Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩
ইসরাত জাহান দ্যুতি

যে চেয়ারটিতে নাওফিল এসে বসেছে, সেই চেয়ারটিও আলাদাভাবে বানানো হয়েছে শুধু বিত্তবানদের বসবার জন্যই। নাওফিলের পোশাক আর তার চাল চলনে বাড়ির চাকরগুলো ভেবেই নিয়েছে , যুবকটি ভিনদেশের কোনো সমৃদ্ধশীল পরিবারের কর্ণধার। অপেক্ষা করছে সে এ বাড়ির অধ্যক্ষার জন্য।
ঘড়ির কাটাতে এখন রাত ন’টা বাজে। সেদিকে চেয়ে নাওফিলের ইচ্ছা হলো সময়ের কাটা এগিয়ে গভীর রাতের সমাগম ঘটাতে। এমন অদ্ভুত ভাবনার সমাপ্তি ঘটল কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির আগমনে। তবে পেছন ফিরে দরজার দিকে তাকাল না নাওফিল। মেরুদণ্ড সোজা করে বসে সে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে দেওয়ালে ঝুলানো তৈলচিত্রটি। তৈলচিত্রটি সম্মাননীয় ফিলিপ ব্যক্তিটির। এ বাড়ির মালিক ছিলেন, যিনি গত দু’মাস হলো মারা গেছেন।
কাঠের মেঝেতে শক্ত পাদুকা পরে হেঁটে চলার যে আওয়াজটা তৈরি হচ্ছে এই মুহূর্তে, সেই আওয়াজটিকে নাওফিল প্রচণ্ড ঘৃণা করে। তার কাছে এই ব্যাপারটা এমন একটা মনোভব তৈরি করে যেন, এই যে ধনবান ব্যক্তিগুলো নিজেকে দুনিয়ার রাজা ভাবে নিজেদের আর সেই ক্ষমতা বোঝাতে ইচ্ছাপূর্বক তারা দাম্ভিকতা ফুটিয়ে অতিরিক্ত শব্দ তুলে হাঁটতে বেশি পছন্দ করে।

শব্দেরও সমাপ্তি ঘটল একটা সময়। নাওফিলের দৃষ্টির সামনে তৈলচিত্রটির বদলে এবার স্পষ্ট হলো লাস্যময়ী এক অতিশয় সুন্দরী অঙ্গনা। গোলাপি বর্ণের সিল্কের তৈরি লম্বা এক খোলামেলা পরিচ্ছদ পরনে অঙ্গনার। গাউন বলার চেয়ে উত্তম হবে রাতের পোশাক বলা। নাওফিল ঈষৎ হাসি সংযত রেখে সরাসরি মেয়েটির চোখে দৃষ্টিপাত করল। মেয়েটিও চেয়ে তাকেই দেখছে জহুরি চোখে৷ উঠে দাঁড়িয়ে নাওফিল গম্ভীর আওয়াজ তুলে বলল, ‘এই সুন্দর রাত্রির শুভেচ্ছা, মহাশয়া। আমি জ্যাকব, এসেছি রোমানিয়া থেকে। সম্মাননীয় আপনার মৃত বাবার পত্রের আমন্ত্রণে। তিনি মুমূর্ষু অবস্থায় থাকাকালীন পত্রটি লিখে আমার বাবাকে পাঠিয়েছিলেন।’
নাওফিলকে ইশারায় বসতে বলে মেয়েটিও টেবিলের অপরপ্রান্তের চেয়ার টেনে বসল।

