আপনাতেই আমি সিজন ২ পর্ব ৭৫
ইশিকা ইসলাম ইশা
নতুন ছাদ হওয়ায় বেশ সুন্দর আর পরিপাটি করে ছাদটা সাজানো হয়েছে। তীব্র মেয়েকে নিয়ে একটু বাতাস পেতে ছাদে এসেছে। বারবার মেয়ের মুখের ঘাম মুছে দিচ্ছে অথচ নিজেও গরমে অতিষ্ঠ।এসি নষ্ট হওয়ার আর সময় পেল না।
পাপা গোওম!!
মেয়েটি ছোট্ট গুলুমুলু হাতে বাবাকে অনুসরণ করে বাবার মুখের ঘাম মুছতেই তীব্র হাসল। আশেপাশে বুলিয়ে মেয়েকে নিচে নামিয়ে দিতেই পায়ের নুপুরের ঝুনঝুন শব্দে মুখরিত হলো চারপাশ। ছোট্ট বাচ্চা পুরো ছাদ ঘুরছে,লাইট দেখছে আর একটু পরপর বাবার উদ্দেশ্য বলছে,
পাপা নাইট!!তুন্দর!!(পাপা লাইট! সুন্দর)
তীব্র মেয়ের আদো আদো কথাগুলো বেশ উপভোগ করে।ছেলেদের প্রথম ডাক মা হলেও মেয়ের প্রথম ডাক পাপা।আদো আদো কন্ঠে প্রথম পাপা ডাকটি শুনে তীব্রর চোখজোড়া ভরে উঠেছিল।সবাইকে ডেকে ডেকে বলেছিল তার মেয়ে তাকে পাপা ডেকেছে।তীব্রর পাগলামি দেখে সেদিন নাজমা চৌধুরী বলেছিলেন,
মেয়ের বাবা হওয়া আল্লাহর রহমত!!আসলেও আল্লাহর রহমত।নয়তো তীব্র চৌধুরীকে বদলাতে রিদিকে আরো কতো কাঠখর পুড়াতে হতো ।সবচেয়ে বড় বদল তীব্রর মেয়ে হওয়ার পর সেটা হলো মাফিয়া পদ থেকে পদত্যাগ করা।এতে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল রিদি।এতো বছর ধরে চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত মেয়ে পারল বদলাতে।
তীব্র মেয়ের ছোটাছুটি দেখার মাঝেই তূর্য ,রৌদ্র ছাদে আসে। ছেলেদের ছাদে ঘেমে নেয়ে একাকার দেখে তীব্র এগিয়ে গিয়ে রুমাল দিয়ে ঘামে ভেজা মুখটা মুছিয়ে দিতে দিতে বলল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
কষ্ট হচ্ছে আব্বু!!
গাড়িতে গিয়ে ঘুমাবে?আমি বিছানা সিস্টেম করে দিতে বলব? ওখানে এসি আছে!
তূর্য, রৌদ্র দ্রু মাথা নেড়ে না বলল,
আম্মুর সাথে ঘুমাব!আম্মু বলল ম্যাজিক করবে!
আম্মু কোথায়??
আমি এখানে??
তীব্র ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার সামনে তাকাতেই দেখল ঢিলা প্লাজু আর লেডিস গেঞ্জি গায়ে ওরনা পরে রিদি দাঁড়িয়ে আছে।হাতে একটা ছোট টেবিল ফ্যান!!পাশে দাঁড়িয়ে আছে মিয়ান (তীব্রর বডিগার্ড)হাতে তার মোটা গদি টাইপ কিছু।
ফ্যান কি করবেন??
ছাদ বিলাস করব!!!
তীব্র ভূ কুঁচকে তাকাল।তার বৌয়ের মাথায় নতুন কি খিচুড়ি রান্না হচ্ছে!!
ছাদ বিলাস কিভাবে করে!!
শুধু দেখতে থাকুন!!
রিদি ছাদে পাটি বিছিয়ে সেখানে মোটা গদি টা বিছিয়ে দিল।তিনজন বাচ্চা ড্যাবড্যাব করে মায়ের কান্ড দেখছে!রিদি বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
আমরা আজ রাতে এখানে ঘুমাব!!
হোয়াট?? পাগল হয়েছেন আপনি?? এখানে ঘুমাবো মানে??আমি নতুন এসি আনতে বলেছি চলে…..
উফফ!!সব সময় এতো এসি এসি করেন কেন?আজ আমরা এখানে ঘুমাবো ব্যাস…..
