Home অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৯

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৯

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৯
সুমি চৌধুরী

ঠিক তখনই, চেনা পৃথিবীর সব কোলাহল ছাপিয়ে ঈশানের তীক্ষ্ণ চাউনি আচমকা গিয়ে আছড়ে পড়ল ছাদের ওই শান্ত কোণে। যেখানে শরতের মেঘের মতো বিষাদ বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল রিদি আর শুভ্রা। শুভ্রার দিকে চোখ পড়তেই এক লহমায় ঈশানের বুকের ভেতরটা যেন থমকে গেল; থমকে গেল চারপাশের চেনা বাতাসও। ছাদের রেলিং ধরে পলকহীন নয়নে মেয়েটা তারই দিকে চেয়ে আছে, যেন চাক্ষুষ কোনো মায়ায় আটকে গেছে তার চোখের পাতা। আলতো বাতাসের হিল্লোলে শুভ্রার পিঠময় ছড়িয়ে থাকা অবাধ্য চুলগুলো চঞ্চলা মেঘের মতো উড়ছে অবিরত। ঈশান যেন সেই তীব্র চাহনির ভার সইতে পারল না, এক বুক গোপন অস্বস্তি নিয়ে মুহূর্তে নিজের চোখ জোড়া নামিয়ে নিল মাটির পানে।

এদিকে বরের সাজে সজ্জিত শুভ্রেরও ব্যাকুল চোখ দুটো ছিটকে গিয়ে পড়ল ছাদের সুনীল সীমানায়। প্রিয়াকে দেখামাত্রই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে দুষ্টুমি ভরা হাসি। সবার চোখের আড়ালে, নিজের হাতটি ঠোঁটে ছুঁইয়ে সে সটান এক বসন্তের হাওয়া ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিল রিদির উদ্দেশ্যে। রিদি লজ্জায় আর বিস্ময়ে চোখ দুটো বড় বড় করে তৎক্ষণাৎ মুখ ফিরিয়ে নিল অন্য দিকে। মনে মনে তীব্র অভিমানে গাল ফুলিয়ে ভাবল, লোকটার বুকে কি শরম-লজ্জা বলতে কিচ্ছু নেই! এই ভরা মজলিসে, এত মানুষের সামনে এমন অসভ্যতামি কেউ করে! কিন্তু মন তো অবাধ্য নদীর মতো, বারণ শোনে না। হাজার বকেটেও নিজের মনকে ধরে রাখতে না পেরে রিদি যখন চোরের মতো আবারও নিচে তাকাল, অমনি দূর থেকে শুভ্র তার এক চোখ টিপে মায়াবী এক ইশারা ছুঁড়ল।
সেই ইশারার তীব্র আঘাত যেন তীরের মতো সোজা গিয়ে লাগল রিদির অবুজ হার্টে এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল তার হৃদস্পন্দন। সে বেশ বুঝল, এই ছাদের কার্নিশে আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকা মানেই লোকটার এমন উন্মাতাল ভালোবাসার কাছে আত্মসমর্পণ করা। সে আর ঝুঁকি না নিয়ে, দ্রুত শুভ্রার নরম হাতটি নিজের মুঠোয় পুরে একপ্রকার টেনেই ছাদ থেকে নিচে নেমে এল।

কিছুক্ষণের মাঝেই মিহি একরাশ ব্যস্ততা পায়ে নিয়ে দৌড়ে রুমে এসে ঢুকল। শুভ্রাকে ওভাবে শান্ত বসে থাকতে দেখে বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে বলল,
“তুই এখনো এখানে মূর্তির মতো বসে আছিস শুভ্রা? জলদি চল, গেট ধরতে হবে তো!”
শুভ্রা নিজের বিষণ্ণ চোখ দুটো মাটির দিকে নামিয়ে খুব মৃদু স্বরে বলল,
” তুই যা বোন, আমার এসবের মাঝে যেতে ইচ্ছে করছে না।”
মিহি দুই কোমরে হাত দিয়ে কৃত্রিম রাগে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“কদম কোনো বাহানা শুনব না, চল বলছি! আমরা সব কাজিনরা মিলে আজ এক লাক্ষ টাকা আদায় করেই ছাড়বো।”

শুভ্রা মুখে আবারও একরাশ না-বোধক শব্দ উচ্চারণ করতে চাইল, কিন্তু মিহি তার কোনো ওজর-আপত্তি না শুনে জোর করেই তার হাতটা টেনে নিয়ে এল বাড়ির সাজানো গেটের সামনে।সেখানে তখন উৎসবের আমেজ তুঙ্গে। ফিতার ওপাশে বরপক্ষের তূর্য, রিফাত আর ঈশান বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর তাদের মাঝখানে সোনালী শেরওয়ানির আভিজাত্য নিয়ে রাজপুত্রের মতো শোভা পাচ্ছে শুভ্র। আমন্ত্রিত অতিথিরা ততক্ষণে অন্দরে প্রবেশ করেছে। গেটের ওপরে থরে থরে সাজানো রকমারি মিষ্টি আর কাঁচের গ্লাসে ভরা রঙিন শরবত। সব কাজিনরা মিলে সেখানে এক মায়ার বৃত্ত তৈরি করেছে। আজ এখানে এক লোভনীয় খেলা হবে শরবতের গ্লাসের নিচে এক হাজার টাকার মচমচে নোট রেখে, সেই শরবত বরপক্ষের কাউকে তুলে নিতে হবে। যদি কোনো চতুর লোক নিখুঁত কৌশলে সেই গ্লাস তুলে শরবতটুকু উদরস্থ করতে পারে, তবে ওই হাজার টাকার নোট চলে যাবে বরপক্ষের পকেটে। আর যদি কোনো ভুল চালে তারা হেরে যায়, তবে দণ্ড হিসেবে তার দ্বিগুণ অর্থ জরিমানা দিতে হবে কনেপক্ষকে।শুভ্রা গেটের এক কোণে এসে লোকচক্ষুর আড়ালে মাথা নিচু করে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। মিহি এক হাজার টাকার নোটটি আঙুলের ডগায় উঁচিয়ে, ফিতার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা বরপক্ষের সবার উদ্দেশ্যে চ্যালেঞ্জের সুরে বলল
, “এই নিন আমাদের শর্তের টাকা! এবার আপনাদের দলের কোন বীর পুরুষ আছেন, যিনি এই টাকা ছুঁয়ে শরবতের গ্লাস তুলবেন?”

