Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৯

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৯

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৯
ইসরাত জাহান দ্যুতি

মাত্র তেইশ বছর বয়সে জাকির শেখ বিয়ে করেছিলেন এক লাস্যময়ী অস্ট্রেলিয়ান নারীকে৷ লিন্ডা নাম তার। পড়াশোনার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া অড জব খুঁজতে গিয়েই পরিচয় হয়েছিল একাকী জীবন কাটানো লিন্ডার সঙ্গে৷ তারপর ধীরে ধীরে দুজনের মাঝে প্রণয় পরিণয় ঘটলে সুশীল ও শালীন মানসিকতা সম্পন্ন জাকির সরাসরি লিন্ডাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন৷ যেখানে লিন্ডা দিয়েছিল তাকে লিভ ইনে থাকার প্রস্তাব। কিন্তু জাকিরের মতো সরল, সুদর্শন কিন্তু কর্মঠ পুরুষের প্রস্তাবই লিন্ডা গ্রহণ করে নেয় নিঃসঙ্কোচে৷ ধর্ম নিয়ে দুজনের মাঝেও কোনোরূপ ঝামেলার সৃষ্টি হয়নি৷ বিয়ের কথাটা জাকির খুব অনায়াসেই বাংলাদেশের সকলের কাছ থেকে চেপে যান৷ কেবল আদরের ছোটো ভাই জায়িনকে যখন নিজের কাছে নিয়ে আসেন তিনি, তখনই জায়িন সত্যটা জানতে পারে।

কিন্তু বড়ো ভাই পাগল জায়িন তা নিয়ে ভুল করেও বাবা-মায়ের কাছে মুখ খোলেনি কখনো৷ জায়িন আসার পর থেকে জাকির কাজের সময় বাড়িয়ে দেন। কারণ, তার পাশাপাশি ভাইয়ের খরচটাও যুক্ত হয়েছিল৷ তবু মাহতাব শেখের কাছ থেকে নিজের জন্য বা জায়িনের জন্যও এক পয়সা নিতে রাজি ছিলেন না। অবশ্য মাহতাব শেখ জাকির সাহেবের জন্য বিশেষ কোনো চিন্তা না করলেও জায়িনের জন্য জোরপূর্বকই প্রতি মাসে বড়ো অঙ্কের টাকা পাঠাতেন। যেটা একটা সময় জায়িন নিজেই গ্রহণ করেছিল৷ কিন্তু মন্দ ভাগ্য ছিল এই দুই ভাইয়েরই। জাকির শেখ লিন্ডাকে মনে-প্রাণে ভালোবাসলেও লিন্ডা ছিল কেবল সুবিধাভোগী, স্বার্থান্বেসী এবং ব্যাভিচারী। যাকে জাকির শেখ কখনোই চিনতে পারেননি৷ ওভার টাইম কাজ আর পড়াশোনার কারণে তিনি যখন লিন্ডাকে যথেষ্ট সময় দিয়ে উঠতে পারছিলেন না, ঠিক তখনই লিন্ডা লোলুপতা নিয়ে হাত বাড়ায় মাত্র আঠারো বছর বয়সি দুর্দান্ত সুপুরুষ জায়িনের দিকে৷ বলা বাহুল্য, নোংরা মানসিকতার লিন্ডা জায়িনকে দেখার প্রথম দিন থেকেই ওর মাত্রাতিরিক্ত সুদর্শনতায় বিমুগ্ধ হয়েছিল। তখনও জায়িন নতুন পরিবেশ বা নতুন সহপাঠীদের সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাওয়াতে পারেনি।

বিশেষ এক কারণে বেশিরভাগ সময়ই কাটাত সে বিষণ্নতায়৷ আর এ সুযোগই কাজে লাগিয়ে লিন্ডা শুরুতে ভীষণ বন্ধুসুলভ আচরণ দেখিয়ে নিজেদের মাঝের জড়তা দূর করেছিল৷ এবং তারপরই নিজের পরিকল্পিত চক্রান্তে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছিল জায়িনকে। নারীকে ধর্ষণের বহু সংবাদ, বহু বিবৃতি শোনা গেলেও পুরুষও যে কখনো কখনো বিকৃতি মানসিকতা সম্পন্ন নারীর কাছে হয়রানির শিকার হয়, তার প্রমাণ জায়িন পেয়েছিল নিজের মাধ্যমেই। অন্তরঙ্গ সম্পর্কের প্রথম অনুভূতি ছিল সেদিন জায়িনের বিষাদপূর্ণ। ওর সরলতা আর ভীত মনের সুযোগ নিয়ে লিন্ডা একবারেই ক্ষান্ত হয়নি৷ আরও বহুবার ওকে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করেছিল সে। এক সময় লিন্ডা নিজের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর জানায় জাকিরকে এবং জায়িনকেও৷ কিন্তু বাচ্চাটি দু ভাইয়ের মাঝে কার ডিএনএ বহন করছে, তা নিয়ে লিন্ডা সন্দেহ প্রকাশ করে জায়িনকে ভয় দেখিয়েছিল এভাবেই– যদি বাচ্চাটি জাকিরের না হয়ে ওর হয়, তখন সে ছোটো ভাই হয়ে জাকিরের সামনে কীভাবে দাঁড়াবে? বড়ো ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক! এ কি সহ্য করতে পারবে জাকির? তাই প্রস্তাব রেখেছিল লিন্ডা, জায়িন আর সে পালিয়ে যেতে পারে। কেননা, ভয়ানকভাবে জায়িনের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছিল অসুস্থ মানসিকতার লিন্ডা। তাই জায়িনকে কোনোভাবেই ছাড়তে চাইছিল না সে। বাচ্চা পেটে আসার পূর্বে পর্যন্ত সে জায়িনকে ব্ল্যাকমেইল করে যেত একই কথা বলেই— তাদের এই সম্পর্কের ভিডিয়ো ক্লিপ যদি কখনো জাকির দেখেন। সেদিন কী হবে জায়িনের? আর এই ভয়েই যে জায়িন মুখ বুজে লিন্ডার কামজ অনুভূতিতে সাড়া দিত।

