Home অকস্মাৎ প্রণয় অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২১+২২

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২১+২২

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২১+২২
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

বিয়ে বাড়ি অথচ রাত জাগা হবে না তা কি কখনো হয়? বিয়ে বাড়ি মানেই হাসি- ঠাট্টা, নাচা- গাওয়া ও হইহুল্লোড় এ ভরপুর; যেখানে ছেলেমেয়েরা হাসি- ঠাট্টার ছলে সময়ের দিকে দৃষ্টিপাত না করেই কাটিয়ে দেয় সর্বক্ষণ। অনিলদের ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটছে। কিছুক্ষন আগের “চোখ টিপ” খেলা শেষ হতে না হতেই তারা আবারও এক নতুন খেলায় মত্ত হতে যাচ্ছে। সেই খেলার মাঝেই একের পর এক শর্ত দিয়ে যাচ্ছে অনিল। এই যেমন:

“পরপর তিনবার ট্রুথ অর ডেয়ার কোনোটাই নেওয়া যাবে না, ব্যাক্তিগত কোনো ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করা যাবেনা, আর কেউ ডেয়ার নিলে যদি তা সম্পন্ন না করে তাহলে ১০০ টাকা জরিমানা করতে হবে ”…
আর কিছু বলতে পারলো না অনিল এর মাঝেই তার কথায় বাম হাত ঢুকিয়ে দিলো নিরব,
“ ভাই কোনো অসম্ভব কাজ করতে দিলে কিন্তু হবেনা। এই ধর তুই বললি আমি ৫ মিনিটে পুরো দুনিয়া ঘুরে আসতে- সেটা তো কখনোই সম্ভব নয় সেক্ষেত্রে জরিমানা করলে হবে না। ”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“ আমি যদি বলি আমি ৫ মিনিটে তোকে পৃথিবী ঘুরে দেখাবো? ”
অনিলের এমন কথায় হাসির রোল পড়ে গেলো গোটা যুবকদল ও তাদের সাথে বসে থাকা কিছু তরুণীদের মাঝে। নিরব হাসতে হাসতে তার পাশে থাকা ছেলেটির উপর পরতে পরতে বললো,
“ ভাই হাসালি , একজন ডাক্তার হয়ে এমন চাপা কেমনে মারলি তুই? ”
“ ৫ মিনিটে না আমি এক মিনিটেই পৃথিবী ঘুরিয়ে দেখাবো তোকে। পারলে কী দিবি বল? ”
এইবার বেশ জুর দিয়ে কথাটা বলল অনিল। তার কথা তেমন একটা গ্রাহ্য করল না নীরব সে আবারও হাসতে হাসতে বলল,
“ তোকে নগদ ৫০০০ টাকা দেব। আর না পারলে তুই আমাদের প্রত্যেক কে ১০০০ টাকা করে দিবি। ”
“ ডান ”
বলেই বসা থেকে উঠে পরলো অনিল। আর বাকিরা সবাই অধির আগ্রহে তার কারসাজি দেখতে তার উপর পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রাখলো।

ছাদের এক পাশে আনিকাকে ছবি তুলে দিচ্ছে হীরা। তখন সবার সাথে ক্যামেরা ম্যানের তোলা ছবি নাকি পছন্দ হয়নি তার। সবাই যখন খেলার শর্ত নিয়ে ব্যাস্ত ছিলো সেই ফাঁকেই হীরাকে দিয়ে নিজের একান্ত কিছু ছবি তোলাতে এদিকটায় এসেছে তারা। চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে আনিকা আর হীরা সেই দৃশ্যটাই মনোযোগ সহকারে ক্যামেরায় বন্দি করছিল। সহসা তাকে কেন্দ্র করে কেউ ঘুরছে সেটা উপলব্ধি করতেই ক্যামেরা থেকে চোখ সরিয়ে আনলো সে। অনিলকে তার চারপাশে ঘুরতে দেখে হতভম্ব হয়ে অনিলের দিক তাকিয়ে রইলো সে। উনি এভাবে ঘুরে ঘুরে কী দেখছে? তাকে দেখছে কী? ভাবতেই শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত প্রবাহিত হলো তার। মুহূর্তেই কপোল দ্বয় রক্তিম বর্ণ ধারণ করলো। তবে তা টিকলো না বেশিক্ষণ, ছাদের মাঝখান থেকে ছেলেমেয়েদের হইহুল্লোড়ের আওয়াজে বিস্মিত নয়নে সেদিকে তাকালো সে। দেখলো সবাই অনিলকে উদ্দেশ্য করে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে বলছে,

