অলকানন্দার নির্বাসন পর্ব ৩৩ (২)
মম সাহা
সন্ধ্যার আকাশে তখন কালো মেঘপুঞ্জ ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। তুমুল ঝড় আশার আশঙ্কা অথচ এক ফোঁটা বাতাস নেই চারপাশে। কিছুক্ষণ আগ অব্দিও বাতাসের বেগে চোখ মেলে রাখা দুষ্কর হয়ে যাচ্ছিল কিন্তু এখন সব থম মেরে গিয়েছে যেন। ভয়ঙ্কর ঝড় আসার পূর্ব লক্ষণ বলা যায়। গ্রাম বাসীদের হাতে হাতে মশালের আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে। চোখে উপচে পড়া কৌতূহল। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে কিছুই তাদের বোধগম্য নয়। তবে উপভোগ্য কিছু যে হবে তা তাদের ভালো করেই অবগত। নন্দা চারপাশে ভালো করে খেয়াল করতেই দেখল বিহারিণী মহলের মোটামুটি সকল সদস্যই এখানে উপস্থিত। তার শাশুড়ি সুরবালা হতে শুরু করে তার দেবর মনোহর অব্দি উপস্থিত। নন্দা গাছে ঝুলিয়ে রাখা লোকটার দিকে এগিয়ে গেল। ধীর পায়ে খুব নিকটে গেল লোকটার। তার গা কাঁপচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটাও যেন ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। একটা শক্ত ভিত্তি চাচ্ছে সে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য। চোখ-মুখ আঁধার করে আসছে। এই যেন পৃথিবী অন্ধকার করে সে লুটিয়ে পড়বে মাটিতে৷ কিন্তু আজ নন্দা ভিত্তি হারা হয়ে গড়াগড়ি খেল না মাটিতে কারণ তার সাথে তার স্টিফেন আছে। যে মানুষটা দিন-রাত তাকে কেবল আগলে রাখছে। স্টিফেনের শক্ত হাতই হলো নন্দার ভরসা। লোকটা গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“তুমি হইলে ঝড়ে অটল দাঁড়িয়ে থাকা বটবৃক্ষ। তোমার অস্থির ব্যাক্তিত্ব বড়োই দৃষ্টিকটু৷ বলিয়া ছিলাম না? যেখানেই থাকিবে, তোমার অবস্থা যেন হয় রাণীর মতন। তবেই না লোকে সম্মান দিবে!”
নন্দা দু-চোখ ভোরে স্টিফেনকে দেখল, প্রতিনিয়ত যে মানুষটা তার শক্ত খুঁটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার পাশে। রাণী হতে আসলে রাজপ্রাসাদ লাগে না, এমন একটা প্রিয় মানুষ থাকলেই যথেষ্ট। নন্দা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করল এবং সফলও হল। দীর্ঘশ্বাসে বেরিয়ে গেল তার সকল ভীতি ভাব। হুট করেই যেন সে চরম সাহসী হয়ে উঠলো। নিজের কলঙ্ক ঘুচানোর জন্য মরিয়া হয়ে গেল। ছুটে গেল গাছের ঝুলন্ত অবস্থায় থাকার লোকটার দিকে। যে লোকটার চোখে একদিন নন্দা কাম দেখেছিল আজ সেই চোখেই বাঁচতে চাওয়ার আকুতি। যে আকুতি একদিন নন্দার চোখে ছিল অথচ লোকটা মূল্যায়ন করেনি। নন্দা স্টিফেনকে উদ্দেশ্য করে বারংবার বলতে লাগল,
“সেদিন রাতে ও-ই আমার সাথে খারাপ আচরণ করতে চেয়েছিল। আমাকে নষ্ট করতে চেয়েছিল। ওর জন্য আমার সব সম্মান, মর্যাদা এক নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়েছিল। যাদের চোখের মনি ছিলাম তারাই আমাকে ছুঁড়ে মেরেছিল। যে গ্রামবাসী সম্মানের স্থান দিয়েছিল একদিন, সে গ্রামবাসীই আমাকে মেরে ফেলতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। কেউ আমাকে সেদিন বিশ্বাস করেনি। আমাকে শেষ করে দিয়েছিল মানুষের অবিশ্বাস।”
স্টিফেন গাঢ় চোখে আশেপাশে চাইল। গ্রামবাসীদের চোখের ভাষা বুঝার চেষ্টা করল হয়তো। তাদের চোখে অগাধ আগ্রহ। অনাকাঙ্খিত কিছু জানতে চাওয়ার তৃষ্ণা। স্টিফেন ভরাট কণ্ঠে বলে উঠল,
“এই যে আপনারা, আপনারা সকলে জানেন তো ও কে?”
