আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৯
ইসরাত জাহান দ্যুতি
বেলের শরবতটা দুই গ্লাস ভর্তি করে, সাথে আরও কিছু ফলমূল, মিষ্টি নিয়ে দীধিতি ট্রে হাতে নাওফিলের ঘরের সামনে এলো। দরজায় ঠকঠক করে অনুমতি চাইল, ‘ভেতরে আসব?’
তাবাসসুমকে নিয়ে নাওফিল ঘরের বেলকনিতে এসে বসেছে মিনিট পনেরো হলো। কথাবার্তা খুব বেশিদূর এগোয়নি তাদের। তাবাসসুম কিছুটা জড়তা থেকে কথা বাড়াতে পারছে না আর নাওফিলের কিছু বলতেই মন চাইছে না। তাবাসসুমের মুখটাও ঠিকমতো দেখেনি সে। যে দু’তিনবার তাকিয়েছিল কথা বলতে, তার সময় কয়েক সেকেন্ড মাত্র। মেয়েটা সুন্দর দেখতে বটে৷ শেখ বাড়ির বধূদের সুন্দরী তো হতেই হবে। এটাই প্রথম শর্ত৷ কিন্তু নাওফিলের সকল আকাঙ্ক্ষা, সকল চাহিদা তো দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা ওই একজন সুন্দরীতেই আবদ্ধ হয়ে আছে। তার থেকেই এখন অবধি ছুটে আসতে পারেনি, তাকে পাওয়াই হলো না! সেখানে দ্বিতীয় কারও মাঝে আটকা পড়বে কী করে?
দীধিতির আওয়াজ পেয়ে নড়েচড়ে বসল নাওফিল, ভেবেছিল এগিয়ে গিয়ে নাশতার ট্রেটা নিয়ে আসবে৷ কিন্তু সেটা মোটেই করবে না সে। গলা ছেড়ে বলল, ‘আসুন, ভাবিজান।’
চোখ বুজে বড়ো এক নিঃশ্বাস টেনে দীধিতি ঘরে আসলো। নাশতার ট্রেটা রেখে বেরিয়ে আসতে চাইলে তাবাসসুম আবারও অনুরোধ করল, ‘বসুন না ভাবি আমার পাশে!’
নাওফিল নিজেও বলল, ‘আমাদের সাথে বসুন, ভাবিজান। কথাবার্তা এগোবে তাহলে আমাদের।’
দীধিতি ম্লান মুখে হাসল, ‘আমি রুফটপে যাব। ফোন আসছে উপর থেকে। তোমরা কথা বলো। এমনিতেই কথা এগোবে।’ বলে আর ওদের উত্তর শোনার অপেক্ষা করল না। দ্রুত বেরিয়ে এলো।
নাহ, তারপরও খু্ব বেশি কথা এগোয়নি ওদের মাঝে। রাত সাড়ে দশটায় রান্নাবান্না যতটুকু হয়েছে তাই দিয়েই তাবাসসুমকে আপ্যায়ন করতে হলো দীধিতির, ঐশীদের সঙ্গেও নিজেই পরিচয় করিয়ে দেয় তাকে।
আর নাওফিল! রান্নাঘর থেকে দীধিতির সাথে তার শেষ দৃষ্টি বিনিময় ছিল৷ এরপর তাবাসসুমের প্রয়োজনে কথা বললেও এক পলকের জন্যও সে আর দীধিতির দিকে চোখ তুলে তাকায়নি। মন থেকেই কি সে কবুল করে নিলো দীধিতিকে ভাইয়ের বউ হিসেবে?
