Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫১

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫১

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫১
রিদিতা চৌধুরী

রাজশাহীর আকাশে তখন গভীর রাতের নিঝুম চাদর নেমে এসেছে। ঘড়ির কাঁটার হিসেবে ঠিক রাত এগারোটা। শহরের বুক চিরে বয়ে চলা শান্ত পরিবেশকে পাশ কাটিয়ে পদ্মাপাড়ের অদূরে সেই নিভৃত গোডাউনের বাইরে তখন চলছে পুলিশের সাইরেনের তীব্র লাল-নীল আলোর ঝলকানি আর ভারী বুটের ব্যস্ত পদশব্দ।
ঠিক এই রুদ্ধশ্বাস ও চরম উত্তেজনাকর পরিবেশের মাঝেই গোডাউন থেকে কিছুটা দূরের ফাঁকা স্কুলমাঠে প্রখর শব্দের গর্জন তুলে সবেমাত্র অবতরণ করল সৌহার্দ্যদের হেলিকপ্টারটি।

আকাশযানটি পুরোপুরি মাটিতে থিতু হওয়ার আগেই এক লহমায় লাফিয়ে নেমে পড়ল সৌহার্দ্য, শাহাবীর ও ফারিস। সৌহার্দ্য এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে সামনে পুলিশের গাড়ির কাছে এগিয়ে যেতেই দেখল, কিডন্যাপারগুলোকে অলরেডি গাড়িতে তোলা হচ্ছে। ঠিক তখনই থমকে গেল তার দৃষ্টি। সামনে রিদি, সায়েম, সুমি অপরাধীর মতো নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। বুক চিরে বেরিয়ে আসা অজানা আতঙ্কে রিদি তখন ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। চারপাশে কী হচ্ছে তা দেখার বা চোখ তুলে তাকানোর ন্যূনতম সাহসটুকুও তার অবশিষ্ট নেই। তীব্র লজ্জা আর ভয়ের চাদরে মুড়ে রিদির মন চাইছে এই মুহূর্তে মাটি ফুঁড়ে হারিয়ে যেতে, পৃথিবী থেকে পালিয়ে যেতে। তবুও পাথরের মতো স্থির হয়ে, অসহায়ভাবে নিজের ঠোঁট কামড়ে কোনোমতে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সে।
সৌহার্দ্য, ফারিস আর শাহাবীর সামনে এগিয়ে যেতেই ডিউটিরত আর্মি অফিসার সম্মানসূচক স্যালুট ঠুকলেন। ফারিস অফিসারকে মৃদুস্বরে কিছু একটা বলতেই পুলিশের গাড়িগুলো একে একে সাইরেন বাজাতে বাজাতে চলে গেল। শুধু নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে আর্মির কয়েকটি জিপ তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে রইল।

সৌহার্দ্যের তীক্ষ্ণ, গাঢ় দৃষ্টি তখন কেবলই রিদির ওপর নিবদ্ধ। মেয়েটাকে সম্পূর্ণ অক্ষত ও সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় নিজের চোখের সামনে দেখতে পেয়ে যেন ধুঁকতে থাকা শরীরে প্রাণ ফিরে পেল সে। কিন্তু পরমুহূর্তেই রিদির পাগলামো আর দুঃসাহসিক কীর্তিকলাপগুলো মনে ভেসে উঠতেই রাগে তার সমস্ত শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। ক্ষোভ আর উদ্বেগে তার চোখ দুটো যেন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনের মতো লাল হয়ে আছে।
আর সহ্য করতে না পেরে সৌহার্দ্য এক ঝটকায় এক ক্ষিপ্ত বাঘের মতো রিদির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। রাগের চরম মুহূর্তে রিদির গালের ওপর হাত তুললেও শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে চোখ বুজে হাতটা নামিয়ে নিল সে। রাগকে প্রশমিত করার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে দুহাতে রিদির থুতনিটা শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলে উঠল,

“আমাকে আর কত জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করলে, তবে তোর শান্তি হবে? ভালোবাসি বলে যা খুশি তাই করে যাবি নাকি? লাগবে না তোর মতো বেয়াদব, অবাধ্য নারীর ভালোবাসা আমার এই জীবনে! যা, আজ থেকে তোর যা খুশি কর, আমি সৌহার্দ্য চৌধুরী আর কোনোদিন ফিরেও তাকাবো না… একবিন্দুও চাই না তোকে আমার জীবনে!”
বলেই সৌহার্দ্য এক মুহূর্তের জন্যও আর কোথাও না তাকিয়ে ঝড়ের বেগে সামনে এগোতে লাগল। সৌহার্দ্যকে এভাবে উন্মত্তের মতো রেগে চলে যেতে দেখে অস্থির হয়ে উঠল রিদি। তাকে আটকাতে সেও দৌড়াতে শুরু করল। কিন্তু কপালের ফেরে নিজের ভারী শাড়ির পাঁচে পা পেঁচিয়ে সোজা মুখ থুবড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সে। সাথে মেয়েটি যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠল। রিদির মুখ থেকে বেরিয়ে আসা ব্যথাতুর আর্তনাদে সৌহার্দ্যের চলার গতি মুহূর্তেই থমকে গেল।
সে পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখল ফারিস দ্রুত এগিয়ে আসছে রিদিকে তুলতে। তা দেখে রুদ্ধশ্বাসে গর্জে উঠল সৌহার্দ্য,

“ডোন্ট টাচ হার! দূরে থাক ওর থেকে!”
এরপর শাহাবীরের দিকে এক পশলা রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে না থেকে নিজের বোনকে তুলতে পারছিস না?”
কথাটা বলেই সে আবার সামনের দিকে পা বাড়াল। ফারিস তার পিঠের দিকে তাকিয়ে নাক-মুখ কুঁচকে চেঁচিয়ে উঠল,
“শালা, আমার হাতে কি অ্যালার্জি আছে? তোর বউকে তুললে কি ফোসকা পড়ে যাবে নাকি!”
সৌহার্দ্য এক পলক জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকাতেই ফারিস সাথে সাথে চুপসে গেল।
এদিকে শাহাবীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দ্রুত এগিয়ে এসে বোনকে মাটি থেকে টেনে নিজের শক্ত বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। রিদি ভাইয়ের বুক থেকে ছিটকে সরে যাওয়ার জন্য ছটফট করতে করতে কান্নায় ভেঙে পড়ে হুপিয়ে উঠল,
“ভাইয়া, আমাকে ছাড়ো! উনি আমাকে ভুল বুঝে চলে যাচ্ছেন, আমাকে যেতে দাও… আমি বুঝিয়ে বললে উনি ঠিক মেনে নেবেন!”
শাহাবীর পরম মমতায় কেঁপে ওঠা বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার সুরে বলল,

