Remedy part 32
মীরা রায়াদ
শাইয়ানকে ওভাবে পরে যেতে দেখে সকলে ভালোই অবাক হলো। নতুন অতিথিদের আগমনের খুশি যেন মুহূর্তে ভাটা পরে গেল। সকলে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পরলো শাইয়ানকে নিয়ে। আহির চিন্তিত খুব। শাইয়ান আবার হার্ট এ্যাটাক করলো না তো! যে নার্সের কোলে মেয়ে বাবুটি ছিল সে দ্রুত ডাক্তার ডেকে আনল এবং শাইয়ানকে কেবিনে নেয়ার ব্যবস্থা করলো। পরিবারের প্রতিটি মানুষের চোখেমুখে আতঙ্ক। ঝুমের ব্যাপারে খোঁজ নেয়া বা বাচ্চাদের নিয়ে মেতে থাকার সময়টুকু তারা পেলো না। ডাক্তার প্রাথমিক চিকিৎসার পর বেরিয়ে এসে বলল –
” চিন্তার কোনো বিষয় নেই। ড. আনসারী এখন ঠিক আছে। অত্যধিক চিন্তায় ওনার প্রেসার ফল করে ছিল। তাই জ্ঞান হারিয়েছে। আমি ওনাকে ঘুমের ওষুধ দিয়েছি, কিছুক্ষন ঘুমালে ঠিক হয়ে যাবে।”
ডাক্তারের কথায় যেন সকলে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। ইব্রাহীম স্বীয় স্ত্রীর পানে তাকিয়ে হেসে ফেলল। তার ছেলেটা যে বউয়ের জন্য এতো নাজুক সে আগে বুঝতে পারেনি। মেহেরুন্নেসার মুখভাব অবশ্য গম্ভীর। তার দুহাতের মাঝে শাইয়ান ঝুমের ছোট কন্যা। যে কিছুক্ষন পর পর কেঁদে কেঁদে সবাইকে তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। মিসেস বিথীর কোলে তাদের একজন পুত্র ও আহিরের মায়ের কোলে একজন। তারা দুই ভাই শান্ত। মেয়েটার থেকে ঢের বেশি শান্ত। ভীষণ শান্ত ভাবে ঘুমিয়ে আছে। অথচ মেয়েটার চোখে ঘুম নেই। সে তার গলার স্বর বাড়িয়ে যাচ্ছে একটু পরপর। অতঃপর শাইয়ানের কাছে আহিরের মাকে রেখে সকলে ভিড় জমালো অপারেশন থিয়েটারের সামনে। কিছু সময় পর অপারেশন থিয়েটার থেকে ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। সকলে তখনো ঝুমের জন্য উদ্বিগ্ন। ডাক্তার তাদের বলল –
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” মিসেস আনসারীর এখনো জ্ঞান রয়েছে। কিছু সময় অবজার্ভেশনে রেখে ওনাকে কেবিনে দেয়া হবে। আপনারা চিন্তা করবেন না। উনি ঠিক আছেন এখন। যদিও হাই রিস্ক ছিল। এবং শেষের পর্যায়ে আমাদের হাতের বাইরে চলে গিয়ে ছিল সবটা। মিসেস আনসারীও রেসপন্স করছিল না তখন। কিন্তু আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালা আনহুর রহমতে সব