Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২৪

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২৪

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২৪
রিদিতা চৌধুরী

বিকেলের ম্লান আলো এসে রিদির জানালার গ্রিলে ধাক্কা খাচ্ছে। বাইরের পাখিগুলোর কিচিরমিচির আওয়াজ বিকেলের নিস্তব্ধতা ভাঙছে, কিন্তু রিদির ঘরের ভেতর সময় যেন থমকে আছে। রিদির তলপেটের সেই তীব্র যন্ত্রণাটা এখন খানিকটা কমে এসেছে; সৌহার্দ্যের বুকের উষ্ণ স্পর্শে সে এখন আরমে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।
​ঠিক এই সময়েই শাহেদা চৌধুরী রিদিকে খুঁজতে খুঁজতে দোতলায় উঠে এলেন। কলেজ থেকে ফেরার পর থেকে রিদিকে তার চোখে পড়েনি, তাই একটু চিন্তিত ছিলেন তিনি। দরজার সামনে এসে হাতলটা আলতো করে ঘোরাতেই দেখলেন, দরজাটা ভেজানো।
​ঘরের ভেতরের দৃশ্যটা দেখে শাহেদা চৌধুরীর পায়ের নিচে যেন মাটি স্থির হয়ে গেল। নীলচে মৃদু আলোয় বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে আছে সৌহার্দ্য আর রিদি। সৌহার্দ্যের হাতের ওপর মাথা দিয়ে রিদি তার নিজের এক হাতে সৌহার্দ্যের গলাটা পেঁচিয়ে ঘুমিয়ে আছে। সৌহার্দ্যের আর একটা হাত রিদির চুলের ভাঁজে আলতো করে রাখা; চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ওভাবেই বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে সে। দুজনেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
​ছেলের এই রূপ, এই কোমলতা—যা তিনি এতদিন ভাবতেই পারেননি—তা আজ প্রত্যক্ষ করে শাহেদা চৌধুরীর চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। এক পরম তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। তিনি কোনো শব্দ না করে সন্তর্পণে দরজাটা আবার আগের মতো চাপিয়ে দিয়ে নিচে চলে এলেন। মনে মনে কেবল দোয়া করলেন, এই সুখ যেন চিরস্থায়ী হয়।

সন্ধ্যা প্রায় ছয়টার কাছাকাছি। হঠাৎ সৌহার্দ্যের ফোনটা তীব্র শব্দে বেজে উঠতেই নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল। বিরক্তিতে কপালে ভাঁজ ফেলে বিছানা হাতড়ে ফোনটা নিয়ে দ্রুত কলটা কেটে দিল সে। পরক্ষণেই রিদির দিকে তাকাতে তার বিরক্তি মুহূর্তেই কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেল। মেয়েটা তখনও ওর গলা জড়িয়ে ধরে নিষ্পাপ শিশুর মতো ঘুমাচ্ছে। রিদিকে সরিয়ে দেওয়ার মতো নিষ্ঠুরতা সে করতে পারল না, বরং ওকে ওভাবেই আলতো করে জড়িয়ে ধরে রেখে সে পুনরায় ফোনটা কানে তুলল। ওপাশ থেকে কিছু একটা শোনা মাত্রই অত্যন্ত পেশাদার ও শান্ত কণ্ঠে বলল, “গেট দ্য ওটি রেডি, আই’ল বি দেয়ার ইন অ্যাবাউট অ্যান আওয়ার।” বলেই লাইনটা কেটে দিল।

