Home আপনাতেই আমি সিজন ২ আপনাতেই আমি সিজন ২ শেষ পর্ব 

আপনাতেই আমি সিজন ২ শেষ পর্ব 

আপনাতেই আমি সিজন ২ শেষ পর্ব 
ইশিকা ইসলাম ইশা

একটা বাচ্চাকে কি বলতে কথা বলতে হয় আর কি বলতে হয় না সেটা নিশ্চয়ই জানেন !!
অলিভা রিদির কথায় তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
আমি তো শুধু সত্যিটা বলেছি!
রিদি এ পর্যায়ে ঠাস করে থাপ্পড় বসিয়ে দেয় দেয় অলিভার গালে। বাঘিনীর মতো গজে উঠে বলে,
আমার ছেলেমেয়ে থেকে একশো হাত যেন দূরে দেখি তোকে।যেই কয়দিন এখানে আছিস ভালোমতোই থাক মায়ের মমতাকে কখনো হালকা করে নিস না।
অলিভা গালে হাত দিয়ে রেগে বলল,
তোর সাহস কিভাবে হয় আমাকে……
রিদি পরপর আরো দুটো থাপ্পর দিয়ে রাগে হিসহিসিয়ে বলল,
আমাকে হালকায় নিয়ে ভুল করিস না।
কি হচ্ছে এখানে??
এরিকার কথায় রিদি রাগে গজগজ করতে করতে বলল,

আপনার বোনকে আমার ছেলেমেয়ের আশেপাশেও যেন না দেখি।আমি রিদিতা নিজের অপমান সহ্য করলেও আমার সন্তানদের ব্যাপারে কোন কুটক্তি আমি সহ্য করব না।
ততক্ষণে সবাই উপস্থিত হয়েছে রুমে।হুট করে এতো সকালে মিজা বাড়িতে রিদির একা আগমন দেখে সবাই বেশ অবাক হয়েছে।রিদি কারো সাথে কোন কথা না বলে অলিভার রুম কোনটা জিজ্ঞেস করে সোজা রুমের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।নক করার পর দরজা খুলতেই রিদির প্রশ্নের সম্মুখীন হয়।
কি করেছে অলিভা?

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

কি করেছে সেটা তাকেই জিজ্ঞেস করুন।আর একটা কথা।রাদিফ ভাইয়ার সাথে অতীতে কি হয়েছে তার বিন্দুমাত্র কোনো ধারনা ছিল না আমার।আমার মনে রাদিফ ভাইয়া কখনোই স্পেশাল কেউ ছিল না।
তার আমাকে পছন্দ হয় নি ওনি সেটা জানিয়েছে। তাছাড়া চাচা চাচী তাকে ধরে বেঁধে আমার সাথে বিয়ে দেয় নি।বিষয়টা ঘটেছে অতীতে যার রেশ টেনে আপনার বোন আমাকে অপমান করলেও আমি কিছু বলি নি। কিন্তু খবরদার আমার ছেলেমেয়েকে উল্টাপাল্টা কথা বললে আমি আপনাকে ছাড়ব না।আই রিপিট ছাড়ব না!
কথাটা শেষ করে রিদি বের হতেই সম্মুখীন হয় রাদিফের।রিদি রাদিফকে একপলক দেখে বলল,
আমি অসহায় ছিলাম।তখন আমি সত্যিই খুব অসহায় ছিলাম ছোটো ও ছিলাম।একটু ভালবাসা,স্নেহ,ভরসার আশায় চাচা চাচীর কাছে আসতাম,রিদ ভাইয়ার কাছে আসতাম হাজারো বাইনা নিয়ে,আপুর কাছে আসতাম স্নেহের আশায়,তোমার কাছে যাওয়ার কারনটাও একই ছিল।আমি জানতাম না তুমি কেন দেশ ছেড়েছো।আর না আমাকে এই বিষয়ে কেউ বলেছে।আমি চাচা চাচির আদর ভালোবাসা থেকে তোমাকে বঞ্চিত করিনি। আর না আমি কখনো এমন চেয়েছি।