নিরীহ পশুও বারবার আঘাতে একটা সময় হুঙ্কার করে ওঠে যেখানে। সেখানে আঠারো বছরের সরল এবং ভীতু জায়িনও আর এই অনাচার সহ্য করেনি। ততদিনের মাঝে নিজের স্কুলে গোটা কয়েক ঘনিষ্ট বন্ধু পেয়ে গিয়েছিল সে, যাদের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকত এক সন্ত্রাসী সত্তা। প্রত্যেকেই ছিল বাবা-মায়ের বখে যাওয়া সন্তান। তাদের সঙ্গ পেয়েই লিন্ডার নিষ্ঠুরতা আর নিজের বিষণ্ণতায় জায়িন মাদক সেবন বা মদ্যপান, সবটাই আয়ত্ত করে নিয়েছিল নিজের মধ্যে। সেই বন্ধুদের কাছেই লিন্ডার ব্যাপারে সমস্ত কথা জানিয়ে সাহায্যে কামনা করেছিল সে৷ নিজের মাঝে লিন্ডার প্রতি এত বেশিই ঘৃণা আর রাগ জন্মেছিল জায়িনের, যে বন্ধুরা লিন্ডাকে গণধর্ষণের পরিকল্পনা করার পরও সে কোনো আপত্তি করেনি৷ জায়িনের জীবনে যেটুকু সাধারণত্ব ছিল, সেটুকু বদলে যায় একটা রাতের ব্যবধানে৷ লিন্ডাকে ছলনায় টেনে নিয়ে আসে জায়িন তার মৃত্যুর অতি নিকটে। মাঝ সমুদ্রে ভাড়া করা শিপের মাঝে লিন্ডার সাথে ঘটায় জায়িনের চার বন্ধু করুণ নির্যাতন৷ যা সহ্যক্ষমতার বাইরে ছিল লিন্ডার। ওদের পরিকল্পনার বাইরে তখন ঘটে যায় আতঙ্কপূর্ণ এক ঘটনা। অসহনীয় শারীরিক অত্যাচারে মারা যায় লিন্ডা। খুনের আসামি হয়ে গোটা জীবন জেলে কাটানোর কথা ভেবেই চার বন্ধু সিদ্ধান্ত নেয়– লিন্ডার মৃতদেহটা টুকরো টুকরো করে সমুদ্রের মাঝে ফেলে দেবে। জায়িন ছিল তখনও নির্বিকার। বরং চার বন্ধুকে অবাক করে লিন্ডার অঙ্গচ্ছেদ করেছিল প্রথম সে-ই।

জাকিরের কাছে লিন্ডা নিখোঁজ হয়ে যায় চিরতরের জন্য। জায়িন আর ওর বন্ধুদের জীবনের প্রথম খুনের গল্প কোনো এক বিশেষ ক্ষমতায় আজীবনের জন্য গোপন থেকে যায়, অজানা থেকে যায় সবার কাছেই। বহু বছর জাকির স্ত্রী ও অনাগত সন্তানের শোকে ছন্নছাড়া জীবন কাটান৷ তারপর একদিন মায়ের আকুতির কাছে হেরে দেশে ফিরে আসেন। মায়ের কথামতোই বাবা তাকে ছোটোখাটো একটা ব্যবসায়ের ভার তুলে দেন। সেই ব্যবসাতেই মনোনিবেশ ঘটিয়ে একটা সময় ছোটো ব্যবসাটা বড়ো করে তোলেন। জায়িন আর তার বন্ধুরা ততদিনে আন্ডারওয়ার্ল্ডে নিজ নিজ রাজত্ব গড়ে নিয়েছে গোপনে৷ এবং লোকসম্মুখে নিজের পরিচয় গড়েছিল জায়িন গোয়েন্দা বিভাগের ইনটেলিজেন্স অফিসার হিসেবে।