কিন্তু দীধিতি শতবার, সহস্রবার সকলের চোখের আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে গেছে নাওফিলকে। তাবাসসুমের সাথে আলাপের পর থেকে তাবাসসুমকে নিয়ে নাওফিলের মাঝে কতটুকু ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সেটাই বোঝার চেষ্টা করে আর বুঝতেও পারে, প্রচণ্ড শক্ত হৃদয়ের নাওফিল তাবাসসুমকে নিয়ে ভাবনা তার যথেষ্ট স্পষ্ট আর হয়ত হ্যাঁধর্মীও। দীধিতির প্রত্যাখ্যানকে অন্তরে পুঁজি করে রেখে দুঃখবিলাস করে বেড়ানো ছেলে নাওফিল শেখ নয়। তার এই আচরণটা অবশ্যই দীধিতিকে আনন্দিত করার কথা ছিল। কিন্তু ওই মুহূর্তে দীধিতির অন্তর হিংসায় জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যেতে চাইল যেন। নিজের মনের এই কদর্য বৈশিষ্ট্যের কথা জানায় ছিল না ওর। শেষ অবধি তাবাসসুমকে আর নিতে পারেনি সে! নিজের ধৈর্যের প্রতি বিশ্বাস হারায়। যদি তাবাসসুম মেয়েটার সঙ্গে অসাদচরণ করেই ফেলে! তাই তন্বীকে আর ঐশীকে তাবাসসুমের দিকে লক্ষ রাখতে বলে সে নির্জনে এসে একাকী বসে থাকে।
এগারোটা বাজার কিছু সময় আগেও নাওফিল জানত না তাবাসসুমের সাথে আরও কিছু সময় তাকে অতিবাহিত করতে হবে। স্বয়ং মাহতাব শেখ থেকে কল আসে তার কাছে। তাবাসসুমকে সহিসালামত পৌঁছে দিয়ে আসার হুকুম করেন নাওফিলকে। তিনি এভাবে এত রাত করে ওদের দুজনের সাক্ষাৎ করাটা একদমই পছন্দ করেননি৷ নেহাৎ ইয়াসিফ খুব অনুনয় করেছিল বলেই মাহতাব শেখ তার ব্যক্তিগত সহকারী অর্থাৎ তাবাসসুমের বাবা আমিনুলকে জানান, নাওফিল তার মেয়ের সাথে নিজের বাসায় কথা বলতে চায়৷ সেখানে তাওসিফের হবু বউসহ নাওফিলের বন্ধু, বন্ধুরের স্ত্রীরাও থাকছে পিকনিকের উদ্দেশ্যে। রাত বেশি হলেও নাওফিল নিজ দায়িত্বে তাবাসসুমকে পৌঁছে দেবে, এ কথাও দেন তিনি আমিনুলকে। আমিনুলের বয়সটা মাহতাব শেখের ছোটো ছেলে জায়িনের সমবয়সীই।
মাহতাব শেখ কৈশরের এতিম আমিনুলকে নিজের মনমতো গড়েপিঠে তৈরি করেছেন। বিয়েও দিয়েছিলেন নিজের পছন্দসই মেয়ের সাথে। আমিনুলের দু’টি কন্যা। তবে ছোটো কন্যা তাবাসসুমকে স্কুলে পড়াকালীন দেখার পর থেকে মনেমনে মাহতাব শেখ মেয়েটাকে নিজের যে কোনো একজন নাতির জন্য ভেবে রেখেছিলেন। তাওসিফ আর ইয়াসিফের জন্য ওদের মা রত্না নিজে মেয়ে পছন্দ করবেন বলে ওদের কারও সাথে আর তাবাসসুমকে নিয়ে ভাবেননি। শেষমেশ নাওফিলের জন্য বছরখানিক আগেই প্রস্তাব রাখেন তিনি আমিনুলের কাছে। তাবাসসুম তখন অনার্স তৃতীয় বর্ষে। নাতিকে সময় সুযোগ করে বহুবার তাবাসসুমের সাথে দেখা করতে বলেছিলেন। কিন্তু নাওফিল কোনো না কোনো অজুহাত সৃষ্টি করে গেছে এই নির্দেশের বিপরীতে। তারপর হঠাৎ মাহতাব শেখকে চমকে দিয়ে নাওফিল নিজেই আজ সন্ধ্যায় জানায়, সে দেখা করতে চায় তাবাসসুমের সাথে। যদি কথাবার্তার পর পছন্দ হয় তবেই বিয়েতে মত দেবে। নয়ত তাকে জোর করতে পারবে না কেউ। এ কথার পরই আজ রাতেই দুজন দেখা করে।
পিকনিক শেষ হতে হতে রাত বারোটা বেজে গিয়েছিল। তাই আর বাসায় ফেরা হয়নি কারও। নাওফিলের ফ্ল্যাটটায় সবগুলো ছেলেরা রয়েছে আর রুমান ঐশীর ফ্ল্যাটটায় দীধিতিরা চার বান্ধবী এসে থাকছে। রাত দুটো অবধি তাদের চার বান্ধবীদের মধ্যে গল্প চলতে চলতে এক সময় ওরা ঘুমিয়ে গেলে দীধিতি ফোনটা হাতে নিয়ে গেস্টরুমে চলে আসে। তারপর থেকেই সে ঘরটা আলো আঁধারি করে বিছানার মাঝে চুপচাপ বসে আছে।