“এখন ও অসম্ভব রেগে আছে, একটু ঠান্ডা হতে দে তো! প্লিজ, ভাইয়ের কথাটা শোন লক্ষ্মী বোন আমার!”
ভাইয়ের সেই শান্ত অথচ দৃঢ় কথায় রিদি কিছুটা হলেও শান্ত হলো।
ফারিস রিদির কিছুটা কাছে এগিয়ে এসে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর গলার স্বর নামিয়ে বেশ গম্ভীর ও ভারাক্রান্ত গলায় বলে উঠল,
“তোমার কি মনে হয় না আজ তুমি যা করলে, সেটা চরম একটা অন্যায় আর বোকামি? ঢাকা থেকে এত দূরে কাউকে কিছু না জানিয়ে তোমার কি এভাবে হুট করে চলে আসা উচিত হয়েছে? আর তুমি কি জানো না? সৌহার্দ্যের ছোটবেলা থেকেই একটা জন্মগত হার্টের সমস্যা আছে—কনজেনিটাল হার্ট কন্ডিশন। অতিরিক্ত কোনো উত্তেজনা বা মানসিক টেনশন ও একটুও সহ্য করতে পারে না; একটু এদিক-ওদিক কিছু হলেই যেকোনো মুহূর্তে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে!”
ফারিসের এই কড়া কথাগুলো কান ছুঁতেই রিদির পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। সে বাকরুদ্ধ হয়ে পলকহীন তাকিয়ে রইল। এ কথা সে আজ জীবনের প্রথমবার শুনল। বুকটা হঠাৎ করেই অজানা আতঙ্কে মোচড় দিয়ে উঠল। রিদির ফ্যাকাশে ও আতঙ্কিত মুখের পানে তাকিয়ে ফারিস একটু নরম সুরে বুঝিয়ে বলল,

“হুম, যা বলছি তা একশো ভাগ সত্যি। এটা নিয়ে এখন অহেতুক প্যানিক করো না; উন্নত চিকিৎসার কারণে সমস্যাটা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে, কিন্তু সত্যি কথা হলো—ও হঠাৎ করে কোনো অতিরিক্ত উত্তেজনা বা মনের ওপর বড় ধাক্কা একদমই নিতে পারে না!”
ভাইয়ের প্রশস্ত বুকের গভীরে মুখ গুঁজে অপরাধীর মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে রিদি। তার কান্নার প্রতিটি ফোঁটা যেন জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসের পরিণতি। একটু দূরে সায়েম আর সুমি তখনও স্তব্ধ হয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে—অপরাধবোধ আর উৎকণ্ঠায় তাদের মাথা নিচু।
রিদিকে বুকে জড়িয়ে ধরে শাহাবীর একবার শূন্য দৃষ্টিতে সুমির দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে রাগ ছিল না, ছিল একরাশ ক্লান্তি। একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে সবার উদ্দেশ্যে শীতল গলায় বলে উঠল,
“যাও, সবাই গিয়ে হেলিকপ্টারে ওঠো।”
কোনো কথা বাড়াল না সায়েম কিংবা সুমি। নিঃশব্দে ফারিসের পিছু পিছু তারা এগিয়ে গেল হেলিকপ্টারের দিকে। রিদিকে শক্ত করে আগলে শাহাবীর যখন হেলিকপ্টারের সামনে এসে পৌঁছাল, তখন একে একে সবাই উঠে বসেছে।
চারপাশে চোখ বুলিয়ে উদ্বিগ্ন মুখে আরবান জিজ্ঞাসা করল,

“ভাইয়া কোথায়?”
আরবানের দিকে বিরক্তিতে এক পলক তাকিয়ে ফারিস খটমটে কণ্ঠে বলে উঠল,
“তোর কি মনে হয়, তোর ওই ঘাড়ত্যাড়া ভাই আমাদের সাথে আসবে?”
তবুও স্বস্তি পাচ্ছিল না আরবান। উদ্বেগে গলা কাঁপিয়ে সে বলে উঠল,
“কিন্তু ভাইয়ার কাছে তো কোনো গাড়ি নেই! একা এই গহিন জঙ্গলে—”
বাক্যটা পুরো শেষও করতে পারল না আরবান। তার আগেই নাক-মুখ কুঁচকে অবজ্ঞার সুরে ফারিস বলে উঠল,
“বাঘকে জঙ্গলেই মানায়, বুঝলি? অত টেনশন না করে চল!”
দাঁতে দাঁত চেপে বিরক্তি প্রকাশ করে সে আরও যোগ করল,
“ওই বেজার প্রোডাক্টটাকে দেখলে তো বাঘও উল্টো ভয়ে পালিয়ে বাঁচবে!”
বলেই এক মুহূর্ত দেরি না করে সে উঠে বসল হেলিকপ্টারে। আরবানও চারদিকে একবার শঙ্কাভরা চোখে তাকিয়ে চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে শেষ পর্যন্ত ভেতরে গিয়ে বসল।
হেলিকপ্টারটি তক্ষুণি শব্দ করে রানওয়ে ছেড়ে শূন্যে ডানা মেলল। ঠিক তখনই বুকফাটা আর্তনাদে ফেটে পড়ল সুমি,

“প্লিজ… প্লিজ আমাকে নামিয়ে দিন!”
তার হঠাৎ এমন চিৎকারে সবাই থমকে গেল, যেন আকাশ থেকে পড়ল। ভ্রু কুঁচকে বিরক্তিতে তেতে উঠে শাহাবীর ধমকে উঠল,
“এই মেয়ে, এটা কি কোনো লোকাল টমটম গাড়ি পেয়েছ? যেখানে-সেখানে থামিয়ে মানুষ নামিয়ে দিবে?”
শাহাবীরের কণ্ঠে থমকে গেল সুমি। এতক্ষণ চরম আতঙ্কের চোটে তার নিজের অস্তিত্বেরই হুঁশ ছিল না। এখন মাথার ওপর থেকে ভয় কাটতেই মনে পড়ে গেল—তার বাবা-মা তো এইখানে রয়ে গেছেন। আর ঢাকার তাদের বাড়িটিতে ঝুলছে বড় একটা তালা। কাঁদো কাঁদো গলায়, প্রায় ভেঙে পড়া কণ্ঠে সে বলে উঠল,
“আমার আব্বু-আম্মু তো এখানেই… বাড়িতে তালা মারা, আমি কোথায় যাবো…”
কথাটা শেষ করতে দিল না শাহাবীর। সুমির দিকে তীক্ষ্ণ অথচ অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে শীতল গলায় বলল,
“তোমাকে বিন্দুমাত্র টেনশন করতে হবে না, আমি ওনাদের সব জানিয়ে দেবো। আর তোমাকে রাস্তায় ফেলে রেখে যাবো!”
কথাগুলো শেষ করেই সুমির একেবারে গা ঘেঁষে বসল শাহাবীর। সুমির কানের ঠিক কাছে মুখটা নিয়ে এসে উষ্ণ গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল,