ভালোয় ভালোয় হয়েছে। এখন তেমন ভয়ের কিছু নেই। তবুও ওনার দিকে খেয়াল রাখবেন। আর হ্যাঁ, বাচ্চাদের জন্মের সময়ের ব্যবধান খুব বেশি নয়। প্রথম দুজনের জন্মের সময় ব্যবধান মাত্র ২ মিনিট। কিন্তু কন্যা সন্তান জন্ম দিতে কিছু জটিলতা দেখা দিয়ে ছিল বলে সে ৭ মিনিট পর দুনিয়াতে আসে। তাছাড়া ছেলে দুজনের থেকে মেয়েটি একটু বেশিই দুর্বল। ওজনেও কম। এটা নরমাল বিষয়। এক মায়ের গর্ভ ভাগাভাগি করা ভাই-বোনদের মাঝে একজন কম পুষ্টির অধিকারী হয়। যাই হোক, তারা চারজন সুস্থ আছে এটাই অনেক। ( এরপর তিনি কিছুটা হেসে বলল) আমি ড. আনসারীর কথা শুনেছি। সত্যি বলতে গতবারের ঘটনার পর আমি কিছুটা আঁচ করে ছিলাম এমন কিছুর। তাই খুব একটা অবাক হয়নি। বরং উনি অজ্ঞান না হলে অবাক হতাম। পরিশেষে বলবো, আপনারা চিন্তা করবেন না। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন যেন দ্রুত তারা সুস্থ হয়ে যায়।”
ডাক্তার তার কথা বলে চলে গেলেন। তার কথায় সকলে কিছুটা হলেও নিশ্চিন্ত হলো। এখন শুধু অপেক্ষা ঝুমের দেখা পাওয়ার। এরপরের ২ ঘণ্টা গেলো নতুন অতিথিদের নিয়ে ব্যস্ততায়। ছেলে-মেয়ে কেঁদে অস্থির অথচ বাবা-মায়ের খোঁজ নেই। ঝুমকে যখন কেবিনে দেয়া হলো তখনও শাইয়ানের জ্ঞান ফিরেনি। ঝুম কিছুটা দুর্বল হলেও সকলের সাথে সে কথা বলেছে। সে বাচ্চাদের দেখলেও ভালোভাবে কোলে নিতে পারেনি। মেহেরুন্নেসা একেএকে তিনজনকে বুকের ওপর দিলে সে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে। যদিও সি-সেকশনের সময় ডক্টর বাচ্চাদের তার কাছে দিয়ে ছিল। তখনো সে অঝোর ধারায় কেঁদেছে। এ যে এক অপ্রকাশিত সুখ। বাচ্চারাও মাকে পেয়ে চুপ করেছে। ঝুম শাইয়ানকে খুঁজলে ঈশাল বড়ই রসিয়ে রসিয়ে তার কীর্তি কলাপ বলেছে। সব শুনে ঝুম লজ্জায় তাকাতে পারছিল না কারো দিকে। পাগল লোকটা তাকে শান্তি দিবে না। এসবের কোনো মানে হয়?
শাইয়ানের যখন জ্ঞান ফিরল তখন দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল। ঝুম বাচ্চাদের খাইয়ে মাত্রই চোখ বন্ধ করেছে। হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে দরজা দিয়ে ঢুকলো শাইয়ান। পিছন পিছন আহিরও এলো।
” শাইয়ান আসতে।”
মেহেরুন্নেসা তখন ঝুমের সাথেই ছিলেন। ছেলেকে দেখে সে উঠে দাড়ালো।
” কি হয়েছে আহির?”
