Home আকাশপ্রিয়া আকাশপ্রিয়া পর্ব ৬১

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৬১

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৬১
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

—’ বিয়ের কথা তো আরও বছর দেড়েক পরে হওয়ার কথা ছিলো, ভাইজান। প্রিয়ার বয়স কম। শিয়া কে এই বয়সে বিয়ের কথা ভাবিইনি। স্ব-ইচ্ছায়, পড়াশোনা শেষ করে, ক্যারিয়ার ঠিক করে তারপর ওর সিদ্ধান্ত ও নিয়েছে। অন্য দিকে ছোট মেয়েকে আমি কি করে এত অল্প বয়সে…বুঝতেই পারছেন।’
আনিসুল রহমান একদমে কথাগুলো বলে থামলেন। প্রশ্নাত্মক দৃষ্টি আকাশের বাবার দিকে। ঘড়ির কাটা ঘুরছে রাত দশটা বেজে একত্রিশ মিনিটে। ডিনার শেষে দুই বাড়ির সকলে বসেছে একসাথে। আগামীকাল আকাশের পরিবারের সবাই ঢাকায় ফিরে যাবেন। শুধু থাকবেন আমেনা চৌধুরী আর তার ছোট জা। শিয়াকে নিয়ে দিন কয়েককের মধ্যেই চৌধুরী বাড়ি নেওয়া হবে। বাড়ির প্রথম সন্তানের ঘরের প্রথম সন্তান! সেই হেতুতে বিশাল আয়োজনও আছে বইকি। তার আগে শাহজাহান চৌধুরী নিজের ছোট ছেলে আর প্রিয়ার বিয়ের বিষয়টা নিয়ে আলাপ আলোচনায় বসেছে প্রিয়ার পরিবারের সাথে। আকাশের বাড়ির সকলেই অবগত আকাশ-প্রিয়ার বিয়েটা নিয়ে। তবে প্রিয়ার বাবা কাউকে এখনো জানানো হয়নি।

বেচারাদের সত্যি বলতে, আঘাত দিতে চাননা কেউ-ই। ছেলের ওপর রেগে থাকলেও স্ত্রীর কথায় শাহজাহান চৌধুরী এতটুকু বুঝেছে, কোন পরিস্থিতিতে পরে হুট করে বিয়েটা সেরে নিয়েছিলো ছেলেমেয়ে দুটো। আর যেখানে সবাই সম্মতি দিয়েই রেখেছে, আজ বাদে কাল এমনিতেও বিয়ে দেওয়াই হতো। সেখানে নিজেরাই হালাল সম্পর্কের বাঁধনে এক অপরকে বেঁধেছে সেটা সত্যি বলতে দোষের কিছু নয়। তাছাড়া প্রিয়া ছোট হলেও, আকাশ মোটেই তা নয়। কোনো হঠকারিতার সিদ্ধান্ত সে কখনোই নেবেনা। নিজের ছেলেকে এতটুকু চেনন তিনি! তবে বিয়েটা যখন একবার হয়েই গিয়েছে, প্রিয়ার বাবা মার থেকে এতবড় কথাটা লুকিয়ে আরও বছর দেড়েক সময় নেওয়ার মানেই হয়না।

কটেজের ডায়নিং প্লেস, ড্রয়িং প্লেস পূর্ণ একেবারে। দুই পরিবারের মানুষ তো আছেই। তাছাড়া রিমির পরিবারও আছে। রাতুল, রিমির বিয়ে নিয়েও আলোচনা হবো বইকি। রেদোয়ান, রাকিব সস্ত্রীক উপস্থিত। শিয়াও নেমেছে নিচে। তাকে আমেনা চৌধুরী নিজের কাছে বসিয়েছেন। ছোট্ট আহিন প্রিয়ার কোলে ঘুমাচ্ছে নিশ্চিন্তে। আনিসুল রহমানের কথার পিঠে ছোট্ট করে শ্বাস নিলেন শাহজাহান চৌধুরী। ওদিকটায় দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছেলের দিকে একটু দৃষ্টি বুলালেন। অতঃপর বেয়াইয়ের দিকে তাকিয়ে বিনয়ের সাথে বললেন,
—’ সেটা ঠিক, ভাইজান। প্রিয়া মাকে হয়তো আমাদের দৃষ্টিতে বিয়ে দেওয়ার সময় হয়নি। আমরা দু পরিবারই উচ্চ শিক্ষিত। আমাদের হিসেব মতে ছেলেমেয়েদের বিয়ের বয়স আরও বহু পরে। কিন্তু কথা সেখানেই। ছেলে-মেয়ে দু’টো একে অপরকে পছন্দ করে। প্রিয়া মায়েরও অনার্সের প্রথম বর্ষ শেষ হয়েছে। হ্যা, এটা ঠিক যে –কথা ছিলো আরও বছর খানেক পরের। কিন্তু ভেবে দেখুন। সবকিছুরই হালাল, হারাম আছে। ধর্মমতে কিন্তু বিয়েটা দিয়ে দেওয়াই উচিত। ওদের মধ্যে সে-ই সম্পর্ক না থাকলে, হয়তো আমরা ভাবতামই না। ভাবতাম কি? যেহেতু একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, এবং আমাদের ইসলামিক মতে বিবাহ ছাড়া সম্পর্ক…বুঝতেই পারছেন।’