চার ঘণ্টা আগের একটা সাধারণ সুন্দর মুহূর্ত। তাবাসসুমকে পৌঁছে দিতে নাওফিল যখন ওর জন্য গাড়ির দরজা খুলে দেয়, তাবাসসুম উঠে বসার সময় তখন ওর বোরখার পেছনের ঘেরের অংশটুকু দরজার বাইরে ঝুলে থাকলে নাওফিল তা খুব যত্নের সঙ্গে কুড়িয়ে নিয়ে মৃদু হেসে তাবাসসুমকে বলে, ‘বোরখাটা গুটিয়ে বসুন।’
মুহূর্তটা সকলের চোখে একদমই সাদামাটা হলেও দীধিতির কাছে তা দুঃসহ অনুভূতি। ও মানতেই পারছে না তাবাসসুমকে দেওয়া নাওফিলের মৃদু হাসি, তাবাসসুমের প্রতি নাওফিলের খেয়াল রাখা। এসব থেকেই স্পষ্ট ওরা দুজন দুজনকে খু্ব পছন্দ করেছে। হয়ত তাওসিফ আর তার বিয়েটার পরই নাওফিলের বিয়ে নিয়ে তোড়জোড় শুরু হবে।
জাইমার সঙ্গে আজ সারাদিনে যোগাযোগ হয়নি৷ জাইমা জানেনও না দীধিতি আজ শেখ বাড়িতে গিয়েছিল। তাকে জানানো জরুরি৷ সঙ্গে আরও অনেক কিছু আলোচনা করা জরুরি। রাতের গভীরতার দিকে খেয়াল না করে দীধিতি নিজের কথাগুলো মেইল করে পাঠাল জাইমাকে। এখন তো জাইমা ঘুমিয়েই নিশ্চয়ই। জেগে ওঠার পর দেখবেন তিনি। কিন্তু দীধিতির যে এখনই কথা বলা দরকার ছিল। আজ রাতে ঘুমের হদিস সে পাবে না।
কতক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে দীধিতি বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। ভূতের মতো আঁধারে ডুবে থাকা সারা ঘর হেঁটে বেড়ায়, কখনও বসার ঘরের সোফায় গা এলিয়ে বসে থাকে, ঝিমিয়ে আসা মনটা নিয়ে আবার ঐশীদের ঘরটাতে যায়। ভাবে, ওদের ডেকে তুলে নিজের বুকের ভেতরে লুকিয়ে রাখা গল্পগুলো, দুঃখগুলোকে জানাবে ওদের। খুব কথা বলতে মন চাইছে ওর কারও সাথে…সব কিছু কাউকে একজনকে বলতে মন চাইছে…যা কখনও বলা হয়নি কাউকেই।
ফিরে এলো আবার গেস্টরুমটাতে৷ ফোনের আলো জ্বলছে নিভছে দেখে দ্রুত এগিয়ে এসে দেখল জাইমা কল করছেন। রাত এখন তিনটার ঘরে। তিনি কি জেগেই ছিলেন? দ্রুত ফোনটা তুলে রিসিভ করে কানে ধরল, ‘মাম্মাম! তুমি ঘুমাওনি?’
খুব ব্যাকুলতা কণ্ঠে দীধিতির। তা খেয়াল করে জাইমা চিন্তিত গলায় বললেন, ‘ওয়াশরুম যাবার তাগিদে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল৷ তুমি আজ সারাদিনে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করোনি, কোনো মেইলও করোনি৷ তাই মনে করেই মেইল বক্স চেক দিলাম আর হঠাৎই তোমার মেইলটা পেলাম। কী লিখেছ এসব, মাম্মাম? তুমি হুঁশে আছ তো? আর তোমার শরীর ঠিক আছে?’
ধপ করে বিছানাতে বসে পড়ল দীধিতি। পরাস্ত, অসহায় সুরে বলে ফেলল, ‘আমি মরেই যাব, মাম্মাম। নাওফিলকে আমি হয়ত খুব ভালোবাসি।’
কয়েক পল মৌন রয়ে গেলেন জাইমা। ফোনের ওপাশ থেকে দীধিতির ফুঁপিয়ে কাঁদার চাপা কণ্ঠ টের পেলেন। তিনি দ্রুত বলে উঠলেন, ‘ভালোবাসার অনুভূতি প্রচণ্ড পীড়াদায়ক, মা! আমি জানি…আমি বুঝি…তোমার মনের কষ্ট আমি উপলব্ধি করছি। আমি হয়ত তোমার কাছে থাকলে তোমার ভালোবাসার অনুভূতি আরও আগেই বুঝতে পারতাম। কিন্তু তুমি হঠাৎ করে কীভাবে নাওফিলের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়লে? তাওসিফকে ট্র্যাপে ফেলার সময়ও তো বলোনি এমনটা।’
-‘নাওফিল! এই নাওফিল ছেলেটার প্রতি আমি বোধ হয় সেই শুরু থেকেই আসক্ত হয়ে পড়েছিলাম। এমনি এমনি নয়, হয়ত ওর জন্য হওয়া অনুভূতির টানেই আমি ছুটে যেতাম ওকে দেখতে। চার বছর ধরে একটু একটু করে এই অনুভূতি বিশালতা ধারণ করেছে৷ আমি ওকে অসীম ভালোবাসি তা তো উপলব্ধি করলাম আজই। ও অন্য কাউকে নিয়ে সংসার করবে আর তা একই বাড়িতে থেকে আমি কীভাবে সহ্য করব, মাম্মাম?’