আহির রুমে প্রবেশ করতে করতে বলল –
” জ্ঞান ফেরার পর এক সেকেন্ড অপেক্ষা করেনি। ডাক্তার বলল নরমাল চেকআপ করবে তাও ধৈর্যে ধরেনি তার। সোজা এখানে চলে এসেছে। কতবার যে দুর্বলতার কারণে পরতে নিয়েছে তার ঠিক নেই। ধরতে চাইলেও ধরতে দেয়নি। এসব পাগলমোর কোনো মানে হয়? জ্ঞান হারিয়ে বেডে পরে থাকতে কি আমরা বলে ছিলাম? সামান্য বউয়ের বাচ্চা জন্ম দেয়া দেখতে পারে না এ নাকি আবার মিলিটারি ডক্টর। আশ্চর্য, তোমাকে চাকরি দিলো কে শাইয়ান? দুনিয়াতে কি আর কারো বউ নেই? তাদের বউদের কি বাচ্চা হয় না? তোমার এই বারবার অজ্ঞান হওয়া আমি আর নিতে পারছি না। যেখানে বাচ্চাদের আসার খবরে আমরা আনন্দ করবো সেখানে তোমাকে নিয়ে ছুটতে হয়েছে।”
আহিরের কন্ঠে বিরক্তি চুঁইয়ে চুঁইয়ে পরছে। বিরক্ত হওয়ারই কথা। জ্ঞান হারানোর একটা লিমিট থাকে। এমন দুর্বল হৃদয় নিয়ে বউকে জোর করে বিয়ে করলো কিভাবে এটাই বুঝতে পরছে না আহির। শাইয়ান যদিও আহিরকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না। সে ঝুমের কাছে যেতে যেতে বলল –
” বিয়ে করো তারপর বুঝবে আমার অবস্থা। বিয়ে না করলে বুঝবে কিভাবে? বিয়ের আগে সব ছেলেই এমন বড় বড় কথা বলে, যেমন তুমি বলছ।”
হাহ, ভাবা যায়! এমন সময়েও এতবড় অপমান! কার জন্য সে এতো কিছু করলো?বেঈমান। আহির মেয়েদের মতো মুখ ফুলিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে রইলো। কথা বলবে না সে আর শাইয়ানের সাথে মনে মনে এই প্রতিজ্ঞা করে নিলো। যদিও সে জানে না কতক্ষন এই কথা রাখতে পারবে। মেহেরুন্নেসা হেসে শাইয়ানের কাছে এসে দুহাতে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলো। ভদ্রমহিলা যথেষ্ট লম্বা হওয়া শর্তেও শাইয়ানের কাঁধ পর্যন্ত ঠাঁই পায়। খুবই স্নেহের সাথে কপালে চুমু খেয়ে চোখের কোণে পানি নিয়ে বলল –
” আমার আব্বা এখন সত্যিই তিনটে ছানার আব্বা হয়ে গিয়েছে। তখন তো দেখলেন না আপনার বাচ্চাদের। এখন দেখবেন না?”
শাইয়ান মাকে একহাতে আগলে নিয়ে বলল –
” দেখবো আম্মা। আমার আরীবা যাদের জন্য এতো যুদ্ধ করলো তাদের তো দেখতেই হবে। তার আগে ওনাকে একবার দেখে আসি। বুকের ভেতর অস্থির অস্থির লাগছে খুব।”
কথাটি বলে আর অপেক্ষা করল না। এগিয়ে গেল ঝুমের নিকট। মেয়েটা বেডের সাথে মিশে ঘুমিয়ে আছে। পেটটা এখনো উচুঁ। মুখের লাবণ্যতা কমে একরাশ অসুস্থতা ঘিরে ধরেছে। উঠাবে না উঠাবে না করেও শাইয়ান নিজেকে সামলাতে পারল না। কিছু সময় কথা না বললে মনটা স্থির হবে না তার। যা ভাবা তাই কাজ। ঝুমের বেডের পাশে বসে সামান্য ঝুঁকে আসতে করে ডাকলো ঝুমকে।
” আরীবা, আরীবা শুনছেন? আরীবা।”
” আব্বা উনি মাত্র ঘুমিয়েছে। এতক্ষন ব্যাথায় ছটফট করেছে খুব। তারওপর বাচ্চাদের খাওয়ানো। ছেলে দুজন একদম ঝুমের ন্যাওটা হয়েছে।”
শাইয়ান অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো –
” দুজন ছেলে?”
আহির এগিয়ে এসে দ্বিগুণ অবাক হয়ে বলল –
” হ্যাঁ দুজন। কেন তুমি জানো না?”