কিন্তু সত্য যে জীবনের একটা পর্যায়ে প্রকাশ পেয়েই যায়৷ জায়িনের জীবনে আয়মান ও আলিয়া প্রবেশের পরই জায়িনকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিতে অতি সুকৌশলে এই গোপন সত্যটি আয়মান উদ্ঘাটন করে জাকিরের কাছ অবধি পৌঁছে দেয় প্রমাণসহ একটা ডকুমেন্টস। যেখানে জায়িন ওর বন্ধুদের সঙ্গে কোনো এক প্রসঙ্গে লিন্ডাকে হত্যার প্রসঙ্গটি তুলেছিল৷ সেই কথাগুলোই আয়মান রেকর্ড করে নিয়েছিল। তখনও অবশ্য এই দুই ধ্বংসক, বিপজ্জনক নারী-পুরুষ একে অপরের প্রতি কোনো অনুভূতির মায়ায় জড়ায়নি৷ আয়মান কেবল ভাবত, কী করে জায়িনকে পুরোপুরি বিনাশ করে ওর নাগাল থেকে দূরে যাবে! আর জায়িন ভাবত, আয়মানের মতো নিষ্ঠুর, ঠান্ডা মাথার একজন কন্ট্রাক্ট কিলার ও টেরোরিস্টকে নিজের হাতের মুঠোয় এনে আন্ডারওয়ার্ল্ডের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোতে ব্যবহার করবে। তবে জায়িনের দূরদর্শিতা আর চতুরতার কাছে আপাতত হার স্বীকার করে আয়মান বাধ্য হয় ওকে বিয়ে করতে৷ ততদিনে জাকিরের সাথে জায়িনের সম্পর্কটা চূড়ান্তভাবে শেষ। জায়িনও আর দেশে ফেরেনি তারপর থেকে। আয়মানের সঙ্গে যুদ্ধ বিগ্রহের মাঝেই কীভাবে, কখন যেন দুর্বলতা অনুভব করেছিল সে, ওই অনুভূতিহীন স্ত্রীর প্রতি। কিন্তু তা যে ভালোবাসা নয়, স্রেফ মায়া।

এমনটাই বিশ্বাস করত জায়িন। এসবের মাঝেই আয়মান জন্ম দেয় দুটো অনিন্দ্য সুন্দর শিশু। যাদের মাঝে মেয়ে শিশুটির মৃত্যু ঘটে জন্মের ছ ঘণ্টা পরই। কিন্তু আয়মান তা মেনে নিতে পারেনি। মানসিক রোগে আক্রান্ত আয়মান জায়িনকেই মেয়ের খুনী ভেবে আরও বেশি হিংস্র আর নিষ্ঠুর হয়ে পড়ে। কারণ, জায়িন চেয়েছিল ওর রাজত্ব সামলানোর জন্য ওর চেয়েও প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত পুত্র সন্তান আসুক ওদের কোল জুড়ে। আর এই কথাটিই আয়মান স্মরণে রেখেছিল। নিজের অন্ধকার সাম্রাজ্য, আয়মানের মানসিক অবনতি আর একমাত্র বাচ্চাটিকে সামলাতে যখন হিমসিম খাচ্ছিল জায়িন, ঠিক তখনই রেজা বেইমানি করে বসে ওর সঙ্গে। আর ঠিক তখনই আলিয়া এগিয়ে আসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। জায়িনের আসল পরিচয় আর নানা অপকর্মের তথ্য প্রমাণ যখন বাংলাদেশ সহ অস্ট্রেলিয়া আইন বিভাগের আওতায়, তখন বোনের শিশু পুত্রের দেখভালের সঙ্গে জায়িনকেও নানাভাবে সহযোগিতা করে অস্ট্রেলিয়া থেকে অন্য দেশে পালিয়ে যায় আলিয়া ওদের নিয়ে। সারা পৃথিবীর কাছে জায়িন আর আয়মান ফেরারি আসামি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে৷ এমন এক বিপদসংকুল অবস্থায় আলিয়া সিদ্ধান্ত নেয়, বোনের শিশু পুত্রটিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এবং নিরাপদ জীবন দিতে হলে তাদের কাছ থেকে ওকে দূরে সরিয়ে দিতে হবে। হ্যাঁ, মাহতাব শেখের সঙ্গে যোগাযোগটা সে-ই করেছিল জায়িনের অগোচরে।