-‘রিল্যাক্স, স্মরণ। কাছে থাকলে কষ্ট বাড়ে, টান বাড়ে৷ এ কথা সত্য। তুমি তাওসিফের সঙ্গে সারাজীবন থাকবে না… থাকতে পারবেও না। ওরা থাকতে দেবে না। তুমি যে উদ্দেশ্যে ও বাড়ি যাচ্ছ তা পূরণের পর কি আদৌ তাওসিফ তোমাকে নিয়ে সংসার করবে? বলো?’
দীধিতির চিৎকার করে কাঁদতে মন চাইছে। ও পারছে না নিজের মনের দশা জাইমাকে বোঝাতে। ব্যাখ্যাই করতে পারছে না আজকের পরিস্থিতিটা!
-‘স্মরণ! তুমি নাওফিলকে সত্যিই চাও?’
-‘আজকে থেকে আমরণ চাই, মাম্মাম। তুমি জানো না ও আজকে আমাকে প্রপোজ করেছিল আর আমি ওকে ফিরিয়েও দিলাম।’
জাইমা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘আমার একটা বিগ মিস্টেক হয়ে গেছে। আমার উচিত ছিল নাওফিলকে নিয়ে তোমার ভাবনাগুলো আগে বিস্তারিত জানা। হয়ত তুমি চাইলে এখনও পারবে নাওফিলকে গ্রহণ করতে। কিন্তু সামনের পরিস্থিতিও সহ্য করার জন্য মনটা শক্ত করতে হবে তোমাকে। কোনো সন্তানই চাইবে না নিজের বাবাকে মরতে দেখতে বা জেলে যেতে দেখতে। যেমনটা তুমি পারোনি রেজার মৃত্যু সহ্য করতে। তুমি তো শুধু ওর লাশের ছবি দেখেছ। আর নাওফিল জাকির শেখের ক্ষতিটা, জায়িনের বিরুদ্ধে আরও একবার সারা দেশের ঘৃণিত দৃষ্টি স্বচক্ষে দেখবে৷ সেদিন কি ও মেনে নেবে ওর স্ত্রীর জন্য ওর বাবার ধ্বংস হয়েছে? স্বাভাবিক একটা সংসার সেদিন হবে তোমাদের? আর তার আগে প্রশ্ন হলো তুমিই বা মানতে পারবে তো যেদিন হাতে প্রমাণ পাবে রেজার হত্যা জায়িনই করিয়েছিল আর সহযোগিতাটাও জাকির শেখ করেছিল? সেদিন কি তোমার আর নাওফিলের মাঝে দ্বন্দ সৃষ্টি হবে না? একজন আরেকজনকে শত্রু ভাবতে বাধ্য হবে সেদিন তোমরা। যদি তুমি এই সত্য মেনে নাওফিলের পাশে থাকতে পারো আর ভুলে যাও এই সত্য, তাহলে তুমি নিশ্চিন্তে নাওফিলকে গ্রহণ করো, মাম্মাম। আমি শুধু বর্তমানটা চিন্তা করিনি। আমি আগামীটাও চিন্তা করে তোমার জন্য তাওসিফকে বেছেছি। তুমি জাকির শেখের স্বীকারোক্তি নেবার পর আমি দেশে ফিরব আর ওকে ওর শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থাও করব। শেখ পরিবার তোমার জন্য কখনই সুখের নয়। এই কথাটা বিশ্বাস করতে হবে তোমাকে। তাওসিফের সঙ্গে বিয়েটা ভেঙেও একদিন তোমাকে চলে আসতেই হবে।’
কয়েকটা ঘণ্টার জন্য দীধিতি ভুলেই গিয়েছিল এই সত্যগুলো। এও ভুলে গিয়েছিল, যাকে ও ভালোবেসে গ্রহণ করতে চাইছে সেই মানুষটির বাবাই ওর বাবার হত্যাকারী। এমনকি জায়িন মাহতাব আর তার সেই বন্ধুরাই দায়ী ওর জীবনটা এত এলোমেলো করে দেওয়ার জন্য৷ আর এ কারণেই যে নাওফিলকে দূরে ঠেলে দেওয়া! ওকে এই সত্যটাও মানতে হবে, বাবার হত্যাকারীর ছেলেকে ওই দূরে থেকেই ভালোবাসা যায়। তাকে নিয়ে সুখের সংসার গড়া যায় না। কারণ, সেই সংসারটা ওদের সুখ, শান্তিতে পরিপূর্ণ হবে না কোনোদিনই। প্রতিটি দিন নাওফিলকে দেখলেই বুকটা খামচে ধরবে এই ভেবেই, জায়িন মাহতাবের সন্তান সে। যাকে নাওফিল অফুরন্ত ভালোবাসে।