বলতে বলতে রিদি গদির উপর একটা পরিষ্কার চাদর বিছিয়ে দিয়েছে।সাথে আনা বালিশ রেখে মশারি টাঙিয়ে চারদিকে গুজে দিল।মশারির উপরে পাতলা একটা কাপড় দিয়ে দিল।এরপর ছোট টেবিল ফ্যান চালু করে মশারির ভেতরে ঢুকে গেল।মাকে ভেতরে ঢুকতে দেখে তূর্য, রৌদ্র ও ভীষণ উত্তেজিত হয়ে ভেতরে ঢুকল।এমন কিছু বাচ্চারা প্রথমবার দেখছে।তীব্র কে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রিদি বলল,
আরে মেয়েকে নিয়ে ভেতরে আসুন!!
এসব কি??
এটা গ্রামীণ পরিবেশে ছাদে আকাশ বিলাস।
আপনার মাথায় এমন অদ্ভুত বুদ্ধি আসে কেমন করে। বাচ্চাদের নিয়ে এই খোলা আকাশের নিচে ঘুমাবো!আর ইউ কিডিং.
আমি তো এখানেই ঘুমাবো।আপনার দুষ্টু মেয়েকে নিয়ে আপনি যেখানে খুশি যেতে পারেন।বাবা ভক্ত মেয়ে।বাবা পেলে মা আর কে?চেনেই না!!হু!এমন মেয়ে আমি নিব না!!
ছোট মেয়েটি মায়ের দিকেই এতোক্ষণ চেয়ে ছিল।তবে মা তাকে বকছে এটা মেনেই ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে উঠলো।মেয়ের কান্নায় তীব্র অস্থির হয়ে মেয়েকে কোলে তুলে বলল,
কি হয়েছে আম্মু!আমার জানবাচ্চা! কাঁদে না জান পাপাকে বলো কি হয়েছে??
বাচ্চাটি ঠোঁট ফুলিয়ে কান্না করে বলল,
আম্মু বতে(বকেছে )পাপা!! আম্মু বতে!!
রিদি অবাক হয়ে বলল,
কিহহ??আমি কখন তোকে বকলাম! দুষ্টু মেয়ে!!
তীব্র মেয়েকে শান্ত করে মশারির ভেতরে ঢুকে গেল।রিদি ততক্ষণে তূর্য আর রৌদ্র কে বুকে জড়িয়ে ঘুম পাড়াচ্ছে।হালকা শীতল আবহাওয়া সাথে খোলামেলা চারপাশ উপরে মিটমিটে তারাদের মেলা।খুব ছোট বেলায় মায়ের সাথে এমন রাতে ঘুমাতো রিদি।তখন ছোট রিদি মায়ের বুকে গুটিয়ে ঘুমাতো।আর আজ!! এতো গুলো বছর পর তার বুকে তার বাচ্চারা ঘুমাচ্ছে।রিদি অতীত ভেবে দুই পুত্রের মাথায় চুমু দিল। শক্ত করে জড়িয়ে ধরল দুইটা প্রান কে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই ছোট মেয়েটি গাল ফুলিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো।রিদি ভু কুঁচকে মেয়ের দিকে তাকালো।মেয়ে ঠিক তার মতোই কথায় কথায় মুখ ফুলিয়ে কেঁদে ওঠে। তীব্র আবারো হচকচিয়ে বলল,
কি হয়ছে মামনি??
ছোট মেয়েটি মায়ের দিকে তাকিয়ে অভিমানী সুরে বলল,
পাপা! আম্মু পুচা!!আডর ডেয় না!!ভাই ভাই আডর ডেয়!!
মেয়ের কথায় রিদি ফিক করে হেসে ফেলল।সাথে তূর্য আর রৌদ্র ও হাসল বোনের আদো আদো কথায়। রৌদ্র বোনকে সুধরিয়ে বলল,
ইটস নট পুচা!!আর আডর না আদর!!
রিদি হাত বাড়িয়ে দিতেই ছোট্ট মেয়েটি মায়ের বুকের উপর মাথা রেখে গুটিয়ে যায়। তীব্র এতোক্ষণ ছেলেমেয়ে আর বৌয়ের কান্ড দেখছিল নিশ্চুপ হয়ে।রিদির দুই পাশে দুইজন আর বুকে বাচ্চা মেয়ের ছোট শরীরটা লেপ্টে আছে। তীব্র সেদিকে তাকিয়ে দেখলো শুধু। বুকের ভেতর এক প্রশান্তির ছায়া।মুখে একটুও হাসি না থাকলে মনের ভেতর অজস্র মায়া।এইতো তার পৃথিবী!তার দুনিয়া!