রিফাত নিজের কলারটা হালকা ঝাঁকিয়ে, বেশ একটা জাঁকালো ভাব নিয়ে বলল,
“আরে, এ তো ডাল-ভাত ব্যাপার! দাও দেখি টাকাটা আমার কাছে।”
তার এমন অতি-উৎসাহী সংলাপ শুনে কনেপক্ষের সব কাজিনরা একযোগে খিলখিল করে হেসে উঠল। মিহি মুচকি হেসে রিফাতের বাড়িয়ে দেওয়া হাতের মুঠোয় টাকাটা গুঁজে দিয়ে বলল,
“বেশ তো, দেখা যাক আপনার কেমন সাহস! তবে মনে রাখবেন মিস্টার, এই খেলার নিয়ম কিন্তু বড্ড কড়া। যদি টাকাটা দিয়ে গ্লাস তুলে শরবতটা শেষ করতে পারেন, তবেই এই টাকা আপনাদের। আর যদি একটুও এদিক-ওদিক হয়, তবে এর ডাবল টাকা জরিমানা গুনে তবেই ভেতরে ঢুকতে হবে।”
রিফাত টাকাটা হাতে নিয়ে বুক ফুলিয়ে একটু হাসল। ঠিক তখনই পাশ থেকে তূর্য এসে তার কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে সতর্কবার্তা দিল,
“রিফাত, সাবধানে করিস কিন্তু! একটু এদিক-ওদিক হলেই মান-সম্মান সব শেষ।”
চারপাশে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা, সবার চোখ গিয়ে আটকেছে রিফাতের আঙুলের ডগায়। রিফাত গভীর মনোযোগ দিয়ে এক হাজার টাকার কচকচে নোটটি শরবতের গ্লাসের নিচে, সেই রুপোলি ট্রের সরু ফাঁক গলে ভেতরে ঢোকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। উপস্থিত সবার চোখ তখন কৌতূহলে চকচক করছে। রিফাত কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমিয়ে, অতি সাবধানে ধীরে ধীরে টাকাটা গ্লাসের নিচে ঢুকিয়ে ফেলল।
টাকাটা ভেতরে ঢুকতেই বরপক্ষের ছেলেরা একযোগে উল্লাসে ফেটে পড়ল কেউ কেউ হাততালি দিয়ে ছন্দের সুরে চেঁচিয়ে উঠল,

“রিফাত! রিফাত! রিফাত!”
কিন্তু আসল খেলা তো এখনো বাকি! টাকা ঢুকলেও রিফাত এখন গ্লাসটা তোলার সাহস পাচ্ছে না। তার কেন যেন মনে হচ্ছে, টাকার কোনা ধরে একটু টান দিলেই ভরপুর শরবতের গ্লাসটা উল্টে গিয়ে সব রস মাটিতে মিশে যাবে। রিফাতের এমন কিংকর্তব্যবিমূঢ় আর কাঁচুমাচু দশা দেখে কনেপক্ষের মেয়েরা হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল।এতক্ষণের মেঘাচ্ছন্ন মন কেমন যেন এক ফুঁৎকারে উবে গেল শুভ্রার সেও আর নিজের ভেতরের এই বাঁধভাঙা আনন্দ চেপে রাখতে পারল না। একরাশ মুক্তো ঝরানো খিলখিল হাসিতে মুখরিত হয়ে উঠল চারপাশ। আর ঠিক সেই মায়াবী মুহূর্তেই, ঈশান এক তীব্র মুগ্ধতা নিয়ে তাকাল শুভ্রার ওই চাঁদের মতো হাসিমুখটার দিকে। তার চেনা গণ্ডি পেরিয়ে মনটা যেন এক লহমায় হারিয়ে গেল; মেয়েটার ফর্সা গালে আবারও সেই চেনা টোল পড়েছে। মনে মনে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঈশান ভাবল।
“ইস! কি যে মিষ্টি লাগছে মেয়েটাকে আজ!”
শুভ্রা হাসতে হাসতেই এবার তার রুপোলি কণ্ঠের সুর ছিটকে দিল রিফাতের দিকে,
“কী হলো রিফাত ভাইয়া? কিছুক্ষণ আগে তো নিজেকে খুব বড় বীর পুরুষ দেখাচ্ছিলেন! এখন হাত কাঁপছে কেন আপনার? এবার গ্লাসটা তুলুন দেখি!”