“আর এটা হলো… আমাকে ইগনোর করার শাস্তি!”
শাহাবীরের শরীরের স্পর্শ আর তীব্র উষ্ণ নিশ্বাসের ছোঁয়া কানের কাছে লাগতেই সুমির বুকটা কেঁপে উঠল। লজ্জায়, অপলক উত্তেজনায় তার ফর্সা মুখটা মুহূর্তে টকটকে লাল হয়ে গেল। চারপাশের কেউ খেয়াল না করলেও, ঠিকই তীক্ষ্ণ চোখে তা ধরে ফেলল ফারিস। মুখ বাঁকিয়ে বিদ্রূপের সুরে সে বলে উঠল,
“ছোট বোনের সামনেই শুরু হয়ে গেছে প্রেম-পিরিতির মহড়া! একটুও লজ্জা করছে না, তোর বিস্ফোরণ এক্সপ্রেস?”
ফারিসের কথায় চমকে গিয়ে সুমির কাছ থেকে একটু সরে বসল শাহাবীর। সুমিও লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যাওয়ার উপক্রম হলো, মাথাটা সে আর তুলতেই পারল না।
কিন্তু এই হইচইয়ের ভিড়ে রিদির দুনিয়া যেন একদম অন্য কোথাও। তার মন এসবের অনেক দূরে, শেকড়হীন কোনো অতল গহ্বরে পড়ে আছে। সে পাথর হয়ে আনমনা তাকিয়ে আছে বাইরে। এই মুহূর্তে বুকের ভেতরটা ছটফট করছে—সবকিছু ফেলে এখনই সৌহার্দ্যের কাছে ছুটে চলে যেতে ইচ্ছে করছে তার। চারপাশের এই বাতাসও যেন তার কাছে বিষাক্ত ঠেকছে। নিজের করা ভুলের কথা মনে পড়তেই রিদির বুকটা অনুশোচনায় পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। সে হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে, সৌহার্দ্যকে মানাতে তার কাঠখড় পোহাতে হবে।

আকাশের বিশালতায় হেলিকপ্টারটা যখন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। সৌহার্দ্য তখন অপলক সেদিকে চেয়ে আছে। হঠাৎ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এক আক্রোশে একটা গাছের গুঁড়িতে সজোরে হাত চালাল সে। তারপর শক্ত করে চোখ বন্ধ করে ঘন ঘন নিশ্বাস নিতে লাগল। বুক চিরে বেরিয়ে আসছে দীর্ঘশ্বাস—‘কীভাবে আজ মেয়েটার গায়ে হাত তুলতে গেল সে?’—এই ভাবনায় নিজের কাছেই নিজে আজ ভীষণ ছোট হয়ে গেছে।
সৌহার্দ্যের রাগ বরাবরই বেপরোয়া, যেন আগ্নেয়গিরি। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, রিদির গায়ে সামান্য একটা আঁচড় লাগলেও তার নিজের বুক যেন কেমন ফাঁকা হয়ে আসে, মনে হয় তার নিজেরই নিশ্বাস আটকে যাচ্ছে। নিজের এই হিতাহিতজ্ঞানশূন্য রাগের ওপর মাঝে মাঝে বড্ড রাগ হয় তার। অথচ শত চেষ্টা করেও সে নিজেকে আটকে রাখতে পারে না, না চাইতেও বারবার মেয়েটাকে কষ্ট দিয়ে ফেলে। অনুশোচনার আগুনে পুড়তে পুড়তে সে যখন আবার সেই গাছের গায়েই আঘাত করতে উদ্যত হলো, ঠিক তখনই সুজন দৌড়ে এসে তার হাত দুটো শক্ত করে খপ করে ধরে ফেলল।

সবাই যে যার মতো চলে গেলেও; কিন্তু সুজন বন্ধুকে এই চরম ভাঙনের মুখে একা ফেলে যায়নি। সে ভালো করেই জানে সৌহার্দ্যের রাগ কেমন ভয়ংকর—মাথা গরম হলে সে নিজের ওপর কী ধরনের তাণ্ডব চালাতে পারে, তার কোনো ঠিকঠিকানা থাকে না।
সুজন এগিয়ে এসে সৌহার্দ্যের হাতের দিকে তাকাতেই তার কপাল কুঁচকে গেল। ক্ষোভে আর বিরক্তিতে তার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল—গাছের গুঁড়িতে অনবরত আঘাত করার ফলে সৌহার্দ্যের হাতটা একদম থেঁতলে লাল হয়ে গেছে। বিরক্তি আর উৎকণ্ঠা মিশিয়ে সুজন প্রায় ধমকের সুরে বলে উঠল,
“কী শুরু করলি বল তো এসব? নিজের ওপর এই অবুঝ জিদ আর কত চালাবি? নিজেকে এভাবে কষ্ট দিয়ে কী প্রমাণ করতে চাস?”

বন্ধুর কথায় কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে সৌহার্দ্য রাস্তার ধুলোবালির মধ্যেই ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসে পড়ল। সুজনের চোখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অদ্ভুত, ব্যথাতুর হাসি ফুটিয়ে সে শান্ত অথচ ভারী গলায় বলল,
“একটা কথা কি জানিস সুজন? আমাদের কাছের মানুষগুলো যখন ঠিক বুঝে যায় কোথায় আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, তখন তারা বিনা নোটিশেই সুযোগ বুঝে সেই জায়গাতেই আঘাত করতে থাকে। এই আমাকেই দেখ… আমি তো বুক ফুলিয়ে ভাবতাম, এই পৃথিবীর কোনো মানুষ, কোনো শক্তিই আমার দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। কোনো দিনও না! অথচ সে-ই আমাকে…”
কথাটা শেষ করতে গিয়েও সৌহার্দ্য হঠাৎ থেমে গেল। নিজের ভেতরের সমুদ্রসমান কষ্টটাকে জোর করে গিলে ফেলল সে। পরমুহূর্তেই নিজেকে কঠোরভাবে সংযত করে মুখটা শক্ত ও গম্ভীর করে নিল, যেন বুকের ভেতর বয়ে যাওয়া তীব্র ঝড়টাকে সে জোর করেই পাথর চাপা দিল।
বন্ধুর মনের অবরুদ্ধ দরজাটা সুজন খুব ভালো করেই চেনে। সে জানে, সৌহার্দ্য এমন এক মানুষ—যার বুক ফেটে চৌচির হয়ে গেলেও ঠোঁট দিয়ে কষ্টের একটা শব্দও বের হবে না; পাথর চাপা দিয়ে সব আর্তনাদ সে নিজের ভেতরে গিলে ফেলতে জানে।
সৌহার্দ্যের মুখের দিকে তাকিয়ে সুজন একচিলতে ম্লান হাসল। তারপর গাছের গুঁড়িতে পিঠ এলিয়ে বসে ঠান্ডা অথচ শাণিত গলায় বলল,