কথা সত্যি। তবুও দোনোমনা লাগছে। যতই হোক, মেয়ের বাবা বলে কথা। যদিও এমন আন্দাজ তিনিও করেছিলেন। আজকে যে আকাশ আর প্রিয়া কে নিয়েই আলোচনা হবে সেটা গতরাত্রে স্ত্রীর সাথেও আলোচনা করেছিলেন। রেনুকা পই-পই করে স্বামীকে বলেছিলেন, এমন যদি কোনো প্রস্তাব চৌধুরীরা করে, রাজি হয়ে যেতে। তাদের বয়স হচ্ছে, শিয়ারও শশুর ঘর হয়েছে। জন্ম, মৃত্যুতে মানুষের হাত কোথায়! মেয়েটার একটা ঠাঁই করে দেওয়ার আগেই খোদার ডাকে সাড়া দিতে হলে! তখন? আফসোসেও লাভ হবে না।
আকাশ গম্ভীর মুখে দাড়িয়ে আছে। পাশে রাতুল এসে দাড়িয়েছে । ডায়নিং এর চেয়ার গুলো টেনে এনে বাকি বন্ধুরা বসা। আকাশের ভাইবোন গুলোও সোফার আশেপাশের হাতলে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। প্রিয়া কোলে আহিনকে নিয়ে ক্রমাগত দুলিয়ে যাচ্ছে। একটু থামলেই ঠোঁট উল্টে কান্নার পায়তারা জুড়ছে ছেলেটা।
বড়দের আলাপ চলছে। আরও আধঘন্টার বিস্তর আলোচনায় ঠিক হলো বিয়েটা হবে। এবং এ মাসেই হবে। শিয়া কে চৌধুরী বাড়ি নেওয়া হবে আকাশ প্রিয়ার বিয়ের সময়ই। চৌধুরী সাহেবের অনুরোধে দ্রুতই বিয়ের ডেট ফেলাও হলো।

ছোট্ট আহিন ক্ষনে ক্ষনে কেঁদে কেঁদে উঠছে। যার কোলেই থাকুক এই মূহুর্তে, সে বোধহয় খুব করে চাচ্ছে তাকে নিয়ে হাটাহাটি করা হোক। বসে থাকতে বিরক্ত প্রকাশ করছে কেঁদে। প্রিয়া সবার মধ্যে থেকে উঠে সরে গেলো। বড়দের এতো উচ্চস্বরের কথার মাঝেও বাচ্চাটা অশান্তি বোধ করছে।
প্রিয়ার উঠে যাওয়া আড়চোখে দেখলো আকাশ। সে-ও পা বাড়াবে ওদিকে তার আগেই কবজিতে টান পরলো কারোর। চোখ ফেরাতেই ফিসফিস কন্ঠে রাতুল বলে উঠলো,
—’তোর বউয়ের বাড়ির লোক এখনো জানে না, তাদের মেয়ের বিয়ের একবছর চলে। ভুল করেও ভুল একটা হয়ে গেলে, সোজা দুই মেয়ের নাতি-নাতনীর মুখ একসাথে দেখতে হতো। ‘
আকাশ ভ্রু কুঁচকে থমকে দাঁড়ায়। পাশেই তার ভাই বোনেরা কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বা বসে। রাতুলের ফিসফিস করে বলা কথাগুলো কর্ণগোচর হতেই ঠোঁট টিপে হাসির রোল পরলো সবার মধ্যে! আকাশ কোনো প্রতিত্তোরই করলো না। রাতুল পুনরায় ফিসফিসিয়ে বললো,