জায়িন নিখোঁজ হলেও রেজা হত্যার মামলা নতুন করে যখন কোর্টে উঠবে, তখন জায়িনের অপরাধের সকল প্রমাণ পুনরায় সামনে আসবে৷ জাকির শেখও ছাড় পাবেন না যদি সত্যিই তিনি জড়িত থাকেন৷ সেদিনটাই নাওফিল কি পাশে থাকবে দীধিতির? নাহ, থাকবে না। নাওফিল মেনে নেবে না নিজের বাবার বিরুদ্ধে আবারও কোর্ট মামলা হওয়া, সারা দেশের কাছে নিজের বাবার আরও একবার অপমান আর জনসাধারণের কাছ থেকে ঘৃণা পাওয়া।
যশোর ফিরে দীধিতি ঝুমুরকে নিয়ে, বোনকে নিয়ে আর সৌরভের পরিবারকে নিয়ে ফিরে এলো ঢাকাতে। সৌরভ একা একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েই থাকত। তার কাছে এসেই উঠল ওরা। ঝুমুরকে নিয়ে একদিন সৌরভের বাবা-মা শেখ বাড়িতেও গেলেন। কথাবার্তা হওয়ার পর বুঝতে পারলেন, শুধুই বাধ্য হয়ে বাড়ির পুরুষেরা সায় দিয়েছেন দীধিতি আর তাওসিফের বিয়েতে। ও বাড়ির মহিলাগুলো কেউ-ই তেমন সৌজন্যতা দেখাননি ঝুমুরদের সাথে। এরপর আলাপ আলোচনা করে ঠিক হলো, তাওসিফ আর দীধিতির বিয়েটা ঘরোয়াভাবে হবে কাছের আত্মীয় নিয়ে। তারপর ও বাড়িরই ছোটো ছেলের বিয়ে হবে মাস দুই পরই। সেই বিয়েটার পর দুই ভাইয়ের রিসিপশন পার্টি একই দিনে করে দীধিতিকেও সামাজিকভাবে পরিচিতি দেবে শেখ বাড়ির পুত্রবধূ হিসেবে। এ সিদ্ধান্তের কারণ তাওসিফের মা রত্না। তিনি ছেলের বিয়ের কোনো কাজেই থাকবেন না বলে জানিয়েছেন। তাই তাওসিফও নিজের বিয়ে ধুমধাম করে করবে না।
এরপর মাত্র ন’টা দিনের ব্যবধান।
কেবল কাছের আত্মীয়স্বজনেই শেখ বাড়ি গমগম করছে আজ। দীধিতি আর ওর পরিবার আজকে সকালে এসে উপস্থিত হয়েছে গাজীপুরে। মাহতাব শেখের কথামতোই ওদেরকে থাকতে দেওয়া হয়েছে অতিথিশালায়। বিয়েটা একই বাড়িতে থেকেই হবে। তাওসিফের মা রত্না তার ছোটো মেয়ে ফিহাকে নিয়ে বাবার বাড়ি টাঙ্গাইল চলে গেছেন গতকালই। তাই সমস্ত দায়িত্ব জাকির শেখের স্ত্রী খুশির এসে কাঁধে পড়েছে। দীধিতির পরিবারের দেখভাল তিনিই করছেন৷
বেলা এগারোটার দিকে ঝুমুর মুখোমুখি হলেন সুহাইল শেখের। প্রথমে চমকে গেলেও পরবর্তীতে খেয়ালে আসে, সুহাইল দীধিতি চাচা শ্বশুর হতে চলেছেন। মাহতাব শেখের ছোটো ভাইয়ের ছেলে সুহাইল। যশোরের জমিদার পরিবারের একমাত্র মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন তার ছোটোভাই। তখন অবশ্য জমিদারি প্রথা ছিল না। কিন্তু দাপট আর তাদের সামাজিক অবস্থান জোরদারই ছিল যশোরে। সুহাইলের মায়ের কোনো ভাই ছিল না বলে এক সময় পারিবারিক ব্যবসায়ের দায়িত্বটা সুহাইলের বাবাকেই নিতে হয়। তাই বাধ্য হয়েই স্ত্রী সন্তান নিয়ে তাকে যশোরে চিরকালের জন্য থেকে যেতে হয়। মাহতাব শেখ ছিলেন চার ভাই, তিন বোন। তিনিই বড়ো। মেজো আর সেজো ভাই মারা গেছেন আরও বহু আগেই। ভাইয়েদের মাঝে বেঁচে আছেনই এখন তিন আর ছোটো ভাইটা। তিন বোনের মাঝে বড়ো যে বোন, তিনিও মারা গেছেন আরও বছর দশ আগে।