রিফাত নিজের কলারটা আরেকটু উঁচিয়ে, বুক টান টান করে বেশ বীরত্বের সুরে বলল,
“আরে, আমি কেন ভয় পাবো! এই তো, এখনই তুলে দেখাচ্ছি।”
কথাটা শেষ করেই সে নিজের ডান হাতের দুই আঙুলে মচমচে নোটটা চেপে ধরল, আর অন্য হাতে উপুড় হয়ে থাকা কাঁচের গ্লাসটা শূন্যে তোলার চেষ্টা করল। কিন্তু বিধিবাম! গ্লাসটা সামান্য একটু ওপরে উঠতেই ভারসাম্য হারিয়ে উল্টে গেল, আর মুহূর্তের মাঝেই ভেতরের সবটুকু রঙিন শরবত ট্রের ওপর দিয়ে গড়িয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
ব্যস, চারপাশ জুড়ে কনেপক্ষের মেয়েদের আনন্দের শোরগোল আর চিৎকার আকাশ ছুঁল। মিহি দুই হাত তুলে বিজয়ের উল্লাসে নেচে উঠে বলল,
“ইয়েই! আমরা জিতে গেছি! এবার আমাদের পাওনা টাকা বুঝিয়ে দিয়ে তবেই ভেতরে ঢুকতে হবে মিস্টার, নয়তো আজ আর বউ নিয়ে ঘরে ফেরা হবে না!”
এমন ভরা মজলিসে বাজি হেরে গিয়ে রিফাত লজ্জায় লাল হয়ে বন্ধুদের পেছনে মুখ লুকানোর চেষ্টা করতে থাকে। ঈশান নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে কোনো রকমে ভেতরের উপচে আসা হাসিটা চেপে রাখে। তূর্য পকেটে হাত দিয়ে বেশ দাতা কর্ণের মতো ভাব দেখিয়ে বলল,

“আচ্ছা বাবা মানলাম আমরা হেরেছি। এবার বলো, কত টাকা চাই তোমাদের?”
আড়ালে লুকিয়ে থাকা শুভ্রা চঞ্চলা রূপটি যেন এক পলকে ফিরে পেল। সে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিজয়ের হাসি ফুটিয়ে বেশ আভিজাত্যের সুরে বলল,
“পুরো দুই লাখ টাকা চাই! শরবত তোলার খেলায় হারার জরিমানা হিসেবে এক লাখ, আর আমাদের বোনকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাওয়ার গেট সেলামি এক লাখ। এখন আর অযথা তর্ক না করে ভালো ছেলের মতো টাকাগুলো দিয়ে দিন দেখি!”
শুভ্রার মুখে এত বড় অঙ্কের ডিমান্ড শুনে তূর্য চোখ দুটো গোল গোল করে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এল। তারপর কপালে হালকা ভাঁজ ফেলে রসিকতার সুরে বলল,
“অ্যাঁ! বলো কী হে রূপবতী? টাকা কি গাছের পাতা নাকি, যে বললেই গাছ থেকে ঝটপট ছিঁড়ে এনে তোমার হাতে তুলে দিলাম।”
শুভ্রা তূর্যের দিকে আরেকটু ঝুঁকে এসে, চোখের কোণে এক চিলতে বিদ্রূপের হাসি ফুটিয়ে বলল,
“আর আপনারা পুরুষ, নাকি ছাগল? এত বছর ধরে বড় বড় চাকরি আর বিজনেস করেও এই শুভ দিনে মাত্র দুই লাখ টাকা পকেট থেকে বের করতে পারছেন না!”
শুভ্রার এই ধারালো আর চটজলদি জবাবে কনেপক্ষের মেয়েরা হাসতে হাসতে যেন লুটিয়ে পড়ল একে অপরের গায়ে। তূর্য তো পুরো আকাশ থেকে পড়ল! সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঈশানের দিকে করুণ চাউনিতে তাকিয়ে নালিশের সুরে বলল,

“ভাই, তুমি কি এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সার্কাস দেখবে? কিছু একটা বলো! এই মেয়ে সবার সামনে আমাদের সোজা ছাগল বানিয়ে দিল! আমরা কি ছাগল? এই অপমান কি মেনে নেওয়া যায় ভাই? কত বড় অপমান!”
তূর্যের কথায় ঈশান এতক্ষণ চুপ থাকলেও এবার আর স্থির থাকতে পারল না। তার শান্ত, গভীর চোখ দুটো সোজা গিয়ে নিবদ্ধ হলো শুভ্রার ওই মায়াবী মুখের ওপর। সে দুই কদম এগিয়ে এসে, একদম বরফশীতল আর শান্ত গলায় বলল,
“কাউকে এভাবে ছাগল বলার রাইট তোমার নেই, শুভ্রা।”
ঈশানের মুখ থেকে নিজের নাম ধরে এমন কঠোর শাসন আর শীতল কণ্ঠস্বর শুনে শুভ্রার বুকের ভেতরটা যেন এক লহমায় ধক করে উঠল এক মুহূর্তের জন্য তার চারপাশের চেনা পৃথিবীটা স্তব্ধ হয়ে গেল। ভেতরটা অভিমানে তোলপাড় করে উঠলেও, সে নিজেকে কোনো রকমে সামলে নিল। মুখের অবয়বটাকে পাথরের মতো শক্ত করে, এক বুক জেদ নিয়ে ঈশানের চোখের দিকে তাকিয়ে জবাব দিল,
“বলেছি, বেশ করেছি! আমাদের ন্যায্য টাকা বুঝিয়ে না দিলে আমরা আরও অনেক কিছু বলব। কী করবেন আপনি?”
ঈশান শুভ্রার চোখের গভীর মণির দিকে তাকিয়ে নিজের কণ্ঠস্বরকে আরও শান্ত, আরও গম্ভীর করে বলল,