রিদি একটু থেমে টলটলে চোখে চাচির দিকে তাকিয়ে বলল,
আল্লাহ আমাকে অনেক অনেক দিয়েছে।পুরো পৃথিবীর ভালবাসা এক জায়গা করে একটা মানুষ আমার জীবনে পাঠিয়েছে।আমি চাইব না আর কারো থেকে ভালোবাসা।আর আবদার করব না।ভালো থেকো।
রিদির চাচি রিদিকে ডাকলেও রিদি দাঁড়ালো না।রাদিফের হুট করেই কেন জানি মনে হলো রিদিকে আটকাতে হবে।রাদিফ রিদির পিছু গেল। ততক্ষণে রিদি নিচে নেমে এসেছে।লতিফা বেগমকে দেখে রিদি ঝট করে জড়িয়ে ধরে বলল,

তোমার সাথে দেখা করতে আসব আমি।এখন আসছি।আসলে আমি কাউকে বলে আসি নি।ওনি ও জানে না।
লতিফা রিদির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
আচ্ছা। সাবধানে যা। আল্লাহ তোকে যা দিয়েছে এরপর আর তোর কারো ভালোবাসা ভিক্ষা করতে হবে না।
রিদি চোখ মুছে গেট পেরিয়ে গাড়ির কাছে আসতেই তীব্র কে দেখে চমকে উঠল,
তীব্র রাতের পোশাক পড়েই গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে।সে ৬ টায় বের হয়েছিল।সেই সময় সবাই ঘুমিয়ে ছিল।সে কাউকে বলে আসে নি।এখন বাজে ৭:৩০।রিদি কিছুটা ভয় পেয়ে এগিয়ে গেল।তীব্রর সামনে গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়াল।

আসলে আমি মানে এখানে…..
তীব্র রিদিকে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমু দিয়ে বলল,
মাথা নিচু করতে মানা করেছি না।সব সময় মাথা উঁচু করে রাখবেন।
রিদি তীব্র কে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো,
আমার বাচ্চারা…..
তীব্র মাথায় হাত বুলিয়ে চুমু দিল পুরো মুখে।চোখের পানি মুছে আদুরে গলায় বলল,
ছিঁচকাদুনে! হয়েছে কলিজা আর না আমি জানি আপনি কেন এসেছেন। উচিত জবাব তো দিয়েছেন।আম পাউড অফ ইউ।রিদি শক্ত করে তীব্র কে জড়িয়ে ধরে রাখল। তীব্র রিদিকে কোলে তুলে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল।
এমা কোথায় যাচ্ছেন ??গাড়ি পিছনে তো!!

আমরা চপার এ যাচ্ছি।গাড়িতে গেলে বাচ্চারা ততক্ষণে উঠে যাবে।উঠে মাকে না পেলে কেঁদে কেঁদে বাড়ি মাথায় তুলে রাখবে।রিদি মৃদু হেসে তীব্রর দিকে তাকালো।এই একটা মানুষ তার পূর্ণতা।তার সকল প্রাপ্তির খাতায় একটাই নাম তীব্র চৌধুরী।রিদি তীব্রর গলায় নিজের হাতের বাঁধন শক্ত করে এগিয়ে এসে গালে ঠোট ছোয়াল।সাথে সাথে তীব্র থেমে গেল।চট করে তাকালো রিদির দিকে।রিদি অপর গালে আরো একটা চুমু দিল। তীব্র ভূ কুঁচকে বলল,
রাতে দেখছি আপনাকে!!
রিদি ফিক করে হেসে বলল,
তীব্র চৌধুরীর রাত আর দিন!!
তিনটাই সারাক্ষণ মায়ের সাথে চিপকে থাকে আমি আর কোথায়!!ঐ রাতেই যা একটু……….
রিদি তীব্রর মুখ চেপে বলল,
অসভ্য! নির্লজ্জ!

তীব্র বাঁকা হেসে দন্ডায়মান চপারে রিদিকে তুলে মার্ভেলর উদ্দেশ্য বলল,
গাড়ির পেছনে রৌদ্র আছে নিয়ে আসো।
রিদি চমকে উঠল।কোথায় রৌদ্র??
তীব্র কিছু বলল না।দুমিনিটের মধ্যে ঘুমন্ত রৌদ্র কে নিয়ে আসল মার্ভেল।রাতের পোশাকেই ঘুমন্ত রৌদ্রকে দেখে রিদি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তীব্র রৌদ্র কে নিয়ে উঠে বসল চপারে।
আপনার সাথেই উঠেছে।মাকে কোথাও যেতে দেখে চুপিচুপি গাড়িতে উঠে বসেছে পিছনের সিটে।ভেবেছে মা হয়তো সত্যিই ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আর চলন্ত গাড়িতেই ঘুমিয়ে গেছে।
রিদির চোখ ভরে উঠল।ছেলের কপালে চুমু দিয়ে ছেলেকে টেনে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল। রৌদ্রর ঘুম হালকা হতেই পিটপিট করে তাকালো মায়ের দিকে। ঘুমন্ত চোখে মাকে দেখে বুকের সাথে লেপ্টে গেল।ঘুম ঘুম কন্ঠে চোখজোড়া বন্ধ করে বলল,

