Home আনহেলদি অবসেশন আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৫৫

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৫৫

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৫৫
কায়নাত খান কবিতা

__ডিজিটাল বউ! স্বামীর সেবা করা বাদ দিয়ে ঢং করে চলে যাচ্ছে!”
কিংশুকের প্রতিটি কথায় অরিন স্পষ্ট শুনতে পেলে ও সে তেমন একটা কর্নপাত করে না। কারণ কিংশুক নিজেই অরিনকে চ’ড় মে’রে তার জীবন থেকে চলে যেতে বলেছে। তাহলে সে কেনই বা থাকবে তার সাথে? অরিন চুপচাপ নিজের রুমে চলে যায়। এবং ডোর, ইউন্ডো, থাই ডোর সব কিছু লক করে ফ্রেশ হতে চলে যায়।
ঝর্নার নিচে দাঁড়িয়ে অরিন অনুভব করে।পানি শুধু শরীর ভেজায় না, ভেতরের জমে থাকা শব্দগুলোও ধুয়ে দেয়। প্রতিটি ফোঁটা যেন স্মৃতির দরজায় টোকা দেয়। চোখ বন্ধ করলেই দৃশ্যগুলো একে একে জেগে ওঠে।প্রথম দেখা, অদ্ভুত দৃষ্টি, বাহুর ট্যাটু, আর সেই অকারণ খোঁজ… যেন কেউ তাকে মানুষ হিসেবে নয়, একটা ‘জিনিস’ হিসেবে চেয়েছিল।
কিংশুকের উপস্থিতি তার জীবনে ভালোবাসা হয়ে আসেনি, বরং এক অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ হয়ে নেমে এসেছিল। ঘরের ভেতর বন্দী দিনগুলো,শুধু দেয়াল নয়, তার শ্বাসও যেন আটকে দিত। অথচ সে কখনো প্রশ্ন করেনি, কখনো নিজের পক্ষে দাঁড়ায়নি। কারণ ছোটবেলা থেকেই সে শিখেছে মানিয়ে নিতে হয়, চুপ থাকতে হয়, অন্যের ইচ্ছাই নিজের পথ।
কিন্তু আজ, এই ঝর্নার নিচে দাঁড়িয়ে প্রথমবার অরিন নিজেকে জিজ্ঞেস করে,তার দোষটা কোথায়?
জীবনের প্রতিটা বাঁকে সে অন্যের কথা মেনেছে, নিজের ইচ্ছাকে চেপে রেখেছে। তাহলে কেন সে আজও বন্দী? কেন তার স্বাধীনতা এত অপরিচিত?

পানির শব্দের ভেতরেই যেন উত্তরটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়,সে কখনো নিজের জন্য বাঁচেনি।
একটা মানুষ যখন নিজের সিদ্ধান্ত নিতে ভুলে যায়, তখন সে ধীরে ধীরে পুতুল হয়ে যায়। অরিন বুঝতে পারে, সে কারো তৈরি করা গল্পের চরিত্র হয়ে ছিল এতদিন। তার হাসি, কান্না, এমনকি নীরবতাও।সবই যেন অন্য কারো লেখা স্ক্রিপ্ট।
ঝর্নার পানি তার চুল বেয়ে নেমে আসে, চোখের কোণে জমে থাকা অদৃশ্য প্রশ্নগুলোকে ভিজিয়ে দেয়।
আজ সে প্রথমবার অনুভব করে,মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েও, সে এতদিন বেঁচেছে মানব-রূপী এক পুতুল হয়ে।
স্মৃতির ভেতর ডুবে থাকতে থাকতে হঠাৎই অরিনের বুকের বাম পাশে যেন মোচড় দিয়ে ওঠে।অস্বস্তিকর, অজানা এক টান। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার চোখ পড়ে বাথরুমের ক্লজেটের দিকে।কাবাটট নড়ছে।
প্রথমে সে ভেবেছিল ভুল দেখছে। হয়তো ঝর্নার পানির শব্দে, মাথার ভেতরের এলোমেলো ভাবনায় চোখ তাকে ধোঁকা দিচ্ছে। কিন্তু না।আবারও নড়ে ওঠে সেটি। খুব ধীরে, খুব সূক্ষ্মভাবে। যেন ভেতর থেকে কেউ নিঃশব্দে ঠেলা দিচ্ছে।
অরিন স্থির হয়ে যায়। তার শরীরের প্রতিটি পেশি শক্ত হয়ে ওঠে, শ্বাস আটকে আসে অজান্তেই। এই গভীর রাতে, এই বন্ধ বাথরুমে।কিছু কি সত্যিই নড়তে পারে?
সে তো ক্লজেটের কাছেও যায়নি। স্পর্শও করেনি। দূরে দাঁড়িয়ে আছে তবুও কাবাটটা কেঁপে উঠছে বারবার।
পানির শব্দ হঠাৎই যেন ভারী হয়ে ওঠে, চারপাশের নিস্তব্ধতা আরও ঘন হয়। অরিনের মনে হয়।এই ছোট্ট জায়গাটার ভেতরেই কিছু একটা অদৃশ্য উপস্থিতি ঘুরে বেড়াচ্ছে।তার গলা শুকিয়ে আসে। ঠোঁট কাঁপে।চোখ সরাতে চায়, কিন্তু পারে না।

