Home Remedy Remedy part 24

Remedy part 24

Remedy part 24
মীরা রায়াদ

ঝুমদের বসার ঘরে আজ মানুষের মেলা বসেছে। ঝুম চোখ বড় বড় করে কিছু পরিচিত – অপরিচিত মানুষ দেখে যাচ্ছে। ভোরবেলা ঘুম থেকে তুলে শাইয়ান শুধু বলেছিল ফ্রেশ হয়ে নিতে। এরপর ঝুমকে নিয়ে বসার ঘরে যাওয়ার আগে শুধু একটি কথাই বলল সে।
” আজ এখানে যা কিছু হয়ে যাক, আপনি ভেঙে পরবেন না আরীবা। আমার বউ দুর্বল না এটা সবাইকে দেখিয়ে দিবেন আজ। মনে থাকবে তো আমার কথাগুলো?”

ঝুম বুঝেছিল কিছু একটা ঘটবে আজ। কথার গুরুত্ব কতটা না বুঝলেও শাইয়ানের কথায় সায় জানিয়ে ছিল তখন। কিন্তু এখানে এসে মনে হচ্ছে সাধারণ কোনো ব্যাপার না। ঝুম একপলকে এখানে উপস্থিত সকলকে দেখে নিলো। তারা মধ্যবিত্ত পরিবারের হলেও তার আম্মা খুব রুচিশীল ব্যক্তি ছিলেন। বসার ঘরে কম দামি একটি সোফা রাখা। যার একপাশে শাইয়ান তাকে নিয়ে বসে আছে। ঝুমের অন্যপাশে শ্রাবণী বসে। আর তাদের থেকে একটু দূরত্বে দরজার কাছে আহির দুহাত বুকে বেঁধে আয়েশি ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। তাদের একপাশের চেয়ারে ঝুমের বাবা ও ঝুমের দাদী বসে। মহিলা বয়সের ভাড়ে নুইয়ে গেলেও তার চোখ দুটি এখনো শকুনি নজরে ঝুমকে শাসিয়ে যাচ্ছে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

তাদের পাশেই ঝুমের ফুপু ও জলিল শিকদারের স্ত্রী দাঁড়িয়ে নিজেদের মাঝে কিছু একটা বলছেন। এছাড়াও এখানে জলিল শিকদারের ছেলে – মেয়েও উপস্থিত রয়েছে। মেয়েটাকে ঝুম কাল দেখলেও ছেলেটাকে আজই প্রথম দেখেছে। ছেলেটির চোখে মুখে রাগ। আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে সে ঝুমদের দিকে তাকিয়ে। তাছাড়া এখানে আরও ৩ জন পুরুষ ও কিছু ইউনিফর্ম পরিহিত আর্মি ও সিভিল ড্রেসের কয়েকজন পাকিস্তানি আর্মি উপস্থিত। অন্যদের না চিনলেও পাকিস্তানি আর্মিদের মাঝে কয়েকজনকে ঝুম চিনতে পারল। এদের সে মুলতান থাকতে শাইয়ানের বিভিন্ন কমান্ড ফলো করতে দেখেছে। এরা এখানে কি করছে? সে অবাক হয়ে শাইয়ানের দিকে চাইলো। বুঝতে পারছে না এখানে কি হচ্ছে। ওই লোকগুলো কারা? কি করতে চাচ্ছে শাইয়ান। শাইয়ান চোখের ইশারায় ঝুমকে শান্ত হতে বলল।
নিরবতা ভেঙে ঝুমের দাদী খেঁকিয়ে উঠলো –