আর তখনই মাহতাব শেখ আর জান্নাতি বেগম নাতিকে নিজেদের কাছে নিয়ে আসার জন্য জাকির শেখের কাছে কান্নাস্বরে আকুতি জানিয়েছিলেন। জায়িনের প্রতি তীব্র অভিমান আর রাগ পুষলেও কখনো ভাইকে ঘৃণা করতে পারেননি জাকির। তাই মনে-প্রাণে সব সময়ই চাইতেন তিনি, ভাইটা যেন ওই সন্ত্রাস জীবন ত্যাগ করে আইনের কাছে আত্মসমর্পণ করে। তারপর একদিন ক্ষমতাবলে মাহতাব শেখ ঠিকই মুক্ত করে আনতেন ছেলেকে। কিন্তু জায়িন তা মানেনি। আর মানেনি বলেই জাকির শেখও কঠিন হয়ে যান ভাইয়ের জন্য৷ আলিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে ইস্তানবুল চলে আসেন তিনি৷ যেখানে ছদ্মবেশে দিনাতিপাত করছিল ওরা তিনজন। জায়িন নিজের বন্ধুদের থেকে সাহায্যের আশায় দিন গুণছিল তখন। খুব ঝুঁকি নিয়েই আলিয়া চার বছরের নাওফিলকে তুলে দেয় জাকির শেখের কাছে। বাচ্চাটাকে ইস্তানবুল থেকে বাংলাদেশ অবধি নিয়ে আসাটা ভীষণ ঝামেলার হলেও শেষমেশ জাকির শেখ পেরেছিলেন। কিন্তু আয়মানের পরিণতি তাতে আরও খারাপ হয়ে যায়৷ সন্তান বুকছাড়া হলে কতটা কষ্ট হয়, তা সেদিন হারে হারে টের পেয়েছিল জায়িনও৷ আলিয়াকে খুন করতে গিয়েও পরিস্থিতি বিবেচনায় তা করেনি সে। উলটে ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশ এসে ছেলেকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছিল। সেদিনও জাকির শেখ শেষবারের মতো ওকে সুযোগ দেন, পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণের জন্য৷ কিন্তু জায়িন নিজের দম্ভপূর্ণ, দুঃসাহসী ব্যক্তিত্বকে ছোটো করতে নারাজ ছিল বরাবরই। তাতে অকাতরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মরতেও সে দ্বিধা করবে না। তবু মাথা নোয়াতে রাজি নয়। তাই তো সন্তানকে ফেলেই পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় সেদিন। নিজের হাতে বড়ো করে তোলা ছোটো ভাইয়ের শেষ পরিণতি কল্পনা করে জাকির শেখ সেদিন নাওফিলকে বুকে জড়িয়ে গোটারাত কেঁদেছিলেন হাউমাউ করে। অমন কান্না জীবনের প্রথম ও শেষ কান্না ছিল তার।

কিন্তু নাওফিলকে পুরোপুরি মায়ের আদরে বড়ো করে তোলার জন্য একজন সত্যিকারের মায়ের প্রয়োজন ছিল৷ যে নিজেও থাকবে সন্তানের জননী। তাই জাকির শেখ নিজেদের আত্মীয়ের মাধ্যমেই খুশি নামক এক নারীর সন্ধান পান, যিনি মা হলেও ছিলেন সন্তান হারা। খুশি ছিলেন স্বামী পরিত্যক্তা এবং বন্ধা। এক সন্তান জন্মের পরই সন্তান ধারণের ক্ষমতা হারিয়েছিলেন। ছয় বছরের একটি ছেলে ছিল তার। যাকে তার স্বামী তালাকের সময়ই রেখে দিয়েছিল। অনেক ভেবেচিন্তে জাকির শেখ বাবা-মায়ের অমতে গিয়ে তাকেই বিয়ে করে ঘরে তোলেন একদিন। বিয়ের রাতে মোটা অঙ্কের মোহরানা পরিশোধের পাশাপাশি নাওফিলকেও তুলে দিয়েছিলেন তার হাতে৷ প্রচণ্ড আবেগী আর আনন্দ চিত্তে খুশি সেদিন নাওফিলকে বুকে জড়িয়ে নিলেও নাওফিল খুব সহজে তার কাছ ঘেঁষেনি। তবুও খুশি চেষ্টার ত্রুটি রাখতেন না নাওফিলের মন জয় করার৷ পাশাপাশি চাইতেন জাকির শেখেরও মনটা পেতে। কিন্তু লিন্ডা নামক ওই কুশ্রী মনের বিশ্বাসঘাতক নারীর প্রতি যেন তিনি জীবনের সবটুকু ভালোবাসা নিংড়ে দিয়েছিলেন৷ তাই তো খুশিকে দেওয়ার মতো কিছুই অবশিষ্ট ছিল না তার। স্রেফ দেহের চাহিদাটুকু পূরণ করা ছাড়া৷ জীবনটা সুন্দর করতে হবে, এ কথা ভাবতেন কেবল তিনি নাওফিলের জন্যই।