তুমি আমাদের আম্মু!আমি তোমাকে কোথাও যেতে দিব না।আমি, তূর্য,পাপা,রোজ তোমার সাথেই যাব।
রিদি রৌদ্রের কথায় শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
আমি কোথাও যাব না জানপাখি।তোমাদের ছেড়ে কোথায় যাব!আমি তোমাদের ভালোবাসি অনেক!!
রৌদ্র মাকে জড়িয়ে চুপটি করে মায়ের বুকে গুটিয়ে গেল। তীব্র চুপচাপ সবটা দেখে মৃদু হাসল।

সময় গড়িয়ে তখন ৮:১২ বাজে,
ঘূনায়মান চপার এসে থামল চৌধুরী বাড়ির বিশাল গার্ডেনে।রিদি চপার থেকে নেমেই ছুট লাগাল বাড়ির ভিতরে।আরেকটা ছেলে ইতিমধ্যে ভাংচুর শুরু করেছে।রিদি দৌড়ে রুমে ঢুকতেই দেখল তীর তূর্য কে অনেক কষ্টে বুকে চেপে ধরে আছে আর তূর্য সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে “”আম্মুর কাছে নিয়ে চলো বলছি!আমি আম্মুর কাছে যাব!আম্মু ঐ পঁচা আন্টির কথা শুনে আমাকে রেখে চলে গেছে।ছাড়ো আমাকে আমি যাব আম্মুর কাছে নয়তো সব ভেঙ্গে ফেলব!”” রুপ তূর্যের হাতে জোর করে ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছে ছোট্ট হাতে কাট লেগেছে তা থেকেই রক্ত বের হচ্ছিল।নাজমা চৌধুরী এটা ওটা বলে শান্ত করার চেষ্টা করছে কিন্তু তূর্য কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না।

তূর্য!!!
রিদির ডাকে তূর্য সহ সবাই দরজার দিকে তাকালো।রিদিকে দেখে সবাই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তূর্য মাকে দেখে তীরের থেকে ছুটে রিদির কোমর জড়িয়ে ধরল।
তুমি কোথায় গেছিলে বলো??তুমি কেন ঐ পঁচা আন্টির কথায় আমাদের ছেড়ে চলে যাব??তুমি আমাদের ছেড়ে যাবে না আম্মু!!নয়তো আমি সব..….
রিদি বিষ্ময়কর দৃষ্টিতে পুরো ঘরে নজর বুলিয়ে নেয়।এতো রাগ!!তাও এইটুকু বাচ্চার!!ওহ আল্লাহ!!রিদি তূর্য কে ছাড়িয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।ছেলের অর্ধ ব্যান্ডেজ করা হাতটা তুলে দেখল।বেশ খানিকটা কাট লেগেছে।রিদির হাত কাঁপছে চোখ জলে টলটল করছে অথচ এই ছেলের চোখমুখে ব্যাথার ছিটেফোঁটাও নেই।রিদি চুপচাপ তূর্যের হাতে ব্যান্ডেজ করে দিয়ে কোলে তুলে নিল।
আম্মু কোথায় গিয়েছিলে??