​সৌহার্দ্য কিছুক্ষণ পর রিদিকে খুব সাবধানে নিজ থেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইল, কিন্তু ঘুমের ঘোরে রিদি যেন ওকে আরও আঁকড়ে ধরল—যেন এই মানুষটার মাঝেই সে তার সমস্ত নিরাপত্তার আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। সৌহার্দ্য নিজের হাতটা রিদির চুলের ভাজে গলিয়ে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিল, তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে অতি নিচু স্বরে ডাকল, ” বোচা নাক, গেট আপ। কিছু খেতে হবে।”
​হঠাৎ সৌহার্দ্যের গলার আওয়াজ কানে যেতেই রিদি ধড়ফড়িয়ে জেগে উঠল। নিজের অস্তিত্ব আর সৌহার্দ্যের সাথে সেই নিবিড় নৈকট্য অনুভব করতেই লজ্জায় তার সমস্ত শরীর উত্তপ্ত হয়ে উঠল। দ্রুত নিজেকে সরিয়ে নিতে চাইলে সৌহার্দ্য একটা বাঁকা বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তাকাল, “এমন বানরের মতো জাম্পিং দিচ্ছ কেন, স্টুপিড? খেয়ে ফেলব আমি তোমাকে?”

​রিদি কোনো উত্তর করতে পারল না। তার লজ্জা যেন আজ সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গেছে। সারাদিন এই অসভ্য লোকটার সামনে যে পরিমাণ লজ্জায় পড়তে হলো, তা ভাবতে গিয়েই তার গাল দুটো রক্তিম বর্ণ ধারণ করল। রিদির এই লাজুক রূপ দেখে সৌহার্দ্য বিছানা ছেড়ে উঠতে উঠতে বিরক্ত হয়ে নির্বিকার কণ্ঠে বলল, “এইটুকুতেই এই অবস্থা? এমন হলে তো আমার ট্যাবলেট গুলো দুনিয়াতে এসে আমাকে ‘পাপা’ না ডেকে ‘দাদা’ ডাকবে, স্টুপিড!” কথাটা বলেই সে আর কোনো দিকে না তাকিয়ে বেরিয়ে গেল।
​সৌহার্দ্যের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রিদি মুখটা বাঁকিয়ে আপনমনে বিড়বিড় করে উঠল, “ছিঃ! অসভ্য লোক! বউই তো মানে না, আবার কথায় কথায় বাচ্চার চিন্তা করে। দুনিয়াতে আসার আগেই ওদের কিসব আজব নাম দিচ্ছে! বজ্জাত কোথাকার!”

​নিজের মনে অভিযোগ করতে করতে বিছানা থেকে নামার সময় তার চোখ পড়ল পাশে রাখা বড় একটা প্যাকেটটার ওপর। কৌতূহলবশত প্যাকেটটা খুলতেই রিদির চোখ কপালে ওঠার জোগাড়—এই লোক যেন আস্ত একটা চকলেট আর চিপসের দোকানই ওর জন্য নিয়ে এসেছে! তাও আবার ঠিক সেই ফ্লেভারের চিপসগুলোই যা রিদির সবচেয়ে প্রিয়। সৌহার্দ্য কীভাবে জানল তার পছন্দের কথা? রিদির মনটা অদ্ভুত এক ভালো লাগায় ভরে গেল। কিন্তু এখনই এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই; শরীরটা এখনো বেশ নাজেহাল। নিজেকে একটু সতেজ করার জন্য দরকার, প্রয়োজনীয় জিনিস আর পোশাক নিয়ে রিদি বাথরুমের দিকে পা বাড়াল।
রাত প্রায় আটটা। রিদি খাবার টেবিলে বসে রাতের খাবার খাচ্ছিল, আর সোফায় বসে রিভা তন্ময় হয়ে টিভি দেখছিল। হঠাৎ কলিং বেলের তীক্ষ্ণ শব্দে বাড়ির নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল। হাতের খাবার নামিয়ে রেখে রিদি দরজার দিকে এগিয়ে যেয়ে দরজা খুলতেই তার গলার কাছে শব্দটা আটকে গেল—সামনের দৃশ্য দেখে সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

​দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে আরবান, আর তার পাশে পৃথা। পৃথার চোখ-মুখ ফুলে লাল হয়ে আছে, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সে অনেকক্ষণ ধরে কেঁদেছে। এত রাতে আরবান আর পৃথাকে একসাথে, তাও এমন বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে রিদির মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে পৃথাকে একহাতে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরল। আরবান-এর দিকে তাকিয়ে শশব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “ভাইয়া, কী হয়েছে? ওকে কোথায় পেয়েছ? ওর এমন অবস্থা কেন?”
​রিদির প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে আরবান বিরক্তিতে মুখটা ফিরিয়ে নিল। তার চোখেমুখে এমন এক আগ্নেয়গিরির মতো রাগ যে, রিদি আর দ্বিতীয়বার কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না। পৃথাকে নিয়ে সে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল। তখনি চেঁচামেচিতে বাড়ির সবাই দ্রুত ড্রয়িং রুমে এসে জড়ো হলো। সারহান চৌধুরী আরবান-এর দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “মেয়েটা কে? তোমার সাথে কেন?”
​রিমা চৌধুরী মাত্রই ঘরে ঢুকেছিলেন, কিছু বলার জন্য মুখ খুললেন, কিন্তু তার আগেই আরবান গলার স্বর নামিয়ে, অথচ তীব্র বিরক্তি আর রাগের সংমিশ্রণে বলে উঠল, “বিয়ে করেছি ওকে। ও এখন আমার স্ত্রী…”
​আরবান-এর কথা শেষ হওয়ার আগেই রিমা চৌধুরী যেন তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন। ছেলের দিকে তেড়ে গিয়ে তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “কোথা থেকে কোন ফকিন্নি ধরে নিয়ে এসেছিস তুই? আমার বোনকে আমি কথা দিয়েছি শিফাকে তোর বউ করব, আর তুই কাউকে না জানিয়ে এমন একটা ফকি—”
​রিমা চৌধুরীর অশালীন শব্দটা শেষ হওয়ার আগেই সারহান চৌধুরী গর্জে উঠলেন, “আহ্ রিমা! চুপ করবে তুমি?”

​কিন্তু রিমা চৌধুরী আজ বাঁধনহারা। তিনি ওনার কথাকে দুই পয়সার গুরুত্বও দিলেন না, বরং আরও তীব্র আক্রোশে গর্জে উঠলেন, “কেন চুপ করব আমি ভাইজান? এই বাড়ির ছেলেগুলোর কপালে কেন সব বেজন্মা আর ফকির-মিসকিন জুটছে…”
রিমা চৌধুরীর ওই অপমানজনক শব্দগুলো ঘরের বাতাসে এক বিষাক্ত বাতাবরণ তৈরি করল। শাহেদা চৌধুরী যেন বজ্রাহতের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, কিন্তু পরক্ষণেই তার সমস্ত শরীর রাগে থরথর করে কেঁপে উঠল। তিনি রিমা চৌধুরীর দিকে আঙুল উঁচিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠলেন, “ছোট, তোর অনেক কিছু আমি সহ্য করেছি, কিন্তু ওই ব্যাপারে একটা শব্দও উচ্চারণ করবি না! সাবধান, এর পরের বার ওই নোংরা শব্দটা মুখ থেকে বের হলে পরিণাম খুব ভয়াবহ হবে!”

​শাহেদা চৌধুরীকে এতটা রুদ্রমূর্তিতে সচরাচর দেখা যায় না। তার কণ্ঠে এমন এক কঠোরতা ছিল যে উপস্থিত সবাই যেন এক মুহূর্তের জন্য জমে গেল। রিদি ভয় পেয়ে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে শাহেদা চৌধুরীর হাত চেপে ধরল, “আম্মু, প্লিজ! শান্ত হোন, আপনার শরীর খারাপ করবে!”
​এসব হইচইয়ের মাঝে সারবান চৌধুরী অত্যন্ত বিরক্ত ভঙ্গিতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল, “সবাই শান্ত হও। যেটা হওয়ার তা হয়ে গেছে, নতুন করে অশান্তি করে কোনো লাভ নেই।”
​ সারবান চৌধুরীর এই উদাসীনতায় রিমা চৌধুরীর জিদ যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। তিনি রাগে গজগজ করতে করতে বললেন, “আমি এই বিয়ে মানি না! কিছুতেই না!”—বলে দাপাদপি করতে করতে তিনি সেখান থেকে চলে গেল। তার পিছু পিছু আরবানও কারো দিকে তাকানোর প্রয়োজন বোধ না করে সোজা নিজের রুমের দিকে চলে গেল।

