Home অলকানন্দার নির্বাসন অলকানন্দার নির্বাসন পর্ব ৩৩

অলকানন্দার নির্বাসন পর্ব ৩৩

অলকানন্দার নির্বাসন পর্ব ৩৩
মম সাহা

খুব ধীর গতিতে ঘরের মিউজিক যন্ত্রটায় গান বাজছে। কোমল, মিহি সেই গানের সুর। গানের সাথে সাথে একটি মেয়েলি কণ্ঠও তাল মেলাচ্ছে,
“আমারও পরাণে যাহা চায়, তুমি তাই,
তুমি তাই গো…….”
প্রকৃতিতে তখন হিমশীতল বাতাস। গগনে নৃত্য করছে ঘন কালো নভশ্চর। ক্ষণে ক্ষণে অশনির নিখাঁদ আলোয় মর্তধাম উজ্জ্বল হয়ে যাচ্ছে তারার ন্যায়। অম্বরের উচ্চনাদ মনুষ্য জাতির জন্য কিছুটা হলেও ভীতিকর। অলকানন্দাও তার বাহিরে নয়। গগন গহ্বর থেকে আশা বিরাট শব্দের কারণে তার মাঝে মাঝে গানের সুর কেটে যাচ্ছে, তাল গুলিয়ে যাচ্ছে। তবুও সে যন্ত্রের তালে তালে গেয়ে যাচ্ছে।

“তোমারও পরাণে কোন সেই মহৎ পুরুষকে চায়, সানশাইন? আমি কী তাহা জানিতে পারি?”
অলকানন্দার গান থেমে গেল। সাথে থেমে গেল তার কাজ করতে থাকা ব্যস্ত হাত। সে কিছুটা চমকে পিছে তাকাতেই দেখল ভিনদেশী পুরুষের সিক্ত দেহখানা। নন্দা একবার উপর থেকে নীচ অব্দি খুব ক্ষীণ ভাবে চোখের মনি ঘুরিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলল। শ্বাস গুলো তার নিরবতায় গল্প শুনিয়ে গেল এক নৃশংসতার। স্টিফেন হয়তো পুরো গল্প বুঝল না তবে দীর্ঘশ্বাসের সারমর্ম বুঝল। শুধাল,
“কে সে মানুষ? যার কথা শুনিলে সানশাইনের বুক ভারী হইয়া যায় দীর্ঘশ্বাসে?”
“নেই তেমন কেউ।”

নন্দার কাঠ কাঠ জবাবে হাসল স্টিফেন। চুলের সরু ধারা বেয়ে বৃষ্টির জল নতুন রঙের কবিতায় টুপটাপ ছন্দে গড়িয়ে পড়ছে। তার হাসির ভাষারা বড়ো অর্থবহ তা আর বুঝতে বাকি রইল না নন্দার। নন্দা ভ্রু কুঁচকালো, কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে জিজ্ঞেস করল,
“হাসছেন কেন? অদ্ভুত!”
“হাসিবো না? যাহার সানশাইনের মতন অমন সুন্দর প্রেমিকা কিংবা স্ত্রী আছে তার তো দিন-রাত হাসির মাঝেই থাকা উচিত বলিয়াই আমি মনে করি।”

কথা থামতেই অলকানন্দা চোখ বড়ো বড়ো করে চাইল। স্টিফেনের মুখের কোণে বাঁকা হাসিরা খেলা করছে। নন্দাকে নিয়ে খুব তীক্ষ্ণ একটি ঠাট্টা যে সে অকপটেই করে ফেলেছে তা আর বুঝতে বাকি নেই নন্দার। সে কিছু বলতে গিয়েও লোকটার হাসি দেখে বলতে পারল না। বরং নিজেও ফিক করে হেসে দিল। নন্দার হাসির শব্দে মুগ্ধতারা ঝমঝমিয়ে যেন পড়তে শুরু করল। মেয়েটার হাসি সুন্দর, যেমন করে সুন্দর আকাশ কিংবা সমুদ্র ঠিক তেমন সুন্দর।
তন্মধ্যেই অ্যালেন ছুটে এলো তাদের ব্যাক্তিগত কক্ষে। হয়তো প্রয়োজনেই এসেছিল। কিন্তু কপোত-কপোতীর এহেন হাস্যোজ্জ্বল দৃশ্যে সে নিজের প্রয়োজন ভুলে গেলো। কেবল মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে চোখের তৃষ্ণা মিটিয়ে নিল সেই দৃশ্য দেখে। স্টিফেন খুব সহজে হাসে না। তাকে খুব হাসতেও দেখা যায় না। নন্দাও তেমন। খুব কমই হাসি থাকে তার মুখে। অথচ কম হাসা দু’জন ব্যাক্তি যখন হাসে তখন পুরো পৃথিবীর মুগ্ধ দৃষ্টি হয়তো তাদের উপরই থাকে।
অ্যালেনের ভ্রম কাটলো। দরকারী কাজটা একটু বেশিই গুরুতর বলেই তার এমন সুন্দর দৃশ্যে না চাইতেও হস্তক্ষেপ করতে হলো। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে তাই বলল,