“আর কী কী বলবে, শুনি?”
ঈশানের এই শান্ত চ্যালেঞ্জ যেন শুভ্রার ভেতরের জেদটাকে আরও হাজার গুণ বাড়িয়ে দিল। সে লোকলজ্জার সব ভয় এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়ে, ঈশানের একদম মুখের কাছে ঝুঁকে এল। তারপর নিজের ফর্সা ডান হাতের তর্জনীটা ঠিক ঈশানের নাকের সামনে উঁচিয়ে এক নিশ্বাসে বলতে লাগে।
“শুনবেন আর কী কী বলব? টাকা না দিলে আপনাদের আমরা চিড়িয়াখানার আস্ত একটা ডিরেক্টরি বানিয়ে দেব! প্রথমে তো আপনারা হলেন ওই আফ্রিকান জলহস্তী, যারা শুধু বড় বড় হাঁ করে গিলতে জানে কিন্তু কাজের বেলায় জিরো! তারপর আপনারা হলেন ওই বুনো গণ্ডার, যাদের চামড়া এত মোটা যে দুই লাখ টাকার ডিমান্ড শুনেও আপনাদের ইমোশন জাগে না! আরও বলব? টাকা না দিলে আপনাদের আমরা ওই ল্যাজকাটা ক্যাঙারু বলব, যারা পকেটে টাকা না রেখে খালি খালি লাফাতে লাফাতে বরযাত্রী আসতে জানে!এখানেই শেষ নয় মিস্টার ঈশান, আপনাদের চেহারা দেখে এখন মনে হচ্ছে ওই খাঁচায় বন্দি থাকা পাগল শিম্পাঞ্জি, যারা কলা না পেয়ে দাঁত কিড়মিড় করছে! আর আপনাদের এই দলবলকে দেখতে একদম ওই মেরু অঞ্চলের অলস সিল মাছের মতো লাগছে, যারা বরফ খণ্ড ফেলে রোদে এসে ডাইনোসর যুগের মতো হা করে ঘুমায়! এমনকি টাকা না দিলে আপনাদের আমরা ওই জঙ্গল থেকে পালিয়ে আসা খেঁকশিয়াল আর শিং ভাঙা হরিণ বলতেও দ্বিধা করব না! এখন বলুন, ইজ্জত বাঁচিয়ে টাকা দেবেন, নাকি এই পুরো অ্যানিমেল কিংডমের খেতাব মাথায় নিয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘাস চিবোবেন?”

শুভ্রার মুখ থেকে এক নিঃশ্বাসে পশুপাখির এমন আজব কীর্তির ফিরিস্তি শেষ হতেই ঈশান আর নিজের ভেতরের প্রবল ধাক্কাটা সামলাতে পারল না। সে অকস্মাৎ বড্ড জোরে কেশে উঠল। এমন বিষম খাওয়া কাশি যে কোনোমতেই আর থামার নাম নেই। ঈশানের এই অবস্থা দেখে তূর্য আর রিফাত ভড়কে গিয়ে তাড়াতাড়ি পাশ থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি বাড়িয়ে দিল। ঈশান এক ঢোকে পুরো গ্লাসের পানিটা খেয়ে তবেই যেন একটু স্বস্তি পেল। বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে সে লাল হয়ে যাওয়া চোখে শুভ্রার দিকে তাকাল। সেই খয়েরী পরী তখন নিজের দুই হাত বুকের ওপর শক্ত করে ভাঁজ করে, মুখটা একটু কুঁচকে বেশ একটা বিজয়ের অহংকার নিয়ে তারই দিকে তাকিয়ে আছে। চারপাশের মেয়েরা তো হাসির চোটে একে অপরের গায়ে ঢলে পড়ছে, কেউ কেউ হাসতে হাসতে একদম লুটিয়ে পড়ার জোগাড়!

অবশেষে গেটের সেই তুমুল বাকযুদ্ধ আর মিষ্টি মধুর ঝগড়াঝাঁটিতে কনেপক্ষের মেয়েরাই শেষ হাসি হাসল। বরের বন্ধুদের সমস্ত বুদ্ধি আর অজুহাত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পুরো দুই লাখ টাকাই আদায় করেই ছাড়ল তারা। টাকাটা মিহির হাতে আসতেই সব মেয়েরা খুশিতে ও বিজয়ের উল্লাসে চিৎকার করে উঠল। এরপর রীতি মেনে শুভ্রের সামনে একটি চকচকে কাঁচি তুলে দেওয়া হলো ফিতা কাটার জন্য। শুভ্র নিজের ভেতরের চরম বিরক্তিটা চেপে রেখে এক টানে ফিতাটা কেটে দিল। ফিতা কাটার সাথে সাথেই চারপাশ হাততালির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল।
ঠিক পরমুহূর্তেই মিহি আর তার সাথে থাকা আরও কয়েকটা চঞ্চল মেয়ে দুষ্টুমি ভরা হাসিতে মেতে উঠে একসাথে কয়েকটা পার্টি স্প্রে ট্রিগার করে দিল বরপক্ষের ছেলেদের ওপর। মুহূর্তের মধ্যে সাদা ফেনিল তরল ছিটকে এসে পড়ল শুভ্র, তূর্য, রিফাত আর ঈশানের দামি পোশাক আর চুলে। সেই সাদা তরলে মাখামাখি হয়ে ছেলেদের অবয়ব দেখে মনে হচ্ছে যেন এক একটা জ্যান্ত সাদা ভেড়া দাঁড়িয়ে আছে!
শুভ্র নিজের দামী সোনালী শেরওয়ানির ওপর ওই সাদা ফেনা দেখে রাগে আর বিরক্তিতে দাঁতে দাঁত চিপল। পকেট থেকে টিস্যু বের করে ফেনা মুছতে মুছতে বিরক্তির সুরে বলল,
“হোয়াট ইজ দিস? এসব নোংরা কী দিয়েছিস?”
মিহি তখনো নিজের হাসি থামাতে না পেরে পেটে হাত দিয়ে বলল,
“আরে ভাইয়া, রেগে যাচ্ছো কেন! এটা তো একদম খাঁটি বিদেশী পারফিউম! দেখো না, তোমাদের সবাইকে কেমন চমৎকার আর সুন্দর দেখাচ্ছে!”
মিহির এই রসাত্মক মন্তব্যে উপস্থিত সমস্ত মেয়েরা আবারও হাসির বন্যায় ভেসে গেল। অবশেষে গেটের সমস্ত আনন্দ, খুনসুটি আর নিয়মের মধুর পর্ব শেষ হলো। রাজকীয় আভিজাত্য নিয়ে শুভ্র বরের জন্য সুসজ্জিত সেই প্রধান আসনে গিয়ে বসল।