” তা বাছা কি বলবে তুমি বলে ফেলো দেখিনি। এতো সময় আমাদের নেই, যে তোমাদের নাটক দেখব আমরা।”
শ্রাবণী মুখ কুঁচকে এক ভয়াবহ গালি ছুড়লো মহিলার উদ্দেশ্যে। এক পা কবরে রেখেও এই মহিলার কূট কাচালী আর শেষ হলো না। ঝুমের চোখেমুখে আঁধার ছেয়ে গেল। সে চোখ তুলে একবার শাইয়ানের দিকে তাকিয়ে দাদীকে উদ্দেশ্য করে কঠিন গলায় বলল –
” ভদ্র ভাবে কথা বলুন আমার স্বামীর সাথে। উনি যে কেউ নয়, যে ওনার সাথে আপনি বা আপনরা অভদ্র আচরণ করবেন। এখানে আমার স্বামীকে যে অপমান করার চেষ্টা করবে আমি কিন্তু তাকে ছেড়ে দিবো না। আমাকে সেই আগের ঝুম মনে করে ভুল করবেন না। আবারও বলছি আমার স্বামীর সাথে ভদ্র আচরণ করবেন।”
ঝুমের দাদী হকচকিয়ে গেলেন। ঝুম এর আগে তাদের মুখের ওপর একটা কথা বলেনি কখনো। আর আজ! বাড়ির বাইরে পা রেখে সাহস বেড়ে গেছে? এর সাহসের হিসাব সে ঠিকই নিবে। ভেবেছে কি? বিয়ে করে জামাই নিয়ে এলেই বুঝি ছেড়ে দিবে সে?
শাইয়ান আলতো হাসলো ঝুমের কথায়। মেয়েটাকে কেউ কটূ কথা বললেও কখনো প্রতিবাদ করে না। এটা তার ভদ্রতা শাইয়ান বোঝে। কিন্তু আজ সেই ভদ্র মেয়েটা তার জন্য উঁচু গলায় কথা বলল? ঝুমের মাথায় আলতো হাত রেখে বলল –

” শান্ত হন। এই সময় উত্তেজিত হতে হয় না। আমি দেখছি বাকিটা। আপনি উত্তেজিত না হয়ে ধৈর্য্য ধরে চুপ থাকবেন।”
শাইয়ানের কথায় ঝুম বেজায় লজ্জা পেলো। সে চোখ নামিয়ে নিচে স্থির করলো। গতকাল ভোরে তার যখন ঘুম ভাঙ্গলো তখনি শাইয়ান তাকে বিভিন্ন রকম প্রশ্নে জর্জরিত করেছিল। তার শারীরিক অবস্থা জানতে চেয়েছিল। ঝুম প্রথমে অবাক হলেও পরবর্তীতে শাইয়ানের কথার অর্থ বুঝতে পেরে স্থির হয়ে গিয়ে ছিল। যদিও সে আগে থেকেই অনুমান করেছিল, কিন্তু সঠিক কিনা জানতো না। ভেবে ছিল পাকিস্তান গিয়ে টেস্ট করিয়ে শাইয়ানকে বলবে। কিন্তু এই ডক্টর তো আগেই সবটা বুঝে ফেলল। পরবর্তীতে শাইয়ান যা যা প্রশ্ন করে তার সঠিক উত্তর দিলে শাইয়ান ৯০ শতাংশ নিশ্চিত হয় ঝুমের প্রেগন্যান্সির ব্যাপারে। এরপর দ্রুত পায়ে বেরিয়ে পাঁচ পাঁচটা টেস্ট কীট এনে ঝুমের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল –

” টেস্ট করে নিন।”
কীটগুলো হাতে নিয়ে ঝুম বোকার মতো তাকিয়ে ছিল। এতোগুলো! লোকটা পাগল হলো নাকি? সে প্রশ্ন করতে চাইলো, কিন্তু শাইয়ানের ধৈর্য্য হলো না কিছু শোনার। সে জোর করে ঝুমকে ওয়াশরুমে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে অস্থির ভাবে সারারুম জুড়ে পায়চারী করে বেড়ালো।
ঝুম ফিরল সময় নিয়ে। ততক্ষনে শাইয়ান ঘেমে নেয়ে অস্থির। অথচ ঝুমের ঠোঁটে প্রাপ্তির হাসি, ছলছল চোখ। মুঠোবন্ধি হাত খুলে দিলো শাইয়ানের সামনে। শাইয়ান এক এক করে প্রতিটি দেখলো স্তব্ধ হয়ে। প্রতিটি কীট জানান দিল নতুন অতিথির আগমন। শাইয়ান ওভাবেই বসে পড়ল বেডের সাইডে। হাতের কীটগুলো বেডের ওপর রেখে দুহাতে মুখ চেপে বসে রইলো। ঝুম বুঝলো অতি আবেগে শাইয়ান দিশেহারা। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে লাল লাল চোখে শাইয়ান প্রশ্ন করলো –