-‘ভিক্টোরিয়া আমি। আমার বাবা আপনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেলেন কেন?’
প্রশ্নটি শেষ হতেই নাওফিল একটা পত্র এগিয়ে দিলো ভিক্টোরিয়া চরিত্রে দেখা দীধিতিকে। পত্রটি সে পড়তে আরম্ভ করতেই নাওফিল ওষ্ঠকোণে কুটিল হাসি স্পষ্ট করে বিশ বছর বয়সী দীধিতির নিটোল সুন্দর শরীরটার সৌন্দর্য দেখতে থাকল। সোনা রঙা গায়ের বর্ণ এবং গায়ের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে থাকা গোলাপি পোশাকে দীধিতিকে নিতান্তই লাস্যময়ী লাগা ভুল হবে না। বুকের বিভাজনে গিয়ে নিবদ্ধ হয়ে পড়ল নাওফিলের দৃষ্টিজোড়া। শরীরের এই অংশটুকু দৃশ্যমান হয়ে আছে দীধিতির চমৎকারভাবে। যে-কোনো পুরুষের নজর কাড়ার জন্য তার বুকের এই বিভাজনটুকু প্রচণ্ড আকর্ষণীয়। ডিম্বাকৃতি মুখটা থেকে যেন এখনো কিশোরী বয়সের ছাপ যায়নি তার। অথচ অভিব্যক্তিতে বাবার মতো গম্ভীরতা এবং দাম্ভিকতা। থুঁতনির খাঁজটা খুব বেশি সুন্দর না হলেও পাতলা ঠোঁট জোড়া অবশ্যই পছন্দনীয়।
চিঠি পড়া শেষে গোলাকৃতির চোখদু’টো তুলে দীধিতি তাকাল নাওফিলের দিকে। এখনো চেয়ে আছে সে তার বুকের বিভাজনের দিকেই।
উফ্! অসভ্য ছেলেটার জায়গায় নাওফিলকে ভাবতেই দীধিতির আরও বেশি রাগ হতে থাকল নাওফিলের ওপর। গল্পটা নিয়ে কল্পনা থামিয়ে দিলো সে। নাওফিলের ওই ফিচেল বাজে চাউনি আর মেনে নিতে পারল না।

ঘুম থেকে তড়িঘড়ি করে টেনে ওঠাল দীধিতিকে ঊর্মি। চটে যাওয়া মেজাজ নিয়ে দীধিতি ধমকে উঠল, ‘কী সমস্যা আপু? ঘুমিয়েছিই রাত করে।’
-‘আরে ওঠ, ঝামেলা হয়ে গেছে। তোর মামা আর আমার ফুপু কল করে মাথা খেয়ে ফেলছে আজই বাড়ি ফেরার জন্য।’
ঘুম মস্তিষ্কে কথাটা পছন্দ হলো না ওর, ‘ফাজলামি কথাবার্তা বাদ দিতে বল। ঘুমাব আমি এখন। আর ডাকবি না।’
-‘এই শোন, ইরফানকে আর একটা সেকেণ্ড দেরি করতে নিষেধ করেছে আব্বু। গতকাল ইনানি বিচে দু’টো যুবক ছেলের লাশ পাওয়া গেছে। সেই খবর আজকে সকালের খবরে টিভিতে দেখাচ্ছে৷ পুলিশে ভরে গেছে ওখানে। খবর দেখার পর থেকে আব্বু আর ফুপু স্থির নেই। পনেরো মিনিট পর পর কল করছে।’
বিরক্তিতে চেহারা কুঁচকে বসে রইল দীধিতি। ভালোভাবেই বুঝতে পারছে, না চাইতেও তাকে চলে যেতে হবে। রাগের চোটে কান্না পাচ্ছে তার৷ ঐশী ছুটে এল ওর কাছে। মুখটা চিন্তিত করে বলল ওকে, ‘আমরাও চলে যাব দোস্ত। তবে বাকিরা বোধ হয় যাবে না। রুমান কল করেছিল। যেই মুহূর্তে লাশ দেখেছে মানুষ, সেই মুহূর্তে ওরা ওই বিচেই বসে আড্ডা দিচ্ছিল।পুলিশরা ওদের কক্সবাজার ছেড়ে যেতে নিষেধ করেছিল জানিস? নাওফিল ভাইয়ের বাবার ফোন কলের দৌলতে ওরা ছাড় পেয়েছে। ওরাও আজ ঢাকা ফিরে যাবে।’