—’ যাস না,ভাই। এতো রাতে বড়দের সিরিয়াস আলোচনা ছেড়ে গোপন বউয়ের পিছন পিছন ঘরে ঢুকে বিয়ের আগেই কেলেঙ্কারি ঘটিয়ে ফেলিস না। তখন প্রিয়ার বাবা মা রেগে বলবে– বাবা, আর দশটা দিন সহ্য হলো না!’
আকাশ বিরক্ত চোখে তাকালো রাতুলের দিকে। আকাশের গম্ভীর দৃষ্টির মধ্যে পরতেই থেমে গেলো বাকিদের প্রকাশ্যের হাসি। কিছু একটা মাথায় আসতেই বাবা, মায়েদের দিকে এগিয়ে গেলো। খুকখুক করে সবার মনোযোগ চাইলো।
—’বিয়ে নিয়ে আমার একটা কথা আছে।’
আকাশের বাবা গম্ভীর মুখে তাকালো ছেলের দিকে। সে তো কথা বলছিলোই। এর মধ্যে আবার ওর কি বলার থাকতে পারে? মুখ ফসকে আবার কি থেকে কি বলে ফেলবে! বেয়াই,বেয়াইন এর কাছে মাথা কাটা যাবে। এমনিই ঘটা করে ঝামেলা পাকিয়ে তো রেখেছেই। আকাশ বোধহয় বুঝলো বাবার মনোভাব। চোখ টিপে ভরসা দিলো।
অতঃপর সবাইকেই উদ্দেশ্য করে বললো,

—’ দশদিন পর নয়, বিয়েটা পনেরো দিন পর হোক। মে মাসে পনেরো তারিখ?’
উপস্থিত বয়যেষ্ঠরা এই পনেরো তারিখের হেতু টের না পেলেও অয়ন রা সবাই পেলো। গত বছর ঠিক এইদিনই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলো দু’জনে। আকাশ এহনাজ চৌধুরী তাদের বিবাহবার্ষিকীর দিনই দ্বিতীয়বার বিয়ের পিঁড়িতে বসতে চাচ্ছেন। কারোর আপত্তি থাকবার কথা নয়, বরং আরও খুশিই হলেন সকলে। দশদিনের বদলে আরও পাঁচদিন বাড়তি পাওয়া গেলো আয়োজন সম্পূর্ণ করার জন্য। শিয়া আর অয়নের বিয়ের মতো এতো তাড়াহুড়োয় হবে না কিছু। এটাই শান্তি।
—’ আর বিয়েটার ভ্যেনুও আমি ঠিক করেছি। আপনাদের যদি আপত্তি না থাকে তাহলে…’
আনিসুল রহমান হবু মেয়ে জামাইয়ের হাত টেনে বসালেন নিজের পাশে। একগাল হেসে বরসা দিয়ে বললেন,
—’ শুধু বলে ফেলো, কোথায় ভ্যেনু ঠিক করতে চাও। তোমাদের দু’জনের আলাদা করে কোনো পছন্দ আছে?’
মাথা নাড়লো আকাশ। এই পরিকল্পনা আদতে তার বহুদিনেরই। শান্ত স্বরে বললো,

—’ এখানে আমাদের নিজস্ব একটা কটেজ আছে। যে কটেজে আমরা প্রথম এখানে এসে ছিলাম আরকি। একটু অফসাইডে, অনেকটাই পরিত্যাক্ত। তবে পাহাড়ের ওপরে হওয়ায় আশেপাশে অন্য রকম পরিবেশ আরকি। তাছাড়া কটেজের সামনের অংশেও বিশাল জায়গা। অনায়াসে সব আয়োজন হয়ে যাবে ওখানটায়।’
প্রিয়ার বাবা মা জানেন না ওই কটেজটার সন্ধান। তারা কিছু বলবেন তার আগেই আকাশ বলে উঠলো,
—’ ওটা আপনাদের বাড়ি থেকে মিনিট পনেরোর পথ। চিনে থাকবেন কি-না… আপনাদের বাড়ির পিছনের ওই রাস্তা, যেটা দু’টো পাহাড়ের মাঝ দিয়ে গিয়েছে, সেই রাস্তা ধরে…’
সজোরে মাথা ঝাঁকালেন প্রিয়ার বাবা। চিনতে পেরেছে বইকি! ওই রাস্তাটা তার দুই মেয়ের ভীষন প্রিয়। বিশেষত প্রিয়ার। খুব খুশি বা মন খারাপ সবেতেই ওই রাস্তায় হাঁটতে চলে যেতো মেয়ে দুটো। তাদেরও যাওয়া হয়েছে সেই হেতুতে। তবে ওদিকটায় বড় বড় গাছপালা আর পাহাড়ের আড়ালে কোনো কটেজ তারা নজর দেয়নি। শাহজাহান চৌধুরী গম্ভীর মুখে বললো,