“তুই তো শুধু তোর নিজের কষ্টটাই দেখছিস, সৌহার্দ্য! তুই কি একবারও আয়নায় নিজেকে প্রশ্ন করেছিস—তুই-বা তাকে কম কষ্ট দিয়েছিস নাকি? আজ তার দেওয়া সামান্য আঘাত তুই সহ্য করতে পারছিস না, আর সেই মেয়েটা কীভাবে তোর দেওয়া অবহেলা আর কষ্টগুলো বুক পেতে সহ্য করে গেছে বল তো? দীর্ঘ চারটা বছর ধরে!”
বন্ধুর এই সোজা কথায় সৌহার্দ্যের চোখে হঠাৎ জমে উঠল তীব্র অস্বস্তি। সে এক পলক সুজনের দিকে তাকিয়ে বিরক্তিতে মুখটা ফিরিয়ে নিল। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে ঝাঁজালো গলায় বলে উঠল,
“তখন আমি পরিস্থিতির শিকার ছিলাম, সেটা তোরা সবাই ভালো করেই জানিস! আমার নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করাটা তখন কতখানি জরুরি ছিল, তা কি তোদের বলে বোঝাতে হবে? আমি যা কিছু করেছি, তখন—সেটা তো ওর জন্যই করেছি!”
সুজন এবার এক অদ্ভুত বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল সৌহার্দ্যের চোখের দিকে। বন্ধুর লুকানো সত্য জানার কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে সে প্রায় ফিসফিস করে বলে উঠল,
“সত্যি করে বল তো সৌহার্দ্য, তুই রিদিকে কবে থেকে ভালোবাসিস?”
সৌহার্দ্য তখন চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে রেখেছে। আনমনে, এক সুদূর শূন্যতায় তাকিয়ে সে নিচু অথচ স্থির গলায় বলে উঠল,

“কবে আর কখন ভালোবেসেছি, তা ঠিক জানা নেই। তবে যেদিন ওকে ‘কবুল’ বলেছিলাম, সেদিন ওই পনেরো বছরের এক কিশোরীর ঘোমটার আড়ালে থাকা না-দেখা মুখটা আমার মনে এক অচেনা পিছুটান তৈরি করেছিল। শত চেষ্টা করেও সেই মুখটা আমি কখনো মাথা থেকে মুছে ফেলতে পারিনি। আর সেই দিন থেকেই পৃথিবীর আর কোনো নারীর প্রতি আমার মনে একটুও মোহ জন্ম নেয়নি…”
বন্ধুর মুখ থেকে এই ছোট্ট একটা স্বীকারোক্তি শুনে সুজন যেন পলে পলে ভাষা হারিয়ে ফেলল। সৌহার্দ্যের মতো এমন পাথরের মতো শক্ত আর গম্ভীর মানুষের বুক চিরে ভালোবাসার এমন নিখাদ রূপ বেরিয়ে আসা যে কতখানি বিশাল ব্যাপার, তা কেবল তার সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোই জানে।
কয়েক মুহূর্তের পিনপতন নীরবতা ভেদ করে সুজন এবার চারপাশের বাস্তব পরিস্থিতির দিকে নজর দিল। ঠোঁটে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে সে কিছুটা তাচ্ছিল্যের সুরেই বলে উঠল,
“তেজ দেখিয়ে তো ওদের সাথে গেলি না, এখন কীভাবে ফিরবো আমরা?”
সৌহার্দ্য গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিল,
“দশ মিনিট ওয়েট কর, ব্যবস্থা করা আছে!”
বলেই সে আবার চোখটা বুজে ফেলল।

রাত তখন প্রায় একটা। তবুও নিস্তব্ধ হয়নি ঢাকা শহর; কোলাহল আর যান্ত্রিকতার বুক চিরে ঠিকই জেগে আছে চারপাশ। ঠিক সেই মুহূর্তেই ছাদ ছুঁল হেলিকপ্টারটা। শাহাবীর রিদি আর সুমিকে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে এসেছে।
রিদি চৌধুরী বাড়ির দিকে যেতে চাইলেও শাহাবীর শক্ত গলায় জানিয়ে দিল, সকালে সে নিজেই পৌঁছে দেবে। তাছাড়া, এই মুহূর্তে সৌহার্দ্যের মাথা গরম, তার রাগ কমাটা জরুরি। ক্লান্ত শরীরে আর প্রতিবাদ করার শক্তি পেল না রিদি, নীরব সম্মতি জানাল।
ফ্ল্যাটে পা রাখতেই শাহাবীর পরম যত্নে তাদের জন্য একটি রুম গুছিয়ে দিল। এরই মধ্যে খাবার অর্ডার করে দিয়েছে সে। সুমি মৃদু প্রতিবাদ করে বলেছিল, সে নিজ হাতে কিছু বানিয়ে নেবে। কিন্তু শাহাবীর তার কথায় কান দিল না।
কিছুক্ষণ এর মধ্য খাবার আসতেই শাহাবীর নিজ হাতে বোনকে খাইয়ে দিল। কিন্তু রিদির গলা দিয়ে যেন খাবার নামছিলই না। সৌহার্দ্য কোথায় আছে, বাড়ি ফিরেছে কি না—এই দুশ্চিন্তায় তার বুক ফেটে যাচ্ছিল। কিডন্যাপারদের কবল থেকে পুলিশ ফোনগুলো উদ্ধার করে দিলেও চার্জ না থাকায় রিদির ফোনটা তখন পুরোপুরি বন্ধ ছিল।

অনেক কষ্টে রিদিকে বুঝিয়ে শুনিয়ে ঘুম পাড়ানোর পর শাহাবীর বারান্দায় এসে দাঁড়াল। এক চিলতে ধোঁয়া ওড়াতে গিয়ে আঙুলে ধরা সিগারেটটা সে ধরল, ঠিক তখনই রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে পাশে এসে দাঁড়াল সুমি। শাহাবীরের হাত থেকে সিগারেটটা কেড়ে নিয়ে দূরে ফেলে দিয়ে চোখের কোণে জমে থাকা রাগ নিয়ে সে বলে উঠল,
“এসব না খেলে হয় না?”
সুমির দিকে এক পলক তাকিয়েও কোনো উত্তর দিল না শাহাবীর। দৃষ্টিটা বাইরে স্থির রেখে সুমি নরম গলায় জানতে চাইল,
“রিদিকে খুব ভালোবাসেন না?”
শাহাবীর সুমির দিকে না তাকিয়েই ছোট করে জবাব দিল,
“হুম, সাথে তোমাকেও!”