রিদি ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বসল সোফায়।রিদির বুকটা ধরপর করছে।এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না এই টুকু ছেলের এতো রাগ।যদি কিছু হয়ে যেত।যদি বেশি চোট লাগত।রিদি নিজেকে শান্ত করতে জোরে নিঃশ্বাস ফেলল।আজ যেন ছেলেদের নতুন রুপ দেখল। রৌদ্র তূর্য দুইজনেরই রাগ বেশি।সবাই বলে ফুল টু বাবার কপি!আজ যেন মানতে বাধ্য যে সবাই সত্যি বলে।নয়তো ৫ বছরও যার পূর্ণ হয়নি সেই ছেলে পুরো রুম রাগে দুঃখে উথালপাথাল করে রেখেছে।রিদি নিজেকে শান্ত করে বলল,
বলব সবটা! রোজ কোথায়??
রোজকে আয়ান নিয়ে গেছে। তূর্য ঘুম থেকে উঠে তোকে না পেয়েই এই কান্ড শুরু করেছে।রুমে এসে দেখি রোজ কাঁদছে।আয়ান রোজ কে নিয়ে লনে গেছে।
আম্মু তুমি আমাকে রেখে কোথাও যাবে না!!
রিদি চুপচাপ আছে কিছু বলছে না দেখে তূর্য মায়ের বুকে আরো একটু সেটে গেল।রিদি তূর্য কে কোলে করেই রুম থেকে বের হতে হতে বলল,
রুমটা পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করুন রুনা আপা!
রিদিকে বের হতে দেখে নাজমা,তীর,রুপ ও বেরিয়ে পড়ে।রিদিকে দেখে অশান্ত লাগছে। তাছাড়া তূর্যের তীব্র রুপ দেখে সবাই বেশ অবাক ই হয়েছে।হয়তো রিদি নিজেও বেশ অবাক হয়েছে…..

রিদি ঘুমন্ত ছেলেদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।সোফায় রিদির একপাশে তূর্য অন্যপাশে রৌদ্র ঘুমিয়ে আছে।নাজমা চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
ওরা ঘুম থেকে উঠলে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে তোকে।ছোট মানুষ অলিভার কথা সত্য মনে করেছে।
এখন রুমে গিয়ে রেস্ট নে।রুম পরিস্কার করে দিয়েছে।
কাজটা একদম ঠিক করিস নি রিদি।
রিদি রুপের দিকে তাকালে রুপ আবারো বলল,
আরো চার পাঁচটা কানের নিচে বাজিয়ে আসা উচিত ছিল তোর।এই মেয়ের সাথে তোর কিসের শত্রুতা!!কি আশ্চর্য!!
এসব থাক এখন।তীর রৌদ্র কে রুমে দিয়ে আয়।তীর রৌদ্র কে কোলে তুলে নেই। তূর্য কে আয়ান এসে কোলে তুলে নিয়ে রিদির উদ্দেশ্য বলল,
মেঘের কাছে রোজ আছে। তূর্য কে আমি রুমে দিয়ে আসছি।
রিদি সম্মতি দিয়ে তূর্য কে সাবধানে কোলে তুলে দিল।রোজ কে নিতে আয়ানের রুমের উদ্দেশ্য গেল।

১টা বেজে ৪৫ মিনিট।রিদি সেই নামাজ আদায় করে হিজাব পরেই ছেলেদের পাশে শুয়ে পড়েছে।মায়ের উষ্ণতায় তূর্য রৌদ্র ও মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। তীব্র বেডের একপাশে বসে মা ছেলেদের একবার দেখে নিল।আর রোজ বাবার কোলে বসে অভিযোগ করছে,
তূতো ভাই তব ফেলি দিতে।রাক করেতে।রুন্দ্র ভাই তিল না।পাপাও তিল না।আম্মু ও তিল না।তুতো ভাই পুচা!
তীব্র মেয়ের সারা মুখে অজস্র চুমু দিয়ে বলল,
আমার মা ভয় পেয়েছিলেন!ভাই বকেছিলো আপনাকে??
রোজ চুমুর বর্ষনে খিলখিল করে হেসে উঠলো। তীব্র মেয়েকে হাসতে দেখে নিজেও হাসল।
তুতো ভাই বতেনি।
তীব্র ঘুমন্ত ছেলেদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বিরবির করল,
মা পাগল ছেলেরা।