“স্টিফেন, বৌঠান, মে আই কামিং?”
আরেকটি পুরুষালী কণ্ঠ ভেসে আসতেই নন্দা থেমে গেল। তার হাসির প্রশস্তও কমে এলো। দরজার দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আসুন, ঠাকুরপো।”
অ্যালেন সাথে সাথেই ঘরে প্রবেশ করল। খুব ব্যস্ত গতিতে স্টিফেনের উদ্দেশ্যে বলল,
“স্টিফেন, তুমি যাহা বলিয়াছ তাহা করিয়া ফেলিয়াছি। সকলে আসিয়া ভীড় করিয়াছে। বাহিরের আবহাওয়া মোটেও উপযুক্ত নহে। কাজটা দ্রুত সারিয়া ফেললে বোধকরি ভালো হইতো। তারপর নাহয় আবার হাসিও।”
শেষের বাক্যে অবশ্য মশকরার ছাপ। নন্দাও বেশ লজ্জা পেল। দ্রুত অন্যদিকে চলে গেল। কাজের বাহানায় লজ্জা লুকানোর প্রচেষ্টা আরকি। স্টিফেন মাথা দুলিয়ে বলল,

“আসিতেছি। এত সুন্দর দৃশ্যে তোমার বা’হাত খানা প্রবেশ করিয়া দিয়া এখন আর মহৎ হইতে হইবে না। তোমারও ব্যবস্থা করিতেছি খুব শীগ্রই।”
এবার অ্যালেন লজ্জা পেল। দ্রুতই সে সেখান থেকে প্রস্থান নিল। এর আগে অবশ্য বৌঠানের থেকে অনুমতি নিতে ভুললো না। নন্দা বরাবরই এই লোকটার আচরণে মুগ্ধ হয়। ছেলেটার সাথে কমপক্ষে হলেও নন্দার বয়সের পার্থক্য দশ-বারো বছর। অথচ অ্যালেন সবসময় নন্দার সাথে কথা বলার সময় মাথা নিচু করে কথা বলে এবং সেই মুহূর্তে তার কণ্ঠস্বর থাকে একবারে কোমল। আর এতটা সম্মানের সঙ্গে কথা বলে যে নন্দার তার প্রতি ভক্তিতে মন ভোরে উঠে।
অ্যালেন চলে যেতেই স্টিফেন নন্দার পাশে এসে দাঁড়াল। নন্দার এলোমেলো থাকা শাড়ির আঁচল কিছুটা ভাঁজ করে দিয়ে বলল,

“তৈরী হও সানশাইন। আজ তোমার সকল কলঙ্ক মুছিয়া ফেলিবার দিন। তবে সানশাইন, এ পৃথিবীতে তোমাকে কেন এই জনমেই আমার হইতে হইল। এই বিষে ভোরা জনমে তোমার মতন অমৃত কেন পাইতে হইলো? যাকে দীর্ঘস্থায়ী ধরিয়া রাখিবার সাধ্য আমার নাই।”
কথা থামতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল স্টিফেন। নন্দা অবশ্য কথার মানে না বুঝে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। স্টিফেন তাড়া দিল। কিন্তু নন্দার মাথায় স্টিফেনের বলা বাক্যই কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে। কিসের কলঙ্ক মুছবে স্টিফেন!

বাহিরের ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎ চমকানোর খেলায় অন্নপূর্ণা কেবল নিশ্চুপ দর্শক। গবাক্ষের কোল ঘেঁষে সে আফসোস পুষে রাখে রোজ। জীবনটা তো এমন হওয়ার কথা ছিল না। এক লহমায় তার সুন্দর, গুছানো জীবন এলোমেলো হয়ে গেলো। তার পবিত্র জীবনে লাগল কলঙ্কের কালি। যে কালি কোনো কিছুর বিনিময়ে আর কখনো উঠবে না। তার গানের কণ্ঠ বরাবরই দারুণ ছিল। সকলের কতো প্রশংসা কুড়িয়েছে সে কণ্ঠ দিয়ে! আজ গান দূরে থাক, কথাও বের হয় না। আফসোসের এক কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় মন-জমিন।
তার ধ্যান ভাঙে দরজার ঠকঠক শব্দে। সে চোখ ফিরিয়ে দরজার দিকে তাকাতেই অ্যালেনের হাস্যোজ্জ্বল মুখ দেখতে পেল। সাদা ধবধবে চামড়ায় হাসিটা একটু বেশিই সুন্দর লাগে অন্নপূর্ণার পানে। অন্নপূর্ণার ধ্যান ভাঙে অ্যালেনের কণ্ঠে,