রাত আটটা।
সকল আনন্দ, সকল উল্লাস, সকল গান আর হাসির রেশ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে না যেতেই সম্পন্ন হলো শুভ্র আর রিদির বিয়ের পবিত্র আয়োজন। দ্বিতীয়বারের মতো তারা আবদ্ধ হলো এক অটুট বন্ধনে, দ্বিতীয়বারের মতো মহান আল্লাহকে সাক্ষী রেখে একে অপরের নাম লিখে নিল নিজেদের নিয়তির পাতায়। যেন বহুদিনের বিচ্ছিন্ন দুটি নদী আবারও ফিরে পেল একই মোহনা, বহু প্রতীক্ষার দুটি হৃদয় আবারও খুঁজে পেল একই ঠিকানা।কিন্তু মিলনের আনন্দের মাঝেও বিদায়ের বেদনা তো চিরকালই নিঃশব্দে অপেক্ষা করে থাকে।বিদায়ের মুহূর্তে রিদি ছুটে গিয়ে ইকবাল এহসানকে জড়িয়ে ধরল। বাবার বুকে মুখ গুঁজতেই বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত কান্না বাঁধভাঙা নদীর মতো উছলে বেরিয়ে এলো। চারপাশের কোলাহল স্তব্ধ হয়ে গেল তার কাঁপতে থাকা কণ্ঠের কাছে।

“আব্বু, আমি জানি আজ তুমি তোমার সমস্ত চাওয়া হারিয়ে আমার সমস্ত পাওয়া পূর্ণ করে দিয়েছ। নিজের স্বপ্নকে নিঃশব্দে বিদায় জানিয়ে আমার স্বপ্নকে দু’হাত ভরে আশীর্বাদ করেছ। তুমি চাইলে আমাকে তোমার ইচ্ছের পথে হাঁটাতে পারতে, কিন্তু তার বদলে আমার সুখের পথে নিজের হৃদয়টাই বিছিয়ে দিয়েছ।আমি জানি, আমি তোমার সেই মেয়ে হতে পারিনি, যে মেয়েকে নিয়ে তুমি নিখুঁত সব স্বপ্ন এঁকেছিলে। তোমার পছন্দের মানুষকে জীবনসঙ্গী করতে পারিনি। কিন্তু বিশ্বাস করো আব্বু, ভালোবাসা বড়ই অদ্ভুত এক অনুভূতি। সে কারও অনুমতি নেয় না, কারও নিয়ম মানে না। সে নিঃশব্দে আসে, হৃদয়ের দুয়ারে কড়া নাড়ে, তারপর একদিন সমস্ত অস্তিত্ব নিজের করে নেয়।শুভ্র ভাইও আমার জীবনে ঠিক তেমন করেই এসেছিল। যেন পথের ধারে পড়ে থাকা এক নামহীন ফুল, যার দিকে প্রথমে কেউ ফিরেও তাকায় না। অথচ সেই ফুলের সুবাস কখন যে আমার সমস্ত ঋতুকে নিজের করে নিয়েছে, আমি নিজেও জানি না।আজ মনে হয়, সেই ফুলের ঘ্রাণেই আমার সকাল জাগে, সেই ফুলের ঘ্রাণেই আমার সন্ধ্যা নামে। সেই সুবাস ছাড়া আমার আকাশ ফিকে লাগে, বাতাস বিষণ্ণ লাগে, পৃথিবীর সমস্ত রঙ মলিন লাগে। মনে হয়, ফুলটা যদি ঝরে যায়, তবুও তার ঘ্রাণ আমার আত্মার ভেতর বেঁচে থাকবে; ফুলটা যদি হারিয়েও যায়, তবুও তার স্মৃতি আমার নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিশে থাকবে।

আব্বু, পৃথিবীতে হাজার ফুল ফুটুক, হাজার সুবাস ভেসে আসুক, তবুও আমার হৃদয় খুঁজবে শুধু সেই একটুকরো ঘ্রাণ, যে ঘ্রাণে আমি আমার জীবন চিনেছি, আমার ভালোবাসা চিনেছি, নিজেকেও নতুন করে চিনেছি।তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও, আব্বু। যদি কোনোদিন তোমার স্বপ্নের আকাশে আমি মেঘ হয়ে এসে থাকি, যদি কোনোদিন তোমার প্রত্যাশার প্রদীপে অজান্তে অন্ধকার নামিয়ে দিয়ে থাকি, তাহলে তোমার এই অবাধ্য মেয়েটাকে ক্ষমা করে দিও। কারণ আমি তোমার অবাধ্য হতে চাইলেও, তোমার ভালোবাসার কাছে কোনোদিন অবাধ্য হতে পারিনি।আজ আমি তোমার বুক ছেড়ে অন্য এক ঘরে যাচ্ছি, কিন্তু বিশ্বাস করো, মেয়েরা শুধু ঠিকানা বদলায়, বাবার প্রতি ভালোবাসা বদলায় না। সময় বদলায়, ঋতু বদলায়, জীবন বদলায় কিন্তু বাবার জন্য মেয়ের হৃদয়ে যে ভালোবাসার নদী বয়ে চলে, তার স্রোত কোনোদিন থামে না, কোনোদিন শুকিয়ে যায় না।”
বলেই রিদি বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে আরও জোরে কেঁদে উঠল। তার কান্না যেন আর শুধু কান্না ছিল না, ছিল বুকের ভেতর জমে থাকা বছরের পর বছর ধরে লুকিয়ে রাখা সব অভিমান, সব ভয়, সব ভালোবাসার একসাথে ভেঙে পড়া। বাবার পাঞ্জাবি ভিজে যাচ্ছিল মেয়ের চোখের জলে, আর সেই ভেজা কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে জমা হচ্ছিল বিদায়ের নির্মম সত্যটা।ইকবাল এহসান মেয়ের মাথায় স্নেহভরা হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর তাকে আরও শক্ত করে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে নরম কণ্ঠে বললেন,

