Home আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১০

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১০

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১০
সাবিলা সাবি

দীর্ঘপথ পেরিয়ে তারা সৈকতের নির্জন প্রান্তে সেই বিলাসবহুল ভিলার সামনে এসে পৌঁছাল। রিসোর্টের মূল কোলাহল সামান্য দূরে, গাছপালায় ঢাকা ভিলাটি ছিল একদম নিভৃত। লিওন ভেতরে প্রবেশ করে হিয়াকে আলতো করে বিছানায় শুইয়ে দিল। নরম গদিতে শরীর এলিয়ে দিতেই হিয়ার ভেজা ছোট চুলগুলো সাদা চাদরের ওপর ছড়িয়ে পড়ল।
বিছানায় শোয়ানোর সময় হিয়া একটু নড়েচড়ে উঠল। অবচেতনভাবেই তার একটি হাত লিওনের শার্টের কলার শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। লিওন হাতটি ছাড়িয়ে নিতে চাইল, কিন্তু হিয়ার স্পর্শে সে এক অদৃশ্য মায়ার টানে আটকে পড়ল। হিয়ার মুঠির মধ্যে থাকা সেই জেদ আর অধিকারের অনুভূতি লিওনের কঠোর সিআইডি সত্তাকে মুহূর্তের মধ্যে এলোমেলো করে দিল।

ঠিক তখনই ইভানা চতুরতার সাথে বলে উঠলো, “আমি চট করে একটু গরম পানি আর তোয়ালে নিয়ে আসছি, আপনি ওকে একটু দেখুন না প্লিজ। আমি খুব নার্ভাস বোধ করছি, হাতপা কাঁপছে আমার।” এই বলে সে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ইভানার এই চলে যাওয়া হিয়ার আগে থেকেই ঠিক করে রাখা পরিকল্পনা, যাতে লিওন আর হিয়া কিছুক্ষণ একা থাকার সুযোগ পায়।
ঘরজুড়ে এখন পিনপতন নীরবতা, চারপাশের পৃথিবীটা থমকে গেছে। সমুদ্রের ঢেউয়ের ছন্দ আর দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। লিওন বিছানার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। ল্যাম্পের ফিকে হলুদ আলোয় হিয়ার মুখটা খুব রহস্যময় দেখাচ্ছে। তার চোখের পাতাগুলো শান্ত, দেখে মনে হয় সে গভীর ঘুমে ডুবে আছে।

লিওন আলতো করে হিয়ার হাতটা তার কলার থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু হিয়া অবচেতনেই আঙুলগুলো দিয়ে লিওনের শার্টের কাপড় শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রইল। লিওন একদৃষ্টিতে হিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। একজন সিআইডি অফিসার হিসেবে তার এখনই এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া প্রয়োজন, তা সে ভালো করেই জানে। কিন্তু হিয়ার সান্নিধ্যে তার শরীরের প্রতিটি পেশি মনে হলো অবশ হয়ে আসছে।
মেয়েটি কি সত্যিই অচেতন? লিওন ঝুঁকে পড়ে রমনীর চোখের পলক খুঁটিয়ে লক্ষ করল। তার মনে হলো, চোখের পাতার নিচে মণি দুটো বুঝি সামান্য কেঁপে উঠল। লিওনের বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে কি কোনো ভুল দেখছে, নাকি এই অচেনা মেয়েটি কোনো গভীর রহস্যের অংশ?
লিওন আরও নিচু হয়ে রমনীর মুখাবয়ব দেখার চেষ্টা করতেই হিয়ার উষ্ণ নিঃশ্বাস তার গালে এসে লাগল। আগুনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকার মতো এক অস্বস্তিতে লিওনের শরীর কেঁপে উঠল। সিআইডি অফিসার হিসেবে তার ভেতরের সতর্কবার্তা বারবার বলছে—’এখন তো কাজ শেষ, চলে যাও এখান থেকে!’ কিন্তু তার মস্তিষ্ক বলছে—’দেখো, কে এই অচেনা নারী, যে তোমার অস্তিত্বের প্রতিটি কোণকে অকারণে তোলপাড় করে দিচ্ছে।’

কক্ষের নিস্তব্ধতা ভেঙে হিয়া ধীরে ধীরে চোখের পাতা কাঁপিয়ে খুলল। তার দৃষ্টি প্রথমে ঝাপসা থাকলেও, মুহূর্তের মধ্যেই তা স্পষ্ট হয়ে উঠল। ঘরের মৃদু আলোয় সে দেখল, বিছানার পাশের চেয়ারে বসে আছে লিওন। তার হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়িভাবে রাখা, আর চোখগুলো গভীর পর্যবেক্ষণে তারই মুখের ওপর স্থির।
হিয়াকে জ্ঞান ফিরতে দেখেই ইভানা ব্যাকুল হয়ে ছুটে এল, “হিয়া, তোর জ্ঞান ফিরেছে, তুই ঠিক আছিস তো?”
এরপর ইভানা লিওনের দিকে আঙুল নির্দেশ করে যোগ করল, “ওই যে দেখ, ইনি সিআইডি অফিসার লিওনার্দো। উনিই তোকে বোট থেকে উদ্ধার করে এখানে এনেছেন। উনার কারণেই তুই আজ নতুন জীবন পেলি।”
ইভানার কথায় হিয়া অভিনয়ের খাতিরেই কিছুটা দুর্বল গলায় লিওনের দিকে তাকাল। তার চোখের পাতাগুলো কেঁপে উঠল মনে হলো এক ঘোর থেকে জেগে সে কিছু বুঝে ওঠার চেষ্টা করছে। বড় বড় হয়ে যাওয়া চোখে লিওনের ওপর স্থির দৃষ্টি ফেলল হিয়া, তাতে ফুটে উঠল এক অবুঝ কৃতজ্ঞতা আর বিস্ময়ের মিশ্রণ।
ঠিক সেই মুহূর্তে লিওন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে কোনো কোমলতা নেই, বরং শিকারি বাঘের মতো এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। হিয়ার থেকে কয়েক হাত দূরত্বে এসে সে গম্ভীর স্বরে বলল, “তোমার নাম কি হিয়া, নূজহাত হিয়া?”

লিওনের মুখে নিজের পুরো নাম শুনে হিয়ার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে এল। সে স্তম্ভিত হয়ে লিওনের দিকে তাকিয়ে রইল, তার বড় বড় চোখজোড়ায় এখন স্পষ্ট বিস্ময়।
লিওন মৃদু হেসে কিছুটা এগিয়ে এল। “ভাবছো তোমার নাম আমি জানলাম কী করে? আমি তোমাকে চিনতে পেরেছি, হিয়া। তুমি কি সেই মেয়েটা না, ভার্সিটির সেই অন্তর্মুখী জুনিয়র, যাকে আমি একদিন র‍্যাগিংয়ের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলাম?”
হিয়ার হৃৎস্পন্দন যেন গলার কাছে এসে আটকে গেল। সে ভেবেছিল লিওন তাকে একজন সাধারণ পর্যটক হিসেবেই দেখবে, কিন্তু লিওন তাকে অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে এল। হিয়া সামান্য কাঁপা গলায় বলল, “আপনার এত আগের কথা মনে আছে? চেহারাও মনে রেখেছেন সিনিয়র?”
লিওন জানালার দিকে ঘুরে দাঁড়াল, তারপর ধীর পায়ে আবার হিয়ার দিকে ফিরল। তার কণ্ঠস্বরে ফুটে উঠলো অহংকারী পেশাদারিত্ব। সে শান্ত স্বরে বলল, “আমি সিআইডি অফিসার, তাও আবার ইন্টারপোলের টপ টেন তালিকায় থাকা একজন। এমনিতে তো আর টাস্ক ফোর্সে জয়েন করিনি। বিশেষ প্রয়োজনে একবার যাকে দেখি, তাকে মরার আগ পর্যন্ত ভোলার ক্ষমতা আমার নেই।”