জায়িনের সন্ত্রাস রূপ সারা দেশে জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর আশেপাশের বহু মানুষ, আত্মীয়স্বজন সুযোগ পেলেই নাওফিলকে নিয়ে যখন তখন ভারী ভারী কূট মন্তব্য, ধিক্কার জানাতে পিছপা হত না। অতি চমৎকার দেখতে ছোট্ট নাওফিলও যে একদিন বাবার মতো সন্ত্রাস হবে, এ যেন সকলের ভবিষৎবাণী ছিল। যা এক পর্যায়ে জাকির শেখের মনকেও প্রভাবিত করে ফেলে নিদারুণভাবে৷ ছোটোবেলায় জায়িনও অবিকল নাওফিলের মতোই সরল, শান্ত, নম্র আর মেধাবী ছিল। ছিল পরিবারের সকলের বাধ্য ছেলে৷ সেই সরল ছেলেটিই যে এক সময় কুখ্যাত অপরাধী হবে, তা কি কেউ স্বপ্নেও ভেবেছিল? তাই নাওফিলও যে বড়ো হওয়ার পর বাবার মতো হবে না, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। যে কারণে স্নেহের ভাইয়ের একমাত্র অংশের প্রতি অসীম ভালোবাসা আর দুর্বলতা আড়াল করে খুব ছোট্ট থেকেই সেই ছোট্ট নাওফিলের প্রতি কঠোর হয়ে যান। বাড়ির প্রত্যেকের কাছে অফুরন্ত আহ্লাদ আর যত্ন পেলেও একমাত্র তিনিই কখনো ওর প্রতি আদর বা মমতা প্রকাশ করেননি। যতটুকু করেছেন তা কেবল রাতের আঁধারে নাওফিল গভীর ঘুমে নিমগ্ন থাকলে৷
শৈশব থেকে কৈশোরে বা কৈশোর থেকে তরুণ সময় অবধি সকলের এমন আচরণ পেয়েই বড়ো হয়েছে নাওফিল৷ জাকির শেখের পাথর মুখভঙ্গির কঠোর শাসন, প্রতিবেশী আর আত্মীয়দের তির্যক মন্তব্য আর দাদা-দাদি, চাচাতো দুই ভাইয়ের ভালোবাসা, এসবের সংমিশ্রণে নাওফিল এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের মানুষ হয়ে ওঠে। হুটহাট পাগলামি করে মর্গ থেকে কাটা লাশ চুরি করে আনা, সেই লাশের সামনে বসে নিজেকে বিভৎস খুনী বেশে সাজিয়ে ভিডিয়ো ধারণ করে পুলিশের কাছ অবধি তা পৌঁছে দিয়ে নিজ পরিচয় দেওয়া, ‘আমি গাজীপুর শ্রীপুর উপলেজার এমপি জাকির শেখের একমাত্র ছেলে নাওফিল শেখ বলছি। আমার ঘর থেকে লাশটা উদ্ধার করে নিয়ে যাবেন যত দ্রুত সম্ভব।’ এরপর থানা থেকে জাকির শেখকে তলব করা হত। জাকির শেখ তখন বাধ্য হতেন পুলিশকে ঘুষ দিয়ে ছেলের পাগলামি গোপন রাখার জন্য৷ কখনোবা ইয়াসিফের হাতেও এ কাজের দায়িত্ব ছেড়ে দিতেন। পাশাপাশি চলত নাওফিলকে শাসনের কাজও। কিন্তু এরকম৷ পাগলামি কাজ বারবার নানান উপায়ে হতে থাকল যখন, তখন জাকির শেখ বুঝলেন তার অতিরিক্ত শাসন বা কঠিন আচরণের ফলেই নাওফিল ভেবে নিয়েছে– জায়িন বা আয়মানের কাছ থেকে ওকে কেঁড়ে রেখেছেন তিনি কেবল প্রতিশোধ আর জেদের বশবর্তী হয়েই। আর এজন্যই ওকেও কখনো ভালোবাসতে পারেননি৷ তাই তো তার সম্মান ডোবাতে আর নিজের জীবনটাকেও ধ্বংস করে দিতে নাওফিল পাগলামিগুলো করে যাচ্ছে আর আগামীতেও যাবে।

এ ব্যাপারটি বোঝার পর থেকে তিনি নাওফিলকে ভালো-মন্দ, যে-কোনো কিছু বলায় ছেড়ে দেন। আবার কখনো নিজ দায়িত্বে বোঝাতেও যাননি, তিনি কতটা কষ্ট বুকে নিয়ে ভাইয়ের অংশকে আগলে রাখতে চেষ্টা করেছেন সারাটাজীবন। তবে তিনি বিশ্বাস করেছেন– ছোটো ভাইকে কষ্ট দিয়ে ওর সন্তানকে কেঁড়ে নিলেও ওই ভাইটাও একদিন বুঝবে, এই জাকির শেখ পাষাণের মতো অন্যায়টি করলেও সেদিন ভুল কিছু করেননি৷ তেমনই ওই ছোট্ট নাওফিলও একদিন বড়ো হয়ে ঠিকই বুঝবে তাকে। আর তার বিশ্বাস আজ সত্যিই ফলেছে৷ গত পাঁচটি বছরে নাওফিল ধীরে ধীরে জাকির শেখের সুপ্ত দুঃখগুলোর হদিস পেয়েছে৷ সেই দুঃখগুলো যেন আর কোনো রাত তাকে নির্ঘুম না রাখে, সেই দায়িত্বটিও গ্রহণ করেছে সে।

