আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২১
ইসরাত জাহান দ্যুতি
-‘আমি এইসব ঝামেলা বেশিদিন নিতে পারব না। তোদের কাজ হওয়া মাত্রই আমাকে মুক্তি দিবি। নিহাদ বল, তোর কাজ কতদূর?’
নিহাদ রাতভর চুরি করে ভোরবেলা এসে ঘুমিয়েছিল কিছুক্ষণ। তাওসিফের কল এলে ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখদুটো খুলে শুধু কলটা রিসিভ করে। তারপর ওভাবেই কানের ওপর ফেলে রেখে আবার ঘুমিয়ে যায় সে। তাওসিফ আবার ডাকে, ‘নিহাদ? কথা বলিস না কেন?’
-‘ভাই, ও ঘুমিয়ে মরে গেছে। তুই কল কেটে আবার কল দে।’
-‘তাহলে ওকে এখন ঘুমাতে দিই, জাদ। বেচারা ঘুমকাতুরে মানুষ। সেখানে সারা রাত না ঘুমিয়ে কাজ করেছে।’
-‘ঠিক আছে। আর তুই তো আজ তাহলে গাজীপুর যাচ্ছিস, না?’
-‘দাদা বারবার কল করে যেতে বলছেন। অমান্য করলে হয়? কুরুক্ষেত্র বেধে যাবে তাহলে।’
-‘যাবার আগে দীধিকে অবশ্যই বলে যাবি কিন্তু। হাজবেন্ড ম্যাটেরিয়াল হতে চেষ্টা করিস এবার।’
তাওসিফ মহা বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে হতাশার দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলে, ‘এটা হয়, জাদ? ছোটো ভাইয়ের মনের মানুষের সাথে স্বামী স্বামী ভাব জমানো? নিহাদকে দায়িত্বটা দিলি না কেন? ওর বদলে আমি যশোর যেতাম।’
জাদ হাসে, ওর হাসি শুনে তাওসিফ বুঝতে পারে নিজের কথাগুলো কতটা বোকা বোকা ছিল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে। আমি নাই বা হলাম নিহাদের মতো আন্ডারকভার পুলিশ অফিসার। ঘরে ঢুকে সামান্য তথ্যগুলো সংগ্রহ করার জন্য ট্রেনিংপ্রাপ্ত পুলিশই হতে হবে এমন কোনো কথা আছে না কি? এটা চাইলে আমি ট্রেনিং ছাড়াই ঘরে ঢুকে তথ্যগুলো এনে দিতে পারতাম।’
বলা শেষে এই কথাগুলোও নিজের কাছেই তাওসিফের প্রচণ্ড অযৌক্তিক আর কৌতুককর শোনাল৷ ওদিকে ফোনের ওপাশে জাদ নিঃশব্দে হেসেই চলেছে, তা দেখতে না পেলেও তাওসিফ ঠিক বুঝতে পারছে। তাই সহসা ধমকে উঠল ও, ‘হাসি থামা! আমি জাস্ট এমনিই বললাম…মানে মজা করলাম আর কী!’
