অশ্রুবন্দি পর্ব ৪৮
ইসরাত জাহান ফারিয়া
প্রতিবারই মনোমালিন্যের পর এমন কখনোই হয়নি
যে ইস্মি ইজহানের কথা বলা বন্ধ ছিল! কিন্তু সেদিনের রাগারাগির পর আজ নিয়ে দুইদিন, ইজহানের খাওয়াদাওয়া, কথা বলা সব বন্ধ! প্রথমদিন ইস্মি রাগের বশে নিজেও কথা বলেনি, সামনেও আসেনি। কিন্তু এলিজার থেকে যখন শুনলো ইজহান কিছুই খাচ্ছে না, জোর করেও কেউ একদানা ভাত ওকে খাওয়াতে পারেনি তখনি ওর টনক নড়ল। তবুও দুপুর পর্যন্ত আসেনি সাধাসাধি করতে। কিন্তু যে লোক একবেলা খাবার দেরিতে পেলেই হট্টগোল শুরু করে, মেজাজ তুঙ্গে উঠে যায়, পেটে ব্যথা শুরু হয়ে যায় সে নাকি সত্যিই আজ নিয়ে দু’দিন একেবারে না খাওয়া? রাগ-ক্ষোভ , অভিমান সব কোথায় গায়েব হয়ে গেল! সন্ধ্যার পর আর থাকতে পারল না ইস্মি। ইহসানকে দিয়ে ইজহানের সব পছন্দের বাজারসদাই আনালো। ভাইয়ের নাটকে ইহসান নিজেও বিরক্ত ছিল; কিন্তু সৃজার চোখ রাঙানির ভয়ে ‘টু’ শব্দটি করল না। এমনকি সৃজা কথা আদায় করে নিলো ইহসানের থেকে; অকারণে, অহেতুক ইজহানের উপর হাত চালাচালি করা যাবে না, মুখও খারাপ করা যাবে না। ইজহান যেসমস্ত কাণ্ড করে বেড়ায় তাতে
ধৈর্য টিকিয়ে রাখা দায়! চাইলেও সেটা পারা যায় না।
সৃজার কন্ডিশনে ইহসান বিপাকে পড়ল। তবুও কী আর করা! মহারাণীর কথা শিরধার্য বলে সে এসব অন্যায় আদেশ মেনে নিলো।
বাজারসদাই ও প্রয়োজনীয় উপকরাণাদি আনার পর শেফালি বুয়াকে নিয়ে ইস্মি নিজেই রান্না করতে গেছিল, কিন্তু নীলু ফুপি আর সৃজার জন্য পারেনি। ওকে বসিয়ে রেখে সৃজাই রান্নাঘরে ঢুকেছে, তবে ইহসান ওকে সাহায্য করেছে। রান্না শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই ভাতের থালা নিয়ে ঘরে ছুটে এসেছে ইস্মি। কিন্তু ওকে দেখেই ইজহান বিছানায় পাশ ফিরে যে শুয়েছে তো শুয়েছেই, উঠার লক্ষ্মণ নেই। বহুদিন পর কঠিন একদফা রাগারাগি হয়েছে ইজহানের সাথে ইস্মির। তাই অস্বস্তিটাও নেহাতই কম নয়। কে আগে কথা বলা শুরু করবে এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে দু’জনেই। ইস্মির যদিও বুক পুড়ছিল তবুও প্রথমেই একেবারে গদগদ আচরণ দেখাতে পারল না। রয়েসয়ে ঢোক গিলে বলল, “খাবার এনেছি, উঠুন।”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
বলল ঠিকই, কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া পেল না ইজহানের। ইস্মি হতাশ ও ভঙ্গুর চোখে তাকিয়ে রইল।তার হাতে ভাতের প্লেট। তাতে দেশি মুরগীর রোস্ট আর বাসমতি চালের ঝরঝরে সাদা ভাত। খাসির মাংস, এক টুকরো কাগজি