তাই তো মাহতাব শেখের সৎ ছেলে হয়ে জাকির শেখ গোটা জীবনে যা কিছু থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কিংবা বলা ভালো, যে সকল হক জাকির শেখ নিজেও ছেড়ে দিয়ে এসেছেন, তা নাওফিল কড়ায়গণ্ডায় বুঝে নিতে শুরু করেছে একে একে৷ শেখ বংশের যাবতীয় সম্পদের অধিকাংশ ভাগের মালিকানা জাকির শেখের প্রাপ্তি৷ বাদ বাকি জায়িন ও জাহিদের। কারণ, জান্নাতি বেগমের প্রথম স্বামী অর্থাৎ মাহতাব শেখের আপন বড়ো ভাই আফতাব শেখ এই বনেদি গোষ্ঠীর বহু সম্পদ নিজ পরিশ্রমে বাড়িয়েছিলেন। মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে তার আকস্মিক মৃত্যুর পর বিধবা ভাবি আর তার একমাত্র ছেলে জাকিরের দায়িত্ব মাহতাব শেখ স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেন ভাবিকে বিবাহের মাধ্যমে। কিন্তু নিজের দুই পুত্র সন্তান জন্মের পরই জাকিরের প্রতি ভীষণ অবহেলা করে যান তিনি প্রতিনিয়ত। সেই কষ্ট, ভাইকে হারানোর কষ্ট আর জীবনের প্রথম নারীকে ভালোবেসে ছলনার কষ্ট, নাওফিলকে পেয়েও না পাওয়ার কষ্ট, সবটা বুকের মধ্যে ঘুম পাড়িয়েই জাকির শেখ কেবল বাঁচতে হবে বলে টিকিয়ে রেখেছেন নিজেকে করুণ একাকীত্বের মাঝে। দ্বিতীয় স্ত্রী খুশিকেও ধীরে ধীরে মেনে নিতে শুরু করছিলেন তিনি। কিন্তু যেদিন জানলেন, নাওফিলের ক্ষতির জন্য এই ডাইনি স্বভাবের নারীটি বহু আগে থেকেই কালোজাদুর আশ্রয় নিয়েছে। সেদিন কেবল জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি, ‘কীসের কমতি ছিল, খুশি?’ খুশি বেগম অপরাধী মুখখানি করে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন, ‘আমার ছেলেটাকে আপনি আমার কাছে এনে দেননি। চেয়েছিলাম ওকে ওর দরিদ্র বাবার কাছ থেকে নিয়ে এসে আপনি এই শেখ বাড়িতে ওকে ঠাঁই দেবেন। আমি যেমন স্বীকৃতি দিয়েছি জাদের, তেমনই আপনিও আমার সোহেলের স্বীকৃতি দেবেন। কিন্তু আপনি শুনলেন না আমার আর্জিটুকু। আমার একটা ছেলের দায়িত্বটা নিলে কি জাদের সম্পত্তিতে খুব কম পড়ে যেত?’

এমনতর কথাগুলোর পর জাকির শেখ আরও একবার দেখলেন সেদিন স্ত্রীরূপী আরেক বিশ্বাসঘাতককে। যে দিনের পর দিন তার ছেলের রক্ষক বেশে হয়ে ছিল একজন ভক্ষক। খুশি বেগমের ছেলে সোহেল সৎ মায়ের সংসারে অভাব আর অবহেলায় বড়ো হতে হতে একটা পর্যায়ে এসে বখে যায়। ক্লাস এইট থেকেই যে পুরোদস্তুর মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে৷ যা শোনার পর খুশি বেগম জাকির শেখের কাছে আবদার রেখেছিলেন, তার ছেলেকে শেখ বাড়িতে আশ্রয় দেওয়ার জন্য। জবাবে তখন জাকির শেখ নীরবতা দেখালেও মনে মনে সম্মতই ছিলেন৷ এত বড়ো সাম্রাজ্যে কত লোককেই শেখ গোষ্ঠীর কর্তারা পেলেপুষে এসেছে চিরকাল৷ সেখানে নিজের স্ত্রীর প্রথম স্বামীর পক্ষের সন্তান তো আরও যত্নআত্তি পাবে এখানে। তিনি সোহেল ছেলেটির খোঁজ খবর নিতে গিয়ে যখন জানতে পারেন, ছেলেটি উচ্চ পর্যায়ের মাদকাসক্ত, তখন তিনি সেই ছেলেকে বাড়িতে ঢোকানোর মতো বোকামিটা করতে চাননি। কারণ, তখন নাওফিল, তাওসিফ আর ইয়াসিফ উঠতি বয়সি ছেলে৷ একবার সোহেল ছেলেটির সঙ্গ পেলে কে বলতে পারে, নিজের বাড়ির ছেলেগুলোও উচ্ছন্নে যাবে না? এমন ঝুঁকি তিনি নিতে নারাজ ছিলেন বলেই মাস গেলে সোহেলের জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের খরচা তুলে দিতেন খুশি বেগমের হাতে৷ ভালো থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থা, ভালো পরার ব্যবস্থা বা ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার ব্যবস্থা, সবটাই তিনি করে দিয়েছিলেন সোহেলের জন্য৷ কেবল বাড়িতে এনে তোলেননি৷ আর এই রাগ আর ক্ষোভ থেকেই খুশি বেগমের মাঝে হিংসাত্মক মনোভাব চলে আসে নাওফিলকে ঘিরে৷ বলা জরুরি, তার সুপ্ত মনের চাওয়া ছিল জাকির শেখ সোহেলকে নিজের পুত্র হিসেবে দত্তক গ্রহণ করুক। তাহলে অন্তত তার সম্পদের ভাগ পাবে সোহেল। সেটা পূরণ হয়নি বলেই ঈর্ষাকাতর আর ক্ষোভিত মনে সব সময় চেষ্টা করেছেন নাওফিলের অনিষ্ট করার৷ নাওফিলের বিয়ের পর বাদ রাখেননি দীধিতিকেও।