-‘নাওফিলের বাবা কে?’
-‘এমপি। সেই কারণেই তো ঝামেলা থেকে বের হতে পারল। কী সাংঘাতিক ব্যাপার স্যাপার!’
অপরিহার্যভাবে দীধিতি গোছগাছ করে নিলো। ওরা চার বান্ধবী আর ঊর্মি, ইরফান এই ছ’জন এক সঙ্গে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। ইরফান টিকিট কাটার জন্য বের হতে চাইলেই ঐশী জানাল, রুমান ওদের গাড়িতে করেই ঢাকা ফেরার কথা বলছে। গাড়ি ওদের চৌদ্দ সিটেরই। সিট থাকতে বাসে যাবার কী প্রয়োজন? ভাড়া না হয় ওদের সঙ্গে শেয়ার করে যাওয়া যাবে। ইরফান, ঊর্মি রাজি হয়ে গেল ঠিকই। কিন্তু দীধিতির এখনো কক্সবাজার ছেড়ে যেতে মন সায় দিচ্ছে না। আরও খারাপ লাগছে তার নাওফিলদের সঙ্গে যাবার কথা শুনে।
বেলা দশটায় রুমান ওদের গাড়ি নিয়ে চলে আসে ঐশীদের হোটেলের সামনে। ওরা হোটেল থেকে বেরিয়ে গাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতেই মুখোমুখি হলো জয়নাল উদ্দিনের। তার সঙ্গে রুমান ঐশীকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বাকিদের তাদের সঙ্গে ঢাকা ফেরার কথাও জানাল। সিটের পেছনের দিকেই বোধ হয় জায়গা হবে দীধিতিদের। এমনটা ভেবে বারবার চোখ, মুখ কুঁচকাচ্ছে সে। গাড়িতে সে কখনোই পেছনে বসতে পারে না। এর থেকে বাসে যাওয়াটা তার জন্য বেশি আরামের ছিল। ওকে দেখার পর থেকেই দীপ্ত প্রথম দিনের মতোই ওকে নজরে রাখছে৷ বারবার ওর চেহারাতে বিরক্তির ছায়া পেয়ে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘শরীর কি খারাপ দীধিতি?’
মৃদু হেসে সে জানাল, ‘না ভাইয়া।’

-‘তাহলে এমন শুকনো লাগছে কেন মুখটা?’
-‘এই যে একদিন এসেই ফিরে যেতে হচ্ছে।’
-‘হুঁ, মন খারাপ হওয়ারই কথা। গাড়িতে উঠে কোনো সমস্যা হলে বোলো আমাকে।’
বলে সে চলে গেল বন্ধুদের কাছে। সবার ব্যাগপ্যাক গাড়ির ডিকিতে তুলছে রুমান আর তুষার। নাওফিলকে এতক্ষণ দেখা যায়নি। দীধিতির অবশ্য ওর কথা খেয়াল হলেও তেমন পাত্তা দিলো না। গাড়িতে ওঠার কয়েক মিনিট আগে নাওফিলকে দেখা গেল একটা দোকানে দাঁড়িয়ে উপজাতি এক সুন্দরী দোকানির সঙ্গে সে কথা বলছে ভীষণ হেসে হেসে৷ তামান্না সেটা দেখে তন্বী আর দীধিতিকেও ডেকে দেখাল৷ তন্বী তা দেখে নাওফিলকে নিয়ে কয়েকটা বাজে মন্তব্যও করল। গতকালকের পর থেকে ওদের দু’জনেরও চক্ষুশূল হয়ে গেছে নাওফিল। দোকান থেকে পানির বোতল কিনে নাওফিল দূর থেকেই দীপ্ত আর দীধিতিকে এক সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলা দেখতে দেখতে এসে পৌঁছল ওদের কাছে। সবুজ তখন ওকে বলল, ‘কী মামা! দোকানির সঙ্গে সেলফি তুলো? ঢাকার সুন্দরীদের রেখে উপজাতি সুন্দরীদের কাছে গিয়ে মরলে অবশেষে।’

-‘সস্তা সুন্দরীদের সঙ্গে সেলফি তোলা পর্যন্তই। এর বেশি আর হবে না। আমি তুলেছি না কি? মেয়েটাই কথা বলতে বলতে ফ্রি হয়ে গেল আমার সাথে। চলে আসার আগে বলল তার সঙ্গে একটা সেলফি তুলে যেতে।’
শিহাব কিছু বলতে যাচ্ছিল এরপর। কিন্তু ঐশী হঠাৎ নাওফিল হাতের কব্জিতে খেয়াল করে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার হাত কাটল কীসে ভাইয়া?’
কথাটা শুনে দীধিতিও তাকাল ওর হাতের দিকে।কব্জিতে অনেকখানি ব্যান্ডেজ করা দেখল৷ সবাই একে একে গাড়িতে উঠতে শুরু করেছে তখন৷ নাওফিল গাড়ির দরজার পাশে দাঁড়িয়ে জবাব দিলো, ‘ছুরিতে কেটেছে বোন।’
ঐশী আবারও প্রশ্ন করল, ‘অতখানি ছুরিতে কাটল কীভাবে?’
উত্তর শোনার অপেক্ষা আর করতে ইচ্ছা হলো না দীধিতির। এই ছেলের কেটে যাক, ফেটে যাক, মরে যাক, কিছুই যায় আসে না ওর। গাড়িতে ওঠার জন্য দরজার কাছে এগিয়ে আসতেই নাওফিলও হঠাৎ দরজার আরও কাছে এসে দাঁড়াল। যাতে দীধিতি ওঠার সময় তার গা ঘেঁষে উঠতে হয় ওকে। আর তেমনটাই হলো। দীধিতি গাড়িতে উঠে যাবার মুহূর্তেই নাওফিল ওর কানের কাছে মুখটা এগিয়ে এনে গম্ভীরস্বরে ঐশীর প্রশ্নের জবাব দিলো, ‘খুন করতে গিয়ে।’

