Home Tell me who I am Tell me who I am part 24

Tell me who I am part 24

Tell me who I am part 24
আয়সা ইসলাম মনি

আমান হোসেন কিছুক্ষণ চুপ থেকে সতর্ক স্বরে বলল,
“বুঝলেন, পলাশ সাহেব, আপনার মেয়েকে এখন ঘরের মধ্যেই রাখুন। স্কুল-টিস্কুল বাদ দিয়ে ঘরের কাজ শিখুক। বেঁচে থাকলে ভবিষ্যতে পড়তে পারবে।”
শব্দগুলো ঠিক যেন শ্বাসরোধী শিকলের মতো আঁকড়ে ধরল পলাশকে। হঠাৎই বুকের ভেতর একটা ঝাঁকি খেল, সাথে শ্বাসও ভারী হয়ে এলো। গলা শুকিয়ে এলেও কোনো রকমে বলল, “স্যার, এখন কি যাব?”
“হ্যাঁ, যান। তবে মিডিয়া যেন বিন্দুমাত্র আঁচ না পায়, সতর্ক থাকবেন।”
“ইয়েস, স্যার।”
একটা শক্ত স্যালুট ঠুকে বেরিয়ে গেল সে।
থানা থেকে বেরিয়েই তার শ্বাস আটকে এলো। পলাশ হাঁসফাঁস করতে করতে কাঁপা হাতে ফোন বের করল। দ্রুত নম্বর চাপল।

“হ্যালো, অবনির মা! অবনি কই?”
ওপাশ থেকে বিস্মিত কণ্ঠ ভেসে এলো, “বলছি, আগে কও তোমার গলার কী হয়েছে? এমন শুনায় কেন?”
পলাশ ধৈর্য হারিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “যা জানতে চাইলাম, তার উত্তর দাও আগে।”
“স্কুলে আছে। জানোই তো, আড়াইটার আগে আসবে না।”
ঘড়ির দিকে তাকাল পলাশ। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আচ্ছা শোনো, এখনো আধ ঘণ্টা সময় আছে। তুমি গিয়ে ওরে আনো।”
“কিন্তু ও তো একলাই আসতে পারে।”
পলাশ হঠাৎ কী যেন মনে করে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠল। ঢোক গিলে সাবধানি কণ্ঠে বলল, “না না, তুমি যেও না। আমি ওমরকে পাঠাচ্ছি।”
ফোন কেটে দিল সে। অর্থাৎ তার ভাই যাবে মেয়েকে আনতে। কারণ পুলিশের ডিউটি ছেড়ে সে নিজে যেতে পারবে না। কিন্তু যে আতঙ্ক তাকে গ্রাস করল, সেটা আরও ভয়াবহ। অর্থাৎ OWL মাঝবয়সী মহিলাদেরও ছাড়ে না।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

মিরা আজ বেশ আয়োজন করেই সজ্জিত হয়েছে। পিতলরঙা শাড়ির ভাঁজে সূক্ষ্ম নকশার মাধুর্য ছড়িয়ে আছে, সঙ্গে মানানসই ফুলহাতা ব্লাউজ। গলায় নাজুক এক হীরকখচিত পেন্ডেন্ট, কানে হীরের দুল পড়েছে, আর ঢেউ খেলানো চুলগুলো খোলা রেখেছে। পুরোনো চৌধুরি বাড়ির দোরগোড়ায় প্রথমবার পা রাখবে বলে আজ সাজগোজে সামান্য বাড়তি যত্ন নিয়েছে। মুখে হালকা পাউডারের ছোঁয়া, ওষ্ঠাধরে হালকা গোলাপি আভার লিপগ্লস লাগিয়েছে।
অন্যদিকে কারানও প্রস্তুত। বেইজ রঙের শার্ট আর শুভ্র প্যান্টের মার্জিত সমন্বয়, সাথে চরণে ক্লাসিক লেদারের লোফার পরে নিল। তার কব্জিতে অডেমার্স পিগুয়েটের দৃষ্টিনন্দন ঘড়ি জ্বলজ্বল করছে। আর শরীরে সেই ‘রোজা ওট লাক্স’-এর সুগন্ধির গোলাপ, চন্দন আর ভ্যানিলার গাঢ় মিশ্রণের মোহময় সুবাস ছড়িয়ে দিল।
কক্ষের চৌকাঠে পা রেখেই কারান থমকে দাঁড়াল। চোখজোড়া ধীরে ধীরে বিস্ময়ে প্রশস্ত হয়ে উঠল। চোখে দুষ্টু চাহনি খেলে গেল। লাইটের আলোতে পিতলরঙা শাড়ির দীপ্তি মিরার ত্বকের সঙ্গে মিশে গিয়ে অদ্ভুত সম্মোহনী আবরণ তৈরি করেছে। খোলা চুলের ঢেউ, হীরার ঝিকিমিকি, আর লিপগ্লসের আভায় মিরার সৌন্দর্য দেখে কারানের নিশ্বাস আটকে এলো।