“দূর পাগলি! তোকে কে বলেছে তুই ব্যর্থ মেয়ে? আমার চোখে তুই কোনোদিন ব্যর্থ ছিলি না, আজও না।আমি তো শুরু থেকেই শুভ্রকে মনে মনে পছন্দ করতাম। মনে মনে ভাবতাম, এমন একটা ছেলে যদি আমার ঘরের জামাই হতো! কিন্তু মানুষের চাওয়া আর সৃষ্টিকর্তার চাওয়া তো এক হয় না মা। তাই নিজের মনের কথাগুলো কখনো মুখে আনিনি। অথচ দেখ, সৃষ্টিকর্তা না চাইলে কিছুই হয় না। হয়তো তিনি আমার বুকের গভীরে লুকিয়ে থাকা সেই ইচ্ছেটাই শুনে ফেলেছিলেন। তাই তো আজ সত্যি সত্যিই শুভ্র আমার ঘরের জামাই হয়ে গেল।”
তিনি থামলেন। গলাটা কেঁপে উঠল।
“তুই বরং আমাকে ক্ষমা করে দিস মা। তোকে অনেক কষ্ট দিয়েছি, অকারণে বকাঝকা করেছি। অনেক সময় এমন ব্যবহার করেছি, যেটা মনে করলে আজও আমার নিজের কষ্ট হয়। কিন্তু তখন যে আমার হাত-পা বাঁধা ছিল রে মা! আমি না চাইতেও পরিস্থিতির কাছে হার মেনে পাষাণ হতে বাধ্য হয়েছিলাম। কারণ ভাইসাব তোদের এই সম্পর্কটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। এখন বল, আমি কীভাবে ভাইসাবকে ডিঙিয়ে তোদের পাশে দাঁড়াতাম? কীভাবে?”

তার কণ্ঠ আরও ভারী হয়ে এলো।
“বিশ্বাস কর মা, তোকে কষ্ট দেওয়ার আগে আমিই শতবার কষ্ট পেয়েছি। তোর চোখের জল দেখার আগে আমার বুক রক্তাক্ত হয়েছে। কিন্তু কিছু অসহায়ত্ব থাকে, যেগুলোর কাছে মানুষ চাইলেও জিততে পারে না। তাই যদি পারিস, এই অসহায় বাবাটাকে ক্ষমা করে দিস মা…”
শেষ কথাটা বলতেই ইকবাল এহসানের চোখ থেকেও টুপটাপ করে জল গড়িয়ে পড়ল।মুহূর্তের মধ্যেই বিয়ের সেই আলো ঝলমলে হলরুমটা যেন অন্য এক আবহে ঢেকে গেল। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে হাসির ঢেউ উঠছিল, সেখানে এখন কান্নার স্রোত বইছে। মনে হচ্ছিল, আনন্দের আকাশটাকে হঠাৎ করেই ছুঁয়ে গেছে বিদায়ের মেঘলা বিকেল।পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা রাবেয়া এহসান নিজের শাড়ির আঁচল মুখে চেপে ধরলেন। তবুও চোখের জল আটকাতে পারলেন না। মায়ের বুকটাও যে মেয়ের বিদায়ে সমান শূন্য হয়ে যায়।শান্ত, স্থির স্বভাবের ইমনও আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চোখ মুছতে মুছতে সেও কেঁদে ফেলল।
ঠিক তখনই সোহান চৌধুরী ধীর, গম্ভীর পদক্ষেপে এগিয়ে এলেন।তার উপস্থিতিতেই আশপাশের মানুষগুলো আবার চুপ হয়ে গেল। তিনি এসে ইকবাল এহসানের সামনে দাঁড়ালেন। কয়েক মুহূর্ত দু’জনের চোখ একে অপরের দিকে স্থির রইল।

তারপর সোহান চৌধুরী শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“আমি নিজেই একদিন বলেছিলাম, এই সম্পর্ক আমি কোনোদিন মানবো না।”
কথাটা শুনে চারপাশ আরও নিস্তব্ধ হয়ে উঠল।তিনি মৃদু হেসে আবার বললেন,
“আর আজ আমি বুক ফুলিয়ে বলছি, এই সম্পর্কটা আমার কাছে অত্যন্ত সম্মানের। শুধু সম্মানের না, অনেক উঁচুতে রাখা একটা সম্পর্ক।তাই ইকবাল, তুমি একদম নিশ্চিত থাকো। রিদিকে আমরা কখনো কোনো কষ্ট পেতে দিব না। ও আজ থেকে শুধু আমাদের বাড়ির বউ নয়। ও আমার আরেকটা মেয়ে।”
তিনি কথা বলতে বলতে রিদির মাথায় হাত রাখলেন।
“আজ থেকে আমার মেয়ে একটা না, দুটো মেয়ে। এক মেয়েকে জন্ম দিয়েছি, আরেক মেয়েকে মন দিয়ে গ্রহণ করেছি।”