চমকে দাঁড়িয়ে পড়ল দীধিতি আর নিমিষে ঘাড় ফিরিয়ে নাওফিলের দিকে তাকাল। ততক্ষণে নাওফিল ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে গাড়িতে উঠে পড়েছে। ড্রাইভিংটা এখন সেই করবে।
দীধিতির চিন্তাকে দূর করে দিয়ে জয়নাল উদ্দিন মেয়ে পাঁচজনকে বসিয়েছেন মাঝের সিটগুলোতে। এতে দীধিতি একটু সন্তুষ্ট হলেও সেই সন্তুষ্টি তাকে চিন্তামুক্ত করতে পারছে না ড্রাইভিং সিটে বসা নাওফিলের ইগল চাউনির চোখদু’টোর জন্য। ফ্রন্ট মিররের মাঝে ওর সেই চাউনি দেখতে পাচ্ছে দীধিতি। গাড়িতে ওঠার পর থেকেই নাওফিল মিররটার পজিশন এমন করেই রেখেছে, যেন দীধিতিকে দেখতে পায় সে। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি সত্যিই দীধিতির কাছে ধারাল লাগছে, এই চোখগুলোর মালিকদের দেখলে মনে হয় এরা ভীষণ নির্দয় প্রকৃতির মানুষ। অথচ নাওফিলের চেহারাটতে যেন নূরের ছোঁয়া। ওই চোখের দৃষ্টি মুখে আর পড়তে চাইল না সে। চোখদু’টো বুজে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টায় নামল।

ভিক্টোরিয়াদের বাড়িটি ওই যুগের সময়ের বেশ অর্থ ব্যয় করে নির্মাণ করা ছিল৷ পোল্যান্ডে আসা পর্যটকরা মাঝে মাঝে এই বাড়িটা দেখার জন্য অনেক অনুরোধ করে মহলের ভেতর আসত। বিনিময়ে ফিলিপ তখন তাদের থেকে টাকাও নিতেন। কিন্তু ভিক্টোরিয়া এই সুযোগটি বন্ধ করে দেয়। সে চায় না, তার নিকটের মানুষগুলো ছাড়া এই মহলের ভেতর বাইরের মানুষ প্রবেশের সুযোগ পাক।

জ্যাকব এসেছে এখানে আজ প্রায় সাত দিন হলো। রোমানিয়াতে ফিলিপের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তারই পুত্র জ্যাকব। ফিলিপের অতি কাছের এবং কোনো বিশ্বস্ত মানুষ ছিল না বলে তার ব্যবসা, সম্পদ আর এক মাত্র মেয়েকে দেখে রাখার জন্য তিনি তার সেই বন্ধুকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। এবং চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন তার মৃত্যুর ঠিক দু’মাস পর যেন এই চিঠি নিয়ে হাজির হন তিনি তার মেয়ের কাছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়াতে তার ছেলেকে পাঠিয়েছেন তিনি ভিক্টোরিয়ার পাশে দাঁড়ানোর জন্য। এই সাতদিনে ভিক্টোরিয়াকে ব্যবসা সম্পর্কিত অনেক বিষয়ে জ্যাকব অবগত করেছে, ধারণা দিয়েছে। যা দেখে ভিক্টোরিয়া মুগ্ধ এবং সন্তুষ্ট জ্যাকবের প্রতি। কিন্তু ইদানীং ভিক্টোরিয়া তার মহলের পেছনের জঙ্গলটায় অদ্ভুত এক শব্দের গর্জন শুনতে পায়। কোনো অচেনা প্রাণীর আত্মচিৎকার। এমনটা সে এর আগে কখনো শোনেনি। আর তার থেকেও অবিশ্বাস্যকর ঘটনা ঘটে তার সাথে। সকাল হলেই নিজেকে সে জ্যাকবের ঘরের বিছানাতে দেখতে পায় প্রতিদিন। জ্যাকবকে থাকতে দেওয়া হয়েছে তার ঘরটাতে। কারণ, জ্যাকব তারই মতো এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে বলে ওরও নিশ্চয়ই তার মতো স্বাচ্ছন্দ্যে থাকার অভ্যাস। আর তাছাড়া ওকে চোখে চোখে রাখার জন্যই ভিক্টোরিয়া ওকে নিজের কাছাকাছি রাখে। এবং নিজে সে তার বাবার ঘরটাতে থাকতে শুরু করে। কিন্তু সমস্যা হয়ে চলেছে তার ক্ষেত্রেই। রাত হলেই নাকি সে অভ্যাসবশত তার পূর্বে থাকা ঘরটাতে চলে আসে ঘুমের মাঝে হেঁটে হেঁটে। জ্যাকব বারণ করার পরও নাকি সে ওই বিছানাতেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। আর জ্যাকব সারা রাত সেই ঘরের বাইরে এসে কাটায়। এমনটা বলতে দেখা গেছে তার চাকরদেরকেও। ঘুমের মাঝে হাঁটাচলার অভ্যাস তো আগে কখনো ছিল না তার! এখন এত সব অদ্ভুত পরিস্থিতিতে কেন পড়ছে সে?