একটা দীর্ঘ দৃষ্টি মিরার উপর রেখে সে ভ্রূ উঁচিয়ে হাসলো। কণ্ঠে শীতল উত্তাপ নিয়ে বলল, “দিনকে দিন আমার বউয়ের রূপ বেড়েই চলেছে। এসব বন্ধ করো, সুইটহার্ট। কোনো দিন না তোমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ি।”
মিরা চুপচাপ হেসে মনে মনে বলে ওঠে, “যেভাবে প্রতিবার চুম্বনে ডুবিয়ে ফেলেন, তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ার আর কী বাকি?”
কিন্তু সে তার ভাবনাকে লুকিয়ে রেখে হঠাৎ ভ্রূ কুঁচকে বলে ওঠে, “এটা কি পড়েছো তুমি?”
কারান বিস্মিত হয়ে হেসে বলল, “মানে? দেখতেই তো পাচ্ছো, শার্ট আর প্যান্ট।”
মিরা চোখ বাঁকিয়ে অন্যদিকে তাকালো।
“আমারও তো ইচ্ছে করে আমার স্বামীকে নতুন নতুন সাজে দেখতে। কিন্তু সে তো সবসময় একঘেয়ে লুকেই আবদ্ধ।”

কারান অবাক হয়ে বলে, “মানে কি, আমাকে শার্ট-প্যান্টে ভালো লাগে না?”
মিরা দ্রুত না বলে উঠবে, কিন্তু মনে মনে ভাবে, “উঁহুঁ, কারান সাহেবের প্রশংসা তো করা যাবে না।”
তারপর হাসিমুখে বলে, “খারাপ তো লাগে না, তবে প্রতিদিন একই সাজে দেখতে দেখতে একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে।”
কারান ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা টেনে বলে, “তাহলে কী পরবো, মিরা? বলো, আজ তোমার মনমতো সাজবো।”
মিরা খানিকটা গম্ভীর ভাবেই বলল, “আজ তুমি পাঞ্জাবি পরো। তোমাকে এই এক সাজে দেখার আকাঙ্ক্ষা অনেকদিনের।”
কারান বিস্ময় মাখা হাসিতে বলল, “কিন্তু আমার স্ত্রী তো কখনো বলেনি যে, সে আমাকে পাঞ্জাবিতে দেখতে চায়।”
মিরা ভ্রূ নাচিয়ে উত্তর দিল, “বলিনি। তবে এখন তো বললাম। যাও, পরে এসো।”
“ওকে, বেবি। জাস্ট ওয়েট ফর ফাইভ মিনিটস।”

কারান অন্য কক্ষে যেতেই মিরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার ভালো করে পরখ করে নিল। নতুন গৃহ, নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হবে—নিজেকে যে পরিপাটি না রাখলেই নয়।
অল্প সময়ের ব্যবধানেই কারান ফিরে এলো। দরজার চৌকাঠ পেরিয়েই থেমে দাঁড়াল সে। মিরার চোখ তার দিকে আটকে গেল। শুভ্র পাঞ্জাবির নিটোল ভাঁজে সূক্ষ্ম সুতার কারুকাজ আলোতে ঝিকমিক করে উঠলো।
বুকের গঠনটা মসৃণ ঢালের মতো নেমে এসেছে; কাঁধের গড়ন চওড়া ও মজবুত, ঠিক সেখানেই পাঞ্জাবির সেলাইটা বসে আছে। কোমরের কাছে হালকা সংকুচিত ছাঁটটা তাকে আরও উচ্চমানের সৌন্দর্যে পরিণত করেছে। সাথে নিখুঁতভাবে মানিয়ে যাওয়া শুভ্র প্যান্ট পরেছে। পায়ে চকচকে লোফার, কব্জিতে সেই ঘড়িটা—সবকিছুই আগের মতো, তবুও কোথাও যেন অভাবনীয় পরিবর্তনের ছাপ।

কিন্তু শুধু পোশাকটাই নয়, তার চলন, দৃষ্টি, অধর; সব মিলিয়ে আজকের কারান যেন অন্য এক মানুষ। তার ভেতরের আভিজাত্য আজ নতুন সাজে মিরার সামনে প্রকাশ পেল। মিরা শুধু তাকিয়েই রইল। তার নিশ্বাস ভারি হয়ে এলো। মিরার বুক ধক করে উঠল। এ কী! এ তার বর? এতটা আকর্ষণীয়, এতটা পরিপূর্ণ! দৃষ্টির গণ্ডি ছাপিয়ে মুহূর্তটি তার হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে গেল। সেই অনুপম সৌন্দর্যের কাছে নিজেকে সংবরণ করা গেল না। প্রশংসা করবে না করবে না বলে নিজেকে আটকাতে চাইলেও, এবার আর পারল না।
হুট করেই উচ্ছ্বসিত স্বরে বলে উঠল, “মাশা আল্লাহ! কী দেখাচ্ছে আমার বরকে! কিসিকা নাজার না লাগ জায়ে।”
এ কথা বলেই সে দুই হাত মুঠো করে কপালে ঠেকাল। অর্থাৎ প্রার্থনা করে তার ভালোবাসার মানুষটিকে সকল অশুভ দৃষ্টির আড়ালে রাখতে চায়।
কারান অবাক। চোখে অবিশ্বাসের চমক নিয়ে বলল, “ও এম জি! ডিড মাই ওয়াইফ রিয়েলি সে দ্যাট? আই ফিল সো প্রাউড অফ মাইসেলফ।”