” কবে থেকে মেডিসিন বন্ধ করেছেন আপনি?”
ঝুম ভড়কে গিয়েছিল তখন। সে ভাবেনি শাইয়ান এমন সময় এই প্রশ্ন করবে। আমতা আমতা করে বলল –
” এখন এই কথা কেন? আপনি খুশি হননি?”
শাইয়ান চোখে পলক না ফেলে একই ভাবে তাকিয়ে ছিল ঝুমের দিকে। তার চোখে কি ছিল কে জানে? ঝুম ভয় পেয়ে ছিল খুব। অজানা আশঙ্কা ঝুমকে আঁশটে পিষ্টে ধরে ছিল।
” আমি যা জানতে চেয়েছি তার উত্তর দিন আরীবা।”
” অনেকগুলো দিন ধরে খাচ্ছি না।”
“কতো দিন?”

ঝুম নীরব। কি বলবে? সে কি বলবে মুলতান থাকতেই সে মেডিসিন বন্ধ করে ছিল? তাহলে কি শাইয়ান তাকে আস্তো রাখবে? শাইয়ান ওর নীরবতায় বুঝে নিল যা বোঝার। চোখ বন্ধ করে হেরে যাওয়া গলায় বলল –
” আমি বলেছিলাম অপেক্ষা করতে আরীবা। সময় হলে আমি নিজেই বলতাম। আমার কথা এবারও শুনলেন না আপনি। এতটা মূল্যহীন আমি? কেন প্রতিবার আমাকে হারিয়ে দেন? আমার ভালোবাসায় কি কমতি ছিল আরীবা?”
না চাইতেও ঝুমের চোখে পানি চলে এলো। সে ব্যস্ত হয়ে শাইয়ানের কাছে গিয়ে গালে হাত রেখে বলল –
” বিশ্বাস করুন আমি আপনাকে কষ্ট দিতে চাইনি।”
” তাহলে কেন করলেন এমন?”
” ভুল কিছু কি করেছি?”
শাইয়ান হতাশ। সে কিভাবে এই মেয়েটাকে বুঝাবে এখন!

” ভুল না আরীবা। আপনি এখনো স্ট্যাবল না।”
” আমি ঠিক আছি ডক্টর। আপনি শুধু শুধু আমাকে নিয়ে চিন্তা করছেন। আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালা যখন দিচ্ছেন তখন নারাজ হবেন না দয়া করে। যিনি দিচ্ছেন তিনি রক্ষা করবেন আমাদের।”
শাইয়ান সেদিন কিছু না বললেও, চিন্তায় সে আজও শান্তি পায় না। তার এক মন ঝুমের জন্য চিন্তায় অস্থির হলেও অন্য মন ঠিকই এই নতুন অনুভূতির জন্য আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালা কাছে শুকরিয়া আদায় করে। যখনই ভাবে সে বাবা হতে চলেছে তখনই অদ্ভুত আনন্দে মন পুলকিত হয়।
ঝুম তার অতীত চিন্তা থেকে ফেরে শাইয়ানের কথায়।
” আরে আরে, ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? বয়স হয়েছে আপনার, এই শরীরে বেশি চাপ নেয়া ঠিক না। অপেক্ষা করুন, মজলিশ এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।”
ঝুমের বাবা অবাক হয়ে বলল –