রাদিফ বেলকনিতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।চোখের সামনে বারবার ভাসছে তীব্র রিদির সকালের দৃশ্য। অজানা কারনে রাদিফের বুকটা জ্বলছে ভীষণ।মনে পড়ল রিদির সাথে ছোট বেলার স্মৃতি।মা মরা মেয়েটাকে রাদিফ খুব স্নেহ করত।রিদিও রাদিফের সাথেই হাসিখুশি থাকত।বড় ভাই অবদার করলেই পূরন হয়ে যেত যে।রাদিফকে বরাবরই রিদির সরলতা, মিষ্টি হাসি মুগ্ধ করত। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে বয়সের সাথে সাথে চাকচিক্য জিনিসগুলো পছন্দের তালিকায় চলে এলো।আগে যখন মজা করে কেউ বলত রিদিকে এতো পছন্দ তোকে ওর সাথেই বিয়ে দিব। ছোট্ট রিদি খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেত তার কাছে বিয়ে মানে সে রাদিফের সাথে ঘুরবে,খাবে,থাকবে আর রাদিফ তার সব অবদার পূরন করবে।রাদিফ শুনে বেশ লজ্জা পেত।কারন রিদির কাছে বিয়ে কি তা না জানা থাকলেও রাদিফ জানত।
কিন্তু ঐ যে চাকচিক্য বয়সের একটা ব্যাপার আছে।বড় হওয়ার পর রিদির থেকে দূরত্ব তৈরি করেছে সে।রিদি কে তার সহ্য হতো না।সে তো রিদির বোনের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতো। সাদা চামড়ার দিকে তাকাতো। তাছাড়া বড় হওয়ার সাথে সাথে রিদিও সৎ মা বাবার ভালোবাসাহীন আর বাস্তবতা মেনে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। ছোট্ট রিদি বড় হতে হতে সকল চঞ্চলতা হারিয়ে ফেলে।এইতো এইভাবেই তো সময় চলছিল।এরপর সে পাড়ি জমাল বিদেশে।তারপর!!তারপর তো আর মনে পড়ে নি রিদি নামক অস্বিস্তকে।নাকি পড়েছিল সে গুরুত্ব দেয় নি।টাকা,চাকচিক্য,নেশা, সৌন্দর্যের ভিড়ে হারিয়ে ফেলেছে নিজেকেই।সবটা তো ঠিকই ছিল তবে হঠাৎ মনকুঠুরে এ কেমন যন্ত্রনা!!রিদি বড় হয়েছে,বিয়ে হয়েছে, হাজবেন্ড আছে, বাচ্চা আছে সে তো সুখেই আছে।তবে তার সেই সুখটা কেন অসহ্য লাগছে।সেও তো ভালো আছে।এরিকাও তো তাকে ভালোবাসে,কেয়ার করে তবে কেন মন নিষিদ্ধ কিছু চাইছে।যা অসম্ভব!!

রৌদ্র তূর্যের ঘুম ভাঙল তখন ২ টা বাজে।রিদি আজ হসপিটালে যাই নি। দুইজনকে ফ্রেশ করিয়ে খাবার খাইয়ে দিচ্ছে। রৌদ্র তূর্য কার্টুন দেখছে মায়ের সাথে চিপকে বসে।রিদি ছেলেদের খাবার খাওয়াতে খাওয়াতে বলল,
আব্বু!!
তীব্র, তূর্য দুইজনে তাকালো মায়ের দিকে।রিদি দুইজনের মুখে খাবার দিতে দিতে বলল,
তোমাদের কেন মনে হয়েছে আমি চলে গেছি??
রৌদ্র, তূর্য চুপচাপ আছে অপরাধীর মতো।রিদি দুইজনকে চুপ দেখে বলল,
তোমরা কি ঐ আন্টির কথা বিশ্বাস করেছিলে??
রৌদ্র তূর্য একে অপরের দিকে তাকিয়ে আবারো চুপ থাকে।রিদি আবারো বলে,
আম্মু কি কখনো তোমাদের ছেড়ে কোথায় গেছে??
দুইজনেই না বোধক মাথা নাড়ল।রিদি একটু থেমে আবারও বললো।
তাহলে তোমাদের মনে এই কথা কিভাবে আসল!!আমি তোমাদের ছেড়ে চলে যাব!!
তূর্য মিনমিন করে বলল,

আমরা ভেবেছিলাম রোহানের আম্মুর মতো তুমিও আমাদের ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু আমরা তো তোমাকে ছাড়া থাকতে পারি না।ঐ পঁচা আন্টির কথায় আমরা আরো ভয় পেয়েছিলাম।রোহান রৌদ্র আর তূর্যের সাথে একই স্কুলে পড়ে।ওর মা ওকে রেখে পালিয়ে গেছে। ছোট্ট রোহান মায়ের জন্য কান্নাকাটি না করলেও সবার অপমান করাই বেশ কেঁদেছে।মায়ের সাথে সখ্যতা এমনিতেও কম ছিল।ছোট থেকে আয়া আর দাদির কাছেই বড় হয়েছে।রিদির খারাপ লাগে বাচ্চাটার জন্য।সে রৌদ্র আর তূর্যের মতো তাকেও অনেক স্নেহ করে।
রিদি মিষ্টি হেসে ছেলেদের মাথায় চুমু দিয়ে বলল,