​ঘরটা মুহূর্তেই থমথমে হয়ে এল। এক কোণে জড়সড় হয়ে বসে কাঁদছিল পৃথা, আর রিদি পরম মমতায় তাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। সারহান চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিদির দিকে তাকিয়ে বললেন, “রিদি, ওকে তোর রুমে নিয়ে যা “মা”। এখন সব কথা শোনার সময় নয়, পরে সব শোনা যাবে।” বলেই তিনি ভারী পায়ে সেখান থেকে চলে গেলেন।
​রিদির মনের ভেতর তখন হাজারটা প্রশ্ন—কীভাবে কী হলো? আরবান আর পৃথার জীবনে এমন কী ঘটে গেল যে আজ এই পরিস্থিতি কখনো ওদের সম্পর্ক আছে মনে হয়নি, তাহলে কি হলো? কিন্তু পৃথার ফ্যাকাসে মুখ আর চোখের জল দেখে রিদির বুকে মোচড় দিয়ে উঠল; এখনই কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস তার হলো না। মনের কৌতূহল মনেই চেপে রেখে, পৃথার হাত ধরে সে আলতো করে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল।

​ফ্ল্যাশব্যাক:
​হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে হঠাৎই একটা তীব্র ব্রেক কষে গাড়ি থামাল আরবান। তার চোখের সামনেই অন্ধকারে কেউ একজন প্রাণপণে দৌড়ে এসে তার গাড়ির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে দ্রুত গাড়ি থেকে বের হতে, একজোড়া কাঁপতে থাকা হাত তার শার্টের কলার আঁকড়ে ধরে আর্তনাদ করে উঠল, “প্লিজ ভাইয়া! বাঁচান আমাকে! ওই জানোয়ারগুলোর হাত থেকে আমাকে বাঁচান!”
​আবছা আলোয় নিজের বুকের ওপর লেপ্টে থাকা মেয়েটিকে ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে আরবান তার দিকে তাকাতেই ভ্রু কুঁচকে গেল। মেয়েটিকে ঠিক কোথায় যেন দেখেছে, মনে করতে পারছে না সে। ওর ভাবনার মাঝেই কয়েকটা বখাটে ছেলে ধেয়ে এল, একজন খিস্তি মেরে বলে উঠল, “হিরো সেজে লাভ নাই, ব্রো! মালটাকে আমাদের হাতে তুলে দে, চাইলে তুই ও ভাগ নিতে পারিস।”
​কথাটা কানে যেতেই আরবানের ভেতরে সুপ্ত আগ্নেয়গিরিটা যেন জ্বলে উঠল। কোনো কথা না বলে তেড়ে গিয়ে সে ছেলেটার কলার চেপে ধরে মুহূর্তের মধ্যে কয়েকটা সজোরে ঘুসি বসিয়ে দিল। ছেলেগুলো দল বেঁধে আক্রমণ করলেও আরবান দমার পাত্র নয়। ছোটবেলা থেকে ক্যারাটেতে চ্যাম্পিয়ন সে, হাত-পায়ের প্রতিটি চাল যেন নিখুঁত। মুহূর্তের মধ্যে বখাটেদের কয়েকজনকে আধমরা করে দিল সে, বাকিরা ভয়ে চম্পট দিল।
​ধুলো ঝেড়ে আরবান মেয়েটির দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল, “নাম কী? বাসা কোথায়? পৌঁছে দিই। আর এত রাতে রাস্তায় কী করছো?”
​পৃথা তখনও ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। আমতা আমতা করে সে বলল, “আমি… আমি বাড়ি ফিরব না ভাইয়া। আমার মামি… আমার মামি একটা বুড়ো লোকের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছে। আমাকে জোর করে—”

