আমার বোবাফুল পর্ব ১
তৃপ্তি এহসান নাওরা
“আশ্রীতা হয়ে বাড়ির মালিককে ভালোবাসার কথা মুখ ফুটে বলতে তোর একবারো বুক কাঁপলো না?ওটা নাহয় পরের বিষয় কিন্তু এটা কী করে ভাবলি যে তোর মতো একজন বোবাকে আমার লাইফ পার্টনার করবো? নিজেকে আর আমাকে দাড়িপাল্লায় মেপেছিস কখনো?কী আছে তোর মাঝে?না আছে জন্ম পরিচয়,না আছে কন্ঠস্বর!এই যোগ্যতা নিয়ে রকস্টার আসফিয়ান বর্ণ’র সামনে দাঁড়িয়েছিস ভালোবাসার দাবি নিয়ে ?হোয়াট অ্যা নাইস জোক ইয়ার! আবার বড় মুখে বলছিস আমি যেনো মিশ্মিকে বিয়ে করতে না করে দেই? আমি কাকে বিয়ে করবো,না করবো সেটার ডিসিশন ঠিক করে দেয়ার তুই কে, হ্যাঁ?
হিংস্র কন্ঠে হিসহিসিয়ে বলা বর্ণের একেকটি কথায় সম্মুখে আলুথালু পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা অশ্রুসিক্ত সুখের বক্ষপিঞ্জরে যেনো তীর বিদ্ধ হচ্ছিলো নির্ভুল নিশানায়।মনে হচ্ছে কেউ অনবরত ছুড়ি চালাচ্ছে কলিজায়।পাঁজরটা বুঝি এখনি ছিঁড়ে ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে।কী বললো বর্ণ?সে এবাড়ির আশ্রীতা?কই আগে তো কেউ উল্লেখ করেনি? এতো দিন জেনে এসেছে –সে এ বাড়ির ছোট কর্তা তামিজ শিকদারের একমাত্র মেয়ে ফারিসতা সুবহান সুখ।মা রুবাইয়্যাত সুলতানার চোখের মণি। তাদের আদর যত্ন,সে একটু চোখের আড়াল হলেই তাদের হাহাকার দেখে তো কবু মনে হয়নি তাতে খুঁত আছে।
সুখ এক মূহুর্তের জন্য মন মস্তিষ্ক থেকে সেটা বের করে দিলো।একটু স্বার্থপর হলো। শেষ বারের মতো চোখের পানি বাঁধাহীন ছেড়ে দিয়ে হাত নেড়েচেড়ে মাথার চুল খামচে বুঝালো,
“ প্লিজ বর্ণ ভাই! আপনি এই বিয়েটা ভেঙ্গে দিন।আমি আপনাকে ভীষণ ভালোবাসি। আপনার পাশে অন্য কাউকে দেখা তো দূর কল্পনা করলেও আমার দম আটকে আসে। শ্বাসকষ্ট হয়।আমি সব কথা শুনবো আপনার।যা বলবেন তা মাথা পেতে নেবো -তবুও আপনি বিয়েটা ভেঙ্গে দিন ”
বর্ণ নির্বিকার চোখে কপাল কুঁচকে তার দিকে চেয়ে রইলো।কোন ভাবাবেগ হলো বলে মনে হয়না। উল্টো সুখের অশ্রুধারা,তার উম্মাদনা যেনো উপভোগ করছে সে। মুখ বাঁকিয়ে গাল চুলকে ড্রেসিং টেবিলে হেলান দিয়ে আয়েশিভঙ্গিতে বসে বর্ণ।সুখ তখনো অনুনয় বিনয় করে যাচ্ছে হাত জোড় করে।এই মূহুর্তে নিজের উপর বড্ড করুনা হচ্ছে সুখের। ইশশ্ তার যদি কথা বলার শক্তি থাকতো। চিৎকার করে বর্ণকে বলতে পারতো –আমি আপনাকে ভালোবাসি বর্ণ।যতটা ভালোবাসলে গাছের পাতারাও নড়চড় বন্ধ করে স্থির হয়ে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকবে আমার ভালোবাসায়।ঠিক ততোটাই ভালোবাসি –যতটা ভালোবাসলে সাগরের উত্তাল গর্জনে শীতলতা ধরা দেবে এক লহমায়। ততোটাই ভালোবাসি -যতটা ভালোবাসলে পাথর বুকেও ফুল ফুটবে। ততোটাই -যতটা ভালোবাসলে স্বয়ং আপনারই নিজের প্রতি হিংসা হবে -এতোটাও ভালোবাসা পাওয়া উচিৎ নয় বলে!