কথাটা শুনে সুমি চমকে তাকাল, কিন্তু শাহাবীরের দৃষ্টি তখনো গ্রিলের বাইরে, ওই অনন্ত আকাশের কোনো এক শূন্যতায়। সুমি একটু এগিয়ে এসে শাহাবীরের কাঁধে আলতো করে মাথাটা এলিয়ে দিল। ফিসফিস করে বলে উঠল,
“কখনো হাত ছেড়ে দিবেন না তো মাঝপথে?”
শাহাবীর আগের ভঙ্গিতেই দাঁড়িয়ে থেকে ভারী গলায় প্রতিজ্ঞা করল,
“নিশ্বাস থাকতে না!”
সুমি তৃপ্তির এক চিলতে মুচকি হেসে শাহাবীরের কাঁধে মাথা রেখেই চোখ বন্ধ করল। আড়চোখে একবার তাকিয়ে শাহাবীর আস্তে করে জিজ্ঞেস করল,
“ঘুমাবা না?”
চোখ বুজেই সুমি জবাব দিল,
“না!”
শাহাবীর আর কিছু বলল না। নিঝুম রাতের চাদরে মুড়ে সেও আগের মতো অপলক তাকিয়ে রইল ওই দূর আকাশের দিকে।

সেদিনের পর থেকে কেটে গেছে ঠিক একটা সপ্তাহ। এই সাতটি দিন সৌহার্দ্যের কোনো খোঁজ নেই, কোনো সাড়াশব্দ নেই। সে ঘটনার পর দিন সকালে চৌধুরী বাড়িতে এসে সৌহার্দ্যকে না পেয়ে রিদি ভেবেছিল সে হয়তো হাসপাতালেই আছে; দুপুর বা রাতে নিশ্চয়ই ফিরে আসবে। কিন্তু দুই দিন পেরিয়ে গেলেও যখন সৌহার্দ্য বাড়ি ফিরল না, তখন রিদির বুকটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল।
এরপর থেকেই সে নিজেদের নতুন বাড়ি থেকে শুরু করে সৌহার্দ্যের চেম্বার—কোথায় না কোথায় খোঁজ করেনি! কিন্তু কোথাও তার এতটুকু সন্ধান মিলল না। ফারিসকে সে কয়েকবার ফোন করে সৌহার্দ্যের ঠিকানার কথা জানতে চাইল, অথচ ফারিস উদাসীন গলায় বলে দিল সে কিছুই জানে না। সৌহার্দ্যের নাম্বারে তো হাজারবার ডায়াল করা শেষ। কিন্তু সৌহার্দ্য কি আর ফোন রিসিভ করে? হয় রিং হতে হতে লাইন কেটে যায়, নয়তো জেনেশুনেই কেটে দেয়। মেসেজ পাঠালেও একটা উত্তর আসে না, সিন পর্যন্ত করে না।
এই এক সপ্তাহে মেয়েটার অবস্থা একদম ভেঙে গেছে। দুশ্চিন্তায় শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে সে; ঠিকমতো ঘুমাতে না পেরে চোখের নিচে গাঢ় কালো দাগ বসে গেছে। রিদির কিছুতেই মাথায় আসছে না, সৌহার্দ্য কেন তার সাথে এমন নিষ্ঠুর আচরণ করছে? সে না হয় না বুঝে একটা ভুল করেছে, তাই বলে কি তাকে একবারের জন্যও ক্ষমা করা যেত না?

সকাল প্রায় নয়টা। ক্লাসরুমের এককোণে থম মেরে বসে আছে রিদি আর সুমি।
​পৃথা আজও আসেনি—মেয়েটা আজকাল কোনো ক্লাসই আর ঠিকমতো করতে পারে না। আর সায়েম? সেই সেদিন থেকে ছেলেটা একদম লাপাত্তা; শত খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো হদিশ মেলা-ভার। দুশ্চিন্তায় দিশেহারা হয়ে সায়েমের বাড়িতে ফোন করা হয়েছিল, ওপাশ থেকে ওর মা ভাঙা গলায় শুধু জানিয়েছেন, সায়েম নাকি কোনো এক বন্ধুর বাড়িতে আছে বলে জানিয়েছে।
​চারপাশের এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে রিদির বুকটা ভেঙে আছে। কোনো কিছুতেই আর মন টিকছে না। ভারাক্রান্ত মনে নিঃশব্দে সুমির কাঁধে নিজের মাথাটা এলিয়ে দিল রিদি। ভেতরটা শুধু হাহাকার করে উঠছে—”কিচ্ছু ভালো লাগছে না!
হঠাৎ করেই ক্লাসের গম্ভীর নিস্তব্ধতা ভেঙে দরজায় এসে দাঁড়াল সৌহার্দ্য। গায়ে একটা কালো টি-শার্ট আর জিন্স প্যান্ট। রোদ থেকে আসার কারণে ফর্সা মুখটা কিছুটা লালচে হয়ে আছে। কারো দিকে একবারের জন্যও না তাকিয়ে সে সোজা এগিয়ে গেল প্রজেক্টরের সামনে।
হঠাৎ কারও উপস্থিতির আভাস পেয়ে রিদি চমকে চোখ তুলল। আর তখনই যেন তার হৃদপিণ্ডটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল! ঠিক এক সপ্তাহ পর সে দেখছে তার সেই প্রিয় মানুষটাকে। রিদির মনে হলো, সে যেন পলক ফেলতে ভুলেই গেছে।

কিন্তু সৌহার্দ্য একদম নির্বাক—সে ফিরেও তাকাচ্ছে না। সে নিজের মতো করে লেকচার দিয়ে যাচ্ছে। সৌহার্দ্যের এমন ঠান্ডা অবহেলা রিদির মনে তীব্র কষ্ট দিল। সৌহার্দ্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য রিদি বারবার সুমির সাথে কথা বলতে শুরু করল, একটু গলা উঁচিয়েই কথাগুলো বলছিল—যাতে সৌহার্দ্যের মনোযোগে বিঘ্ন ঘটে, সে হয়তো বিরক্ত হয়ে বকা দেবে বা কিছু একটা বলবে।
কিন্তু না! আজ সৌহার্দ্য টু শব্দটিও করল না। সৌহার্দ্যের আচরণ দেখে রিদির এমন মনে হতে লাগল, সে যেন এই মুহূর্তে পুরোপুরি অদৃশ্য, কেউ তাকে দেখতেই পাচ্ছে না।
রিদি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল আর সৌহার্দ্যের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে নরম অথচ কাঁপাকাঁপা গলায় বলে উঠল,
“স্যার, আমি একটা টপিক বুঝতে পারছি না, একটু বুঝিয়ে দেবেন প্লিজ?”
সৌহার্দ্য এক বিন্দুও বাক্যব্যয় করল না। সে সোজা হেঁটে রিদির ডেস্কের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বইটার দিকে এক পলক তাকিয়ে একদম অচেনা মানুষের মতো এক গম্ভীর, গমগমে স্বরে বলে উঠল,