দুশ্চিন্তায় কাটছে ভিক্টোরিয়ার প্রতিটা দিন। আজ সে ভেবে রেখেছে, কোনোভাবেই আজ রাতে সে ঘুমাবে না। জ্যাকব এবং বাসার চাকরদের কথা সে একেবারে বিশ্বাস করতে পারছে না। তার ধারণা, সে নিজের ঘরেই ঘুমিয়ে পড়ে। এবং ঘুমানোর পর তার ঘুমের মধ্যে হাঁটাচলার রোগও একদম নেই। কিছু একটা খারাপ হচ্ছে তার সঙ্গে। কিংবা জ্যাকবই কোনো ষড়যন্ত্র করছে তার বিরুদ্ধে। তা হাতেনাতে ধরবার জন্য আজ সে রাতের খাবারটাও খায়নি। কারণ, খাওয়ার পর ঘুম চলে আসে তার অতি জলদি৷
প্রতিদিন সে যে সময়টাতে ঘুমোতে যায়, আজও সে একই সময়টাতে বিছানাতে এসে শুয়ে পড়ে। এবং চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ার ভান ধরে পড়ে থাকে। তার বিশ্বাস, রাত আরেকটু গভীর হলেই এ ঘরে কেউ আসবে। আর সেই কেউটা হবে জ্যাকবই।
এক প্রহর যেতেই ঘরের দরজাটা খুলে গেল ভিক্টোরিয়ার। দরজা খোলার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে ভিক্টোরিয়া। তার ধারণাই এবার সত্য হচ্ছে। ঘরের মাঝে আজ সে মোমবাতি জ্বালিয়ে রেখেছে। অন্যদিনের মতো আঁধার রাখেনি সেই ব্যক্তিটে ধরবার জন্য।

ব্যক্তিটি ঘরে আসল নিঃশব্দে। বোঝারই উপায় নেই কেউ ঘরটিতে হাঁটছে। ঘরের জানালাটা বন্ধ করে রেখেছিল ভিক্টোরিয়া। এই জানালা বরাবর দাঁড়ালে দূরের জঙ্গলটা চোখে পড়ে। সেই জানালাটা ব্যক্তিটি খুলে দিয়ে মোমবাতি ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিলো আর ধীর পায়ে হেঁটে ভিক্টোরিয়ার সিথানে এসে বসল। বেশ ভয় করছে ভিক্টোরিয়ার উপস্থিত ব্যক্তিটির জন্য। চোখ খোলার সাহস তো একেবারেই হচ্ছে না, উলটে ভয়ে তার নিঃশ্বাস ঘন ঘন পড়তে আরম্ভ করেছে। ব্যক্তিটি সুক্ষ্ম নজরে তাকিয়ে দেখছে ভিক্টোরিয়ার বুকের ওঠানামা। আজ যে পূর্ণিমা। জানালাটা খোলার একটাই কারণ, পূর্ণিমার আলোতে আজ ভিক্টোরিয়াকে দেখবে সে। রাতের পোশাকে ভিক্টোরিয়াকে দেখতে ব্যক্তিটি প্রতি রাতে ছুটে আসে ওর কাছে। একটা দিনও বাদ নেই সে ভিক্টোরিয়ার দৃশ্যমান বুকের বিভাজনের খানিকটা ওপরে আঁকা স্টার ট্যাটুতে চুমু খায়নি। আজ ওই ট্যাটুর প্রতি সে আরও বেশি আকর্ষণ বোধ করছে। বুকের কাছটাতে ঝুঁকে পড়ে সে আজও দীর্ঘক্ষণ চুমু খেল ট্যাটুতে। রাগে ভিক্টোরিয়া চকিতেই চোখ মেলল আর দেখতে পেল জ্যাকবের ধূসর বর্ণের জ্বলজ্বল করা চোখদু’টো। ক্ষিপ্ত সেই চোখ। সে তাকানোর মুহূর্তেই জ্যাকবও মাথা উঁচু করে তাকায় তার দিকে। আর তাকে চিৎকার করার সুযোগটুকুও না দিয়ে মুখ চেপে ধরে তার গলার পাশে সুচালো দাঁতের কামড় বসায়। ভিক্টোরিয়া নিস্তেজ হতেই জ্যাকব ছেড়ে দেয় ওকে। আষ্টেপৃষ্ঠে ওকে জড়িয়ে ধরে চুমুতে ভিজিয়ে তোলে ওর সারা গলা।
গল্পের এই অবধি দীধিতি নাওফিলকে ভেবে আসতেই চায়নি। আর সে তো গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তাহলে সে এটুকু স্বপ্নতেই দেখেছে এত সময়। নাওফিলের জ্বলজ্বল করা চোখজোড়া জ্যোৎস্নার আলোতে শুধু ভয়ঙ্কর নয়…সুন্দরও লাগছিল, ফর্সা মুখটা থেকেও যেন নূর ছড়াচ্ছিল। কিন্তু তবুও দীধিতি এখন আর মুগ্ধ হচ্ছে না৷ তার একদমই ভালো লাগছে না নাওফিলকে। সামনের সিটে বসে আছে নাওফিল। কিন্তু ড্রাইভিং সিটে এখন দীপ্ত। আর ফ্রন্ট মিররটা এখন আর তার উদ্দেশ্যে ঘোরানো নেই।