মিরা হাসল। চোখে একরাশ প্রশ্রয় নিয়ে বলল, “আমার হাসব্যান্ড হ্যান্ডসাম, বুঝেছো?”
কারান এবার সত্যিই হতবাক। এক দৃষ্টিতে মিরার দিকে তাকিয়ে এগিয়ে এলো। তারপর ডান হাতের উলটো পাশ দিয়ে তার ললাটে আলতো ছোঁয়া দিল।
“কই, তোমার শরীর তো ঠিকই আছে। কিন্তু আজ হঠাৎ কী হলো, বাবু?”
মিরা মিষ্টি হাসলো।
“কিচ্ছু হয়নি। শুধু আমার স্বামীকে আজ এতটা অপূর্ব লাগছে যে দৃষ্টি সরাতে পারছি না।”
কারান গলা খাঁকারি দিয়ে অন্যপাশে তাকিয়ে চুলে হাত বুলালো। তারপর বলল, “আয়হায়! আমি তো অলরেডি উড়ছি, জান। তবে যেহেতু আইদাহ আহসান মিরা নিজ মুখে স্বীকার করেছে, তার মানে নিঃসন্দেহে আমি এক অতুলনীয় পুরুষ। পুরুষ নয়, মহাপুরুষ বলাটা বেশি উপযুক্ত।”
মিরা হেসে উঠল, “সে আর বলতে! (থেমে) আচ্ছা কারান, একটা কথা ছিল।”
কারান গভীর দৃষ্টিতে তাকালো, “হুম, বলো?”

মিরা একটু দ্বিধান্বিত স্বরে বলল, “এভাবে যাওয়া কি ঠিক হবে? মানে, বোরকা কি পরবো?”
কারান মৃদু হাসল। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, “তুমি তো সোজা গাড়িতে উঠবে। তোমাকে তো কেউ দেখবে না, সোনা। আর ঘরের আপনজনদের সামনে তো পর্দার প্রয়োজন নেই, জানো নিশ্চয়ই?”
মিরা মাথা হালকা ঝাঁকিয়ে বলল, “হ্যাঁ, তবে সেটা মাহরামদের জন্য। কিন্তু তালহা ভাইয়া তো থাকবে।”
কারান এবার গম্ভীর স্বরে বলল, “তাহলে মাথায় কাপড় দিয়ে রাখবে, ওর সামনে খুব বেশি প্রয়োজন না হলে যাবে না।”
কিছুটা ভেবে সচেতন কণ্ঠে বলল, “না, তোমার ওর সামনে যাওয়ারই দরকার নেই। আমি তো আছিই। তালহার কাছ থেকে কিছু প্রয়োজন হলে আমাকে বললেই হবে। আর ঘরের ভেতর তো সবসময় বোরকা পরে থাকাও সম্ভব নয়।”
মিরা একটু ভেবে নিয়ে বলল, “হুম, সেটাও ঠিক। আচ্ছা, এবার চলুন, স্বামী মহাশয়।”
কথা শেষ হলেও দুজনের মাঝখানে স্নিগ্ধ নীরবতা নেমে এলো। মিরা আর কারান ঈষৎ হাসিমুখে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকল।

এ সময় হঠাৎ কারানের ফোনের কর্কশ রিংটোন সেই মধুর মুহূর্তের অবসান ঘটাল। স্ক্রিনের নাম দেখে কারানের ভ্রূ কুঁচকে গেল। সে বলল, “একটু ওয়েট করো বেবি, আমি কলটা ধরছি।”
“আচ্ছা।”
কারান পাশের কক্ষে গিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “হুম, বলো ইমন।”
ওপাশ থেকে কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা ভেসে এলো, “স্যার, যা বলবো শুনলে অবাক হবেন নিশ্চিত।”
কারান এবার গাঢ় কণ্ঠে বলল, “কী হয়েছে?”

“স্যার, ওয়াজিদের মৃতদেহ নরেন রায়ের কাছে পাঠানোর আগে আমি একটা চূড়ান্ত পরীক্ষা চালাই। মেডিক্যাল চেকআপও করাই। কারণ নরেন রায় যে কতটা বিপজ্জনক, তার কী মতলব থাকতে পারে, বোঝা মুশকিল…”
কারান চোয়াল শক্ত করে, স্বরে তীক্ষ্ণ সংযম এনে বলল, “হ্যাঁ, এবার মূল কথা বলো।”
ইমন শ্বাস ভারী করে বলল, “স্যার, ওয়াজিদের মাথার চুলের ফাঁকে সূক্ষ্মভাবে লুকানো ওয়্যারলেস স্পাই মাইক্রোফোন পেয়েছি। যার মাধ্যমে নরেন রায় আমাদের প্রতিটি শব্দ শুনেছে।”
কারানের দৃষ্টিতে বজ্রাঘাতের স্পষ্টতা ফুটে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “দ্য মেইন পয়েন্ট ইজ দ্যাট… এ কারণেই ওয়াজিদ আমাকে কিছু জানায়নি।”
“জি, স্যার। কিন্তু তাও বলব, ওয়াজিদ শেষমেশ যে পথ বেছে নিল, তা সঠিক ছিল না। ও তো চাইলেই সেই চিঠিটি আপনাকে দিতে পারত।”