বর্ণ লাইটার জ্বালিয়ে সিগারেটের আগায় ছোঁয়ালো। দুবার সুখটান দিয়ে পরপর নিকোটিনের ধোঁয়া গুলো ছুঁড়ে দিলো সুখের চোখে মুখে। মেয়েটা মৃদু স্বরে কেশে উঠে তৎক্ষণাৎ।এই বাজে ধোঁয়া সহ্য হয়না তার। শ্বাসরোধ হয়ে আসতে চায়। অন্যদিন হলে সে এক ছুটে বেরিয়ে যেতো কিন্তু আজ হজম করে নিলো সব বিষাক্ত ধোঁয়া টুকু। করুন চোখে,একটু আশা নিয়ে বর্ণের ধূসর মণি যুক্ত চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তাকে একটু ভালোবেসে আগলে নিলে খুব কী ক্ষতি হয়ে যাবে? বেশি বেশি তো চাইছে না। ব্যাস এইটুকুনি।
বর্ণ উঠে এলো ধীর লয়ে। চোখের দৃষ্টি শান্ত নদীর মতো শীতল।সুখ মাথা নামিয়ে নেয়।
“ শুনে রাখ -আমি মিশ্মিকেই বিয়ে করবো। এক ছাদের নিচে থাকবো,ওর সাথে একবেডে ঘুমাবো,ওকেই গভীর ভাবে ছুঁয়ে দেবো।এতো এতো ভালোবাসবো যে…
দুহাতে জামা খামচে ধফ করে চোখ খিচে নেয় সুখ। একবিন্দু অশ্রু কণা গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে।বর্ণ কী যানে – তার একেকটা শব্দে সুখের ছোট্ট হৃদয় কতোটা ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে? কিছু মূহুর্তের জন্য তার
মৃ!ত্যু সাধ গ্রহণ করার ইচ্ছে জাগছে? উফফ্ মাটি ফাঁক করে যদি এই ছোট দেহ খানি সেখানে লুকিয়ে ফেলা যেতো!
কথাগুলো বর্ণ সুখের কানে কানে বলছিল ।সে মাঝপথেই থেমে গেলো সুখের মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে।পরপর দাঁতে দাঁত নিষ্পেষিত করে ধমকে উঠলো হিংস্র মিশ্রিত রুক্ষ স্বরে,
“ গেট আউট ফ্রম হেয়ার!আই সেইড গেট আউট!নেক্সট টাইম যেনো আমার ত্রিসীমানায় তো তোকে না দেখতে পায়।একটু হেসে হেসে কথা বলেছি –আর ওমনিই দাবি নিয়ে এসেছে ভালোবাসার।”
কন্ঠে জোর ঢেলেই বলছিল বর্ণ। মেয়েটা কেঁপে কেঁপে উঠে প্রতিটি বাক্যে।ভেজা নেত্র পল্লব তুলে তাকায়। মেঘাচ্ছন্ন আকাশের বুক থেকে যেমন বর্ষার বৃষ্টি ঝড়ে পড়ে টুপটাপ –সেভাবে ঝড়ছিল তার অশ্রু মালা।সুখ বুঝে নিলো বর্ণ কোনোদিন বুঝবে না তার নীরব অদৃশ্য নিরব ভালোবাসা।সে চোখের জল মুছে পা বাড়ায় দরজার অভিমুখে।
“ খবরদার যদি ছোট চাচ্চু অথবা অন্য কাউকে বলেছিস আমি তোকে আশ্রীতা, জন্ম পরিচয় হীন বলেছি।”
সুখ ফিরতেই বর্ণ অন্যদিকে চেয়ে চুলে হাত মালিশ করে বললো,
“ যদি তোর ভালোবাসা বিন্দু পরিমাণ সত্যিকারের হয়ে থাকে!”
সুখকে আবার এগিয়ে আসতে দেখে বর্ণ ভ্রু গুটিয়ে তাকায়। আবার কেন আসছে এই বোবাফুল?তার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ালো সুখ।হাত নাড়িয়ে নিজস্ব ভাষায় বলতে শুরু করে,
“ এমন একদিন আসবে –আপনি একটু হাত চাইবেন আমার।একটু কথা বলতে পাগলের মতো ছুটবেন আমার পিছু। একবার ভালোবাসি শুনতে নিজের মুখ থেকে হাজার বার ভালোবাসি শব্দটা উৎসর্গ করবেন। কিন্তু সেদিন অনেক দেরি হয়ে যাবে।আমি সেদিন পাগলা প্রেমিকা হয়ে আপনার ইশারায় ফেরত আসবো না।এতো এতো দূরে হারিয়ে যাবো যে … ”
পুণরায় চোখের কৌটায় জল ভরে এলো তার।বর্ণ সুখের সব ভাষা বুঝে না।তবে কিছু কিছু বুঝে গিয়ে পুরোটায় বুঝে নিতে পারে কেনো যেনো।সে হাসলো তাচ্ছিল্য।সে নাকি একদিন ভালোবেসে দেওয়ানা হবে এই বোবা ফুলের জন্য? এরচেয়ে হাস্যকর আর কী হতে পারে।বর্ণ বুকে হাত গুঁজলো।বললো বিদ্রুপ স্বরে,
“ যদি কখনো ভালো না-ই বাসি?”