ঢাকা ফেরার পর দীধিতি কিছুদিন যশোর থেকে ঘুরে এসেছে। মা আর ছোটোবোনের পাগলামি থামাতে ভার্সিটি মিস দিয়ে গিয়েছিল সে দেশের বাড়ি। সেখান থেকে ফিরতেই ঐশী আর রুমান এক সঙ্গে দেখা করে ওদের তিন বান্ধবীর সঙ্গে। ওরা চার বান্ধবিই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। তামান্না, তন্বী আর সে থাকে হোস্টেলে। রুমানের ভাইয়ার বিয়ের দাওয়াত দেবার জন্যই রুমান এসেছিল ঐশীর সঙ্গে। দীধিতি দাওয়াত গ্রহণ করেনি অবশ্য। কিন্তু তা সে প্রকাশ করেনি। মনে মনে ভেবে রেখেছে সেদিন সকালেই ঊর্মি আপুর কাছে চলে যাবে। মোটকথা, নাওফিলের মুখটা দেখার শখ আর নেই তার। কিন্তু আল্লাহ পাক বোধ হয় এমন কিছু চাননি। রুমান আসার পরেরদিনই ঐশীর জোরাজুরিতে ওদের তিনজনকে যেতে হলো ধানমন্ডি আটে তৈরি করা রুমানদের ক্লাব ঘরে । ওখানে আজ রুমান সবাইকে ট্রিট দেবে তার বিয়ের জন্য। বলা যায়, এটাও বন্ধুদের চাপে পড়েই। অন্তত দশ হাজার টাকা আজ খসবে সেখানে তার।

এদিকে দীধিতি কখনো আসেনি। নয়তলা অ্যাপার্টমেন্টের সামনে এসে দাঁড়াল ওরা। এখানে ক্লাব ঘর কেমন হতে পারে সেটাই আন্দাজ করার চেষ্টা করছে দীধিতি। অনেক নিয়মকানুন মেনে ঢুকতে হয় ভেতরে। যেটা বিরক্তিকর লাগল দীধিতির৷ ওদের চারজনকে নিয়ে রুমান লিফটে ঢুকে নয়তলাতে এসে দাঁড়াল। ঐশী তখন বলল ওকে, ‘এখানে ক্লাবঘর কোথায়?’
-‘ক্লাব ঘর রুফটপে। ওখানে ওরা সবাই গোছগাছ করছে।’
দীধিতি জিজ্ঞেস করল, ‘কীসের গোছগাছ ভাইয়া?’
রুমান একটু হেসে বলল, ‘সাত বন্ধুর মধ্যেই আমিই প্রথম ম্যারিড ট্যাগ লাগাতে চলেছি। সেটাকে বিশেষভাবে সেলেব্রেট করবে আরকি। পাগলের দল সবগুলো। তোমরা ততক্ষণে একটু রেস্ট নাও।’
বলে সামনের অ্যাপার্টমেন্টের লক খুলে ভেতরে ঢুকল রুমান। ঐশী জিজ্ঞেস করল, ‘এই বড়োলোকি অ্যাপার্টমেন্টে তুমি কবে থেকে থাকো রুমান?’
রুমান হেসে ফেলল ঐশীর প্রশ্নের সুর শুনে, ‘অনেক আগে থেকে। খালি আমি থাকি না, আমরা সাতজনই থাকি যখন এক সঙ্গে হই সবাই।’