লিওন হিয়ার একদম কাছে এগিয়ে এল। তার চোখেমুখে এমন একটা ভাব, যেন সে হিয়ার মনের ভেতরের সবটুকু পড়ে ফেলার চেষ্টা করছে। নিচু স্বরে সে বলল, “আমার মনে হয়, আমি এবার সব হিসাব মিলিয়ে ফেলেছি। তুমিই সেই মেয়েটা, তাই না? যে এতকাল আড়াল থেকে আমার অ্যাসাইনমেন্ট করে দিত?”
হিয়ার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সে নিজেকে যতটা আড়াল করতে চেয়েছিল, লিওনের এই তীক্ষ্ণ নজর তার সব পরিকল্পনা ভেঙে দিচ্ছে। হিয়া কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু লিওনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনের ভেতর তখন তোলপাড়—সে বুঝতে পারছে, যে মানুষকে সে ফাঁদে ফেলার পরিকল্পনা করেছিল, সেই মানুষটিই এখন তার লুকানো সত্য খুঁজে বের করে আনছে।

লিওনের কথায় হিয়ার বুকটা মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠলেও, সে মুখে এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা বজায় রাখল। সে কোনোভাবেই আতঙ্কিত হওয়ার ভান করল না। বরং মৃদু হেসে খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল, “আপনার এমনটা মনে হওয়ার কারণ কী, সিনিয়র? ভার্সিটিতে তো আপনার ওপর অনেক মেয়েরই ক্রাশ ছিল। হয়তো আপনি ভুল করছেন, অন্য কেউও তো হতে পারে।”
লিওন এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর তীক্ষ্ণ চোখে হিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “সহজ কারণ। যেটা তখন ভাবিনি বা ভাবার সময় পাইনি, সেটা এখন পরিষ্কার। তোমাকে বাঁচানোর সেই ঘটনাটার পর থেকেই আমার পেন্ডিং অ্যাসাইনমেন্টগুলো অদ্ভুতভাবে সব কমপ্লিট হয়ে যেত। প্রতিবার। আর এখন আমি নিশ্চিত হতে চাই। আমার প্রমাণের প্রয়োজন।”
লিওন ইভানাকে নির্দেশ দিল, “মিস ইভানা, কাগজ আর কলম আনুন।”
ইভানা খানিকটা ইতস্তত করলেও হিয়ার শান্তভাব দেখে আর দ্বিমত করল না। সে দ্রুত ড্রয়ার থেকে কাগজ-কলম এনে লিওনের হাতে দিল। লিওন কাগজটা হিয়ার সামনে রেখে বলল, “কিছু একটা লেখো। যা খুশি লেখো।”

হিয়া ডান হাত বাড়াতে গিয়েও যেন কী ভেবে থেমে গেল। এরপর সে বাঁ হাত দিয়ে কলমটা তুলে নিল। বেশ সাবলীলভাবে বাঁ হাতে একটা ছোট প্যারাগ্রাফ লিখে ফেলল সে। লিওন বিস্ময়ে অপলক তাকিয়ে রইল। হিয়া খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, “আমার জন্মগত অভ্যাস। বাঁ হাতেই আমি সব কাজ করি। ডান হাতটা আমি একদমই ব্যবহার করতে পারি না, ওটা অকেজো।”
হিয়ার মনে তখন অন্য চিন্তা। সে জানে, ডান হাতে লিখলে হাতের লেখা মিলে যাবে। চিরকুটের সেই লেখার সাথে মিলে গেলে লিওন ধরে ফেলবে যে সেই ‘ভাইপার’। আপাতত সে লিওনের কাছে শুধু ভার্সিটির সেই সাধারণ হিয়া হয়েই থাকতে চায়।
লিওন দ্রুত কাগজটা হাতে তুলে নিল। তার চোখের মণি সরু হয়ে এল। হাতের লেখাটা পরীক্ষা করতে করতে তার মুখে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। কাগজটা হিয়ার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে সে বলল, “আমার আইডিয়া মিলে গেছে। রাইটিং স্টাইলটা ঠিক সেই অ্যাসাইনমেন্টগুলোর মতোই। এবার বলো, কেন করে দিতে? আমাকে হেল্প করার পেছনে আসল রিজনটা কী?”

হিয়া এবার আর কোনো রাখঢাক করল না। বালিশে হেলান দিয়ে বসল সে, ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল শীতল আত্মবিশ্বাসী হাসি। খুব ধীরস্থির গলায় সে বলল, “খুব সহজ। ভার্সিটির সেই দিনটায় আপনি আমাকে বাঁচিয়েছিলেন, সেটা আমার কাছে সাধারণ কোনো ঘটনা ছিল না। শুধু একটা থ্যাংকস দিলে সেটা কম হয়ে যেত। আর আমি কারো ঋণ রাখি না, সিনিয়র। তাই আমি আমার দেনা শোধ করে দিয়েছিলাম।”
লিওনের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। যেই রহস্যের উত্তর খুঁজতে সে এতদিন হন্যে হয়ে ঘুরেছে, সেই উত্তর এত সহজভাবে তার সামনেই ছিল—অথচ এতদিন কেন সে একবারও ভাবেনি যে সেই সাধারণ জুনিয়র মেয়েটাই এটা করতে পারে! এত বছর পর আজ তাকে সামনাসামনি দেখেই জটটা খুলে গেল।
কিছুক্ষণ পর লিওন নিজেকে সামলে নিল, আবার ফিরে এল তার আগের গম্ভীর ভাব। হিয়ার দিকে তাকিয়ে সংক্ষেপে বলল, “গুড। এবার বিশ্রাম নাও। বাই।” লিওন আর এক মুহূর্তও দেরি করল না, দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

লিওনের ভারি বুটের শব্দ করিডোর পেরিয়ে মিলিয়ে যেতেই ইভানা ভয়ে কুঁকড়ে বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে দ্রুত কণ্ঠস্বর নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, “মিস্ট্রেস, আপনি কী করলেন? ও তো ইন্টারপোলের টপ টেন-এর একজন! ও যদি এখন হিয়ার অতীতের দিকে একটু খুঁটিয়ে তাকিয়ে দেখে? হিয়ার সঙ্গে যে ভাইপারের যোগসূত্র আছে, এটা জেনে গেলে? আমরা কি বড় কোনো বিপদে পড়ে গেলাম না?”
হিয়া বিছানায় আরাম করে হেলান দিয়ে বসল। তার মুখে ভয়ের কোনো চিহ্ন নেই, বরং এক অদ্ভুত প্রশান্তি। সে আলতো করে নিজের বাঁ হাতের আঙুলগুলো নাড়ল পিয়ানো বাজানোর মতো করে । ইভানার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল, “শান্ত হ ইভানা! লিওন আমাকে চিনেছে শুধু সেই ভিতু অসহায় সাধারণ ভার্সিটির জুনিয়র মেয়ে হিসেবে। আর ‘ভাইপার’ যে কিনা হাজার হাজার মাইল দূরে থেকে নিজের শত্রুদের শেষ করে দেয় সেই ভয়ংকর পরিচয়টা ওর কল্পনাতেও নেই। সো চিল!”

ইভানা তবুও অস্থির হয়ে পায়চারি করতে লাগল। “কিন্তু উনি তো নিশ্চিত হয়ে গেছে যে ওনার অ্যাসাইনমেন্টগুলো আপনিই করে দিতেন। উনি কি এখন আমাদের ওপর নজরদারি বাড়াবে না?”
হিয়া জানালার বাইরের নীল সমুদ্রের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন এক চিলতে আগুনের আভা। সে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল, “একদিক থেকে এটা ভালোই হয়েছে। লিওনের মনে এখন আমাকে নিয়ে এক ধরনের মায়া তৈরি হবে। আমি ‘হিয়া’ হয়েই ওর কাছাকাছি থাকব, ওর বিশ্বাস অর্জন করব। আর ওদিকে ভাইপার হয়েই ওর রক্তে, ওর প্রতিটি পদক্ষেপে আমি মিশে যাব। ও ঘুণাক্ষরেও টের পাবে না, ও যাকে খুঁজছে সেই ওর আশেপাশে ঘুরছে।
হিয়ার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল বরফ শীতল পৈশাচিক হাসি। ইভানাকে ইশারায় কাছে ডেকে সে ফিসফিসিয়ে বলল, “শোন, একটা মাস্টার মাইন্ড প্ল্যান এসেছে মাথায়। লিওন তো আমাকে চিনে ফেলেছে, ভালোই হয়েছে। এবার ওকে এমন এক ফাঁদে ফেলব, কৌশলে এমন জায়গায় নিয়ে যাবো যেখানে ও আমার নজরের একদম কাছে থাকবে। এখন তুই বরং একটু বিশ্রাম নে, পরিকল্পনাটা ঠিক করে সময় হলেই তোকে বলব।”