“ ফাটিয়ে দিয়েছেন অনিল ভাই। ”
সবার এহেন কাণ্ডে ড্যাবড্যাব করে তাদের দিক তাকিয়ে আছে হীরা ও আনিকা। কিছুই মাথায় ঢুকছেনা তাদের। দুজনে দুজনের দিক প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকালো শুধু। এদিকে অনিল ঠোঁটে বিশ্বজয়ের হাসি নিয়ে ছেলেমেয়েদের দিক এগোতে এগোতে নিরবের চুপসে যাওয়া মুখের দিক তাকিয়ে একটা চোখ মারলো। জ্বলে উঠলো নিরব। কটমট করতে করতে বিড়বিড় করে বললো,
“ শা*লা লেফাফাদুরস্ত একটা, উপর দিয়ে সবার কাছে একদম ভদ্র- সভ্য সেজে থাকে আর ভিতরে শুধু কুটনা বুদ্ধি। ধেৎ কেন যে এই ছেলের সাথে টক্কর দিতে গেলো সে এখন ৫০০০ টাকা মাইর যাবে তার। ”
এসব ভাবতে ভাবতেই নিজেকে নিজে বকতে লাগলো সে। এর মাঝেই তার কাছে এসে অনিল বললো,

“ টাকা বের কর এইবার। ”
“ দেখ ভাই আমার মতন একজন বেকার মানুষের থেকে টাকা নিয়ে কী লাভ তোর? তোর তো টাকার অভাব নেই। ”
“ তখন তো নিজেই লাফিয়ে লাফিয়ে বলেছিলি এখন টাকা বের করতে সমস্যা কী? ”
অনিলের কথার উত্তর করতে পারলো না নিরব। এর আগেই সেখানে হীরা ও আনিকা উপস্থিত হলো।
“ কী হয়েছে? ”
হীরার কন্ঠ পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ পেলো নিরব। সে কিছুটা অসহায়ত্বের ভাব করে বললো,

“ ভাবি দেখুন না, ওঁ শুধু আপনাকে একটু ঘুরে ঘুরে দেখেছে এর জন্য নাকি ওঁকে আমি ৫০০০ টাকা দিতে হবে। ”
ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেলো হীরার, চোখ ছোটো ছোটো করে তাকালো অনিলের দিকে। অনিল অগ্নিদৃষ্টিতে নিরবের দিক তাকিয়ে আছে হীরা সামনে না থাকলে হয়তো এতক্ষণে একটা ঝড় বয়ে যেতো তার উপর দিয়ে। অনিলের এমন অগ্নিমূর্তি তে বেশ মজা পেলো নিরব। “ বেচারার মেইন পয়েন্টে হাত দিয়েছি” কথাটি ভেবেই ভিতরে ভিতরে হেসে কুটি কুটি খাচ্ছে সে। বাকিরা তাদের কান্ড দেখে মুখ চাপা দিয়ে হেসে যাচ্ছে। সহসা অনিলের পকেটে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠতেই সম্বিৎ ফিরল অনিলের। ফোন বের করে স্ক্রিনে থাকা নাম্বারটি দেখে সবার উদ্দেশ্যে বললো,
“ গাইস আ’ম স্যরি, আমাকে এখন যেতে হচ্ছে আমি আর খেলায় অংশগ্রহণ করতে পারছি না। ”
বলেই এক মুহুর্ত ও অপেক্ষা না করে ধুপধাপ পা ফেলে স্থান ত্যাগ করলো সে কাউকে কিছু বলার সুযোগ ও দিলো না। তার যাওয়ার পানে চেয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো নিরব। যাক বাবা সে বেঁচে গেলো। অনিল যেতেই হীরা ও আনিকা সবার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলো, “ কী হয়েছে” উত্তরে সকলে এসেই একসাথে বললো, “ আরে এমনেই ভাইয়ার সাথে মজা করছিলাম। ”