আম্মু তোমাদের ছেড়ে কোথাযও যাব না কলিজারা।আম্মুর দুনিয়াই তোমাদের ঘিরে পাখি।আম্মু কোথাও যাবে না সোনা। আম্মু তোমাদের অনেক ভালোবাসি তো!! কিন্তু আজ তোমরা যা করেছো তাতে কিন্তু আমি খুব ভয় পেয়েছি।
রৌদ্র তুমি কাউকে কিছু না বলে গাড়িতে উঠে লুকিয়ে থেকেছো।তোমার বাবা খেয়াল না করলে কি হতো। তোমার খোজ পেতাম না।বাই চান্স যদি কোন দূর্ঘটনা ঘটে যেত।আমি কি করতাম তখন!
আর তুমি!রাগ এতো কেন তোমার!রাগে নিজের যে ক্ষতি করেছো তা কি জানো।হাত কেটে গেছে কতটা।আমি কতোটা ভয় পেয়েছিলাম! তোমার বোন কতোটা ভয় পেয়েছে।বাসায় কারো পরোয়া করোনি।এসব কি ভালো কাজ¡আজ দুইজনেই পঁচা কাজ করেছো।আর কখনো যেন এমন না করো।তাহলে কিন্তু আম্মু সত্যি সত্যি চলে যাব।
রৌদ্র তূর্য একসাথে বলল,

ওকে মাম্মাম!!আর করব না।
রিদি দুই ছেলেকে বুকে চেপে মুচকি হেসে বলল,
আমার বাবারা তোমাদের আচর লাগলেও আম্মুর ভীষণ কষ্ট হয়। যেখানে আজ দুইজনেই ই ভয়ংকর কান্ড করেছো।জানো আম্মু কতোটা ভয় পেয়েছি।
সরি আম্মু!!
ইটস ওকে!আমার কলিজা!
তীব্র দূর থেকে মা ছেলেদের কথা শুনে মেয়েকে কোলে নিয়ে এগিয়ে এলো।সোফার একপাশে বসতেই রৌদ্র, তূর্য আড়চোখে বাবার দিকে তাকালো।বাবা আবার বকে কি না!! কিন্তু তাঁদের অবাক করে দিয়ে তীব্র ছেলেদের টেনে নিজের কোলে বসিয়ে বলল,

আমার ব্রেভ বাচ্চা!!পাপা প্রাউড অফ ইউ মাই টাইগারস!!
রৌদ্র তূর্য ঝলমলিয়ে হেসে বাবাকে জরিয়ে ধরলো।রিদি তীব্রর দিকে তাকিয়ে কটমটে গলায় বলল,
খবরদার ওদের বিগরাবেন না।আপনার আদরের পুতুল কে গিয়ে বিগরান।হয়েছে তো সব বাপের মতো।
রৌদ্র তূর্য মিটমিট হাসছে মাকে আবারও আগের মতো দেখে। তীব্র রিদির কথায় পাত্তা না দিয়ে ছেলে মেয়েদের সাথে খুনসুটি করতে লাগলো।এর মাঝেই নুপুরের ঝনঝন শব্দ তুলে তৃপ্তি ছুটে আসতেই তীব্র ওকেও কোলে তুলে বসিয়ে দিল।

এ্যাই বৌ!!এই বৌ!!জানপাখিইইইইই…..…
আম্মুউউউউউউ…..
আম্মুউউউউউউ…….
এ্যাই বৌ!!!বৌ!!!!
রিদি রান্নাঘর থেকে ওদের চেঁচামেচি শুনে আড়চোখে সবার দিকে তাকালো।রাইফা,রুনা, রুপালি হেসে উঠলো,
রুনা: শুরু হয়ছে আপনার ডাকাডাকি ভাবিজান!!
রাইফা:যা গিয়ে দেখ নবাব পুত্র দের কি হয়েছে!!
রিদি গরম পানিতে চা দিয়ে বলল,
যাচ্ছি!
বৌজান!ও বৌ জান!!
আম্মু, আম্মু……
রাইফা:যা গিয়ে দেখ।
রিদি চুলার আঁচ কমিয়ে দিতেই কিচেন ঢুকে মেঘ। চেঁচামেচি শুনে মিটমিট করে হেসে বলল,
এই রিদু!!জলদি বের হ!যা যা……..নয়তো পুরো বাড়ি মাথায় তুলবে এরা।দেখ গিয়ে ছেলেদের সাথে বাপকেও রেডি করিয়ে দিতে হয় নাকি!!