ইভানা হিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠল। সেই দৃষ্টিতে দেখতে পেলো ভয়াবহ আগুনের আভা। সে দ্রুত কয়েক পা পিছিয়ে গেল—কারণ সে জানে, হিয়ার মনে যখন এমন কোনো পরিকল্পনা জন্ম নেয়, তখন তার পরিণতি হয় নিশ্চিত ধ্বংস।
হিয়া চোখ বন্ধ করল। মনের পর্দায় ভেসে উঠল লিওনের শক্ত চোয়াল, আর সেই তীক্ষ্ণ চাহনি। সে বিড়বিড় করে উঠল, “খুব তাড়াতাড়িই আবার দেখা হবে, বাজপাখি। মাই ব্রেইন ক্যান্সার! তুমি আমার মস্তিষ্কের সেই ক্যান্সার, যা আমাকে প্রতি মুহূর্ত যন্ত্রনার দহনে পুড়িয়ে শেষ করে দিচ্ছে। এবারের সাক্ষাৎটা এমন হবে, যা তুমি চাইলেও ভুলতে পারবে না দিলবার।”
কিছুক্ষণ পরেই হিয়ার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখেই হিয়ার ঠোঁটের হাসিটা আরও রহস্যময় হয়ে উঠল—দানিয়েল, তার বস। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে দানিয়েলের রাগান্বিত গর্জন শোনা গেল, “হিয়া! এই পাগলামিটার মানে কী? কার অনুমতি নিয়ে তুমি হুট করে ইভানাকে সঙ্গে নিয়ে থাইল্যান্ডে চলে গেলে? লন্ডনের সিক্রেট অপারেশনগুলো শেষ না হতেই এসব কী শুরু করলে তুমি? মাথা কি খারাপ হয়ে গেলো তোমার?”
হিয়া ধীরস্থিরভাবে বিছানায় উঠে বসল। সে জানে দানিয়েলকে কীভাবে বশে আনতে হয়। শান্ত গলায় সে বলল, “বস। থাইল্যান্ডে আমি একটা বিশেষ মিশন এসেছি।এটা ছাড়া আমার কার কোনো উদ্দেশ্য নেই এখানে আসার।”

দানিয়েল বিদ্রূপের হাসি হাসল। “মিশন? লন্ডন ফেলে হঠাৎ থাইল্যান্ডে গিয়ে এমন কী মহাবিপদ উদ্ধার করছো তুমি, যেটা আমাকে জানানোর প্রয়োজনও মনে করলেনা? বলো তো, কী ঝামেলায় জড়িয়েছো?”
হিয়া জানালার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। দানিয়েলকে পুরোটা সত্য বলা যাবে না, সে ভালো করেই জানে। মুহূর্তের মধ্যেই সে একটা মিথ্যে বুনে ফেলল—অথচ পুরোপুরি মিথ্যাও নয়। এখানে এসে কোনো কিছু না করে ফিরে গেলে দানিয়েল নিশ্চিতভাবেই সন্দেহ করবে। তাই সে শান্ত গলায় বলল, “সবচেয়ে বড় ডিলটা আমি এখন এখানেই করছি, বস। জেনেশুনে চোখ রেখেই এখানে এসেছি। এই রিসোর্টে খুব শীঘ্রই একটা হাই-প্রোফাইল ইভেন্ট হতে যাচ্ছে। সেখানে প্রদর্শিত হবে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি হীরা—’দ্য ব্লু স্টার’। ওটা বাগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছি আমি।”

ওপাশ থেকে দানিয়েল কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। “হীরা চুরি? তুমি কি জানো এটা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ? আর আমাকে না জানিয়েই তুমি এমন একটা রিস্ক নিচ্ছো?”
হিয়া এক শীতল আত্মবিশ্বাসে পূর্ণ কণ্ঠে বলল “ঝুঁকি না থাকলে কি আর আমি ভাইপার? ‘ব্লু স্টার’ হীরার বাজারমূল্য কত, তা তো আপনি ভালো করেই জানেন বস। ওটা কব্জা করতে পারলে লন্ডনের সব ক্ষতির হিসাব মিটে যাবে। আমি পরিস্থিতি পুরোপুরি পর্যবেক্ষণ করছি। চিন্তা করবেন না, সব আমার হাতের মুঠোয় আছে।”

ফোনটা ড্রয়ারের ভেতর ছুঁড়ে ফেলে দিল হিয়া। এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেও ইভানা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, “মিস্ট্রেস, আপনি কেন বসকে এসব বললেন? আপনি তো ভালো করেই জানেন, দানিয়েল বস মিথ্যে একদম সহ্য করতে পারে না। তাছাড়া, এই ব্লু স্টার চুরির প্ল্যানটা তো আমাদের আসল মিশনের অংশই ছিল না!”
হিয়া বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পরনের লিনেন সেটের ভাঁজে হাত বোলাতে বোলাতে সে এগিয়ে গেল আয়নার সামনে। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক শীতল, পৈশাচিক হাসি। তার আঙুলের ডগায় এখনো সেই সাদা বাটনটা—লিওনের শার্টের কলারটা যখন সে আকর্ষণে মুচড়ে ধরেছিল, ঠিক তখনই ওটা ছিঁড়ে তার হাতে চলে এসেছিল। স্মৃতিটা মনে পড়তেই হিয়ার ভেতরে এক অদ্ভুত উত্তেজনা খেলে গেল। সে বোতামটাতে পরম মমতায় একবার চুমু খেলো, যেন ওটা কোনো বহুমূল্য রত্ন; তারপর ড্রয়ারের ভেতর রাখা সবচেয়ে দামি বাক্সটিতে ওটা যত্ন করে রেখে দিল। এরপর আয়নার দিকে তাকিয়েই ধীরস্থির গলায় বলল, “মিথ্যা? ইভানা, তুই কি সত্যিই আমাকে চিনিসা না? আমি বসকে মিথ্যে বলিনি। এই রিসোর্টে খুব শীঘ্রই আসলেই একটা হাই-প্রোফাইল ইভেন্ট হতে যাচ্ছে আর ‘দ্য ব্লু স্টার’ ডায়মন্ডটাও সেখানেই থাকবে।”

ইভানা হতবাক হয়ে হিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। “তার মানে আপনি সত্যিই ডাকাতি করবেন? কিন্তু কেন? অফিসার লিওনকে কাছে পাওয়াটাই তো আপনার একমাত্র লক্ষ্য ছিল!”
হিয়া আয়নায় নিজের চোখের প্রখর উজ্জ্বলতা খুঁটিয়ে দেখল। তারপর ধীরপায়ে ইভানার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে এক নিষ্ঠুর হাসিতে মুখটা ভরিয়ে ফেলল। “এক ঢিলে আমি দুটো পাখি মারব, ইভানা। ‘দ্য ব্লু স্টার’ ডায়মন্ডটা তো আমি হাতাবই ওটা আমার ব্যাংকের অ্যাকাউন্টের জন্য দারুণ এক সম্পদ হবে। কিন্তু ওই হীরাটার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি দামি একটা জিনিস আমার চাই, যেটা পৃথিবীর কোনো বাজারে কেনা যায় না।”

এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপর হিয়ার কণ্ঠস্বরটা আরও গভীর হয়ে এল, “লিওন। আমার কাছে লিওন যেকোনো হীরা বা রত্নপাথরের চেয়েও দামি। ও যখন দেখবে ওর চোখের সামনেই আমি সবচেয়ে সুরক্ষিত সম্পদটা লুটে নিচ্ছি, তখন ওর সেই অহংকারী সিআইডি ইগোটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। আর ঠিক সেই ভাঙাচোরা, দুর্বল মুহূর্তেই আমি ওর জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য হয়ে ওর হৃদয়ে চিরস্থায়ী জায়গা করে নেব।”
হিয়া ইভানার কাঁধে আলতো করে হাত রাখল। শীতল স্বরে বললো “বস ভাবছে আমি শুধু অর্থের পেছনে ছুটছি, কিন্তু সে কি জানে আমি আসলে একটা মানুষের পুরো অস্তিত্ব দখল করতে যাচ্ছি? লিওন আমার জন্য কোনো সাধারণ অ্যাসাইনমেন্ট নয়; ও আমার জীবনের সবচেয়ে দামি হীরা, যাকে আমি নিজের আয়ত্তে আনবই।”