কারান নিশ্বাসের ভার সজোরে ত্যাগ করে বলল, “হ্যাঁ, পারত। কিন্তু যখন জলে কুমির আর ডাঙায় বাঘ থাকে, তখন বুদ্ধির চাকাও থমকে যায়। আমি ওকে ভরসা দিয়েছিলাম, চাইলে আরও কিছু মুহূর্ত চিন্তা করতে পারত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তুমি এতদিন বিষয়টি গোপন রাখলে কেন?”
“স্যার, আপনি নিজেই তো কিছুদিন অফিস থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাই বলতে গিয়েও বলিনি।”
“আচ্ছা, বুঝলাম। এখন শোনো, আমি কিছুদিন গ্রামের বাড়িতে থাকব। তুমি সামলে নিও, ফাহমিদা তো আছেই। তবে সতর্ক থেকো। নরেন রায়ের মতো মানুষ যা খুশি তাই করতে পারে।”
ইমন কপাল কুঁচকে বলল, “জি, স্যার। ও আসলে আপনাকে নামানোর জন্য উন্মত্ত হয়ে গেছে। একটা কথা ছিল, স্যার।”

“হুঁ, বলো।”
“আরিয়ান স্যার কি আর অফিসে আসবেন না?”
কারান সামান্য ভ্রূ কুঁচকে, শীতল কণ্ঠে উত্তর দিল, “আসবে, তবে এখন নয়। আমি ওকে বিশ্বাস করি না, তাই বিষয়টা বিবেচনা করতে হবে। আচ্ছা, রাখছি।”
“জি, স্যার।”
ফোন কেটে দিয়ে কারান কপাল ডলে চিন্তায় ডুবে গেল। ইমনের কথাগুলো তাকে ভাবিয়ে তুলছে। নরেন রায় কী পরিকল্পনা আঁটছে? প্রতিশোধের অগ্নিশিখা এবার কোন পথে ধেয়ে আসবে? কারানের কারণেই তো তার সাম্রাজ্য ভেঙে পড়েছে। নরেন নিশ্চয়ই এমন কিছু করবে, যাতে কারানের অস্তিত্ব চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়।

তখনই দরজায় মৃদু কড়া নাড়ার শব্দ হলো। মিরার কণ্ঠস্বর ধ্যানভঙ্গ করল, “আর কতক্ষণ?”
কারান ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে মিরার দিকে তাকাল। মিরার দিকে এক মুহূর্ত চোখ বুলিয়ে নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে, শাড়ির কুচি ঠিক করে দিল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে মিরার দু’কাঁধে বলিষ্ঠ হাত রেখে গভীর স্বরে বলল, “এত দিনেও আমার বউ ঠিকঠাক শাড়ি পরা শিখল না। চৌধুরি বাড়ি থেকে এসে তোমাকে শাড়ি পরিয়ে দেব।”
মিরা হাসল। কপালে সামান্য ভাঁজ ফেলে বলল, “তুমি শাড়ি পরাতেও পারো?”
কারান নেশালো স্বরে ফিসফিস করে বলল, “সেটা ঐ দিনই দেখবে। যদিও শাড়ি পরিয়ে দিতে যতটুকু সময় লাগবে, খুলে ফেলতে দু সেকেন্ডও সময় নিব না।”
মিরা চোখ সরিয়ে মুখ শক্ত করে বলল, “শুরু হয়ে গেল অ”সভ্যতা?”
কারান দুষ্টু হাসি ছড়িয়ে মিরার কপালে গভীর চুমু খেয়ে বলল, “লেটস গো, বেবি।”
মিরা হাসতে হাসতে কারানের বাহু জড়িয়ে ধরল, আর দু’জনে একসঙ্গে দরজা পেরিয়ে বাইরে পা রাখল।

সবুজ শ্যামলী, ফিরোজা রুপালি, রূপের নেই তো শেষ। স্নিগ্ধ, মনকাড়া, শীতল সমীরের হালকা স্পর্শ, আর ক্ষণেকের জন্য বুকের গভীরে শ্বাস নিয়ে তা ছেড়ে দেওয়ার উপলব্ধি—এটাই গ্রামীণ দৃশ্যপটের অমলিন গূঢ়তা। রাস্তার দু’ধারে পরিচিত বৃক্ষরাজির সুসজ্জিত বাহার এবং ভৃঙ্গরাজ ফুলের তীক্ষ্ণ মিষ্টি গন্ধ; এইসব মিলিয়ে জীবনের সমস্ত অবসন্নতা যেন মুহূর্তেই দূর হয়ে যায়।
কারান গাড়ি চালিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। আর মিরা গাড়ির কাচ খুলে বাইরের দিকে মুখ বাড়িয়ে, দু’চোখে অনাবিল বিস্ময়ের রং ধারণ করে বুকের গভীরে শ্বাস টেনে নিয়ে, এক এক করে ছেড়ে দিল। এরপর সে গভীর মুগ্ধতায় বাইরের দৃশ্য উপভোগ করতে শুরু করল। কারান কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে, মাঝে মাঝে স্নিগ্ধ হাসিতে তার প্রিয়তমার হাস্যোজ্জ্বল মুখমণ্ডলটির দিকে তাকিয়ে নিল।
আজ মিরার মুখে অসীম আনন্দের রেখা স্পষ্ট। এতদিন পর সে বাড়ির বাইরে পা রেখেছে, এবং তার সাথে এই শান্তির পরিপূর্ণতাও এসেছে। তাছাড়া সড়কটি একদম নিঃসঙ্গ, জনশূন্য। তবে দূরে কিছু কৃষক মাঠে কাজ করতে দেখা যায়, যা আলাদা একটা মধুর দৃশ্য।
মিরা গীতব্যঞ্জিত কণ্ঠে গান গেয়ে ওঠে,