লেবু আর টকদই দিয়ে শশার একটা সালাদ, সঙ্গে বোরহানি। তরকারিতে একদম ঝাল দেওয়া হয়নি, হলুদও একটু। অন্যান্য মশলাও কম দেওয়া হয়েছে। ইজহানের পছন্দের সব রান্না। কিন্তু লোকটা দেখো, খাচ্ছে না। কথাও বলছে না। ইস্মির এবারে কান্নার মতো পেল। উঠে গিয়ে বিছানার ওপাশে বসলো। কিন্তু ওকে দেখেই বিদ্যুতের গতিতে অন্যপাশ ফিরে গেল ইজহান। ইস্মির প্রচন্ড রাগ বাড়লো এবারে। উঠে আবারও অন্যপাশটাতে গিয়ে বসলো। ইজহান আবারও এমন করলো, ইস্মিও…করতেই থাকলো এপাশ-ওপাশ! বিরক্ত হয়ে ইজহান একসময় উঠে পড়লো, বিছানা থেকে নেমে পায়ে স্যান্ডেল চাপিয়ে চলে গেল বারান্দায়, ঠাস করে দরজা আটকে ফুঁসতে শুরু করল। এসে বলে কি-না, ‘খাবার এনেছি, উঠুন!’ হুহ! এত কীসের ঠেকা তার ঐ মহিলার জন্য? এত প্রেম সে দেখাবে না। বেশি আদর দেয়, বেশি চোখে হারায় বলে এই মহিলা তাকে পেয়ে বসেছে। দু’দিন ধরে সে না খাওয়া, ক্ষিধে নিয়ে সে ভেতরে ভেতরে সে মরে যাচ্ছে অথচ এই মহিলা আজ তার পছন্দের রান্না নিয়ে সাধাসাধি করছে? কী মনে করে , সে খাদক? সারাদিন খাইখাই করে? খাইয়ে তাকে ভুলানো যায়?
ইস্মিতা কী ভেবেছে, এসব দেখলেই সে বউয়ের কঠোর আচরণ ভুলে যাবে? ওর পিত্তি ফেটে যাচ্ছে অথচ সে চুপ!
কেন চুপ? রাগে চুপ।
এদিকে ইস্মি বুঝতে পারছে না কীভাবে এই লোকের জেদ ছাড়াবে। এই ধুরন্ধর লোক কখনোই নিজের ভুল দোষ মেনে নেয় না, স্বীকারও করে না। তাকেই সবসময় নত হতে হয়। মানছে তারও ভুল আছে, কিন্তু সে কী জানতো ঐ ফেরিওয়ালা লোকটা তার দিকে চেয়ে আছে, দেখছে ওকে আপত্তিকর চোখে? জানতো তো না। ভালোভাবে বললে ইস্মি তো আর আবদার করতো না, বারান্দায় বসতোও না, কিন্তু ইজহান কী করল? ওকে সাবধান না করে উল্টো ওকেই দোষারোপ করল। টবটা যে ফেলল, যদি ঐ লোকের কিছু হতো? বড়সড় একটা ঝামেলা বাঁধতো না? বেড়াতে এসে এমন ঝুটঝামেলা কি ভালো লাগতো? নীলু ফুপি, এলিজার সামনে কতটা লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়েছে ইস্মি! অথচ লোকটা ওকে বোঝে না৷ ইস্মি বারান্দার জানালার পাশে একটা চেয়ার টেনে এনে বসলো। শব্দ শুনে ইজহান একটু তাকালেও চট করেই আবার দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। ইস্মি আড়চোখে তা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “রাগ করে না খেয়ে থাকুন আপনি, আমিও না খেয়ে থাকব, ঔষধও নেব না৷ তখন যেন কেউ আমাকে কিছু বলতে না আসে৷ বললেও আমার কিছু যায়-আসবে না৷ আমিও মানুষ, আমারও জেদ আছে৷”
ইস্মি ভেবেছিল এসব বললে হয়তো ইজহান নরম হবে, বেরিয়ে আসবে। কিন্তু অনেকক্ষণ পেরিয়ে যাওয়ার পরেও তার কোনো লক্ষ্মণ দেখা গেল না। এদিকে তারকারি সব ঠান্ডা হয়ে গেছে, ভাত শুকিয়ে খড়খড়৷ এই লোক যদি খেতে রাজিও হয় তবুও এই ঠান্ডা ভাত-তরকারি খাবে না। এতগুলো খাবার নষ্ট হবে; ইস্মি আর অপেক্ষা করল না, খাবে না বললেও বাচ্চার কথা চিন্তা করে ভাত-তরকারি