এসব ফাঁস হওয়ার পর মাহতাব শেখ রেগে আগুন রূপ ধারণ করেছিলেন। তার অমতে গিয়ে খুশিকে বিয়ে করার জন্য এই বৃদ্ধ বয়সে এসেও বাড়ি ভর্তি মানুষের মাঝে তার কাছে চরম অপমানিত আর লাঞ্ছিত হয়েছিলেন তিনি। খুশিকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুকুম ছিল তার জন্য৷ এবং আদেশ ছিল তিনি যেন কখনই নাওফিলের আশেপাশেও না আসেন৷ এক নিমেষে মাহতাব শেখ ভুলে গিয়েছিলেন সেদিন– যে নাতির ভালোবাসায় অন্ধ তিনি, সেই নাতিকে পৃথিবীর আরেক প্রান্ত থেকে লুকিয়ে এনে তাদের বুকে তুলে দিয়েছিলেন ওই সৎ পুত্র জাকির আইন শৃঙ্খলার ফাঁক ফোকরকে ডিঙিয়ে।
খুশি বেগমের নামে জাকির সাহেবউ সত্য-মিথ্যার আশ্রয়ে সাজানো বেশ ক’টি শক্তপোক্ত মামলা দিয়ে জেলে পুরে দেন তাকে৷ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড যেন ভোগ করতে হয় তাকে, তার সকল ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আবার মাহতাব শেখও একচুল ছাড় দেননি। এবং সেদিনের পর থেকে আজ চারটা বছর জাকির শেখও বাড়ির বাইরে। আর ফিরে যাননি সেখানে।

ক্রাচে ভর করে নাওফিল বাবার গাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল সবে। হাসপাতাল থেকে সরাসরি বাবার অ্যাপার্টমেন্টেই থাকতে হবে তাকে সুস্থ না হওয়া অবধি। কড়া আদেশ জারি করেছেন জাকির সাহেব। ছেলের কোনোরকম গাইগুই শোনেননি। তখুনি দ্বিতীয় আরেকটি পরিচিত গাড়ি এসে থামল। নাওফিল ধীর স্থির মুখভঙ্গি নিয়ে তাকায় সেদিকে। গাড়ির দরজা খুলে তাওসিফ নামল সঙ্গে কিরণকে নিয়ে৷ কিরণের চোখে-মুখে এক আকাশ কুণ্ঠা আর বিব্রতভাব। বোঝা গেল, তাকে জোরপূর্বক সঙ্গে এনেছে তাওসিফ৷ ওদের দেখা মাত্রই নাওফিল কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফেলে গাড়িতে ওঠার জন্য পা বাড়াল৷
-‘স্মরণ আজ সকালে উত্তরার ফ্ল্যাটে এসেছে।’ বলে উঠল তাওসিফ।
কথাটা কানে পৌঁছনো মাত্রই নাওফিল থেমে যায়৷ আর তা দেখে তাওসিফ ঠোঁটে বাঁকা হাসি খেলায় একটু৷ ইয়াসিফের সঙ্গে যে দা কুমড়ার সম্পর্ক নাওফিলের, তাওসিফের সঙ্গে অত বেশি বাড়াবাড়ি পর্যায়ের না হলেও আবার খুব একটা কমও না৷ তবে সেটা কেবল নাওফিলের দিক থেকেই৷ তাওসিফ খুব চেষ্টায় আছে, ওদের তিন ভাইয়ের সেই পুরোনো সম্পর্কটাকে আবার বাঁচিয়ে তোলার। এখন একমাত্র সে-ই শীতল আর নরম মেজাজি মানুষ।