-‘মাই এল্ডার ব্রাদার মিহাদ ইজ মোর অফ আ সুপারহিরো দ্যান আন্ডারকভার পুলিশ অফিসার নিহাদ৷ আই প্রাউড অফ য়্যু, ব্রাদার।’
তাওসিফ মন খারাপের গলায় বলল এবার, ‘আমি নির্ঝঞ্ঝাট মনের মানুষ। অথচ সারা জীবন তোরা দুইটা সেই আমাকেই সবরকম ভেজালের আগে রাখিস। অদূর ভবিষ্যতে আম্মু আর আব্বু আমাকে বিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন বলে পাত্রীও পছন্দ করে রেখেছেন। শুনেছি মেয়েটা নাকি একদম আমার মনের মতো। আমি যেমন চাই। দাদারও খুব পছন্দ সেই মেয়েটা। আর সেখানে কি না আমি ছোটো ভাইয়ের না হওয়া প্রেমিকাকে নিয়ে ঘর সংসার ঘর সংসার খেলব! এসব ওই মেয়েটা জানতে পারলে আমাকে আর বিয়ে করতে চাইবে? না আমার চরিত্র তার কাছে শুদ্ধ লাগবে? কখনও হারাম সম্পর্কে জড়ালাম না যাতে আমার বিবাহিত জীবনটাই আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি থাকে। তা আর বোধ হয় হবে না।’
-‘ভাই, আমি ফোন রাখছি। তোমার হায় আফসোস শুনলে আমার জীবন বেদনাময় লাগে৷ নিহাদ জাগলেই ওর সঙ্গে কথা বোলো৷ আমি জিমে যাচ্ছি। তিন মাসে প্রচুর ওয়েট গেইন করে ফেলেছি৷ মুখ ফুলে তরমুজের মতো হয়ে গেছে আমার। আল্লাহ হাফিজ।’
তাওসিফ বিদায়ও জানাতে পারল না৷ তার আগেই কল কেটে গেল। ছোটো ভাইদুটো কখনই ওর দুঃখ, কষ্টের কথা শুনতে চায় না কেন? ও সাধারণ মানুষ। সাধারণভাবে সব কিছু চায়। নিজের জীবন, নিজের জীবনসঙ্গী, সব কিছুই। ছোটো থেকেই ওর চাওয়াগুলোও ছিল সাধারণ। তাই ওর চিন্তাভাবনাও অতি সাধারণ। কিন্তু ছোটো দুই ভাই নিহাদ আর জাদের অন্যায়কে আড়াল করতে, তাদের নানান অপকর্মে সহযোগিতা করতে করতে না চাইতেও সব সময় ও-ই জটিলতায় ফেঁসে যায়। এতদিন না মনে হলেও আজ হারেহারে টের পাচ্ছে, বড়ো ভাই হওয়াটা ভীষণ যন্ত্রণার।
-‘আমি রেজার প্রথম স্ত্রী, জাইমা৷ বিয়েটা ছিল আমাদের মাঝে শুধুই একটা সিগনেচার মাত্র। আমার নিরাপদ জীবনের জন্য বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দরকার ছিল। আর সেই দরকারটা পূরণ করেছিল রেজা৷ যদিও সম্পূর্ণ কৃতিত্ব জায়িন মাহতাবের। তিনি মানুষটা যতখানি খারাপ, ঠিক ততখানিই আবার ভালো ছিলেন। কথা দিয়ে কথা রাখা মানুষ। আর বেইমানদের জানে মেরে দেওয়া এক অমানুষ। আয়মানকে তার হতে দিতে সাহায্য করার বিনিময়ে আমি স্বাভাবিক, নিরাপদ জীবন চেয়েছিলাম জায়িনের কাছে৷ তিনি দিয়েছিলেনও তাই। আমি বাংলাদেশে আসার পর আমার সব থেকে ভালো সময় ছিল মাত্র চারটি বছর। তারপরই সব কোথা থেকে কী করে এলোমেলো হয়ে গেল যেন। জায়িন আর আয়মানকে পাশাপাশি কার কাছে কতটা মানানসই লাগত জানি না৷ কিন্তু আমার কাছে শুরু থেকেই মনে হত ওরা একে অপরের জন্য নয়৷ ওরা এক হওয়া মানে শুধুই পাপের ভিত মজবুত হওয়া। শুনলে অবাক হবে, জায়িন আর আয়মানের সন্তান ওদের ভালোবাসার ফল ছিল না। ছিল স্বার্থের ফল। নিজেদের রাজত্ব গড়ে সেই রাজত্ব রক্ষার জন্য বংশধর তৈরি করার উদ্দেশ্যেই সমঝোতা করে সন্তান জন্ম দিয়েছিল ওরা। ওদের মাঝে কোনোদিনও ভালোবাসা ছিল না।