—’ ওটার তো মেরামত প্রয়োজন। ‘
রাতুল, রাকিব একলাফে এগিয়ে এলো এদিকটায়। হাসিমুখে বললো,
—’ আমরা আছি কি করতে আংকেল? সব সামলে নেবো। তাছাড়া অতোটাও সময় লাগবে না।’
শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো বিয়ের আয়োজন চৌধুরীদের ওই কটেজটাতেই হবে। রাকা মুখ টিপে হেসে ইশারা করলো আকাশকে। আকাশ উঠে আসতেই চাপা গলায় বললো,
—’ এই কেটেজে এসেই প্রিয়ার সাথে প্রথম দেখা হয়েছিলো না?’
আকাশের মুখের গম্ভীরতা কেটে গেলো এক মূহুর্তেই। সুদর্শন পুরুষ টা হাসলো সামান্য। মানসপটে এসে ধরা দিলো বছর দেড়েক আগের ওই অভাবনীয় একটা সকাল… তার আগের দিনই সবে কটেজে পা রেখেছিলো তারা। পরের দিন একমাথা বৃষ্টি নিয়ে জগিং এ বেরিয়ে ছিলো। সে যখন বের হয়, তখন অবশ্য ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। পথিমধ্যে পা থমকায়। সঙ্গে হৃদয়ও। প্রথম দেখায় প্রেম বলে কি ওটাকে? একটা আকাশরঙা শাড়ি লেপটে ছিলো এক রমনীর সর্বাঙ্গে। বৃষ্টির পানিতে কোমড় ছড়ানো দীর্ঘ কেশরাশি ভিজে একসাড়। সঙ্গে পরনের ওই শাড়ি খানাও। দু’হাতে শাড়ির আঁচল আকড়ে তার পাশ ঘেষে চলে যায় মেয়েটা। সেই নারীদেহের মাতাল করা ঘ্রান আজও ভুলতে পারেনি আকাশ, কানে কানে কেউ কি বলে গিয়েছিলো – ‘ তুই প্রেমে পরলি এবারে? কঠিন ভাবে প্রেম! তাও আবার প্রথম দেখাতেই! ‘ বলেছিলো হয়তো। সামনে পথে হেটে আসার ওই সময়টুকু চোখের পলকে কেটে যেতেই, নিজের চিরাচরিত সত্ত্বা ভুলে পিছু ফিরে তাকিয়েছিলো। রমনীর ধনুকের মতো বাঁকানো কোমড়, ভেজা শাড়ির আড়ালে স্পষ্ট হয়ে থাকা নারীদেহের ভাজ! সেই প্রথম নিজের দৃষ্টির হেফাজত করতে ভুলে গিয়েছিলো আকাশ এহনাজ চৌধুরী। এক দেখায় সাধ মেটেনি সেদিন। ঘুরে তাকিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে ছিলো সেদিকে। পাহাড়ের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত!
আকাশের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় মেয়েটা গুনগুন করে কি গান গাইছিলো শুনতে পায়নি আকাশ। তবে তার কানে মেলোডি বাজিয়ে বাংলা গান গেয়ে গিয়েছিলো কেউ…

—’ কি আবেশে তারে বারেবারে
দেখি তবু যেনো, মেটেনা তৃষা!
সে যে পথ চলে, বুকে ঝড় তুলে
জেগে ওঠে, ঘুমানো আশা!’
হাসি প্রস্বস্ত্য হলো আকাশের। রাকার দিকে তাকালো। রাকা বুঝে নিলো যা বোঝার। বলাবাহুল্য রাকিবদেরও বোধগম্য হয়েছে সবটা । ওই রাস্তাটা আকাশদের ওই কটেজের ঠিক সামনেই৷
বড়দের আলোচনার মাঝেই সময় বুঝে সরে এলো আকাশ। প্রিয়ার খোঁজ করতে করতে এ ঘর, সে ঘর করতে করতে গিয়ে থামলো তারই ঘরে। দরজা বন্ধ করে গিয়েছিলো নিচে। শেষ কয়েকমাস যাবৎ আলাদা ঘরে থাকে সে আর প্রিয়া। প্রিয়া কালেভদ্রে আসে এ ঘরে। তাও কোনো কাজ থাকলে তবেই। জামাকাপড় থেকে শুরু করে, নিজের ব্যবহারের সবই ট্রান্সফার করে ফেলেছে মেয়েটা। বাবা মা দেশে ফেরার পর, সে ভয় বোধহয় আরও দ্বিগুণ হয়েছে।