সে নিজেই খেয়ে নিলো। খেয়েদেয়ে সব রেখে এসে দরজা আটকে আবারও জানালার কাছে গিয়ে বসল। চেয়ারে বসে রেলিংয়ে পা তুলে বসে আছে ইজহান। মাথাটা পেছনে হেলানো। একহাত দিয়ে চোখ ঢাকা। হাওয়ায় কপালে থাকা চুলগুলো উড়ছে। পরণের ট্রাউজার একটা কোনোমতে হাঁটুর নিচে আরেকটা টাখনুর কাছে গোটানো। কালো রঙের টি-শার্টের কলার একদিকে বাঁকা হয়ে আছে৷ ফর্সা মাংসপেশির একটু নিচে থাকা লাল রঙের তিলটা জ্বলজ্বল করছে।
এত সুন্দর এই লোকটা, অথচ বিয়ের প্রথমদিকে যখন জবরদস্তি করে আদর করতে আসতো ইস্মির কাছে ওকে বীভৎস মনে হতো। আদর নেবে না বলে রাগে ওর পেশিতে কামড় বসিয়ে লাল করে দিতো। মাথার চুলগুলো টেনে ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করতো। কিন্তু আদর নামক যন্ত্রণা থেকে রেহাই পেতো না। ইজহান যেমন আদর দিতো, তেমনি নিজেও আদর আদায় করে নিতো ইস্মির কাছ থেকে জোর করেই। আদর না করলে ব্ল্যাকমেইল করে করে আদর নিতো এই বর্বর লোক৷ সেসময়টাতে অসহ্য হয়ে কত ভাবতো, এই লোককে সে ছেড়ে গিয়ে উচিৎ শিক্ষা দেবেই। কিন্তু পরে গিয়ে আর পারলো না, সুযোগ পেয়েও না। বাঁধা পড়ে গেল এই লোকের সব বর্বরতা, আদর আর কঠিন পাগলামোতে। বাবা-ভাইয়া কত বোঝালো, এই পাগল একদিন তোকেই মেরে ফেলবে, ইস্মির তখন মনে হয়েছিল মরণটা এই লোকের হাতেই হোক, তবুও তার কাছ থেকে দূরে গিয়ে নয়। ও দূরে গেলে এই লোক তো নিজেই মরে যাবে৷
স্ত্রী হয়ে স্বামীর মৃত্যুর কারণ কীভাবে হবে সে? এরচেয়ে ভালো নয়, সে নিজেই মরে যাক এই লোকের অবাধ্য ভালোবাসায়? ইস্মি জানালার গ্রিল গলিয়ে উদাসীন চোখে আকাশপানে তাকায়, মনে মনে কামনা করে এই অবুঝ লোক যাতে একটু বুঝের হয়, সুস্থির হয়! চোখ নামানোর সময় চন্দ্রালোকের দ্যুতিতে নিজের সুর্দশন স্বামীর রুপের বহর দেখে ইস্মি একটু থমকায়, ঠোঁটে হাসি খেলে। পরক্ষনেই থেমে ইজহানকে উদ্দেশ্য করে বলে, “দেখুন আপনার ভাগের খাবার আমি খেয়ে নিয়েছি৷ পরে ভুল ধরতে আসবেন না যেন, আপনাকে রেখে কেন খেয়েছি! আপনার মায়ের কথা চিন্তা করেই খেয়েছি। আপনি রাগ করেই থাকুন। বরং আরো বেশি করে রাগ করুন। এখনি সময় রাগ দেখানোর, পরে আর পাবেন না ইস্মিতাকে। যে সবসময় আপনার রাগের কারণ হয়, আর রাগ ভাঙ্গারও কারণ হয়।”
ইজহান সব শোনে, কিন্তু গোঁ ধরে বসেই থাকে। ইস্মি আরো কিছুক্ষণ বকবক করে, কিন্তু বিকারহীন স্বামীর প্রতিক্রিয়া লাভে ব্যর্থ হয়ে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ে। কিন্তু শান্তি মিলে না তাতে। কীভাবে মিলবে? এই লোককে তো সে মনে জায়গা দিয়েছে। এখন মনে বসে জ্বালাচ্ছে! হঠাৎ কী মনে হতেই ইস্মি শোয়া থেকে একটু পরেই আবার উঠে যায়। ঘরের বাতিটা নিভিয়ে হলদে বেডসাইডটা জ্বেলে দেয় সে। মিটিমিটি মায়াবী আলোয় ভেসে যায় ঘরটা। ট্রলি থেকে একটা গোলাপি রঙের শাড়ি বের করে হাতে নিয়ে বসে ব্লাউজ খুঁজতে থাকে। কিন্তু পায় না, আনা হয়নি। ইস্মি অবশ্য হতাশ হয় না, তার মাথায় ঘুরছে অন্য চিন্তা। এই লোককে বাগে আনার চেষ্টা করবে সে। তাতে অন্যকিছুতে নজর না দিলেও চলবে।