রিদি আড়চোখে সবার মিটমিট হাসি দেখে চুপচাপ বেরিয়ে যেতে যেতে চোখ রাঙাল মেঘ কে।মেঘ তোয়াক্কা করল না।রিদি বেরিয়ে যেতেই জোরেই হাসল সবাই।ছুটির দিন বিধায় আজ অফিসে যায় নি তীব্র।নিয়ম ভেঙে আজ লেট করে উঠেছে।সাথে এই দুটো নবাবও।ঘুম থেকে উঠে তাকে না দেখলে আগে বাপ ডেকে ডেকে লজ্জায় ফেলত এখন বাপের সাথে ছেলেরাও যুক্ত হয়েছে।এদের অত্যাচারে রিদি সকালে এদের আগে রুম থেকে বের হয় না।জামাই আর ছেলেদের রেডি করিয়েই বের হতে হয়।মেয়েকে আবার বাপ ভাই মিলে রেডি করিয়ে দেয়।এদিক থেকে একটু বাঁচা।রিদি রুমে ঢুকতেই রেগে বলল,

এই কি সমস্যা??এভাবে ষাঁড় আর ষাঁড়ের বাচ্চার মতো চেঁচামেচি করছেন কেন আপনারা??
তীব্র কম্ফোটার থেকে মুখ বের করে বলল,
ষাঁড়ের বৌ এদিকে এসে চুমু দিয়ে তুলেন ষাঁড়ের বাচ্চাদের!! ষাঁড়ের বাচ্চারা মায়ের আদর ছাড়া উঠতে নারাজ!!
রিদি ভূ কুঁচকে এগিয়ে আসে। ছেলেদের আদর করে উঠিয়ে দেয়।রৌদ্র তূর্য মাকে পেয়ে আরো কিছুক্ষণ মায়ের বুকে ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকে।রিদি ছেলেদের কান্ডে মুচকি হেসে বলল,
আব্বু ফ্রেশ হবেন না !!চলেন!

রিদি ছেলেদের ফ্রেশ করিয়ে দেয়। দুইজনেই ফ্রেশ হয়ে নাস্তার জন্য নিচে চলে আসে।রিদি এবার বাপ বেটির দিকে এগিয়ে গেল।কম্ফোটার সরিয়ে বাবা মেয়ের দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ।কি সুন্দর স্নিগ্ধ মুখশ্রী।রিদি মুখ বাড়িয়ে মেয়ের টসটসে গালে চুমু দিল। তীব্রর বুকে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে।রিদি তীব্রর এলোমেলো চুল গুলো ঠিক করে ঠোট ছোয়াল কপালে।কানে ফিসফিস করে বলল,
ভালোবাসি বাবুদের আব্বু!! ভীষণ ভালোবাসি!

আপনাতেই আমি সিজন ২ পর্ব ৭৭

তীব্রর ঠৌটের কোনা বেঁকে গেল মুচকি হাসিতে।রিদি সেই হাসির দিকে তাকিয়ে আবারো বলল,
ধন্যবাদ আমার জীবনে ঝড় হয়ে এসেও পূনতায় মুড়িয়ে দেওয়ার জন্য। আপনি নামক ঝড় আমার জীবনে বার বার আসুক।সেই ঝড় ভেঙ্গেচুরে নতুন করে গড়ে তুলুক এক সমুদ্র পরিমাণ ভালবাসার পৃথিবী। আপনার মাঝেই বসবাস হোক আমার জীবন সংসার।#আপনাতেই_আমি হয়ে থাকতে চাই চিরজীবন। মৃত্যুর পরেও #আপনাতেই_আমি থাকব। খুব বেশি ভালোবাসি বাবুদের আব্বু!

সমাপ্ত