নিজের ঘরের সামনে এসে থমকে দাঁড়ালো আকাশ। মেয়েলি কন্ঠস্বরটার উৎস তার ঘরের ভিতরেই। এবং কন্ঠস্বরের মালিক আদতে এই ঘরেরই মালকিন, আকাশের হৃদয়ের মালকিন৷ মুচকি হেসে নিঃশব্দে ঘরে ঢুকতেই চোখে পরলো সেই নারীকে। আহিন বিছানায় শুয়ে। গোল গোল চোখ মেলে তাকিয়ে আছে, ওপরে ঘূর্ণায়মান ফ্যানটার দিকে। আর তার দিকে কাত হয়ে হাতে ভর করে আধশোয়া হয়ে একা একাই বকবক করে যাচ্ছে প্রিয়া। আদুরে কন্ঠে আহ্লাদ করতে করতে, কি সব বলছে সে-ই জানে।
বাইরের করিডরের দিকে নজর বুলিয়ে চট করে ঘরের দরজা আটকে এগিয়ে এলো আকাশ। প্রিয়া তখনও আলাপে মগ্ন। আকাশের অস্তিত্ব টেরই পায়নি। আচমকা কোমড়ের কাছটার জামা গলিয়ে একটা শীতল খসখসে হাতের তালু তার উদরে ঠেকতেই ধড়ফড়িয়ে উঠতে গেলো মেয়েটা। আকাশ নড়াচড়া করতে দিলো না। শক্ত করে চেপে ধরলো নিজের বুকের সাথে। ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো মেয়েটার কানের লতিতে। শব্দ করে চুমু খেয়ে বললো,

—’ এতো চমকানের কি হয়েছে? এই ঘরে আমি ছাড়া আর কে আসতে পারে? আর কার এতো সাহস, এতো গভীরে তোমাকে স্পর্শ করার।’
প্রিয়া তবুও উঠে বসতে চায়। বাড়ি ভর্তি মানুষ। এভাবে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় কেউ দেখে ফেললে! একে তো, সে তালে তালে এই ঘরে চলে এসেছিলো। এখন আবার এরকম ! প্রিয়া ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো,
—’ আপনি এখানে কি করছেন? কেউ চলে আসলে?’
—’আসবে না।’
—’যদি আসে?’
—’ সবাই নিচে। ‘
প্রিয়ার শরীর শিথিল হলো খানিকটা। মাথাটা এলিয়ে দিলো আকাশের বুকে। পিঠ ঠেকে আছে আকাশের সাথে। ছেলেটার বুকের ধুকপুক শব্দ স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছে। প্রিয়া মুচকি হেসে ঘাড় উঁচিয়ে প্রশ্ন ছোড়ে,

—’ বিয়ের ডেট কবে ঠিক করলেন?’
আকাশ নেশাগ্রস্তের মতো মুখ ডুবায় মেয়েটার গ্রীবাদেশে। আধখোলা খোপা করা চুলের নিচে চুমু আঁকতেই শিউরে উঠলো মেয়েটা। আকাশ সেখানে মুখ ডুবিয়েই হাস্কিস্বরে বললো,
—’জানিনা। পরে শুনে নিও।’
প্রিয়া নিজের পেটের ওপর বিচরন করতে থাকা হাতের ওপর জামার ওপর দিয়েই হাত রাখলো। মৃদু কন্ঠে বললো,
—’জ্বালাচ্ছেন কেনো? হাত সরান।’
আকাশ সরালো তো না-ই। বরং স্পর্শ গভীর করলো। এলোমেলো জায়গায় ছুঁয়ে দিতে দিতে বললো,
—’ কতদিন কাছে পাই না তোমাকে। যন্ত্রণা… বোঝো তা?’
—’আর কয়েকটা দিনই তো।’
—’এখন হলে সমস্যা কি! অবিবাহিত কি আমরা?’
প্রিয়া ঠোঁট টিপে হাসি আঁটকে বললো,
—’সেদিন যেনো কে দূরে সরিয়ে দিলো? কাছে না টেনে।’
—’ ভুল হয়ে গেছে। ‘
—’মানছেন তাহলে?’
—’ সজ্ঞানে। ‘
—’এখন?’