শাইয়ান দুদিকে মাথা নেড়ে বলল –
” না। আমাকে কেউ কিছু বলেনি।”
” মানে কি! তুমি তো তখন ওখানেই ছিলে যখন বাচ্চাদের নিয়ে এলো।”
শাইয়ান দৃষ্টি ঝুমের দিকে ফিরিয়ে
বলল –
” আমি জানি না।”
আহির হতবাক হয়ে বলল –
” তুমি কি তার আগেই জ্ঞান হারিয়ে ছিলে নাকি?”
শাইয়ান কোনো উত্তর দিল না। আহির তার উত্তর পেয়ে গেলো। সে বাকরুদ্ধ। এই ছেলে এক পিস। এভাবে কিভাবে পারে?
শাইয়ান ঝুমকে আর জাগালো না। সকলের সামনে লাজলজ্জা ভুলে ঝুঁকে কাছাকাছি গিয়ে ঝুমের কপালে গভীর এক চুমু খেয়ে উঠে পা বাড়ালো বাচ্চাদের দিকে। ঝুমের বেডের ঠিক পাশেই বড় চওড়া একটি বাচ্চাদের সাদা রঙের দোলনা। দোলনাটি শ্রাবণী কিনে ছিল বাচ্চাদের জন্য। প্রত্যেকেই কম বেশি বাচ্চাদের জন্য অনেক কিছু কিনেছে। যার দরুন ঝুম শাইয়ানকে এসব নিয়ে চিন্তা করতে হয়নি। এই বড় দোলনাটি শ্রাবণী আহিরকে নিয়ে অনেক খুঁজে কিনেছে। যেন এক সাথে তিনজনকে রাখতে পারে। এখানে আসার পর আহিরই সেটি নিয়ে এনেছে। শাইয়ান ধীর কদমে দোলনার কাছে গিয়ে দেখলো তিনটি ছোট সাদা পুতুল শুয়ে আছে। দুজন ঘুমিয়ে থাকলেও একজন চোখ মেলে পিটপিট করে তাকাচ্ছে। শাইয়ানের যে কেমন অনুভূতি হলো সে নিজেও বলতে পরছে না। হাঁটু গেঁড়ে দোলনার পাশে বসে একে একে তিনজনকে ছুঁয়ে দিলো আলতো হাতে। ইস্, কি অদ্ভুত অনুভূতি! মেহেরুন্নেসা এগিয়ে এসে জেগে থাকা বাবুকে কোলে তুলে শাইয়ানের কোলে দিলো। শাইয়ানের হাত কাপছে তখনো। সে একজন ডাক্তার। এমন ছোট বাচ্চা এর আগে বহুবার কোলে নিয়েছে। অথচ নিজের বাচ্চাকে কোলে নেয়ার সময় তার ভয় করছে! কি এক সময় এলো তার জীবনে। বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে এমন ভাবে ধরে রইলো যেন পরে গিয়ে ব্যাথা না পায়। ছোট্ট শরীরটা এতো নরম! তার শক্ত হাতের জন্য কি ব্যাথা পাচ্ছে? শাইয়ান একটু হালকা করে ধরলো। বাচ্চাটা কি বুঝল কে জানে? সে জ্বিভ দিয়ে চকচক শব্দ করে হেসে দিলো। ব্যাস বেচারা শাইয়ান নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। কেঁদে ফেলল নিজের ঔরসজাতকে কোলে নিয়ে। মেহেরুন্নেসা ছেলের কান্না দেখে নিজেও কেঁদে ফেলল। এগিয়ে এসে কাঁধে হাত রেখে বলল –
” আপনার কন্যা। সর্ব কনিষ্ঠ জন।”
শাইয়ান তখনো কেঁদে চলেছে। মেয়েকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বলল –
” আম্মা, আমার আম্মা। আমি আপনার খারাপ বাবা আম্মা। আমি আপনাদের পৃথিবীর আলো দেখার আগেই মেরে ফেলতে চেয়ে ছিলাম আম্মা। আপনি কি আমাকে ক্ষমা করবেন আম্মা?”