“ইয়েস মিস, কোথায় প্রবলেম হচ্ছে বলুন?”
রিদি হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারল, তার বর তার ওপর ভীষণভাবে রেগে আছে। বুক কাঁপলেও সে সৌহার্দ্যের একটু কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল। বইটা তার সামনে বাড়িয়ে ধরে নির্দিষ্ট একটা টপিকে আঙুল রাখল, তারপর ফিসফিস করে একদম কানে কানে বলবার মতো সুরে বলে উঠল,
“হৃদয়ে সমস্যা হচ্ছে, স্যার? আপনি এত নিষ্ঠুর কেন? আপনার এই অবলা ছাত্রীর মনটা একটুও বুঝছেন না কেন?”
ভরা ক্লাসের মাঝে বউয়ের এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন দুষ্টুমিতে সৌহার্দ্য একেবারে থমকে গেল। যদিও রিদি খুব নিচু গলায় কথাগুলো বলছিল, তাই ক্লাসের কেউ শুনতে পায়নি, তবুও সৌহার্দ্যের বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে উঠল। সৌহার্দ্য এদিক-ওদিক তাকাল, তারপর একটা ভারী গলা খাঁকারি দিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে রিদির ছটফটানি পুরোপুরি এড়িয়ে গম্ভীর মুখে টপিকটা বুঝিয়ে দিতে শুরু করল।
বুঝানো শেষ হতেই সৌহার্দ্যের মুখের গম্ভীরতা আরও গাঢ় হলো। রিদির চোখের দিকে একবারের জন্যও না তাকিয়ে সে কঠিন গলায় বলে উঠল,

“বোঝা গেছে, মিস?”
রিদিও কি আর কম যায়। সে কোনো উত্তর না দিয়ে এদিক-সেদিক তাকিয়ে বেশ মুচকি হেসে, দারুণ একটা ভাব দেখিয়ে একটু ঝুঁকে এল সৌহার্দ্যের দিকে। একেবারে ধীর কণ্ঠে, ফিসফিস করে দুষ্টুমিভরা সুরে বলল,
“আই লাভ ইউ, স্যার! না মানে… এত সুন্দর করে পড়াটা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য! আপনি চাইলে চু…”
কথাটা ঠিকমতো শেষও হলো না। তার আগেই সৌহার্দ্য এমন একটা রাগী ও ভয়াল দৃষ্টি ফেলল রিদির ওপর, যার মধ্যে উপচে পড়ছিল একরাশ পুঞ্জীভূত বিরক্তি। দাঁতে দাঁত চেপে সে বলে উঠল,
“এক ঘণ্টা কানে ধরে দাঁড়িয়ে থাকুন, মিস! হৃদয়ের প্রবলেম তাহলে সলভ হয়ে যাবে!”
কথাটা শেষ করেই সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না, হনহন করে প্রজেক্টরের সামনে গিয়ে নিজের লেকচারে মন দিল।
রিদি বিরক্তিতে মুখ ফুলিয়ে সৌহার্দ্যের দিকে তাকাতেই সৌহার্দ্য ধমকের সুরে আবারও হুকুম দিল,

“এই ইউ ভ্যানিশ কুইন, কানে ধরে দাঁড়াও!”
বলেই সে আবার নিজের লেকচারে ডুবে গেল।
রিদি কানে ধরে দাঁড়িয়ে মুখটা একটু কুচকে মনে ফুঁসে উঠল—
“আগে একবার রাগটা ভাঙিয়ে নিই তারপর বুঝাবো কত ধানে কত চাল। না হয় আমিও আপনার বউ নই মিষ্টার চৌধুরী!”
প্রায় ঘণ্টাখানেক একটানা ক্লাস করানোর পর সৌহার্দ্য যখন নিজের নোটপ্যাডটা গুছিয়ে ক্লাস রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল, ঠিক তখনই ক্লাসের শেষপ্রান্ত থেকে তানিমা একটু কেঁপে কেঁপে লাজুক কণ্ঠে ডেকে উঠল,
“স্যার, একটু শুনবেন?”
তানিমাকে এমন মাখামাখা সুরে কথা বলতে দেখে রিদির চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। মনে হলো মেয়েটা এমনভাবে আবদার করছে যেন সৌহার্দ্য তার নিজের জামাই লাগে। রাগে রিদির ভেতরটা ফুঁসে লাল হয়ে উঠতে লাগল।
সৌহার্দ্য বিরস মুখে থমকে দাঁড়াল। তানিমা বা কারো দিকে একবারের জন্যও না তাকিয়ে সে বরফশীতল ও বিরক্ত গলায় বলল,
“সে ইট কুইকলি।”
তানিমা একটুও কালক্ষেপণ না করে একটা সুন্দর রঙের ইনভিটেশন কার্ড সৌহার্দ্যের দিকে বাড়িয়ে দিল। ঠোঁটে কৃত্রিম লাজুক হাসি ফুটিয়ে গলে যাওয়া গলায় সে বলে উঠল,
“পরশু আমার জন্মদিন, স্যার! আপনি প্লিজ আসবেন, আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করব!”
তানিমার এমন চটপটে আহ্বানে সৌহার্দ্যের ভ্রু কুঁচকে গেল। সে ন্যূনতম কোনো ভাবান্তর না দেখিয়ে, কার্ডটার দিকে চোখ তুলেও তাকাল না। নির্লিপ্ত কণ্ঠে সাফ জানিয়ে দিল,
“ওটা লাগবে না, আমার সময় হবে না।”
বলেই এক মুহূর্তের জন্যও দাঁড়াল না, সোজা ক্লাস রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
সৌহার্দ্য ক্লাস রুম থেকে বের হওয়া মাত্রই রিদি একটা হিংস্র বাঘিনীর মতো জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তানিমার দিকে তাকাল। কিন্তু রিদির ওই খুনে চাহনিকে পাত্তাই দিল না তানিমা। বরং উল্টো বুক ফুলিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বিষাক্ত সুরে বলে উঠল,

“তাতে কী হয়েছে! আমি ঠিকই স্যারকে রাজি করিয়ে ছাড়ব। প্রয়োজনে বাবাকে দিয়ে বলাব। বাবাকে স্যার অসম্ভব ভালোবাসেন, স্যারের পক্ষে বাবার মুখের ওপর না করা অসম্ভব!”
তানিমার এই দাম্ভিক কথাগুলো রিদির পিলে চমকে দিল। রাগে গা রি রি করতে করতে সে ক্লাস থেকে বেরোনোর পথে হঠাৎ তানিমার ডেস্কের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। তারপর একটু ঝুঁকে তানিমার ঠিক কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে চরম হুংকার ছেড়ে বলল,
“আগে ওই রাগি বজ্জতটার রাগ ভাঙিয়ে নেই, তারপর তোকে দেখতেছি। আমার জামাইয়ের পিছনে ঘোরার মজা তোকে হারে হারে না বুঝিয়েছি তো আমার নাম রিদিতা খান না!”
কথাটা শেষ করেই সে হনহন করে হেঁটে চলে যেতে গিয়ে হঠাৎ কী যেন মনে পড়ে যাওয়ায় এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তারপর মুখের ভেতর থেকে নিজের চিবানো নরম বাবলগামটা চটজলদি বের করে ফেলল। তানিমা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার অবাক হওয়া মুখের মধ্যে সেই গামটা গুঁজে দিল। এরপর দুপ-দাপ শক্ত পায়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেল।
তানিমা তখন চরম একটা শক খেয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাটা তার মগজে পৌঁছাতেই সে রিদির চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে বমির বেগে গাবাগাব করতে লাগল। রাগে-ঘৃণায় ফুঁসতে ফুঁসতে হিসহিস করতে শুরু করল।