“আসিতে পারি?”
অন্নপূর্ণা মাথা নাড়ায়। ইশারায় ভেতরে আসার অনুমতি দেয়। অনুমতি পেতেই অ্যালেন ভেতরে প্রবেশ করে। হাসি মুখেই প্রশ্ন ছুঁড়ে,
“ভালো আছেন?”
অন্নপূর্ণা ঘাড় কাঁত করে উত্তর দিল। জানালো তার সবটুকু ভালো না থাকার পৃথিবীতে সে ভালো আছে। কিন্তু ইশারা মিথ্যা বলতে জানলেও চোখ যে কখনো মিথ্যা বলে না। তার ভালো না থাকার বহিঃপ্রকাশে চোখ গুলো যে জ্বলজ্বল করছে। অশ্রু লুকানোর ভয়াবহ চেষ্টা চট করেই ধরে ফেলল অ্যালেন। ফিক করে হেসেও দিল সে। বলল,
“মিথ্যেও বলিতে পারেন আপনি! পারিলেও মিথ্যে বলায় বড়োই কাঁচা আপনি। আগে শিখিতে হইবে ভালো করে মিথ্যা কীভাবে বলিতে হয়। তারপর বলিবেন, কেমন?”
অন্নপূর্ণা ভাবেনি এমন ভাবে হাতে-নাতে সে ধরা পরে যাবে। তাই কিঞ্চিৎ লজ্জাও পেল সে। চোখ ঘুরিয়ে নিল সাথে সাথে। তা দেখে অ্যালেন আবার হাসল। ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
“আর চোখ ঘুরাইতে হইবে না। শীগ্রই তৈরী হইয়া নিন, আমরা এক স্থানে যাইব। ভয় নেই, কেবল আমি আর আপনি না, বৌঠানও যাইবে। তাড়াতাগি তৈরী হোন।”
অন্নপূর্ণা আর জিজ্ঞেস করার সুযোগ পেল না কোথায় যাবে আর কেনই বা যাবে। যেমন হুট করে অ্যালেন এসেছিল ঠিক তেমন করেই সে প্রস্থান নিল৷

বাহিরে তখন ঝড়ের জন্য প্রস্তুত প্রকৃতি। এই হয়তো আকাশ-পাতাল উজাড় করে ঝড় নামবে। চারপাশ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে। যদিও রাত নয় সময়টা কিন্তু দেখতে রাতের চেয়েও যেন আঁধার। নন্দাদের গাড়িটি তাদের গ্রাম পেরিয়ে তার এককালীন শ্বশুর বাড়ির গ্রামে চলে এসেছে। নন্দা প্রশ্ন করার আগেই গাড়িটি তার নিজ স্থানে থামল। নন্দা গাড়ি থেকে নামতেই চারপাশের পরিচিত সেই দৃশ্য দেখতেই চমকে উঠলো। এটা সেই জায়গা যেখানে নন্দাকে বেঁধে রেখে বেধড়ক মারধর করা হয়েছিল। নন্দার লোমকূপ দাঁড়িয়ে গেল। সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতি বারবার উঁকিঝুঁকি দেওয়া আরম্ভ করল তার মস্তিষ্কে। সে ঘটনার অনেকদিন হয়ে গেলেও নন্দার যেন আজ খুব করে শরীর যন্ত্রণায় ফেটে পড়ছে। কী মার! কী নৃশংসতা! হুট করেই নন্দা যেন স্থান, কাল, পাত্র ভুলে গেলো। স্টিফেনের হাত জাপটে ধরে কেমন আকুতি-মিনতি ভরা কণ্ঠে বলে উঠল,

“আমাকে বাঁচান, আমাকে বাঁচান। এখান থেকে নিয়ে চলুন এক্ষুনি। আমাকে বাঁচান।”
নন্দার অস্থির উত্তেজনা সাথে আহাজারিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল তার শাশুড়ি কাদম্বরী দেবীসহ অন্নপূর্ণাও। অ্যালেনের কণ্ঠেও ভীত ভাব। মেয়েটার হুট করে এমন পরিবর্তনেই সকলে অবাক হলো কেবল নির্বাক রইল স্টিফেন। আলতো হাতে নন্দার বাহু জড়িয়ে ধরে ভরসা দিল। শান্ত কণ্ঠে বলল,
“তোমার কিছু হইবে না, সানশাইন। যার আস্ত একটা স্টিফেন আছে তার চিন্তা কিসের? তোমার জন্য আমি আছি তো! চোখ খুলো।”

অলকানন্দার নির্বাসন পর্ব ৩২

নন্দা তবুও ভয় পেল। চোখ না খোলার যেন পণ করেছে সে। অতঃপর স্টিফেন কণ্ঠ গাঢ় করল,
“চোখ খুলিতে বলিয়াছি তোমায়। চোখ খুলিবে এক্ষুণি।”
নন্দা সাথে সাথে চোখ খুলল। সামনে দৃষ্টি পড়তেই তার চক্ষু যেন চড়কগাছ হয়ে গেলো। সেদিনের মতন জায়গাটা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে গ্রামবাসী। তাদের হাতে মশালের উত্তপ্ত আগুন। তাদের সামনেই সেদিন নন্দাকে যেই বৃক্ষের সাথে বেঁধে রেখেছিল সেই বৃক্ষের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে একটি লোককে। যাকে নন্দা চেনে। বা বলা যায়, যে নন্দার সর্বনাশের কারণ।

অলকানন্দার নির্বাসন পর্ব ৩৩ (২)