“ হাতের মাঝে ভাইয়ার নাম লিখে দে ”
হীরার হাতে মেহেদি পড়ানোরত ইতির উদ্দেশ্যে কথাটা বললো আনিকা। তার কথায় ইতি হীরার দিক চাইলো। বুঝতে চাইলো হীরার অভিব্যাক্তি, হীরা নিশ্চুপ হয়ে আছে কিছুই বলছে না দেখে তা সম্মতির লক্ষণ ভেবে তার হাতের মাঝ বরাবর অনিলের নামটি লিখে দিলো ইতি। নিজের হাতের তালুতে “অনিল+হীরা” লিখাটার মধ্যে নজর পরতেই কেমন যেন একটা অন্যরকম অনুভূতি হলো হীরার। নাম না জানা এই অনুভূতির সাথে অনেক আগে থেকেই পরিচয় হয়েছে তার। তবে এখনো তার নাম শনাক্ত করতে সক্ষম হয়নি সে। হৃদয় জুড়ে একটা নাম বার বার নাড়া দিলেও সেই নামটি মুখে আনার সাহস পায়নি সে। তার ভাবনার মাঝেই মেহেদি লাগানো শেষ হয়ে গেলো ইতির। তারপর আরেকজন এগিয়ে আসলে হীরা সরে গিয়ে তাকে বসার জায়গা করে দিলো। কিয়ৎক্ষণ আগে একে একে সব ছেলেরাই চলে গিয়েছিলো। তারা যেতেই মেয়েরা সবাই মেহেদি লাগাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ল। রীতি ব্যতিত তখন কেউই মেহেদি পড়েনি হাতে তাই এখন একে একে সবাই মেহেদি দিচ্ছে। আর সবার হাতে নিপুণ ভাবে নকশা করে তা দিয়ে দিচ্ছে ইতি। দীর্ঘ সময় পর মেহেদি দেওয়ার পর্ব শেষ করে কোমড় ব্যাথা নিয়ে থেমে থেমে উঠে দাঁড়ালো ইতি। তখন রাত প্রায় ৩ টার কাছাকাছি। সকলেই আস্তে আস্তে উঠে রওনা হলো যাওয়ার উদ্দেশ্যে।

” কিরে তোরা কখন আসবি? আর হীরার ফোন কোথায় জিজ্ঞেস করতো। ”
ছাদ থেকে এসে দুর্বল শরীরটা মাত্র বিছানায় হেলাতে নিচ্ছিলো আনিকা। অনিলের মেসেজে টি চোখের সামনে পরতেই বিদ্যুৎ বেগে উঠে পড়লো সে। মানে কি, হীরা রুমে যায়নি? তাহলে কোথায় ওঁ? দ্রুত পা চালিয়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে পড়লো সে। তখন আসার সময় হীরাকে না দেখে ভেবেছিলো হয়তো রুমে চলে গেছে তাই সে ও তেমন একটা গুরুত্ব না দিয়েই চলে এসেছিলো ছাদ থেকে। কোনো কিছু না ভেবেই পুনরায় ছাদের দিক ছুট লাগালো সে। তাকে এভাবে ছুটতে দেখে ইতিও তার সাথে ছুট লাগালো। আনিকার সাথে এক রুমেই শুতে নিচ্ছিলো সে। তবে আনিকাকে এভাবে হন্তদন্ত হয়ে বেরোতে দেখে তার ও আর ঘুম হলো না। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে এক সময় কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছেই চারদিক চোখ বুলালো আনিকা। আতঙ্কিত কণ্ঠে মুখে আনলো প্রিয় সেই নামটি,

“ হীরা, হীরা এখানে আছো তুমি? ”
কোনো সাড়াশব্দ নেই, নিস্তব্ধ রাত, চারপাশ থেকে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া কিছুই কানে এলো না তাদের। গলাটা খানিক শুকিয়ে এলো আনিকার।
“ ভাবী রুমে যায়নি? ”
ভয় ভয় কণ্ঠে আনিকার উদ্দেশ্যে প্রশ্নটা করলো ইতি। জবাবে দুদিকে মাথা নাড়ালো আনিকা।
“ মনে হয় নিচে আছে।”

বলেই দুজনে দেরি না করে নিচে নামতে শুর করলো। মিনিটের মধ্যেই ধুপধাপ পা ফেলে নিচে নেমে রান্নাঘর থেকে শুরু করে সব জায়গায় খুঁজেও যখন হীরার খুঁজ মিললো না তখন পা জোড়া ধরে আসলো আনিকার। ইতিমধ্যে নিচের সকলেই জেনে গেছে হীরার নিখুজ হওয়ার কথা। নিরব মাত্র বন্ধুদের এগিয়ে দিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করছিলো। বাড়ির সকলের চিন্তিত মুখ বিশেষ করে আনিকার শুকনো মুখটা নজরে আসতেই ধক করে উঠল তার বুকটা। সাথে সাথেই আনিকার সামনে এসে জিজ্ঞেস করলো,