ছোট্ট বাচ্চা মেয়েটি বেশ খানিকটা সময় পর মায়ের বুক থেকে মুখ তুলে তাকালো বাবার দিকে বাবাকে একা একটু দূরে তাঁদের দিকে তাকাতে দেখে বলল,
আম্মুল কাছে আল তাইগা নাইই পাপা!(আম্মুর কাছে আর জায়গা নাই পাপা)
তীব্র মেয়ের কথায় আর গম্ভীর মুখ করে রাখতে পারল না।মুচকি হেসে বলল,
তাহলে পাপা কোথায় ঘুমাবো প্রিন্সেস??
মেয়েটি গভীর চিন্তায় ডুব দিল। একবার মা তো একবার বাবাকে দেখছে।মায়ের দু পাশে দুই ভাই আর বুকে সে তাহলে পাপা কোথায় ঘুমাবো!! তীব্র মেয়ের চিন্তিত মুখ দেখে হাসল।রিদি ও দেখছে এদের কান্ড!
মেয়েটি হুট করেই মায়ের বুক থেকে নেমে বাবার কাছে আসল।দু পা ছড়িয়ে বসে বলল,
আতো পাপা!তুমাকে তুম পালিয়ে দি(আসো পাপা! তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দি)
তীব্রর মুখের হাসি চওড়া হলো। তাৎক্ষণিক মেয়ের কোলে মাথা রেখে চোখ বুজল। শান্তি!হয়তো এটাই!চুলে ছোট্ট তুলতুলে হাতের স্পর্শে তীব্রর চোখ ভিজে গেল। হ্যাঁ তীব্রর চোখে পানি!
আডর আডর!! তুমাও পাপা!!(আদর আদর!ঘুমাও পাপা)
তীব্র মেয়ের ছোট্ট পা জোড়ায় চুমু দিয়ে বলল,
আমার প্রিন্সেস!!
ছোট্ট রোজ বাবার আদরে খিলখিল করে হেসে উঠলো। তীব্র মাথা উঠিয়ে দেখল মেয়ের হাসি একদম মায়ের মতোই হাসি। তীব্র এবার রোজ কে বুকে নিয়ে কপালে চুমু দিয়ে বলল,
আপনি পাপার বুকে থাকুন আম্মাজান!তাহলে পাপা ঘুমিয়ে যাবে।রোজ তীব্রর কথায় চুপচাপ পাপার বুকে মাথা রাখল।রোজের ঘুমের সময় হওয়াই চোখ পিটপিট করে ঘুমিয়ে পড়ল কিছুক্ষণে। রৌদ্র আর তূর্য ও ঘুমিয়ে পড়েছে মায়ের বুকে। তীব্র এবার বৌয়ের দিকে তাকালো।রিদি এতক্ষণ বাবা মেয়ের কান্ড দেখছিল। তীব্র কে তাকাতে দেখে মৃদু হাসল। তীব্র ও হাসল। আজকাল তীব্রর হাসিমুখ দেখা যায়।রিদি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা সে যেন সবসময় এই মানুষটিকে ভালো রাখতে পারে। তীব্র একটু এগিয়ে এসে রিদির কপালে চুমু দিয়ে ছেলেদের কপালেও চুমু দিল। বিছানায় শরীর এলিয়ে মেয়েকে বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল একহাতে ।অন্যহাতে রিদির একহাত শক্ত করে ধরল।রিদি এবারো মুচকি হাসল।দুইজনের মাঝে কথা নেই। শুধু নীরব ভালোবাসা।রিদির ভাবতেও অবাক লাগে সেই প্রথম দিনের ভয়ংকর তীব্র চৌধুরী আর আজকের তীব্র চৌধুরীর মাঝে বিশাল তফাৎ দেখে।রিদি দুই ছেলেকে বুকে আরো একটু চেপে ধরে চোখ বন্ধ করলো। অভাগী সে যে এতোটা ভালো থাকবে ধারনার ছিল না। আল্লাহ তাকে খুব ভাগ্যবতী করে এই তীব্র চৌধুরীর সাথে বেঁধেছে।নয়তো তার কি তীব্র চৌধুরীকে পাওয়া হতো আর এতো সুখের যোগ্য হতো কখনো!! আল্লাহ তাকে দুহাত ভরে দিয়েছে।