আহিরের ভীষণ খারাপ লাগছে এখন। সকলে জানে শাইয়ান যা করতে চেয়ে ছিল তা শুধুমাত্র ঝুমের কথা ভেবে। অথচ বেচারা কাউকে বুঝতে দেয়নি তার মনের ওপর দিয়ে কি গিয়েছে। মেহেরুন্নেসা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল –
” কাঁদে না আব্বা। আপনি একদম খারাপ বাবা না। শান্ত হন একটু।”
” আম্মা উনি এতো হালকা কেন? এতো ছোট কেন? কতো পাউন্ড ওজন হয়েছে ওনাদের?”
” আপনার মেয়ের ওজন মাত্র ৩.২ পাউন্ড। আর বড় ছেলের ৪.৮ এবং মেজো ছেলের ৪.৩ পাউন্ড ওজন। আপনার কন্যা ভীষণ দুর্বল। পুষ্টি কম পেয়েছে তিনি। তবে চিন্তার বিশেষ কোনো কারণ নেই। তবুও একজন ভালো শিশু বিশেষজ্ঞকে দেখিয়ে নিলে ভালো হয়।”
শাইয়ান তৎক্ষণাৎ নিজের ফোন খুঁজলো কিন্তু পেলো না। আহির এগিয়ে এসে শাইয়ানের ফোন ওর হাতে দিয়ে বলল –
” জ্ঞান হারানোর পর ফোন মেঝেতে পরে ছিল তাই আমি রেখে দিয়ে ছিলাম।”
শাইয়ান ফোন হাতে নিয়ে কল লাগালো কাউকে।
” ড. শাইয়ান রেহমান আনসারী স্পিকিং। আমার ইমিডিয়েটলি ড. খানের একটি অ্যাপয়েনমেন্ট লাগবে। ভেরি ইমারজেন্সি।”
” হ্যালো স্যার। স্যার কাইন্ডলি একটু হোল্ড করুন, আমি চেক করে দেখছি।”
” হুম।”
শাইয়ান একহাতে মেয়েকে ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে অন্যহাতে ফোন কানে চেপে ধৈর্য্য সহকারে বসে রইলো। কয়েক মিনিট পর ওপর পাশ থেকে বলল –
” স্যার আজ তো ড. খানের সিডিউল ফুল। স্যারের বেশ কিছু ওটি আছে।”
” ড. খানের সাথে কন্টাক্ট করিয়ে দিন।”
” স্যার খুব বেশি কি ইমারজেন্সি?”
” ইয়াহ। আমার বাচ্চাদের জন্য।”
” ওকে ওকে স্যার আমি কন্টাক্ট করিয়ে দিচ্ছি এখনি।”
” হ্যালো ড. খান। দিস ইজ ড. শাইয়ান রেহমান আনসারী। আজ সকালে আমার ওয়াইফ ট্রিপ্লেটস বেবির জন্ম দিয়েছেন। আমার ছোট বেবি কিছুটা দুর্বল। আপনি কি আজ একটু টাইম দিতে পারবেন প্লিজ?”
” ইয়াহ ড. আনসারী। আমি কিছু সময়ের জন্য ফ্রি আছি। আপনি বরং বেবিকে নিয়ে আসুন আমার কেবিনে।”
” থ্যাঙ্ক ইয়ু ড. খান।”
” ইয়ু আর মোস্ট ওয়েলকাম ড. আনসারী।”
শাইয়ান কল কেটে মেহেরুন্নেসার দিকে তাকিয়ে বলল –
” আম্মা ওদের নিয়ে এখন যেতে হবে। ড. খান নাহলে সময় দিয়ে পারবে না। বাড়ির অন্য সবাই কোথায়?”
” ওরা তো বাড়িতে চলে গিয়েছে আব্বা।( আহিরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়লো) কেউ কি রয়েছে হাসপাতালে?”