শুকনো ঢোক গিলতে গিলতে সামনের দিকে পা বাড়াতেই অরিন লক্ষ্য করে ক্লজেটের মাঝ থেকে দরজার মতো খুলে যায়। এবং সেখান থেকে বেরিয়ে আসে কিংশুক।কিংশুককে দেখার সাথে সাথে অরিন নিজেকে ঢাকতে ব্যস্ত হয়ে পরে। শরীরে বস্ত্রের লেস মাত্র নেই তার।কোনো রকম তয়লা পেচিয়ে দাঁড়িয়ে পরে অরিন। কিংশুক ও শুধু মাত্র একটি টাওজার পরে উদোম শরীরে তার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে।
শুকনো ঢোক গিলতে গিলতে এক পা এগোতেই অরিনের চোখের সামনে অস্বাভাবিক ঘটনাটা ঘটে।ক্লজেটের মাঝ বরাবর রেখা কেটে দরজার মতো ফাঁক হয়ে যায়।
সময়ের মতো থমকে থাকা সেই ফাঁক থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে কিংশুক।
মুহূর্তটা যেন বাস্তব না, দুঃস্বপ্নও না।এর মাঝামাঝি কোথাও আটকে থাকা এক অনুভূতি।
কিংশুককে দেখার সাথে সাথেই অরিন চমকে ওঠে। শরীরের দিকে হঠাৎই তার সচেতনতা ফিরে আসে। ভেজা ত্বক, ঝর্নার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা অসহায়তা।সব মিলিয়ে সে দ্রুত নিজেকে ঢাকতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাড়াহুড়ো করে একটা তোয়ালে জড়িয়ে নেয় শরীরে, হাত কাঁপছে তার।

ওদিকে কিংশুক, নির্বিকার, অস্বাভাবিকভাবে শান্ত। তার গায়ে কেবল একটি টাওজার, ভেজা শরীর থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে ধীর ছন্দে।
অরিন পিছিয়ে যেতে থাকে, দৃষ্টি সরিয়ে রাখে।কিংশুককে না দেখার এক জেদ চেপে বসে তার ভিতরে।
তার কানে কোনো শব্দ ঢুকছে না, যেন চারপাশের সবকিছু নিঃশব্দ হয়ে গেছে।
ঠিক তখনই হঠাৎ।এক তীব্র টান পড়ে তার জড়ানো তোয়ালায়।
অরিন থমকে দাঁড়ায়, দুই হাতে আঁকড়ে ধরে কাপড়টা, শ্বাস ভারী হয়ে ওঠে।
ভয় আর অপমান একসাথে গলা চেপে ধরে তাকে।
ধীরে, কিন্তু স্পষ্ট বিরক্তি নিয়ে মাথা তোলে সে।
চোখে জমে ওঠে রাগ।জোড় গলায় বলে ওঠে অরিন,