আকাশ মুখ তুললো মেয়েটার গ্রীবাদেশ থেকে। তাদের দিকে টুলটুল চোখে চেয়ে থাকা আহিনের দিকে তাকিয়ে বললো,
—’ আমাদের বাবা কে ওর মায়ের কোলে দিয়ে এসো। ও থাকলে কিচ্ছু করতে পারবো না। একটু পর কেঁদে, হাত পা ছোড়াছুড়ি করবে। দেখা যাবে আমরা তখন এমন মূহুর্তে আছি! আমি পাগল হয়ে যাবো অমন হলে।’
প্রিয়া শব্দ করে হেসে ফেললো।
—’ আমাদের বাচ্চা হলে তখন কি করবেন?’
—’ একই কথা। শিয়ার কাছে দিয়ে আসবো।’
—’ লোককে জানাবেন–আজ বাসর করবেন? হুম?’
আকাশ প্রিয়ার চুলের ঘ্রান টানতে টানতে বললো,
—’জানলে ক্ষতি কি! ‘

প্রিয়া পুনরায় নড়েচড়ে উঠলো সরে যেতে। আকাশ এবারে একঝটকায় বিছানায় ফেললো মেয়েটাকে। নিজে দু হাত বিছানায় ভর করে উঠে এলো প্রিয়ার ওপরে। ভার ছাড়েনি মেয়েটার ওপরে। তবে সেরকম দুরত্বও নেই। প্রিয়া হাসফাস করে ওঠে। দৃষ্টি সরিয়ে ফেলে। পাশে আহিনের দিকে তাকাতে তাকতে বলে,
—’ বাড়ির সবাই জেগে। আমাদের নিয়েই কথা হচ্ছে। একটু পরেই আমাদের খোঁজ করবে। বড়রা দেখলে যা তা কাহিনি হবে। সরুন, আমি নিচে যাই বাবাই কে নিয়ে।’
আকাশ জিবে ঠোঁট ভেজায়। গর্দান ঝুকিয়ে নিজের ভেজা ঠোঁট টা চেপে ধরে মেয়েটার গলার ভাঁজে। উন্মাদের মতো শুষে নেয় জায়গাটা। চুমুর তীব্রতা এতোটা গভীরে অনুভব করে যে-প্রিয়ার হাত এসে ঠাঁই নেয় আকাশের গ্রীবাদেশ।
কন্ঠদেশ ছেড়ে নিচের দিকে নামে। পেটের ওপরের জামার অংশটুকু সরিয়ে ঠোঁট দাবায় এখানে। নাভিমূলের পাশটায় রক্ত জমে যায় এক নিমেষে। আকাশ মাথা ঠেকালো মেয়েটার নির্মেদ নগ্ন উদরে। মাতাল সুরে বললো,

—’ সবাই ঘুমালে আজ রাতে আসতে হবে, আমি অপেক্ষায় থাকবো।’
প্রিয়া শ্বাস টানে জোরে জোরে। পায়ের তালু খামচে ধরা বিছানার চাদর। হাত জোড়াও তাই। অস্ফুটস্বরে বলে ওঠে,
—’ বাচ্চাটা কেঁদে ফেলবে। সরুন। ওর মায়ের কাছে যাই।’
—’ আগে বলো আসবে।’
—’ আপনিই তো কাল বললেন, আনুষ্ঠানিক বিয়ে অবধি অপেক্ষা করতে।’
—’ সে আরও পনেরো দিন।’
—’ এ কটা দিনই তো।’
—’উহু। নিজেকে এতো বারবার দমিয়ে রাখা যায়না।’
—’ আম্মু যদি রাতে আমার কাছে শুতে আসে। এসে ঘরে আমাকে না পেলে!’
—’ প্রিয়া…’
—’হু।’
—’ আজ রাতে এ ঘরে চাই তোমাকে। আসবে না?’
আকাশের কন্ঠের আকুতিতে কম্পিত হলো তনুদেহ টা। ঠোঁট কামড়ে ইতস্তত করে কম্পিত হাতখানা গলিয়ে দিলো আকাশের চুলের ভাজে। আকাশ মুখ তুলতেই দু হাত ছড়িয়ে কাছে ডাকলো ছেলেটাকে। আকাশ আসতেই জড়িয়ে নিলো নিজের সাথে। দু’হাতে বলিষ্ঠ শরীরটা আঁকড়ে নিয়ে বললো,
—’ বাবাই কে ঘরে দিয়ে, বাকিরা ঘুমালে, আমি ম্যানেজ করে আসছি। একটু রাত হবে হয়তো।’
আকাশের ঘন ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ পাওয়া গেলো। বিরবির করে বললো,
—’উমমম, চলবে। তবে দ্রুত আসবে।