” হ্যাঁ শ্রাবণী আছে। ক্যান্টিনে গেল কফি নিতে।”
” আহির তুমি শ্রাবণীকে এখানে আসতে বলো। আম্মা আপনি আমার সাথে চলুন। আহির তুমিও এখানে থাকো। ওনাদের দরকার পরতে পারে।”
” আচ্ছা আমি আছি এখানে।”
” ড. আনসারী আপনার বেবিরা একদম সুস্থ আছেন। ছোট বাচ্চাটা আন্ডার ওয়েট কিন্তু প্রপার টেক কেয়ার করলে কয়েক মাসের মাঝে রিকভার করে ফেলবে ইনশাল্লাহ্। বাই দ্যা ওয়ে কংগ্রাচুলেশনস্।”
শাইয়ান মাথা নেড়ে বলল –
” থ্যাঙ্কস ড. খান।”
” আর হ্যাঁ বেবিদের মায়ের বুকের দুধ দেয়ার চেষ্টা করবেন। বাড়তি কোনো ফর্মুলা দুধের দরকার নেই।”
” ওকে।”
শাইয়ান মেহেরুন্নেসার সাথে করে বাচ্চাদের নিয়ে ঝুমের কেবিনে ফিরে এলে দেখতে পেল ঝুম শ্রাবণীর সাথে কথা বলছে। ঝুম শাইয়ানকে দেখে মিষ্টি করে হেসে ডাকলো।
” ডক্টর।”
শাইয়ান তখনও মেয়েকে বুকের সাথে জড়িয়ে ছিল। ঝুমকে কথা বলতে দেখে বুকের মাঝে কি যে এক শান্তির বাতাস বয়ে গেল! মেহেরুন্নেসার দুহাতে দুই ছেলে বাবু। ঝুম সেভাবেই বলে উঠলো –
” ডক্টর কি বলল?”
শাইয়ান এগিয়ে গিয়ে ঝুমের কাছে গিয়ে বসলো। অতপর ঝুমের বুকের ওপর মেয়েকে দিয়ে বলল –
” ওরা ঠিক আছে। চিন্তার কিছু নেই। আপনার শরীর ঠিক আছে? ব্যাথা করছে এখনো?”
” আমি ঠিক আছি ডক্টর। চিন্তা করবেন না। একটু ব্যাথা করছে।”
শাইয়ান ব্যস্ত হয়ে পরলো হঠাৎ।
” কোথায় ব্যাথা করছে? ডক্টর ডাকব? আমাকে বলুন।”
” উফ্ ডক্টর থামেন আপনি। পাগলামো করেন কেন? আর কি শুরু করেছেন আপনি? কোথায় কোথায় জ্ঞান হারান কেন? আপনার জন্য আমি লজ্জায় পরি।”
শাইয়ান মুখটা করুন করে বলল –
” আমি তো ইচ্ছা করে অজ্ঞান হই না আরীবা। আপনার জন্য চিন্তা হলেই এমন হয়।”
ঝুম কিছু বলার মতো ভাষা পেলো না। সত্যিই শাইয়ানের তো দোষ না। তাই তাকে বলেই বা কি হবে।
ঝুম মেয়েকে ভালো ভাবে বুকের সাথে আগলে নিয়ে বলল –
” আপনি ঠিক আছেন ডক্টর?”
” আপনারা সুস্থ আছেন দেখে এখন আমিও ভালো আছি।”
” ওদের দেখেছেন?”
শাইয়ান হেসে বলল –
” হ্যাঁ। ওরা কার মতো হয়েছে বুঝতে পারছি না।”
ঝুম মেয়েকে দেখিয়ে বলল –
” সে আপনার মতো সুন্দর হয়েছে ডক্টর। তার চোখ দুটি আপনার মতো দেখুন।”
শাইয়ান অবাক হয়ে বলল –
” সত্যি!”