হিয়ার এই স্থির এবং হিমশীতল পরিকল্পনা শুনে ইভানা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে স্পষ্ট বুঝতে পারল, হিয়া এখন কেবল একজন ক্রিমিনাল মাস্টারমাইন্ড নয়, সে এখন এক বিপজ্জনক প্রেমে মত্ত শিকারি—যে কোনো মূল্যে নিজের শিকারকে বাগে পেতে মরিয়া।
হিয়া আবার জানালার দিকে ফিরে গেল। বাইরের সমুদ্র তখন অস্বাভাবিক শান্ত, হয়ত কোনো এক ভয়ংকর তুফানের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। হিয়ার চোখে তখন এক জেদী আগুনের আভা। সে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল, “লিওন, তুমি তো সিআইডি অফিসার। দেখি, তোমার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর আমার এই অভেদ্য প্রেমের জালে—শেষ পর্যন্ত কে জেতে!”
পরের দিন সকাল থেকেই দ্বীপের আবহাওয়া ছিল থমথমে। হিয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী, সে খুব ভোরে ইভানাকে নিয়ে রিসোর্টের বাইরে বের হলো। তাদের গন্তব্য দ্বীপের শেষ প্রান্তের সেই বিস্তীর্ণ জঙ্গল—যেখানে প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়, সেখানে এমন সব হিংস্র প্রাণীর বাস, যারা মানুষের গন্ধ পেলেই মুহূর্তের মধ্যে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। পুরো এলাকাটি তাই কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা, ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে সতর্কবাণী।

হিয়া বড় অংকের অর্থের বিনিময়ে স্থানীয় কিছু লোককে ভাড়া করল। সারাদিন ধরে সেই জঙ্গলের গভীরে সে ঠিক কী কী গোপন কাজ করল, তা ইভানার কাছে ধোঁয়াশা রইলো এখন পর্যন্ত। ইভানা শুধু দূর থেকে দেখল, হিয়া অত্যন্ত নিপুণ হাতে কিছু অদ্ভুত যন্ত্রপাতির পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে এবং জঙ্গলের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে নিজের পরিকল্পনার ছক সাজাচ্ছে।
বিকেল গড়িয়ে এল। আকাশে সূর্যাস্তের লালচে আভা তখন সমুদ্রের জলে মিশেছে, কিন্তু হিয়ার ফেরার কোনো নামগন্ধ নেই। ইভানা অধৈর্য হয়ে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। হিয়া কি কোনো নতুন বিপদ ডেকে আনছে?
অবশেষে ধুলোবালি মাখা অবস্থায় হিয়া যখন ফিরে এল, তার ঠোঁটে তখন সেই চিরচেনা শিকারি হাসি। ইভানা বুঝতে পারল, পরিকল্পনা শুরু হয়ে গেছে।
হিয়া তখন ইভানার সামনে তার পুরো পরিকল্পনা খুলে বলল—সে এই নিষিদ্ধ এরিয়ার ভেতরেই যাবে এবং ইভানা যেন ঠিক সময়ে লিওনকে খবর দেয়। এই বিপজ্জনক কৌশলের কথা শুনে ইভানার মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে তোতলামি করে বলল, “মিস্ট্রেস, এটা কি বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না? যদি সত্যিই কোনো মাংসাশী প্রাণী আপনার ওপর হামলা করে?”

হিয়া তার ঠোঁটে এক চিলতে শয়তানি হাসি ফুটিয়ে বলল, “ভয় পাওয়ার কিছু নেই, ইভানা। ওই প্রাণীদের সাথে আমার বোঝাপড়া আগেই হয়ে গেছে। আমি শুধু লিওনের সামনে নিজেকে অসহায় হিসেবে তুলে ধরতে চাই। ও যখন দেখবে ওর পরিচিত ভার্সিটির জুনিয়র মেয়েটা বিপদে পড়েছে, তখন ওর সিআইডি সত্তা নিজের অজান্তেই জেগে উঠবে। আর ঠিক তখনই, ও আমার মায়াজালে আটকা পড়বে।”
পরিকল্পনা অনুযায়ী, হিয়া ইভানাকে কিছু দূর এগিয়ে নিয়ে গেলো এরপর সে একাই গহিন জঙ্গলের দিকে পা বাড়াল। গহীন অরণ্যের নিস্তব্ধতা চিরে সে যখন ভেতরে প্রবেশ করল, তখন তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। জঙ্গলের একটু গভীরে গিয়ে সে নিজের ফোনের জিপিএস অন করে রেস্ট্রিকশন দেয়া সাইনবোর্ডের অদূরে ঘাসের ভেতর সাবধানে ফেলে রাখল—যাতে লোকেশন ট্রেস করা সহজ হয়।
ইভানা ঠিক দশ মিনিট পর পাগলের মতো দৌড়ে রিসোর্টের ডাইনিং এরিয়ায় ফিরে এল। মায়া আর লিওনকে টেবিলের পাশে বসা দেখেই সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। “অফিসার লিওন! প্লিজ, সাহায্য করুন! আমার ফ্রেন্ড হিয়া… ওকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। ও হঠাৎ কোথায় উধাও হয়ে গেল, জঙ্গলের ওখানে আমি একটা চিৎকার শুনেছি! আমার মনে হচ্ছে হিয়া ভুল করে জঙ্গলের রেস্ট্রিকটেড এলাকায় ঢুকে পড়েছে!” কাঁদতে কাঁদতে ইভানা মেঝেতে বসে পড়ল।

লিওন তখন কফি খাচ্ছিল। ইভানার কথাগুলো শুনতেই তার হাত থেকে কফির মগটা প্রায় ছিটকে পড়ে যাচ্ছিল। হিয়ার সেই গতকালের ম্লান মুখটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। এক ঝটকায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো লিওন। লিওনের চোখে তখন গভীর উদ্বেগ। মায়া আতঙ্কিত গলায় চিৎকার করে বলে উঠল, “লিও ভাইয়া, ওখানে তো মানুষখেকো প্রাণীদের বাস! এখনই ম্যানেজমেন্টকে খবর দাও!”
লিওন কোনো কথা বলল না। তার সিআইডি ব্রেইন তখন কোনো নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করছে না। তার প্রতিটি পেশিতে এখন এক তীব্র উত্তেজনা, মাথায় কেবল হিয়ার নিরাপত্তার চিন্তা। দ্রুত নিজের বেল্ট থেকে হ্যান্ডগানটা চেক করে নিল সে—নিশ্চিত হতে চাইল যে সে যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। তার চোখেমুখে এখন এক অদ্ভুত কঠোরতা, যা কেবল একজন অভিজ্ঞ অফিসারের পক্ষেই সম্ভব।
ইভানার দিকে এক পলক তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, “তুমি আমার বোন মায়াকে নিয়ে এখানেই থাকো। আমি যাচ্ছি।”

রিসোর্টের ম্যানেজারের অনুমতির জন্য এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না সে। বরং দ্বীপের শেষ প্রান্তে সেই নিষিদ্ধ জঙ্গলের সীমানার দিকে সে বাতাসের বেগে দৌড়াতে শুরু করল। একজন সিআইডি অফিসার হিসেবে এটি তার কাছে এখন আর কেবল সাধারণ সাহায্য করা নয়, এটি এক ব্যক্তিগত মিশন। ঝোপঝাড় আর পাথুরে পথ মাড়িয়ে সে যখন জঙ্গলের সেই কাঁটাতারের কাছে পৌঁছাল, তখন তার হৃদস্পন্দন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। তার সামনে এখন অন্ধকার জঙ্গল, আর ভেতরে কোথাও হয়তো মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে হিয়া। সে তার টর্চলাইটটা জ্বালাল, আর সেই আলোতে জঙ্গলের গভীরতা যেন আরও রহস্যময় হয়ে উঠল।
জঙ্গলের গভীরে প্রবেশ করতেই লিওন এক অপার্থিব নিস্তব্ধতা অনুভব করল। চারপাশটা কেমন শ্বাসরুদ্ধকর, ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে ভেসে আসছে অদ্ভুত সব পশুর গর্জন। লিওন অত্যন্ত সাবধানে পা ফেলছে, হাতের বন্দুকের ট্রিগারে রাখা আঙুলটি প্রতিটি মুহূর্তে প্রস্তুত। সিআইডি অফিসার হিসেবে তার পেশাদার মন তাকে বারবার সতর্ক করছে—হিয়া কি সত্যিই পথ হারিয়েছে, নাকি এই বিপদের আড়ালে অন্য কোনো গভীর ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে?