-‘শেষমেশ তোর দেওয়া গিফ্ট ওর অ্যাকসেপ্ট করেছে৷ এর পেছনে ক্রেডিটটা কার, জানিস?’ বলতে বলতে কিরণকে নিয়ে এগিয়ে এলো তাওসিফ নাওফিলের কাছে।
-‘ক্রেডিট তোর বা তোর ক্রিমিনাল ভাইয়ের হলেও আমি তোদের ওপর দয়া দেখাচ্ছি না।’ কাঠ গলায় জানিয়ে দিলো নাওফিল।
তা শুনে তাওসিফ ব্যঙ্গ করে উঠল, ‘ওরে বাবা! আমি অসহায়, এতিম, কাঙাল মিহাদ তোর দয়া নিয়েই তো পঁয়ত্রিশে এসে ঠেকেছি৷ তুই না থাকলে আমি কীভাবে যে বাঁচতাম! তোকেই আমার বাপ বলে ডাকা উচিত।’
-‘কেমন আছ, কিরণ?’ তাওসিফকে স্পষ্ট অবজ্ঞা করে নাওফিল কিরণের দিকে মনোযোগ দিলো, ‘দেখা হয়েছে তোমার আপুর সঙ্গে?’

-‘হ্যাঁ, সকালে ওর সঙ্গে দেখা করেই আপনাকে দেখতে এলাম। আপনার কন্ডিশন এখন কেমন?’ অস্বস্তির সঙ্গে বলতে বলতে কিরণ রাগান্বিত আড় দৃষ্টি তাওসিফকে ছুড়ে দিলো৷ গতরাত থেকে এই লোকটার কব্জায় বন্দি সে। সকালবেলা যখন দীধিতি ফোন করল ঢাকা ফেরার কথা জানিয়ে, তখন এই বেহায়া লোকটা ওর সঙ্গেই নাচতে নাচতে উত্তরা চলে যায় নাওফিলের সেই বাসায়। যার বর্তমান মালিক এখন একমাত্র দীধিতিই। তাওসিফকে এতদিন পর হঠাৎ বিনা নোটিশে চোখের সামনে দেখেও বোনের মাঝে কেন যেন কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। তবে সেই আগের মতো গদগদ ভাবটাও দেখায়নি সে। পুরোদস্তুর নির্বিকার৷ যেন মনে হচ্ছিল, প্রতিদিনই তাদের দেখা সাক্ষাৎ বা যোগাযোগ সচল ছিল।
-‘আমি সব সময়ই আলহামদুলিল্লাহ ভালো থাকি৷ তোমার আপুর খবর বলো কিছু। শুনি কেমন কী দিনকাল যাচ্ছে তার?
প্রশ্নটা করতেই জাকির শেখের আগমন ঘটল৷ তিনি কিছুটা দূরে গুরুত্বপূর্ণ ফোনকলে ব্যস্ত ছিলেন এতটা সময়৷ কিরণকে দেখে সব সময়ের গম্ভীরতা নিয়ে প্রস্তাব দিলেন তাওসিফকে, ‘ওয়াইফকে নিয়ে চলো আমার বাসায়৷’

হো হো করে হেসে ফেলল তাওসিফ, ‘কী বলেন, কাকু? আপনার ছেলে গেটের সামনে থেকেই লাথি মেরে বসবে আমাকে। না কাকু, আমার বউকে নিয়ে যেচে পড়ে অপমান হতে রাজি নই।’
নাওফিল আর না দাঁড়িয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে উঠে এলো গাড়ির মাঝে। জানালা থেকে কিরণকে বলল, ‘তোমাকে কল করব, কিরণ৷ ফ্রি থাকলে রিসিভ কোরো। ভালো থেকো আর দোয়া কোরো আমার জন্য।’
-‘তুই এত নির্লজ্জ কেন’, ভুরু কুটি করে তাওসিফ ব্যঙ্গার্থে বলল নাওফিলকে, ‘ওর বোনকে ছেড়েছুড়ে দিয়ে ওর কাছেই আবার দোয়া ভিক্ষা চাইছিস! লজ্জা করে না? ও দোয়া করলে করবে তো আমার জন্য৷’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৮

-‘নির্লজ্জ তুই আর তোর ক্রিমিনাল ভাই। যাদের অগণিত বার আমার চোখের সামনে থেকে দূরে থাকতে বলি। কিন্তু তোরা তো কানকাটা।’ কটমট চোখে চেয়ে বলে উঠল নাওফিল।
তাওসিফ ঠোঁট টিপে হেসে আরও এক বাঁকা জবাব দেওয়ার জন্য মুখ খুলতেই জাকির শেখ দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশায় ঘাড় নাড়াতে থাকলেন। এই তিন ভাইয়ের মাঝে বাচ্চাদের মতো রোজকার ঠোকাঠুকি কখন না জানে ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়৷ সেই ভয়েই বুক কাঁপে তার। তাওসিফকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘যাবি তুই? গেলে গাড়ি বের কর।’
-‘না, কিরণকে হসপিটাল ঢুকতে হবে। পরে যাব আমরা। তোমরা বেরিয়ে পড়ো সাবধানে।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here