যেন এ এক অবিশ্বাস্য কথা। ঝুম মেয়েকে দুহাতের সাহায্যে উপরে তুলে দেখলো। শাইয়ান অবশ্য কিছুই বুঝলো না, তবুও দেখলো। অতপর ঝুমের দিকে তাকিয়ে ভীষণ নরম কন্ঠে বলে বসলো –
” আমি দুঃখিত আরীবা।”
ঝুম ভ্রু উঁচিয়ে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। শাইয়ান তাকালো না ঝুমের দিকে। কিছুটা ইতস্তত করলো। মেহেরুন্নেসা ছেলে দুজনকে খুব সাবধানে দোলনায় রেখে শ্রাবণী ও আহিরকে ইশারায় বাইরে যেতে বলে নিজেও চলে গেলো। তার পিছু পিছু একে একে তারা দুজনই চলে গেলো। রুমে রয়ে গেলো শাইয়ানরা পাঁচজন। শাইয়ানকে চুপ করতে দেখে ঝুম শাইয়ানের হাতে হাত রেখে বলল –
” কি হয়েছে ডক্টর? আপনি কিছু বলতে চান?”
” হুম।”
” বলুন।”
” সেই সময়টাতে আমি আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করে ছিলাম। ওদের মেরে ফেলতে চেয়ে ছিলাম।”
শাইয়ানকে থামিয়ে দিয়ে ঝুম বলল –
” থামুন ডক্টর। এসব শুনতে চাই না। আমিও তখন আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছি। তাছাড়া আমি অবুঝ নই ডক্টর। কেন আপনি ওমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলেন তা বোঝার মতো বুদ্ধি হয়েছে আমার।”
” আমাকে থামাবেন না প্লিজ। বলতে দিন। ধন্যবাদ পাখি তিনটি ফুলকে আমার জিবনে এনে দেয়ার জন্য। আপনি জানেন না তখন বুকে পাথর রেখে ওই সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলাম আমি। আমার কাছে আপনি ছাড়া কিছুই তখন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। অন্য কোনো পথ থাকলে আমি ওই কথা ভাবতাম না। আপনাকে আমি কি বলে ধন্যবাদ জানাব আমি জানি না। যদি আপনি নিজের জিবন বাজি রেখে ওদের দুনিয়াতে আনার সিদ্ধান্ত না নিতেন তাহলে কি হতো ভেবেই নিজেকে নিষ্ঠুর, পাষাণ খারাপ লোক মনে হচ্ছে। ওরা যখন জানতে পারবে ওদের বাবা ওদের মারতে চেয়েছিল তখন কতটাই না ঘৃণা করবে আমায়।”
” এসব কি বলছেন ডক্টর। এমন কিছুই হবে না। ওরা জানে ওদের বাবা যা করে ছিল তা ওদের মাকে বাঁচানোর জন্য করে ছিল। সুতরাং আপনাকে ওরা ঘৃণা নয় সন্মান করবে। আমি তো আমার দুই ছেলেকে আপনার মতো বউকে আর মাকে ভালবাসতে শিখাবো।”
শেষের কথাটি ভীষণ গর্ভ করে বলল ঝুম। শাইয়ান নির্নিমেষ অপলক তাকিয়ে রইলো ঝুমের দিকে। ঝুম ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করলো –
Remedy part 31
” কি দেখছেন?”
শাইয়ান ঝুঁকে পড়ল ঝুমের ওপর।
” একটা চুমু খাই আপনাকে?”
ঝুম হকচকিয়ে উঠলো। বুকের সাথে লেপ্টে ঘুমিয়ে থাকা মেয়েকে একবার দেখে নিয়ে বলল –
” আআআআআ ডক্টর মেয়ে আমার চেপ্টে ভর্তা হয়ে যাবে। সরুন আপনি।”
শাইয়ান নড়ল না। তবে বুকের কাছটায় কিছুটা দূরত্বে রেখে বলল –
” কিছু হবে না। খাই একটা চুমু?”