__কিং!”
অপরপ্রান্তে নীরবতা আরও ঘন হয়ে ওঠে।কিংশুক কোনো উত্তর দেয় না।
বরং ধীরে, হিসেবি টানে অরিনের জড়ানো তোয়ালাটা আলগা করতে থাকে।
অরিনের ভেতরের জমে থাকা ক্ষোভ মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হয়।
এক ঝলকে ঘুরে দাঁড়িয়ে সে কিছু বলতে যায়।কণ্ঠে রুদ্ধ প্রতিবাদ জমে ওঠে।
কিন্তু শব্দ বের হওয়ার আগেই কিংশুক তাকে কাঁধে তুলে নেয় হঠাৎ করে।
অপ্রস্তুত অরিন ছটফট করে ওঠে, হাত-পা ছুঁড়ে মুক্ত হতে চায়।তার চিৎকারে ঘরের বাতাস কেঁপে ওঠে, কিন্তু তাতেও থামে না কিংশুক।
নির্বিকার পায়ে সে কাবাট পেরিয়ে নিজের কক্ষের দিকে এগিয়ে যায়।অরিনের কণ্ঠ ভেঙে যায়, তবুও সে থামে না।ভয় আর রাগ মিশে একাকার হয়ে ওঠে তার প্রতিটি শব্দে।

__কিং স্টপ।”
__নোপ!’’
__আই ডোন্ট লাইক ইউ কিং। নিচে নামান আমাকে।’
__আই নো, ইউ ডোন্ট লাইক মি। ইউ লাভ মি।’’
__কচু।”
সুযোগ পেয়ে কিংশুকের পিঠে বেশ অনেক গুলো চ’ড় থাপ্প’ড় বসিয়ে দেয় অরিন।কারণ এই সুযোগ দ্বিতীয় বার আর আসবে না। তাই সুযোগটি লুফে নেয় সে। ইচ্ছে মতো মারতে থাকে কিংশুকের পিঠে।
__তুমি আমার পিঠ ব্যাথা করে ছাড়বে তো,আমি তোমার শরীর ব্যাথা করে ছাড়বো। বুঝে নিও।’
কিংশুকের এমন লাগামহীন কথার অর্থ স্পষ্ট ভাবে বুঝতে পেরে একদম চুপসে যায় অরিন। আর কোনো সাউন্ড বের করে মুখ থেকে। হাত পা একদম জীবন্ত লাশের মতো ছেড়ে দেয়।
কিংশুক অরিনকে সোজা বিছানার মাঝ বরাবর বসায়। এবং তার পায়ের নিচে বসে পরে হাঁটু পেরে। রাগে অরিন অন্যত্র মুখ ফিরিয়ে নেয়।

__বেবিগার্ল।’
কোনো প্রতি উত্তর করে না অরিন।চুপচাপ অন্যত্র মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকে। কিংশুক অরিনের হাত ধরে কোমল আদরে নিজের গালে রাখে।এবং মায়াভরা কন্ঠে বলে ওঠে,
__Can I learn how to be gentle… just by being around you?”
__No, You can’t.’’
__why?”
__আপনি কখনো আমাকে বুঝেননি কিং। স্বাধীনতা দেননি।”
__যদি স্বাধীনতার অর্থ আমার থেকে দূরে থাকা হয়। তাহলে সেই স্বাধীনতা তুমি কখনোই পাবে না।”
কিংশুকের উত্তর শুনে অরিন উঠে সরে যেতে চাইলে হঠাৎই তার বাহু চেপে ধরে কিংশুক।
এক ঝটকায় টেনে আনে নিজের কাছে।দূরত্বটুকু মুহূর্তেই ভেঙে যায়।
অরিন থমকে যায়, দৃষ্টি এড়িয়ে রাখতে চায়, কিন্তু পারে না পুরোপুরি।তার শ্বাস তখনও অস্থির, চোখে রাগের সাথে জমে থাকা ভয়।
কিংশুকের আঙুলের চাপ শক্ত। ডুকরে উঠে অরিন।