রাত তখন ঠিক বারোটার কাঁটা ছুঁই ছুঁই। সৌহার্দ্যের ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে সশব্দে খেলা চললেও পুরো ঘরে যেন এক অদ্ভুত, ভারী নীরবতা জমে আছে। সোফায় পাশাপাশি বসে থাকা ফারিস আর সুজনের হাতে ধরা কফির মগগুলো থেকে ততক্ষণে ধোঁয়া ওঠা প্রায় থেমে গেছে। অথচ সৌহার্দ্যের হাতের মগটায় একটা চুমুক দেওয়ারও ফুরসত হয়নি। তার আনমনা চোখদুটো টিভির সবুজ মাঠের দিকে নয়, বরং ফিক্সড হয়ে আছে কোলের ওপর খোলা ল্যাপটপের স্ক্রিনটার দিকে।
ল্যাপটপের ক্যামেরা উইন্ডোতে চোখ রাখতেই বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। ঘরের এক কোণে একা বসে আছে তার বউ—অভিমান জমাট বাঁধা মুখ, রাগ আর ভালোবাসার মিশ্রণে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দরজার পানে। যেন এই মুহূর্তের প্রতিটি নিঃশ্বাসে জড়িয়ে আছে বহু না-বলা অভিযোগ আর দীর্ঘ প্রতীক্ষা।
সৌহার্দ্যে কে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে কাঠপুতলীর মতো চেয়ে থাকা দেখে ফারিস আর চুপ থাকতে পারল না। কণ্ঠে এক চিলতে কৌতুক আর গভীর অনুভূতির প্রলেপ মেখে সে বিরক্তি নিয়ে বলে উঠল—
“এভাবে কত দিন বাড়ি ফিরবিনা? তোর বউ প্রতিদিন একবার করে ফোন দিয়ে তোর ঠিকানা জানতে চা…”
ফারিসের কথা শেষ হওয়ার আগেই সৌহার্দ্য বিরক্ত হয়ে কিছু বলতে নেবে তার আগেই সায়েম এসে ভয়ে ভয়ে বলল,

“স্যার আপনাদের খাবার রেডি!”
সেদিন ঢাকায় ফেরার পর সৌহার্দ্য ভয় দেখিয়ে ছেলেটাকে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে এসেছে। আজ এক সপ্তাহ ধরে বিনা বাক্যে বেচারাকে দিয়ে বাড়ির সমস্ত কাজ করিয়ে নিচ্ছে সে। সুজন সেদিকে একবার তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর আহারে-উহারে করে বলে উঠল—
“আহারে বেচারা! জীবনে বন্ধু করার আগে এখন থেকে দশবার ভেবে নেবে যে; তার এমন জা…”
কিন্তু সৌহার্দ্যের অগ্নিমূর্তি দৃষ্টি সুজনের গায়ে পড়তেই সে সাথে থেমে গেল। ফারিস এবার সায়েমের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,
“ওকে ছোট ভাই, তুমি এবার পড়তে বসো; আমরা গিয়ে খেয়ে নিচ্ছি।”
সায়েম মাথা নেড়ে চলে যেতে যেতে দাঁতে দাঁত চেপে রাগে বিড়বিড় করে উঠল—

“খাটাশ! শুধু একবার এখান থেকে বের হতে দে, তারপর তোর বউয়ের সাথে প্যাঁচ লাগিয়ে তোর পিন্ডি না চটকিয়েছি, তবে আমার নাম সায়েম না!”
সায়েম চলে যেতেই ফারিস সৌহার্দ্যের দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“এবার অনেক হয়েছে সৌহার্দ্য! ছেলেটার পড়াশোনাটা এভাবে নষ্ট হচ্ছে, ওকে বাড়ি যেতে দে।”
সৌহার্দ্য চরম বিরক্তি নিয়ে জবাব দিল,
“এখানে বেশ ভালোই ওর পড়ালেখা হচ্ছে! ছেড়ে দিলে বাড়িতে গিয়ে ওই ইডিয়টটা পড়া কম করবে, আর আমার বউকে কুবুদ্ধি দেবে বেশি!”
কথাটা বলেই সে আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে নিজের রুমের দিকে ঝড়ের বেগে হেঁটে চলে গেল।
সৌহার্দ্য চলে যেতেই ফারিস আপন মনে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“আমি নিশ্চিত, সারহান চৌধুরীর ডিএনএ-তে নিশ্চয়ই কোথাও ভেজাল ছিল, না হ…”
ফারিস পুরো কথা শেষ করার আগেই সুজন তাকে থামিয়ে দিয়ে ঝাঁজালো গলায় বলে উঠল,
“শুধু ওর না, তোর বাপের ডিএনএ-তেও আছে!”
বলেই সে সোজা খাবার টেবিলের দিকে পা বাড়াল। আর ফারিস তখন নির্বাক, একেবারে আহাম্মকের মতো পলকহীন চোখে সুজনের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।

মাঝখান থেকে নীরবে কেটে গেল আরও একটা দীর্ঘ দিন। রিদি ভেবেছিল, কলেজে দেখা হওয়ার পর সৌহার্দ্য বাড়ি ফিরবে, কিন্তু না—সৌহার্দ্য ফিরল না।
হঠাৎ রিদির মাথায় এলো, সে সৌহার্দ্যকে না দেখে চটপট করলেও সৌহার্দ্য ঠিক ক্যামেরার আড়াল থেকে নজর রেখেই তাকে দেখে নিচ্ছে, তাই সে ফিরছে না। তাদের ঘরের যে ক্যামেরা আছে সেটা রিদি ভুলেই গেছিল।
এই লুকোচুরি খেলাটা আর ভালো লাগল না রিদির। বুকভাঙা অভিমান আর ক্ষোভে সে আর পুরো দিন নিজের রুমে কিংবা সৌহার্দ্যের রুমের আশেপাশেও গেল না। সমস্ত আবেগ গলায় আটকে রেখে, এক বুক অভিমান নিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করে বলে উঠল—

“এবার দেখ ভালো করে বজ্জত!”
রাত প্রায় একটা বাজে। গেস্ট রুমের নিঝুম অন্ধকারে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে রিদি। মনের ভেতর হাজারটা ভাবনা ঝড় তুলছে, কিছুতেই ঘুম আসছে না। তবুও চারপাশের নিস্তব্ধতায় নিজেকে এলিয়ে দিয়ে ঘুমানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সে। ঠিক যখন চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে আসছিল, তখনই ঘরের বাতাস ভারী করে তুলল এক চেনা সুবাস—’ক্রিড অ্যাভেনটাস’-এর সেই মাতাল করা ঘ্রাণ। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘরটা সৌহার্দ্যের উপস্থিতিতে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। রিদির বুকটা কেঁপে উঠলেও সে নড়ল না, ঘুমের ভান করে শক্ত হয়ে শুয়ে রইল। বুকের গভীরে জমা হওয়া আক্ষেপ তখন মোচড় দিয়ে উঠছে—কেন এই সামান্য বুদ্ধিটা আরও ক’টা দিন আগে মাথায় এল না? তাহলে তো এতগুলো দিন সৌহার্দ্যকে ছাড়া শূন্যতায় কেটে যেত না।