পায়ের নিচে শুকনো পাতার মড়মড় শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। সাইনবোর্ডের কাছাকাছি পৌঁছাতেই তার নজর গেল মাটিতে পড়ে থাকা একটা ফোনের দিকে। লিওন নিচু হয়ে ফোনটা হাতে তুলে নিল—এটা হিয়ার ফোন। এখন তার আর কোনো সন্দেহের অবকাশ রইল না, হিয়া ঠিক এই বিপদের মুখেই দাঁড়িয়ে আছে। সে বুঝতে পারল, সে ঠিক পথেই এগোচ্ছে, কিন্তু এই গভীর জঙ্গল তাকে আর হিয়াকে ঠিক কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, তা তার কল্পনার অতীত।
জঙ্গলের আলো তখন ফুরিয়ে আসছে। লিওন ঝোপঝাড় সরিয়ে এগিয়ে যেতেই দেখল, পাঁচজন মুখোশধারী লোক হিয়াকে ঘিরে ফেলেছে। হিয়া মাটিতে পড়ে আর্তনাদ করছে, “প্লিজ! আমাকে ছেড়ে দিন! আমি একজন সাধারণ টুরিস্ট, আমার কাছে কিছু নেই!”

একজন লোক হিয়ার কলার ধরে তাকে টেনে তুলল, আর অন্যজন তার হাত থেকে ব্যাগটা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। হিয়া এমনভাবে চিৎকার করছে যেন সে সত্যিই কোনো ভয়াবহ বিপদে পড়েছে। আড়াল থেকে সবটা দেখে লিওনের মাথায় রক্ত উঠে গেল। সে বন্দুক তাক করে গর্জে উঠল, “হাত সরাও!”
লিওনের কণ্ঠ শুনে লোকগুলো প্রায় ঘাবড়ে গেল। হিয়া একবার আড়াল থেকে লিওনের দিকে তাকাল—তার চোখে বিজয়ের ঝিলিক, যেটা লিওন হয়তো খেয়ালই করল না। সে এখন লিওনের চোখের সামনে এক অসহায় শিকার, যাকে বাঁচানোর জন্য সিআইডি অফিসারটি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত।
পাঁচজন লোক একসাথে লিওনের দিকে তেড়ে এল। কিন্তু লিওনের সিআইডি ট্রেনিংয়ের দক্ষতা তখন চোখের পলকে কাজ করছে। তার একেকটা ঘুষি আর লাথিতে লোকগুলো একের পর এক কুপোকাত হতে লাগল। মারপিটের ধকল সামলাতে না পেরে একজন লোক পকেট থেকে পিস্তল বের করার চেষ্টা করতেই লিওন ক্ষিপ্র গতিতে তার নিজের হোলস্টার থেকে বন্দুক বের করে সরাসরি সেই লোকের কপালে তাক করল।
লিওন গর্জে উঠে বললো “গুলিটা ছাড়ার আগেই তোর মগজ আস্ত থাকবে না, বলে দিচ্ছি!” তার কণ্ঠের তীব্রতা আর চোখের শীতল দৃষ্টি দেখে লোকগুলোর সাহস ভেঙে গেল। জীবন বাঁচাতে তারা আর কোনো কথা না বলে অন্ধকারের ভেতর দৌড়ে পালিয়ে গেল।

হিয়া মাটির ওপর পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার পরিকল্পনায় ছিল লিওনের এই বীরত্বপূর্ণ উদ্ধারকার্য, এরপর কোনো অজুহাতে জঙ্গল থেকে ফেরার পথ ভুলে যাওয়া—যাতে লিওনের সাথে এই গা ছমছমে পরিবেশে একা রাত কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু পরিস্থিতি এখন তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। মারপিট থামতেই জঙ্গলের গভীর থেকে ভেসে এল এক বিকট শিসের শব্দ, সাথে মাটি কাঁপানো গম্ভীর গর্জন। গাছের ডালপালা চুরমার করে কোনো বিশাল প্রাণী তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে।
চারপাশে হিংস্র প্রাণীদের সেই পরিচিত ডাক এখন এতটাই জোরালো যে, তা কানের পর্দায় আঘাত করছে। লিওন এক মুহূর্ত দেরি করল না। দ্রুত হিয়ার কাছে এগিয়ে এসে শক্ত করে তার হাত চেপে ধরল। তার কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা, “হিয়া, ওঠো! আমাদের এখনই এখান থেকে বেরোতে হবে। আমরা অনেক গভীরে চলে এসেছি, আর সময় নষ্ট করা মানেই দুজনের মৃত্যু!”

হিয়ার হাতের শীতলতা লিওনের হাতের মুঠোয় আসতেই সে বুঝতে পারল, মেয়েটি প্রবল আতঙ্কে কাঁপছে। হিয়ার চোখেমুখে ফুটে ওঠা সেই ভয়ার্ত অভিব্যক্তি লিওনের মনে এক মুহূর্তের জন্য হলেও কোমলতা জাগিয়ে তুলল। সে ভাবল, হিয়া ওই ছিনতাইকারিদের জন্য এই বিপদে জড়িয়েছে।
লিওনের হাতের শিরাগুলো তখন উত্তেজনায় ফুলে উঠেছে, তার পেশিগুলো টানটান। মৃত্যুর মুখোমুখী দাঁড়িয়েও তার চোখেমুখে ভয়ের লেশমাত্র নেই—আছে শুধু হিয়াকে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার অদম্য জেদ।

হিয়া নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলে উঠল, “লিওন… আমি তো জানতাম না এখানে এত বেশি ভয়ঙ্কর সব প্রাণী থাকে। আমি তো নিজের অজান্তেই তোমাকে অনেক বড় বিপদে ফেলে দিয়েছি।”
লিওন স্থির দৃষ্টিতে সামনের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে পিস্তলটা শক্ত করে ধরল। চারপাশ থেকে ভেসে আসা হাড়হিম করা গর্জনগুলো যেন জানান দিচ্ছে—তারা এখন এই দ্বীপের আদিম শিকারিদের নজরে পড়ে গেছে।
লিওন হিয়ার দিকে ঘুরে তার চোখের গভীরে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “ভয় পেয়ো না। আমি সাথে আছি, তোমার কিচ্ছু হবে না।”
লিওনের কথাগুলো হিয়ার কানে মন্ত্রের মতো বাজল ঠিকই, কিন্তু তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে তো চেয়েছিল পরিস্থিতিটা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে, কিন্তু খেলার মোড় যেদিকে ঘুরছে, তাতে তার নিজেরই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। সে আড়চোখে দেখল লিওনের প্রতিটি গতিবিধি আগুনের মতো তীক্ষ্ণ। হিয়ার মনে হলো, সে কি তবে বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলল? লিওনকে নিজের মায়ায় জড়াতে গিয়ে কি সে সত্যিই তাদের দুজনের জীবনের বাজি ধরেছে?