পুরো ​কথা শেষ করার আগেই ওই বখাটেদের ডেকে আনা স্থানীয় কিছু লোক হইচই বাধিয়ে দিল। তারা আরবান ও পৃথার দিকে আঙুল উঁচিয়ে মিথ্যে অভিযোগে চিৎকার শুরু করল, “এই ছেলে এই মেয়েকে নিয়ে নোংরামি করছিল! আমরা বাধা দেওয়ায় আমাদের মেরে এই অবস্থা করেছে!”
​আরবান তেড়ে যেতেই মুরব্বি নামধারী লোকগুলো আরও জোরালো প্রতিবাদ শুরু করল। তাদের চিৎকার, মানুষের ভিড় আর পরিস্থিতি ক্রমে হাতের বাইরে চলে যাচ্ছিল। আরবান কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে কোণঠাসা করা হলো। একে তো সে একজন ডাক্তার, সমাজের চোখে তার পারিবারের সম্মান অনেক উঁচুতে—এই স্ক্যান্ডাল তার ক্যারিয়ার ও পরিবারের সম্মান দুটোই ধুলোয় মিশিয়ে দিবে। আর অন্যদিকে, পৃথার সেই অসহায় কান্নারত মুখটা আরবানের কঠিন হৃদয়ে কেমন এক মায়ার দাগ কাটল। সে বুঝতে পারল, এই মেয়েটিকে এখন একা ছেড়ে দেওয়া মানে তাকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়া। পরিস্থিতির চাপে, কোনো উপায় না দেখে একপ্রকার বাধ্য হয়েই সে বিয়েটা করল।
​পৃথার জীবনের গল্পটা অনেক আগে থেকেই বিষাদময়। দশ বছর বয়সে মাকে হারানোর পর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সৎ মায়ের অকথ্য নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সে মামার আশ্রয়ে এসেছিল। কিন্তু সেখানেও শান্তি জোটেনি। মামা স্নেহশীল হলেও মামি তাকে কাজের মেয়ের মতো অবহেলা করত, প্রতিমুহূর্তে কটু কথা আর খাবারের খোঁটা শুনতে হতো। শেষমেশ টাকার লোভের বশবর্তী হয়ে তিন বাচ্চার এক বুড়োর সাথে বিয়ে ঠিক করলে পৃথা অজানার উদ্দেশ্যে পালিয়ে আসে, আর ঠিক তখনই পড়ে ওই বখাটেদের খপ্পরে।

বর্তমান
নিজের রুমে এসে পৃথার মুখ থেকে সবটুকু শোনার পর রিদি পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। পৃথা যখন ঝরঝর করে কেঁদে সব খুলে বলছিল—কীভাবে মামি তাকে টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়ার ফন্দি এঁটেছিল, কীভাবে সে রাতের অন্ধকারে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে এসেছিল—রিদির বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল।
​রিদি জানত পৃথার পরিবার খুব একটা স্বচ্ছল নয়। পৃথা বেশ কয়েকটা প্রাইভেট পড়াতো, পড়াশোনায় অসাধারণ মেধাবী হওয়ায় কলেজ থেকেও অনেক সুযোগ-সুবিধা পেত। কিন্তু পারিবারিক টানাপোড়েন বা মামার বাড়ির অকথ্য নির্যাতনের কথা পৃথা কোনোদিনও রিদিদের কাছে প্রকাশ করেনি। যে মেয়েটা সারাক্ষণ হাসিখুশি থাকত, অকারণে দুষ্টুমি করে সবাইকে মাতিয়ে রাখত—তার ওই হাসির আড়ালে যে এতটা হাহাকার আর যন্ত্রণার সমুদ্র লুকানো ছিল, তা রিদি কল্পনাও করতে পারেনি।
​রিদির নিজের কাছে নিজেকে আজ খুব ছোট মনে হচ্ছে। এত কাছের বন্ধু হয়েও সে কেন পৃথার চোখের গভীরের সেই চাপা কান্নাটা পড়তে পারল না? যে মেয়েটা নিজের বুকভরা কষ্ট চেপে রেখে রিদির যেকোনো বিপদে পাশে এসে দাঁড়াত, রিদি যখন ভেঙে পড়ত—পৃথা ,সুমি তাকে সান্ত্বনার চাদরে জড়িয়ে রাখত। অথচ সেই মেয়েটার এত চাপা কষ্ট ছিলো, রিদি কখনো টেরই পেলনা? আজ রিদির মনে হচ্ছে সে বন্ধু হিসেবে ব্যর্থ ।