আকাশের বাড়ির মানুষজন ঢাকা মুখি হয়েছে সকাল সকাল। ওখান থেকে সব কেনাকাটা করে সামনে সপ্তাহে আকাশের দাদা-দাদি কে সঙ্গে নিয়ে আসবেন এখানে। পুরো বিয়ের আয়োজন করা হবে এখানেই। আকাশের দাদা শাহজালাল চৌধুরীর সময়ে নির্মাণ করা কটেজ ওটা। বেশ মেরামতের দরকার। রাতুলরা সকাল সকাল লেগে পরেছে সেই কাজে। পাঁচ ছয়দিন টানা চলবে এসব কাজ। তাছাড়া কটেজের সমানের দিকটার জায়গায় গাছপালা জঙ্গলে ছেয়ে আছে, সে-সব পরিষ্কার করে প্যান্ডেলের কাজও তো আছে। হলুূদ, মেহেদী সব আয়োজন শুরু হবে সাতদিন আগে থেকেই। ছেলে-মেয়ে গুলোর পরিকল্পনার শেষ নেই।
অফিস যাওয়ার আগেও ব্যাস্ত চোখজোড়া খুঁজে ফিরলো প্রিয়াকে। নজরে পরলো না। রাতেও আসেনি ঘরে। মেজাজ চটে আছে আকাশের। রাতে ঘুম হয়নি একবিন্দুও। মাথা দপদপ করছে। গোটা রাতে চারবার শাওয়ার নিয়েছে। তবুও শরীরের ছটফট ভাব কমছে না কিছুতেই। ব্রেকফাস্ট করে রুম থেকে ব্যাগটা নিয়ে নিচে আসলো, তারপরও ম্যাডামের দেখা মিললো না। বাড়ি ভর্তি সব মানুষ বসার ঘরে গিজগিজ করছে, সকালের নাস্তা খাওয়ার জন্য। অথচ ওই একমাত্র ব্যাক্তির দেখা নেই কোনো।

দোতলার করিডর থেকে মলিন মুখে উঁকিঝুকি মারছে প্রিয়া। গতরাতে ঝামেলা তো হয়েই ছিলো। না হলে স্বইচ্ছেতে কি আর সে আকাশের কাছে যায়নি না-কি! আহিনকে ওর মায়ের কাছে দিয়ে, নিজে ফ্রেশ হয়ে যেই বের হবে ঘর থেকে তখনই প্রিয়ার মা এসে পরেন। রাতে মেয়ের সাথে ঘুমাবেন বলে। ছোট্ট মেয়েটারও বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। বাবা মায়ের মন বলে কথা! বিয়ের আগে এ কটা দিন মেয়ের কাছেই শোবেন তিনি। দু’দিন পর চলেই যাবে পরের ঘরে। ছোট্ট মেয়েটা, অন্য বাড়ির বউ হবে। ভাবা যায়!
আকাশ গম্ভীর মুখে কটেজ থেকে বেরিয়ে যেতেই অপরাধি মুখে নিচে নেমে এলো প্রিয়া। আকাশের বাড়ির লোকজন একটু পর ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। অয়নরা তাদের বিদায় দিয়ে ছুট দিয়েছে অফিসের দিকে। এ কটা দিন বহু কাজ। ওই কটেজটার মেরামতেও ব্যাস্ত সময় পার করতে হবে। তাছাড়া তাদের হোটেলের কাজও শেষের দিকে। একদিন কাজ বন্ধ রাখার উপায় নেই বললেই চলে।

পাঁচদিন কেটে গিয়েছে এরই মধ্যে। আকাশদের কটেজের মেরামত একদম শেষের দিকে। আগামীকাল থেকে প্যান্ডেলের লোকজন চলে আসবে। ছিমছাম প্যান্ডেল হবে। পাহাড়ের ওপর এক টুকরো মেঘের দেশে একটা কটেজ। সেখানে রঙচঙ প্যান্ডেল মানায়! মানায় না। স্নিগ্ধ মেঘ মেঘ আবেশ না থাকলে চলবে কেনো!
রিমির বাবার এরই মধ্যে দ্বিতীয় বারের মতো স্ট্রোক হয়েছে। বাধ্য হয়ে মেয়ের বিয়ে দ্রুত সারতে মরিয়া হয়ে গিয়েছেন বেচারা। প্রায় সয্যাশায়ীই তিনি। হুইল চেয়ারে চলাচল করতে হয়। কথা ছিলো আকাশ প্রিয়ার বিয়ের ঝামেলা মিটলে তারপর নাহয় আয়োজন হবে। তবে সেটা হচ্ছে না। অগত্য একদম ঘরোয়া আয়োজনেই আজকে বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। আছরের আজানের পরপর রিমিদের বাড়িতে চলে এসেছে সবাই। শশুরের অ্যাক্সিডেন্টটায় রাতুল যতটা দুঃখ পেয়েছিলো, এই কারণে বিয়েটা দ্রুত হয়ে যাওয়ায় আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে যেনো। সবার আগে তৈরি হয়ে গিয়েছে। যোহরের নামাজের পর থেকেই সেজেগুজে গাড়িতে বসে আছে। তবে সব গোছগাছ করে রওনা দিতে দিতে বিকেল হওয়ায় সে মহা বিরক্ত। অভিযোগ এরই মধ্যে কয়েকবার প্রকাশ করে ফেলেছে প্রিয়ার বাবার কাছে। রাতুলের পরিবারও এসেছে আজ খুব ভোরে।
বর বেশে বেশ খোশমেজাজেই বসে আছে রাতুল। ড্রাইভিং সিটে বসা আকাশের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বললো,