সকাল থেকে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। গ্রামীণ অনেক নিয়ম পালন হচ্ছে। লতিফা বেগম হলুদ বাটছে আর গান বলছে।নাজমা চৌধুরী ও সাথে সাথে বলছে আবার গ্রামের বয়স্ক মহিলারা তো আছেই।শিল পাটায় একদিকে হলুদ বাটছে তো অন্যদিকে গ্রামের মেয়ে বৌ রা গাছ থেকে মেহেদী পাতা তুলছে আর গান বলছে। মেহেদী পাতা তোলা হলে সবাই এবার টাকা তুলতে গেল একে একে সবার কাছে।প্রথমে চাচার থেকে টাকা তুলল ৫০০ টাকা। এরপর চাচি,রিয়ার হাজবেন্ড,একে একে সবার থেকে টাকা তুলে ১০০০০ টাকা হয়েছে।সবাই অনেক খুশি ছিল ১০০০০ টাকা তুলতে পেরে।এরপর মেহেদিও বাটা শুরু হলো।সবাই হৈ হৈচৈ করে গান বলতে লাগল।
চারদিকে কোলাহল আর হৈচৈ।গানে গানে পুরো বাড়ি বাজছে। ছেলেমেয়েরা চারদিকে ছোটাছুটি করছে।এমন সময় একটা বড় গাড়ি প্রবেশ করল মির্জা বাড়ির গেট দিয়ে।সাদা চকচকে গাড়ি থেকে নেমে এলো এই বাড়ির বড় ছেলে রাদিফ মিজা।সেই বছর ১২ আগে বিদেশে (আমেরিকা)গিয়ে সেখানেই সেটেল হয়েছে সে।বিয়েও করেছে সেখানকার মেয়েকে।যদিও মেয়েটা বাঙালি তবে জন্মের পর থেকে সেখানেই বেড়ে উঠা তার।নাম এরিকা মহল।রাদিফ আর এরিকার একটা ছেলে আছে নাম রিক মির্জা। বয়স ৬বছর।
রাদিফ কে আসতে রিদির চাচি ছুটে এলো। ছেলেকে ১২ বছর পর চোখের সামনে দেখে কেঁদে উঠলো।রিদির চাচাও ১২ বছর পর ছেলেকে দেখলেন।তবে কিছু বললেন না।রিক কে কোলে তুলে কথা বলতে বলতে ভেতরে ঢুকে গেলেন।রাদিফ সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে এরিকা আর এরিকার বোন অলিভা কে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো।এরিকা এই প্রথম বাংলাদেশে এসেছে। দুইজনের পড়নেই জিন্স আর টপস ।লালচে চুলগুলো কাধ পর্যন্ত খোলা।চোখে সানগ্লাস ,হাতে ব্যাগ।ধবধবে সাদা দেখতে মেয়ে দুটো একদম মডার্ন। মডার্ন ড্রেস পরাই গ্রামের অনেকেই এরিকা আর ওর বোনকে নিয়ে এটা ওটা মন্তব্য করছে।গ্রামের মানুষ এমন পোশাকে বাড়ির বৌ কে দেখে একটু আকটু কথা বলবেই। রাদিফ ছেলে আর বৌ নিয়ে রুমে চলে যায়।সবাই ফ্রেশ হয়ে একসাথে নিচে আসে। খাবার খেয়ে বাগানের দিকে যাই। ওখানে রিদ কে হলুদ লাগানো হবে।রাদিফ,এরিকা বাগানের দিকে যেতেই হৈইচেই দেখতে পেল।এরিকা খানিকটা ঘাবরে গিয়ে বলল,
এত লোকজন কেন রাদিফ??এভাবে ঘিরে রেখেছে কাকে?
বিয়ে বাড়ি লোকজন তো হবেই।এসো!! রিদ কে হলুদ ছোয়াবে সবাই তাই এমন ঘিরে রেখেছে।
ওহহ আই সি!!
রাদিফ গিয়ে বাগানে পৌছাতেই সবাই তাকালো রাদিফের দিকে। দীর্ঘ ১২ বছর পর ভাইকে দেখে একটু হাসল রিদ।রিয়া রাদিফ কে দেখে এগিয়ে এলো। ভাইয়ের সাথে ভালোমন্দ কথা বলে এরিকাকে নিয়ে গেল সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য।রাদিফ সেদিকে দেখে এগিয়ে এলো রিদের দিকে,
ভেবেছিলাম আসবে না!
তোর বিয়ে না এসে পারি! তাছাড়া অনেক তো হলো মান অভিমান।১২ বছর কম সময় তো না।
রিদি হাসলো।যাক অবশেষে বুঝতে পেরেছ ১২বছর দীর্ঘ সময়।আব্বু এখন হয়তো আর রাগ করে নেই।কারন এখন সব ঠিক আছে।যে কারনে তোমার উপর নারাজ ছিল সেই কারনটা এখন উহ্য হয়ে গেছে।
রাদিফ রিদের দিকে তাকিয়ে আবার আশেপাশে তাকিয়ে বলল,
আসেনি তোর বিয়েতে??