​একরাশ অপরাধবোধ আর গভীর মায়ায় রিদির দুচোখ ভিজে এল। সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে কিচেন থেকে খাবার নিয়ে এল। পৃথার শুকনো, ফ্যাকাসে মুখটা দেখে রিদির বুকটা কেঁপে উঠল। সে আলতো করে পৃথার মুখে খাবারের তুলে খাইয়ে দিয়ে পৃথাকে ঘুমাতে বলে বের হলো! যাই হোক এখন তার একটু হলেও শান্তি লাগছে, এবার অন্তত তার ভাইয়ের কাছে ভালো থাকবে! আরবান কে সে চিনে রাগ পড়ে গেল সব ঠিক হয়ে যাবে!
​রাত প্রায় ১১টা। রিভা আর রিদি সোফায় বসে মগ্ন হয়ে বাইক রেসিং দেখছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই সৌহার্দ্য ঘরে প্রবেশ করল। কারো দিকে না তাকিয়ে সে ডাইনিং টেবিলের কাছে গিয়ে এক গ্লাস পানি ঢেলে সবেমাত্র মুখে দেবে, ঠিক তখনই তার কানে ভেসে এল তার বউয়ের সেই মিষ্টি কণ্ঠস্বর, “জানো রিভা, আমার না বাইকার ছেলেগুলোকে মারাত্মক ভালো লাগে! উফ, কি হ্যান্ডসাম…?”
​রিদির বাক্যটি শেষ হওয়ার আগেই সৌহার্দ্য হাতের গ্লাসটা ঠাস করে ডাইনিং টেবিলে রাখল। শব্দটা এতই তীব্র ছিল যে, রিদি আর রিভা দুজনেই চমকে উঠল। এতক্ষণ টিভিতে এত মগ্ন ছিল যে, সৌহার্দ্য যে কখন ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে, তারা টেরই পায়নি!

​সৌহার্দ্য এখন রাগে ফুঁসছে। তার রক্তচক্ষু যেন রিদিকে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার জন্য স্থির হয়ে আছে। রিদি ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না সৌহার্দ্য হঠাৎ এত ক্ষেপে গেল কেন! সৌহার্দ্য কোনো কথা না বলে রাগে তিরতিরে মেজাজ নিয়ে দুপদাপ পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল। এদিকে রিদি আর রিভা একে অপরের দিকে তাকিয়ে একদম আহাম্মক বনে বসে রইল।
সৌহার্দ্য রুমে ঢুকেই যেন আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। রাগে ও ক্ষোভে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। কোনো দিকে না তাকিয়েই সে দ্রুত হাতে ফোনটা বের করে ফারিসকে কল দিল। ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হওয়ার সাথে সাথেই সৌহার্দ্য কোনো ভনিতা না করে তপ্ত কণ্ঠে হুঙ্কার ছেড়ে বলল, “আধ ঘণ্টার ভেতরে আমার বাড়ির সামনে একটা বাইক চাই, দেশের মার্কেটে বর্তমানে হাইরেঞ্জ যেটা আছে, সেটাই!”
​এত রাতে সৌহার্দ্যের এমন অদ্ভুত আবদার শুনে ফারিস হতভম্ব। এমনিতেই আজ দলের অভ্যন্তরীণ ঝামেলায় তার মেজাজটা তুঙ্গে, তার ওপর সৌহার্দ্যের এই অযৌক্তিক বায়না শুনে সে বিরক্তি চেপে রাখতে পারল না। ফারিস টিপ্পনী কেটে বলল, “শালা! বউ তো মানিস না, এখন আবার কোন বেডিকে নিয়ে এত রাতে বাইকে ঘোরার শখ হলো তোর?”