” মানে? কারো জন্য অপেক্ষা করছো? সকলেই তো আছে এখানে।”
শাইয়ান তার কথার উত্তর করলো না। মিনিট ২/৩ এর মাঝে একটি প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের আগমন ঘটলো বাড়ির প্রধান ফটক দিয়ে। দেখতে মাজারি উচ্চতার পুরুষটির ফর্সা শরীরে রোদে পোড়া দাগ স্পষ্ট। বয়স আনুমানিক শাইয়ান, আহিরের মতো। তার প্রবেশের সাথে সাথে শাইয়ানের ঠোঁট কোনে হাসি ফুটে উঠলো।
” আরেহ। যার অপেক্ষা ছিল তার আগমন অবশেষে ঘটলো!”
ঝুমের ফুপু অবাক হলেন ছেলেটিকে দেখে। বিস্মিত তিনি কথা বলতে ভুলে গেলেন।
” নয়ন তুই? তুই এখানে কি করছিস?”

নয়ন নামের ছেলেটির দৃষ্টি ঝুমের ওপর। ঝুম একপলক দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিয়ে ছিল। এই লোককে কেন শাইয়ান এখানে ডেকেছে? আড়ষ্ঠতায় শাইয়ানের আড়ালে লুকাতে চাইলো সে। ঝুমের নিজেকে লুকানোর বৃথা চেষ্টা দেখে অদ্ভুত ভঙ্গিমায় আসলো নয়ন। শাইয়ান সবটাই লক্ষ্য করলো। তার চোখে রাগ কিন্তু ঠোঁটে ঝুলন্ত নজরকাড়া হাসি। নয়ন এগিয়ে এসে একটি চেয়ার টেনে বসলো ঠিক ঝুমের বরাবর। তার দৃষ্টি ঝুমের থেকে এক সেকেন্ডের জন্য সরেনি।
” শুনলাম তোমাদের আদরের মেয়ে বাড়ি ফিরছে। আমাকে তো আসতেই হতো তাই না? মামাতো বোন আবার এক সময়ের বউ বলে কথা কিছু দায়িত্ব তো আছেই। তা ঝুম, কেমন আছিস? মনে আছে নাকি নতুন পেয়ে ভুলে গেছিস আমায়।”

ঝুম উত্তর করলো না। সে রেগে আগুন। শাইয়ানের দিকে চেপে শাইয়ানের পেটের দিকে চিমটি কাটতে লাগলো। সব রাগ সে এভাবে উগলে দিলো। শাইয়ান মুখ বুঝে ঝুমের অত্যাচার সহ্য করলো। সে যে মনে মনে ভয়ঙ্কর রেগে আছে বুঝতে দিল না। এই ছেলেকে সে স্পেশাল থেরাপি দিতে ডেকে এনেছে। নয়তো দুই চোখে সহ্য করার মতো ধৈর্য্য তার নেই। তার বউয়ের দিকে নজর দেয় কত বড় সাহস। পরিবেশ থমথমে। আহির নয়নের দিকে তাকিয়ে। এখানের অনেক কিছুই সে বুঝতে পারছে না। ভাষাগত সমস্যায় পড়েছে সে। কিন্তু একজন পুরুষ হয়ে নয়নের নজর সে ঠিকই পড়তে পারল। মেজাজ খারাপ হয়ে আছে তাও সে চুপ। শাইয়ান যেহেতু এখনো কোনো স্টেপ নেয়নি, সুতরাং তারও ধৈর্য্য ধরা উচিত।
শাইয়ান হেঁসে নয়নকে উদ্দেশ্য করে বলল –

” আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। যদিও অনেকটা লেট করেছেন।”
অতঃপর একজনকে চোখের ইশারায় কিছু বলল। সেই ব্যক্তি তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে গেলো। ফিরে এলো দুজন আইনজীবীকে নিয়ে। তারা ভিতরে প্রবেশ করলে ঝুমের বাবার চেহারা থমথমে আকার ধারন করে।
” আহির ওনাদের বসার ব্যবস্থা করো।”
শাইয়ানের কথায় আহির দ্রুত পায়ে দুটি চেয়ারের ব্যবস্থা করলো। আইনজীবীরা বসে নিজেদের মাঝে টুকিটাকি কথা বলে কাগজপত্র বের করতে লাগলেন। জলিল শিকদারের স্ত্রী আর সহ্য করতে পারলেন না। গতকাল রাতে জলিল শিকদার তাদের এই বাড়ির ব্যাপারে বলে ছিলেন। তখনই মনে চাচ্ছিলো ঝুমকে গলা টিপে মেরে দিতে। এক আপদ গিয়ে অন্যটাকে রেখে গিয়েছে তাদের শান্তি নষ্ট করতে। গতকাল রাতেই তারা চেয়ে ছিল কিছু একটা করতে কিন্তু বাড়ি ভর্তি পাহারা থাকায় সম্ভব হয়নি।