বাইরে থেকে বারান্দায় সিঁটকিনিটা আটকে হাতে করে শাড়িটা নিয়ে বারান্দার কাছের জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় ইস্মি। এরপর একটু কেশে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে তার পাগল স্বামীর। আঁড়চোখে একনার দেখে নিয়ে পরণে থাকা শাড়ির আঁচলটা ফেলে সে তাকাতেই দেখে ইজহান দুই ভুরু কুঁচকে শাণিত চোখে তাকিয়ে। ইস্মি মনে মনে হেসে উঠে, এই লোককে এখন জ্বালাবে ও। কতক্ষণ রাগ দেখিয়ে বোম হয়ে থাকতে পারে সেও আজ দেখবে। মনের ভাবনা মনে রেখে আস্তেধীরে পরণের বসন সবটাই খুলে একপাশে রেখে দেয়। এরপর ব্লাউজহীন মোমের মতো নরম দেহে গোলাপি রঙের শাড়িটা গায়ে জড়ায় আনাড়িভাবে। সেইফটি-পিন বিহীন শাড়িটার কুচি খুলে পরে বার দুয়েক। ঝুঁকে গিয়ে বিরক্ত ভঙ্গিতে কুচি ঠিক করে ইস্মি। এমনিভাবেই আলতো হাতে চুলের কাটা ছেড়ে দিতেই পিঠময় ছড়িয়ে পড়ে কালো চুলের গোছা। কানের দুপাশে গুঁজে দেয় ইস্মি। অদ্ভুত সুন্দর, বুক কাঁপিয়ে দেওয়া মোহনীয় এক মেয়েলি দৃশ্য!
এদিকে শীতল হাওয়া গায়ে লাগিয়ে চোখের উপর হাত ঢাকা দিয়ে দৃষ্টি আড়াল করা অভিমানের জাহাজ ইজহান শেখ তখন হতভম্ব, হতবাক। অল্পবিস্তর হা গেছে তার মুখটা। শক্ত চোয়াল হয়ে এসেছে শিথিল। ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগতেই শিরশির করে মেরুদণ্ড বেয়ে কিছু একটা বয়ে চলে। শিহরণে কেঁপে উঠে সে।।গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসে তার। এই অপ্সরা কে? সত্যিই তার ইস্মিতা? তার বউ? ইজহান হতবিহ্বল হয়ে হিসাব মেলায়। অংকে সে পাকা, কিন্তু আজ এই অনুভূতির হিসাবে মেলাতে ব্যর্থ সে।
এভাবে একটুও না সেজে এ মেয়েকে এত আবেদনময়ী লাগে? এতটা আপন আপন, আমার আমার লাগে? কই! আগে তো সে এসব টের পায়নি। না ইস্মিতা এভাবে নিজ থেকে কখনো তার কাছে এসেছে? কস্মিনকালেও না। সে ঢোক গিলে, বড্ড তেষ্টা পেয়েছে তার। ইস্মিতা কী শুনলে হাসবে? বড্ড অস্বস্তি হয় ইজহানের। এদিকে ইজহানকে খেলাতে চাওয়া ইস্মি স্বামীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরে আড়াকলে মনে মনে হাসে। আরেকটু জ্বালাতে আবেদনময়ী ভঙ্গিতে চেয়ারে বসে, হাত বাড়িয়ে বারান্দার টবে থাকা একটা গোলাপ ছিঁড়ে কানে গুঁজে বাইরে মন দেয়। গুনগুন করে কবিতা ধরে,
‘সে যদি তোমাকে অগ্নিতে ফেলে মারে?’