সুহাইল আসার পর দীধিতির পরিবারের একজন হয়েই সকল দায়িত্ব নিতে অনুরোধ জানান তিনি ঝুমুরকে। যে দায়িত্বটা রেজা থাকলে করত সেটাই তিনি করতে চান। ঝুমুর তাতে সম্মতি না দিলেও দীধিতি আর কিরণের কথাতে রাজি হন শেষে। তারপর থেকে সুহাইল কাজের ফাঁকে ফাঁকে কতবার যে এসে দেখে যাচ্ছেন ওদের! তা দেখে তামান্নারা তিন বান্ধবী অনেকটাই আন্দাজ করে নেয় সুহাইল আর ঝুমুরের মাঝে না হওয়া সম্পর্কটার ব্যাপার। ঐশী দীধিতির হাতে মেহেদি পরিয়ে দিতে দিতে তন্বী আর তামান্নাকে বলে, ‘তোরা কি খেয়াল করেছিস এই শেখ গোষ্ঠীর সবগুলো পুরুষের মাঝে ক’টা কমন জিনিস আছে?’
তামান্না উত্তর দেয়, ‘আমি আসার পর থেকেই খেয়াল করেছি। এই বাড়ির মেয়েরা যতটা না উজ্জ্বল, তার চেয়ে বেশি উজ্জ্বল ছেলেরা।’
তন্বী কোনো কথা বলছে না। তাওসিফের সঙ্গে দীধিতির বিয়েটা ওর কাছে কেন যেন অস্বাভাবিক লাগছে। এমনকি দীধিতিকেও। নাওফিলকেও অবশ্য চায় না ও দীধিতির পাশে। কিন্তু ওর বান্ধবীর মনের খবর তো ও জানত। কীভাবে নিতে পারছে দীধিতি নাওফিলেরই ভাইকে বিয়ে করতে? যেখানে চব্বিশটা ঘণ্টাই নাওফিল দীধিতির চোখের সামনে থাকবে!
মেহেদি পরা হাতের দিকে চেয়ে আনমনে কণ্ঠে দীধিতি বলল, ‘এই পরিবারের সব পুরুষদের চেহারায় বিশেষ কিছু মিল আছে। যা দেখলেই বোঝা যায় এরা একই পরিবারের ছেলে। আজকে সুহাইল কাকুর মাঝেও সেই মিল লক্ষ করলাম। যা চারটা বছরে লক্ষ করিনি৷’
ঐশী জিজ্ঞেস করল, ‘কী মিল বল তো?’
-‘সবগুলো পুরুষের মুখের কাঠামো লম্বা, একইরকম ছোটো ছোটো চোখ, একদম সামান্য কোঁকড়াচুলো আর গায়ের রং তো আছেই৷ আর দৈহিক উচ্চতাও প্রায় একইরকম। মাহতাব শেখও যে যুবককালে দেখতে বেশ ছিলেন তা বোঝা যায়।’
-‘শুধু পুরুষগুলো সুন্দর! আমি তো দেখি সবার বউগুলোও।’ তন্বী বলল।
তা শুনে দীধিতি জবাব দিলো, ‘এই পরিবারের বউ হওয়ার প্রথম শর্ত তাকে অবশ্যই ফরসা আর সুন্দর হতে হবে৷ যাতে করে এ পরিবারের বংশধরেরাও সুন্দর হয়। আজকেই জানলাম তা। সকালের নাশতা দিতে এসে খুশি আন্টি আম্মুর সাথে গল্প করার সময় বলছিলেন এমন অনেক কথায়।’
-‘ও আচ্ছা, এই জন্যই সবগুলো শেখ দেখতে মাখোমাখো।’ হাসতে হাসতে বলল ঐশী।
মন হালকা করার জন্য দীধিতিও হাসল খুব, গল্প বাড়াতে থাকল নাওফিলের কথা স্মরণে না আনার জন্য। দুপুর হতে হতেই দীধিতিকে বউবেশে সাজাতে আরম্ভ করল তিন বান্ধবী। বিকালের মাঝে বিয়ে সম্পূর্ণ হতে হবে৷