কে??
সে !যার জন্য ১২বছর বনবাসে কাটালাম।
সে না আসলে বিয়েটাই করতাম না। তাছাড়া ভাইয়া বনবাস তুমি নিজে থেকে নিয়েছো।
খুব ভালোবাসিস এখনো আগের মতই!
আমার স্নেহের পরিবর্তন হয় না।সি ইজ অলওয়েজ স্পেশাল ওয়ান ফর মি।
রাদিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে দূরে তাকালো।রিয়া এরিকাকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে দেখে বলল,
তোর কি মনে হয় ও আমার যোগ্য ছিল!
না! একদমই না।ও কখনো তোমার যোগ্য ছিল না। কারন ও বেস্ট সঙ্গীনির যোগ্য ছিল।যেটা ও পেয়েছে আর সে অন্তত তুমি না।
রাদিফ তাচ্ছিল্য সুরে বলল,
শুনেছিলাম স্বামীর বাড়িতে জায়গা হয়নি।বিয়ের কয়েক মাস পরে এখানে রেখে গেছিল।
ঠিক শুনেছিলে! তবে কি জানো আল্লাহ যখন যাকে দেয় দুহাত ভরে দেয়।
তবে বলছিস এখন সুখে আছে!
রিদ একটু হেসে বলল,
আছো তো কয়েকদিন!নিজেই দেখে নিও।
সেটা দেখতেই তো আসলাম।
রিদ আর কিছু বলল না। রাদিফের বিষয়টা ইগনোর করে এগিয়ে গেল বিরক্তি নিয়ে।রাদিফ ও গেল পিছু পিছু।রিদ এবার বিরক্ত হয়ে বলল,
আপু আমি রুমে গেলাম!এসব আমার ভালো লাগছে না।
রিয়া লাফ দিয়ে রিদের হাত ধরে বলল,
এই এই খবরদার!এটা নিয়ম! হলুদ ছোঁয়াতে হয় ভাই।
যাই করো তুমি আর রিদু ব্যাতিত কোন মেয়ে আমাকে টাচ করবে না।এটাই ফাইনাল।
কিন্তু মামু!!সবাই তো হলুদ ছোঁয়াই!
স্টপ মনি।এসব ছেলেমানুষী ভালো লাগে না।তুই জানিস তোর মামু এসব পছন্দ করে না। শুধু শুধু জেদ করছিস।যা গিয়ে রিদুকে ডাক।
মায়ের কথায় মনি হতাশ হয়ে ঘুরতেই দেখল রিদি আসছে।পড়নে সুতির একটা সবুজ রঙের শাড়ি। কোমরের নিচ অব্দি সিল্কি চুল গুলো ছাড়া সামনের টুকু শুধু কাটা দিয়ে পিছে আটকানো।হালকা সাজে অপরূপা লাগছে।মনি মায়ের উদ্দেশ্য চেঁচিয়ে বলল,
রিদু মনি চলে এসেছে আম্মু……..
মনির চেচানোতে রাদিফ অলস চোখে তাকায় সেদিকে।রুপ,রিদি আসছে।দুইজনেই আজ সবুজ রঙের শাড়ি পড়েছে।রুপ তো এমনিতেই সুন্দর তার উপর সবুজ শাড়িতে যেন অধিক সুন্দরী লাগছে।ধবধবে ফর্সা ত্বকে শাড়িটি জ্বলজ্বল করছে। তবে রাদিফের অলস দৃষ্টি বিষ্ময়কর দৃষ্টিতে পরিবর্তন হয়ে আটকালো রিদির উপর।হা হয়ে গেল রিদিকে দেখে। টানাটানা চোখে যেন তীব্র উজ্জলতার ঝলক অথচ সেই সময়ে চোখগুলো ছিল শান্ত আর ভীতিকর। আগের সেই হ্যাংলা পাতলা, শ্যামল গড়নের মেয়েটা আজ যেন অতিযত্নে গড়ে তোলা পারফেক্ট গড়নের এক সুন্দরী রমনী।দীঘন কালো সিল্কি চুলগুলো রোদের মৃদু আলোই চকচক করছে।আর হাসিটা!!উফফফফ!!!আজ এতো বছর পর কেন মনে হচ্ছে সে ভুল করেছে।রাদিফ নিজের ভাবনায় নিজেই অবাক হলো।