” হচ্ছে কি এখানে? সেই কাল থেকে একের পর এক আপনাদের অহেতুক বিচরণ দেখে যাচ্ছি আমাদের বাড়িতে। ভদ্রতা জ্ঞানটুকু নেই? অন্যের বাড়িতে এসে যা ইচ্ছা করে যাচ্ছেন।”
মহিলার কথায় শাইয়ানের হাসি যেন আরো একটু বাড়ল। সে আইনজীবীদের উদ্দেশ্য করে বলল –
” ওনারা ব্যস্ত হয়ে পরেছে। আপনারা এবার শুরু করুন।”
আইনজীবীদের মাঝে একজন মাথা নেড়ে জলিল শিকদারের দিকে একটি দলিল বারিয়ে দিয়ে স্পষ্ট গলায় সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল –

” আমীরা আহসান তার সকল সম্পত্তি, টাকা ও যাবতীয় সকল কিছু তার মেয়ে আরীবা ঝুমের নামে করে দিয়ে গেছেন। তার সম্পত্তির মাঝে এই বাড়িটিও রয়েছে যা সে তার বাবার বাড়ি থেকে পেয়ে ছিল।”
সকলে ভূত দেখার মতো চমকে গেলো। ঝুমের ফুপু আহাজারি শুরু করলো। জলিল শিকদার শক্ত হয়ে বসে রইলেন হাতে কাগজটি নিয়ে। যাতে স্পষ্ট বাংলায় দলিল করা। একই সাথে ঝুম ও তার আম্মার সাক্ষর দেয়া। তার স্ত্রী চুপ রইলেন না। অসভ্যতার চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে তেড়ে এলেন ঝুমের দিকে।
” আমি মানি না এসব। এই বাড়ি আমার। এই সব কিছু আমার। তোর মা বেঁচে থাকতেও আমাকে শান্তি দেয়নি আর মরেও শান্তি দিলো না। সেদিন ওই মহিলার সাথে তোকেও মেরে দেয়া উচিৎ ছিল।”
মহিলা অতি শোকে পাগল হয়ে গেছেন। ঝুমকে আঘাত করার আগে তাকে আগলে তিনটি মানুষ এগিয়ে দাড়ালো। শাইয়ান দুহাতে ওনার হাত ধরে আলতো ধাক্কা দিলো। তবু তিনি আবার তেড়ে এলে শ্রাবণী নিজের সর্ব শক্তি প্রয়োগ করে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল তাকে। নিচে পরে সে আরো জোরে বিলাপ বকতে লাগলো। ঝুমকে নানারূপ অভিশাপ দিলো। ঝুম থ্ম মেরে বসে। শাইয়ান দুহাতের মাঝে আগলে নিল ওকে।

” ডক্টর, আমার আম্মা।”
শাইয়ান বলল না কিছুই। সে এই ব্যাপারেগুলো নিয়েই ভয় পাচ্ছিল। আজ অনেক না জানা সত্য জানবে ঝুম। এতদিনে জানা সকল ভুল তার ভাঙবে।
” আপনি কথা দিয়ে ছিলেন আমায় আরীবা। ভেঙে পরা চলবে না। আপনি না অনেক স্ট্রং? নিজেকে শক্ত করুন।”
ঝুম লক্ষ্য করলো তিনজন অপরিচিত পুরুষের মাঝে মধ্য বয়স্ক লোকটি এগিয়ে এলো ঝুমের নিকট। তাকে কাছে আসতে দেখে শাইয়ান সরে গেলো। লোকটি এসে ঝুমের পাশে বসে, ঝুমের মাথায় হাত রেখে বহু কষ্টে বলল –
” আমি তোমার মামা আম্মু। তোমার মায়ের বড় ভাই। আর ওরা ( কিছুটা দূরে দাড়ানো পুরুষ দুজনকে দেখিয়ে বলল) ও আমার বড় ছেলে মেহরাব। আর ওর পাশের জন তোমার ছোট মামার ছেলে শৌর্য।”
ঝুম অবাক হয়ে দেখলো তার মামা নামের লোকটিকে। ঝুম কিভাবে প্রতিক্রিয়া দিবে বুঝলো না। শুধু চুপচাপ তাকিয়ে রইলো। অথচ কাদল না একদম।