​সৌহার্দ্যের চোখেমুখে এখন ঘোর বিরক্তি। সে দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর স্বরে শুধু বলল, “তোকে যেটা বলা হয়েছে, সেটা কর ইডিয়েট।” বলেই ‘ঠাস’ করে ফোনটা কেটে দিল সে।
​ওপাশে ফোনটা হাতের মুঠোয় নিয়ে ফারিস দাঁতে দাঁত চিপে গজগজ করতে লাগল, “শালা বেজা বিড়াল! সারহান চৌধুরী কী খেয়ে যে এমন অদ্ভুত একটা প্রোডাক্ট জন্ম দিয়েছে! মাথাটা পুরোপুরি আউলা!” সৌহার্দ্যকে মনে মনে গালমন্দ করতে করতে সে বাধ্য হয়েই হাইরেঞ্জ বাইকের সন্ধানে বের হয়ে গেল।
সৌহার্দ্য ফারিসের ফোনটা কেটে দিয়ে আগ্নেয়গিরির মতো অগ্নিমূর্তিতে নিচে নেমে এলো। রিদি আর রিভা তখনও টিভির সামনে সম্মোহিতের মতো বসে। সৌহার্দ্য কোনো কথা না বলে সরাসরি সোফার সামনে গিয়ে রিমোটটা নিয়ে ঠাস করে টিভিটা বন্ধ করে দিল। রিভার দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল, “এত রাতে না ঘুমিয়ে এসব কী দেখছিস? ঘুমাতে যা, স্টুপিড!”
​ভাইয়ের মেজাজ দেখে রিভা আর কোনো কথা বাড়াল না, বরং তড়িঘড়ি করে নিজের রুমের দিকে সরে পড়ল। রিভা চলে যেতেই সৌহার্দ্য তার জ্বলন্ত দৃষ্টি রিদির ওপর নিক্ষেপ করল। রাগী গলায় বলল, “পড়াশোনা বাদ দিয়ে এসব কী দেখছ? যাও, বই নিয়ে আমার রুমে এসো!”

​সৌহার্দ্যের এই হুকুম শুনে রিদির মেজাজও বিগড়ে গেল। সে রাগে গজগজ করতে করতে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “অসভ্য লোক! মুখে একটু মধু নিয়ে কথা বললে কি আপনার জাত যাবে?”
​রিদির কথা শুনে সৌহার্দ্য এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। সে ঠোঁট কামড়ে রিদির মাথা থেকে পা পর্যন্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে স্ক্যান করতে লাগল। রিদি তার এই রহস্যময় দৃষ্টির মানে বোঝার চেষ্টা করে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। হঠাৎ সৌহার্দ্য ওর দিকে একটু ঝুঁকে নেশালো, গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “শুধু মধু মিশিয়ে কথা না… মধু মিশিয়ে আরো অনেক কিছু করতে ইচ্ছে হয়? ইউ এগ্রি?” বলেই চোখ টিপে এক অদ্ভুত ইশারা করল সে।
​সৌহার্দ্যের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণে রিদি যেন পাথরের মতো জমে গেল। তার চোখেমুখে তখন লজ্জার মিশ্রিত ক্রোধ। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “লুচ্চা লোক! নজর ঠিক করুন, বেহায়া নির্লজ্জ ডাক্তার!”
বলেই সে হনহনিয়ে চলে যেতে চাইল। কিন্তু সৌহার্দ্য পেছন থেকে শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় ডেকে উঠল, “আমার খিদে পেয়েছে, খাবার দিয়ে যাও।”
​রিদি বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ফিরে বলল “আমাকে বউ মানেন না, আবার হুকুম করেন কেন? অসভ্য লোক!”