ছোট থেকেই রিদির প্রতি তার আলাদা সহানুভূতি ছিল।ছোট চাচা আর চাচির অত্যাচারের জন্য হয়তো সেটা!!এর বেশি কিছু না।তবে বাবা যখন বলল রিদিকে বিয়ে করার কথা তখন থেকেই সহানুভূতি পরিবর্তন হয়ে ঘৃনা ভর করল। তথাকথিত এই কালো মেয়েকে সে বিয়ে করবে না।তখন তাগড়া সুদর্শন যুবক সে !!হাজারো সুন্দরী মেয়ে তার পিছনে ঘুরে আর সে এই কালো মেয়েকে বিয়ে করবে।এই মেয়েকে বিয়ে করলে কি সন্মান থাকবে তার! বন্ধুবান্ধবদের কিভাবে মুখ দেখাবে সে!!তার মতো সুদর্শন পুরুষের এমন কালো বৌ!এটা মানতে পারছিলো না রাদিফ।তাই খুব খারাপ ব্যবহার করত রিদির সাথে। একবার তো রেগে রিদির গায়ে হাত তুলেছিল কারন সে তার একটা সোপিচ পরিস্কার করার সময় ভেঙে ফেলেছিল। ছোট মানুষ না বুঝে করেছে এটা মানতেই চাইল না সে!এরপর রিদির গায়ে হাত তোলার অপরাধে বাবাও তার গায়ে হাত তোলে এরপর সে রাগ করেই তার মামার সহায়তায় বিদেশে পারি জমাই।
পাপা!পাপা!!
ছেলের ডাকে ধ্যান ভাঙল রাদিফের। ছেলেকে দেখে হচকচিয়ে তাকালো কিছুটা দূরে খিলখিলিয়ে হাসতে থাকা অতিপরিচিত রমনীর দিকে।এই হাসি!!উফফ একদম বুকে গিয়ে বিঁধছে তার। হঠাৎ এই অনুভূতি কেন??রাদিফ নিজেকেই প্রশ্ন করল।
পাপা!!পাপা!!
হু হু!!!!
আমার ট্যাব পাচ্ছি না! কোথায় রেখেছো!!
রাদিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,
তোমার মা হয়তো জানে!চলো জিজ্ঞেস করে আসি।
রাদিফ অদ্ভুতভাবেই রিদির নিকট গিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে এরিনার উদ্দেশ্য বলল,
এরি!!রিক এর ট্যাব কোথায়?ও কখন থেকে খুঁজছে!!
রাদিফের ডাকে সবাই তাকালো রাদিফের দিকে।রাদিফ আরচোখে তাকালো রিদির দিকে রিদিকে তার দিকে তাকাতে দেখে কিছুটা ভাব নিয়ে বলল,
তুমি হয়তো রিদিতা তাই না!!
রিদি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।তার মুখ দেখে যে কেউ বলবে সে বেশ অবাক হয়েছে।রিদিকে এভাবে তাকাতে দেখে রিয়া এগিয়ে এসে বলল,
চিনতে পেরেছিস??রাদিফ ভাইয়া!
রিদি মুখে মিষ্টি হাসি এনে বলল,
চিনেছি!তাহলে এই মিষ্টি ছেলেটা কি রাদিফ ভাইয়ার! মাশাআল্লাহ!!একদম কিউট এর ডিব্বা!!
রাদিফ ছেলের তারিফ শুনে বলল,
বাবা মা দুজনেই সুন্দর।ছেলে সুন্দর হবে না!তুই বল তোর কি অবস্থা??
আছি আলহামদুলিল্লাহ ভালো!আপনারা কেমন আছেন??
ভালো।তোর ভাবির সাথে দেখা হয়েছে??
হ্যাঁ!এইতো আপু পরিচয় করিয়ে দিল।আ…….
এই রিদু!!এসব জলদি শেষ কর এভাবে আমি বসে থাকতে পারবো না।
রিদের চেঁচামেচিতে রিদি দৌড় লাগাল রিদ কে বসিয়ে রাখা স্টেজ এর দিকে।রিদ এমনিতেই এসব হলুদ টলুদ ছোয়াবেনা বলে জেদ ধরে ছিল রিদি,রিয়া কোনমতে বুঝিয়ে রাজি করিয়েছে তবে রিদ সাফ সাফ বলেছে ওকে কোন মতে টাচ করবে না কেউ।রিয়া আর রিদি ব্যাতিত!!বোন ছাড়া অন্য কারো ছোয়া নিবে না।
রিদ অন্তত হলুদ ছোঁয়াতে রাজি হয়েছে এটাই অনেক।তাই কেউ আর কিছু বলে নি।এখন আবার লেট করলে চলেই যাবে রুমে।তাই রিদি তাড়াতাড়ি রিদের কাছে এগিয়ে গেল।বলা তো যায় না কখন আবার চলে যায়।
রিদি রিদ কে হালকা একটু কে হলুদ লাগানোর বদলে মুঠো ভর্তি হলুদ নিয়ে পুরো মুখে ঢলে দিল।রিদ হতভম্ব হয়ে রিদির দিকে তাকাতেই রিদি ক্যাবলা হেসে দৌড় লাগাল।রিদির দৌড় লাগানো দেখে রিদ ও রেগে ওর পিছু ছুটল।
এই বেয়াদব দাড়া!তোর সাহস কতো??আমার মুখে এতো হলুদ লাগাস। দৌড়াচ্ছি স কেন ইডিয়েট??