স্টিফেনের আঙুল নন্দার দিকে। গ্রামবাসীরা উপর-নীচ মাথা দুলালো। কয়েকজন জবাব দিল,
“হ্যাঁ, জানবো না কেন? ও অলকানন্দা।”
“ওর সাথে সেদিন কী করিয়া ছিলেন মনে আছে? কীভাবে আপনাদের থেকে বাঁচাইয়া আমি এই গ্রাম থেকে ওকে নিয়া গিয়াছিলাম সে কথা নিশ্চয় আপনাদের স্মরণে আছে?”
কয়েকজন মাথা নাড়াল। কয়েকজন পাথরের মূর্তির ন্যায় তাকিয়ে থেকে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করল। স্টিফেন অ্যালেনের দিকে তাকাল, ভয়ঙ্কর কণ্ঠে নির্দেশ দিল,
“এক্ষুণি তলোয়ার নিয়ে আসো অ্যালেন।”
তলোয়ারের কথা শুনতেই লোক সমাগসে কলরব উঠল। ভয়ে অনেকে কয়েকপা পিছে চলে গেলো। গাছের সাথে বাঁধা লোকটা চেঁচিয়ে উঠল। অসহায় কণ্ঠে বলল,
“আমাকে ছেড়ে দেন, সাহেব। আমি ইচ্ছেকৃত কিছু করতে চাইনি। আমাকে ছেড়ে দেন।”
স্টিফেন যেন কোনো কথা-ই শুনলো না। চোখ-মুখ তার ভয়ঙ্কর। তাচ্ছিল্য করে সে বলল,
“সেদিন আমার সানশাইনও বাঁচিতে চাওয়ার আকুতি করিয়া ছিল। তাকে ছাড়িয়া ছিলা কী?”
লোকটা কথা বলল না। হাউমাউ করে কান্না শুরু করল। অ্যালেনও তন্মধ্যে ধারালো একটি তলোয়ার নিয়ে উপস্থিত হলো। যার তীক্ষ্ণতা দেখে লোকটা হতভম্ব। আকুতি ভোরা কণ্ঠে নন্দার উদ্দেশ্যে বলতে লাগল,
“আমাকে ছেড়ে দেন, বৌঠান। আমি তো আপনার সাথে কিছু করিনি।”
“সুযোগ পেলে তো আমাকে ছিঁড়ে খেতেও দু’বার ভাবতেন না। ভাগ্যিস সেদিন পালাতে পেরে ছিলাম। নাহয় কী ছাড়তেন আমাকে আপনি? আমিও তো আকুতি করে ছিলাম।”
লোকটা চিৎকার করে উঠল। বাঁচতে চাওয়ার আকুতি মিনতি করতে লাগল বারবার। স্টিফেন তলোয়ার নিয়ে এগিয়ে গেল তার দিকে। লোকটা আর টিকতে না পেরে অবশেষে সুরবালা দেবীর উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
“মা ঠাকুরণ, আমাকে বাঁচান। আপনার পরিবারের মানুষ বলাতেই তো আমি এসব করে ছিলাম। নাহয় কী আমি জানতাম যে বৌঠান এখানে আসবে? আমাকে জানিয়েছিল বলেই তো জেনেছিলাম। করতে বলেছিল বলে এমনটা করেছি। আমাকে বাঁচান।”
সুরবালা দেবীর সাথে সাথে উপস্থিত সকলে চমকে গেল। কেবল চমকালো না স্টিফেন। তার ঠোঁটে বাঁকা হাসি। তবে সে হাসির আকার, আকৃতি নেই। বড়ো আড়ালের হাসি তা। সুরবালা দেবী চমকে উঠলেন। অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বললেন,
“কে বলেছে এসব করতে! আমার বাড়ির মানুষ এমন বলবে কেন? কে বলেছে এমন!”
লোকটা সামান্য শ্বাস নিল, উচ্চ স্বরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আপনার বাড়ির আরেক পুত্রবধূ কৃষ্ণপ্রিয়া আর আপনাদের বাড়িরই একজন পুরুষ নবনীল বাবু এ কাজটি করতে বলেছিলেন। তার বিনিময়ে অনেক স্বর্ন মুদ্রা আমাকে দিয়ে ছিলেন। এমনকি তারা এটাও বলেছিলেন যেন বৌঠানের সাথে তেমন খারাপ কিছু না করি। এর আগেই তারা গ্রামবাসীকে খবর দিয়ে নিয়ে এসে বৌঠানকে ফাঁসিয়ে দিব। কেন ফাঁসাবে, কী তার কারণ কিছুই জানা নেই আমার। আমাকে যা বলা হয়েছিল কেবল তা-ই করেছিলাম। তবে শেষ অব্দি বৌঠানের এমন রূপ লাবণ্য দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি বলে তার শরীরে হাত দিয়ে ফেলেছিলাম। তার এত সুন্দর রূপ। যে কেউই তো…….”