বিনা চেষ্টায় মরে যাব একেবারে।
‘সে যদি তোমাকে মেঘে দেয় উত্থান?’
বৃষ্টিতে, আমি বৃষ্টিতে খানখান।
‘সে যদি তোমাকে পিষে করে ধুলোবালি?’
পথ থেকে পথে উড়ে উড়ে যাব খালি।
‘উড়বে?– আচ্ছা, ছিঁড়ে দেয় যদি পাখা?’
পড়তে পড়তে ধরে নেব ওর শাখা।
‘যদি শাখা থেকে নীচে ফেলে দেয় তোকে?’
কী আর করব? জড়িয়ে ধরব ওকেই।
বলো কী বলব, আদালত, কিছু বলবে কি এরপরও?
‘যাও, আজীবন অশান্তি ভোগ করো!’
ইজহান চোখের কোণে একটুখানি হাসি চাপার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। তার এই ইস্মিতাকে সে চিনত না! এই মেয়ের উপর আজ আবার প্রেমে পড়ছে সে—পুরোনো প্রেম, নতুন রূপে! ইজহানের শ্বাস ফেলতে কষ্ট হয়। বুক চেপে ধরে সে বিড়বিড় করে, “আমি শেষ, পুরোপুরি শেষ, একেবারে শেষ।”
ইস্মি ওর কথা শুনতে পায় না। সে নিজের মতো করে আবেদনময়ী ভাবভঙ্গিতে নিজেকে দেখাতেই ব্যস্ত।
ইজহানের ইচ্ছে করে ওকে বুকের ভেতর পিষে ফেলতে। কেননা, হলদে আলোয় গায়ে গোলাপ জড়িয়ে বসে থাকা এই নারীটি তার রাগের কারণ, দুঃখের কারণ, ভালোবাসায় মরণের কারণ। এমনি সময় কোনোদিন নিজে থেকে কাছে আসে না। অথচ এখন দেখো, পেট-পিঠ, গলা-বাহু আর হাসিতেই তার বুকে চা’কু বসাচ্ছে। তাকে মেরে দিচ্ছে। ইস্মি ওর হতভম্ব অবস্থা ঠাহর করতে পেরে ইচ্ছে করে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, “আমার সুদর্শন স্বামী… তুমি শুনছো? চলো একটা সন্ধি করি, হৃদয়ে হৃদয় মিশিয়ে। কেননা, আজকাল তোমার রাগে আমার আকাশ কালো হয়ে আসে, তোমার অভিমানের আগুনে আমার হৃদয় পোড়ে, তোমার যন্ত্রণার ভারে আমার নিঃশ্বাস পর্যন্ত ভারী হয়ে ওঠে! তোমার ভালোবাসার মরীচিকায় ছুটতে ছুটতে এক তৃষ্ণার্ত যাত্রী হয়ে গেছি। শুনতে পাচ্ছো? এই বুকের গহীনে এক মরুভূমি জন্ম নিয়েছে, যেখানে কেবল তোমার ছোঁয়ার এক পশলা বৃষ্টি হলে সবুজ জন্মাবে!
ওহে আমার কঠিন হৃদয়ের পুরুষ, তোমার কঠোরতা আমার অন্তর্দ্বন্দ্বে হাহাকার হয়ে বাজে। একটিবার ফিরে তাকাবে না? এক ঝলক শীতল বাতাস হয়ে আমার দহন মেটাবে না? আমি তোমার প্রেমে হারিয়ে যাওয়া এক পথহারা রজনী। তোমার একটুখানি উষ্ণতা পেলেই ভোর হয়ে যাবো, তোমার একটুখানি ছোঁয়ায় আবার জেগে উঠবো!