সৌহার্দ্য নিঃশব্দে এসে বসল রিদির ঠিক পাশে। এতদিন পর মেয়েটাকে এভাবে এত কাছে পেয়ে তার বুকের ভিতরটা যেন এক নিমেষে শান্ত হয়ে গেল। রিদি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে কি না—তা পরখ করতে সৌহার্দ্য কিছুক্ষণ পলকহীন তাকিয়ে রইল। যখন সে নিশ্চিত হলো যে রিদি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ঝুঁকে এসে রিদির কপালে এঁকে দিল একটা আলতো চুমু, এরপর দুই গালে একে একে বুলিয়ে দিল আরও দুটো গভীর চুমু। তারপর আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে নিঃশব্দ পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল সে।
সৌহার্দ্যের পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই রিদি ধীরে ধীরে মেলে দিল তার চোখ দুটো। তার ঠোঁটের কোণে তখন খেলে গেল এক চিলতে মায়াবী হাসি। মুহূর্তের মধ্যে বিছানা ছেড়ে পা টিপে পা টিপে উঠে সে এগোলো তাদের রুমের দিকে। আজ যে করেই হোক, সৌহার্দ্যের এই অভিমান তাকে ভাঙাতেই হবে।
কিন্তু রুমে পা রেখেই রিদির বুকটা ছাঁত করে উঠল—পুরো ঘরটা একদম ফাঁকা, কোথাও নেই সে। মুহূর্তেই তার মনটা বিষাদে ভরে গেল। সে ভাবল, সৌহার্দ্য বুঝি আবার চলে গেল। ভারী মন নিয়ে যখন রিদি গেস্ট রুমের দিকে ফিরে যাচ্ছিল, হঠাৎ তার নজর পড়ল স্টাডি রুমের আধো-খোলা দরজার দিকে। দরজাটার ফাঁক গলে আসা আলোয় রিদি বুঝে গেল, সৌহার্দ্য সেখানেই আছে।

রিদি রুমে ঢুকে নিজের টি-শার্টটা বদলে গায়ে গলিয়ে নিল সৌহার্দ্যের একটা সাদা শার্ট। ঢিলেঢালা শার্টটা তার হাঁটু পর্যন্ত নেমে এল, আর হাত দুটো এতটাই বড় যে তার আঙুলগুলো প্রায় পুরোটাই শার্টের ভেতরে লুকিয়ে গেল। রুমের আয়নার সামনে নিজের এই রূপ দেখে রিদি লজ্জায় কুঁকড়ে গেল। তবু আজ সে সমস্ত লজ্জা-শরম বিসর্জন দিল—কারণ আজ যে মূল্যেই হোক, সৌহার্দ্যর সব অভিমান তাকে ভাঙাতে হবে।
সৌহার্দ্যের স্টাডি টেবিলটা তখন ল্যাপটপের স্ক্রিনের নীল আলোয় মাখামাখি। ও মগ্ন হয়ে কী যেন টাইপ করছিল। ঠিক তখনই, শব্দহীন পায়ে ঘরে ঢুকল রিদি। পা টিপে টিপে একেবারে সৌহার্দ্যের গা ঘেঁষে দাঁড়াল। লাজুক অথচ চঞ্চল চোখে তাকাল ওর দিকে। তারপর সামান্য ঝুঁকে, নরম গলায় ফিসফিস করে বলল—
“আমাকে কেমন লাগছে ডাক্তার সাহেব?”

রিদির কণ্ঠ পেতেই সৌহার্দ্যের হাতটা কীবোর্ডের ওপর থেমে গেল। সামান্য চমকে উঠল সে। এইমাত্র তো মেয়েটাকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন দেখে এল। তাহলে ও এখানে এলো কীভাবে? মনে মনে ভাবল, এ মেয়ে দেখি ঘুমের নিখুঁত নাটক করছিল। আস্ত এক স্টুপিড।
সৌহার্দ্যে রিদির দিকে তাকাতেই তার মুখটা কেমন যেন কুঁকড়ে গেল, গলা শুকিয়ে তীব্র একটা বিষম খেল। কাশতে কাশতে চরম বিরক্তিতে সে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“আস্তাগফিরুল্লাহ, আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম!”
এরপর আর রাগ ধরে রাখতে না পেরে ধমকে ওঠে সে,
“শয়তানের মতো লাগছে, আউট স্টুপিড মহিলা!”
রিদি তাতে এক চুলও বিচলিত হলো না। বরং কোনো তোয়াক্কা না করে সে সৌহার্দ্যর আরও একটু কাছে এগিয়ে যেতেই সৌহার্দ্য তড়িৎ গতিতে চেয়ার ছেড়ে উঠে এক পা পিছিয়ে গেল। তা দেখে রিদি নিজের শার্টের সামনের আরো একটা বোতাম অবলীলায় খুলে ফেলল, আর চোখের পলকে সৌহার্দ্যের ঠিক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অদ্ভুত এক হাসিতে বলে উঠল—

“এমন করছেন কেন শাশুড়ির ছেলে? মনে হয় বউকে ভয় পাচ্ছেন?”
সৌহার্দ্য ঘরের এদিক-ওদিক আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে বিরক্তিতে মুখটা বিকৃত করে বিড়বিড় করে ফেলল,
“বউকে ভয় পাচ্ছি না, বউয়ের নামে ‘সামনে’ দাঁড়ানো শয়তানকে ভয় পাচ্ছি!”
তারপর রক্তিম চোখে, তীব্র আক্রোশে রিদির দিকে তাকিয়ে হিসহিস করে বলে উঠল—
“বেয়াদব মহিলা, এসব কী পড়ছো তুমি? লজ্জা-শরম কী সব শরবতের মতো গুলিয়ে খেয়েছ?”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫০

রিদির কাছে সৌহার্দ্যের এই রাগ, এই ধমক দুই পয়সারও দাম পেল না। এক মুহূর্তের জন্যও না ভেবে সে লাফিয়ে গিয়ে হঠাৎ করেই সৌহার্দ্যের গলা জড়িয়ে ঝুলে পড়ল। হুট করে এই আকস্মিকতায় ভারসাম্য রাখতে না পেরে সৌহার্দ্য রিদিকে সাথে নিয়ে সজোরে আছড়ে পড়ল বিছানার ওপর। সৌহার্দ্যের বুকের ওপর অবলীলায় এলিয়ে পড়ে রিদি তার বুকে একের পর এক চুমু এঁকে দিতে দিতে নেশাতুর গলায় ফিসফিসিয়ে উঠল—
“নিজেরটা গুলিয়ে খেয়েছি, এবার আপনারটাও খাবো শাশুড়ির ছেলে!”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here