” এতদিন পর হঠাৎ?”
ঝুমের কঠিন স্বর শুনে ঝুমের মামা কেঁদে দিলেন। ঝুম আবারও বলল –
” সেই তো আসতেই হলো আপনাদের। আগে এলে কি ক্ষতি হতো? আপনারা একবার আম্মাকে নিয়ে গেলে আজ আমার আম্মা বেঁচে থাকতো। আমার সাথে থাকতো।”
ঝুমের মামা ঝুমের দুহাত ধরে বলল –
” আমরা চেষ্টা করে ছিলাম আম্মু, কিন্তু নিরুপায় ছিলাম। পারিনি আমাদের চোখের মনিকে বাঁচাতে। তাইতো তোমাকে বাঁচানোর জন্য এখান থেকে দূরে পাঠিয়ে দিলাম।”

” মানে?”
” আমার আব্বা ভীষণ কঠোর হৃদয়ের ছিল। আমীরাকে বারবার বুঝিয়ে ছিলাম জলিল ভালো ছেলে না। কথা শুনল না আমাদের। আমার বিচক্ষণ বোনটাকে মিথ্যে ভালোবাসার ফাঁদে ফেলে ওরা সম্পত্তি হাতাতে চেয়ে ছিল। বাবা আমীরাকে ভীষণ ভালোবাসতেন। প্রায়ই ওর নামে জমি রাখতেন, ব্যাংকে টাকা রাখতেন। এসব আমরা জানতাম। আমাদের দু ভাইয়ের কখনো এই ব্যাপারে আপত্তি ছিল না। বাবা বলতেন যা আমীরার নামে রাখা হয় আমীরা সেটুকুই পাবে। আর বাবার সম্পত্তি আমরা দুই ভাই। ওভাবেই বাবা লিখে দিয়ে ছিলেন আমাদের। আমীরা পালিয়ে আসার আগে বাবা ওর নামে এই বাড়িটি কিনে ছিল। ওদের নজর আমিরার সম্পত্তির ওপর ছিল সর্বদা। আদরের মেয়ে সমাজের চোখে অসম্মানিত করে চলে যাওয়ায় বাবা মানতে পারল না। তাজ্য করে বসলেন। আদেশ দিলেন যে ওর সাথে যোগাযোগ করবে সে যেন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়। আমার বাবা এক কথার মানুষ ছিল। বহু দিন আমরা বাবার ভয়ে যোগাযোগ করতে পারলাম না। আমীরাও করলো না।

হঠাৎ একদিন আমীরার ফোন পেলাম। শুনলাম আমার বোনের দুর্বিষহ জীবনের কথা। ছোট্ট বোনটাকে এই দুহাতে আগলে বড় করেছি, সেই বোন ভালো নেই শুনে কেমন লেগেছিল জানো আম্মু? তৎক্ষণাৎ বাবাকে জানাই। বাবা তখনো আদেশ জারি করলেন ওর সাথে কেউ কথা বললে তার এই বাড়িতে শেষ দিন। বাবার ওপর কথা বলার সাহস বা স্পর্ধা আমাদের কারো ছিল না। তবুও লুকিয়ে আমীরাকে সাহায্য করতে চাইলাম। কিন্তু কিভাবে যেন জলিল জানতে পেরে গেল। আমাদের বাড়িতে সেদিন ওর বোন আর মা গিয়ে বাবাকে অপমান করলো। খারাপ ভাষায় গালাগালি করলো। এলাকার মানুষ দেখে সকলের সামনে আমাদের কটূ কথা শুনল। আমার বাবা সইতে না পেরে সেদিন হার্ট এ্যাটাক করে আমাদের ছেড়ে সারা জীবনের মতো চলে যান। বাবার মৃত্যুতে আমরা এতটাই ভেঙে পরে ছিলাম যে তোমাদের খোঁজ নেয়ার কথা মাথায় ছিল না। যখন নিলাম তখন জানতে পারলাম, এই জালিমদের চক্রান্তে তোমার জীবনটাও জড়িয়ে গিয়েছে। ওরা চেয়ে ছিল আমীরাকে বেঁধে রাখতে।