সুখ তৎক্ষণাৎ বুকের বাঁ পাশে হাত রাখলো। এবং পরপরই পাঁচ আঙুল মুঠ পাকিয়ে বর্ণকে দেখালো –তার অন্তরের দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস। ঠোঁট বাঁকিয়ে বর্ণ হাসলো সের্ফ।মানতে হবে -বোবাফুল শুধু বোবা নই,সাথে বোকাও আছে! তাকে ভালোবাসার তাকদ দেখাচ্ছে!হাউ সিলি।
বাড়ির বড় কর্তা আযাদ শিকদারের অবাধ্য,জিদ্দি, রগচটা ছেলেটা আশফিয়ান বর্ণ।মা আইজা খানমের ইচ্ছে ছিল ছেলে তার ডাক্তার হবে,বাবার পছন্দ ইন্জিনিয়ার। কিন্তু ফাঁকফোকর দিয়ে অবাধ্য বর্ণটা নিজের স্বপ্নের পথে হেঁটে এসেছে দিনের পর দিন।আজ সে রকস্টার।সুরেলা কন্ঠর বদৌলতে দেশে
বিদেশে তার সুনামের ছড়াছড়ি।লক্ষ লক্ষ ফ্যান ফলোয়ার্স।হাজারো মেয়ে যাকে নিয়ে দিবাস্বপ্ন দেখে। একটা সেলফি নিতে যুদ্ধ লাগিয়ে দেয় –কে আগে নিবে।সেই বর্ণ নাকি একদিন এই বোবাফুলের নৈকট্য পেতে উম্মাদ হবে?এও সম্ভব ইহজীবনে?
সুখের চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিলো বারে বারে।সে তবুও ফ্লোরে উবু হয়ে কালো কালিতে অঙ্কিত কাগজের টুকরো তিনটে কুঁড়িয়ে নিলো। এখানে তার তিন বছরের লুকায়িত অনুভূতি,আবেগ, ভালোবাসার কথা মন উজাড় করে একেকটা শব্দ বুনেছিল সে। অথচ বর্ণ এক নিমেষেই সব পায়ের তলায় পিষে দিলো। একটুও কী মায়া হয়নি?এতোটাও নিষ্ঠুর হওয়া যায় বুঝি?
শেষ বারের মতো একবার নিরুত্তাপ বর্ণকে দেখে বেরিয়ে এলো সখ।চোখের অশ্রু মুছে নিল হাতের উল্টো পিঠে।অপর হাতে আঁকড়ে ধরে আছে ছেঁড়া কাগজের টুকরোগুলো।সে এগিয়ে চললো অগ্রভাগে।এই রুমের সামনে,রুমের অধিকারী পুরুষটির সামনে কখনো আসার সুযোগ হবে কী না কে জানে।হয়তো না।সে সজ্ঞানে আর আসবে না।
পথিমধ্যে মিশ্মির মুখোমুখি হয় সুখ।বর্ণের কাছে যাচ্ছে বোধহয়।সুখকে দেখে প্রতিবারের মৃদু হাসলেও মিশ্মির সাথে তাল মেলানোর ইচ্ছে হলো না তার।সে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো আগে।মিশ্মি কপাল কুঁচকে তাকায়।তাকে ইগনোর করলো না মেয়েটা?বোবাটার হঠাৎ এতো দেমাগ উদয় হলো কোত্থেকে।
বর্ণের রুমের দিকে হাটা ধরলো মিশ্মি।ওই সুখ না দুঃখের দেমাগ দেখার টাইম আছে নাকি তার? নেহায়েৎ বর্ণের পরিবারের সদস্য বলে ভদ্রতা বজায় রেখে কথা বলতে হয়।
বর্ণের মতোই মিশ্মিও একজন ফিমেল সিংগার। একইসাথে বহুবার কাজ করেছে।সেই সূত্রের তাদের পরিচয়। অতঃপর বন্ধুত্ব।সেই থেকেই সম্পর্কের এতো দূর।হাতে মাত্র পনেরো দিন বাকি –তারপরেই পৃথিবীকে জানিয়ে দুজন দুজনার হয়ে যাবে।
সুখ পেছনের তিন জোড়া উৎসুক দৃষ্টি পেছনে ফেলে মায়ের কক্ষে এসে থামলো। রুবাইয়্যাত তখন শাড়ি ভাঁজ করে কাভার্ডে তুলে রাখছিলেন।মেয়েকে দেখে সহাস্যে হাত নেড়ে জিজ্ঞেস করলেন,
-“ কিছু বলতে চাও”
সুখ তখন ঘাড় বাঁকিয়ে অপলক চোখে ভদ্রমহিলাকে পরখ করতে ব্যস্ত।বর্ণ বলছিল –সে নাকি জন্ম পরিচয় হীন,আশ্রীতা।তাহলে এই ভদ্রমহিলা কে?উনার সাথে কীসের সম্পর্ক? আচমকা এক কাণ্ড ঘটিয়ে বসলো সুখ। হঠাৎ করেই…