কথাগুলো শেষ হতেই চারপাশে জমে থাকা ভারী আবেগের ভেতর যেন একফোঁটা প্রশান্তির বৃষ্টি নেমে এলো।রিদি কান্নাভেজা চোখে এগিয়ে গিয়ে সোহান চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরল। সেই জড়িয়ে ধরাটা ছিল না শুধু মামা শ্বশুরকে আলিঙ্গন করা, ছিল দুটি পরিবারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সমস্ত সংকোচ, সমস্ত দূরত্ব আর সমস্ত অচেনাকে এক নিমিষে আপন করে নেওয়ার এক নীরব স্বীকৃতি। মনে হচ্ছে, এক মুহূর্তেই শ্বশুর আর বাবার মাঝখানের অদৃশ্য দেয়ালটা ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে, আর তার জায়গায় জন্ম নিয়েছে নতুন এক সম্পর্কের উষ্ণতা।এরপর ইকবাল এহসান ধীর পায়ে শুভ্রের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।মুখে হাসি রাখার চেষ্টা করলেও চোখ দুটো বারবার ভিজে উঠছিল। বছরের পর বছর ধরে বুকের ভেতর আগলে রাখা সবচেয়ে কলিজাটাকে আজ অন্য একজনের হাতে তুলে দেওয়ার মুহূর্তটা যে কোনো বাবার জন্যই সবচেয়ে কঠিন।তিনি শুভ্রের ডান হাতটা নিজের হাতের ওপর নিলেন। তারপর কাঁদতে থাকা রিদির নরম, কাঁপতে থাকা হাতটা তুলে এনে পরম যত্নে শুভ্রের হাতের ওপর রাখলেন।দুটি হাতের মিলনটুকু দেখে মনে হচ্ছে, যেন একজন বাবা তার সমস্ত বিশ্বাস, সমস্ত দোয়া আর সমস্ত নিশ্চিন্ততা একজোড়া হাতের মাঝে রেখে দিচ্ছেন।ইকবাল এহসান দুই হাত একসাথে চেপে ধরে শুভ্রের চোখের দিকে তাকালেন।তারপর ভাঙা, কাঁপা কণ্ঠে বলতে লাগলেন,

“শুভ্র, আজ থেকে আমার কলিজার টুকরোটাকে তোমার হাতে তুলে দিলাম। ও দেখতে যেমনই হোক, আমার কাছে ও চাঁদের চেয়েও দামি।এই মেয়েটাকে আমি বুকের ভেতর রেখে বড় করেছি। নিজের সুখ-দুঃখ ভুলে ওর হাসিটাকে আগলে রেখেছি। কখনো গায়ে একটা আঁচড় পর্যন্ত লাগতে দিইনি। ওর চোখে জল দেখলে আমার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠত।আমার মেয়েটা বড্ড অবুঝ, বড্ড ছেলেমানুষ। অনেক সময় না বুঝেই ভুল করে ফেলে। কখনো যদি এমন কিছু করে বসে, তুমি ওকে শাসন কোরো, ওকে বুঝিয়ে দিও, প্রয়োজন হলে বকাও দিও। কিন্তু কখনো মন থেকে দূরে ঠেলে দিয়ো না বাবা।রাগ করে যদি বলো, ‘চলে যা তোর বাবার বাড়ি’, ও হয়তো সত্যিই চলে আসবে। কিন্তু তোমার অবহেলা তোমার অবহেলা ও সহ্য করতে পারবে না।কারণ মেয়েরা রাগ সহ্য করতে পারে, শাসন সহ্য করতে পারে, অভিমানও সহ্য করতে পারে কিন্তু প্রিয় মানুষের অবহেলা সহ্য করতে পারে না।আজ আমি শুধু আমার মেয়েকে তোমার হাতে তুলে দিচ্ছি না। আমি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান আমানতটাকে তোমার হাতে তুলে দিচ্ছি।আমার রিদি তো তোমার ভালোবাসার সুবাসে পাগল হয়ে আছে। তোমার নাম শুনলে ওর চোখে আলো জ্বলে ওঠে, তোমার কথা বললে ওর মুখে হাসি ফুটে ওঠে।ওর পৃথিবীটাকে তুমি সুন্দর করে রেখো বাবা।
ওর ভালোবাসার এই সুবাসটুকু যেন কোনোদিন হারিয়ে না যায়।”

চারপাশে তখন পিনপতন নীরবতা।
কারও চোখ শুকনো নেই।ইকবাল এহসান হঠাৎ দু’হাত জোড় করে ফেললেন।সেই দৃশ্য দেখে অনেকেই অবাক হয়ে উঠল।কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে তিনি বললেন।
“বাবা হিসেবে আজ তোমার কাছে হাত জোড় করে শুধু একটা ভিক্ষা চাই।ওর চোখের এই জলটুকু যেন শুধু আজকের বিদায়ের জন্যই হয়।জীবনের আর কোনোদিন, কোনো কষ্টে, কোনো অবহেলায়, কোনো একাকীত্বে যেন আমার মেয়ের চোখে জল না আসে।আমি জানি পৃথিবীতে সব সুখ দেওয়া কারও পক্ষে সম্ভব না। তবুও যতটুকু পারো, ওকে আগলে রেখো।আমার মাকে ভালো রেখো বাবা।”

অনেক ভালো রেখো শেষ কথাটা বলেই ইকবাল এহসানের গলা আটকে গেল।কাঁধ কেঁপে উঠল।এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর বন্দী করে রাখা কান্নাটা আর ধরে রাখতে পারলেন না তিনি।চোখের জল গড়িয়ে পড়ল অবিরাম।ইকবাল এহসানের ওমন আকুল করা কথাগুলো শুনে শুভ্রের বুকের ভেতরটাও কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। এতক্ষণ নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করলেও এবার তার চোখ দুটোও আর্দ্র হয়ে এলো। চোখের কোণে জমে থাকা জলরাশি বারবার ঝাপসা করে দিচ্ছিল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার মুখটা।সে পরম শ্রদ্ধা আর বিনয়ের সাথে ইকবাল এহসানের হাতের ওপর নিজের অন্য হাতটা রাখল। তারপর তার কাঁপতে থাকা দুটো হাত শক্ত করে ধরে সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল।ধীর কণ্ঠে বলতে শুরু করল।

