আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪৫
কায়নাত খান কবিতা
_কতদিন__ভেবেছি শুধু দেখবো যে তোমায়…!”
মুখের ওপরে গরম নিঃশ্বাস অনুভব হতেই ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে অরিন। প্রচন্ড রকমের হাঁপাতে থাকে সে। যেন কোনো দূরস্বপ্ন দেখছিলো এতক্ষণ ধরে। কপালের ঘাম মুছতে গিয়ে নিজের শরীরে থাকা ভারি পরিধানের ওজন বেশ ভালো মতোই আন্দাজ করতে পারে সে। বর্তমানে সে একটি বেজায় অন্ধকারে আচ্ছন্ন ঘরের বিছানার মাঝে বসে রয়েছে । জানালার পর্দা টানা। বাইরের আলো ঢোকার কোনো সুযোগ নেই। শুধু কোণের একটা নীলচে ল্যাম্প জ্বলতে থাকে।যার আলো ঘরটাকে অস্বস্তিকর, শীতল একটা আবরণে ঢেকে রেখেছে।
ভারি লেহেঙ্গাটা শরীরের ওপর পাথরের মতো চেপে আছে। সূক্ষ্ম সোনালি কারুকাজ, ঘেরের ভাঁজে ভাঁজে ঝিলমিল আলো।কিন্তু তার কাছে সবই বোঝা। গলার হার যেন শ্বাস আটকে দিচ্ছে, কানে দুল, হাতে চুড়ি, কপালে টিকলি, সব মিলিয়ে সে যেন কোনো পুতুল, সাজানো, স্থির, নিজের ইচ্ছার বাইরে।
নিজের অবস্থান সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা পেতে না পেতেই একটা বিশ্রী বাজে গন্ধ তার নাকে আসতে থাকে। হালকা কেশে ওঠে অরিন। এই বিশ্রী বাজে গন্ধের সূত্র পাত খুঁজতে খুঁজতে অরিনের চোখ চলে যায় সোফার দিকে।
যেখানে কালো লেদারের সোফায় গা এলিয়ে বেশ আরম করে বসে থাকে কিংশুক।
পায়ের ওপর পা তুলে, অবহেলার ভঙ্গিতে। এক হাতে সিগার। ধোঁয়া ধীরে ধীরে পাক খেয়ে ওপরে উঠছে। আলো-ছায়ার ফাঁকে তার চোখ দুটো অদ্ভুত শান্ত।কিন্তু সেই শান্তির নিচে কেমন হিমশীতল কঠোরতা।
সে একবারও তাড়াহুড়া করছে না। যেন এই মুহূর্তটার জন্য অনেকদিন অপেক্ষা করেছে কিং।
ধোঁয়ার কুণ্ডলী সরিয়ে কিংশুক সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে অরিনের দিকে তাকায়। মাথা থেকে পা পর্যন্ত ধীর, হিসেবি দৃষ্টি। যেন পরীক্ষা করছে,সব ঠিকঠাক হয়েছে কিনা।
ঘরের বাতাস ভারি হয়ে ওঠে।
অরিন বুঝতে পারে, তার কণ্ঠ শুকিয়ে গেছে। এই সাজ, এই নিস্তব্ধতা, আর কিংশুকের নিঃশব্দ উপস্থিতি।সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত চাপা আতঙ্ক তৈরি করছে তার মাঝে।
কিংশুক সিগারের ছাই ঝেড়ে খুব নিচু, স্থির কণ্ঠে বলে..
-বিবাহিত হওয়ার পর ও আবার কেন বিয়ে করতে গেলে জান? Didn’t I satisfy you?”
খুব ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে অরিন তাকায় কিংশুকের দিকে। তার দৃষ্টির কঠোরতা কিংশুককে গিলে খেতে বাধ্য।
–ইফফ! ওভাবে তাকিয়ো না জান। প্রেমে পড়ে যায় তো।”
–আমি আপনাকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখছি কিং।”
–ব্যাপার না। দৃষ্টি আমার দিকে থাকলেই হলো।
অরিন ওঠে দাঁড়ায় কিংশুকের সামনে। সে দাঁড়ানোর সাথে সাথে কিংশুক ও একটা গা ছাড়া ভাব নিয়ে দাঁড়ায়।
–আপনাকে আমি ঘৃণা করি কিং। কেন বুঝেন নাহ?”
কিংশুক অরিনের একদম কাছে দাড়িয়ে কোমর জাপ্টে বলে..
–আমি ও আপনাকে ভালো বাসি জান। আপনি কেন বুঝেন না?”
নিজেকে ছাড়াতে ছাড়াতে খানিকটা ঘৃণা ভরা কন্ঠে অরিন বলে ওঠে
—আবার পালাবো।”
কিংশুক আরো শক্ত ভাবে অরিনকে ধরে বলে
– আবার ধরে আনবো।”
–I hate you king!”
–I love you too jann.”
কিংশুকের কথা গুলো যেন কাঁচের ন্যায় বাঁধলো অরিনের শরীরে। সে তাকে hate YOU বলছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে কিং তাকে love you too বলছে? এ কেমন বিক্রিত মস্তিষ্কের লক্ষ্মণ?