কিন্তু সাইকোপ্যাথ আয়মান সন্তান জন্মানোর পর হঠাৎ একটু একটু করে পালটে যায়। আলিয়ার সঙ্গে পরিকল্পনা করে জায়িনের থেকে পালিয়ে যেতে চায় সন্তান নিয়ে সে বহুদূরে৷ যেখানে খুব সুন্দরভাবে বসবাস করতে পারবে, কোনো শত্রু থাকবে না, মানুষ হত্যা করতে হবে না, বাচ্চা সুন্দর একটা জীবন পাবে। কিন্তু ওই আন্ডারওয়ার্ল্ডে প্রবেশ করলে কি চাইলেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব? জায়িনও কিন্তু একটা সময় চেয়েছিল বেরিয়ে আসতে। কিন্তু পারেনি। একদিন হঠাৎ রেজা দেশে ফিরে আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়৷ আমি চাইছিলাম না আর কোনো ঝামেলা আমার জীবনে আসুক। প্রথমে খুব ইগনোর করতাম। একদিন ও নিজেই আমার ঠিকানা খুঁজে আমার দরজায় এলো, বিধ্বস্ত বেশে। ওর কোলে তখন কয়েকদিন বয়সের হওয়ার একটা প্রিন্সেস। মাশা আল্লাহ, কী যে সুন্দর ছিল বাচ্চাটা! আমাকে রেজা ব্যথাহত, পরাজিত গলায় বলল, “আমাদের কিছুদিন ঠাঁই দেবে, জাইমা?” ওর কোলে ওই ফেরেশতা বাচ্চা, আর ওর ওই অসুখী চেহারার দুর্বল কণ্ঠ আমাকে নরম করে দিলো৷ আমি বাচ্চাটাকে কোলে নিতেই ও বলল, “ওকে ফিডিং করানো দরকার৷ কিন্তু সম্ভব না। অন্য কোনো ব্যবস্থা কী করা যায় আমাকে একটু বলবে? আজ ক’টা দিন গোরুর দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করেছি। পারিনি, আর ও খায়ওনি। খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন।”
আমি কৌতূহল নিয়ে কয়েক পল শুধু রেজাকে দেখেই গেলাম তখন। বাচ্চাটা কেঁদে উঠলে আমি আর কথা বাড়াইনি৷ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতেই সে আমাদের ওকে হাসপাতালে অ্যাডমিট করতে বলে। সাতটা দিন ট্রিটমেন্ট করিয়ে তারপর বাচ্চাটাকে সুস্থ বেশে পাই আমরা। ডাক্তারের থেকে পরামর্শ নিয়ে ওকে বাইরের দুধটাই খাওয়াই৷ প্রথম প্রথম প্রিন্সেসটার খুব কষ্ট হত, পেটে দুধটা সইতো না, অনেক সমস্যা দেখা গেল। বারবার ওকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে ছুটতে হত আমাদের। আমি না চাইতেও একটা সপ্তাহেই বাচ্চাটার স্নেহে জড়িয়ে যাই, জন্ম না দিলেও মা মা অনুভূতি টের পাই নিজের মধ্যে। রেজা বোধ হয় তা বুঝতে পেরেছিল। একদিন সাহস করে বলেই ফেলল, “আমরা কি চাইলে ওর বাবা-মা হতে পারি, জাইমা? আমি জায়িন মাহতাবকে ত্যাগ করেছি।” আমি বিপরীতে প্রশ্ন করেছিলাম অনেক। বাচ্চাটা কে বারবার জানতে চাইছিলাম। ও বলেনি…কেবল আবদার করেছিল যেন ওর বাবা-মায়ের শূন্যস্থান পূরণ করার চেষ্টা করি আমরা। আমি রেজাকে দিনদিন দায়িত্ববান মেয়ে পাগল বাবা রূপে আবিষ্কার করেছি শুধু। দেড়টা বছর আমি আমার স্মরণকে বুকের মধ্যে নিয়ে আগলেছি। কিন্তু আমার ভাগ্যে ওকে নিয়ে সুখের জীবন ছিল মাত্র দেড়টা বছরই। রেজা খুব ভয়কাতর চেহারা নিয়ে একদিন বাড়ি ফিরল। আমার হাত মুঠোর মধ্যে জড়িয়ে ধরে বলল, “জাইমা, আমার জীবনে স্মরণ খুব দামী একটা উপহার।