জঙ্গলের নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে বেরিয়ে এল এক বিকট, হাড়কাঁপানো গর্জন। কম্পনে যেন মাটির নিচ থেকে শিরশিরানি উঠে এল। লিওন তড়িৎ গতিতে হিয়াকে টেনে নিয়ে এক বিশাল বটগাছের খোদলে লুকিয়ে পড়ল। টর্চের সরু আলোয় তারা যা দেখল, তাতে দুজনেরই রক্ত হিম হয়ে গেল—সাইনবোর্ডের এরিয়ায় পাহারা দিচ্ছে বিশালাকার দুটো প্রাণী, যাদের চোখের মনি অন্ধকারে আগুনের গোলার মতো জ্বলছে। লিওন হিয়ার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “ওরা গেট ব্লক করে দিয়েছে। এখন ওদিক দিয়ে বেরোনো মানে সরাসরি মৃত্যুর মুখে পড়া।”

প্রাণীগুলো তারকাটার সামনেই ধীর পায়ে পায়চারি করছে, লিওন বুঝল, ওই পথে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সে হিয়াকে ইশারা করল বিপরীত দিকে এগোতে। প্রাণপণে তারা ছুটতে শুরু করল ঘন অন্ধকারের ভেতর দিয়ে। বাঁশঝাড় আর কাঁটাভরা লতাগুল্মের আড়াল দিয়ে যখন তারা দৌড়াচ্ছে, তাদের পায়ের তলায় পাতার মড়মড় শব্দ তখন প্রাণীদের কানে পৌঁছানোর আগেই তাদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিচ্ছে। পেছনে ভারী পায়ের আওয়াজ আর গাছের ডাল ভাঙার শব্দ শুনে বোঝা যাচ্ছে—শিকারিগুলো তাদের পিছু নিয়েছে।
ছুটতে ছুটতে হিয়া হঠাৎ একটি বিশাল সেগুন গাছের নিচে এসে থমকে দাঁড়াল। লিওন হাঁপাচ্ছিল, সে হিয়ার দিকে তাকাতেই দেখল হিয়া ওপরের দিকে চেয়ে আছে। হিয়া আঙুল তুলে ফিসফিস করে বলল, “সিনিয়র দেখুন! আমাদের মনে হয় আজ রাতটা এখানেই কাটাতে হবে। ওই যে ওপরে একটা টং হাউজ!”
লিওন ওপরের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। বিশাল ওই গাছের মগডালে কাঠের তৈরি ছোট্ট একটি কাঠের টং হাউজ ঝুলছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই লিওনের মনে এক চিলতে খটকা লাগল—এই গভীর জঙ্গলের এত দুর্গম আর পরিত্যক্ত এলাকায় এমন নিখুঁত একটি টং হাউজ এলো কোথা থেকে? সাধারণ কোনো পর্যটকের জন্য এটা তৈরি করা অসম্ভব, তবে এখানে অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে কি?

প্রাণের ঝুঁকি তখন এতই প্রবল যে, লিওন কোনো প্রশ্ন করার সময় পেল না। সে দ্রুত হিয়াকে সাহায্য করে মই বেয়ে ওপরে তুলে দিল, তারপর নিজেও এক ঝটকায় উঠে এল। ছোট সেই কাঠের ঘরটিতে জায়গা খুবই কম; লিওন আর হিয়া পাশাপাশি বসতেই তাদের শরীরের উষ্ণতা একে অপরের সাথে মিশে গেল।
ঘরটি ছোট হলেও বেশ মজবুত। বাইরে সেই ভয়ংকর প্রাণীদের গর্জন এখনো শোনা যাচ্ছে, তারা ঠিক এই গাছের নিচেই ওত পেতে আছে। লিওন সাবধানে জানালার ছিদ্র দিয়ে বাইরে নজর রাখছে, তার শরীর তখনো উত্তেজনায় টানটান। আর হিয়া? সে অন্ধকারের মাঝেও আড়চোখে লিওনের লিওনের দিকে তাকিয়ে রইল।
আসলে, এই টং হাউজটি হিয়া তার ভাড়া করা লোক দিয়ে সকাল থেকে তৈরি করিয়েছে। তার পুরো পরিকল্পনায় ছিল লিওনকে কোনোভাবে এই জঙ্গলের ফাঁদে ফেলা, যাতে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যেখানে লিওন আর হিয়া ছাড়া আর কেউ থাকবে না।
লিওন আড়ষ্ট হয়ে জানালার পাশে বসে আছে। তার হাতের পিস্তলটা তখনও ট্রিগারে প্রস্তুত। হঠাৎ সে হিয়ার দিকে ফিরল। আগুনের মতো উজ্জ্বল চোখে সে হিয়াকে দেখল। টং হাউজের ভেতরের অন্ধকার আর বাইরের বিভীষিকার মাঝে লিওন যেন এক গভীর ঘোরের মধ্যে আছে।

লিওন নিচু স্বরে প্রশ্ন করল, “তুমি কি আগে থেকে এই জঙ্গল সম্পর্কে জানতে? এই টং হাউজটা… অদ্ভুতভাবে আমাদের চোখের সামনে পড়ল, মনে হলো কেউ এটা আমাদের জন্যই তৈরি করে রেখেছে।”
হিয়ার ঠোঁটের কোণে অন্ধকারে এক চিলতে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। সে লিওনের একদম কাছে সরে এসে ফিসফিস করে বলল, “হয়তো ভাগ্যই আমাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য এটা সাজিয়ে রেখেছে, সিনিয়র। এই জঙ্গলের নিয়ম তো আমরা জানি না, কিন্তু আপাতত এই টং হাউজটাই আজ আমাদের নিরাপত্তা দিবে।”
টং হাউজের ভেতরটা তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। লিওন যখন গভীর চিন্তায় মগ্ন, তখনই হিয়া ঘরের এক কোণে হাতড়াতে শুরু করল। আগে থেকেই তার এখানে রাখা একটি পুরনো তেলের কুপি আর দুটো পাথর তার হাতের নাগালেই পাওয়া গেল। হিয়া খুব সাবধানে পাথর দুটো ঠুকে এক মুহূর্তেই শিখা জ্বালিয়ে ফেলল। কুপির সলতেয় আগুন ধরতেই পুরো কাঠের ঘরটি এক মায়াবী আলোয় ভরে উঠল।
লিওন স্তব্ধ হয়ে হিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। সে অবাক হয়ে বলল, “পাথর দিয়ে আগুন ধরাতে পারো তুমি..?”

হিয়া মৃদু হাসল। সে তো জানত, এই ঘরটি তার লোক দিয়ে আগেই গুছিয়ে রাখা হয়েছিল, তাই এখানে কী আছে তা তার নখদর্পণে। সে শান্ত গলায় বলল, “পরিস্থিতি অনুযায়ী সবকিছুই আয়ত্ত করতে হয়, সিনিয়র।”
এদিকে, রিসোর্টের লবিতে তখন হাহাকার পড়ে গেছে। লিওন আর হিয়ার নিখোঁজের খবর ছড়াতেই চারদিকে এক অসহনীয় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। লিওনের বাবা-মা খবরটা পাওয়ার পর থেকেই শোকে পাথর হয়ে গেছেন, লিওনের মায়ের চোখের জল যেন ফুরাচ্ছে না। আর মায়া? সে তো পাগলের মতো রিসোর্টের লবিতে পায়চারি করছে।
মায়া বারবার চিৎকার করে বলছে, “লিও ভাইয়া কি ওই জঙ্গলে সেইফ আছে? আমরা কেন এখানে বসে আছি? পুলিশের কোনো খবর নেই কেন? এখনই রেসকিউ টিম পাঠান!”
রিসোর্টের ম্যানেজার বারবার তাদের শান্ত করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু মায়ার আর্তনাদ লবির বাতাসকে ভারী করে তুলছে। প্রতিটি সেকেন্ড তাদের কাছে একেকটা বছরের সমান। তারা জানে না, সেই জঙ্গলের গভীর অন্ধকারে লিওন এখন ঠিক কোন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

ইভানা খুব ঠান্ডা মাথায় সবাইকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। সে মিথ্যা অভিনয়ের আশ্রয় নিয়ে বলছে, “আঙ্কেল-আন্টি, দয়া করে শান্ত হোন। পুলিশ বা সিআইডি যদি এখন ওখানে যায়, তবে হিয়া আর অফিসার লিওন দুজনেই বেশি বিপদে পড়বে। ওনারা হয়তো কোনো নিরাপদ জায়গায় লুকিয়েছে। এখনই সিআইডি বাহিনী পাঠালে ওই হিংস্র প্রাণীগুলো শব্দ পেয়ে ওদের খুঁজে নেবে।”
রিসোর্টের ম্যানেজার তাদের শান্ত করার চেষ্টা করলেও তার কণ্ঠে ব্যবসায়িক স্বার্থের ছাপ স্পষ্ট। তিনি দ্রুত যোগ করলেন, “ঠিক বলছেন ম্যাডাম। আমাদের এই দ্বীপের সুনাম খুব নাজুক। কোনো অঘটন ঘটলে রিসোর্টের নাম খারাপ হবে। আপনারা ধৈর্য ধরুন, কাল সকালেই আমরা লোক পাঠিয়ে তল্লাশি শুরু করব—আশা করি ওনাদের কিছুই হবে না।”
মায়া তার কথা শুনে প্রায় ফেটে পড়ার উপক্রম হলো। “কাল সকাল? ততক্ষণে হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে! আপনি কি বুঝতে পারছেন না কিসের কথা বলছেন?”