–অনেক রেস্ট নিয়েছো জান। we should go now.”
–where?”
–বিয়েতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। তোমার মা তো কাগজ পুড়িয়ে ফেলেছে। পরের বার আবার ও সেম ঝামেলা চাচ্ছি না জান। কিং ভুল একবার করে। কিন্তু শিক্ষা অন্যরা নেয়।”
— আমি যদি আজকে মা-রা ও যায় তবু ও আপনাকে বিয়ে করবো না। আগের বিয়ের কোনো প্রমাণ নেই। so I’m safe from you..you can’t stop me king..”
অরিনের মুখে অবস্থিত চুল গুলো সরাতে সরাতে হুট করে পিছনের চুল শক্ত করে মুঠি করে ধরে কিং। তার হাতের তীব্র শক্তিতে ব্যাথাতে কুকরিয়ে ওঠে অরিন। চোখ দিয়ে আপনা আপনি পানি গড়িয়ে পরে।
–আমি আপনার থেকে পারমিশন নিচ্ছি না জান। অর্ডার করছি। And you have to follow it. না শব্দটি আমার ডিকশনারিতে নেই জান।”
–আমি আপনার কেনা পুতুল নই। i Won’t listen to you..
— Are you sure?”
__ yeap!. I will not marry you..never!”
হঠাৎ করেই কিংশুকের চোখে অদ্ভুত রাগ জ্বলে ওঠে। কোনো কথা না বলেই সে অরিনের হাত শক্ত করে ধরে টেনে নিয়ে বেরিয়ে আসে বাড়ির গার্ডেনে।
অরিন হোঁচট খেতে খেতে তার পেছনে হাঁটে। ভারি লেহেঙ্গা আর গহনাগুলো দৌড়াতে তো দূরের কথা, ঠিকমতো হাঁটতেও দিচ্ছে না। গার্ডেনটা বিশাল, কিন্তু অদ্ভুত ফাঁকা। চারপাশে চোখ বুলিয়ে অরিনের বুক ধক করে ওঠে।
দূরে কয়েকজন গার্ড ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। আর মাঝখানে একটা বিশাল বুলডোজার।
মাটির ওপর তার লোহার দাঁতগুলো ঠান্ডা আলোয় ঝিলিক দিচ্ছে। পুরো জায়গাটা যেন কোনো নির্মাণস্থল নয়। বরং অজানা কোনো অশাস্তির মঞ্চ।
অরিনের মনে হঠাৎ আতঙ্কের ঢেউ ওঠে।সামনের দিকে তাকিয়ে কিংশুক বলে ওঠে
– I have a surprise for you jaan.”
কিংশুক একবারও অরিনের দিকে তাকায় না। ধীর পায়ে সোজা এগিয়ে যায় বুলডোজারের দিকে। যেন আগেই সব ঠিক করে রেখেছে সে।
মুহূর্তের মধ্যেই সে উঠে বসে ড্রাইভারের সিটে।
ইঞ্জিনটা হঠাৎ গর্জে ওঠে।ভয়ংকর ভারি শব্দে রাতের নীরবতা ছিন্ন হয়ে যায়। বুলডোজারের আলো জ্বলে উঠে সরাসরি অরিনের মুখে পড়ে।অরিনের বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে।ভয়ার্ত কন্ঠে অরিন জিজ্ঞেস করে..
__এটা কী করছেন আপনি কিং?”
কিন্তু কোনো উত্তর আসে না।পরের মুহূর্তেই বুলডোজারটা সামনে এগোতে শুরু করে, সোজা অরিনের দিকে।লোহার বিশাল ব্লেডটা ধীরে ধীরে তার দিকে তেড়ে আসতে থাকে অরিনের দিকে। কিংশুকের মুখে কোনো ভাব নেই। ঠান্ডা, পাথরের মতো।অরিনের শরীর কাঁপতে থাকে। তারপর হঠাৎ ঘুরে দৌড় দিতে থাকে । ভারী লেহেঙ্গা টেনে ধরে থাকে তার পা, তবুও প্রাণপণে ছুটতে থাকে সে। কিন্তু কয়েক কদম যেতেই বুঝতে পারে।চারপাশে গার্ডরা দাঁড়িয়ে আছে। কেউ তাকে যেতে দিবে না। তাদের মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, যেন তারা শুধু আদেশ পালন করছে।
অরিন একদিকে দৌড়ে যেতেই গার্ড পথ আটকে দেয়।আরেকদিকে ছুটে যায়।সেখানেও দেয়াল।
আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪৪
পেছন থেকে বুলডোজারের গর্জন আরও কাছে আসতে থাকে। মাটির কম্পন তার পায়ের নিচে কাঁপতে থাকে।অবশেষে দৌড়াতে দৌড়াতে অরিন গিয়ে ঠেকে উঁচু সিমেন্টের দেয়ালে।আর যাওয়ার জায়গা নেই।তার সামনে অন্ধকার দেয়াল। আর পেছনে গর্জে ওঠা বুলডোজার।অরিন ঘুরে দাঁড়ায়।ঠিক সেই মুহূর্তে বুলডোজারটা ভয়ংকর গতিতে তার দিকে এগিয়ে আসে।
__কিং নাহহহহ!”