তাওসিফের পছন্দের রং নাকি আকাশ রঙা। তাই দীধিতির পরনে আকাশী রঙেরই ঝলমলে বিয়ের শাড়িটা উঠেছে। শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে গায়ের অধিকাংশ গহনাই সাদা স্বর্ণের আর হীরা, মুক্তার। তবে মাহতাব শেখের কথামতো ফুলস্লিভ ব্লাউজের সঙ্গে মুখে নিকাবও রাখতে হবে। কিন্তু সাধারণ নিকাব কি বউয়ের সাজসজ্জার সঙ্গে মানায়? তাই ঐশী কল করে রুমানকে জানাল, সাদামাটা নিকাব পরাবে না ওরা দীধিতিকে। শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে নিকাবও কারুকার্য শোভিত ঝলমলে হতে হবে। রুমান তা তাওসিফকে কল করে জানালে তাওসিফ এক ঝাড়ি দিয়ে বলে, ‘আমি এসে এখন নিকাবে ডিজাইন করতে বসব? বউয়ের কেনাকাটা যারা করেছে তাদেরকে বল, হারামজাদা!’ বলেই ফোনটা কেটে বন্ধ করে দেয় সে। তান মনমেজাজ বিচ্ছিরি খারাপ। বাড়িতে মা-বোন নেই একেতে, উপরন্তু মিলি মেয়েটাকে বোঝাতে চেয়েছিল যা তা তো বোঝানো যায়-ইনি। আরও তাকে গালাগাল করেছে যাচ্ছেতাই ভাষায়। পর্দানশীল মেয়েদের মুখের ভাষা অমন হয়! লজ্জা, অপমান আর রাগে তাওসিফও গোটা কয়েক গালি দিয়ে বসেছিল তাই। এ জীবনে আর মিলিকে পাওয়া হবে না বলে যতটা রাগ আর দুঃখ হচ্ছে। তার চেয়ে অধিক হচ্ছে নাওফিল আর দীধিতির ওপর।
রুমান তাওসিফের এই পাগল মার্কা আচরণের কথা নাওফিলকে জানালে নাওফিল ঘণ্টাখানিকের মধ্যে কীভাবে কে জানে নিকাবের ব্যবস্থা করে ফেলে। আর রুমানকে দিয়ে তা পাঠিয়েও দেয়। অবশেষে ওই নিকাব মুখে বেঁধে দেওয়ার পর দীধিতির মাথায় বিয়ের ভারী ওড়না আর সোনার তাজ ওঠে। সাজগোজ সম্পূর্ণ হলে পাঁচ, দশেক ছবিও তুলে পাঠিয়ে দেয় তামান্না নাওফিলকে। মেসেজে বলে দেয়, ‘তাওসিফ ভাইয়ার ফোন বন্ধ। তাই আপনাকে দিলাম। ছবিগুলো দেখিয়েন ভাইয়াকে।’
নাওফিলের ফোনটা ইয়াসিফের হাতে ছিল তখন। কাজের ফাঁকে কখন যেন নাওফিল দিয়ে গিয়েছিল ওকে। আজ বোধ হয় একমাত্র নাওফিলই বিয়ে বাড়ির সকল কাজ করে উদ্ধার করে দিচ্ছে! একরত্তি সময় ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে না। আর তাওসিফ শেরওয়ানি পরে প্রস্তুত হয়ে মনের শোক কাটাতে বাইরে কোথাও গিয়ে নিরিবিলি বসে আছে। কারণ, আজকের বিয়েটা সেদিনের মতো নকল হবে না। সেদিন পিকনিকের রাতে ওদের তিনভাইয়ের মাঝে প্রথম কথাটা ছিল নাওফিলের, ‘আজকে শেষ সুযোগ দিয়েছিলাম আমি, দীধিকে। ও তা পেয়েও গ্রহণ করেনি। আমি এরপর আর কোনো নাটক বা খেলা করব না। যা হবে, যেটা হবে, সবটাই সত্য হবে। মিহাদ ভাই, তুই কি দীধিতিকে অপছন্দ করিস?’
তাওসিফ ভ্রু’কুটি করে তাকায়, ‘অবশ্যই। ও অসৎ উপায়ে ঢুকছে আমার বাড়িতে। তাহলে অপছন্দ করা কি গুনাহ?’
-‘ওর উদ্দেশ্য তো অসৎ নয়৷ ওর দিক থেকে তা সৎ। আমি জিজ্ঞেস করছি এ কারণটা ছাড়া কি ওকে অপছন্দ হয়?’