অ্যাপার্টমেন্টটা মূলত কার তা দীধিতিরও জানবার ইচ্ছা থাকলেও কৌতূহল দেখাল না সে। ভার্সিটি থেকে সরাসরি চলে এসেছে। একটু বিশ্রামের প্রয়োজন আসলেই। ওদেরকে বসতে দিয়ে রুমান চলে গেল ছাদে। যাবার আগে ওদেরকে ফ্রেশ হবার জন্য ওয়াশরুমও দেখিয়ে দিয়ে গেছে। চলে গিয়ে অবশ্য ফিরে এল সে দশ মিনিট পরই। ওদেরকে নিয়ে এল ছাদে। বিশাল ছাদটা দেখতেই তামিল সিনেমার অ্যাপার্টমেন্টের ছাদের মতোই সুন্দর। এক পাশে খোলামেলা একটা ক্লাব ঘর তৈরি করা। মানে মাথার ওপর ছোটোখাটো একটা ছাদ ছাড়া কোনো দেয়াল নেই ক্লাবের। পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ছাদটি। বসার জন্য রয়েছে বেতের চেয়ার কতগুলো আর শোয়ার জন্য ফ্লোরিং করেও ব্যবস্থা করা আছে। সেগুলো এক পাশে গুছিয়ে রেখে অন্য পাশে ছোটো একটা কাচের গোল টি-টেবিলে অনেক বড়ো একটা কেক সাজিয়ে রাখা। দীধিতি পরিবেশ দেখে বুঝতে পারল আজকে রাতে এখানে ব্যাচেলর পার্টিও হবে৷ আগের দিনের থেকে আজকে ওদের চারজনকে সবাই একটু বেশিই আতিথেয়তা দেখাচ্ছে। নাওফিলের দিকে ভুলেও একবার তাকায়নি দীধিতি। ঘুরেফিরে দীপ্তকেই নিজের আশেপাশে পাচ্ছে শুধু। দুপুর পার হয়ে বিকাল হতে চলেছে। কেকটা সন্ধ্যার সময় কাটার পরিকল্পনা করছিল সবাই। কিন্তু দীধিতি, তামান্না আর তন্বী বলল ওদের তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে হোস্টেল। সে কারণে কেকটা এখনি কেটে ফেলার ব্যবস্থা করল ওরা। ঐশী আর রুমানকে কেকের সামনে দাঁড় করিয়ে কেক কাটতে বলে ওরা ওদের দু’জনের চারপাশে দাঁড়িয়ে ঘিরে ফেলল। কেক কাটাকাটির পরের মুহূর্তটা দীধিতির পছন্দ নয়। দূরে সরে এসে দাঁড়ানোর আগেই কেক ছোঁড়াছুড়ি শুরু হয়ে গেছে। একদমই যা তা একটা ব্যাপার। আর প্রথমবারই সরাসরি তার গায়ে এসে লাগল। একদম থুঁতনি আর গলা মাখিয়ে গেছে। রাগে ওর চোখ মুখ শক্ত হয়ে যেতেই রাতুল জলদি এগিয়ে এসে টিস্যু দিয়ে বলল, ‘আপু তুমি খেপে যেয়ো না প্লিজ। তুমি কি এখনই ফ্রেশ হবে?’