বিভিন্ন ভাবে ওর সব কিছু লিখে নেয়ার চেষ্টা করেও যখন সফল হলো না, তখন তোমাকে ব্যবহার করলো। আমীরাকে মুঠোয় রাখার একমাত্র রাস্তা ছিল তুমি। আমীরা তোমাকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসতো। তাই তুমি ওদের হাতে থাকলে আমীরার সবকিছু ওদের হাতের মুঠোয় থাকবে ভেবেই তোমার সাথে ওসব করে ছিল। তখন থেকে আমার বোনটা চুপ হয়ে গেলো। আমাকে বলল, তোমাকে এখান থেকে দূরে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে। তোমাকে এই বাড়িতে রাখলে ওরা বাঁচতে দিবে না বুঝে গিয়ে ছিল ও। তাইতো ছয়টা বছর ধরে ওদের হাতের পুতুলের মতো নেচেছে আমীরা। তোমার নামে দলিল বানানো, বিথীর সাথে যোগাযোগ, ফোন সব আমি আর তোমার ছোট মামা করেছি। এমনকি যেদিন তুমি বিথীর সাথে ঢাকা গেলে সেদিনও আমরা তোমাদের সাথেই গাড়িতে ছিলাম আম্মু। আমরা আমাদের বোনকে বাঁচাতে পারিনি কিন্তু তোমাকে সুন্দর একটি জীবন দিতে চেয়ে ছিলাম।”
ঝুম মন দিয়ে সব শুনল। এতকিছু তার অজান্তে হয়ে গেলো?

” ব্যাগে থাকা দলিলটা কি এটা?”
ঝুমের মামা মাথা নাড়ালেন। ঝুম ঠাণ্ডা স্বরে বলল –
“আম্মা তো দলিল আমার ১৮ বছরের আগে করে ছিল। তাহলে কিভাবে কি?”
” হ্যাঁ, তোমার যখন ১৫ বছর বয়স তখন দলিল তৈরি করে ছিলাম। কিন্তু তোমার কাছে সবটা ১৮ বছর পরই হস্তান্তর করা হবে এভাবেই দলিলটি তৈরি করা হয়েছে।”
” ওহ! ছোট মামা কোথায়?”
” আমার ভাইটা গতবছর মারা গিয়েছে। ওর খুব ইচ্ছা ছিল তোমার সাথে দেখা করার। কিন্তু সেই সময়টা আর হলো না।”

ঝুমের মামা কেঁদে ফেলল। ঝুম কি বলবে বুঝতে পারল না। এতো দিন তার জানা সত্যগুলোর মাঝে আংশিক মিথ্যেও ছিল। এতকাল নানাবাড়ির কাউকে না চেনা সে হঠাৎ এসে যদি কেউ বলে আমি তোমার মামা তাহলে কেমন অভিপ্রায় হওয়া উচিৎ আসলেই ঝুমের জানা নেই।
শাইয়ান এগিয়ে দাড়ালো জলিল শিকদারের সম্মুখে। প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে টানটান হয়ে দাঁড়ালো। কন্ঠে কাঠিন্যতা এনে সাবলীল ভঙ্গিতে বলল –
” বাকি সত্য কে বলবে মি. শিকদার? আপনি নাকি আপনার ওয়াইফ মিসেস. শিকদার?”
জলিল শিকদার শক্ত চোখে তাকালেন।
” কি বলতে চাও তুমি?”
” বলতে তো চাই অনেক কিছু, কিন্তু তার আগে শুনতে চাই। সেদিন রাতে কি হয়ে ছিল? আরীবার আম্মা কিভাবে মারা গেলেন?”