__কিং আপনি আমাকে আবার কষ্ট দিচ্ছেন!’’
অরিনের চোখে পানি দেখে মুহুর্তেই তার হাতের বাহু ছেড়ে দেয় কিংশুক।তারপর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তাকে।
__কিং লিভ মি।”
__আই কান্ট! তোমাকে পাওয়া খুব দরকার আমার বেবিগার্ল!”
__আমাকে পাওয়া কিংবা না পাওয়াতে কী বা এমন যায় আসে কিং?”
হালকা করে অরিনের ধনুকের ন্যায় কোমরটি ধরে তার কপালের সাথে নিজের কপাল ঠেকিয়ে কিংশুক বলে,
__তোমায় পাওয়া বড় প্রয়োজন! বলো তুমি কী আমার হবে? বলো রাখবে কী অনুভবে?”
চোখ বন্ধ করে জোরে নিঃশ্বাস ফেলতে থাকে অরিন।তারপর কিংশুকের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
__আমাকে যদি এতোটাই প্রয়োজন হতো! তাহলে চলে কেন যেতে বলেছিলেন কিং? তাও সবার সামনে চ’ড় মেরে!”
অরিনের মনের ভিতরে থাকা চাপা কষ্টটি বুঝতে পেরে তার থেকে দু-কদম সরে দাড়ায় কিং। পিছন থেকে একটি ধারালো ছু’ড়ি নিয়ে অরিনের সামনে দাঁড়ায় সে। অরিন যতক্ষণে বাঁধা দেওয়ার জন্য পা চালায়, ততক্ষণে কিংশুক নিজের হাত কে’টে ফেলে। অরিন চেয়ে ও থামাতে পারে না কিংশুককে।
অরিন এসে শক্ত করে কিংশুকের কা:টা হাতটি চেপে ধরে। এবং তড়িঘড়ি করে ফাস্ট এইড বক্স বের করে ব্যান্ডেজ করতে থাকে অরিন। চোখ বয়ে টপটপ করে জলরাশি গুলো ধাপিত হতে থাকে । যেন নিঃশ্বাস টা ও বন্ধ হয়ে এলে বলে।

__হাত কেটেছে আমার, আর কাঁদছো তুমি?”
__আপনি এতো বেপরোয়া কেন কিং?”
__তোমার জন্য!”
অরিন আর কিছু না বলে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কিংশুককে। কিংশুক একহাতে অরিনের কোমর জাপ্টে ধরে তাকে নিজের কোলে বসিয়ে নেয়।
__হাত কে’টে গেছে। একটু সমস্যা হবে। তুমি কী কোওপারেট করবে?”
অরিন কিংশুকের কথার কোনো অর্থ বুঝতে না পেরে তার দিকে তাকিয়ে থাকে ভ্রু কুঁচকে । এখন সে কোন কাজে তাকে সঙ্গ দেবে ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না তার।জিজ্ঞেসা দৃষ্টিতে অরিন আওড়ায়,
__কোন ব্যাপারে কিং।”
কিংশুক কিছু না বলে শুধু একটু হাসি টেনে আনে মুখে তারপর অরিনকে এক ঝটকায় বেডে ফেলে দিয়ে তার উপরে চড়ে বসে,

__কিং নো।”
__ইউ ক্যান্ট স্টপ মি বেবিগার্ল।”
__কিং হাত কেটে গেছে আপনার।”
__হাত দিয়ে এমনিতেই ও কিছু করা লাগবে না। তুমি শুধু নড়ো না।”
অরিনকে আর কোনো উত্তর না দিতে দিয়ে তার উন্মুক্ত গলায় মুখ ডুবিয়ে রাখে কিংশুক। অজস্র চুমুতে ভরিয়ে ফেলে তাকে। খানিকটা হাঁপিয়ে ওঠে অরিন।কিংশুক বরাবরই অনেক শান্ত মানুষ। তবে অরিনের কাছে গেলে এতোটা ডেস্পারেট কেন হয়ে যায় সে বুঝতে পারে না। যেন তাকে থামানোই মুশকিল হয়ে ওঠে।এভাবে বেশ অনেক ক্ষণ তাদের মিলনের মাত্রা চলতে থাকে। অরিন এক পর্যায়ে বলে ওঠে,

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৫৪

__কিং দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার।”
কিংশুক মাথা তোলে অরিনের মুখের সাথে নিজের মুখ লাগিয়ে বলে,
__ইট’স জাস্ট অ্যা বিগেনিং বেবিগার্ল।”
__কিং…!”

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৫৬

2 COMMENTS

Comments are closed.