“এই পথ যদি না শেষ হয়,
তবে কেমন হতো তুমি বলতো?
যদি পৃথিবীটা স্বপ্নের দেশ হয়,
তবে কেমন হতো তুমি বলতো?”
কারান স্বচ্ছ হাসি দিয়ে বলল, “তুমিই বলো।”
এবার মিরা মুখে অনাবিল আনন্দের হাসি নিয়ে, গদগদ কণ্ঠে বলল, “জানো কারান, দাদা-দাদি মারা যাওয়ার পর তো আর কখনো গ্রামে যাওয়া হয়নি। ফুফি তো শ্বশুরবাড়ি। এখন গ্রামের বাড়িটা একদম পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে। আজ এতদিন পর গ্রামীণ দৃশ্য দেখছি। কী যে আনন্দ হচ্ছে!”
কারান হেসে বলল, “যখন ফুফির সাথে কথা বলবে, তখন আনন্দ আরও দ্বিগুণ হয়ে যাবে।”
“আমি অনেক এক্সাইটেড জানো, তবে একটু একটু ভয়ও লাগছে।”
কারান সামান্য ভ্রূ কুঞ্চিত করে বলল, “ভয় করছে কেন?”
মিরা একটু হেসে বলল, “আরে প্রথমবার, আবার কাউকে চিনি না। কেমন না?”
“কিচ্ছু হবে না, বাবা। আর তুমি তো অনেক খুশি, তাই না?”
“অনেক, অনেক বেশি।”

কারান হাই তুলে, হাস্যরসাত্মক কণ্ঠে বলল, “তাহলে আমি একটা চুমু ডিজার্ভ করি।”
মিরা ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে, কারানের গালে তার অধরের নরম ছোঁয়ায় একটুকরো আলতো চুমু রাখল। স্পর্শটা ছিল ক্ষণিক, কিন্তু তার উষ্ণতায় একরাশ নীরব ভালোবাসা মিশে ছিল। এরপর সে নিজের সিটে ফিরে এলো। মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে হাসল। নিজের আচরণে নিজেই খানিকটা লজ্জিত, আবার গোপনে গোপনে তৃপ্তও।
এই অপ্রত্যাশিত স্পর্শে কারান যেন মুহূর্তের জন্য বাস্তবতা হারিয়ে ফেলল। তার মস্তিষ্কে হালকা ঝাঁকুনি খেল। হৃৎস্পন্দন একবার থমকে গিয়ে আবার চলতে শুরু করল। সে কিছু না ভেবেই তৎক্ষণাৎ ব্রেক চাপল।
মিরা তার ভাবনার গতিপথকে ভেঙে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কি হলো?”

কারান কিছু না বলে বিভোর চোখে মিরার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর তার ঠোঁটে গভীর চুমু এঁকে দিল। স্ব জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে, গলায় কোমলতা এনে বলল, “কিচ্ছু হয়নি। তবে আমি খুব খুশি, মিরা।”
একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে সে আবার গাড়ি চালাতে শুরু করল। কিন্তু সেই নিঃশ্বাসে মিশে ছিল হৃদয়ের অতল গহ্বর থেকে উঠে আসা পূর্ণ ভালোবাসার গান।
এদিকে কারানের চুমুতে মিরার বুকের গভীরে ধীরে ধীরে উত্তাপ জমতে থাকে। তার চোখ জ্বলে উঠলেও ঠোঁটে কোনো কথা আসে না। মিরা একটানা কিছুক্ষণ তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইল। কারানের চোখে-মুখে যে অদৃশ্য শান্তি রয়েছে, মিরা তা স্পষ্ট অনুভব করছিল।

সে নিজেও তখন ভেতরে ভেতরে অপূর্ব উত্তেজনায় কাঁপছিল। বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ভারি লাগছিল, কিন্তু তাতে কোনো অস্বস্তি ছিল না; ছিল শুধু অনির্বচনীয় পরিতৃপ্তি। সে চুপচাপ মাথাটা গাড়ির সিটে হেলিয়ে দিল। চোখ মেলে বাইরের প্রকৃতির দিকে তাকাল। একটা হাওয়ার দোলা এসে তার চুল উড়িয়ে দিলে, চুলগুলো উড়ে এসে তার মুখে পড়ল। কিন্তু সে সরিয়ে দিল না। সে শুধু চেয়েছিল এই শান্ত মুহূর্তটাকে আগলে রাখতে। অর্থাৎ কারান যে অদৃশ্য শান্তিতে আচ্ছন্ন, মিরা তার শান্তিতে বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে চায় না।

পুরোনো চৌধুরি বাড়িতে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে রাতের আবরণ গাঢ় হয়ে নেমেছে। কারান গাড়ি থেকে নেমে বউয়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে দরজা খুলে দাঁড়াল। মিরা এক চিলতে হাসি ছড়িয়ে গাড়ি থেকে নামল, কিন্তু চারপাশের ঘোর অন্ধকারে চৌধুরি বাড়ির চেহারাটাই বোঝার উপায় নেই। আশপাশে তো বটেই, ভিতরেও কোথাও কোনো আলোর অস্তিত্ব নেই। কারান ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে মৃদু স্বরে বলল, “এসো।”
মিরাও নীরবে তার পিছু নিল। এক হাতে শাড়ির আঁচল টেনে মাথা ঢেকে নিল। শাড়ির ঘন কাপড়ে তার সারা অবয়ব ঢেকে গেছে, শুধু মুখ, হাত আর পায়ের খানিকটা দৃশ্যমান।

বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই কর্কশ নারীকণ্ঠ ভেসে এলো, “আম্মা, আবার কারেন্ট গেছে গা। হারিকেন কই?”
নরম সুরে আরেকজন সাড়া দিল, “মোমবাত্তি জ্বালা। তুব্বার ঘরে আছে। দেখ যাইয়া।”
ওদের কথোপকথন শুনে কারান এবার গলা উঁচিয়ে ডেকে উঠল, “ফুফি! দিদা!”
তার কণ্ঠ শুনেই পুরো বাড়িতে আলোড়ন উঠল। যে যেখানে ছিল চোখে-মুখে অবিশ্বাস আর বিস্ময় নিয়ে সবাই সদর দরজার দিকে ছুটে এলো। ফাতিমা অর্থাৎ কারানের ফুফু, দরজার ফ্রেমে দাঁড়িয়ে চোখে পানি নিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “ও মা! কে আইছে দেইখা যাও! আল্লাহ রে, কারান আইছে, মাগো।”
শাড়ির আঁচল সামলাতে সামলাতে তিনি আবার ঘরের ভেতরে দৌড়ে গেলেন।

ওদিকে ভিতরের ঘরে বসে পাঠশালার বইয়ে ডুবে থাকা তুব্বা কান পেতে ফাতিমার আওয়াজ শুনল। বইটা ফেলে রেখে জোড়ালো পায়ের শব্দে ছুটে এলো উঠোনে। কারানকে দেখেই দম নিতে নিতে বলল, “কারান ভাইয়া?”
এই সময় এক যুবক এগিয়ে এসে কারানের গলা জড়িয়ে ধরল। কারানও হেসে আলিঙ্গন করল। তার বয়স বড়জোর সাতাশ হবে। উত্তেজনায় কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল, “হোয়াট অ্যা সারপ্রাইজ, ব্রো! তুই যে আসবি, বলে আসবি না? বাইশ বছর পর ফিরে এলি। বাইশটা বছর… খোদার কসম, চোখের সামনে তোকে দেখেও বিশ্বাসই হচ্ছে না।”
একটু থেমে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “ভেতরে আয়, ভাই। মা? মা, কোথায় গেলে আবার?”
ঠিক তখনই ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে ধীরে ধীরে আবির্ভূত হলেন এক বৃদ্ধা। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর, তাই লাঠির ওপর ভর দিয়ে অতি সতর্কে পা ফেললেন উঠানে। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা, কিন্তু চেনা মুখটিকে চিনতে এক মুহূর্তও সময় লাগল না। তার মুখে থরথরানো হাসি ফুটে উঠলো। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “আমার মানিকচাঁদ আইছেনি? ওরেএ, এদিকে আয়।”

তার পাশেই ফাতিমা হাসিমুখে ঘর থেকে উঠানে পা রাখল। ফাতিমা পাশ থেকে তার হাত ধরে বললেন, “এই যে তোমার মানিক। এইবার চোখ ভিজাইয়া দেখো, মা। অবশেষে তোমার কারান ফিররা আইছে।”
তুব্বা পাশে এসে চুপচাপ চশমাটি বৃদ্ধার হাতে তুলে দিল। তিনি চোখে চশমা পরে প্রিয় মুখটি প্রাণভরে দেখতে থাকলেন।
কারান সামনে এগিয়ে এসে দাদিকে জড়িয়ে ধরল। তারপর এক ভ্রূ উঁচিয়ে কণ্ঠে মধুর সুর এনে বলল,
“কী খবর, জান?”
দাদিজান তখন লাঠি উঁচিয়ে কারানের পায়ে আলতো আঘাত করে বললেন, “এদ্দিন পর দাদিরে মনে করলি, ছোকরা?”
কারান তখন চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক নিয়ে হেসে বলল,
“চেতো না বেবি, তোমার জন্য একটা চমক আছে।”

সে খানিকটা পিছনে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল, মুখে মৃদু হাসি টেনে সম্ভাষণ করল, “মিরা!”
এদিকে তারান্নুম তুব্বার ঘর থেকে মোমবাতি নিয়ে এসে দাদিজানের হাতে দিল। মিরা ধীর পায়ে কারানের পাশে এসে দাঁড়াল। চোখ নামিয়ে বিনম্র কণ্ঠে বলল, “আসসালামু আলাইকুম। আসসালামু আলাইকুম, দাদিজান।”
মোমবাতির অল্প আলোয় মিরার অবয়ব স্পষ্ট হতেই সবাই হতবাক হয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এলো। সবার শ্বাসের শব্দটুকুও থমকে গেছে। কারো মধ্যে কোনো বাক্য বা নড়াচড়া নেই। কারান মিরার হাত ধরে রসিকতার সুরে বলল, “মিরা, পরিচিত হও। এটাই তোমার সতিন সৈয়দা আম্বিয়া জমাদ্দার।”
মিরা হালকা হাসল, একবার উপস্থিত সবার ওপর চোখ বুলিয়ে নিলো। কিন্তু কেউ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে সবাই। কারান ঠোঁটে রহস্যময় হাসি টেনে বলল, “জান, কী হলো? এই হলো আমার আপন বউ। তুমি তো আমার সৎ বউ।”