ঠিক সেই মুহূর্তেই রিসোর্টের মূল ফটক দিয়ে ভারী বুটের শব্দ শোনা গেল। পাঁচজন অস্ত্রধারী এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকারী সদস্যের একটি রেসকিউ টিম সেখানে এসে উপস্থিত হলো। লিওনের বাবা আর্থার হায়াসের ফোনেই তারা এসেছেন। তাদের পরনে বিশেষ গিয়ার এবং হাতে লেটেস্ট জিপিএস ট্র্যাকিং ডিভাইস। তাদের দলনেতা সরাসরি ম্যানেজারের দিকে এগিয়ে এসে কঠোর গলায় বললেন, “আপনারা তল্লাশির জন্য দেরি করতে পারেন, কিন্তু আমাদের জন্য প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। আমাদের কাছে খবর আছে, জঙ্গলের ওই এলাকায় হাই-প্রোফাইল লোকজন বিপদে পড়েছে। রেসকিউ টিম এখনই রওনা হচ্ছে, সাথে গাইডের প্রয়োজন নেই, আমরা নিজেরাই পথ চিনে নেব।”

ম্যানেজার তাদের দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন, কিন্তু আর্থার হায়াত একমুহূর্ত নষ্ট না করে রেসকিউ টিমের সাথে গেটের দিকে দৌড় দিল। মায়া যেতে চাইলে তাকে আটকে রাখলেন লিওনের মা।
টং হাউজের ভেতর কুপিটার মৃদু হলদেটে আলো লিওনের তীক্ষ্ণ চেহারায় এসে পড়েছে। আলো-ছায়ার লুকোচুরিতে তার মুখটা আরও গম্ভীর আর আকর্ষণীয় দেখাচ্ছে। হিয়ার চোখের মণি তখন এক অদ্ভুত তৃষ্ণায় কম্পমান এটা শুধুমাত্র বেঁচে ফেরার তৃষ্ণা নয়, বরং লিওনকে নিজের করে পাওয়ার এক তীব্র নেশা। লিওন বিন্দুমাত্র টের পাচ্ছে না যে, সে এখন আর কেবল এক বিপৎসংকুল জঙ্গলে নেই, বরং জড়িয়ে পড়েছে এক বিষাক্ত মায়ার জালে। বাইরের জগতের সাথে তাদের সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। লিওনের ফোনটা এখন কেবলই একটা কাঁচ আর প্লাস্টিকের খেলনা, যা নেটওয়ার্কের অভাবে কোনো কাজে আসছে না।
হিয়ার মনে হলো, ছকের প্রতিটি গুটি তার পরিকল্পনা মতোই জায়গা মতো বসেছে। সে কুপির সলতেটা একটু উঁচিয়ে আগুনের তেজ বাড়িয়ে দিল। কুঠুরির ভেতরটা উজ্জ্বল হতেই সে আরও একটু এগিয়ে লিওনের ঠিক পাশেই গিয়ে বসল। আগুনের মৃদু আঁচে হিয়ার ছায়াটা দেয়ালে দীর্ঘ হয়ে লিওনের ছায়ার ওপর আলিঙ্গনের মতো জড়িয়ে রইল।

টং হাউজের ভেতর বাতাসের ঝাপটায় কুপির শিখাটা দপদপ করে নিভে যাওয়ার উপক্রম হলো। সেই মুহূর্তে হিয়া আর লিওন দুজনেই কুপিটা আগলে ধরতে হাত বাড়াল। তাদের হাত গিয়ে পড়ল কুপিটার ওপর, আর কাকতালীয়ভাবে লিওনের হাতের নিচে চাপা পড়ল হিয়ার হাত।
কুপিটার উজ্জ্বল আলো এখন সরাসরি লিওনের মুখের ওপর পড়ছে। এই মায়াবী আলোয় লিওনকে এত বেশি পৌরুষদীপ্ত আর সুন্দর দেখাচ্ছে যে, হিয়া এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। লিওনের ওই শান্ত, অথচ রহস্যময় চাহনি হিয়ার ভেতরের সমস্ত ঠান্ডা হিসেব-নিকেশ মুহূর্তেই গলিয়ে দিচ্ছে।হিয়া তার হাতের তালুর প্রচণ্ড জ্বালাও টের পাচ্ছিল না, তার সমস্ত মনোযোগ কেবল লিওনের দিকে।
হঠাৎ লিওনের খেয়াল হলো, কুপিটার তাপে হিয়ার হাত পুড়ে যাচ্ছে। সে ধপ করে হিয়াকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে নিজেও হাতটা টেনে নিল। তারপর গর্জে উঠল, “আর ইউ ক্রেজি? নিজের হাতটা পুড়ে যাচ্ছে টের পাচ্ছো না?”

হিয়ার হুঁশ ফিরল। সে যথেষ্ট স্ট্রং মেয়ে; জীবনে কত মার খেয়েছে, কত ক্ষত সহ্য করেছে—এই সামান্য পোড়া তার কাছে নস্যি। কিন্তু এই মুহূর্তে সে সেই ঠান্ডা মাথার খেলোয়াড় হিয়া নয়, সে লিওনের সামনে ওই সাধারণ, অসহায় হিয়া। সে সঙ্গে সঙ্গে হাতের তালু চেপে ধরে ব্যথায় কুঁকড়ে গেল। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল ঝরতে শুরু করল। সে এমন ভান করল, যেন এই অসহ্য যন্ত্রণায় তার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
হিয়া কেঁপে কেঁপে বলল, “আমি… আমি শুধু চেয়েছিলাম কুপিটা নিভে না যাক।”
লিওন দেখল, হিয়ার হাতের তালুর চামড়া লাল হয়ে ফুলে উঠেছে। সে অস্থির হয়ে উঠল। টং হাউজের এই ছোট কুঠুরিতে কোনো ফার্স্ট এইড কিট নেই, এমনকি মলম বা ব্যান্ডেজ—কিছুই নেই। লিওন কী করবে, ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। তার সিআইডি ট্রেনিং তাকে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকা শিখিয়েছে, কিন্তু হিয়ার এই ক্ষত তার মনে এক অজানা অস্থিরতা তৈরি করছে।