​সৌহার্দ্য তার দিকে এগিয়ে এল, একদম কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, “বউ মানলে তো আরো অনেক দায়িত্ব পালন করতে হবে, করতে পারবে সেগুলো?”
​সৌহার্দ্যের কথার গভীরতা এবং তার ছোঁয়া রিদির স্নায়ুতে এক তীব্র শিহরণ জাগাল। সে নাক-মুখ কুঁচকে দ্রুত রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। এই অসভ্য মানুষটার সাথে কথা বলা মানেই নিজেকে লজ্জার চরম সীমায় নিয়ে যাওয়া। ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজাতে সাজাতে সে দেখল সৌহার্দ্য এসে বসেছে। সৌহার্দ্য রিদির দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “খেয়েছ?”
​রিদি কোনো কথা না বলে শুধু ওপর-নিচ মাথা নাড়ল। খেতে খেতে সৌহার্দ্য নিস্পৃহ গলায় বলল, “কাল আমার সাথে ডাক্তারের কাছে যাবে। এত অস্বাভাবিক ব্যথা হওয়াটা একদম ঠিক না।”
​রিদি এবারও কোনো উত্তর দিল না। সৌহার্দ্য খাওয়া শেষ করে সোজা নিজের রুমে চলে গেল। রিদিও নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল।
সকাল প্রায় আটটা। সারারাত রিদি আর পৃথা নিজেদের কথা, কষ্ট আর অনুভূতির আদান-প্রদান করে কাটিয়ে দিয়েছে রাতটা, তাই ঘুমটা আজ দেরিতেই ভেঙেছে। রেডি হয়ে রিদি যখন পৃথার দিকে তাকাল, চোখে একরাশ মমতা আর উদ্বেগ নিয়ে সে মৃদু স্বরে বলল, “তোর আজ যাওয়ার দরকার নেই, এমনিতে পরিস্থিতি ঠিক নেই তার মধ্যে তোর দজ্জাল শাশুড়ি কী বলে ঠিক নেই!” পৃথাও রিদির উদ্বেগটুকু বুঝতে পেরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। রিদি নিচে নেমে আমেনা খালাকে পৃথার খাওয়ার ব্যবস্থা করতে বলে দ্রুত পায়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল।

গেইটের সামনে আসতেই রিদি যেন পাথরের মতো জমে গেল। গেটের ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সৌহার্দ্য। তার পাশে চকচক করছে সেই বিশাল দানবীয় ‘BMW M 1000 RR’ বাইক। সৌহার্দ্য বাইকের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কী যেন টাইপ করছে। পরনে লেদার জ্যাকেট, বুকের কাছে সামান্য খোলা, ভেতরে টি-শার্ট আর কালো কার্গো প্যান্ট। চোখে সানগ্লাস। সূর্যের আলোয় তাকে অবিকল কোনো বলিউড হিরোর মতো লাগছে—আজ যেন তার সুদর্শনতা কয়েক গুণ বেশি প্রকট।রিদির চোখের পলক যেন পড়ছে না। এই অসভ্য লোকটা যে এতখানি সুদর্শন, তা সে এতদিন খেয়ালই করেনি। করার কথাও নয়, কারণ তাদের কথোপকথন মানেই তো ঝগড়া আর চিৎকার।
এইসব ভাবনার মাঝেই রিদির হঠাৎ গতকাল রাতের কথা মনে পড়ে গেল, তার মানে এই লোক এই জন্য এত তেজ দেখিয়েছে। রিদি কিছু একটা ভেবে মুখ বাঁকিয়ে সৌহার্দ্যের পাশ কাটিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা রিকশায় উঠে বসল। সৌহার্দ্যকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, “উফ রিক্সায় চড়তে যা ভালো লাগে, আমার ভীষণ পছন্দের, আর রিকশাওয়ালা মামাগুলো তো জোস!

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২৩

বলেই রিকশাওয়ালাকে তাড়া দিয়ে বলল, “তাড়াতাড়ি চলুন মামা, না হলে আমার ইন্নালিল্লাহ হয়ে যাবে!”
​সৌহার্দ্য এতক্ষণ ভাব আর নিস্পৃহতায় মোবাইলে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ রিদির এই অদ্ভুত আচরণ আর কথাগুলো কানে যেতেই সে চমকে চোখ তুলে তাকাল রিদির দিকে। সৌহার্দ্য তার দিকে তাকাতে সে দাঁত বের করে একটা হাসি দিলো, রিদির সেই চাহনি আর কথার মারপ্যাঁচে সৌহার্দ্যর বুঝতে বাকি রইল না রিদি কী বোঝাতে চাইছে। কিন্তু ততক্ষণে রিক্সা টা অনেক দূর এগিয়ে গেছে, সে দিকে তাকিয়ে সৌহার্দ্যর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, তার চোখে তখন আগুনের হলকা। রিদির চলে যাওয়ার পথের দিকে সে এমন অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল….

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here