সরি ভাই ভুল হয়ে গেছে সরি!!
তোর সরির……..রিদি দাড়া বলছি!!
রিদি শাড়ি পড়ে কোনমতে ছুটছে।রিদের হাতে লাগলে আজ আচ্ছা মতো সেই হলুদেই ডুবাবে তাকে। কিন্তু শাড়ি পড়ে দৌড়াতে গিয়ে শাড়ি পায়ে বেঁধে পড়তে নিলে রাদিফ এগিয়ে এসে রিদিকে ধরার আগেই এক শক্তিশালী বিশাল দেহ এসে তার সামনে দাঁড়ালো রাদিফ চেঁচিয়ে কিছু বলার আগেই দেখল সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত একজন পুরুষ এসে রিদিকে টান দিয়ে বুকে জড়িয়ে নিয়েছে।বেশি না হয়তো দু হাত দুরে দাঁড়ানো রাদিফ।রিদিকে কারো বুকে লেপ্টে থাকতে দেখে যেই কিছু বলবে ওমনি সেখানে উপস্থিত হয় রিদ সহ সবাই।রাদিফ লোকটার মুখ না দেখতে পাচ্ছে না সামনে দাঁড়ানো লোকটার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
এই তোর সাহস কিভাবে হয় আমার সামনে এসে দাঁড়ানোর!
রাদিফের চেঁচামেচতে সবাই এবার রাদিফের দিকে তাকালো।
তুই জানিস আমি কে??তোর সাহস কিভাবে হয় আমার পথ আটকানোর।
রিদ একটু এগিয়ে এসে বলল,
কি হয়েছে ??
রাদিফ চেঁচিয়ে বলল,
কে এই রাসকেল??আমার পথ আগলে দাঁড়াই!হু দ্যা হেল হি ইজ!!
এদিকে রাদিফের চেঁচামেচিতে রিদি শক্ত বাহুডোর থেকে বেরুতে চাইলেও পারল না।শেষে বিরক্ত হয়ে বলল,
ছাড়ুন!!এভাবে চেপে আছেন কেন??সবাই আছে ছাড়ুন!
তীব্র কিছু বলল না।রিদি পাঁজাকোলা তুলে রাদিফের উদ্দেশ্য বলল,
ভুল পথে পা দিলে পথ আটকে দেওয়াই উওম মি:রাদিফ মির্জা।
রাদিফ ক্ষিপ্ত মেজাজ নিয়ে সামনে দাঁড়ানো লোকটাকে সাইড কেটে সামনে তাকাতেই অবাক হলো!রিদিকে পাজকোলে তুলে দাড়িয়ে আছে এক সুদর্শন পুরুষ।নিলাভ শান্ত চোখজোড়াই এক প্রকার হুমকি!মুখাবয় একদম গম্ভীর,চোয়াল শক্ত।
রাদিফ কিছু বলার আগেই তীব্র রিদের উদ্দেশ্য বলল,
লুকিং বিউটিফুল!ডোন্ট ওয়ারি শাস্তি টা আমি দিয়ে দিব।
রিদ এতক্ষণ একটুও অবাক না হলেও তীব্রর এমন কথায় এবার কিছুটা নড়েচড়ে দাঁড়াল।সবার সামনে এমন কোলে তুলে নেওয়াই মিটমিট করে হাসছে সবাই আর রিদি তো লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে আছে।সে জানে এখন মাথা ঢুকে মরে গেলেও তীব্র রিদিকে নিচে নামাবে না। তারমধ্যে শাড়ির কুঁচি খানিকটা খুলে গেছে।
এটা কোন ধরনের অসভ্যতা?নামান ওকে!