“ কিরে কুটনি বুড়ি মুখের দশা এমন কেন? কিছু হয়েছে? ”
“ হীরা ভাবী কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ”
পাশে থাকা ইতির মুখ থেকে কথাটা শুনে নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না সে। নিজেকে যথেষ্ট স্বাভাবিক রেখে বললো,
“ অনিল জানে? ”
জবাবে অশ্রুসিক্ত নয়নে নিরবের দিক তাকিয়ে দুদিকে মাথা নাড়ালো আনিকা। তৎক্ষনাৎ কোনো শব্দ ব্যয় না করে অনিলের রুমের দিক হাঁটা ধরলো সে। বাকিরা সবাই তখনো যে যার মতো হীরাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

হাঁটতে হাঁটতে রুমের মধে কারো সাথে কথা বলায় ব্যাস্ত ছিলো অনিল। তখনই হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকলো নিরব। ঘরে ঢুকেই বারান্দা থেকে শুরু করে ওয়াশরুম অব্দি সকল জায়গা চেক করতে লাগলো। তার এমন কাণ্ডে ফোনের অপর পাশের ব্যাক্তিটিকে পরে ফোন করবে বলে ফোন কেটে দিলো অনিল। তারপর এদিক সেদিক ছুটতে থাকা নিরবের উদ্দেশ্যে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
“ কিরে কাকে খুঁজছিস? ”
“ ভাবীকে। ”
“ ওঁ তো ছাদে। ”
“ ছাদে নেই। এমনকি বাড়ির কোনো জায়গায়ই পাওয়া যাচ্ছে না। ”
কথাটা শুনে অনিল তেমন একটা প্রতিক্রিয়া করলো না। উল্টো কপাল কুঁচকে বললো,
“ আর ইউ কিডিং উইথ মি? ”
“ নারে ভাই সত্যি সত্যিই ভাবীরে পাওয়া যাইতাছে না। ”
অপ্রত্যাশিত এই জবাবটি অনিলের কর্নকুহুর হতেই ছোটো খাটো একটা বজ্রপাত যেনো পড়লো অনিলের মাথায়। আপনা আপনিই দু- কদম পিছিয়ে গেলো পা জোড়া, ফ্লুরে ঝনঝন শব্দ করে হাত ফসকে পরে গেলো হাতে থাকা ফোনটা।

নিস্তব্ধ রাত, চতুর্দিক ঘিরে বিরাজ করছে নীরবতা। এমন নিঃশব্দ রাতের মাঝেই রীতিদের বাড়িতে চলছে আহাজারি। চোখ বেয়ে ঝর ঝর করে পানি নির্গত হচ্ছে আনিকার। সামনেই অনিল হাঁটু গেড়ে বসে আছে আর জিজ্ঞেস করছে,
“ হীরাকে শেষ কোথায় দেখেছিলি ভাইয়াকে খুলে বল সব। ”
অনিলের কথার কান্নাভরা কণ্ঠে থেমে থেমে পুরো ঘটনা খুলে বললো আনিকা। বলতে বলতেই আবারও ডুকরে কেঁদে উঠলো। তার নিজেকে অনেক অপরাধী মনে হচ্ছে। সে যদি হীরার দিক ভালো করে খেয়াল রাখতো তাহলে হয়তো এমনটা হতো না। নাজিয়া বেগম বারবার করে বলেছিলেন বিয়ের প্রথম বছরে মেয়েদের রাত বিরাতে বাইরে থাকা ভালো নয়, হীরার পাশে পাশে থাকিস। “আচ্ছা হীরাকে খারাপ কোনো কিছু এ নিয়ে গেলো না তো?” তার ভাবনার মাঝেই অনিল আবারও প্রশ্ন ছুড়লো,