এবার দাদিজান মুখভর্তি হাসি ছড়িয়ে বললেন, “এ্যা তো দেহি রাত্তির বেলা সূর্যোদয় হইলো! এ্যা ক্যারে লইয়া আইছো, মানিক?”
কারান হাসতে হাসতে মিরার পিছন থেকে হাত বাড়িয়ে, তার বাম কাঁধে আলতোভাবে হাত রেখে বলল, “তাহলে বলো বলো, কেমন সতিন এনেছি তোমার?”
তালহা ভ্রূ উঁচিয়ে বলল, “ভাই তো দেখছি ঘরে চাঁদ নিয়ে এসেছে!”
ফাতিমা বিস্ময়াভিভূত কণ্ঠে বলল, “ওমা! এ কারে আনছো, কারান?”
মিরাকে দেখে মুহূর্তকাল নির্বাক হয়ে গিয়ে সময় হারিয়ে ফেলল সে। তারপর হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেয়ে উচ্ছ্বসিত স্বরে বলল, “ঘরের লক্ষ্মীকে বাইরে দাঁড় করাইয়া রাখছো ক্যান? ভিত্রে আহো, বউ।”

এদিকে মিরা এতগুলো অচেনা মানুষের অকুণ্ঠ প্রশংসায় লজ্জায় নত হয়ে কারানের পাঞ্জাবির একাংশ টেনে ধরল। অপরিচিত সান্নিধ্যে পুলকিত হলেও প্রচণ্ড লজ্জায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল সে।
কারান ঘাড় কাত করে মিরার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল, “লজ্জা পেয়ো না, বউ। এরা তোমারই আপনজন।”
তার ঠোঁটে চাতুর্যপূর্ণ হাসি খেলে গেল।
“তাছাড়া আমি তোমাকে যে পরিমাণ লজ্জায় ফেলি, তার তুলনায় এ তো কিছুই না।”
মিরার গাল টকটকে লাল হয়ে উঠল। কারানের কথায় আরও বিভ্রান্ত হয়ে সে বিস্মিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। একে তো অপরিচিত এতগুলো মানুষের প্রশংসা, আবার কারানের এ হেন কথায় মিরার মুখের ভাব মুহূর্তে বদলে গেল। কারান মিরার চোখে-মুখে ক্রমশ জমতে থাকা রাগের আভাস বুঝে হেসে নিজের ঘাড় চুলকে দৃষ্টি এদিক-ওদিক ঘোরাল। ফাতিমা স্নিগ্ধ কণ্ঠে বলল, “ভিত্রে আহো, বউমা।”

এসময় দাদিজান কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে এলেন। চোখ থেকে এক চিলতে সুরমা কনিষ্ঠা আঙুলে নিয়ে মিরার সামনে দাঁড়িয়ে মৃদু স্বরে বললেন, “মাথাহান নোয়াও, নাতবউ।”
মিরা সংকোচে অবনত হতেই, তিনি তার কপালে কালো তিলক এঁকে দিয়ে থরথর কণ্ঠে বললেন, “এই হইলো চৌধুরি বাড়ির রতন (রত্ন)। এ্যারে সাবধানে রাহিস, মানিকচাঁদ। কারুর দৃষ্টিদোষ না লাগে।”
মিরার অপরূপ সৌন্দর্যে অভ্যর্থনাকারীদের চোখে বিস্ময় ও প্রশংসার দীপ্তি ছড়িয়ে পড়েছে। প্রত্যেকের দৃষ্টি জ্বলজ্বল করে উঠল, যেন তারা রূপের এক অনির্বচনীয় মূর্তিকে প্রত্যক্ষ করছে। তবে এই মোহমুগ্ধ আবহের মধ্যে এক জোড়া চোখ বিষণ্নতার ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে রইল। অন্তরে অজানা বেদনার ঢেউ উঠলেও, কঠোর নিয়ন্ত্রণে তা বাহিরে প্রকাশ পেল না।

মিরার সৌন্দর্যের প্রশংসাবর্ষণে অতিষ্ঠ হয়ে মেয়েটি হঠাৎই নিজেকে গুটিয়ে নিল। হৃদয়ের গভীর ক্ষোভ আর বিষাদকে আর সহ্য করতে না পেরে, ব্যাকুল পদক্ষেপে কক্ষের দিকে ছুটল সে। প্রবেশমাত্রই দরজার পালা বন্ধ করে বিছানায় আছড়ে পড়ল। বিবশ যন্ত্রণায় ঠোঁট কামড়ে ধরে সে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগল। সে আর কেউ নয়, ফাতিমার জ্যেষ্ঠ কন্যা—তারান্নুম তাজিন সোহা।
অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ মহলে অনাড়ম্বর আয়োজনে মিরার প্রবেশ ঘটল। সুসজ্জিত অন্দরমহলের প্রত্যেক কোণায় তার আগমনের জাঁকজমক প্রতিফলিত হলো।