ওহে আমার অবুঝ, রাগী পুরুষ! শুনছ তুমি? তোমার কঠিন দৃষ্টি আমার হৃদয়কে শিকলে বাঁধে, যন্ত্রণা দেয় যাতনা। আচ্ছা যাতনা চুকেবুকে যাক, সব চুলোয় যাক। এসো আমরা সন্ধি করি, দীর্ঘ রাতের শেষে, তোমার বাহুডোরে একটুখানি আশ্রয়ের, একটু স্বস্তির! আমার যন্ত্রণায় তুমি এক পশলা বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়বে বিনিময়ে ঠোঁটের ছোঁয়ায় আমি তোমার তৃষ্ণা মেটাব! চলো একটা সন্ধি করি।”
এবারে যেন ইজহান আর পৃথিবীতেই রইল না। মরে গেল সে একেবারে! কয়েক মুহূর্ত পর যখন আবার পুনরজ্জীবিত হলো, ইস্মি শুনলো, কানে এলো বারান্দার দরজায় জোরালো হাতের থাবা পড়ার আওয়াজ। ইস্মি প্রথমে একটু ভড়কে গেল, পরক্ষণেই ওর মস্তিষ্ক কাজ শুরু করল। দ্রুত এলোমেলো শাড়িটা বদলে নিয়ে সাধারণ একটা শাড়ি গায়ে জড়ালো, চুল কাটায় আটকাতে যেই না উদ্যত হলো বারান্দার জানালা দিয়ে একপ্রকার হামলে পড়া মতোন করে ইজহান বলল, “পাষন্ড নারী, আমাকে অগ্নিকুণ্ডে ফেলে দিয়ে তুই এখন সতীসাবিত্রী সাজছিস? আই সয়্যার ইস্মিতা, একই মুহূর্তে যদি দরজা না খুলিস আমি লাফিয়ে পরে যাব বারান্দা থেকে। তোকে বিধবা বানিয়ে যাব। আই সয়্যার! ওয়ান, টু….”
আত্মা কেঁপে উঠল ইস্মির। ইজহান ‘থ্রি’ বলার আগেই দ্রুত গিয়ে দরজার সিঁটকিনি খুলে দিলো। এরপরই ঝাঁপিয়ে পড়ল রাগীমানবের বুকে। টি-শার্টের খোলা বোতামের ওখানে নগ্ন বুকে পরপর কয়েকটা চুমু বসিয়ে দিয়ে আগ্রাসী স্বরে বলে, “ইজহান বিহীন পৃথিবীতে ইস্মিতা বেঁচে থাকতে চায় না। ইস্মিতা তার পাগলকে ছাড়া এক মুহূর্তও কাটাতে পারবে না!” ইস্মিতার গলা কাঁপছিল জ্বলন্ত রাগে। ইজহানের চোখে চোখ রেখে কঠিন গলায় বলল, “নিষ্ঠুর, বিবেক বর্জিত পুরুষ! দ্বিতীয়বার কখনো এটা বলার আগে, দেখবে তোমার ইস্মিতা হারিয়ে গেছে ইজহান শেখ!”
এর আগে কখনো এত আপন করে ইস্মি কখনো
ওকে ‘তুমি’ সম্বোধন করেনি। নিজ থেকে এতো আদর কখনো করেনি। ইজহান ওর মুখ তুলে পাগলের মতো চুমু খেতে খেতে ওকে দেয়ালের সাথে মিশিয়ে নেয়। ইস্মিও ওকে সমানতালে চুমু বসায়, ইজহানের পাগল পাগল লাগে। দু’দিনের ক্ষিধেটিধে সব গায়েব হয়ে ভয়ংকর তৃষ্ণায় তার গলা শুকিয়ে যায়। হাঁপাতে হাঁপাতে সে বলে, “এই মহিলা, আমার পুদিনার শরবত কোথায়?”
অশ্রুবন্দি পর্ব ৪৭
“খেয়ে ফেলেছি।”
“এবার তোকে খেয়ে ফেলব আমি, আই সয়্যার!”
কন্ট্রোল হারা হলেও ইজহান নিজের সীমা জানে। সীমা অতিক্রম না করেই সে নিজের আদর-যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ করে তুলল ইস্মিকে। আর এই পুরুষের রাগ-জেদ একেবারে নিঃশেষ করে দিতে হলে এই মুহূর্তে তার অবাধ্য হওয়া যাবে না। ইস্মি অবাধ্য হলোও না। চুপচাপ আদরটুকু মাথা পেতে গ্রহণ করে নিলো। ফিসফিস করে প্রশ্ন করল, “এভাবে
কেন আটকে ফেললেন আমাকে?”
“কারণ—তুমি আটকে ফেলেছ আমাকে।”