“ ছাদে ভালো করে দেখেছিলি? ”
জবাবে উপর নিচ মাথা নাড়ালো আনিকা। পাশে থাকা ইতি বললো,
“ অনেকবার ডাক ও দিয়েছি কোনো উত্তর পায়নি। ছাদে থাকলে অবশ্যই শুনতো। ”
তার কথায় আর কিছু বললো না অনিল। ধুপধাপ পা ফেলে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে পড়লো। তার পিছন পিছন নিরব ও ছুটলো। বাড়ির সামনে পিছনে আশেপাশে যত যায়গা আছে সব জায়গায় দেখলো। তবে কোনো চিহ্ন ও পাওয়া গেলো চল হীরার। বাড়ির পিছনের দিকটায় ধপ করে বসে পড়লো অনিল। আর পারছে না সে এতক্ষণ সবার সামনে নিজেকে যথেষ্ট স্বাভাবিক রাখলেও এখন বুক কাঁপছে তার, নিশ্চল হয়ে পরছে হাত পা, চোখ গুলো জ্বলছে ভীষন, ভেঙে আসছে কণ্ঠনালী। ভাঙ্গা গলায় আবারও বহু কষ্টে উচ্চারণ করলো সেই নামটি,

“ হী..রা, হয়্যার আর ইউ? প্লিজ স্পিক আপ ড্যাম ইট। আই ওয়ান্ট টু লিসেন ইউর ভয়েস, প্লিজ আনসার মি- হয়্যার আর ইউ? ”
বারবার নিজের শব্দের প্রতিধ্বনিই কানে আসলো তার অন্য কোনো শব্দের অস্তিত্বও উপলদ্ধি করতে পারলো না। কিয়ৎক্ষণ এভাবেই কাটলো তারপর ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ালো সে। চললো বাড়ির ভিতর।

নিজের অসহ্য ভারী শরীরটাকে নিয়ে যখন ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করলো অনিল তখনি দৌঁড়ে আসলেন নাজিয়া বেগম। বললেন,
“ কিরে পেলি? ”
প্রশ্নটা করে নিজের ছেলের করুন দৃষ্টির দিক তাকিয়েই উত্তর পেয়ে গেলেন তিনি। অনিল কোনো শব্দও না করেই হাঁটা ধরলো, বড়ো বড়ো পা ফেলে চললো ছাদের দিক। প্রতিটা পদক্ষেপে তার মস্তিষ্ক জুড়ে চললো একটাই আবেদন- উপরে গিয়ে যেন সেই স্নিগ্ধ মুখটা দেখতে পায় সে, যে করেই হোক সৃষ্টিকর্তা যেন তার ঐ স্নিগ্ধ অবুঝ পাখিটাকে তার কাছে ফিরিয়ে দেয়। রোজ রোজ ঐ মিষ্টি মুখ খানায় “ডাক্তার সাহেব” ডাকাটি শুনার জন্য হলেও ঐ অবুঝ পাখিটাকে তার চাই। ক্ষণে ক্ষণে তার অবুঝপনামিতে মত্ত করার জন্য হলেও তার ঐ অবুঝ কিশোরীটিকে চাই।
এক পর্যায়ে অফুরন্ত এই যাত্রাপথ শেষ করে ছাদে প্রবেশ করলো অনিল। ভয়,আতঙ্ক, ও এক রাশ শূন্যতা নিয়ে সে পা বাড়ালো ছাদের ভিতর।

পুরো ছাদ জুড়ে আলো বিরাজমান। তবে একপাশে গাছ থাকায় সেদিকটায় আলো পৌঁছাতে পারে নি। সেদিক টাই গেলো অনিল। ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে দেখলো চারিপাশ- নাহ, এখানেও কেউ নেই! থমকে গেল অনিল। আর পারছে না দিশেহারা লাগছে তার আঁখিযুগল না চাইতেও ঘোলা হয়ে উঠছে। সেখান থেকে আসতে নিয়েও থামলো সে। অদূরে থাকা পানির ট্যাংক এর দিকে নজর গেলে অবশ পা দুটো নিয়ে হাঁটা ধরলো সেদিকে। ট্যাংক টার কাছে গিয়ে পা কাঁপছে তার, হৃদস্পন্দন কেমন যেন থেমে থেমে যাচ্ছে। ট্যাংক এর পাশে ফ্ল্যাশ মারতেই সেখানে দৃশ্যমান হলো এক কিশোরীর ঘুমন্ত মুখশ্রী। ট্যাংকের সাথে হেলান দিয়ে ঘুমের রাজ্যে মগ্ন হয়ে আছে সে। দ্রুত এগিয়ে গেলো অনিল, ঘুমন্ত কিশোরীর সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পরলো ধপাস করে। অজান্তেই নিজের কঠোর পূরুষ চোখ থেকে গড়িয়ে পরলো এক ফোঁটা জলবিন্দু।