রোমানা বিরক্তি আর দ্বেষের সংমিশ্রণে মুখ কুঁচকে নিজের কক্ষের সোফায় বসে গভীর চিন্তায় ডুবে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যে আরিয়ান কক্ষে প্রবেশ করে দ্রুত পোশাক পরিবর্তন করে নেয়। অথচ রোমানা তার দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে স্থির দৃষ্টিপাত করে থাকে। আরিয়ান যখনই ফ্রেশ হওয়ার উদ্দেশ্যে ওয়াশরুমের দিকে এগোয়, রোমানা হঠাৎ পথ রোধ করে কঠোর স্বরে বলে, “কোথায় গিয়েছিলে?”
আরিয়ান ভ্রূ কুঁচকে জবাব দেয়, “ফাজলামো বন্ধ করো, সামনে থেকে সরো। ফ্রেশ হয়ে আসি।”
রোমানা একচুলও নড়ল না, বরং আরো কঠিন স্বরে বলল, “আগে উত্তর দাও, তারপর যেতে দিচ্ছি।”
আরিয়ানের ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফোটে, “ইদানীং খুব বেশি বাড়াবাড়ি করছো, সাওদা রোমানা। আমার আসল রূপটা দেখাইনি এখনো। সামনে থেকে সরে দাঁড়াও।”

রোমানা ঠোঁটের কোণে তীক্ষ্ণ হাসি ছড়িয়ে বলে, “তাই নাকি? তাহলে দেখাও তোমার সেই রূপ। তবে মনে রেখো, আমার দ্বিতীয় রূপটাও তুমি দেখোনি। কোথায় গিয়েছিলে? ইভানার কাছে?”
আরিয়ান বিস্ময়ে স্থবির। চোখ কুঁচকে জিজ্ঞাসা করে, “তুমি কি বলতে চাইছো?”
রোমানা বিদ্রূপে হাসে, “যেটা তুমি ভাবছো, ঠিক সেটাই। তুমি কি মনে করো, আমি কিছুই জানি না?”
আড়চোখে তাকিয়ে বলল, “তোমার এক্স… ওহ, ভুল বললাম। এক্স বলা যায় কি না, সেটা নিশ্চিত নই। হয়ত এখনও বর্তমান।”
আরিয়ান ঠোঁটে চাপা হাসি টেনে বলল, “তোমার গোয়েন্দাগিরি প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু ইভানার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই, আর থাকার কথাও না।”
রোমানা বাঁকা হাসে।

“তাহলে যাও কোথায়? চাকরিও তো নেই, বেকার মানুষ এত ঘোরাঘুরি কীসের?”
পরিহাসবিদ্ধ বাক্যগুলো আরিয়ানের ধৈর্যের শেষ প্রান্তে আঘাত হানে। তার চোখ র”ক্তবর্ণ হয়ে ওঠে। বুকের ভিতর আগুন জ্বলে উঠে। অকস্মাৎ রোমানার চুল মুঠোয় ধরে ঠাস করে মাথাটা দেয়ালের সঙ্গে ঠুকে দেয় সে। গম্ভীর, হুঁশিয়ারি ভরা কণ্ঠে বলে, “পরেরবার আমাকে অপমান করলে এই মাথাটাই আর শরীরের সঙ্গে থাকবে না।”
কঠোর বাক্য ছুড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে যায় সে। রোমানা চোয়াল শক্ত করে কপাল ডলতে থাকে। চোখের দৃষ্টি কঠোর করে ফিসফিসিয়ে বলে, “আহ, আল্লাহ! ইচ্ছে করছে শু”য়ারেরবাচ্চাটার গলাটা চেপে ধরি।”

কটমট করে পুনরায় বলল, “দাঁড়াও, তোমার বিচার হবে।”
ক্ষণিক পর আরিয়ান ফ্রেশ হয়ে ফিরে এসে দেখে রোমানা শুয়ে আছে। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সে মনে মনে বলে, “ওরে শালিইই! শাস্তি দেওয়ার পথ পেয়ে গেছ, তাই না?”
তবে আরিয়ানের মনে সন্দেহ দানা বাঁধে। তাই উন্মত্ত ক্রোধে টেবিলে রাখা কাঁচের গ্লাস আছড়ে ফেলে দেয় সে। উদ্দেশ্য রোমানার ঘুম ভাঙানো। তবে তন্দ্রাঘোরে থাকা মানুষকে জাগানো যায়, কিন্তু তন্দ্রার ভান ধরে থাকা মানুষকে কীভাবে জাগাবে?

সেই শব্দে কক্ষ কেঁপে উঠল, কাচ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল, কিন্তু রোমানা একটুও সাড়া দিল না।
আরিয়ান ঠোঁট কামড়ে তার পাশে শুয়ে পরে। গভীর অন্ধকারে তার চোখদুটো জ্বলে ওঠে। উগ্র কণ্ঠে ফিসফিস করল, “আজকে শুধু এই সৌন্দর্য তোমাকে রক্ষা করল, সাওদা রোমানা। তোমার হাজার অপমানের পরও তোমাকে ঘৃণা করতে পারি না, কারণ তোমাকে দেখলে মনে হয়, সৌন্দর্যের সংজ্ঞা নতুন করে লিখতে হবে। এতটাই ভয়ংকর সুন্দর তুমি।”

Tell me who I am part 23

রোমানা চোখ বন্ধ রেখেই মনে মনে বলল, “আমি জানি, আরিয়ান। তুমি সৌন্দর্যের পূজারি। কিন্তু ভুলে গেছ, গোলাপে কাঁটা থাকে। আর এই মোহই একদিন তোমাকে ধ্বংস করবে, দেখে নিও।”

Tell me who I am part 25