাবে না তো? ব্যাকুল হয়ে যখন আমার বাবার কাছে তোমার পরিবার নিয়ে এসে বললে তুমি আমাকে চাও। আমার পরিবার রাজি ছিল না। তোমাদের স্ট্যাটাসের থেকে আমরা অনেক ওপরে ছিলাম। কিন্তু আমি তোমাকে অপমান করিনি। তোমার জন্য লড়ে ছিলাম সেদিন আমি। মার খেয়েছি মায়ের হাতে। না খেয়ে থেকেছি তোমার জন্য। যখন টাকার ওভাবে তোমার পড়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, তখন সেই ছোট বয়স থেকে তোমার জন্য টিউশন করেছি। মাস শেষে টাকাগুলো তোমার হাতে তুলে দিতাম, যেন তুমি ভালোভাবে থাকতে পারো।

তখন তোমার পরিবার তোমার পাশে ছিল না পাভেল। তুমি বলতে তোমার সাহসী মেয়ে পছন্দ আমি তোমার জন্য নিজেকে বদলে ফেললাম। তোমার বাইকার মেয়ে পছন্দ আমি তোমার জন্য বাইক চালানো শিখলাম। তোমার বাঙ্গালী মেয়ে পছন্দ না আমি তোমার জন্য এমন হলাম। দেখো এই আমিকে কেউ পছন্দ করে না। আমি নিজেও করি না পাভেল। তাও তোমার ভালো লাগার জন্য আমি নিজেকে প্রতিদিন নিজ হাতে শেষ করেছি। তুমি কখনো দেখেছো আমার রাত জাগা কান্না? তুমি বলতে ব্যস্ত আছি, আমি বিশ্বাস করে নিতাম। তুমি বলতে বন্ধুদের সাথে আছি, আমি বিশ্বাস করতাম। তুমি বলতে অফিসে প্রেসার, আমি তাও বিশ্বাস করতাম। সারা দিন অপেক্ষা করার পর রাতে এসে বলতে ঘুম পাচ্ছে, আমি বোকা মেনে নিতাম।

তুমি বলেছিলে এখন বিয়ে করতে চাও না। লাইফের টার্নিং পয়েন্ট, কাজ করে ভালো পজিশনে যেতে হবে। দেখো আমি অপেক্ষা করতে করতে আজ তোমার কাছেই বুড়ি হয়ে গেলাম। এটাকেই বুঝি ভালোবাসা বলে পাভেল? শুনেছি দূরত্ব নাকি গুরুত্ব বাড়ায়। আমি তো দূরত্ব বাড়িয়েও দেখলাম। কি জেনেছি জানো? আমি আসলে দূরেই ছিলাম। আমার তোমার প্রতি কোনো অভিযোগ নেই পাভেল। যা আছে তা সবটা নিজের প্রতি। আমি অন্ধের মতো ভালোবেসে ছিলাম তোমাকে। অন্যায় করেছি। নিজেকে ভাল না বেসে আমি পাপ করেছি। তার থেকে ও বড় পাপ করেছি তোমার জন্য নিজেকে বদলে। এবার থেকে আর পাপ করব না পাভেল। আমি নিজেকে ভালবাসবো। খুব ভালবাসবো দেখো। আর হ্যাঁ, আল্লাহ ছাড় দেয় ছেড়ে দেয় না। ভালো থেকো দোয়া রইলো।”
শ্রাবণী ঘুরে মিসেস বিথীকে জড়িয়ে ধরে বলল –

” আমাকে ক্ষমা করে দিও মা। বোকা ছিলাম তাই তোমার কথা শুনিনি। ক্ষমা করবে না আমাকে?”
মিসেস বিথী দুহাতের মাঝে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল।
” তুই কোনো অন্যায় করিসনি শ্রাবণী। আমার মেয়ে সব থেকে ভালো মেয়ে। যে তোর সততার মুল্য না দিয়ে তোকে ঠকিয়েছে সে একদিন বুঝবে। তোর মূল্য আজ না হয় কাল বুঝবে।”

Remedy part 20

শ্রাবণী ঠোঁট এলিয়ে নরম অথচ চমৎকার হাসি দিল। সেই হাসি আহির আজ প্রথম দেখলো। আজ মেয়েটাকে বিরক্তিকর লাগছে না। অসাধারণ লাগছে। আজ আর উশৃঙ্খল লাগছে না। কেমন যেনো নরম এক নারীসুলভ ভাব ফুটে উঠেছে। শ্রাবণী সকলের উদ্দেশ্যে বলল –
” আজকের সন্ধ্যা আমার জন্য নষ্ট হলো। সরি। ফেরা যাক এবার?”
কেউ কথা বাড়ালো না। নিঃশব্দে এগিয়ে চলল। শ্রাবণী তার অতীত পিছে ফেলে এগিয়ে গেল এক নতুন শুরুর পথে।

Remedy part 22