চমকে উঠলো ঝুমের বাবা ও তার স্ত্রী। ঝুম শান্ত চোখে দেখলো। ঝুমের ফুপু খেঁকিয়ে উঠে বলল –
” তুমি কিন্তু এবার বাড়াবাড়ি করছো ছেলে। কি বুঝাতে চাও আমরা খুনি?”
” আমি বুঝাতে চাইছে না। আপনি নিজেই বলছেন। তাছাড়া কিছুক্ষন আগে আপনার ভাইয়ের বউও বললেন একই কথা। শুনতে পেলেন না?”
মহিলা চুপ করে গেলেন। শাইয়ান ভদ্ররূপ ছেড়ে এবার নিজের প্রফেশনে ফিরে গেলো। বোঝা হয়ে গেছে লাথির ভূত কথায় মানবে না। দরাজ কন্ঠে হুংকার ছেড়ে বললেন –
” বলবেন নাকি আমি আমার উপায়ে বলিয়ে নিবো?”
জলিল শিকদার নড়লেন না এক বিন্দুও। সে শান্ত ভাবে বলল –
” আমি জানি না কিছু।”
শাইয়ান চমৎকার হেসে বলল –

” ওয়েল। অফিসার্স ওনার মেয়ে আর ছেলেকে নিয়ে চলুন। দেখি কতক্ষন চুপ থাকে।”
তবুও পাষাণ লোকটির বিন্দুমাত্র দ্বিধা কাজ করলো না। কিন্তু জলিল শিকদারের স্ত্রী কেঁদে ফেললেন হাউমাউ করে।
” আমার ছেলে মেয়েকে কিছু করবেন না দয়া করে। আমি বলবো সব। ওদের এসবে জড়াবেন না।”
জলিল শিকদার রাগান্বিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। গর্জন দিয়ে বললেন –
” চুপ করো সবিতা। একটা কথাও বলবে না তুমি।”
শাইয়ান ভালই বুঝলো কোথায় ভয় দিতে হবে।
” ওকে, আপনাদের ইচ্ছা। অফিসার্স আপনাদের কি বলে দিতে হবে কি করতে হবে?”
দুজন ইউনিফর্ম পরা অফিসার এগিয়ে গিয়ে জলিল শিকদারের ছেলে মেয়েকে ধরতে গেলে, জলিল শিকদার উগ্র ভাবে বলল –

” একজন দেশ সেবকের বাড়িতে ঢুকে তাকে ও তার পরিবারকে হেনস্তা করার অপরাধ কি হতে পারে আপনাদের জানা নেই?”
” সরি মি. শিকদার। আমাদের ওপর হেড অফিস থেকে অর্ডার আছে।”
জলিল শিকদার হতভম্বের মতো দাড়িয়ে রইলেন। লোক দুজন তাদের কমান্ড অনুযায়ী ছেলে মেয়ে দুজনকে টেনে হিঁচড়ে নিতে লাগলো। জলিল শিকদারের ছেলে চেঁচিয়ে বলল –

Remedy part 23

” আম্মু, আব্বু বাঁচাও। এরা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। ছাড় আমাদের, ছাড়। একবার ছাড়া পেলে তোমাদের দেখে নিবো। জানে শেষ করে ফেলবো।”
ঝুম আশ্চর্য হলো ছেলেটির এরূপ ব্যবহারে। এতটুকু বয়সে এমন আক্রমণাত্মক ব্যবহার! মিসেস. শিকদার কেঁদে কেঁদে বলল –
” ছেড়ে দিন ওদের আমি বলছি, আমি বলছি। আমীরাকে আমরা মেরেছি। বিষ দিয়ে মেরেছি।”

Remedy part 25