হিয়াকে যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখে লিওন আর স্থির থাকতে পারল না। তার সিআইডি-র কঠোর প্রশিক্ষিত মনটা মুহূর্তের জন্য সব যুক্তি বিসর্জন দিল। সে আলতো করে হিয়ার হাতটি নিজের হাতের ওপর তুলে নিল।
“একটু সহ্য করো,” লিওন ফিসফিস করে বলল। তার গলার স্বরে এক অদ্ভুত কোমলতা ছিলো, যা হিয়ার শরীরের প্রতিটি রোমকূপকে শিহরিত করে তুলল। লিওন তখন বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে পাশে থাকা ছোট্ট মাটির কলস থেকে সামান্য জল তালুতে ঢেলে হিয়ার পোড়া হাতের ওপর আলতো করে ছড়িয়ে দিল। ঠান্ডা জলের স্পর্শে জ্বালাটা কিছুটা কমলেও, হিয়ার অস্তিত্ব জুড়ে তখন লিওনের আঙুলের উত্তাপ। লিওনের প্রতিটি ছোঁয়ায় হিয়ার মনে হলো, আগুনের আঁচ থেকেও এই স্পর্শ অনেক বেশি তীব্র, অনেক বেশি নেশাতুর।
টং হাউজের সংকীর্ণ পরিসরে লিওন কাঠের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসেছিল। ক্লান্তি আর মানসিক উত্তেজনায় তার মস্তিষ্ক তখন অবশ। দূরে রিসোর্টের দিকে তাকিয়ে তার কেবল মনে পড়ছিল বাবা, মা আর মায়ার মুখগুলো। কত রাত যে সে ডিউটিরত অবস্থায় কাটিয়েছে, কিন্তু আজকের রাতটা এক অনন্তকালের সমান। চিন্তার রেশটুকু থাকতে থাকতেই লিওন চোখ বন্ধ করল আর এক পর্যায়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
হিয়ার ঘুমানোর কোনো নামগন্ধ নেই। সে পাথরের মূর্তির মতো লিওনের দিকে তাকিয়ে আছে। অপলক দৃষ্টিতে সে লিওনের অবয়বটাই দেখে যাচ্ছে। হঠাৎ লিওনের মাথাটা ডান কাতে ঝুঁকে পড়ল, ঘুমন্ত অবস্থায় টলে পড়ে যাচ্ছিল সে। হিয়া মুহূর্তের দেরি না করে নিজের বাঁ হাতটা বাড়িয়ে দিল। লিওনের ভারি মাথাটা এসে লুটিয়ে পড়ল হিয়ার হাতের ওপর।

টং হাউজের রুদ্ধশ্বাস নিস্তব্ধতায় হিয়া নিজের প্রতিটি শ্বাস আটকে রাখল। লিওন এখন এতটাই কাছে যে, তার হৃদস্পন্দনের প্রতিটি ধাক্কা হিয়ার কানে এসে বাজছে। হিয়ার ডান হাতের আঙুলগুলো অজানাই তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে লিওনের চোখের ঘন পাপড়ির ওপর আলতো করে বুলিয়ে দিল।
হিয়ার ভেতরের তৃষ্ণাটা এখন মরুভূমির মতো দাবদাহ হয়ে উঠেছে। সে এক ঘোর আর নেশায় আক্রান্ত। লিওনের সেই পরিচিত অধরযুগল হিয়ার সামনে রাখা এক বাটি নিষিদ্ধ স্ট্রবেরির মতোই যা তাকে প্রলুব্ধ করছে, ডাকছে। ইশ, যদি এই মুহূর্তে নিজের সমস্ত খিদে মিটিয়ে নিতে পারত! ওর মনে হচ্ছে, এই ঠোঁটজোড়ার সুধা পান না করলে সে হয়তো এই মুহূর্তেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। লোভ আর বাসনার তীব্রতায় তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
হাত দুটো কাঁপছে হিয়ার। খুব ইচ্ছে করছে লিওনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এই তৃষ্ণা মেটাতে, কিন্তু একটা সূক্ষ্ম ভয় বারবার তাকে থামিয়ে দিচ্ছে। যদি লিওন জেগে যায়? যদি তার এই পৈশাচিক আকাঙ্ক্ষার রূপটা লিওন টের পেয়ে যায়?

হিয়া তার আঙুলগুলো সরিয়ে নিল, কিন্তু চোখ ফেরাতে পারল না। আগুনের মায়াবী আলোয় লিওনের মুখটা এখন এক নেশা ধরানো বাস্তব। হিয়ার মনে হলো, এই মানুষটিকে শিকার করার খেলায় সে নিজেই আজ শিকারি হয়ে নিজেকেই বন্দি করে ফেলেছে। সে জানে, এই মুহূর্তের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেই তার সব পরিকল্পনা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। তবুও, নিজের তীব্র বাসনার সাথে লড়তে লড়তে হিয়ার শরীর তখন ঘামছে, আর মনটা বারবার বলছে—এই ‘স্ট্রবেরি’র স্বাদ পাওয়ার জন্য সে কি নিজের সবটুকু অস্তিত্ব বাজি রাখতে পারবে না?
ভোরের প্রথম আলো যখন টং হাউজের কাঠের ফাটল গলে ভেতরে এসে পড়ল, তখনো কুপিটার নিভে যাওয়া সলতে থেকে ধোঁয়ার একটা কুণ্ডলী কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে। সারা রাত হিয়া আবেশে লিওনের মাথার নিচে হাত পেতে বসে ছিল যাতে করে লিওনের এক ফোঁটা ঘুম না ভাঙে।

ভোরের আলো চোখে পড়তেই লিওনের তন্দ্রা ভেঙে গেল। সে চোখ মেলেই দেখল হিয়া তার মাথার নিচে হাত পেতে অচল হয়ে বসে আছে। লিওন মুহূর্তের মধ্যে চমকে উঠে সোজা হয়ে বসল, হিয়া দ্রুত হাত সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু পারল না। দীর্ঘ সময়ের চাপে তার হাতটা পুরোপুরি অবশ হয়ে পাথর হয়ে গেছে; হাতের আঙুলগুলোতে প্রাণের কোনো স্পন্দন আর নেই। সে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে অন্য হাত দিয়ে অবশ হাতটিকে টেনে আনল, তবে লিওনকে বুঝতে দিলোনা, তার ভেতরে যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট, তবে সে আপ্রাণ লুকানোর চেষ্টা করল।
লিওন নিজের হাত দুটো দিয়ে মুখ ঘষল, রাতের সব ক্লান্তি মুছে ফেলতে চাইলো। হিয়ার দিকে তাকিয়ে সে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। হিয়া দাঁতে দাঁত চেপে সেই অনুভূতি আড়াল করে আড়ষ্ট গলায় বলল, “সরি সিনিয়র… আপনি ঘুমের ঘোরে পাশে হেলে পড়ছিলেন, তাই হাতটা রেখেছিলাম।”
লিওন কিছুটা অস্বস্তিতে মাথা নাড়ল। সে ভাবল হিয়া হয়তো মাত্র কিছুক্ষণ আগেই হাতটা রেখেছে। অবশেষে ভোরের আলোয় হিয়া যখন অঘোরে ঘুমিয়ে ছিল, তখন তার অবশ হয়ে যাওয়া হাতটা যন্ত্রণায় মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছিল। কিন্তু সূর্য যখন মধ্যগগনে, টং হাউজের কাঠের দেওয়ালের ফাটল দিয়ে আসা কড়া রোদ হিয়ার চোখে পড়তেই তার ঘুম ভেঙে গেল। সে হাত বাড়াল লিওনকে খোঁজার জন্য, কিন্তু তার হাতের তালু স্পর্শ করল কেবলই শূন্য বিছানা।
লিওন নেই।

হিয়া দ্রুত উঠে বসল, কিন্তু দীর্ঘক্ষণ হাত অচল হয়ে থাকায় তার শরীরটা যেন ঝিম ধরে আছে। চারিদিকে তাকাল সে—টং হাউজটা একদম নিস্তব্ধ। হিয়ার বুকের ভেতরটা একটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে চিৎকার করে লিওনের নাম ধরে ডাকতে লাগল, কিন্তু জঙ্গলের নিস্তব্ধতা ছাড়া কোনো উত্তর নেই। হিয়ার প্যানিক অ্যাটাক শুরু হয়ে গেল। সে পাগলের মতো গাছ থেকে নিচে নেমে এল। ঝোপঝাড় ঠেলে এদিকওদিক ছুটতে লাগল সে। একসময় হাঁটুর জোর হারিয়ে সে বনের মাটিতে হাঁটু ভেঙে পড়ল।
তার চারপাশটা ভনভন করে ঘুরছে। হিয়ার চোখে অন্ধকার নেমে আসছে। সে নিজের চুলগুলো খামচে ধরে বিড়বিড় করে উঠল, “কোথায় গেল ও? লিওন! যদি ওর কিছু হয়ে যায়… আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। ওর কিছু হলে, আমি তো মরে যাব!”

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৯

হিয়ার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। যে ভাইপার মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘোরে, সে আজ একটা মানুষের অনুপস্থিতিতে মৃত্যুর মুখ দেখছে। লিওনের অস্তিত্ব ছাড়া হিয়ার কাছে পুরো পৃথিবীটা এখন একটা অর্থহীন শ্মশান। সে কাঁদছে না, সে ভেতরে ভেতরে মরে যাচ্ছে।

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here