রাদিফের কথায় তীব্র কপাল কুঁচকে তাকাল। কিছু বলার আগেই রিয়া তাড়াহুড়ো করে বলল,
ভাইয়া ওনি রিদির হাজবেন্ড!রাদিফ বিষ্ময় নিয়ে তাকালো তীব্রর দিকে। হাজবেন্ড!!! হাজবেন্ড কথাটা কোথাও যেন ভালো লাগল না। তবে মুখে কিছু বলল না।
এদিকে তীব্র রাদিফের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বাঁকা হাসল।সেও কিছু না বলে রিদিকে ওভাবে কোলে নিয়েই চলে যেতে যেতে একবার তাকালো রিদির লজ্জা পাওয়া মুখটার দিকে। তীব্র তা দেখে মুচকি হাসল।দুনিয়ার অদ্ভুত এক আকর্ষন তার বৌ।একটু ও কমে না সেই আকর্ষন।চুম্বুকের মতোই টানে এই চেহারাটা।এতো বেশি মায়াবি হবে কেন!!তার মতো তীব্র চৌধুরীও কিনা এই মায়াবতীর কাছে হার মেনে বসে আছে।হ্হ ভাবা যাই!!
আম্মু ছোটু বাত্তা!
বলেই খিলখিল করে হেসে উঠলো রোজ। বাবার কোলে মাকে দেখে রোজ মাকে ছোট বাচ্চা বলছে আর হাসছে।
মেয়েকে এভাবে হাসতে দেখে রিদি রেগে তাকালো তীব্রর দিকে।
নামান! অসভ্য লোক!
তীব্র রিদির কথায় তোয়াক্কা বিহীন মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
আম্মুসোনা তুমি বাইরে কেন জান?ভাইয়ারা কোথায়??
খেলতে!!
তাই!!
বলেই রিদিকে কোলে নিয়েই এক হাটু ভাজ করে বসল।রিদি চটপট তীব্রর গলা জড়িয়ে ধরল। কিছু বলার আগেই তীব্র বলল,
মাম্মার কোলে উঠো!
পাপার কথায় রোজ দু কদম এগিয়ে মায়ের কোল চরতেই রিদি শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরল মেয়েকে।কিছু বলার আগেই তীব্র উঠে দাঁড়ালো মা মেয়ে সহ।কোন কথা ছাড়াই ভেতরে রুমে নিয়ে ঢুকল।রিদিকে সোফায় বসিয়ে মেয়েকে কোলে তুলে টসটসে গালে চুমু দিয়ে বলল,
আমার আম্মা!
ছোট্ট রোজ ও ছোট ছোট দুহাতে তীব্রর গালে হাত রেখে বলল,
আমাল বাবু!!
রিদি এতক্ষণ নীরব দর্শকের মতো সবটা দেখে ফুঁসে ওঠে বলল,
আপনাদের বাপ বেটির ভালবাসা দেখার জন্য কোলে তুলে আনলেন!তাও সবার সামনে থেকে।ওরা কি ভাবছে!!আপনার তো লজ্জার ল ও নাই কিন্তু আমার তো আছে!অসভ্য পুরুষ!!
তীব্র রিদির কথায় পাত্তা না দিলেও ছোট্ট পুতুলটা বাবাকে এভাবে বকতে দেখে বলল,
পাপা আম্মু বতে বতে!!
তীব্র মেয়ের চুলগুলো কানে গুঁজে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,
তোমার আম্মু পঁচা তাই আমাকে বকছে!!
খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো রোজ।মুখে হাত দিয়ে মিচকি হেসে বলল,
আম্মু পুচা!!
রিদি এবার খেকিয়ে উঠে বলল,
আমি পচা তাই না!আসিস শুধু আমার কাছে!আম্মু আম্মু বলে! অসভ্য বাপের অসভ্য মেয়ে!বলেই ধপাধপ পা ফেলে চলে গেল। তীব্র সেদিকে তাকিয়ে আবারো বলল,
তোমার আম্মু বেস্ট আম্মু এই পৃথিবীতে বুঝলে প্রিন্সেস!
রোজ অবুঝ গলায় বাবার কথায় সাই দিলো,
আপনাতেই আমি সিজন ২ পর্ব ৭৪
আত্তা!!
তীব্র মেয়ের গালে আবারো টপাটপ চুমু দিয়ে আদুরে গলায় বলল,
আম্মুজান এখন আপনার ঘুমানোর সময়।রাতে আমরা মজা করব তাই এখন আপনি একটু ঘুমাবেন।বলেই মেয়েকে বুকে নিয়ে ঘুরতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর রোজ ঘুমিয়ে যেতেই তীব্র মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে বিছনায় শুইয়ে দিল।