—’ ভাগ্য! সবই ভাগ্য! দেখলি…কি থেকে কি হয়ে গেলো। আজকের পর থেকে আমি বিবাহিত। আর তুই! বিবাহিত ব্যাচেলর। মন খারাপ করিস না। তুইও প্রকাশ্যে বিবাহিত হয়ে যাবি আর সাত দিন পরেই।’
আকাশ মুচকি হাসলো। পিছনে বসা বাকিরা। প্রিয়া গিয়ে বসেছে অন্য গাড়িতে। শিয়া আর অয়নের সাথে। শিয়ার বাচ্চাটা হওয়ার পর থেকে প্রিয়াকে ঘুরেফিরে তার আসেপাশেই দেখা যায়। আকাশের সাথে এ ক’দিনে সাক্ষাৎ হয়েছে মাত্র হাতে গোনা কয়েকবার। ছুঁতে গেলেই পালাই পালাই করে। আশ্চর্য মেয়ে একটা! আকাশ নিজেও ফিচেল হেসে থমথমে কন্ঠে বললো,

—’ হিসেব করে দেখতো, জিতলো কে। তুই না আমি?’
—’নিঃসন্দেহে আমি।’
—’কোন যুক্তিতে?’
—’ তোর আগে বিয়ে করছি আমি।’
গাড়ি রাস্তায় মোড় নিলো আকাশ। আড়চোখে রাতুলের অতী উচ্ছসিত মুখটা দর্শন করলে। তার কিছু তে হলো না। পিছন থেকে খ্যাকখ্যাক করে হাসির শব্দ শুনতে পাওয়া গেলো। রাকিব ঝুঁকে এসে রাতুলের বাহুতে চড় বসিয়ে বাঁকা কন্ঠে বললো,
—’ গাধা কি সাধে বলা হয়! আকাশ বিয়ে করছে দ্বিতীয় বারের মতো। হাজার বার বাসর সেরে বসে আছে। আর তুই শা*লা হবু বউকে চুমু অবধি খেতে পারিস নি। হিসেব মেলে কিভাবে?’
রাতুল দমলো না। তীব্র প্রতিবাদ করে উঠলো,

—’ তো? আজকের পর থেকে আমি আমার বউকে সবার সমানে চুমু খাবো। কে কি বলবে! আকাশ সেটা পারবে ওর বিয়ের আগ অবধি? গোপনে বিবাহ তাহার।’
আরও কতক্ষণ চলতো এই কথার যুদ্ধ। তার আগেই দেখতে পাওয়া গেলো অল্প পরিসরে সাজানো বিয়েবাড়ি। রিমিদের বাড়িতে এসে গিয়েছে তারা।

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৬০

বিয়েটা হয়ে গেলো ঝটপট একেবারে। কাজি সাহেব এসে বসেই ছিলেন। কনেও সাজানোই ছিলো। রাতুলদের এসে দেরি করতে হলো না খুব একটা। এশার আজানের আগেই বিয়ে,খাওয়াদাওয়া সবের পাঠ চুকে গেলো। বউ নিয়ে আজকে কটেজেই ফিরবে। এখানেই সব আয়োজন করা হয়েছে। আকাশ প্রিয়ার বিয়ে নিয়েও ঝামেলার শেষ নেই। এখন রিমিকে নিয়ে ঢাকা গিয়ে, আবার আসা! জার্নি করতে পারে না মেয়েটা। আর সাতদিন পর আকাশ প্রিয়ার সাথে একেবারে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হবে ওরাও। বাসরের আয়োজন করা হয়েছে কটেজেই। রাকা, তুশি,প্রিয়া সবাই মহা সমারোহে সাজিয়ে ফেলেছে সবটা। রিমিকে নিয়ে যখন ফেরা হলো তখন সবে নয়টা। যদিও নবদম্পতিকে মোটেই বাইরে আটকে রাখা হলো না।

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৬২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here