“ফুপা, আপনি আমাকে লজ্জা দেবেন না। হাত জোড় করার অধিকার আপনার নয়, আপনার সামনে মাথা নত করার অধিকার আমার।আজ আপনি আমাকে শুধু আপনার মেয়ের হাত তুলে দেননি, আপনার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অংশটুকু আমার হাতে তুলে দিয়েছেন। একজন বাবার বুকের ভেতর যে পৃথিবীটা বছরের পর বছর ধরে বাস করে, আজ সেই পৃথিবীটার দায়িত্ব আমার কাঁধে এসেছে।রিদি আপনার কাছে কলিজার টুকরো।আর আমার কাছে সে আমার সমস্ত অস্তিত্বের কারণ।মানুষ বেঁচে থাকে শ্বাসে, আর আমি বেঁচে আছি রিদিকে ভালোবেসে। রিদি আমার সেই মানুষ, যার নাম শুনে আমার সবচেয়ে খারাপ দিনটাও সুন্দর লাগে।ও আমার সেই মানুষ, যার হাসি দেখলে মনে হয় পৃথিবীতে এখনও সৌন্দর্য বেঁচে আছে।ও সেই মানুষ, যার চোখের জল আমার বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ ঘটায়।যার একফোঁটা হাসি আমার সমস্ত ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।

আমি জানি না আমি কতটা ভালো স্বামী হতে পারব।কিন্তু আমি এটুকু জানি, ওকে কষ্ট দিয়ে শান্তিতে ঘুমানোর ক্ষমতা আল্লাহ আমাকে দেননি।ওকে কাঁদিয়ে ভালো থাকার স্বার্থপরতা আমার নেই।ওকে অবহেলা করার মতো শক্ত হৃদয়ও আমার নেই।কারণ রিদি আমার জীবনের কোনো অংশ না ফুপা রিদিই আমার জীবন।আপনি জানেন, মানুষ যখন খুব প্রিয় কোনো জিনিস হারানোর ভয় পায়, তখন সেটা বুকের কাছে চেপে ধরে রাখে।আমি রিদিকে ঠিক সেভাবেই আগলে রাখতে চাই।আপনি বললেন ও অবুঝ। হ্যাঁ,মেয়েটা অবুঝ। কিন্তু জানেন ফুপা, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষগুলোই একটু অবুঝ হয়। কারণ তারা হিসেব করতে জানে না, তারা শুধু মন দিয়ে ভালোবাসতে জানে।আজ এই পবিত্র মুহূর্তে আপনাকে আমি কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে চাই না। কারণ প্রতিশ্রুতি অনেকেই দেয়, কিন্তু সময়ের সঙ্গে ভুলে যায়। আমি শুধু আমার হৃদয়ের কথাটা বলতে চাই।যেদিন থেকে রিদি আমার জীবনে এসেছে, সেদিন থেকেই আমার সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, স্বপ্ন-বাস্তবতা সবকিছুর মাঝখানে ওর নাম জড়িয়ে গেছে।

আজ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, আমার সবচেয়ে প্রিয় আশ্রয় কোথায় আমি কোনো বাড়ির নাম বলব না, কোনো শহরের নাম বলব না, আমি শুধু বলব, আমার আশ্রয়ের নাম রিদি।তাই ওর চোখের জল মুছে দেওয়ার জন্য আমাকে আলাদা করে শিখতে হবে না ফুপা। মানুষ নিজের চোখে ধুলো পড়লে যেমন কষ্ট পায়, আমি তেমনই কষ্ট পাই ওর চোখে জল দেখলে।আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।আমি ওকে শুধু স্ত্রী হিসেবে ঘরে তুলব না, আমার জীবনের সম্মান হিসেবে আগলে রাখব।ও যদি কোনোদিন অভিমান করে, আমি তার অভিমান ভাঙাব।ও যদি কোনোদিন পথ হারিয়ে ফেলে, আমি তার হাত ধরে পথ দেখাব।ও যদি কোনোদিন ক্লান্ত হয়ে যায়, আমি তার বিশ্রামের ছায়া হব।আর যদি কোনোদিন পৃথিবীটা ওর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে পৃথিবীর বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমি একাই ওর পাশে থাকব।কারণ ভালোবাসা মানে শুধু হাত ধরা নয়, ভালোবাসা মানে শেষ পর্যন্ত হাতটা না ছাড়া।আপনি আজ যে আমানতটা আমার হাতে তুলে দিলেন, ইনশাআল্লাহ সেই আমানতকে আমি আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সম্মান, মর্যাদা আর ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখব।আর যেদিন আমার জীবনের শেষ সূর্যটা অস্ত যাবে, সেদিনও আমার হৃদয়ের শেষ স্পন্দনটা সাক্ষী দেবে আমি রিদিকে ঠিক প্রথম দিনের মতোই ভালোবেসেছিলাম।”
কথাগুলো শেষ করেই শুভ্র রিদির কান্নামাখা মুখটার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর রিদির হাতটা শক্ত করে ধরে ইকবাল এহসানের দিকে চোখ তুলে শান্ত অথচ ভারী কণ্ঠে বলল।

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৮

“যাকে ছাড়া থেমে যায় আমার পুরো পৃথিবী
যার অনুপস্থিতিতে ভারী হয়ে ওঠে আমার প্রতিটা নিঃশ্বাস
যাকে দেখলেই বিষণ্ন আকাশেও বসন্ত নেমে আসে
যার হাসিতে আলো হয়ে যায় আমার সমস্ত অন্ধকার
যার কাছে জমা আছে আমার পৃথিবীর সব সুখ
যার সান্নিধ্যে বেঁচে থাকে আমার সমস্ত শান্তি
যার অস্তিত্বে জড়িয়ে আছে আমার প্রাণ
যার মাঝে হারিয়ে গেছে শুভ্র নামের এই মানুষটা”
একটু থামল সে। রিদির হাতটা আরও শক্ত করে ধরে নিচু অথচ কাঁপা গলায় বলল।
“সেই মানুষটাকে কষ্ট দেওয়ার ক্ষমতা আল্লাহও আমাকে দেননি।”

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৭০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here