তাওসিফ একটু ভাবে, ভেবে বলে, ‘সৌন্দর্য আর আচার আচরণে বিচার করলে পছন্দ হয় বেশ। কিন্তু দীধিতিকে বউ ভাবতেই আমার উইয়ার্ড লাগে। ওকে দেখলেই আমার ছোটো ভাইয়ের বউ ফিলিংস আসে। আমার মিলিকেই পছন্দ বেশি।’
-‘ভালো তো আর বাসিস না মিলিকে।’
-‘না, তা এখনও বাসি না।’
-‘তাহলে দীধিকে নিয়েই আগামী দিনগুলো সংসার করার মানসিকতা তৈরি কর। আমার দীধিকেই ভাবি হিসেবে চাই।’
এরপর ওদের দুই ভাইয়ের মধ্যে এই একটা প্রসঙ্গ নিয়ে বেশ কথা কাটাকাটি চলে। শেষমেশ ইয়াসিফ সমাধান দেয়, যদি মিলি সবটা জেনে তাওসিফের জন্য অপেক্ষা করতে রাজি হয় তাহলে মিলিই হবে তাওসিফের বউ। বিয়েটা হবে না দীধিতির সঙ্গে৷ হলেও প্রয়োজনে আবারও না হয় নাটকই হবে বিয়েটা! আর মিলি রাজি না হলে দীধিতিকেই বিয়ে করতে হবে তাওসিফকে
তারপর এ কথা মেনে নিয়েই তাওসিফ সাহস যুগিয়ে মিলির সঙ্গে আলাদাভাবে দেখা করে কথাবার্তা বলে সব জানায়। মিলি তখন কোনো প্রতিক্রিয়া না জানালেও বাসায় ফিরে ইচ্ছামতো গালাগাল দেয় তাওসিফকে। এতে তাওসিফ খুব দুঃখ পেলেও নাওফিল বেজায় খুশি হয়। কারণ, দ্বিতীয়বার ও বিয়ে নিয়ে কোনো ফাজলামো বা খেলা করতে রাজি নয়।
ইয়াসিফের একজন বন্ধু আজ বিয়ের কাজী। বাবার পরিবর্তে সে প্রায়ই এই শুভ কাজটা করে থাকে। কিন্তু পেশাতে সে একজন আর্কিটেক্ট, নাম ফারহান জয়। বিকাল চারটার দিকে সে হাজির হলেই জাকির আর জাহিদ তাওসিফকে বাড়িতে ডেকে আনার তাগাদা দেন ইয়াসিফকে। ফোন করে তাওসিফকে পাওয়া যাচ্ছে না বিধায় ইয়াসিফ নাওফিলকে খুঁজতে শুরু করল, ওকে খুঁজে আনার জন্য৷ বাড়ির বাগানে এসে পাওয়া গেল নাওফিলকে। অতিথিদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা এখানেই করা হয়েছে। প্রয়োজন না পড়লেও নাওফিল এসে তদারকি চালাচ্ছে। ছেলেটার মনের হাল আজ বেহাল৷ তা পৃথিবীর কেউ-ই ধরতে পারছে না ওর চেহারা দেখে। যদি ইয়াসিফ ভাইয়ের মনের খবর না জানত তবে সেও নিশ্চিত টের পেত না৷
এক আত্মীয়ার খাবার টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সাথে খোশ গল্পে মেতেছে নাওফিল৷ ওর পাশে এসে ইয়াসিফ দাঁড়াতেই অতিথিদের ভিড়ে থাকা যুবতী মেয়েগুলোর মনোযোগ চুম্বকের মতো এসে আটকে গেল ওদের দু ভাইয়ের মুখখানিতেই। তাওসিফের সাদা আর আকাশী রঙা শেরওয়ানির সঙ্গে মিলিয়ে ওরা দু ভাইও আজও ঝলমলে নকশার আকাশি রঙা পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা পরেছে৷ উজ্জ্বল আর সুঠাম শরীরে চমৎকার দেখতেও লাগছে ওদের।
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৮ (২)
ইয়াসিফ নাওফিলের কানেকানে বলল, ‘বাংলোতে গিয়ে ডেকে আন তাওসিফকে। ফারহান চলে এসেছে বিয়ে পড়াতে। বাবা আর বড়ো কাকু খুঁজছে তাওসিফকে।’
হাসি হাসি মুখটা চকিতেই মেঘমেদুরে ঢেকে গেল নাওফিলের৷ আবার চট করে কঠোর, গম্ভীর অভিব্যক্তিটা সামলেও নিলো, বলল, ‘দীধির কাছে নিয়ে যা ফারহান ভাইকে। আপাতত একদিকের কাজ এগিয়ে রাখুক৷ আমি ডেকে আনছি তাওসিফকে।’