আমার খুব কাছের কারও আমানত ও। তোমাকে বিশ্বাস করি খুব। তাই তো তোমার কাছে ছুটে এসেছিলাম এই উপহারকে সযত্নে রাখার জন্য৷ কিন্তু আমি চাই না আমার জন্য তোমার জীবন সংকটে পড়ুক। জায়িন আর আয়মানের সন্তান এই পৃথিবীতে যতখানি নিরাপদে আছে এখন, তাকে প্রোটেক্ট করার জন্য শেখ পরিবার আছে। স্মরণের জন্য আমরা দুজন ছাড়া কেউ নেই। তুমি, আমি, দুজনেই জায়িন, আয়মান কিংবা ওদের মতো আরও কিছু মানুষের টার্গেট। সেখানে আমরা এক সঙ্গে থাকলে বিপদে দুজনই পড়ব। স্মরণকে রক্ষা করার জন্য উপরে এক আল্লাহ ছাড়া তাহলে আর কেউই থাকবে না। আমাদের খুঁজে চলেছে ওরা। আমি জায়িনের কাছে একজন বিশ্বাসঘাতক, জায়িনের মতো আরও একজনের কাছে তার সম্পদ চোর। স্মরণ সেই সম্পদ। স্মরণের মা আমার একমাত্র ভালোবাসা। কিন্তু আমার সারা জীবনের আফসোস, তাকে আমি পবিত্রভাবে পাওয়ার আগেই সে শয়তানের নোংরা ছোঁয়া পেয়েছে। সেই শয়তান জায়িনেরই বন্ধু।
কিন্তু জানি না সে কে। আমাকে জানাতে পারেনি আমার ভালোবাসার মানুষটা৷ শুধু আমার কাছে স্মরণকে তুলে দিয়ে অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে চলে যেতে বলে। আমি তাকেও আমার সঙ্গে করে আনতে চেয়েছিলাম, পারিনি৷ তাকে আনা সম্ভব ছিলও না। খুব সাবধানে সে স্মরণকে জন্ম দিয়েই আমার হাতে তুলে দিয়েছিল। স্মরণকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে বেরিয়ে আসতে আমাকে সহযোগিতা করেছিল আলিয়া। নয়ত পারতাম না আজ এখানে থাকতে। আমার ভালোবাসা সর্বক্ষণ নজরবন্দি হয়ে আছে, বাচ্চাটা না পেয়ে জায়িন আর জায়িনের বন্ধুরা আটকে রেখেছে ওকে৷ আলিয়াই আমাকে আপডেট জানাচ্ছে ওদিকের। জায়িনের বন্ধু চারজন আমাকে আর স্মরণকে খুঁজতে দেশে এসেছে। ওরা স্মরণকে নিজেদের কাছে রাখতে চায়। আমি কোনোভাবে ধরা পড়ে গেলে তুমিও ধরা পড়বে।
আর আয়মান তোমাকে পেলেই মেরে ফেলবে। তুমি মুম্বাই চলে যাও, জাইমা। অনেক কষ্টের পর তুমি স্বাভাবিক জীবন পেয়েছ। আমার আর স্মরণের জন্য তোমার ক্ষতি না হোক। স্মরণ তো এখন বড়ো হয়েছে। এখন ওকে আমি একাই সামলে নিতে পারব। আজ রাতেই ওকে নিয়ে আমি পালাব।” সে রাতটাই রেজা আমার ভালোর চিন্তা করতে গিয়ে আমাকে কী যে কষ্ট দিলো! আমার কোনো কথাই ও শুনল না। আমার কোল খালি করে দিয়ে তোমাকে নিয়ে ও চলে গেল কোথায় যেন। আমি ওর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলাম ফোনে বহুবার। ওকে পেলাম না৷ সত্যিই বুকে হাহাকার নিয়ে চলে এলাম মুম্বাই।’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২০
কান্নার দমকে জাইমা আর কিছু বলতে পারলেন না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকল সে। দীধিতি জড়ীভূতের ন্যায় কানে ফোন চেপে বসে রইল শুধু। বিনা অনুমতিতেই ওর চোখের পানিরাও নিজেদের উৎসর্গ করে চলেছে।