বাকি কথা বলতে পারল না আর লোকটা। তার আগেই তার বিকট চিৎকার ভেসে এলো। সকলে তৎক্ষণাৎ চোখ বন্ধ করে ফেলল। লোকটার জিহ্বাটা মুখ থেকে আলাদা করে নিয়েছে স্টিফেন। স্টিফেনের চোখের সাদা অংশ লাল রক্তজবার ন্যায় রূপ লাভ করেছে। কপালের রগ ফুলে একাকার। হিংস্র চোখে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে সে বলল,
“সানশাইনের ব্যাপারে আর একটা বাজে শব্দ বাহির যেন নাহয় এই মুখ দিয়া তাই এই ব্যবস্থা করিলাম। শুধু ও না, সেদিন যারা যারা সানশাইনের সাথে অন্যায় আচরণ করিয়াছিল সকলকে তার হিসাব দিতে হইবে। হোক সরাসরি কিংবা ঘুরিয়ে। হিসাব আমি নিবোই।”
নন্দা তার মুখ চেপে ধরল। সুরবালা দেবীর কাছে সবটা কেমন ঘোরের মতন ঠেকল। নবনীল আর কৃষ্ণপ্রিয়া কি-না শেষমেশ এমন একটা কাজ করল! এত নিচু কাজ! মনোহর হাসল। তার চোখে অশ্রুরা টলমল করছে। সে সুরবালা দেবীর দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলল,
“আমি বলেছিলাম না বড়োমা? বৌঠান এমন কিছু করতে পারেনা। বৌঠান ফুলের মতন পবিত্র, আমি জানতাম। এই মানুষটার সাথে আমি নিজেই কতকিছু করতে চেয়েছিলাম কিন্তু তার পবিত্রতার কাছে আমি যে বড়ো নগন্য। আমার মতন একটা নগন্য মানুষ এটা বিশ্বাস করেনি অথচ তোমরা বিশ্বাস করেছিলে। কীভাবে করেছিলে! পবিত্রতায় সেদিন কলঙ্ক লেপেছিলে। আজ বুঝলে তো!”
কথা থামিয়ে সে নন্দার কাছে হাঁটু মুড়ে বসলো। দু-হাত জোর করে মাথা নত করে বলল,
“আপনার সাথে অনেক খারাপ আচরণ করেছিলাম, বৌঠান। আমাকে ক্ষমা করবেন। আর কৃষ্ণপ্রিয়ার দোষের শাস্তি কীভাবে দিবেন! ও নিজেই দিয়ে দিয়েছে নিজেকে শাস্তি। মেয়েটা বড়ো বোকা। সংসার, স্বামী ভেবেই নিশ্চয় কাজটা সে করেছিল। আর কাজটা যে ভুল তা উপলব্ধি করতে তার বোধহয় দেরি হয়ে গিয়েছিল যার জন্য সে গলায় কলসি বেঁধে মরল। সেদিন বুঝিনি, তবে আজ বুজছি৷ তবুও যদি শাস্তি দিতে চান তবে আমাকে দেন। ওর স্বামী হিসেবে আমারও তো দায়িত্ব আছে শাস্তি ভাগ করার। মেয়েটা নিশ্চয় সংসারের ভালো করতে গিয়ে আপনার ক্ষতি করেছিল। আমি তার শাস্তি মাথা পেতে নেব।”
অলকানন্দার নির্বাসন পর্ব ৩৩
গ্রামবাসীদের মুখেও কোনো শব্দ নেই। নিশ্চুপ সুরবালা। নন্দন মশাই আমতা-আমতা করে বলল,
“নবনীল কোথায়? বেশ কয়েকদিন যাবত তো ওকে পাওয়া যাচ্ছে না। ধরা পড়ে যাবে বলেই কী গা ঢাকা দিয়েছে?”
নবনীলের খোঁজ পড়তেই সকলের মাঝে গমগমে ভাব শুরু হয়ে গেলো। কোথায় নবনীল? কোথায় লুকালো!
এতশত কথার মাঝে চুপিসারে ভাবছে একটি মস্তিষ্ক। নবনীলের মাংস মাগুর মাছদের খেতে কেমন লেগেছিল? এত পাপ যে করেছে তার মৃত্যু আরও ভয়ঙ্কর হওয়া উচিত ছিল না?