“ ওহে কিশোরী, বড্ডো অবুঝ তুমি,
তোমার এই অবুঝ তুমিটার পাল্লায় পড়ে আরেকটু হলে আজ নিঃস্ব হয়ে যেতাম আমি। ”
হীরার দিক ঝুঁকে শান্ত স্বরে বলে উঠলো অনিল। কিয়ৎক্ষণ অপলক তাকিয়ে থাকলো ঐ স্নিগ্ধ মুখ পানে। অতঃপর সেও হীরার পাশে হেলান দিয়ে বসে পড়লো। আনিকার ফোনে মেসেজে করে জানিয়ে দিলো হীরাকে পেয়েছে। সাথে আরও বলেছে হীরা ঘুমিয়ে আছে তাকে নিয়ে যেতে হবে- নিচের সবাইকে সামাল দিতে।

“ আম্মু হীরাকে পাওয়া গেছে। ”
নিচে আনিকার মুখ থেকে বের হওয়া কথাটা কর্ণপাত হতেই সকলে একসাথে তার দিক তাকালো। সকলের মুখেই হাসির রেখা ফুটে উঠলো। সকলেই একসাথে বলে উঠলো,
“ কোথায়? কোথায় পাওয়া গেছে? ”
“ ছাদেই ছিলো পানির ট্যাংক এর পিছনে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে তাই দেখতে পাইনি আমরা। ”
“ জামাই বউ দুইটাই এক। মানুষরে পাগল বানানোর সব টেকনিকে ডিগ্রী করে রেখেছে এরা। ”
বিড়বিড় করে কথাটা বলেই নিজের রুমের দিক হাঁটা ধরলো নিরব। পিছন থেকে আনিকা চিল্লিয়ে উঠলো,
“ এই এই কোথায় যাচ্ছো তুমি? হীরা তো ঘুমাচ্ছেই এখন ছাদে গিয়ে কী লাভ তোমার? ”
“ ছাদে যাইনারে বইন , রুমে যাই রুমে! যাবি? ”
তার কথায় ভেঙচি কাটলো আনিকা। দীর্ঘশ্বাস ফেললো নিরব। এতক্ষন ভাইয়ের বউয়ের জন্য কী মরা কান্নাই না কাঁনছে! যেনো ওঁর ভাইয়ের বউ না নিজের জামাই হারায় গেছে। আবার এখনি হাসির শেষ নেই, সবই ভাইবোনের আজব কান্ডকীর্তি।

হীরাকে কোলে করে নিচে নামছে অনিল। ঘুমের মাঝে নিজের শরীরের নড়চড় অনুভব করে অনিলের গলা শক্ত করে আকড়ে ধরলো হীরা। অনিলের বুকে পুরো বিড়াল ছানার মতো গুটিয়ে গিয়ে আবারও মগ্ন হলো ঘুমে। তার কান্ড দেখে কিঞ্চিৎ ঠোঁট দুটো প্রসারিত হলো অনিলের। মন চাইলো হীরাকে আরেকটু নড়াতে, করলো ও তা। এইবার হীরা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো অনিলকে। এরপর তাকে আর বিরক্ত করলো না অনিল।চেয়ে রইলো ঐ ঘুমন্ত কিশোরীর পানে। বুকটা প্রশান্তিতে ছেয়ে যাচ্ছে তার। এতক্ষনের সব গ্লানি মুছে গেছে নিমিষেই। রুমের ভেতর প্রবেশ করে হীরাকে আস্তে আস্তে বিছানায় শুইয়ে দিলো সে। হীরাকে শুইয়ে তার দুপাশে হাত রেখে তার উপর ঝুঁকে আছে অনিল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে হীরাকে। কিয়ৎক্ষণ এভাবেই তাকিয়ে থেকে বলে উঠলো,

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ১৯+২০

“ সবাই নাকি ঘুমন্ত নারীর প্রেমে পড়ে অথচ
আমার যে তোমার জাগ্রত তুমিটাকেই বেশি ভালো লাগে
যে সারাক্ষণ শুধু অবুঝপনামিই করে যায় আমার সামনে। ”

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২৩+২৪