দীধিতি কথা না বলে মাথা ওপর নিচ করে হ্যাঁ বলল। রুমান হাতের চাবিটা ওকে দিয়ে বলল, ‘রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসো। সমস্যা নেই।’
তামান্না আসতে চাইল ওর সাথে৷ কিন্তু ততক্ষণে আবার কেক ছোঁড়াছুড়ি শুরু হয়ে যায়। তন্বীকে আগে সে দিয়েছিল বলে তন্বী পেছন থেকে ওকে জাপটে ধরে ওর সারা মুখে ঘঁষে দিলো। আর যাওয়া হলো না ওর। প্রতিশোধ নিতে এগিয়ে গেল সেও। কিন্তু এই কেক ছোঁড়াছুড়ির ব্যাপারটা কারওরই পরিকল্পনাতে ছিল না। তাহলে প্রথমেই ছুঁড়েছিল কে? তা কেউ টের পায়নি৷ একজন ছোঁড়াতেই বাকিরাও শুরু করে দেয়।
ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হতে হতে দীধিতি ভেবে নিলো, এখান থেকেই চলে যাবে সে নিচে। জরুরি কল এসেছে বলে ঐশীকে জানাবে। তারপর তামান্না আর তন্বীকে নিয়ে বেরিয়ে যাবে। টিস্যুতে হাতটা মুছে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করল ঐশীকে কল করার জন্য। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে কানে এসে পৌঁছল কারও গগনবিদারী চিৎকার৷ চমকে উঠল সে। সে ছাড়া আরও কেউ আছে না কি এখানে? ভাবতে ভাবতেই আবারও শুনতে পেল কোনো পুরুষ কণ্ঠের চিৎকার। মাস্টার বেডরুম থেকেই আসছে আওয়াজটি। কিন্তু তা দেখার থেকে এখান থেকে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়াই ঠিক মনে করল সে। এবং বেরিয়ে যাবার মুহূর্তেই কেউ আবার চিৎকার করে উঠল আর বলে উঠল, ‘বাঁচাও আমাকে!’

হাতের ফোনটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে পড়ল দীধিতি। কয়েক সেকেণ্ড কিছু চিন্তা করে তামান্নাকে কল করল সে। কিন্তু রিসিভ হলো না। তন্বী, ঐশীকেও চেষ্টা করল কয়েকবার। একই ফলাফল। তিনজনকে তিনটা মেসেজ পাঠিয়ে আর দরজাটাও লক না করে বেডরুমটার দিকে এগিয়ে গেল সে৷ কিন্তু সেখানে কেউ নেই। অথচ এইদিকটা থেকেই চিৎকারের আওয়াজটা আসছিল। বাথরুমের দরজাটা একটু খুলে দেখতে এগোলো। কিন্তু খোলার পূর্বেই দরজার ফাঁক থেকে ভয়ে মূর্ছা যাবার মতো দৃশ্য দেখতে পেল সে। নগ্ন একটা ছেলের লাশের সামনে বসে আছে নাওফিল রক্তাক্ত ছুরি হাতে। ও তো ছাদে ছিল। এখানে কখন এল? লাশটার অবস্থা চোখে দেখার মতো নয়। গলার নিচ থেকে তলপেট পর্যন্ত কাটা। বুকের ভেতরের খাঁচাসহ, পেটের নাড়িভুঁড়ি সব কিছু দেখা যাচ্ছে। রক্তে লাশটাসহ বাথরুমের সাদা ফ্লোর মাখামাখি। নাওফিলের হাতে ছেলেটির রক্তাক্ত হৃদপিণ্ড। সেটার ওপর ছুরি চালিয়ে কয়েক পিস বানিয়ে ফ্লোরে সাজিয়ে রাখল।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২

যেন খাবারের জন্য পরিবেশন করে রাখল সে। তারপর রক্তের মাঝেই বসে লাশের বুকের ওপর ঝুঁকে রক্তের ঘ্রাণ নিতে থাকল চোখ বন্ধ করে৷ আবার সোজা হয়ে বসে ফ্লোরে পড়া রক্ত হাতে মেখে সারা মুখে ডলে নিচ্ছে আর পাগলের মতো হাসছে। দাঁড়িয়ে পড়ে নিজেকে আয়নায় দেখতে থাকল নিষ্পলক। তখন দরজারে ফাঁকে দীধিতির মুখটাও সে দেখে ফেলল আয়নার ভেতর। তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল দীধিতির দিকে। চোখে মেয়েটির ভয়ের তীব্রতা দেখা গেলেও নিজেকে স্থির রাখার চেষ্টা করছে সে প্রাণপণ। অন্য কোনো মেয়ে হলে এতক্ষণে হয় চিৎকার করে অজ্ঞান হতো, নয়তো দৌঁড়ে পালাত। কিন্তু দীধিতি খুব ঠান্ডা মস্তিষ্কে থাকার চেষ্টা করছে। তা বোঝায় যাচ্ছে ওর চেহারা দেখে। ধীরে ধীরে পেছন দিকে পা চালাচ্ছে সে, যাতে টের না পায় নাওফিল। নাওফিল তা দেখেও চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, আর দেখতে থাকল দীধিতির চলে যাওয়া।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here